সিন্ধু বালোচিস্তান বিজয় | পশ্চিমোত্তরের সংগ্রাম | আকবর 

সিন্ধু বালোচিস্তান বিজয় :

সিন্ধু বালোচিস্তান বিজয় | পশ্চিমোত্তরের সংগ্রাম | আকবর

 

(১) সিন্ধু-বিজয়— কাশ্মীর ও কাবুল আকবরের হাতে ছিল, কিন্তু সিন্ধুনদের নিম্নভাগ তখনও স্বাধীন ছিল। সেটাকে বাদ দিয়ে সমগ্র উত্তর ভারত আকবরের শাসনাধীন বলা যেতে পারে না। মুলতান যদিও আরব-বিজয়ের সময় থেকে সিন্ধুর সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং চ-রেওয়াজের দৃষ্টিতেও সিন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তথাপি সিন্ধু ভাষা তথা রীতি থেকে পৃথক হয়ে মুলতান বাবরের আমল থেকেই মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে।

প্রাচীন মুলতান সুবায় তিনটি সরকার (জেলা) ছিল— মুলতান, দীপালপুর ও ভক্কর। ভক্করের সুদৃঢ় দুর্গ ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে আকবরের সেনাপতি কেশু খান অধিকার করেছিলেন। এবার বাদশাহ মুলতান থেকে দক্ষিণ সিন্ধু-উপত্যকা— বিশেষ করে ঠটা— সমুদ্রতট বরাবর হস্তগত করবেন বলে সঙ্কল্প করেন । কন্দাহার হাত-ছাড়া হয়ে গিয়েছিল।

সিন্ধু থেকে বালোচিস্তান কন্দাহারও দখল করা সম্ভব। আকবরের দৃষ্টিতে এই যুদ্ধের অনেক গুরুত্ব ছিল, তবুও এই অভিযানে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করেননি। এই কাজের জন্য আব্দুর রহীম খানখানাকে নিযুক্ত করা হয়, তিনি শেষ গুজরাত-বিজয়ে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে রহীমকে মুলতানের সিপাহসালার নিযুক্ত করে ঠটা অধিকার করার হুকুম হয়। ঠটার শাসক তখন মির্জা জানীর আস্ফালন ছিল কাশ্মীরের সুলতানের মতোই। তিনি দরবারে হাজির হয়ে অধীনতা স্বীকার করা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছিলেন।

জানী দুইবার প্রতিরোধ করেন, কিন্তু শেষে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। ঠটার পরে ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে সিয়ান’ দুর্গ শাহী সেনার হাতে চলে আসে। জানী দরবারে এলে আকবর তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন এবং তাঁকে ঠটা জায়গির দিয়ে তিনহাজারী মনসব প্রদান করেন। জানী ইসলাম ত্যাগ করে দীন-ইলাহী গ্রহণ করেছিলেন এবং আকবরের দারুণ ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। দক্ষিণের যুদ্ধেও তিনি বাদশাহকে সঙ্গদান করেন এবং ১৬০১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে আসিরগড়-বিজয়ের পর তাঁর মৃত্যু হয়। তুর্কি ভাষায় রাজকুমারকে বলা হয় তরখন। তারা তুরানের কোনো এক প্রভাব- প্রতিপত্তিশালী বংশের উত্তরপুরুষ ছিল।

দ্বিতীয়বার কাশ্মীর যাত্রা করেন। এর অল্পকাল পরেই সংবাদ আসে যে খানখানা সিন্ধু ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে চনাবের উপকূলে শিকার করতে করতে আকবর জয় করেছেন। তিনি জানতে পারেন, কাশ্মীরের রাজ্যপালের ভ্রাতুষ্পুত্র বিদ্রোহ করে ২. সিয়ান, লরকানা জেলায় অবস্থিত একটি শহর ও প্রাচীন দুর্গ ছিল।

 

ফারসিতে তাকে সিবিস্তানও বলা হতো, তবে তা বর্তমানের সিবি নয়। —রা: সা: নিজেকে কাশ্মীরের সুলতান বলে ঘোষণা করেছেন। ভিস্তরে পাহাড়ের ভিতর প্রবেশ করতেই সেনারা বিদ্রোহী সর্দারের মাথা কেটে তাঁর সম্মুখে পাঠিয়ে দেয়।

এই যাত্রায় তিনি মাত্র ষাট দিন কাশ্মীর উপত্যকায় থাকেন এবং বারামুলা গিরিপথ অতিক্রম করে পলি, রোহতাস হয়ে লাহৌর পৌছান। সেখানে খবর পান, রাজা মানসিংহ ওড়িশার আফগান সর্দারদের পরাজিত করেছেন । ওড়িশাকে বাংলা সুবার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয় এবং ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তা বাংলারই একটি অংশ হয়ে থাকে। এইভাবে পশ্চিমে সিন্ধু ও পূর্বে ওড়িশা অধিকৃত হওয়ার ফলে সমুদ্রতটের দুইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড আকবরের হস্তগত হয় ।

(২) বালোচিস্তান-বিজয় (১৫৯৫ খ্রিঃ) — খানখানা সিন্ধু-মুলতানে বসে এবার বালোচিস্তান ও কান্দাহার বিজয়ের প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে ঐতিহাসিক মীর মাসুমের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী গিয়ে কয়েটার দক্ষিণ-পূর্বে সিবী দুর্গ দখল করে নেন, দুর্গটি পরনি আফগানদের অধিকারে ছিল।

পাঠানেরা কঠিন প্রতিরোধ করেছিল, কিন্তু শাহী সেনার কাছে তা আর কতটুকু? এই দুর্গ জয়ের ফলে সুবার সীমা কন্দাহারের কাছ বরাবর পৌঁছে যায়। সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত মকরান অঞ্চলও তখন আকবরের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত । কন্দাহার আর কতদিন নিজের অদৃষ্টকে ধন্যবাদ জানাবে? দুই মাস পরে এপ্রিলে বিনা যুদ্ধে সেখানে অধিকার কায়েম হয়ে যায়।

কন্দাহার ইরানের হস্তগত ছিল। তাঁর ইরানী সুবেদার মুজফ্ফর হুসেন মির্জার নিজের অত্মীয়বর্গের মধ্যে কলহ চলছিল, ওদিকে উজবেক আব্দুল্লা খাঁর আক্রমণেরও সর্বদা আশঙ্কা ছিল, সেজন্য তিনি স্বয়ং আকবরের নিকটে দূত প্রেরণ করে জানালেন: আপনি কন্দাহার গ্রহণ করুন ।

কন্দাহার অধিগ্রহণ করার জন্য তিনি শাহবেগকে নিযুক্ত করেন । ১৫৯৫ থেকে ১৬২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কন্দাহার মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাহাঙ্গির সেটাকে হস্তচ্যুত করে ফেলেন, তারপর তাঁর পুত্র শাহজাহান ১৬৪৮ থেকে ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পুনরায় নিজের অধিকারে রাখতে সমর্থন হন। তারপর কন্দাহার বরাবরের জন্য মোগল সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ।

তুরানী উজবেগ খান আব্দুল্লার উল্লেখ আগে করা হয়েছে। তিনি ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে অর্থাৎ যে-বছর আকবর সিংহাসনে বসেন, তখন থেকে বুখারার হর্তা-কর্তা- বিধাতা হয়ে ছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যকে বিস্তৃত করতে করতে বদশী, হিরাসত ও মশহদ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন।

তিনি বুখারার সিংহাসনে বসেন ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে, অথচ তাঁর পিতা ইস্কান্দার তথা পিতৃব্য পীর মুহম্মদের সামনেও তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর পিতাকে ‘খাকানেজাহা’ (পৃথ্বীরাজ) ঘোষণা করেন। আব্দুল্লা অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। জিজক থেকে সমরকন্দ- গামী পথে জিলান্‌উতি সীমান্তে একখানি শিলার উপর তিনি নিম্নলিখিত অভিলেখ খোদিত করান—

“মরুভূমির অভিযাত্রী ও জলস্থলের যাত্রীদের জানা দরকার যে ৯৭৯ হিজরীতে (২৩শে মে, ১৫৭১-১৪ই মে, ১৫৭২ খ্রিঃ) খিলাফতের সহায়ক, মহাখাকান সর্বশক্তিমান মহাখান ইস্কান্দারখান-পুত্র আব্দুল্লার ত্রিশ হাজার সৈনিক এবং বোরকা খানের পুত্র দরবেশখান বাবাখান ইত্যাদির সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়।

তাঁর সেনাবাহিনীতে সুলতানের পঞ্চাশজন আত্মীয় ও তুর্কিস্তান-তাশকন্দ-ফরগানা- দস্তেকিপচকের চল্লিশ হাজার যোদ্ধা ছিল। গ্রহ-নক্ষত্রাদির সৌভাগ্যসূচক মাহেন্দ্রক্ষণে শাহের সেনা বিজয়প্রাপ্ত হয়। উপর্যুক্ত সুলতানদের মধ্যে বহুসংখ্যক নিহত হয় ও বহুসংখ্যক বন্দী হয়। এই এক মাসে এত রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল যে জিজক নদীর জলের উপর রক্ত ভাসতে থাকে” (মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, ২য় খণ্ড দ্রঃ)।

শয়বানিয়াদের (উজবেকদের) মধ্যে সবচেয়ে বড় খান ছিলেন আব্দুল্লা। শাহ তহমাস্পের মৃত্যুর পর আব্দুল্লার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। এরূপ প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিষয়ে আকবরের চিন্তিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ১৫৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারি আব্দুল্লা (২য়)-র মৃত্যুর পর সেই বিপদের আশঙ্কা দূর হয়ে যায়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সুলতানির মধ্যে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। তার ফলে আকবর পশ্চিমোত্তর সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হলেন, সেজন্য তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হল দাক্ষিণাত্য দিগ্বিজয়ের দিকে ।

 

Leave a Comment