১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

 

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

 

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলার জনসাধারণের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্দোলনে এ অঞ্চলের ছাত্র ও যুব সমাজের ব্যাপক অবদান রয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টির পরপরই এ অঞ্চলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অঙ্গ দল হিসেবে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে।

১৯৫২ সালের পর ১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে এসব ছাত্র সংগঠন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বাষট্টি সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন সাধারণভাবে “শিক্ষা আন্দোলন” হিসেবে খ্যাতি লাভ করলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের ফলে যে জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে ওঠে তা ধাপে ধাপে স্বাধীনতা পর্যন্ত বিকশিত হয়।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন বা ছাত্র আন্দোলন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমসাময়িক শিক্ষা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তাই এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে (১) শিক্ষা (২) রাজনৈতিক- এ দু’ভাগে আলোচনা করা যায়।

শিক্ষা প্রেক্ষাপট:

১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন শিক্ষা আন্দোলন নামে খ্যাত। পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববাংলার প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত শিক্ষানীতি এ অঞ্চলের ছাত্র সমাজকে সরকার বিরোধী- আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পাকিস্তান সরকারের পরিকল্পনা ছিল পূর্ববাংলায় শিক্ষার অগ্রগতি রোধ করতে পারলে এ অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ স্তিমিত হবে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি দীর্ঘকাল টিকে থাকবে।

তাই শুরু থেকেই সরকার পূর্ববাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে চরম বৈষম্য নীতি অনুসরণ করতে থাকে। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে এই বৈষম্যের প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল। যেমন- ১৯৪৭-৪৮ সালে পূর্ববাংলায় প্রাথমিক স্কুল, ঐ সমস্ত স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীর হার ছিল যথাক্রমে রাষ্ট্রের মোট সংখ্যার যথাক্রমে ৭৭.৮৯%, ৮০.৯৩%, ৭৮.৯৭%। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে এসে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮.৯৩%, ৫৭.৬৮% ও ৬৩.৫৪%।

তেমনি মাধ্যমিক স্তরে ১৯৪৭-৪৮ সালে স্কুল, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হার ছিল যথাক্রমে ৫৭.২৬%, ৫৬.৩৮% ও ৫০.৪৭%। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৮.৫০%, ৩৯.৫৪% এবং ৩৭.৫৫%। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্বাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অনগ্রসরতার চিত্রও সমভাবে হতাশাব্যঞ্জক। ১৯৪৭-৪৮ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে একটি ও দু’টি।

১৯৬১-৬২ সালে দু’ অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪টি ও ৬টি। অথচ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে দেখা যায় ১৯৪৭-৪৮ সালে পূর্ববাংলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৬২০ জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র ৬৫৪ জন। কিন্তু ১৯৬২-৬৩ সালে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭১৪০ জন ও ৯৪৬৪ জন। পূর্ববাংলায় ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও পশ্চিম পাকিস্তানে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের পরপরই পূর্ববাংলায় কয়েকটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’।

মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা, বিদেশী শোষণের অবসান প্রভৃতি ছিল এ সংগঠনের লক্ষ। কিন্তু সরকারি দমননীতি ও নির্যাতনের মুখে ১৯৪৮ সালেই এ সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্পকালের মধ্যে গঠিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হল পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে এ সংগঠনটি গঠিত হয়। পরের বছর পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে ছাত্র সংগঠনটি মূলত আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে কাজ করতে থাকে। ১৯৫৫ সালের পর দু’টি সংগঠনের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

সমসাময়িককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশন গঠিত হয়। তবে সরকারের কঠোর দমননীতির মুখে খুব শীঘ্রই দলটির বিলুপ্তি ঘটে। ১৯২০ সালে ভারতের কমিউনিস্টরা ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর অনুকরণে ‘পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি’ গঠিত হয় এবং পাশাপাশি এর অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ গঠিত হয়। উল্লেখ্য যে, পূর্ববাংলার গণমানুষের শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে ‘ছাত্রলীগ’ ও ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ যুগপৎ ভূমিকা পালন করেছিল।

বিশেষ করে ১৯৫২ সালে ভাষার দাবি নিয়ে পূর্ববাংলায় সরকার বিরোধী যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিল এ অঞ্চলের ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ ছাত্র সমাজ। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র সমাজ পূর্ববাংলার যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দিয়েছিল তার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটেছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ফলাফলের ওপর।

আন্দোলনের পর্যায়

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের পরোক্ষ প্রস্তুতি চলতে থাকে ‘৬১ সালের গোড়ার দিকে ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে। এ পর্বে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ। এ দু’ ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৬১ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ও রবীন্দ্র শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং এ উপলক্ষে চারদিন ব্যাপী কর্মসূচি গৃহীত হয়।

এদিকে সামরিক সরকার ছাত্র সংগঠনগুলোর গতিবিধি লক্ষ রাখার জন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করে এবং এদের রিপোর্ট অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর আজম খান ছাত্র রাজনীতিকে ‘শয়তানের মনন’ বলে আখ্যায়িত করেন। রাজনীতিতে জড়িত ছাত্রদের তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কখনো ‘নক আউট’ আবার কখনো ‘কিক আউট’ করার ঘোষণা দেন।

আবার কেন্দ্রীয় সরকার গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ছাত্রদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার প্রতিক্রিয়াশীল নীতি ঘোষণা করে। যেমন- রাজনীতির সাথে জড়িত মেধাবী ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরি, সশস্ত্র বাহিনীতে কমিশন লাভ এবং আন্তর্জাতিক বৃত্তি লাভে অযোগ্য বলে ঘোষণা দেয়। সরকারের এ ধরনের ঘোষণায় ছাত্র সমাজ ভীত না হয়ে বরং সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনের লক্ষে এগিয়ে যায়।

এ অবস্থায় ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পরবর্তী ২১ ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনের লক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের উদ্যোগে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ইস্কাটনের একটি বাড়িতে এক গোপন সভায় মিলিত হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে কোন কিছুর বিনিময়ে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং পরবর্তী ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই তা শুরু করা হবে।

কিন্তু এর আগেই ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দীর গ্রেফতারের খবর ৩১ জানুয়ারি ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলে দাবানলের মত চারদিকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করে আলোচনা করা যায়। যথা-

প্ৰথম পৰ্ব : সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন

দ্বিতীয় পর্ব : সংবিধান বিরোধী আন্দোলন

তৃতীয় পৰ্ব : আইয়ুব প্রবর্তিত শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন ।

প্রথম পর্ব : সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন

১৯৬২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা আতাউর রহমানের বাসভবনে সরকার বিরোধী এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী করাচি গেলে তাঁকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।

এ সংবাদ পরদিন পূর্ব পাকিস্তানের পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে এ অঞ্চলের ছাত্র সমাজ সরকার বিরোধী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং এর মধ্যদিয়ে আন্দোলনের প্রথম পর্বের সূচনা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে মধুর ক্যান্টিনে বৈঠকে মিলিত হয় এবং পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সৰ্ব্বক ধর্মঘট পালিত হয়।

ধর্মঘটের সংবাদ পত্রিকায় ছাপানো না হওয়ায় ২ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবে যায় এবং সরকারি পত্রিকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ৩ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঞ্জুর কাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সফরে আসলে ছাত্ররা তাকে নাজেহাল করে । ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দেয়ালগুলো সামরিক সরকারবিরোধী লেখায় ভরে যায় ।

 

দ্বিতীয় পর্ব : শাসনতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন

বাষট্টির ছাত্র আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা ঘটে আইয়ুব খান কর্তৃক পরিকল্পিত শাসনতন্ত্রকে কেন্দ্ৰ করে। আইয়ুব খান ১৯৬০ সলের জানুয়ারি মাসে মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারি ৯৫.৬ শতাংশ মৌলিক গণতন্ত্রীদের আস্থা ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এর দুদিন পর পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ‘ব্যুরো অব ন্যাশনাল রিকনস্ট্রাকশন’ (BNR) নামক একটি কমিশন গঠন করেন।

কমিশন ৬২ সালের ২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদের এবং ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের পরোক্ষ নির্বাচনের সুপারিশ করে। কমিশন আইয়ুব খানের সাংবিধানিক পরিকল্পনা সম্বলিত একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। এতে ব্রিটিশ পদ্ধতির পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র পাকিস্তানে প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়।

এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়, পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থা পাকিস্তানে চালু করলে অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক নেতাদের আত্ম স্বার্থপরতা এবং দুর্নীতির জন্ম দিবে। অতএব, রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণার্থে প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুপারিশ করা হয়। প্রস্তাবিত সংবিধানে প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকারের কথা বলা হয় এবং ভোটারদের যোগ্যতা হিসেবে শিক্ষা ও সম্পদের বিধান রাখা হয় ।

আইয়ুব খানের শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা ও জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের পরোক্ষ নির্বাচন ঘোষিত হলে পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ পুনরায় আন্দোলনের ডাক দেয়। ছাত্রদের নির্বাচন বিরোধী আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। নির্বাচন শেষে আন্দোলনরত ছাত্ররা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নিকট বিবৃতির মাধ্যমে ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করে।

এরমধ্যে প্রধান দাবিগুলো ছিল- সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তিদান, গ্রেফতারি পরওয়ানা প্রত্যাহার, সামরিক আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মুক্তি, রাজনৈতিক কর্মী ও বন্দিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের আদেশ প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর আরোপিত EBDO ও PODO প্রভৃতি কালাকানুনের প্রত্যাহার, বাক- স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা প্রদানসহ ছাত্রদের স্বার্থ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত কিছু দাবি ।

ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আইনসভায় সরকারবিরোধী গ্রুপ নিজেদের জন্য ৮ দফা নীতিমালা গ্রহণ করে। এগুলো হলো মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, বিনা বিচারে ডিটেনশনের বিরোধিতা, সকল রাজনৈতিক বন্দির আশু মুক্তি ইত্যাদি। ২৫ জুন (১৯৬২) পাকিস্তানের নয়জন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা আইয়ুবের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন।

তাছাড়া বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের মধ্য থেকেও ছাত্রদের দাবির পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। ফলে সরকার অধিকাংশ ছাত্রকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

তৃতীয় পর্ব : শরীফ কমিশন বিরোধী আন্দোলন

আগস্ট মাস থেকে বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে সমসাময়িক শরীফ কমিশনের শিক্ষা সংক্রান্ত রিপোর্টকে কেন্দ্র করে। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে ১৯৫৮ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এস.এম. শরীফকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিশন গঠন করেন এবং পাকিস্তানের পরবর্তী শিক্ষানীতি সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করেন।

১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কমিশনের রিপোর্ট সরকারের নিকট হস্তান্তর করা হয় এবং ১৯৬২ সালে তা প্রকাশিত হয়। কমিশনের রিপোর্টে পাকিস্তানে ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক, উর্দুকে সার্বজনীন ভাষায় রূপান্তর, উর্দু ও বাংলা ভাষার সম্পর্ককে আরো ঘনিষ্ঠতর করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

কমিশন পাকিস্তানের একটি অভিন্ন বর্ণমালার জন্য সুপারিশ করে এবং অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে অবান্তর বলে ঘোষণা করে। শরীফ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের শিক্ষা বিষয়ক কতগুলো সিদ্ধান্তও ঘোষণা করে । যথা-

১. প্রতিটি স্কুলে ৬০ শতাংশ ব্যয় সংগৃহীত হবে ছাত্রদের বেতন থেকে বাকি ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে।

২. পাস কোর্স ও অনার্স কোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়।

ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব

পূর্ববাংলার ছাত্র আন্দোলন তথা জাতীয় আন্দোলন ও জাতীয় মুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফলাফল ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথমত, ১৯৬২ সালের আন্দোলন ছাত্র সমাজ ও ছাত্র সংগঠনসমূহের জন্য অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দেয়। শুধুমাত্র শিক্ষা বিষয়ক ব্যাপার নিয়ে এত ব্যাপক ও বিশাল ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠতে পরে তা ছিল ছাত্র নেতৃবৃন্দের জন্য একটি বিরাট শিক্ষা।

দ্বিতীয়ত, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এ দেশবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। আর ১৯৬২-র ছাত্র আন্দোলনে এ বীজ অংকুরিত হয়ে জাতীয় চেতনার সঙ্গে প্রগতিশীল ধারার স্ফূরণ ঘটায়। সমগ্র দেশে এ আন্দোলন অসামান্য স্পর্শী প্রাণের জোয়ার বয়ে আনে ।

তৃতীয়ত, এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায় যে, আইয়ুব খানের মত লৌহ মানব ছাত্র আন্দোলনের নিকট নতি স্বীকার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুক্তিদান ও ১৯৬২ সালের শেষ দিকে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

চতুর্থত, আইয়ুব খান ক্রমবর্ধমান ছাত্র আন্দোলনের বা ছাত্রদের রোষানল থেকে রক্ষা পাওয়ার লক্ষে বিনা পরীক্ষায় ছাত্রদের ডিগ্রি প্রদান করেন।

পঞ্চমত, ‘শিক্ষা আন্দোলন হিসেবে বহুল পরিচিত এ আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকও উপেক্ষনীয় নয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করে যে দমন-পীড়ন ও বিভিন্ন নিবর্তনমূলক ও রাজনীতিবিদদের অকেজো করার জন্য বিভিন্ন অযোগ্যকরণ অধ্যাদেশ জারি করেন তাতে পাকিস্তানে বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানে এক চরম রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

‘৬২-র আন্দোলন এ পরিকল্পিত রাজনৈতিক শূন্যতাকে ভেঙ্গে গোটা পরিবেশকে চাঙ্গা করে তোলে ।

ষষ্ঠত, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন ৬৯-এর ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান ও আইয়ুব খানের পতন, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি রাজনৈতিক এলিটদের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং অবশেষে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন অধিকতর প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা।

পঞ্চাশের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ষাটের দশকের শেষ নাগাদ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৬২ সালের আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। সর্বশেষে, ১৯৬২ সালের আন্দোলনে এবং তার পূর্বে ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে যুগান্তকারী ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপটে ১৯৬২ সাল একটি মাইল ফলক। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, শাসনতন্ত্র ও শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে।

১৯৬২ সালের আন্দোলন থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রয়োগ ঘটিয়ে ছাত্র সমাজ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতন ঘটায় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিজয়কে সুনিশ্চিত করে। তাই শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, দ্বিতীয় খন্ড, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪ ।

২। আবুল কাশেম, ‘বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন : প্রকৃতি ও পরিধি, ইতিহাস সমিতি পত্রিকা, সংখ্যা ২৩-২৪, ১৪০২- 3808 1

 

১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ

১। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমি সংক্ষেপে লিখুন।

২। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রস্তুতি আলোচনা করুন ।

৩। শরীফ কমিশন বিরোধী আন্দোলন সংক্ষেপে পর্যালোচনা করুন।

রচনামূলক প্রশ্নঃ

১। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করুন। এ আন্দোলনের ফলাফল কি হয়েছিল?

Leave a Comment