আজকের আলোচনার বিযয় সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, কোনো আঁতাঁত প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অনাগ্রহ দৃষ্টত মনে হয় এক সুচিন্তিত নীতিই বটে। ১৯৭০ সালের জুন মাসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে৺১ পরিষ্কার বলা হয় যে, অন্যান্য দলের সঙ্গে নির্বাচনী আঁতাত হলে তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবে। তাই এখন জনসাধারণকে তাদের “নিজ প্রতিনিধি ও দল” বেছে নিতে হবে। অবশ্য (আওয়ামী লীগ) দলের নিজ বিকল্পগুলি বেছে নেওয়ার পথ খোলা রাখার জন্য এই মর্মে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে:
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, আমরা দেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির সাথে কোনোই যোগাযোগ রাখবো না, ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে যে, যদি আগামীতে রাজনীতি গণতন্ত্রের পথে না এগিয়ে যায় এবং আমরা গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ও সংগ্রাম শুরু করতে বাধ্য হই সে ক্ষেত্রে আমরা দেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলের সহযোগিতাকে স্বাগত জানাবো ।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 2 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/03/আওয়ামী-লীগের-অভ্যুদয়-পটভূমি-3.jpg)
সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২
অন্যান্য দলকে আরো আশ্বাস দেওয়া হয় যে, আওয়ামী লীগ “শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ও দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাদের সহযোগিতা ও পরামর্শ চাইবে।” তাজউদ্দিন তাঁদের এ কথা মনে করিয়ে দেন যে, “নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হতেই পারে, তবে অসহযোগিতা তার পূর্বশর্ত নয় ।” উল্লিখিত রিপোর্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়ের আভাস রয়েছে:
(ক) বিরোধী শক্তির অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে নিজ প্রাধান্য ও আধিপত্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগ প্রত্যয়শীল;
(খ) পূর্ব পাকিস্তানে একাধিপত্য সত্ত্বেও এ দলটি পাকিস্তানী ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের মোকাবেলায় নিজের দরকষাকষির সীমিত সামর্থ্য সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবহিত। প্রথম বিষয়টি এমনকি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নদান পর্যায়েই পরিষ্কার ধরা পড়ে। কেননা, তখন কনভেনশন মুসলিম লীগও পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের মোট আসনের অর্ধেকের জন্য প্রার্থী দিতে পারেনি। আর দ্বিতীয় বিষয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরে স্পষ্ট হয় ।
আশু লক্ষ্য হিসেবে ছয়-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান চালায়। এ দল আগাগোড়া এ কথাই বলে যে, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, পাকিস্তানে শোষণমুক্ত এক জনসমাজের অভ্যুদয় ঘটানো। নির্বাচনী অভিযানের আগাগোড়া, বিশেষ করে, প্রচারণা অভিযানের প্রধান ভাষণগুলিতে কোনো ঐতিহ্যগত বা চিরায়ত শ্রেণীহীন সমাজ কিংবা কোনো নাস্তিক সমাজ সম্পর্কে কোনো কোনো মহলে যাতে কোনো প্রকার আশঙ্কার উদ্রেক না হয় সে জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
এটি করা হয় এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি নিবারণ করার জন্য যে পরিস্থিতিকে আওয়ামী লীগবিরোধী ধর্মীয় ও রক্ষণশীল দলগুলি তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কাজে লাগাতে পারে। ‘৫০-এর দশকের মাঝামাঝি মুসলিম লীগ আওয়ামী লীগের ঘন ঘন সমালোচনায় নিয়োজিত হয় ৷
সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে ঘন ঘন অভিযোগ তোলা হয়, তিনি পশ্চিমা লোকায়ত দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ আর ঠিক সে কারণেই তাঁকে ইসলামী পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষায় অক্ষম বলে অভিহিত করা হয়। আর এভাবেই মুসলিম লীগ পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এ সব কারণে দেশজ “সমাজতন্ত্রে” শেখ মুজিবের গুরুত্বারোপের বিষয়টিকে একটা সুপরিকল্পিত আত্মরক্ষামূলক অবস্থান বলেই মনে হয় ৷
এ ছাড়াও প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে কিছু হুমকির আভাসও ছিল। যেমন, তিনি তাঁর বিবৃতিতে বলেছিলেন যে, শাসনতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর নিজেরও কিছু ভাবনাচিন্তা আছে আর স্বায়ত্তশাসন ইস্যুর সাথে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। শাসনতন্ত্র তৎকর্তৃক অনুমোদন প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের ঘোষিত অবস্থানটিও শাসনতন্ত্রের বৈধতাদানের প্রক্রিয়াকে সহজ করবে—এমন আভাস মোটেও নয় কেননা, প্রেসিডেন্ট বলেন যে তিনি কেবলই সই করার এক যন্ত্রমাত্র নন, বরং একজন অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি
হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের দেশ ও জনসমষ্টির স্বার্থের হেফাজতেও দায়িত্ব রয়েছে । কথাবার্তা ও মন্তব্যে নানা সন্দেহ-সংশয়ের সৃষ্টি হয়। আর এগুলি আরো ঘনীভূত হয়। এলএফও বা আইন কাঠামো আদেশের কোনো কোনো বিধানের কারণে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বিদ্যমান কাঠামোর কোনো পরিবর্তন প্রবর্তনে প্রয়াসী হলে এ সব বিধান বলে প্রেসিডেন্ট তা নাকচ করার ক্ষমতা রাখেন। এলএফও’র, বিশেষ করে, দুটি-দফার সমালোচনা করেন পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকরা । এর প্রথমটি হলো ২৫নং দফা। এতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে: জাতীয় পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত শাসনতন্ত্র বিলটি অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্ট সমীপে পেশ করা হবে । এই অনুমোদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাতীয় পরিষদ বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে।” দ্বিতীয়টি ২৭নং দফা। এতে বলা হয়েছে:
১. এই আদেশের কোনো বিধানের ব্যাখ্যাদির বিষয়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ দেখা দিলে তা প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে নিষ্পত্তি হবে; এবং এ সিদ্ধান্ত হবে চূড়ান্ত এবং এ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
২. জাতীয় পরিষদ নয়, প্রেসিডেন্ট এই আদেশের যে কোনো সংশোধন করার ক্ষমতার অধিকারী হবেন।
এলএফও ঘোষণার অব্যবহিত পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি দু’দিনব্যাপী এক সভায় মিলিত হয়। এ সভা গণতান্ত্রিক নীতিমালা অনুযায়ী এলএফও’র সংশোধন চেয়ে এক প্রস্তাব পাস করে। প্রকাশ্যেও আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এলএফও’র সংশোধন করার জন্য বলে। তারা তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত করেনি। ছাত্রলীগও একই পথ অনুসরণ তবে এটিকে করে। তবে আওয়ামী লীগের মতো নীরব না থেকে তারা এলএফও’র সমালোচনায় সোচ্চার হয় ।
ছাত্রলীগের বক্তব্যে প্রেসিডেন্টকে তাঁর অর্পিত কার্যদায়িত্ব অপপ্রয়োগের জন্য অভিযুক্ত করা হয়। ছাত্রলীগ নেতারা বলেন যে, জাতি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কোনো শাসনতান্ত্রিক কাঠামো চায়নি। প্রেসিডেন্টের কেবল কাজ ছিল নির্বাচনের জন্য একটা আইন কাঠামো দেওয়া।
নির্বাচনের পরে যা কিছুই ঘটুক সেগুলি পুরোপুরিই জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় । শাসনতন্ত্র অনুমোদন বা অননুমোদনের ভিটো ক্ষমতা, এমনকি, প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতাটি তাঁর হাতে রেখে দেওয়ায় তাতে গণতান্ত্রিক নীতিমালা ও পাকিস্তানের জনসাধারণের প্রতি প্রেেিডন্টের অনাস্থাই প্রকাশ পেয়েছে।
তারা ঘোষণা করেন যে, বাঙালিরা কোনো ব্যক্তির দেওয়া শাসনতন্ত্র গ্রহণ করবে না। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নূর এ আলম সিদ্দিকী জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ভাবী সদস্যদের পূর্বাহ্ণে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন:
ছয় ও এগারো-দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য আপনাদেরকে সর্বাত্মক প্রয়াসী হতে হবে। আপনারা যদি এতে ব্যর্থ হন, তার পরেও আমরা আপনাদেরকে সম্মান দেব। কিন্তু কেউ যদি ছয়-দফা ও এগারো দফা প্রশ্নে রফা করে মন্ত্রিত্ব কিংবা পারমিট বাগাতে বাংলার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং কোনো অগণতান্ত্রিক পকেট শাসনতন্ত্র প্রণয়নে সাহায্য করেন, তাঁকে ক্ষমা করা হবে না।
এই বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে ও এক আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে ছাত্রলীগ কর্মীদের বলা হয়। ১৯৭০ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মিছিলে এক নতুন শ্লোগান: “জাগো, জাগো, বাঙালি জাগো” ধ্বনিত হতে শোনা যায়। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ছিল প্রদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন, তখন ১২৪টি কলেজ ইউনিয়নের মধ্যে ১১৪টি ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণ করতো ছাত্রলীগ। পরে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হলে ১৪২টি নির্বাচনের মধ্যে ১৩২টি নির্বাচনে ছাত্রলীগ জয়ী হয়ে ছাত্র সংগঠনসমূহের নির্বাচনে এক রেকর্ড সৃষ্টি করে ।
১৯৭০ সালের জুনে আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভা দলীয় ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে বলে যে, আওয়ামী লীগ এলএফও’র ২৫ ও ২৭নং দফা বাতিল দেখতে চায়। তবে প্রেসিডেন্ট দফাগুলি যদি বাতিল করতে রাজি নাও হন তবু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
আওয়ামী লীগ মনে করে, জনগণই কর্তৃত্বাধিকারের একমাত্র উৎস, আর এ-ও বিশ্বাস করে, জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করার মতো কোনো উচ্চতর কর্তৃপক্ষ দেশে নেই; জনগণ যদি ছয়-দফার প্রতি অনুকূল রায় দেয়, এলএফও’তে যা-ই লেখা থাক আওয়ামী লীগ উক্ত রায় বাস্তবায়িত করবে।
এর আগে ৩৮ শেখ মুজিব বলেন, (নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্টকে স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটির নিষ্পত্তি করতে হবে—এই মর্মে মওলানা ভাসানীর নাছোড়বান্দা দাবির উল্লেখ প্রসঙ্গে): “আমরা ভিখারি নই, আমরা জানি অধিকার কী করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।”৩৯ এমনি করে বলা চলে, কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আওয়ামী লীগের মনোভাব ছিল প্রায় অবজ্ঞার। তবু এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ৷
আওয়ামী লীগের জোট না বাঁধার নীতি এবং এলএফও’র তাৎপর্য সম্পর্কে তার নির্বিকার মনোভাব অনেকের কাছেই হেঁয়ালিময় মনে হয়। মুসলিম লীগের কোনো উপদলের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা বা পিপিপির সঙ্গে প্রায় সমঝোতা হয়েছে কিনা এ রকম নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায়।
শেখ মুজিবের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ ব্যক্ত করা হয়। পরে এলএফও সংশোধিত না হওয়া, চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার দাবি গৃহীত না হওয়া এবং নির্বাচন ডিসেম্বর অবধি স্থগিত রাখার দাবি গৃহীত না হওয়াকে শেখ মুজিবের পরাজয় বলে বর্ণনা করা হয়। ৪° কোনো কোনো সমালোচকের ধারণা, আওয়ামী লীগ যুক্তিবর্জিতভাবে অতি আত্মবিশ্বাসী। যুক্তি দেখিয়ে বলা হয় যে, শাসনতন্ত্রে ছয়-দফা কর্মসূচি সন্নিবেশিত করার জন্য আওয়ামী লীগের দরকার হবে পরিষদে অন্যান্য স্বায়ত্তশাসনপন্থী শক্তিগুলির মৈত্রীর।
আর যদি বিষয়টির ফয়সলা পরিষদের বাইরে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েও করতে হয় তাহলেও অন্য সব স্বায়ত্তশাসনপন্থী শক্তির সহযোগিতা প্রয়োজন হবে আওয়ামী লীগের। আর সে জন্যই আওয়ামী লীগের আঁতাতবিরোধী মনোভাব যুক্তিযুক্ত নয়।
অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, মুজিব তাঁর “আগ্রহাতিশয্যে” হয়তোবা “তাঁর দাবির বিষয়বস্তুগুলির প্রশ্নে কোনো রকম রফা না করেই তার যৌক্তিক উপসংহারে নিয়ে যাওয়ার এক বিশাল দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেন,” কেননা তাঁদের প্রায় সুনিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, “মাত্র একটি প্রদেশে তাঁর নিজ শক্তিকে ভর করে আর যা-ই হোক তিনি নিজ পছন্দমাফিক শাসনতন্ত্র পেতে পারেন না” কারণ, “গোলটেবিল সম্মেলনের অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত পরিষ্কার যে,
ছয়-দফার অত্যন্ত প্রবল বিরোধিতা কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে নয় বরং তার অস্তিত্ব রয়েছে ক্ষমতাসীন প্রতিযোগী স্তরগুলির মধ্যেও।” তাঁদের আশঙ্কা ছিল: প্রেসিডেন্ট শাসনতন্ত্র অনুমোদনের আগেই এ ধরনের বৈরিতা প্রকাশ্যে এসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে কেননা, প্রেসিডেন্ট তাঁর নানা বিকল্প খোলা রেখেছেন এ ঘোষণা দিয়ে যে, তিনি সই করার যন্ত্র হবেন না।
এলএফও ঘোষিত হওয়ার আগেই যদি এত গভীর আশঙ্কা অনুভব করা ও তা এত স্পষ্ট প্রকাশ করা হয়ে থাকে তাহলে এটি ধরে নেওয়া ভুল হবে (যেমন করেছেন কোনো কোনো সমালোচক) যে, শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এলএফও ঘোষিত হলে তাতে কী বিপদ নিহিত থাকতে পারে তা জানতেন না।
ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের মনোভাবটির এক সংক্ষিপ্ত ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে পাকিস্তান সোসাইটিতে প্রদত্ত পাকিস্তানের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী প্রফেসর জিডব্লিউ চৌধুরীর (যিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত বেসরকারি উপদেষ্টা) বক্তব্যে । পশ্চিম পাকিস্তানীরা কোনো অবস্থায় জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের অনিবার্য ফল মেনে নেবে না ও শাসক জান্তা এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানে কোনো রাজনৈতিক দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না… এ সব মেনে নেওয়ারই শামিল ছিল এ বক্তব্যটি ।৪৩ এমনিভাবে দেখা যায়, ‘৫০-এর দশকে যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বানচাল করা হয় পাকিস্তান ঠিক তখনকার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
ক্ষমতার রজ্জু যাদের হাতে তাদের পক্ষ থেকে ঘটনা পুনরাবৃত্তির বিপদ অগ্রাহ্য করার চিহ্নাভাস অত্যন্ত উজ্জ্বল, তীক্ষ্ণ হয়ে দেখা দেয়। তবে এমন চিহ্নও সুস্পষ্ট ছিল যে, এ ধরনের কোনো তৎপরতা বিনা চ্যালেঞ্জে যাবে না। পূর্ব পাকিস্তান আপোস-নিষ্পত্তির নীতির পথ ছেড়ে দিয়েছিল। সুনিশ্চিতভাবেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির এই বিরাট, বিশাল পরিবর্তন সাধনের স্থপতি ছিল আওয়ামী লীগ।
এলএফও ঘোষণার আগেও শেখ মুজিব ছয় হাজার ছাত্রলীগ কর্মীর এক বিরাট সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময়, আর শহীদ নয়, গাজী হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেন, যার এ পরিবেশে একমাত্র অর্থ ও তাৎপর্য এই হতে পারে যে, বিজয় দ্বারে সমাগত। আর তাই তাদের উচিত হবে শহীদ নয়, গাজীর ভূমিকা পালনের জন্য তৈরি হওয়া।
এলএফও জারির পর সাবলীল স্বচ্ছন্দে শাসনতন্ত্র পাস হওয়ার আশা ছিল একান্তই ক্ষীণ। তাজউদ্দিন আহমদের রিপোর্ট ও শেখ মুজিবের বিভিন্ন বিবৃতির যে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলি আওয়ামী লীগের চিন্তাধারারই পরিচায়ক। বাস্তবিকপক্ষেও, শেখ মুজিব ১৯৬৯ সা 1 থেকে যা বলে আসছিলেন তা এ কথা ঘোষণার সমান যে, যেভাবেই, যে পন্থায়ই হোক, আওয়ামী লীগ ছয়-দফা কর্মসূচি বাস্তবায়িত করার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
অবশ্য, দলটির অগ্রাধিকার থাকবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থার প্রতি। তবে জনপ্রতিনিধিরা যদি পরিষদের ভেতরে কাজটি না করতে পারেন, জনসাধারণকেই পরিষদের বাইরে তা করতে হবে। বাহ্যত সমালোচকরা (আওয়ামী লীগ মিত্র ও বৈরী—উভয় তরফের সমালোচক) প্রথমত, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের সম্ভাবনার উনমূল্যায়ন করেছিলেন আর, দ্বিতীয়ত, তাঁরা এ কথা ভুলে গিয়েছিলেন যে, যদি রাজপথে এ ইস্যু নিষ্পত্তি করতেই হয় তাহলে এমন এক বিশাল ব্যাপ্তির আন্দোলনের প্রয়োজন হবে যা কোনো বিশেষ একটি দলের সাংগঠনিক সামর্থ্যে কুলোবে না।
এ আন্দোলন এক পূর্ণ ব্যাপ্তির জাতীয় আন্দোলনের আকার নেবে। আর তাই আওয়ামী লীগ জোট না বাঁধলেও তার তেমন কোনো ক্ষতিই হবে না । অথচ নির্বাচনে জয়ের পর স্বায়ত্তশাসনের দাবি যে প্রক্রিয়াতেই পূরণ হোক না কেন, তা হবে আওয়ামী লীগের নামে । এ জন্যই আওয়ামী লীগ কোনরূপ মৈত্রী প্রস্তাবের প্রতি উদাসীন থাকে ।
যারা মৈত্রী বা আঁতাত চেয়েছিল তাদেরও কথাটা জানা ছিল। আর সে কারণেই তারা সবচেয়ে আধিপত্যশীল দলের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছিল। আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি এতই সুপরিসর ও সর্বাঙ্গীণ ব্যাপ্তির যে অন্যান্য স্বায়ত্তশাসনপন্থীর নতুন করে আর তাতে যোগ করার কিছুই ছিল না। নানা বৈরী পরিবেশ ও প্রতিকূলতার মধ্যে ছয়- দফা কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের অটল, অবিচল থাকার বিষয়টি এত পরিপূর্ণ ছিল যে, এ সব দাবির স্তর খাদে নামানোর আর কোনো অবকাশই ছিল না অন্যদের তরফে যদিও কোনো কোনো সমালোচক এর নাড়িই ধরতে পারেননি।
কেউ তা করেননি ইচ্ছাকৃতভাবে, অনেকে করেননি অতীত ঘটনাবলির ঊনমূল্যায়নের কারণে। অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ইস্যু নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তৈরি থাকার কথা এতই স্পষ্ট করে প্রকাশ করা হয় যে বিষয়টি সম্পর্কে আর কোনো সংশয়ই থাকতে পারে না যদিও কোনো কোনো সমালোচক আবারও হয় ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা বুঝতে না পারার কারণে দেখেও দেখেননি, এমনকি উপেক্ষাও করেছেন । এগারো-দফার প্রতি দলীয় সমর্থনের পাশাপাশি এ ধরনের ইতিবাচক প্রলক্ষণগুলি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে এক অজেয় অবস্থানে ন্যস্ত করেছে।
আর এর একমাত্র বিকল্প যা তার ইঙ্গিত আওয়ামী লীগই দিয়েছে। আওয়ামী লীগ বলেছে, তার বিকল্প কার্যব্যবস্থা হবে সহিংস গণজোয়ারের মাধ্যমে গোটা সমাজের খোলস বদলে ফেলার ডাক । তবে বিরাজমান পরিস্থিতিতে গোটা পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানীরা এ ধরনের আন্দোলনের সূচনা করবে—এটা অকল্পনীয়।
আর কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যেকার সম্পর্ক আগাগোড়া না বদলানো হলে পূর্ব পাকিস্তানীদের কোনো মাত্রার বিপ্লবী চেতনা তেমন সহিংস গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পারতো না যা পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। এ জন্য স্বাধীন না হলেও পূর্ব পাকিস্তানে বৈপ্লবিক প্রকৃতির পরিবর্তনের বাস্তব অবস্থাগুলি সৃষ্টির জন্য প্রাথমিক আবশ্যকতা ছিল এ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন। এ জন্য স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম শুধু অনিবার্যই নয় বরং অপরিহার্যও ছিল।
এ কারণে সমাজ পরিবর্তনের নিধিদের যুক্তিসঙ্গত মনোভাব হওয়া উচিত ছিল, এ প্রক্রিয়ায় গতি আরো জোরদার করা। ‘৫০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে শুরু করে পরের বছরগুলিতে এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন সমাজ পরিবর্তনের নানা গোষ্ঠী ও উপদল । এরা আবার এই প্রক্রিয়ার পরিক্রমায় অনেক খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। তবে মধ্যপন্থী শাখার প্রতিনিধিত্বকারী ওয়ালী ন্যাপ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠাকিভাবে বলতে গেলে প্রায় সব সময়েই আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ থেকেছে।
১৯৭০-এ কোনো কোনো ভাসানী অনুসারী আওয়ামী লীগের “মাধ্যমে” কাজ করেন বলে মনে করা হয় যখন মওলানা ভাসানী তাঁদেরকে কাজের কোনো দিগ্দর্শন দিতে ব্যর্থ হন।৪৪ অবশ্য তথাকথিত চরমপন্থীরা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আদর্শিক বুনিয়াদের ওপর বিরাট পরিসরে তেমন কোনো আশু প্রভাব ফেলতে পারেননি। তবে তারা সমাজের সর্বস্তরে মনোযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয় যার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হয় সুদূরপ্রসারী।
অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে বামরাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশ সম্ভবত বলে দেয় যে, ১৯৭০-এ তখনকার নিম্ন সাক্ষরতার হার, নিম্ন শিল্প ও নগরায়নের হারের আলোকে এবং কোনো ভালো শেকড় গাড়া শ্রেণী চেতনার অনুপস্থিতিতে ন্যাপ (এমনকি মধ্যপন্থী ওয়ালী ন্যাপ)-এর মতো বামপন্থী দলগুলির সঙ্গে আওয়ামী লীগের যুক্তফ্রন্ট গঠনও হিতে বিপরীত হতে পারতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ন্যাপ (ওয়ালী)-কে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মুখ সংগঠন বলে মনে করা হতো।
সে কারণে কড়াকড়ি আদর্শিক অর্থে এমন একটি সংগঠনে “ধর্মবিরোধী জনসমাজ” গঠনের অঙ্গীকার থাকতেই হয়। এখন আওয়ামী লীগের সাথে এ ধরনের একটি দলের গাঁটছড়া বাঁধা সম্ভব হলে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিগুলি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সফল আঘাত হানবে এমন ঝুঁকি ছিল । কারণ আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ প্রবণতার প্রবল বিরোধিতা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানী সমাজের একাংশে যদিও পরের দিকের বছরগুলিতে সমাজে এই প্রবণতা গৃহীত হতে থাকে তরুণ রক্তের প্রভাব বৃদ্ধির আবেশিক কারণে।
এই প্রবণতা গৃহীত হওয়ার আরো একটি কারণ হলো ইসলামের মৌলিক নীতিগুলির হেফাজতে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার (শেখ মুজিব নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে যে দেশজ সমাজতন্ত্রে তাঁর প্রত্যয়ের কথা বারংবার উল্লেখ করেন তা এ প্রসঙ্গেও তাৎপর্যপূর্ণ)। এ ক্ষেত্রে খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খন্দকার মোশতাক আহমদের মতো আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম। তিনি এসেছিলেন এক সুখ্যাত ধর্মপ্রচারক পরিবার থেকে।
আওয়ামী লীগ সংগঠনের সূচনা থেকে দলে তিনি উচ্চ মর্যাদায় আসীন ছিলেন। স্থানীয় স্তরগুলিতেও এ রকম নজির ছিল অনেক। আর বস্তুত এগুলি ছিল আওয়ামী লীগ সংগঠনের নাস্তিক্য ও জ্ঞেয়বাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ।
ন্যাপ (ওয়ালী) প্রচ্ছন্ন তাৎপর্যে কাজ করছিল আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের পক্ষে। তাই এই পর্যায়ে ওয়ালী ন্যাপের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাঁত হলে ‘ইসলাম পসন্দ’ মহলগুলি প্রবল শোর তুলে আঁতাত ও আঁতাতের অঙ্গ সংগঠনগুলিকে আরো জোরদারভাবে কলঙ্কিত করার প্রয়াসী হতো। আর সেটি বলাবাহুল্য, স্বায়ত্তশাসনই হোক কিংবা সমাজ পরিবর্তনই হোক কোনো কিছুর জন্যই অনুকূল হতো না ।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে একান্তই পরিষ্কার, আওয়ামী লীগের ভালো করেই জানা ছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যতদূর অবধি দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মকর্মে হস্তক্ষেপ না করবে ততদূর অবধি ঐ আদর্শ মেনে নেওয়া হবে—তার বেশি নয়।
তাই নির্বাচনী ইশতেহারে খুবই সতর্ক অঙ্গীকার করা হয় এই মর্মে যে, ইসলামী নীতিমালাবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না। ৪৫ এ ঘোষণা ছিল দলীয় ম্যানিফেস্টোর বিবৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে, কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক নীতিবিরোধী কোনো আইন পাকিস্তানের জন্য গণতান্ত্রিক পন্থায় একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নকালে পাস করা হবে না।
ওয়ালী ন্যাপের নির্বাচনী ইশতেহারে অবশ্য ইসলাম, কোরআন, শরিয়ত ও সুন্নাহ কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় বিষয়ের উল্লেখ নেই। এতে শুধু এ কথা বলা হয় যে, সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষাকে ঐচ্ছিক করা হবে ।
আর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য পৃথক উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হবে।৪৭ নিহিত তাৎপর্যে এ বিষয়টির গ্যারান্টি রয়েছে যে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে ধর্মে হস্তক্ষেপ করা হবে না। তবে ওয়ালী ন্যাপ জমি ও কলকারখানার বেসরকারি মালিকানা বিলোপে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকায় ৪৮ খোদ এই বিষয়টিই ইসলামবিরোধী এই অর্থে যে, ইসলাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ তো করেইনি, কোনো ব্যক্তির এ রকম সম্পত্তির পরিমাণের ওপরও কোনো সীমা আরোপ করেনি যদিও ইসলাম জাকাত ইত্যাদি ব্যবস্থার মাধ্যমে ঐ ব্যক্তির সম্পত্তি ও সম্পদে অন্যের হিস্যার ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে।
এ কারণে এ দল দুটির কোনো তরফ তাদের ঘোষিত আদর্শ ও উদ্দেশ্য বিসর্জন দিয়ে নীতির প্রশ্নে আপোস না করা অবধি আওয়ামী লীগ ও ওয়ালী ন্যাপের মধ্যে কোনো আঁতাত প্রস্তাব ফলপ্রসূ হতে পারতো না। তাই এ সব থেকে দেখা যাবে যে, উভয় দল তাদের দৌড়ের সীমাচৌহদ্দি পুরোপুরি জানা সত্ত্বেও, আঁতাত ইস্যু নিয়ে পরস্পরের সমালোচনায় লিপ্ত ছিল কেবল রসনাযুদ্ধের ফাঁকে এ বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যে যে, রাজনীতিতে ধর্মের মর্যাদা কী হবে সেই প্রশ্নে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু করতে যাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি রয়েছে ।
আওয়ামী লীগ ইসলামী নীতিমালা রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকলেও এ নিয়ে যে কোনো সময়ে প্রশ্ন তোলা যেতো। এগারো-দফার চূড়ান্ত অনিবার্যতা স্বীকার করে নিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকে একটি অবস্থানে নিয়ে আসে। অথচ এই এগারো- দফা কিন্তু সমাজে ধর্মের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে একেবারেই নিশ্চুপ।
ইসলামের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকারের বাস্তব প্রয়োগ অংশটিরও নানা ভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও দেওয়া সম্ভব। যুক্তির দিক থেকে দেখলে ইসলামী নীতিমালার পরিপন্থী যদি কোনো আইন না-ই হয়, তাহলে সেই আইনে ইসলামকে “সমুন্নত রাখার প্রয়োজনই বা কোথায়? ইসলাম সম্পর্কে আওয়ামী লীগের অবস্থানকে শেখ মুজিব আরো অস্পষ্ট করে তোলেন।
তিনি তাঁর বেতার/টেলিভিশন ভাষণে উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের ছয়-দফা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য সকলের প্রতি ন্যায়বিচার। কাজেই এ সব কখনো ইসলামবিরোধী হতে পারে না। আওয়ামী লীগের ‘ইসলাম পসন্দ’ বিরোধীরা হয় এ সব বিষয় ধরতেই পারেনি, নয় বলতে হয়, তাদের ইসলামবাদও আওয়ামী লীগের সমাজতন্ত্রের মতোই ধোঁয়াটে বা অন্তঃসারশূন্য । আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দলের এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, জনসাধারণকে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে । এতে বলা হয়:
ন্যায়বিচারের বুনিয়াদে আমাদের জনসমাজ পুনর্নির্মাণের অভিন্ন প্রয়াসে জনগণ যাতে সক্রিয় ও সম্মিলিতভাবে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারে সে জন্য আমাদের সমাজে বৈপ্লবিক প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করতে হবে। এ জন্যে দরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক সমাজ বিপ্লব সাধনের। এ ধরনের বিপ্লব সম্ভব করতে হলে আমাদের এক নতুন শাসনতন্ত্র, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মিতির প্রয়োজন ।
তাই বিপ্লব আনতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ও সেভাবে এক নতুন শাসনতান্ত্রিক, আর্থ-রাজনৈতিক ও সমাজ-শৃঙ্খলা এনে বর্তমান অবিচারসুলভ ব্যবস্থার অচলায়তনকে সরিয়ে দিতে হবে । নতুন ব্যবস্থার আওতায় অঞ্চল ও অঞ্চলের মধ্যে, মানুষ ও মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার বিরাজ করবে। আর সেভাবেই দলীয় ইশতেহার প্রণীত হয়েছে। ইশতেহারের রূপরেখায় পাকিস্তানের প্রতিটি অঞ্চল দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুবিচারের নিশ্চয়তা বিধানের এক সর্বাঙ্গীণ কৌশলের উপস্থাপনা রয়েছে।
ইশতেহারে শাসনতন্ত্রের জন্য প্রদত্ত রূপরেখার মৌলিক বৈশিষ্ট্যবলিতে “এক সত্যিকারের প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের” অঙ্গীকার রয়েছে—রয়েছে এই মর্মে গ্যারান্টি যে, “পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ্য় সন্নিবেশিত ইসলামের অনুশাসনবিরোধী কোনো আইন পাকিস্তানে প্রণয়ন বা বলবৎ করা যাবে না।” ছয়-দফা কর্মসূচির দাবিগুলি অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়াও ইশতেহারে আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক নানা ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে যেগুলি আওয়ামী লীগ সংগঠন বাস্তবায়িত করার আশা রাখে।
এগুলি হলো: এক ব্যাপক সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থা, সর্বাঙ্গীণ বন্যা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাদির বাস্তবায়ন, খাদ্যশস্যের উৎপাদকদের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও স্থিতিশীল মূল্য; বাতাঈ ও ইজারা প্রথায় আইন ও শরিয়ত প্রয়োগ; পশ্চিম পাকিস্তানে জায়গীরদারি, জমিদারি ও সর্দারি ব্যবস্থার বিলোপ, সরকারি খাস জমি ও বেসরকারি মালিকানার জন্য নির্ধারিত সিলিং বা সীমার অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন চাষী ও ক্ষুদ্র চাষীদের মধ্যে বিলিবণ্টন, সমবায়ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশসাধন; সকল মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এবং সকল ব্যাংক ও বীমা ব্যবসায়ের জাতীয়করণ, একচেটিয়া কারবারের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা; ক্রমবর্ধমান পদ্ধতির আয়কর ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং মুলধনী লাভ, মুনাফা, সম্পদ, দানদেহাজ, উপহার ও উত্তরাধিকারের বেলায় মোটা কর আদায়; কর অবকাশ, বিয়োজন ও মওকুফের বেলায় সর্বাঙ্গীণ পুনর্বিবেচনা • পদ্ধতির ব্যবস্থা, পাট ও তুলা ব্যবসায়ের জাতীয়করণ, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের অধিকার,
শ্রমিকদের ধর্মঘট, ন্যায্য মজুরি, তাদের ও তাদের পরিবারের যথা বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা-সুবিধা লাভের অধিকার; সেতু, সড়ক এবং সামুদ্রিক ও নদীবন্দর স্থাপনের মাধ্যমে উন্নততর যানবাহন ও যোগাযোগ সুবিধা প্রদান, নিরক্ষরতা উচ্ছেদ, সকল স্তরে ধর্মীয় শিক্ষা সম্প্রসারণের ব্যবস্থা, প্রাথমিক মান অবধি অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা, নতুন মেডিক্যাল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মেধাবী ছাত্রদের জন্য উচ্চতর শিক্ষা লাভের সুযোগ-সুবিধা, উর্দু ও বাংলাভাষার উন্নয়নে উৎসাহ প্রদান, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক ভাষাগুলির সংরক্ষণ, নারীর সমমর্যাদা,
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের নিয়ে সার্ভিস কোর গঠন; প্রতিটি ইউনিয়নে মেডিক্যাল সেন্টার ও প্রতিটি থানা সদরে হাসপাতালের ব্যবস্থা; পল্লী জনপদে মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েটদের জাতীয় সার্ভিস প্রবর্তন; পল্লী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে নিয়োগের জন্য প্যারামেডিক্যাল কর্মী প্রশিক্ষণ; মোহাজিরদের জন্য সমান অধিকার ও সুযোগ; স্বল্প ব্যয়সাপেক্ষ নগর আবাসন প্রকল্পের বেলায় অগ্রাধিকার, স্বাধীন ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি, ‘সিয়াটো’ ও ‘সেন্টো’ চুক্তি থেকে সরে আসা; সাম্রাজ্যবাদী ও নব্য উপনিবেশবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিপীড়িত মানুষের প্রতি সমর্থন, জাতিসংঘ প্রস্তাবানুসারে কাশ্মীর সমস্যার নিষ্পত্তি; ফারাক্কা বিরোধের মীমাংসা এবং সকল রাষ্ট্র, বিশেষ করে, প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ৷
ইশতেহারের উপসংহারে উল্লেখ করা হয় যে, ফেডারেশনের প্রতিটি ইউনিট সম্পর্কিত প্রস্তাব উল্লিখিত কাঠামোর মধ্যে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশন ইউনিটের আওয়ামী লীগ ইশতেহারে সাঙ্গীকৃত হবে । ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের একুশ-দফার সাথে ১৯৭০ সালের আওয়ামী লীগের ইশতেহারের মিল রয়েছে।
উভয় ইশতেহারেরই উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সকল স্তরের জনগণের মাঝে ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি। এ ইশতেহার স্পষ্টত আওয়ামী লীগের বাস্তববাদী বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছে। অবশ্য, দলীয় এ ইশতেহারে অ্যাপস্যাকের দাবিকে ঠাঁই দেওয়া হয়নি। ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলি আগাগোড়া বাস্তবায়িত হলে তা অবশ্য জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থায় একটা তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে ও অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের এক বুনিয়াদ রচনা করতে পারতো।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারাভিযান ১৯৭০ সালের ৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের বক্তৃতা-ভাষণগুলিতে প্রধানত স্থানীয় সমস্যাগুলির সাথে ছয়-দফা কর্মসূচি সম্পর্কিত ইস্যুগুলি আলোচিত হয়। এই প্রচারাভিযানের শেষ পর্যায়ে শেখ মুজিব হয় ব্যালটের মাধ্যমে নয় জনআন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের দাবি বাস্তবায়িত করার দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন শোষণ উচ্ছেদ করার সুযোগ নিয়ে এসেছে ।
তিনি আরো বলেন, “আমরা যদি সময়ের ডাকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হই তাহলে আগামী প্রজন্ম যুক্তিসঙ্গতভাবেই আমাদেরকে দায়ী করবে।” তিনি আশ্বাস দেন, “যারা জনস্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে এবার তাদের ব্যর্থ করে দিতে হবে কেননা, জাতীয় বিষয়াবলিতে বাঙালির অংশ নিশ্চিত করেই দেশের শাসনতন্ত্র প্রণীত হবে।” পূর্ব পাকিস্তানীদের
বারংবার মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের শোষকেরা পূর্বাঞ্চলের। জন্য দায়ী। আসন্ন ‘ব্যালটের লড়াই’ তাঁর জন্য হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ের মাধ্যমে বাংলার অধিকার হাসিলের শেষ সংগ্রাম । তিনি তাঁর কোনো কোনো বক্তৃতা/ভাষণে আরো উল্লেখ করেন যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর বিলম্বিত করার চক্রান্ত করা হচ্ছে । ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর তাঁর বেতার/টিভি ভাষণে দেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থার প্রেক্ষাপটে ছয়-দফা কর্মসূচির গুরুত্ব সম্পর্কে সবিশেষ জোর দিয়ে তিনি বলেন:
আওয়ামী লীগের ছয়-দফা কর্মসূচি, যা এগারো-দফারও অন্তর্ভুক্ত, আঞ্চলিক অন্যায়-অবিচার সমস্যার এক যৌক্তিক সমাধান। আমাদের ছয়-দফা ফর্মুলার ভিত্তিতে ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করে শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পুনর্নির্মিতিই সমস্যার সম্ভব একমাত্র সমাধান। এ স্বায়ত্তশাসনকে কার্যকর করতে হলে এতে অবশ্য অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা থাকতে হবে। এ জন্যই আমরা চাই, ফেডারেশনের ইউনিটগুলির ক্ষমতা থাকতে হবে।
এ জন্যই আমরা চাই, ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে মুদ্রা ও রাজস্বনীতি, অর্জিত বিদেশী মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য-সহায়তার বিষয়ে দরকষাকষির অন্যান্য ক্ষমতা থাকুক।
স্পষ্টত বোঝা যায়, ছয়-দফা কর্মসূচি ছিল আওয়ামী লীগের প্রধান অবলম্বন । ১৯৬৬ সাল থেকে পরবর্তীকালে এ দল একটানা এ কর্মসূচি বাস্তবায়নকেই তার একমাত্র না হলেও সর্বাগ্রগণ্য উদ্দেশ্য হিসেবে প্রচার করেছে।
১৯৭০ সাল নাগাদ এ কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের অন্য যে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। সে কারণেই বলা চলে, ‘তৃতীয় মত৫১-এর লেখকের মতো ভাষ্যকারগণ আওয়ামী লীগের সদরদপ্তরে মনোনয়ন প্রার্থীদের বর্ধিষ্ণু ভিড় লক্ষ্য করে যে বৈরী মন্তব্য করেছেন তা হয় বুঝবার ভুলে নয়তো নিদারুণ অস্বস্তিতে।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থীর সংখ্যা ছিল বিপুল । ১৯৭০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পূর্ব পাকিস্তান থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করার সময় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও যুগপৎ আওয়ামী লীগ সংসদীয় বোর্ডের সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন যে, যথাক্রমে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের ১৬২ ও ৩০০ আসনের জন্য ৩৫৯ ও ১৫৫৬টি আবেদনপত্র পাওয়া গেছে।
এই এতে এ দলের নির্বাচনে প্রত্যাশিত সম্ভাবনাটিই প্রতিফলিত হয়েছে। অন্য দলগুলির নির্বাচনে উন্নততর সম্ভাবনা থেকে থাকলে নিশ্চয়ই ‘খাঁটি নয়’ এমন প্রার্থীরা তাদের ওখানেই ভিড় জমাতো (যদি না আবেদনকারীদের এমন কোনো হীন মতলব থেকে না থাকে যে, আওয়ামী লীগ নেতাদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী, আত্মম্ভরী করে তুলতে হবে)। অন্য দলগুলির তুলনামূলক দুর্বলতা খুব পরিষ্কার লক্ষ্য করা যায় জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে তারা শতকরা কয়টি আসনে প্রতিযোগিতা করেছে তা থেকে।
স্পষ্টত আওয়ামী লীগ নির্বাচনী দৌড়ের প্রথম ধাপেই অন্য দলগুলির তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সকল আসনে গ্রাহী দেয়। সে তুলনায় মাত্র একটি দল জাতীয় পরিষদের ও দুইটি দল প্রাদেশিক পরিষদে ৫০ শতাংশের বেশি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়।
আওয়ামী লীগ ও অন্য দলগুলির মধ্যে উপরোক্ত বিরাট ব্যবধানের জন্য তাৎপর্য এই যে, অন্য দলগুলির কোনোটিই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে নবাগত ছিল না। অনেক বেশি সংখ্যক আসন বা নির্বাচনী এলাকা থেকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অক্ষমতায় এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, তাদের প্রভাব ছিল একান্তই স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত ।
এ কারণে অন্য দলগুলির পক্ষ থেকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রদেশের স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে—এই অজুহাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন-তারিখের তফসিল স্থগিত করার জন্য বলা খুবই স্বাভাবিক। তাদের এ অনুরোধ মঞ্জুর করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ১৯৭০ সালের যথাক্রমে ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর নির্বাচনের তারিখ আবার স্থগিত করার জন্য বলা হয় ।
তবে এ ক্ষেত্রে আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। আর নিয়তির পরিহাস এই যে, ১৯৭০ সালের নভেম্বরে যে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় পূর্ব পাকিস্তানকে বিধ্বস্ত করে তা এ সব দলকে আরো অজনপ্রিয় করে তোলে। আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন মঞ্চের আবেদন বেড়ে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক জান্তা যে অবহেলা দেখান তা তাঁরা বিভিন্ন সরকারি বিভাগে, সশস্ত্র বাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা বাড়িয়ে ও কিছু পূর্ব পাকিস্তানী আমলার পদোন্নতি দিয়ে,
কিংবা জাতীয় সম্পদের অপেক্ষাকৃত একটা বড় ভাগ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করে, এক দল শিল্পোদ্যোক্তা ও উদ্বৃত্ত চাষীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যা কিছু শুভেচ্ছা কোনো কোনো পূর্ব পাকিস্তানী মহলে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন তার সবটুকুই বরবাদ করে দেয় ।
আর এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের ছয়-দফা কর্মসূচির রূপরেখা নির্ধারিত কেন্দ্র- প্রদেশ সম্পর্কের বিষয়টি যাঁরা মেনে নিতে পারেননি তাঁরা তাঁদের যেটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা অবশিষ্ট ছিল, বিশেষ করে, ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকাগুলি সফর শেষে, ১৯৭০ সালের ২৬ নভেম্বর শেখ মুজিবের বিবৃতির পর, তার পুরোটাই হারান। তিনি তাঁর এই বিবৃতির শেষাংশে যা বলেন, তা কার্যত এক রণ হুঙ্কারের শামিল যাকে স্বাধীনতার প্রচ্ছন্ন ঘোষণা হিসেবেও ধরা চলে। তিনি বলেন:
বাংলাদেশ এখন জেগে উঠেছে। সে এখন তার রায় দেবে ব্যালটে, অবশ্য সে ব্যালট যদি ভেস্তে দেওয়া না হয়। আর ব্যালট যদি ভেস্তেই দেওয়া হয় তাহলে বাংলাদেশের মানুষ—যে লাখো মানুষ প্রাণ দিয়েছে তাদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে প্রয়োজনে আরো লাখো প্রাণের চরম আত্মত্যাগ স্বীকার করতে—যাতে করে বাংলাদেশ হতে পারবে তার নিয়তির বিধাতা।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার উপনিবেশ ধরনের সম্পর্ককে যদি চূড়ান্তভাবে উন্মোচিত করে থাকে আর সে কারণে আওয়ামী লীগ মোকাবেলার অবস্থান গ্রহণ করে চলতি সম্পর্কের ধারাবাহিকতার বিরোধিতায় স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন শুরু করে থাকে, পূর্ব পাকিস্তানে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত মানুষের প্রতি সরকারের নিদারুণ ঔদাসীন্য প্রমাণ করলো যে চলতি সম্পর্কের কাঠামোয় কোনো রেখাপাতই হয়নি। আওয়ামী লীগ নেতা আক্রমণাত্মক অবস্থানে যেতে বাধ্য হলো। এ বিষয়ে জনঅনুভূতির যথার্থ অভিব্যক্তি দিয়েছে ‘ফোরাম’ এভাবে:
যদি জনগণের সরকারই হতো তাহলে তার প্রধান নির্বাহী তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে বসতেন ভোলায় (ঘূর্ণিঝড়ে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা)—তিনি সরাসরি ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনা করতেন । বস্তুত এ কারণে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের জন্য যে দাবি উঠেছে তা উচ্চাভিলাষী রাজনীতিকদের কোনো আকস্মিক খেয়াল বা মর্জিমাত্র নয়। সপ্তকোটি মানুষের অস্তিত্বের জন্য এ এক অপরিহার্য প্রয়োজন।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 3 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2015/01/বাংলাদেশ-কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী-লীগের-কেন্দ্রীয়-কমিটি-4.jpg)
নির্বাচন আমাদের সমস্যার ধন্বন্তরী সমাধান—এমন কোনো ভ্রান্তিবিলাস বা মোহ আমাদের নেই। নির্বাচন কেবল আমাদের জনসমক্ষে ও গোটা দুনিয়ার কাছে স্বশাসনের জন্য পূর্ব পাকিস্তানী জনসাধারণের মৌলিক আকুতির স্বাক্ষর রাখবে। এ এমন এক দাবি যার জন্য আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বা যুক্তির প্রয়োজন নেই । এখন দরকার কেবল এর সপক্ষে সোচ্চার ও পরিষ্কার রেকর্ড রাখার। এ দাবি জানানোর পর আমাদের শাসক শ্রেণী তা অবজ্ঞা করলে, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পরবর্তী পর্যায় নিজেই প্রকটিত হবে।
এখনো সময় আছে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকার যা এ দেশে শান্তি ও সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। তবে এটির এক প্রদর্শনী সম্ভব যদি পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ পরিষ্কার গলায় বলতে পারে: আমাদের মৃতেরা জীবন দিয়ে এই ভোট দিয়ে গেছে, যারা আজও বেঁচে আছে তাদেরকে তাদের ভোট দিয়ে বলতে দাও ।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 1 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/সাধারণ-নির্বাচন-পর্ব-২.png)