সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট [ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ]

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট

সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট

 

 

জনাব সভাপতি, বন্ধু কাউন্সিল সদস্যবর্গ ও মাণণীয় অতিথিবৃন্দ। আপনারা আমার আন্তরিক অভিবাদন গ্রহণ করুণ। বিগত দুই বৎসর পাকিস্তানের কথা বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক উত্থান পতনে প্রচুর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এবং পূর্ব বাংলার অমর জনতার সেবায় একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত থেকে আজিকার এই কাউন্সিল সভায় আপনারা সমবেত হয়েছেন। এই অধিবেশনের গুরুত্ব অপরিসীম।

আওয়ামী লীগের এই বাৎসরিক কাউন্সিল অধিবেশনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব আপনাদের নিকট সুস্পষ্ট। আইনতঃ বৎসরে ন্যূনকল্পে একবার এই কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিগত ময়মনসিংহ অধিবেশনের পর ১৯৫৪ সালে কাউন্সিল সভা আহ্বান করা সম্ভবপর হয়ে উঠে নি। ইহার কারণও রয়েছে প্রচুর।

মজলুম জনগণের ঐক্যজোট এই আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কর্মী ও নেতৃবৃন্দকে পূর্ববঙ্গের [পূর্ববঙ্গে] ৯২-ক ধারা প্রয়োগের সাথে সাথে কারা প্রাচীরের অন্তরালে কাটাতে হয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হয়েছে, আবার অনেককে অন্তরীণ রাখা হয়েছে। পূর্ববাংলার অবিসম্বাদিত নেতা ও পূর্ববাংলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে প্রায় বৎসরাধিককাল পূর্ববাংলায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি।

সন্ত্রাসপূর্ণ ৯২-ক ধারার বিভীষিকার কথা নিশ্চয়ই আপনারা কেউ ভুলেন নি আর এও ভুলেননি যে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদ্দীকে বহুদিন যাবৎ মুমূর্ষু অবস্থায় জুরিখের হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। শত ইচ্ছে থাকা সত্যেও [সত্ত্বেও।

গত বছর কাউন্সিল সভা ডাকা সম্ভবপর হয়নি। আপনাদের অনেকেরই মতো আমিও তখন জেলখানায় বসে এই শুভ দিনটির প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছিলাম। আজ আমরা বিচার করবো অতীতে কি করেছি, আর সেই সাথে কর্তব্য নির্ধারণ করবো অনাগত ভবিষ্যতের। আগামী দিনের সুখ, ঐশ্বর্য্য ও সমৃদ্ধিপূর্ণ দেশ ও জাতি গঠণের কাজে নিজেদেরকে দৃঢ়প্রত্যয় সহকারে নিয়োজিত করার শপথ গ্রহণের এটাই মঙ্গল মুহূর্ত।

বন্ধুগণ, একটি রাজনৈতিক জোট হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমিকা বর্ণনা করার পূর্বে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে যে, কোন্ সামাজিক প্রয়োজনে এই দলের সৃষ্টি হয়েছিল এবং কি এর কর্মসূচি। এই দুটি প্রশ্নের সম্যক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা পরিস্ফুট হয়ে উঠবে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মূলে যে প্রেরণায় এ দেশের মজুর, কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিগণ উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, তা হচ্ছে স্বাধীনতা, সুষ্ঠু গণতন্ত্র, প্রগতি, সমৃদ্ধি এবং শৃঙ্খলমুক্ত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে জাতির অবাধ বিকাশ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে সাধারণ মানুষের অন্তরে যে মহাণ কামণায় বীজ লুকিয়েছিল, মুসলিম লীগ সরকার ব্যক্তিস্বার্থপরতার মোহে ফ্যাসিষ্ট দমণনীতির দ্বারা উহা নির্মূল করার ব্যর্থ প্রয়াসে মেতে উঠে।

পূর্ব বাংলার মজলুম জনতার একনিষ্ঠ সেবকরা সেদিন সেই অন্যায়কে নীরবে সহ্য না করে প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ দলের সেই অপচেষ্টাকে প্রতিরোধের জন্য চরম বিপদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছপাও হয়নি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস। পাকিস্তানের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় সৃষ্টি হয়েছিল এই মাসে। পূর্ব বাংলার তরুণ ছাত্ররা সেদিন প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সংগ্রামী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলে।

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য, পূর্ববঙ্গবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সেদিন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের মাধ্যমে ছাত্ররাই প্রথম জীবন পণ করে প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখী হয়। সেদিনকার ছাত্র আন্দোলনে আমিও আপনাদের অনেকেরই মতো অংশ নিতে পেরেছিলাম বলে অত্যন্ত গর্ব অনুভব করছি। তখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ ব্যতীত স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ বিরোধী কোন প্রতিষ্ঠানই আর ছিল না। ছাত্র লীগের উদ্যোগেই তখন গণ আন্দোলন দানা বেধে ওঠে। এর পর থেকে জালেম মুসলিম লীগ সরকার নিপীড়িত জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর প্রতিদিন হামলা চালিয়ে তাদের ঘৃণ্যরূপটি জনগণের সামনে খুলে ধরতে লাগলো।

 

 

কৃষক বুঝতে পারলো, মুসলিম লীগ জমিদার প্রভূদের স্বার্থরক্ষক; মঞ্জুর বুঝতে পারল, মুসলিম লীগ মালিক গোষ্ঠির শোষণের সহায়ক; ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা বুঝলো, মুসলিম লীগ বিদেশী একচেটিয়া পুজিপতিদের দালাল, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবিরা একে বুঝলো অশিক্ষা, নিরক্ষরতা, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ বাষ্পের ধারক ও বাহক এবং সমগ্র জাতি বুঝলো, মুসলিম লীগ পাকিস্তানের শান্তি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের দুশমন। মুসলিম লীগ এই দেশের মানুষকে সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের নাগপাশে চির আবদ্ধ রাখবার ভ্রান্ত উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে প্রাদেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, বিভেদ ও বিদ্বেষের বিষ ছড়ালো, জনতার ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরিয়ে এবং ভাষা, কৃষ্টি ও বিদ্বেষের বিষ ছড়ালো, জনতার ঐক্য ও সংহতিতে ফাটল ধরিয়ে এবং ভাষা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের বুকে ছুরিকাঘাত করে আমাদের জাতীয় বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালো।

ইতিহাসের চাকাকে পশ্চাদমুখী করার লীগ চক্রান্তকে ব্যর্থ করার এবং পাকিস্তানকে একটি প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবার পবিত্র দায়িত্ব মাথায় নিয়ে আর একটি শক্তি জন্ম নিল। ১৯৪৯ সনের ২৩ ও ২৪শে জুনে গণদরদী ও মজলুম জনগণের নেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জন্ম হলো।

বন্ধুগণ, আওয়ামী লীগ জন্ম হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও উহার কর্মীগণ এক দিনের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেনি। সামন্তবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মুসলিম লীগ সরকারের নূতন নূতন হামলার বিরুদ্ধে দুর্জয় সাহস নিয়ে আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন মোকাবেলা করতে হয়েছে। অত্যাচার ও জুলুম শাহীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ যে জোরালো প্রতিবাদের ধ্বনি তুলেছিল তারই ফল স্বরূপ জনগণের মধ্যে এসেছিল নব নব চেতনা, নতুন আশা ও উদ্দীপনা এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার বজ্র কঠিন শপথ।

ভাইসব! এর ফলে আওয়ামী লীগকে মূল্য দিতে হয়েছে অনেক। আমাদের শ্রদ্ধেয় সভাপতি জনাব ভাসানী, আপনাদের সাধারণ সম্পাদক ও হাজার হাজার কর্মীকে জেল, কারাবাস ও হাজতবাস করতে হয়েছে। হতে হয়েছে মামলার আসামী। সহ্য করতে হয়েছে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা, বহিস্কারাদেশ প্রভৃতি অকথা জুলুম। এ সব আপনাদের জানাকথা উল্লেখ করে আপনাদের অমূল্য সময় নষ্ট করবার ইচ্ছে আমার নেই।

ভাইসব! একথা আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে গণদাবীর বলিষ্ঠ আওয়াজকে উপেক্ষা করা যখন প্রতিক্রিয়াশীল ও গণ দুষমণ মুসলিম লীগ সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল এবং দেশব্যাপী সভাসমিতি ও প্রতিবাদের ঢেউ খেলে গেল যার ফলে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের হাটে মাঠে যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো তখন মুসলিম লীগ সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও পূর্ব বাংলায় সুদীর্ঘ আট বছর পর সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য হল।

অত্যাচার, অবিচার, অনাচার এবং মুসলিম লীগ সরকারের কুশাসনে ও গণবিরোধী ভূমিকায় জনসাধারণকে এত অকথ্য নিপীড়ণ সহ্য করতে হয়েছিল, দেশের আর্থিক কাঠামো এমনি ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল, পূর্ব বাংলার জনতা তথা জাতি এমনি ভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছিল যে জনতা একদিনের জন্যও মুসলিম লীগ সরকারকে বরদাপ্ত করতে রাজী ছিল না।

তাই তারা সমস্ত লীগ বিরোধী দলগুলির সমন্বয়ে মুসলিম লীগকে পূর্ববাংলার মাটি হতে উৎখাত করার জন্য একটি ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করবার আওয়াজ তুলেছিল। এই দাবীর পরিপ্রেক্ষিতেই জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাক আওয়ামী লীগ ১৯৫৩ সালের ১৪ই নভেম্বর তারিখে মোমেনশাহীর ঐতিহাসিক কাউন্সিল অধিবেশনে লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে মুসলিম লীগ জুলুম শাহীর মোকাবিলা করবার জন্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার পূর্বে মুসলিম লীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধজনিত মনোভাব হতে উদ্ভুত চিন্তাধারা প্রসূত লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠণ করবার ভাবাবেগ প্রশমিত করবার জন্যে আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু সহকর্মী এ- কথা আলাপ আলোচনার দ্বারা অনেক আওয়ামী লীগ কর্মী এবং নেতাকে বুঝাতে চেষ্টা করেছিলাম যে আওয়ামী লীগের পক্ষে একটি তথাকথিত যুক্তফ্রন্ট গঠণ করা মোটেই যুক্তিসংগত হবে না।

আমাদের এই মতের স্বপক্ষে তখন এই যুক্তি ছিল যে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান নির্বাচনপূর্ব সাত বছরের মধ্যে একদিনের তরেও আমাদের সংগ্রামী ঐক্যজোট আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বা তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গণদাবীর স্বপক্ষে একটি কথাও বলে নি তাদেরকে হঠাৎ লীগ বিরোধী প্রতিষ্ঠান বলে রাতারাতি প্রচার করলেও আমরা কি করে তাদেরকে লীগ বিরোধী প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করবো এবং এইরূপ জগাখিচুড়ি দল গঠণ করলে তার ফল দাঁড়াবে

এই যে, নির্বাচনপূর্ব সময়ে যারা নিজেদেরকে লীগ বিরোধী বলে প্রচারণা চালাবে ও বড়মুখে জনতার দাবী দাওয়া আদায় করবে বলে ঘোষণা করবে নির্বাচনোত্তর [নির্বাচনোত্তর] সময়ে তাদেরকেই হয়ত দেখা যাবে যে জনতার দাবীকে এড়িয়ে গিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে তারা গণ দুশমণ মুসলিম লীগের সাথে হাত মিলিয়েছে। অনেকেই সেদিন আমাদের এই মতকে উপহাস করে উড়িয়ে দিয়েছিলেন- এবং আমাদের মতকে অহেতুক ও অমূলক বলে গণ্য করেছিলেন।

 

সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট

 

এমনকি আমি যাতে এই তথাকথিত ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠণে বাধা না দিই তজ্জন্য আমাকে জীবন নাশের ভয় দেখিয়ে বেনামী কয়েকখানা চিঠি দেওয়া হয়েছিল উহা আজও আমার নিকট সুরক্ষিত অবস্থায় আছে। এমনকি তখন আমার বিরুদ্ধে একটি প্রচারণা শুরু হয়েছিল যে আমি যুক্তফ্রন্ট গঠণের প্রবল বিরোধী। হয়ত আজিকার এই কাউন্সিল অধিবেশনের অনেকেরই কাছে এই প্রচারণা পৌঁছেছিল।

কিন্তু বন্ধুগণ, আমি যখন দেখলাম যে মুসলিম লীগ শাহীকে খতম করবার জন্যে জনগণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং ইহার জন্যে যারা নির্বাচনের একদিন পূর্বেও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ করে এসেছে তাদের গ্রহণ করতেও জনগণ প্রস্তুত কিন্তু মুসলিম লীগকে এক মুহুর্তের জন্যও বরদাস্ত করতে রাজী নয় তখন জনমতের রায়কে মাথা পেতে মেনে নিয়ে মোমেনশাহীর ঐতিহাসিক কাউন্সিল অধিবেশনের ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠণের সিদ্ধান্তকে আমি মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিলাম। আজ আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, ঐরূপ জগাখিচুড়ী তথাকথিত যুক্তফ্রন্ট গঠণ করে আমাদের কোন লাভই হয়নি বরং সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

Leave a Comment