স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ১

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ১।

স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী

 

স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী

 

উনিশ শতকের সূচনায় অজ্ঞ, অশিক্ষিত, গৃহের চার দেয়ালে বিধি-নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সর্বপ্রকার অধিকার বঞ্চিত বাঙালি নারীর যে চিত্রটি দেখতে পাওয়া যায় শতকের শেষ দশকে এসে সমাজের একাংশের ক্ষেত্রে সেই চিত্রটির আংশিক পরিবর্তন ঘটে, যা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

আবার এই উনিশ শতকের শেষার্ধেই দেখা যায় শতকের প্রারম্ভে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত, পশ্চিমী উদারনৈতিক ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারার ধারক এবং পশ্চিমী নারীমুক্তির ভাবধারায় বিশ্বাসী যে পুরুষসমাজ নারীর শোচনীয় অবস্থা উপলব্ধি করে তা পরিবর্তনের জন্য সংস্কার আন্দোলনের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন তাদের সংস্কারবাদের স্থানটি দখল করে জাতীয়তাবাদ।

এর কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন বৃটিশ শাসনের প্রতি শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত-অভিজাত শ্রেণির মোহভঙ্গকে। বৃটিশ শাসকেরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণিটির বিকাশ ঘটিয়েছিল তাদের মিত্র হিসেবে তাদের শাসন ও শোষণ কাজে এই শ্রেণিকে ব্যবহারের উদ্দেশে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই শ্রেণি বৃটিশ শাসনকে ভারতবর্ষের জন্য উন্নতির সহায়ক হিসেবে মেনে নিয়ে শাসকবর্গের সহযোগী হিসেবেই কাজ করে আসছিল, কিন্তু অচিরেই তাদের ধারণা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। বৃটিশ শাসন ভারতবর্ষের উন্নয়নে সহায়ক না হয়ে এর বিকাশসাধনকে বাধাগ্রস্ত করছে এই চেতনা থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সূত্রপাত হয়। 

এক্ষেত্রে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হচ্ছে ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলায় যেমন বৃটিশ শাসন সর্বাধিক ব্যাপ্তিতে বিকাশলাভ করেছিল, জাতীয়তাবাদ বিকাশের ক্ষেত্রেও বাংলার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। জাতীয়তাবাদ বিকাশের জন্য একান্ত প্রয়োজন হয় নিজেদের অতীত ঐতিহ্য, প্রথা, সংস্কার ও সামাজিক সংগঠনগুলির শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। এই প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক এই নতুন নেতৃত্বের কাছে বিশ শতকের প্রারম্ভে নারীর প্রশ্নটিও নতুন মাত্রায় দেখা দেয়।

এই পর্যায়ে এসে দেখা গেলো, বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সংস্কারবাদের পরিবর্তে সচেষ্ট হলেন প্রাচীন ভারতে নারীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে। একই সঙ্গে আরেকটি বোধের জন্ম হয় আর সেটি হলো দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করা। পাশাপাশি নারীকে শক্তিরূপে পূজা করবার প্রাচীন ভারতীয় রীতিটির পুনঃপ্রচলনও এই সময়ে দেখা যায়। এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

তিনি ১৮৮২ সালে রচিত আনন্দমঠ উপন্যাসে প্রথম দূর্গা-কালী রূপে নারীশক্তির সঙ্গে ভারতমাতার তুলনা করেন এবং এভাবে শক্তিরূপে নারীর পূজাকে নূতন করে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। বঙ্কিমের রচিত বন্দেমাতরম (মাতৃভূমির বন্দনা কর) ধ্বণিটি পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলনে মন্ত্র হিসেবে জনগণকে উজ্জীবিত করবার কাজে ব্যবহৃত হয়।

তবে তিনি তাঁর উপন্যাসে নারীর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেছেন, পরিবর্তে তিনি বাঙালি সনাতন হিন্দু রমণীর ধারণাটিই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন, যে নারী হবে প্রাথমিকভাবে শিক্ষিত, সত্যিকার অর্থে ধার্মিক, অল্প বয়সে বিবাহিত, যার আচরণ হবে নম্র, ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে যে হবে পতিব্রতা এবং পারিবারিক যে কোন প্রযোজনে নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির ভেতরে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ঘটলেও তা শিক্ষিত ভদ্রমহিলাদের ততটা অনুপ্রাণীত করে নি, এর কারণ হিসেবে দেখা যায় যে, যেহেতু শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণি জনপরিমণ্ডলের কাজের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন এবং অনেকেই বৃটিশ প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন, কাজেই তারা সহজেই বৃটিশ শাসনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং বৈষম্যমূলক আচরণসমূহ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

অপরপক্ষে বৃটিশ প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভাবে এই উপলব্ধি শিক্ষিত ভদ্রমহিলাদের মধ্যে সেভাবে জাগ্রত হয় নি, উপরন্তু নারীশিক্ষার প্রসারের মতো উন্নয়নকে তারা উন্নততর সভ্যতা বৃটিশদের শাসনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং বৃটিশ শাসনকে ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট বলে মেনে নিয়েছিলেন।

এছাড়া তখনও পর্যন্ত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নারীর জন্য উপযুক্ত কার্যক্ষেত্র নয়, এই অভিমতই ছিল সর্বজনস্বীকৃত। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৭৫ সালে যখন বঙ্গ মহিলা নামে মহিলাদের জন্য পত্রিকা প্রকাশিত হয় তখন তাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়

In this journal we will make special efforts to assemble as much as possible on current events. We will not discuss political events and controversies because politics would not be

interesting or intelligible to women in this country at present. But we will not be adverse to describing them insofar as they touch on social customs and behavior.”

১৮৮৪ সালে বামাবোধিনী পত্রিকা যখন রাজনৈতিক প্রবন্ধ প্রকাশ করতে আরম্ভ করে তখন তারা ব্যাখ্যা প্রদান করে এই বলে যে

in Bengal the time to teach women about politics has not yet come. In a country where many well-educated youths are incapable of understanding politics it will be a long time before the way can be prepared for teaching politics to women. But whether our women understand politics or not, it is essential that they possess a general knowledge of the past and present state of the country.’

কাজেই বলা যায় সচেতনভাবেই নারীদেরকে রাজনীতির বাইরে রাখা হতো। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৫-তে। এর চার বছর পর ১৮৮৯-এ কংগ্রেসের পঞ্চম অধিবেশনে দশজন নারী প্রতিনিধির উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়, তাদের মধ্যে দু’জন ছিলেন বাঙালি।

একজন স্বর্ণকুমারী ঘোষাল এবং অপরজন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। তবে তাঁদের উপস্থিতি ছিল শুধুমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে দর্শকসাড়িতে। বক্তব্য প্রদানের কোন অধিকার তাদের তখন পর্যন্ত দেয়া হয় নি। কংগ্রেস অধিবেশনে কখন মহিলারা প্রথম বক্তব্য রাখেন সে বিষয়টি নিয়ে গবেষকদের কিছুটা মতভেদ দেখা যায়।

ঐতিহাসিক যোগেশচন্দ্র বাগল-এর মতানুসারে ১৮৯০-তে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে এই দুইজন বাঙালি নারী প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং “কাদম্বিনী অধিবেশন শেষে সভাপতিকে ধন্যবাদ দান প্রসঙ্গে একটি বক্তৃতা করেন। অ্যানি বেসান্ট এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া বলেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যে ভারতীয় নারী জাতিরও উন্নতির দ্যোতক, এ ব্যাপারে তাহাই সূচিত হইল।

”” ঐতিহাসিক রাধাকুমার উল্লেখ করেন, “Another writer puts the date ten years later, saying ‘the first lady speaker of the Congress was Mrs. Kadambini Ganguli, who moved the customary vote of thanks to the president of the Sixteenth Congress in 1900 (Calcutta)’.”

সময় প্রসঙ্গে মতভেদ সত্ত্বেও দু’টি বক্তব্যে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট তা হচ্ছে, কংগ্রেস অধিবেশন মঞ্চে প্রথম যে নারী কণ্ঠটি শোনা গিয়েছিলো সেটি একজন বাঙালি নারীর। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় ১৯০১- এ কংগ্রেস অধিবেশনে আরেক বাঙালি নারী সরলা দেবীর বিখ্যাত ‘হিন্দুস্থান’ সঙ্গীতটি গাইবার ব্যবস্থা করা হয়, পরবর্তী সময়ে ১৯০৫-এ কংগ্রেসের বারানসী অধিবেশনে সরলা দেবী ‘বন্দেমাতরম্’ সঙ্গীতটি কিছু পরিবর্তন করে নিজ সুরে গেয়েছিলেন।

” তবে কংগ্রেস-এর এই পর্যায়ে যে নারী প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাওয়া যায় তা প্রধানত তাদের পিতা, স্বামী, ভাই বা বলা চলে পারিবারিক সূত্রে ঘটেছিলো। অনেকাংশেই এই প্রতিনিধিত্ব ছিলো অলংকারিক ও প্রতীকি। ১২

বাংলার নারীদের প্রথম রাজিৈতক আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগটি অবশ্য স্থাপিত হয়েছিল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পূর্বে ১৮৮৩ সালে ‘ইলবার্ট বিল’ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। ১৮৮৩-এর ফেব্রুয়ারিতে কোর্টনী ইলবার্ট ভারতীয় সিভিলিয়ানদের মফস্বলের ইউরোপীয় অপরাধীদের বিচার করবার ক্ষমতা প্রদান করবার সুপারিশ করে একটি বিল প্রণয়ন করেন।

এর পূর্বে কেবল শেতাঙ্গ ম্যাজিস্টেট বা জর্জ ব্যতীত অন্য কেউ শেতাঙ্গ অপরাধীদের মামলার বিচার করতে পারতো না। লর্ড রিপন কোর্টনী ইলবার্টের বিলে সহমত পোষণ করলে ইউরোপীয়ানরা এর বিরুদ্ধে ‘ইউরোপীয়ান এ্যান্ড এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করে। ১৩ এদের প্রতিরোধের কাছে নমনীয় হতে বাধ্য হন রিপন।

অবশেষে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, শেতাঙ্গদের বিচারকালে সমান সংখ্যায় ভারতীয় এবং শেতাঙ্গ সমন্বয়ে জুরীবোর্ড গঠন করা হবে। এই সিদ্ধান্ত ভারতীয়দের কাছে অসম্মানজনক বিবেচিত হয় এবং তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। ইতোমধ্যে ১৮৮৩-এর মে মাসে আদালত অবমাননার দায়ে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর দু’মাস জেল হয়।

” এই ইলবার্ট বিল আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই প্রথম বাঙালি নারীদের সরব হতে দেখা যায়। এসময়ে লর্ড রিপনের কাছে বাংলার শিক্ষিত ভদ্রমহিলাদের এক প্রতিনিধি দল এই বিলের পক্ষ সমর্থন করে আবেদন করেন। এতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ছিলেন, বিনোদিনী, সুলোচনা, চপলা, ভাবিনী, মনোরমা, হরোসুন্দরী, থাকোমনি সহ আরো অনেকে।

১৫ ইলবার্ট বিল আন্দোলন চলাকালে বাংলার জাতীয়তাবাদী নেতাদের অনেকে উপলব্ধি করলেন নারীরা রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করতে পারে। ১৮৮৩-তে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রথম সুপারিশ করলেন নারীজাতিকে দেশের রাজনৈতিক মানোন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করবার জন্য। ইলবার্ট বিল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন কবি কামিনী রায়, অবলা বসু সহ ছাত্রীরা। এদের মধ্যে ছিলেন বেথুন স্কুলের নিচু শ্রেণীর ছাত্রী সরলা দেবী, তাঁর ভাষ্যমতে

“এদিকে স্কুলে উপর ক্লাসের কতকগুলি মেয়েদের নেতৃত্ব-প্রভাবে আমার জাতীয়তার ভাব উত্তরোত্তর বর্ধিত হতে লাগল। তাদের মধ্যে অন্যতম নেত্রী ছিলেন- কামিনী দিদি ও অবলা নিনি।

তাদের নির্দেশগুলি আমাদের কাছে প্রবাহমান হয়ে আসত আমার দিদি ও তাঁর সহপাঠিনীদের মধ্য দিয়ে। সব সময় সব ব্যাপারগুলি না বুঝেও তাঁদের আদেশানুযায়ী কাজ করতুম। ইলবার্টবিলের আন্দোলনে সুরেন বাভুজ্য যখন জেলে যান, তখন সবাই একটা কালো রঙের ফিতে অস্তিনে বাঁধলুম। কেন তা ঠিক জানতুম না ।

এভাবে উনিশ শতকের আশির দশকে এসে বাঙলায় শিক্ষিত নারীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা কিছু মাত্রায় সঞ্চারিত হতে থাকে। তবে এই চেতনা সীমাবদ্ধ ছিল শহরের শিক্ষিত ভদ্রমহিলা শ্রেণির একাংশের মধ্যে।

বঙ্গভঙ্গ পূর্ব ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় এই পর্বে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটে সরলা দেবীর মধ্যে। বাল্যে ইলবার্ট বিল আন্দোলনে যোগ দেয়ার মধ্যেদিয়ে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শুরু হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্যদিয়ে তার জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে।

‘ভারতী’ পত্রিকায় বিভিন্ন লেখার মধ্য দিয়ে তিনি দেশবাসীর মনে বৃটিশবিরোধী মনোভাব তৈরী করতে সচেষ্ট হন। তার লক্ষ্য ছিল, “শুধু শরীরগত দৌর্বল্য হটালে হবে না, বাঙালীর মন থেকে ভীরুতা অপসারিত করতে হবে। দেখা যায়, পশ্চিম ও পাঞ্জাবের বড় বড় পালোয়ানেরাও সাহেব-ভীতিতে ভরা। এই সাদা চামরার ভয় সরাতে হবে।

” তাই তিনি ভারতীতে ‘মৃত্যুচর্চা, ‘ব্যায়ামচর্চা, ‘বিলেতি ঘুষি বনাম দেশী কিল প্রভৃতি প্রবন্ধে বাঙালী জাতিকে সুস্থ-সবল হতে এবং বিদেশীদের অপমানের প্রতিবাদ করে মৃত্যু পর্যন্ত বরণ করতে আহ্বান জানান। এর ফলে উদ্বুদ্ধ স্কুল-কলেজের ছাত্ররা দলে দলে সরলা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে থাকে এবং সরলা দেবী এদের মধ্যে থেকে বাছাইকরা ছেলেদের নিয়ে একটি অন্তরঙ্গ দল গঠন করলেন।

এই দলের সদস্যরা ভারতের মানচিত্রে প্রণাম করে শপথ করতেন তারা ‘তনু, মন,ধন’ দিয়ে ভারতের সেবা করবে। এবং এই শপথের সাক্ষী হিসেবে তাদের হাতে রাখি বাঁধা হতো। সরলা দেবী নিজ বাড়িতে এই তরুণদের জন্য ব্যায়াম এবং কুস্তি শেখাবার কেন্দ্র স্থাপন করেন।

সরলা দেবী এর পরবর্তীতে বাঙালির মধ্যে স্বদেশ গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসব, বীরাষ্টমী ব্রত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তিনি প্রথমে ১৯০৩সালে মহারাষ্ট্রের শিবাজী উৎসবের আদলে বাংলায় প্রতাপাদিত্য উৎসব চালু করেন। এর পর একই বছর তিনি উদয়াদিত্য উৎসবও চালু করেন।

এই উৎসবের উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে সরলা দেবীর বক্তব্য ছিল, “রাজপুত বীরবালক বাদল প্রভৃতির কীর্তি পড়ে আমরা বাঙালিরা অভিভূত হই, তাদের গৌরবে গৌরবানুভব করি, কবিতা বানাই, কিন্তু বাঙালীর ঘরের ছেলে উদয়াদিত্য যে মোগলদের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টায় সম্মুখ সমরে দেহপাত করেছিলেন তার খবর কিছুই রাখিনে।

তাঁর স্মৃতি বাঙালি যুবকের ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত করে দেওয়া দরকার।” এই উৎসবের মধ্যদিয়ে তিনি বঙ্গভঙ্গের পূর্বেই বাঙালি তরুণদের স্বদেশী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।

১৯০৪-এ সরলা দেবী বাঙালিকে শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত করবার জন্য প্রচলন করলেন বীরাষ্টমী ব্রতের। দূর্গা পূজার সময় মহাষ্টমীর দিন তরুণেরা তলোয়ারকে ফুল এবং চন্দন দিয়ে সজ্জিত করে ভারতের সকল বীরদের নামে স্তোত পাঠ করে অঞ্জলি দিত, মায়েরা শক্তিমন্ত্রের চিহ্ন স্বরূপ নিজের সন্তানের হাতে রাখী বেধে দিতেন, নানান ধরনের খেলার আয়োজনও এই দিন করা হতো। এই ব্রত উদযাপনের কারণ হিসেবে দেখা যাবে।

“বহুকাল ধরে বাংলাদেশের সংস্কারে যা রয়েছে কিন্তু বাঙালীর ব্যবহার থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে তারই পুনরুদ্ধার করা। বাঙালী মায়েদের বীরমাতা হওয়ার লক্ষপথে আবার নিয়ে আসা, সে বিষয়ে তাদের ব্রত পুনঃপ্রচলন করা।

ভীরু বাঙালী মাদের হাত দিয়েই ছেলেদের রক্ষাবন্ধন করিয়ে মায়ের নিজমুখে ‘বীরভব’ বলে ছেলেকে বীরোচিত খেলাধূলায় কাজেকর্মে প্রবৃত্তি দেওয়ান। মাতায় পূত্রে মিলিত হয়ে দেশকে গৌরবশিখরে সমুন্নত রাখার প্রকৃষ্ট সাধনা যে দেশের ধর্মোৎসবের একটি অঙ্গ ছিল-সে দেশ আজ এত হীন এত পতিত হয়ে আছে কেমন করে।”

সরলা দেবী কর্তৃক প্রচলিত এসব অনুষ্ঠান বিশ্লেষণে বলা যায়, যে তিনি উপনিবেশিক শাসকবর্গের তুলনায় বাঙালি জাতির শারীরিক এবং মানসিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন শুরু হবার পূর্ব থেকেই দেশীয় পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য বিভিন্ন স্বদেশী ভাঙার খোলা হতে থাকে। সরলা দেবীও এসময় নিজ খরচে একটি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ খোলেন। এটি ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা শুধু মেয়েদের জন্য একটি স্বদেশী বস্ত্রের ও দ্রব্যের ভাণ্ডার।

১৯০৪ এ বম্বে কংগ্রেসের প্রদর্শনীতে এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে বিভিন্ন দেশীয় পণ্য প্রেরণ করা হয় এবং প্রদর্শনীতে সরলা দেবী স্বর্ণপদক লাভ করেন। সরলা দেবীর আরো একটি কৃতিত্ব হচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম গানটিতে সুর দিয়ে বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে গাওয়ানো। গানটিতে প্রথমে দুটি পদে রবীন্দ্রনাথ সুর বসিয়েছিলেন, পরে তিনি তাঁর সুযোগ্য ভাগ্নি সরলাকে দায়িত্ব দেন সম্পূর্ণ গানটিতে সুরারোপ করবার জন্য।

সরলা দেবীর দেয়া সুরেই গানটি সভা-সমিতিতে পাওয়া হতে থাকল। আর ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনির প্রচলন হয় সরলা দেবীর ভাষ্যমতে, “বন্দে মাতরম্ শব্দটি মন্ত্র হল সর্বপ্রথম যখন মৈমনসিংহের সুহৃদ সমিতি আমাকে স্টেশন থেকে তাদের সভায় প্রসেশন করে নিয়ে যাবার সময় ঐ শব্দ দুটি হুংকার করে যেতে থাকল।

সেই থেকে সারাবাংলায় এবং ক্রমে ক্রমে সারা ভারতবর্ষে ঐ মন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ল-বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যখন গবর্নর সাহেবের অত্যাচার আরম্ভ হল আহিমালয়-কুমারিকা পর্যন্ত ঐ বোলটি ধরে নিলে।

”১৭ সরলা দেবীর স্বদেশী প্রচেষ্টা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগে থেকেই শুরু হয় এবং বঙ্গভঙ্গ পূর্ব সময়ে বাংলার তরুণসমাজের মনে জাতীয়তাবোধের চেতনা বিকাশে এবং তাদের স্বদেশহিতের ব্রত গ্রহণে সরলা দেবী একক নারী হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তবে যে বিষয়টি উল্লেখ্য তা হলো তিনি বিশেষভাবে কেবল নারীদের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট কোন কর্মসূচি এই পর্যায়ে গ্রহণ করেন নি।

১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গের সময় সরলা দেবীর জীবনের পটপরিবর্তন ঘটে। এই সময় বিবাহসূত্রে তিনি পাঞ্জাবে বসবাস শুরু করেন এবং তার কর্মক্ষেত্র হয় পাঞ্জাব। তবে পরবর্তী সময়ে ১৯১০-এ তিনি ‘ভারত স্ত্রীমহামণ্ডল’ গঠন করেন এবং বাংলাতেও এর শাখা খোলা হয়।

বাঙালি জাতি বৃটিশ শাসনের মোহভঙ্গ হয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনায় যখন পরিপুষ্ট হচ্ছে ঠিক তখনই বঙ্গভঙ্গ নামক কার্জনীয় চক্রান্তের আকস্মিক ক্রুরতায় তারা প্রকাশ্য বিদ্রোহের পথে নেমে আসে। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব বিশদভাবে প্রকাশ করা হয়।

একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয় যে ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। ৬ জুলাই প্রথম প্রস্তাব প্রকাশিত হবার পর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিরুদ্ধে সকলকে প্রতিবাদ করতে আহ্বান জানান। জনসাধারণের মধ্যেও ব্যাপক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিভিন্ন সভায় মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য, মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী এবং অন্যান্যরা সভাপতিত্ব করেন।

বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব ১৯০৫ সালে গৃহীত হলেও এই চক্রান্ত চলছিল বহুদিন ধরেই। বাঙালি জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের পরিচয় পেয়ে একে বাধাগ্রস্থ করবার জন্য এ প্রচেষ্টা বহুদিন ধরে চলে আসছিল।

বাঙালির ঐক্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে নিজেদের স্বার্থ পূরণের নীতিতে বিশ্বাসী বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী বাঙালি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরাবার প্রক্রিয়া হিসেবে বঙ্গভঙ্গ-এর পথ বেছে নিয়েছিলো। আসাম বাংলা থেকে ছিন্ন হয় ১৮৭৪-এ। এই সময়ে বাংলা ভাষাভাষী সিলেট (শ্রীহট্ট), কাছাড় ও গোয়ালাপাড়াকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করে একজন চিফ কমিশনারের অধীনে আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে ১৯০১-এ পুনরায় বাংলাকে বিভক্ত করবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসময় এন্ড্রু ফ্রেজারের প্রস্তাব অনুসারে উড়িষ্যাকে মধ্যপ্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এন্ড্রু ফ্রেজার বাংলার ছোটলাট নিযুক্ত হবার পর ১৯০৩-এ পুনরায় বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। এবার প্রস্তাব নেওয়া হয় চট্টগ্রাম বিভাগ, ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলাকে কিছু কিছু আঞ্চলিক পরিবর্তনসহ যুক্ত করা হবে আসামের সঙ্গে।

কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, এ প্রস্তাব কার্যকর হলে পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলি কলকাতার অনিষ্টকর প্রভাব থেকে মুক্ত হবে এবং পূর্ববাংলার মুসলমানরা ন্যায়বিচার পাবে।” এই প্রস্তাব প্রকাশ হয় ১২ ডিসেম্বর ১৯০৩ এবং সঙ্গে সঙ্গে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, শুরু হয় বিক্ষোভ প্রতিবাদ। ১৯০৩-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯০৪-এর জানুয়ারির মধ্যে ৫০০ প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয় পূর্ববাংলায়।

২২ এদিকে ১৮ মার্চ ১৯০৪, কলকাতার টাউনহলে রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। টাউন হলের দ্বিতীয় তলায় স্থান সংকুলান না হওয়ায় একই সঙ্গে একতলাতেও প্রতিবাদসভা হয়। সঞ্জীবনী পত্রিকায় লেখা হল, “এমন সভা কেহ কখনও দেখে নাই। ২৩ সরলা দেবী ২৯ এপ্রিল ১৯০৪ তারিখে প্রতাপাদিত্য উৎসবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করলেন ক্লাসিক থিয়েটারে।”

সর্বক্ষেত্রে প্রবল জনবিক্ষোভ এবং প্রতিবাদ সত্ত্বেও কার্জন নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে ১৯০৫-এর জুলাই মাসে বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করলেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রচারিত হওয়ায় ২০ জুলাই ১৯০৫ তারিখেই কৃষ্ণকুমার মিত্র সঞ্জিবনী পত্রিকার মাধ্যমে বিদেশী পণ্য বর্জন এবং ত্যাগস্বীকার করেও স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহারের জন্য এক প্রতিজ্ঞাপত্র প্রকাশ করেন। বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ চলতে থাকে।

সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর বাড়িতে এক সভায় সর্বজনীনভাবে বয়কটের প্রস্তাব গ্রহণ প্রচার ও প্রয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। জাতীয় কর্তব্য নির্ধারনের জন্য নেতৃবৃন্দ ৭ আগষ্ট ১৯০৫ কলকাতা টাউন হলে এক সভা আহ্বান করেন। এই সভা থেকেই নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন ঘোষণা করেন। সভায় সাংবাদিক নরেন্দ্র সেন বিদেশি দ্রব্য বর্জন সংক্রান্ত প্রস্তাব পাশ করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২৫

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সব থেকে সফলরূপ বিদেশী পণ্য বর্জন, এবং এই বিদেশি দ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রচার এবং দেশীয় পণ্যের প্রসারের আন্দোলনকে শক্তিশালী এবং সাফল্যমণ্ডিত করবার জন্য সমাজের সর্বস্তরের মহিলাদের সাহায্য বাঙালি পুরুষদের প্রয়োজন হয়।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সম্পৃক্ত জাতীয়তাবাদী নেতারা এটি উপলব্ধি করতে পারলেন যে, গৃহের নারীদের সচেতন করতে না পারলে তাদের আন্দোলন পূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারবে না। অতএব তারা এবার উদ্যোগী হলেন নারীদের স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে।

তবে এই উদ্যোগ নারীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন অথবা মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির লক্ষে ছিল না, ছিল পুরুষদের নিজেদের আন্দলোনকে সফল করবার জন্য। এই উদ্যোগের পথম প্রয়াস হিসেবে ঐ বছর ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার প্রাক্কালে স্বদেশী নেতৃবৃন্দ মেয়েদের কাছে একটি আবেদন রাখলেন। ভাইফোঁটা উপলক্ষে তাঁদের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে জাতীয় ধনভাণ্ডারে দান করবার জন্য প্রচারিত এই আবেদনপত্রে স্বাক্ষরকারীদের অন্যতম ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  

আবেদনে বলা হয়

ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ও ধনভাণ্ডার

বন্দেমাতরম্

ভগিনীগন, ভাইদ্বিতীয়ার আর বিলম্ব নাই। ঈশ্বরের কৃপায় এই বৎসর হইতে তোমাদের ভাই দ্বিতীয়ার যজ্ঞ বৃহৎ হইয়া উঠিতেছে। এবার রাখীসূত্রে সমস্ত বাঙ্গালি ভাই হইয়া মিলিয়াছে। এবারে তোমরা ভাইকে নিমন্ত্রণ করিবার বেলায় দেশভাইকে ভুলিও না। ভগিনি! আমরা তোমাদের দেশভাই, সেই শুভদিনে সমস্ত বঙ্গরমণীর কোমল হৃদয়ের কল্যাণ কামনার জন্য উন্মুখ হইয়া থাকিব। 

সেদিন তোমাদের ঘরের ভাইয়ের অন্ধ্রের থালায় যখন অন্ন পরিবেশন করিবে, তাহাদের যন্ত্রের থালায় যখন বস্ত্র সাজাইয়া রাখিবে তখন হে কল্যাণি মনে রাখিও, ভাই তোমাদের একটি দুটি নহে সমস্ত দেশ ব্যপ্ত করিয়া বহু কোটি তোমাদের ভাই; তাহাদের অন্নের স্বচ্ছলতা নাই, তাহাদের শরীর রোগে জীর্ণ, তাহাদের পরিধানের বস্ত্রটুকু সমুদ্রপার হইতে আহরণ করিতে হয়।

তাহারা অন্নবান হউক, তেজস্বী হউক, নীরোগ হউক, তাহারা নিজের দুঃখ নিজে মোচন করিবার শক্তি লাভ করুক, এই কামনা করিয়া, ভগিনীগণ সেই দেশ-ভাইদের অন্ন ও বস্ত্রের উদ্দেশ্যে সেদিন যথাসাধ্য কিঞ্চিৎ দান করিও। তোমাদের কল্যাণ কামনায়, তোমাদের মঙ্গলদানে আমাদের দেশের সমস্ত ভ্রাতৃগণের ললাটের তিলক উজ্জ্বল হইয়া উঠিবে, যমের দ্বারে যথার্থই কাটা পরিবে এবং যে বিধাতা তোমাদিগকে বাঙ্গলা দেশে বাঙ্গালীর ঘরে জন্ম দিয়া বাঙালীর ভগিনী করিয়াছেন তিনি প্রসন্ন হইবেন।

তাঁহার প্রসাদেই তোমাদের দেশের ও ভাইদের সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের ঘরের ভাইদেরও যথার্থ মঙ্গল হইবে, ইতি। শ্রীশিশিরকুমার ঘোষ, ” সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,” আনন্দমোহন বসু,/” জগদিন্দ্রনাথ রায়,” নলিনবিহারী সরকার, ” মতিলাল ঘোষ, ” ভূপেন্দ্রনাথ বসু, ” রবীন্দ্রনাথ ‘ঠাকুর, ২৭

এই আবেদনে সাড়া দিয়ে মেয়েরা ভাইফোঁটার খরচ বাঁচিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জাতীয় তহবিলে দান করতে থাকে। পাশাপাশি রাখীবন্ধনের জন্য অন্দরমহলে বসে প্রদীপের সলতে পাকানোর মতো রাখী তৈরির কাজেও মেয়েরা ব্রতী হয়।

প্রবাসী পত্রিকায় একজন লেখকের লেখায় জানা যায়, “সেই রাখীবন্ধন দিবসে ঊষাকালে যখন আমার পূজনীয়া জননী রাখী প্রস্তুতকরণোদ্দেশে কতকগুলি উপবীতসূত্র লইয়া হরিদ্রাবর্ণে রঞ্জিত করিতেছিলেন তখন আমার মনে হইল সদ্যপ্রস্তুত সূত্র দ্বারা এ রাখী প্রস্তুত হওয়া আবশ্যক। তাঁর মাকে একথা জানাতেই তিনি টাকু বের করে সুতো তৈরি করলেন। প্রস্তুত রাখী পাড়ার ছোট ছেলেরা আকাশ-ফাটানো ‘বন্দেমাতরম্’ ধ্বনিতে পূর্ণ করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিয়ে এল।”২৮

১৩১২ বঙ্গাব্দের (১৯০৫ খৃস্টাব্দ) ভাদ্র মাসে প্রকাশ হয় ভারত মহিলা পত্রিকাটি। প্রথম সম্পাদকীয়তে লেখা হল, “রাজনীতিই হউক আর শিল্পবিজ্ঞানই হউক, পুরুষের পার্শ্বে নারী দণ্ডায়মান না হইলে পুরুষের শক্তি কখনও সম্যক বিকশিত হইতে পারে না।

” এই প্রথম দেখা গেল রাজনৈতিক কার্যক্ষেত্রে মহিলাদের প্রত্যক্ষভাবে এগিয়ে আসার পক্ষে আহ্বান জানান হল। ঐ সংখ্যাতেই কুমুদীনি মিত্র লিখলেন মাতৃভূমির দুর্দিনে মহিলাগণের কর্তব্য, তিনি বঙ্গনারীকে আহ্বান জানালেন

দুর্দ্দিনে দেশের সুপুত্রগণ স্বদেশের জন্য যেরূপ অক্লান্ত পরিশ্রম করিতেছেন, তাহা নির্জীব প্রাণেও আশার সঞ্চার করে।… স্বদেশের জন্য এই যে আগুন জ্বলিয়াছে তাহার উত্তাপ কি নারীজাতিকে স্পর্শ করিতেছে না? স্বদেশভক্তগণ মাতৃভূমির নামে যে সকল প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন, নারীগণেরও কি তাহা পালনীয় নহে? দেশের এই দুর্দ্দিনে নারীগণ যদি পুরুষের সাথে সম্মিলিত না হন তবে আর আশা কোথায়?

বিদেশী অশনবসনে অনুরাগ আমাদের অস্থিমজ্জায়, শিরায় শিরায় প্রবেশ করিয়াছে। এতদিন স্বদেশের দ্রব্য তুচ্ছ করিয়া বিদেশী দ্রব্যের যে অত্যধিক আদর করিয়াছি, তাহার ফলে এক্ষণে দেখিতেছি যে, স্বদেশী শিল্প অনাদরে বিনষ্ট প্রায় হইয়াছে। সামান্য দ্রব্যের জন্যও বিদেশের দ্বারস্থ হইতে বাধ্য হইতেছি। আমরা স্বদেশের অকল্যাণ করিয়া বিদেশের ধনগমের পথ প্রশস্ত করিতেছি।

 

মহিলাগণ কি স্বদেশের দুঃখে মৰ্ম্মাহত হইতেছেন না? তাঁহারা কি ইহার নিবারণার্থ কোন উপায় অবলম্বন করিবেন না? এই জাতীয় বিপদে নারীগণ কি স্বদেশ প্রেমে অনুপ্রানিত হইয়া উঠিবেন না?…

নারীগণ কি আজ নিস্তেজ, নিষ্প্রভ হইয়া থাকিবেন? তাঁহারা কি স্বদেশের কল্যাণের জন্য বিদেশী বস্ত্র ব্যবহার করিব না এই সামান্য প্রতিজ্ঞাটিও করিতে প্রস্তুত হইবেন না? রমণীগণ স্বদেশানুরাগে পুরুষদিগের পশ্চাতে পরিয়া থাকিবেন কেন? তাঁহারা পুরুষদিগের সহিত মিলিত হইয়া স্বদেশের কল্যাণ সাধনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ না হইলে পুরুষেরা কখনও এই শুভকার্যে সিদ্ধি লাভ করিতে সক্ষম হইবেন না।

 

তবে একবার জাগিয়া উঠি, একবার সবলে সমুদয় বিঘ্ন অপসারিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে অগ্রসর হই। ৩০ কাজেই বলা যায় যে, শুধুমাত্র স্বদেশী নেতৃবৃন্দই নয়, একই সাথে কিছু সংখ্যক শিক্ষিত নারীর মনেও এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়েছিল যে স্বদেশী আন্দোলনকে সফল করতে এই আন্দোলনে সকল পর্যায়ের নারীদের অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

তবে এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি স্মরণ রাখা প্রয়োজন তা হলো, নারীদের ক্ষেত্রে বয়কট আন্দোলনে সম্পৃক্ত হবার প্রধান লক্ষ্য ছিল পুরুষদের সৃষ্ট আন্দোলনকে সফল করা, জাতীয়তাবাদী চেতনা বা রাজনৈতিক সচেতনতা মূখ্য প্রণোদনা হিসেবে এ পর্যায়ে কাজ করে নি।

বঙ্গরমণীদের বয়কট আন্দোলনে উৎসাহিত করতে ভারত মহিলা-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় “স্বদেশী দ্রব্য ও বঙ্গনারী” প্রবন্ধে লেখা হল বঙ্গব্যাবচ্ছেন আন্দোলনে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার সম্বন্ধে দেশের লোকের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়াছে। অত্যন্ত সুখের বিষয় যে নারীগণও এই সময়ে আপন কর্তব্য বিস্মৃত হন নাই।

নারীগণের মধ্যে অনেকে রাজনৈতিক আন্দোলন বুঝিতে না পারেন, কিন্তু স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করিয়া দেশের শিল্প বাণিজ্যের উন্নতি সাধন করা যে অবশ্য কর্তব্য তাহা সকলেই বুঝিতে পারেন। এ বিষয়ে পুরুষ অপেক্ষা নারীর দায়িত্ব বরং বেশী। কারণ সাধারণত স্ত্রীলোকদিগের পছন্দ অনুসারেই প্রত্যেক পরিবারের ব্যবহার্য্য দ্রব্য ক্রয় করা হয়।

তাঁহাদের উৎসাহ ও সহানুভূতি না পাইলে পুরুষগণ স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের সংকল্প বড় বেশীদিন রক্ষা করিতে পারিবেন না। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় যে মহিলাগণ আপনাদিগের দায়িত্ব বুঝিতে পারিয়াছেন। বঙ্গদেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরে মহিলাগণ সমবেত হইয়া এবিষয়ে কৰ্ত্তব্য নির্ধারণ করিতেছেন।

গত ৫ই আশ্বিন নাটোরের মহারানী শ্রীমতী গিরিবালা দেবীর আহ্বানে মেরি কার্পেন্টার হলে কলিকাতার মহিলাদিগের এক বিরাট সভা হইয়াছিল। প্রায় এক হাজার মহিলা উপস্থিত হইয়াছিলেন। অসুস্থতা বশতঃ নাটোরের মহারানী উপস্থিত হইতে পারেন নাই। শ্রীমতী ইন্দিরা দেবী বি.এ. মহারানীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সভাস্থলে চারিটি প্রবন্ধ পাঠ ও উদ্দিপনাপূর্ণ কবিতা আবৃত্তি এবং জাতীয় সঙ্গীত হইয়াছিল। কলিকাতায় মহিলাগণের এইরূপ সম্মিলন বোধহয় এই প্রথম। ৩১

১৬ অক্টোবর ১৯০৫, ৩০ আশ্বিন প্রতিবাদস্বরূপ ঘরে ঘরে অরন্ধনের প্রস্তাব আনলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। বঙ্গব্যবচ্ছেদের দিন মুর্শিদাবাদের জেমোকান্দি গ্রামে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর বাড়িতে পাঁচশতাধিক নারী তার মায়ের আহ্বানে একত্রিত হন এবং রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী রচিত বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা তাঁর কন্যা শ্রীমতী গিরিজা দেবী পাঠ করে সমবেত মহিলাদের শোনান। ৩২ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী নারীদের প্রতি আহ্বান করলেন

প্রতি বৎসর আশ্বিনে বঙ্গবিভাগের দিনে বঙ্গের গৃহিনীগণ বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রত অনুষ্ঠান করিবেন। সেদিন অরন্ধন। দেবসেবা ও রোগীর ও শিশুর অশ্রূষা ব্যতীত অন্য উপলক্ষে গৃহে উনুন জ্বলিবে না। ফলমূল চিড়ামুড়ি অথবা পূর্ব্বদিনের রাঁধা ভাত ভোজন চলিবে।

পরিবারস্থ নারীগণ যথারীতি ঘটস্থাপন করিয়া ঘটের পার্শ্বে উপবেশন করিবেন। বিধবারা ললাটে চন্দন ও সধবারা সিন্দুর লাগাইবেন। হরীতকী বা সুপারি ফল হাতে লইয়া বঙ্গলক্ষ্মীর কথা শুনিবেন। কথা শেষে বালকেরা শঙ্খধ্বনি করিলে পর ঘটে প্রণাম করিবেন।

প্রণামাস্তে বামহস্তের (বালকেরা দক্ষিণ হস্তের) প্রকোষ্ঠে স্বদেশী কার্পাসের বা রেশমের হরিদ্রারঞ্জিত সূত্রে পরস্পর রাখী বাঁধিয়া দিবেন। … সংবৎসরকাল যথাসাধ্য বিদেশীদ্রব্য বিশেষত বিলাতী দ্রব্য বর্জ্জন করিবেন। পুত্র কন্যাকে বিদেশী দ্রব্য ব্যবহারে প্রশ্রয় দিবেন না।

স্বদেশী থাকিতে বিদেশী জিনিষ গ্রহণ অধর্ম্ম বলিয়া জানিবেন। সাধ্যপক্ষে প্রতিদিন গৃহকর্ম আরম্ভের পূর্বে লক্ষ্মীর ঘটে মুষ্টিভিক্ষা রাখিবেন এবং মাসান্তে বা বৎসরান্তে উহা কোনরূপ মায়ের কাজে বিনিয়োগ করিবেন। ৩৩

এই প্রথম দেখা গেল নারীদের জন্য সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হল। এখানে লক্ষণীয় যে স্বদেশী আন্দোলনে নারীদের আহ্বান করবার জন্য ধর্মের পথকে বেছে নেয়া হয়। বাইরের জগতে নারীর প্রবেশের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাতে বিঘ্ন না ঘটিয়ে তাদের জন্য নির্ধারিত নিত্যদিনের ধর্মীয় আচার, ব্রত, প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তাদেরকে রাজনীতিতে সংযুক্ত করা হল।

নিঃসন্দেহে বলা চলে মহিলাদের আন্দোলনে আনবার জন্য অরন্ধন খুবই কার্যকর একটি প্রথা ছিল। এই প্রথা অনুসারে ঘরের বাইরে বের না হয়েও নারীরা দেশের প্রতি তাদের সচেতনতা প্রদর্শনে সক্ষম হতেন। অরন্ধন ছিল একাধারে রাজনৈতিক কর্মসূচী ও ধর্মীয় আচার।

ঠিক একইভাবে রাখীবন্ধন নামক সামাজিক প্রথাও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয় এবং বঙ্গনারীর রাজনীতিতে সংযুক্তির পথ প্রশস্ত করে। দেশকে মাতৃরূপে পূজা করবার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য এবং বাঙালির অসন্তোষকে সম্মিলিতরূপে প্রকাশ করবার জন্য নারীকে এই স্বদেশী আন্দোলনে শরীক করা হয় এবং এই সকল কার্যক্রমকে বেছে নেয়া হয়।

“ এতদিন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার সংস্পর্শ থেকে বাংলার নারীদের দূরে রাখবার যে প্রচেষ্টা ছিল, বঙ্গভঙ্গের ঘোষণায় পর্যায়ক্রমে সেই চিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটল।

বাংলার পুরুষরা অনুভব করলেন সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না করেও তাদের নারীসমাজকে কিছুটা দেশাত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন, অন্যথায় তাদের বিদেশী পণ্য বয়কট আন্দোলন সফল হবে না। এ কারণে বার বার দেখা যায় বাঙালি নারীকে দেশমাতৃকার দুঃখ অনুভব করবার এবং সেই দুঃখ মোচনে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলার প্রচেষ্টা চলে। বঙ্গভঙ্গ রদ এবং স্বদেশী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তিনি বাঙলার নারীদের আহ্বান জানালেন

জগতে স্ত্রীলোক যদি বা যুদ্ধ না করিয়া থাকে, ত্যাগ করিয়াছে; সময় উপস্থিত হইলে ভূষণ হইতে প্রাণ পর্যন্ত ত্যাগ করিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। কর্মের বীর্য অপেক্ষা ত্যাগের বীর্য কোন অংশেই ন্যূন নহে। ইহা যখন ভাবি তখন মনে এই গৌরব জন্মে যে, এই বিচিত্র শক্তিচালিত সংসারে স্ত্রীলোককে লজ্জিত হইতে হয় নাই; স্ত্রীলোক কেবল সৌন্দর্য দ্বারা মনোহরণ করে নাই, ত্যাগের দ্বারা শক্তি দেখাইয়াছে।

আজ আমাদের বঙ্গপ্রদেশ রাজশক্তির নির্দয় আঘাতে বিক্ষত হইয়াছে, আজ বঙ্গরমণীদের ত্যাগের দিন। আজ আমরা ব্রত গ্রহণ করিব। আজ আমরা কোন ক্লেশকে ডরিব না।

উপহাসকে অগ্রাহ্য করিব, আজ আমরা পীড়িত জননীর রোগশয্যায় বিলাতের সাঁজ পরিয়া শৌখিনতা করিতে যাইব না। দেশের জিনিসকে রক্ষা করা, এও তো রমণীর একটা বিশেষ কাজ… একবার ভাবিয়া দেখুন, যেখানে বাঙালি পুরুষ বিলাতি কাপড় পরিয়া সর্বত্র নিঃসংকোচে আপনাকে প্রচার করিতেছেন সেখানে তাঁহার স্ত্রীকন্যাগণ বিদেশী বেশ ধারণ করিতে পরেন নাই।

স্ত্রীলোক যে উৎকট বিজাতীয় বেশে আপনাকে সজ্জিত করিয়া বাহির হইবে ইহা আমাদের স্ত্রী প্রকৃতির সঙ্গে এতই একান্ত অসংগত যে, বিলাতের মোহে আপাদমস্তক বিকাইয়াছেন যে পুরুষ তিনিও আপন স্ত্রী কন্যাকে এই ঘোরতর লজ্জা হইতে রক্ষা করিয়াছেন।

এই রক্ষণপালনের শক্তি স্ত্রীলোকের অন্তরতম শক্তি বলিয়াই দেশের দেশীয়ত্ব স্ত্রীলোকের মাতৃক্রোড়েই রক্ষা পায়। নূতনত্বের বন্যায় দেশের অনেক জিনিস, যাহা পুরুষসমাজ হইতে ভাসিয়া গেছে, তাহা আজও অন্তঃপুরের নিভৃত কক্ষে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আছে।…

আমাদের দেশের নারীগণ আত্মীয়স্বজনের আরোগ্য কামনা করিয়া দীর্ঘকালের জন্য কৃচ্ছ্রব্রত গ্রহণ করিয়া আসিয়াছেন। নারীদের সেই তপঃসাধন বাঙালির সংসারে যে নিষ্ফল হইয়াছে তাহা আমি মনে করি না। আজ আমরা দেশের নারীগণ দেশের জন্য যদি সেইরূপ ব্রত গ্রহণ করি, যদি বিদেশের বিলাস দৃঢ় নিষ্ঠার সহিত পরিত্যাগ করি, তবে আমাদের এই তপস্যায় দেশের মঙ্গল হইবে- তবে এই স্বস্ত্যয়নে আমরা পুণ্যলাভ করিব এবং আমাদের পুরুষগণ শক্তিলাভ করিবেন।

দেখা যাচ্ছে যে, নারীকে স্বদেশ ব্রতে আহ্বান করলেন পুরুষেরা এবং তাদের জন্য কর্মপন্থা নির্ধারণ করলেন পুরুষেরা। সেই কর্মপন্থাও পিতৃতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। এখানে নারীকে ঘরের বাইরে বের হয়ে পুরুষের কাতারে এসে আন্দোলনে শরিক হবার সুযোগ দেয়া হলো না।

তাকে দেয়া হলো সহযোগির ভূমিকা। পুরুষেরা যে আন্দোলন তৈরি করলেন তাকে সফল করবার জন্য নারী হলেন সহায়ক। বাংলার নারীরা এই সহায়কের ভূমিকাই মেনে নিলেন। তারা পুরুষদেরকে নিশ্চয়তা দিলেন পুরুষদের প্রতিজ্ঞা তারা ভঙ্গ করবেন না, তাদের উৎসাহে বাধা দেবেন না। ব্রতধারিণীরা ঘোষণা করলেন

তোমরা নির্ভার হও, আজ আমাদের পরমানন্দের দিন, আজ আমাদের মহোৎসব।… এ ব্রত অভূতপূর্ব্ব ব্রত। ইহাতে তোমরা নির্ভার হও, আজ আমাদের পরমানন্দের দিন, আজ আমাদের মহোৎসব।… এ ব্রত অভূতপূর্ব্ব ব্রত।

ইহাতে উপবাস নাই, শরীর পতন নাই, কোন কষ্টই নাই, ইহা নিরবচ্ছিন্ন সুখেরই ব্রত। তবে তোমরা কি মনে করিতেছ এ ব্ৰত পালনে আমরা অসমর্থ হইব? বিলাতি চুড়ি ফেলিয়া দিয়া আমরা যদি দেশের শাঁখারুলি পরি বিলাতি সাবান বিলাতি সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার না করিয়া যদি আমরা দেশী সাবান চিরপ্রচলিত আতর গোলাপ ব্যবহার করি, যদি ফিতায় চুল না বাঁধিয়া আগের মত চুলের দড়ি ও জরী দিয়া চুল বাঁধি,

যদি জ্যাকেটে বিলাতি লেশ না দিয়া দেশী চিকন লাগাইয়া পরি, সুক্ষ্ম বিলাতি মজলিন পয়নাপল প্রভৃতির বদলে, দেশের চেলি বারাণসীতেই সুসজ্জিত হই আর বিলাতি সুলভ শাড়ির বদলে, সামান্য বেশিদরের শাড়িই ব্যবহার করি, তাহা কি ত্যাগ স্বীকার? না কোন কষ্টনামবাচ্য?…. আজ ধনী মধ্যবিত্তের এক উদ্দেশ্য এক ব্রত।

একের অর্থ অন্যের পরিশ্রম মিলিত করিয়া তাঁহারা দেশের কলকারখানা বৃদ্ধির চেষ্টা করিতেছেন। এই চেষ্টা সফল হইলে ধনী গরিব নির্ব্বিভেদে সকলেই দেশীবস্ত্র ব্যবহারে সক্ষম হইবেন।

এসময়ে আমরা ধনী ও মধ্যবিত্ত ঘরণীগণ, যদি বিলাতি তেল, বিলাতি সুগন্ধী, বিলাতি জ্যাকেট, এবং অন্যান্য নানাবিধ সৌখিন বিলাতি দ্রব্য ব্যবহার পরিত্যাগ করি, তবে কত অপব্যয় নিবারণ করিতে পারি এইরূপ সমস্ত অর্থ দেশের উন্নতিতে প্রদত্ত হইলে তাঁহাদিগের উদ্দেশ্যসাধনে আমরা কতদূর সহায়তা করিতে পারি? দেশের কার্য্য করিবার, স্বামী ও পিতাপুত্রের সহায়তা করিবার এই সুযোগ এই অবসর কোন বঙ্গ রমনী না হাস্যমুখে গ্রহণ করিবেন।

অতএব হে বঙ্গসন্তানগণ, যদি তোমাদিগের মাতৃস্থান গ্রহণ করিয়া, সমস্ত বঙ্গরমণীর পক্ষ হইতে এই অভয়বানী প্রচার করিতেছি যে তোমাদিগের সঙ্কল্পই আমাদিগের সঙ্কল্প, তোমাদিগের ব্রত আমাদিগেরও ব্রত। তোমরা নির্ভয় হও, তোমাদের প্রতিজ্ঞা অটল রহুক, তোমাদিগের ব্রত অবাধে উদ্‌যাপিত হউক।

বঙ্গভঙ্গকালীন এই সকল রচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, নারীর স্বদেশব্রত গ্রহণের পশ্চাতে জাতীয়তাবোধের পাশাপাশি, জাতীয় সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী স্বামীপুত্রের পাশে এসে দাঁড়ানোর প্রেরণা তাঁদের আরো বেশি করে অগ্রসর করে দিয়েছিল। এরফলে পুরুষের মত নারীরাও গ্রামে এবং শহরে নিজেরা সংগঠিত হয়ে বিদেশী দ্রব্য বর্জন করে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের প্রতিজ্ঞা করতে থাকে। কোন কোন সভায় মহিলারা পুরুষদের উদ্দীপ্ত করছেন আবার ঘরে ঘরে প্রভাব বিস্তার করে স্বামী, ভাই ও সন্তানদের মাতৃপূজায় দীক্ষিত করছেন।

দেশী আন্দোলনে নারীদের সম্পৃক্ততার কয়েকটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, কলকাতায় কৃষ্ণকুমার মিত্রের কন্যা কুমুদিনী মিত্র বিভিন্ন সভায় যোগ দিয়ে এবং দেশাত্ববোধক সঙ্গীত রচনা করে জনসাধারণকে জাতীয়তার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

তার মা লীলাবতী মিত্র, ডাঃ নীলরতন সরকারের স্ত্রী নির্মলা সরকার, ডাঃ প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের স্ত্রী সুবলা আচার্য, ডাঃ সুন্দরীমোহন দাসের স্ত্রী নির্মলা সরকার তাদের নিজেদের ঘরে ও এলাকায় তাঁত চরকা প্রবর্তনে তৎপর হন। ভারতী পত্রিকায় হিরন্ময়ী দেবীর সূত্রে মাহলাদের দুটি ব্রত সম্পর্কে জানা যায়।

প্রথম ব্রতটিকে তিনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই ব্রত যারা গ্রহণ করেন তারা প্রতিদিন চরকায় কিছু পরিমাণ সূতা কেটে, আসন্ন পূজার পূর্বে অন্ততঃ একটি শাড়ির পরিমাণ সূতা কেটে সেই সূতায় শাড়ি প্রস্তুত করে সেই শাড়ি পরে পূজা সম্পন্ন করবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেন এবং অপর ব্রতটি মায়ের কৌটা বিশেষণে ভূষিত হয়।

এটি ছিল মুষ্টি অন্ন সংগ্রহের ব্রত। এত ব্রতধারীরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে স্বদেশের উদ্দেশে একটি মাটির বা যে কোন পাত্র স্থাপন করে তাতে প্রতিদিন একমুষ্টি পরিমাণ চাল রাখবেন। স্নেহশীলা চৌধুরী গ্রামবাংলার নেত্রী হিসেবে খুলনা জেলায় মহিলা সমিতি গঠন করে গৃহিনীদের বিদেশের তৈরী রেশমী চুড়ি বর্জন করে শুধুমাত্র শাখা পরতে উদ্বুদ্ধ করেন। 

সঞ্জীবনী পত্রিকা লিখেছিল, স্বদেশী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল তিন জেলার তিনজন মহিলা, এরা হলেন ময়মনসিংহের দীনমনি চৌধুরী, জলপাইগুড়ির অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত এবং মৌগঞ্জে লক্ষণ চৌধুরীর বিধবা পত্নী।

স্বদেশী আন্দোলন শুরুর পর দেখা গেলো নারীদের 80 উদ্বুদ্ধ করবার জন্য পুরুষদের প্রচেষ্টা প্রয়োজন হচ্ছে না। ১৯০৫-এর নভেম্বরে বামাবোধিনী পত্রিকায় বলা হয় মহিলারা নিজেরাই নিজেদের সংগঠিত করে জনসভা করে পুরুষদের স্বদেশী কর্মযজ্ঞে যোগ দিতে উদ্দীপ্ত করছেন এবং যার যার গৃহে স্বামী, সন্তান, ভাইকে স্বদেশীব্রত গ্রহণ করতে প্রভাবিত করছেন।

” নীরদ চৌধুরী তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন কীভাবে তার অভিভাবকেরা সন্তানদের সমস্ত বিদেশী পোষাক বাতিল করে দেশী পোষাক কেনেন এবং পরে তার মা বাড়িতে থাকা একটি বিলাতি কাঁচের জগ ভেঙে ফেলবার জন্য ছেলেকে নির্দেশ দেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মৃতিচারণ করেছেন।

তখনকার সেই স্বদেশী যুগে ঘরে ঘরে চরকা কাটা, ভাঁত বোনা, বাড়ীর গিন্নী থেকে চাকর-বাকর, দাস-দাসী কেউ বাদ ছিল না। মা দেখি একদিন ঘড় ঘড় করে চরকা কাটতে বসে গেছেন। মার চরকা কাটা দেখে হ্যাভেল সাহেব তাঁর দেশ থেকে মাকে একটা চরকা আনিয়ে দিলেন। বাড়ীতে তাঁত বসে গেলো খটাখট শব্দে তাঁত চলতে লাগল।… ছোট ছোট গামছা, ধুতি তৈরী করে মা আমাদের দিলেন, সেই ছোট ছোট ধুতি হাঁটুর ওপর উঠে যাচ্ছে তাই পরে আমাদের উৎসাহ কত । 

সুধা মজুমদারের পিতা তারাপদ ঘোষ ছিলেন জমিদার এবং জীবন-যাপনে ইউরোপীয়ান। সুধা মজুমদারের মা ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু গৃহিনী। ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় সুধা মজুমদার ছিলেন ৭ বছরের শিশু এবং সেই সময়েই তিনি তার মায়ের মাধ্যমে এই আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন হন। তাঁর স্মৃতিচারণায় দেখা যায়

My Introduction to politics was in 1905 when I was seven years old and mother served us with a phal-ahar [fruit meal] When it was neither a fast day nor a puja day. It was not a holyday nor did I hear of any holy purpose, so I was somewhat puzzled to notice the unusual silence in the kitchen and find that no fire were burning at all. On enquary I learnt it was 47 associated with the Swadeshi movement.”

স্বদেশী আন্দোলন যে বাড়ির অন্দরমহলকে কতটা প্রভাবিত করেছিল তা সুধা মজুমদারের মায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যিনি ছিলেন একজন জমিদারপত্নী এবং যার স্বামী ইংরেজভাবাপন্ন। কয়েক স্থানে মহিলা জমিদারেরা তাদের প্রজা ও অধিনস্তদের শুধু স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করেন।

ভারত মহিলা পত্রিকায় শ্রী অমৃতলাল গুপ্ত-এর রচনায় জানা যায় ময়মনসিংহের মহিলাদের সভার কথা। নারীদের মধ্যে তারাই অগ্রণী হয়ে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে সভা করেন এবং বিদেশী দ্রব্য বর্জন করে স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণের সংকল্প করেন।

তিনি আরো উল্লেখ করেন ময়মনসিংহের মহিলারা বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শোকচিহ্ন স্বরূপ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করেছেন এবং তিনদিন তারা হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেছেন। এছাড়াও তারা বিদেশী কোম্পানীর অপমানিত কেরাণীদের জন্য চাঁদা তোলেন। ঢাকা, বরিশাল সর্বত্র স্বদেশী আন্দোলনের সপক্ষে মহিলাদের সভার বিবরণ পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।

কর্ম্মাটার অঞ্চলে রাখীবন্ধনের দিন পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারা নিজেদের পৃথক সভা অনুষ্ঠিত করেন। সেই সভায় মহিলারা পরস্পরের হাতে রাখী বাধেন এবং বিদেশী দ্রব্য আর ব্যবহার করবেন না বলে সংকল্প করেন। পাশাপাশি তাঁরা স্বদেশী আন্দোলনে সহায়তা করবার জন্য নিজেদের মধ্যে চাঁদা সংগ্রহ করেন। ১

বাঁকিপুরে অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিষ্টেট ও নববিধান ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য্য শ্রী প্রকাশ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া উপলক্ষে নারীরা একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

অনুষ্ঠানে সমবেত নারীরা শহরের গণ্যমান্য পুরুষদের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন এবং স্বদেশভক্তিমূলক গান, আবৃত্তি ও প্রার্থনা পরিবেশন করেন। তাঁরা নারীজাতির অবস্থার উন্নতি করতে এবং স্বদেশব্রতে নারীদের সঙ্গী করতে পুরুষদের অনুরোধ জানান। সভা শেষে পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও উচ্চকণ্ঠে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। 

বরিশালে মহিলারা বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘শয্যাতুলুনী’ নামক আনুষ্ঠানিকতা থেকে প্রাপ্ত টাকা জাতীয় ভাণ্ডারে দান করতে শুরু করেন।৫° কলসকাঠি গ্রামের মহিলাদের অনেকে বঙ্গভঙ্গ রদ না হওয়া পর্যন্ত গেরুয়া পোষাক পরবার প্রতিজ্ঞা করেন। ১৯০৬ সালে বরিশালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভার সম্মেলনে তিনশত মহিলা উপস্থিত ছিলেন এবং পুলিশ সভা ভেঙ্গে দিলে তারা প্রতিবাদস্বরূপ প্রখর রৌদ্রে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে যান।

এই সভার প্রাক্কালে বন্দে মাতরম্ ধ্বনির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হলে সরোজিনী বসু নামের একজন মহিলা প্রতিজ্ঞা করেন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তিনি ডান হাতে কোন স্বর্ণালঙ্কার পরবেন না। এই মর্মে লিখিত প্রতিজ্ঞা করে তিনি তাঁর হাতের সোনার বালা বরিশালের স্বদেশী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি অশ্বিনীকুমার দত্তের কাছে জাতীয় ভাণ্ডারে দান করবার জন্য পাঠান। 

শুনিয়া আনন্দিত হইয়াছি যে আমার ক্ষুদ্র দান গৃহীত হইয়াছে। খোকামনিকে দিয়া ডান হাতের বালা পাঠাইয়া প্রতিজ্ঞা করিলাম যে, যে পর্য্যন্ত “বন্দে মাতরম্” বলা নিষেধি সার্কুলার রহিত না হইবে সে পর্য্যন্ত ঐ হাতে আর সোনার বালা পরিব না। “বন্দে মাতরম্”।

উপর্যুক্ত ঘটনাসমূহ বিশ্লেষণে সন্দেহাতীতভাবে বলা চলে যে, বঙ্গভঙ্গ এবং এর ফলে সৃষ্ট বিদেশী পণ্য বয়কট আন্দোলন সাধারণ বাঙালি নারীর মধ্যেও একধরনের জাতীয়তাবোধের জন্ম দেয়, আর এভাবে স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে যে নারীরা জাতীয়চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন, তাদেরই একটি বড় অংশ পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত হন।

মনোরমা বসুর স্মৃতিচারণায় জানা যায় ৩০ আশ্বিন রাস্তা দিয়ে গান গেয়ে মানুষের মিছিল চলেছিল। ৮ বছরের বালিকা মনোরমাও এদের দলে মিশে যান, হাতে হলদে সূতোর রাখী বেঁধে দীক্ষা নেন এক নতুন জীবনের।” যে জীবনে পরবর্তীতে পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ পথ।

আশালতা সেন তাঁর দশ বছর বয়সে যখন বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে তখনই এর বিরুদ্ধে একটি কবিতা লেখেন যেটি সুহৃদ পত্রিকায় ছাপা হয় এবং অমৃতবাজার ও বেঙ্গলি পত্রিকায় তার প্রশংসা বের হয়। ৮ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব কার্যকর করা হলে আশালতা সেনের মাতামহী নবশশী দেবী তাঁর এগারো বছরের নাতনীকে বিলেতি পণ্য বর্জনের সংকল্পপত্র স্বাক্ষর করিয়ে স্বদেশীমন্ত্রে দীক্ষিত করেন এবং গ্রামের মেয়ে বৌদের স্বাক্ষর করাবার ভারও আশালতার ওপর দেন।

আশালতা সেন তাঁর স্মৃতি কথায় উল্লেখ করেছেন কীভাবে প্রাচীনপন্থী পর্দানশিন মহিলারা পর্যন্ত বিদেশী জিনিষ বয়কটের আন্দোলনে সক্রিয় ভাগ নিতে শুরু করলেন। বিক্রমপুর অঞ্চলে নবশশী দেবী, সুশীলা সেন, কমলেকামিনী গুপ্তা সহ অন্যান্য মহিলারা মহিলা সমিতি, স্বদেশীভাণ্ডার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করে স্বদেশী প্রচারে উদ্যোগী হন। খুলনাতে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের এক ভাষণের শেষে সভায় উপস্থিত মহিলারা তাদের কাঁচের চুড়ি ভেঙ্গে ফেলে।

বিপীনচন্দ্র পাল ১৯০৭ সালে পূর্ববাংলা ভ্রমণকালে হবিগঞ্জ ও ভোলায় মহিলাদের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আবার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ময়মনসিংহে গেলে মহিলারা তাঁকে সম্বর্ধনা জানান। কমলা দাশগুপ্ত তার স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী গ্রন্থে ঢাকা ও ঢাকার গ্রামাঞ্চলে যে সব মহিলারা ১৯০৫-এ বঙ্গ-ভঙ্গ আন্দোলনের সময় সভা-সমিতি করে স্বদেশী ব্রত গ্রহণে মহিলাদের উদ্বুদ্ধ করতেন তাদের কয়েকজনের নাম লিপিবদ্ধ করেন যা নিম্নরূপ: 

১. মুক্তকেশী দেবী (বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর শ্বশ্রুমাতা)

২. চিন্ময়ী দাস সোনারং গ্রাম

৩. সুশীলাসুন্দরী সেন (ঢাকার দীননাথ সেনের কন্যা

৪. প্রিয়বালা গুপ্তা

৫. গিরিজা গুপ্তা

৬. সুরমা সেন

৭. কমলেকামিনী গুপ্তা

৮. সুশীলা সেন

৯. নবশশী দেবী।

কেবল বিদেশী পণ্য বর্জনের মাধ্যমেই নয়, স্বদেশী নেতৃবৃন্দের উপর বৃটিশ শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধেও বাংলার নারীরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। যুগান্তর পত্রিকার সম্পাদক ভুপেন্দ্রনাথ তাঁর পত্রিকায় বিপ্লববাদ প্রচারের অভিযোগে ১৯০৭ সালের ২৪ জুলাই তারিখে এক বছরের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

” এই ঘটনায় বাঙালি নারীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। কলকাতায় লীলাবতী মিত্রের সভাপতিত্বে এক সভায় মহিলারা ভুপেন্দ্রনাথের বৃদ্ধা মা ভুবনেশ্বরীকে অভিনন্দন জানান। অভিনন্দনপত্রে লেখা হয়

আমরা কতিপয় বঙ্গনারী যুগপৎ আনন্দ ও বিষাদতার লইয়া আপনাকে অভিনন্দন করিতে আসিয়াছি। আপনার পুত্র অকুষ্ঠিত সাহসত্তরে স্বদেশের সেবা করিতে গিয়া রাজদ্বারে যে নিগ্রহপ্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহাতে আমরা প্রত্যেক বঙ্গনারী অসীম গৌরব পুনরায় লাভ করিতে গিয়া পদে পদে যখন তীব্র অপমান ভোগ করেন, তখন সে নিগ্রহ উজ্জ্বল মনির ন্যায় জাতীয় জীবনের শোভাবর্ধন করিয়া থাকে।

বিধাতার শুভ করে আপনার পুত্র অন্য যে স্পৃহনীয় আভরণ অর্জন করিয়া আনিয়াছেন, তাহার দীপ্তিতে কেবল আপনার কুল নহে সমগ্র বঙ্গদেশ আলোকিত হইয়াছে। এরূপ সন্তানের জন্মে কুল পবিত্র, জননী ধন্যা ও জন্মভূমি আলোকিত হইয়া থাকেন। আপনার পুত্রের ন্যায় নির্ভীক স্বদেশ সেবক পুত্র প্রতি বঙ্গনারীর অঙ্কে অবতীর্ণ হউক, এই আশীর্বাদ অন্য আমরা বিধাতার নিকট ভিক্ষা করিতেছি। 

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রভাব থেকে সাহিত্যজগতও মুক্ত ছিল না। এ ক্ষেত্রটিতেও মহিলারা তাদের স্থান করে নিয়েছিলেন। এই পর্যায়ে দেখা যায় নারীদের রচনার বিষয়বস্তু হিসেবে স্বদেশবন্দনা একটি বড় স্থান দখল করে। এক্ষেত্রে অন্তঃপুর পত্রিকার নাম উল্লেখযোগ্য। এই পত্রিকায় কেবল মেয়েদের লেখাই ছাপা হতো।

হেমন্তকুমার চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাটি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বহু গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ প্রকাশ করে এবং স্বয়ং সম্পাদিকাও স্বাদেশিকতা প্রচারে লেখনী ধরেন। ৬৭ মহিলা কবি গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী প্রকাশ করলেন স্বদেশিনী কাব্যগ্রন্থ । কাব্যগ্রন্থে ‘অঙ্গচ্ছেদ’ কবিতায় তিনি লিখলেন, “কে বলে ভেঙেছে অঙ্গ ভেঙ্গেছে মোহের বাসা,/জাগিয়া উঠিছে বঙ্গ-হৃদয়ে তরুণ আশা। 

‘রাখীমন্ত্র’ কবিতায় তিনি বঙ্গনারীকে ইতিহাসে বঙ্গনারীর গৌরবদীপ্ত ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আহ্বান করলেন, “ভুলি হিন্দু-মুসলমান / প্রীতিসূত্র কর দান;/ বাঁধ সূক্ষ্ম সুত্রমূলে বিরাট জীবন।/ কর মনে দ্রৌপদীর বেনীবাঁধা পণ।” স্বর্ণকুমারী দেবী লিখলেন, “আর না করিব ভিক্ষা, স্বনির্ভর এই শিক্ষা,/ এই মন্ত্র, এই দীক্ষা, এই জপ অবিরত।/ সাক্ষী তুমি মহাশূন্য, না লব বিদেশী পণ্য,/ ঘুচাব মায়ের দৈন্য, করিলাম এ শপথ। ” –

সাহিত্য পত্রিকায় সরলাবালা সরকার স্বদেশসেবায় বঙ্গরমণী প্রবন্ধে লিখলেন, ” এখন যদি আমাদের দেশে মোটা ছালার অপেক্ষা সূক্ষ্ম কাপড় না পাওয়া যায়, তবে আমাদের সেই ছালাই পরিতে হইবে।

বিদেশী দ্রব্য বর্জন করিতে গেলে কলাশিল্প সম্বন্ধেও কিছু ক্ষতি স্বীকার করিতে হইবে।… চরকা কাটা অভ্যাস করিলে সময়ের সদ্ব্যবহার হয়। দেশীয় দিয়াশলাই, দেশী সাবান ভিন্ন অন্য সাবান স্পর্শ করিব না এই প্রতিজ্ঞা যথার্থ প্রতিপালিত হইলে এতদিন আর দোকানগুলিতে বিদেশী সাবান দেখা যাইত না।”

 

স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী

 

বামাবোধিনী পত্রিকায় জীবনবালা দেবী লিখলেন, “প্রতি মুহূর্তে আমাদের কত লক্ষ টাকা বিদেশীদের করতলগত হচ্ছে, আমরা বিদেশী বাণিজ্যের উন্নতির অনেক সহায়তা করছি, কিন্তু নিজের দেশের জন্য কি সরলা দত্ত বললেন, ” বঙ্গমাতার চক্ষুজল মুছাইবার জন্য ভ্রাতার পার্শ্বে ভগিনীগণ যখন দাঁড়াইবে তখন সমগ্র ভারতে নতুন জীবনীশক্তি জাগিয়া উঠিবে।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন-এর প্রভাবে নারীদের মধ্যে যে দেশাত্ববোধের চেতনা গড়ে ওঠে এই প্রথমবারের মত দেখা গেল তা কেবল শহরকেন্দ্রিক হয়ে না থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির গণ্ডি অতিক্রম করে প্রান্তিক শ্রেণির নারীদেরও উদ্বুদ্ধ করে।

এটির দ্বিতীয় পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুন : স্বদেশী যুগ : ১৯০৫-১৯১৯ দেশাত্মবোধের চেতনায় উজ্জীবিত নারী – পর্ব ২

Leave a Comment