১৬তম ডিভিশন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ১৬তম ডিভিশন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

১৬তম ডিভিশন

 

১৬তম ডিভিশন

 

১৬তম ডিভিশন 

এ ডিভিশনের ১০টি ব্যাটালিয়নে কোনো পরিবর্তন আনা হয় নি। ১৬তম ডিভিশনের এলাকা ছিল রংপুর-বগুড়া-রাজশাহী সেক্টর। ৯ ডিভিশন এক ব্রিগেড কম (৭ ব্যাটালিয়ন) : যশোধ-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর সেক্টর।খুলনা সেক্টরের জন্য ইপকাফ-এর সমন্বয়ে কর্নেল ফজল হামিদের নেতৃত্বে একটি নতুন এডহক ৩১৪ তম ব্রিগেড গঠন করা হয়।

একটি ব্যাটালিয়ন, দুটি কোম্পানি, স্থানীয় গ্যারিসনের সৈন্য এবং নৌ সেনাদের সমন্বয়ে চট্টগ্রামে ব্রিগেডিয়ার আতা মালিকের নেতৃত্বে একটি নয়া এডহক ৯১তম স্বতন্ত্র ব্রিগেড সৃষ্টি করা হয়। ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজীর নেতৃত্বে ৫৩ তম ব্রিগেডকে ঢাকা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়।

২-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জামশেদের নেতৃত্বে একটি ইপকাফ-। নতুন এডহক ৩৮তম ব্রিগেডকেও ঢাকা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজির নেতৃত্বে ৯৩তম ব্রিগেডকে ময়মনসিংহ রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুটি ব্যাটালিয়ন এবং সিএএফ-এর সমন্বয়ে এই নতুন এডহক ব্রিগেড গঠন করা হয় ।

মেজর জেনারেল রহিম খানের নেতৃত্বে ৩৯তম এডহক ডিভিশনকে চাঁদপুর রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ডিভিশন মাত্র ৫৩তম ব্রিগেড নিয়ে গঠিত হয়। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স এ ডিভিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিভিশন হিসেবে গঠনে প্রয়োজনীয় সৈন্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তারা এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি।

প্রতিটি ব্রিগেডের সাথে একটি ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্ট থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমরা ঘাটতির কারণে কোনো ব্রিগেডে ফিল্ড আর্টিৰি পঠ পারি নি। সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা ি আনুপাতিক হারে আর্টিলারি বণ্টন করা হয় ।

এডহক ফরমেশন প্রকৃত ফরমেশনের মতো ছিল না। এডহক দেশনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্টাফ, অফিসার ও যানবাহনের অভাব ছিল। কমান্ড হেডকোয়ার্টস এবং বিভাগীয় হেডকোয়ার্টার্স ও কমিউনিকেশন লাইনে বিদ্যমান সম্পদ অনুযায়ী যোগাযোগ সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়।

কমান্ড ও কন্ট্রোলের জন্য এগুলো ে ভালো ছিল। সৈন্যরা তাদের এলাকায় অফিসারদের পরিদর্শনে যেতে দেখতে পেতো। যুদ্ধকালে সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে অফিসারদের এ ধরনের পরিদর্শন খুবই সহায়ক বলে বিবেচিত হয়।

সৈন্যদের গতিবিধিতে আমাদের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে শত্রুদের মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে প্রণীত আমাদের অপারেশন পরিকল্পনায় যেসব বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয় সেগুলো হলো :

  1. অগ্রবর্তী আত্মরক্ষামূলক অবস্থান এবং শত্রুদের সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন;
  2. একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শত্রুকে আটকে রেখে নির্দিষ্ট দুর্গ ও সুরক্ষিত অবস্থানে পিছু হটে আসা;
  3. দুর্গগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লে সৈন্যদেরকে ঢাকা অভিমুখী স রাস্তা বন্ধ করার জন্য চূড়ান্ত প্রতিরক্ষা ব্যুহে পিছু হটে আসতে হবে। 
  4. ময়মনসিংহ থেকে চতুর্দশ ডিভিশন ও ১৩তম এডহক ব্রিগেড এবং খুলনা থেকে ৩১৪ (ক) ব্রিগেডকে ঢাকা এলাকায় পিছু হটতে হবে।

গোয়েন্দা তথ্যে বড়ো ধরনের পরিবর্তন সত্ত্বেও জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাকে কোনো লিখিত দিক-নির্দেশনা দেয় নি। বৈরি পরিস্থিতি এবং ভারতীয় আগ্রাসন ও বিদ্রোহ মোকাবেলায় সম্পদের ঘাটতি থাকায় আমাকে আমার পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়।

দেশের ভেতরে দুর্গ ও সুরক্ষিত অবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। দুর্গ ও সুরক্ষিত ঘাঁটিগুলো শত্রুর অবাধ চলাচলে বাধা দেবে, তাদেরকে আত্মরক্ষামূলক লড়াইয়ে ব্যস্ত রাখবে এবং এভাবে তাদের ক্ষতিসাধন করবে।

 

পূর্ব পাকিস্তান বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী (ইকাফ) অনেকটা বিশৃঙ্খল হয়ে পাড়ায় স্থানীয় রাজাকারদের (সাবেক বিহারি ও অনুগত পূর্ব পাকিস্তানি) সীমান্ত চৌকি প্রহরায় নিয়োজিত করা হয় এবং তারা নিয়মিত সেনাবাহিনীর প্রহরাধীন দুর্গ ও সুরক্ষিত ঘাঁটিতে পিছু হটে আসে।

রাজাকারদের অফিসার ছিল নিয়মিত সেনাবাহিনীর। তারা খুব প্রশংশনীয় ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিবাহিনীর সাথেও প্রচণ্ড লড়াই করেছে তারা। আমি জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট পাই।

রিপোর্টে বলা হয় যে, আগ্রাসী মনোভাব সত্ত্বেও ভারত পাকিস্তানের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না। তবে সে বিদ্রোহীদের সমর্থন নান এবং কিছু ভূখণ্ড দখলে নেওয়ার লক্ষে সীমিত পর্যায়ে হামলা চালাতে পারে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। আমরা স্থানীয়ভাবে গঠিত বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে সীমান্ত বন্ধ করে দিতে সক্ষম হই।

এটা ঠিক যে, ঢাকা ছিল মেরুদণ্ড। নদী ও খাল-বিল এবং প্রধান প্রধান যোগাযোগ কেন্দ্রের ভিত্তিতে ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় । যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোতে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা হয় যাতে ঢাকা অভিমুখী শত্রুর যে-কোনো অগ্রাভিযান ব্যাহত হয়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শত্রু নদী পারাপারে হেলিকপ্টারে সৈন্য পরিবহন অথবা ছত্রী সেনা নামানোর চেষ্টা করতে পারে। দুর্ভাগ্যক্রমে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স ও আইএসআই ভারতের হেলিকপ্টারে সৈন্য পরিবহনের সম্ভাবনা অথবা সামর্থ্য সম্পর্কে আমাদেরকে কখনো অবহিত করে নি।

ফরমেশন কমান্ডারদের বৈঠকে ঢাকা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং তা চূড়ান্ত করা হয়। আমি এ বৈঠকে আমার সেকেন্ড ম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেজর জেনারেল জামশেদ এবং সহায়ক বাহিনীর কমান্ডারদের নিয়ে যোগদান করি।

১৯৭১ সালের অক্টোবরে চিহ্ন অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ আমাদেরকে দেখতে আসেন। পরিকল্পনায় এসব পরিবর্তন সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়। একই মাসে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স ‘অর্ডার অব ব্যাটল’ ইস্যু করে। এতে পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিরাজিত পরিস্থিতির আলোকে আমার পরিকল্পনা কার্যকর ও অভ্যস্ত বাস্তবসম্মত বলে প্রমাণিত হয়।

এ পরিকল্পনা বিভিন্ন মিশন বিশেষ করে রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনার সাথে সঙ্গতি রেখে প্রণয়ন করা হয়। রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা ছিল সকল বিবেচনার ঊর্ধ্বে এবং আমার পক্ষে তা অগ্রাহ্য করা সম্ভব ছিল না। আমি ছিলাম পাকিস্তানের সার্বিক পরিকল্পনার কেবল একটি অংশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে।

পক্ষান্তরে, পুরো বিষয় কৌশলগত পর্যায় থেকে দেখার দায়িত্ব ছিল হাই কমান্ডের। তাদের উচিত ছিল গোটা পরিস্থিতির জটিলতা অনুধাবন করা এবং ইন্দিত লক্ষ্য অর্জনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। সার্বিক পরিকল্পনা থেকে যে কোনো বিচ্যুতি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অসংখ্য ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

 

১৬তম ডিভিশন

 

গোটা পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে মোতায়েন একজন কমান্ডারের তার ওপর অর্পিত মিশন সফল করে তুলতে নিজস্ব উদ্যো গ্রহণের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু আমার ওপর অর্পিত মিশন বাস্তবায়নে এমন স্বাধীনতা আমাকে দেওয়া হয় নি।

Leave a Comment