১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

 

ছয় দফা আন্দোলন

 

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র দু’টির সৃষ্টি হয় এবং তখন থেকেই শুরু হয় পরস্পরের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। রাষ্ট্র দু’টির মধ্যকার এ প্রতিযোগিতা বহুবার প্রত্যক্ষ যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের প্রধান লক্ষ কাশ্মিরের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারতের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৯৪৭ সালে।

শেষপর্যন্ত জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে। কাশ্মির নিয়ে পাক-ভারতের মধ্যে দ্বিতীয়বার যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৯৬৫ সালে। এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলেও এর প্রভাব বা ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী।

যুদ্ধের কারণ

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের মূল কারণ ছিল পাকিস্তান কর্তৃক ভারত শাসিত কাশ্মির অধিকার ও পাকিস্তান শাসনভুক্ত করার প্রচেষ্টা। ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ (জম্মু ও কাশ্মির) এবং পাকিস্তান এক-তৃতীয়াংশ দখল করে। যদিও ভারত দাবি করে যে কাশ্মিরের মহারাজা হরি সিং-এর সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে আইনগতভাবে কাশ্মির-এর ওপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।

পাকিস্তান মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে সমগ্র কাশ্মিরের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মিরে নিজ নিজ অধিকৃত অঞ্চলের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে। বস্তুতপক্ষে, তখন থেকেই পাকিস্তানের মধ্যে ভারত বিদ্বেষী মনোভাব জাগ্রত হয়।

১৯৬৫ সালের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তান এ বিষয়ে অনেকটা নীরব থাকলেও ১৯৬৫ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খান পুনরায় ভারত বিরোধী রাজনীতিতে তৎপর হয়ে ওঠেন এবং ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে উজ্জীবিত হন। কতগুলো পারিপার্শ্বিক অবস্থা আইয়ুব খানকে ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করেছিলো। কারণগুলো নিম্নে সংক্ষেপে আলোচিত হলো-

আইয়ুব খানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা:

আইয়ুব খান মনেপ্রাণে একজন দাম্ভিক লোক ছিলেন। ক্ষমতা লাভের পর তিনি পাকিস্তানে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন। এ সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে তিনি নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে তোলেন।

আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন এবং শেষপর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনের নিকট নতি স্বীকার করে সামরিক আইন প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তিসহ শিক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাতিল করেন।

এতে তাঁর ভাবমূর্তি অনেকটা খর্ব হয়। এরপরই আইয়ুব বিরোধী ৯ দলীয় ফ্রন্ট ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) গঠন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের আন্দোলনে আইয়ুবের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হয়। এই ফ্রন্টের কার্যক্রম স্তিমিত করতে ফ্রন্টের কার্যক্রমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৯৬৪ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বিহারি-বাঙালি দাঙ্গায় রূপান্তরিত হতে সময় লাগেনি।

দাঙ্গা বিদ্বেষী বাঙালিদের তৎপরতায় সরকার শঙ্কিত হয়। এর সাথে যুক্ত হয় ১৯৬৫ সালের নির্বাচনের ফলাফল। নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে আইয়ুব জয়ী হন। কিন্তু বিরোধী দলীয় ‘কপ’ প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব অপেক্ষা প্রায় দ্বিগুণ ভোটে জয়লাভ করেন।

এই নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে সরকারি প্রার্থীকে পরাজিত করা অসম্ভব। তাই রাজনীতিবিদরা আইয়ুব-বিরোধী কঠোর কর্মসূচি দেয়ার চেষ্টা চালান। অন্যদিকে আইয়ুব খান তাঁর ব্যর্থতা ঢাকার জন্য জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশে কাশ্মির জয় করে পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের কৃতিত্ব বয়ে আনতে সচেষ্ট হন।

চীন-ভারত যুদ্ধের প্রভাব:

১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী পরাজিত হয় এবং চীন ভারত শাসিত কাশ্মিরের ‘আকসাই’ অঞ্চল দখল করে নেয়। চীনের কাছে ভারতীয় বাহিনীর পরাজয় পাকিস্তানকে উৎসাহিত করে। আইয়ুব খান হঠাৎ করে তাঁর ভারত নীতি পরিবর্তন করে পূর্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হন।

আর্জাতিক প্রভাব:

চীন-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান চীনের সাথে মৈত্রী জোট গড়ে তোলে। পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথেও আইয়ুব খানের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। নির্বাচনের পরপর তিনি পিকিং ও মস্কো সফর করেন। এসব রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে আইয়ুব খান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

কাশ্মিরকে সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করা:

১৯৬৪ সালে জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হয়ে কাশ্মিরের ব্যাপারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করেন। ভারতীয় সংবিধানে কাশ্মিরের যে বিশেষ স্থান ছিল ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে শাস্ত্রীর সরকার সংবিধান সংশোধন করে তা তুলে দিয়ে কাশ্মিরকে সম্পূর্ণরূপে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করে নেয়। এর ফলে পাকিস্তানে নতুন করে ভারত বিরোধী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

কচ্ছের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিজয়:

ভারতের গুজরাট ও পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত সমুদ্রতীরবর্তী কচ্ছের রানের উত্তরাংশ পাকিস্তান দাবি করলে ভারত তার সম্পূর্ণটাই নিজের বলে ঘোষণা করে। এ দাবি নিয়ে ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে এবং এ সংঘর্ষে পাকিস্তানই বেশি সফলতা অর্জন করে। এ যুদ্ধে বিজয় আইয়ুব খানের মনোবল ও আকাঙ্ক্ষা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

পাকিস্তানের গৌরব ও আয়তন বৃদ্ধি:

চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের পরাজয়, কচ্ছের যুদ্ধে পাকিস্তানের বিজয় এবং পাকিস্তানের বিশাল সৈন্যবাহিনী আইয়ুব খানের মনোবল বৃদ্ধি করে। তাই তিনি ভারত অধিকৃত কাশ্মির অধিকারের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি ও গৌরব বাড়ানোর লক্ষে অগ্রসর হন। আর এ নীতির প্রত্যক্ষ পরিণতি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ।

যুদ্ধের ঘটনাবলি

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের কারণ যাই থাকুক না কেন, পাকিস্তানের একমাত্র লক্ষ ছিল যুদ্ধে ভারতকে পদানত করে ভারত শাসিত কাশ্মির অধিকার করা এবং তা পাকিস্তান রাষ্ট্রভুক্ত করা। এ লক্ষ সামনে নিয়ে পাকিস্তান অগ্রসর হয়। কাশ্মিরী নেতা শেখ আব্দুল্লাহ্ গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়ায় ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তান ভারতে অনুপ্রবেশের সুযোগ পায়।

ভুট্টোর পরিকল্পনা মোতাবেক কাশ্মিরে সশস্ত্র গেরিলা অনুপ্রবেশ ঘটানো শুরু হয় ১৯৬৫ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে। ৯ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মির বিপ্লবী পরিষদ গঠন করে অনুপ্রবেশকারীরা পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তায় ভারত নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হিংসাত্মক তৎপরতা শুরু করে দেয়।

ব্যাপক গুলি, অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন নাশকতামূলক কাজ চলতে থাকলে পাকিস্তানি প্রচারযন্ত্রে একে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মিরী জনগণের বিদ্রোহ বলে প্রচার করতে থাকে। সমস্ত আগস্ট মাস ধরে পাক সেনারা নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর আক্রমণ চালাতে থাকে ।

 

অবশেষে ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান বাহিনী কাশ্মিরের ভারতীয় অংশ আক্রমণ করলে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের প্রথম থেকেই ভারতীয় বাহিনী প্রাধান্য বজায় রাখতে শুরু করে। ভারতীয় সৈন্যরা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে লাহোর শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানিরা কাশ্মির সীমান্তের ছামর সেক্টরে সাফল্য লাভ করলেও অন্যত্র পরাজিত হতে থাকে।

পাকিস্তানের এহেন চরম দুর্দিনে পূর্ব পাকিস্তানিরাই চরম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে লাহোর শহর রক্ষা করেছিল। এদিকে যুদ্ধে পাকিস্তানের শোচনীয় অবস্থা অনুভব করতে পেরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাশ্চাত্য শক্তি উভয়েই যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী হয়। তাদের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের কঠোর হুশিয়ারীর ভিত্তিতে মাত্র সতের দিনের মাথায় ২৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ বন্ধ করা হয়।

এর কয়েক মাস পর ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনের মধ্যস্থতায় তাসখন্দ শহরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে পাক-ভারত যুদ্ধের অবসান ঘটে। কিন্তু এ চুক্তির নয়টি ধারার কোনটিতেই কাশ্মির সমস্যার উল্লেখ মাত্র ছিল না।

পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়া

পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যায় পূর্ব পাকিস্তানেও পাক-ভারত যুদ্ধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী মহলগুলো তাসখন্দ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার পরিবর্তে কাশ্মির সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেন। বস্তুতপক্ষে এ অঞ্চলের মানুষ পাক-ভারত যুদ্ধকে আইয়ুব খানের হঠকারিতা বলে আখ্যা দিয়েছিল।

পাক-ভারত যুদ্ধের পর এ অঞ্চলে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। এর কারণ হচ্ছে যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। ভারত ইচ্ছে করলে যে কোন মুহুর্তে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারত। পূর্ব পাকিস্তানি জওয়ানরা জীবন বাজি রেখে পাঞ্জাবের লাহোর শহর রক্ষা করলেও পাক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ন্যূনতম নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

তাছাড়া যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানসহ গোটা পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল, খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ফলে সামরিক ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরতাসহ পূর্ব পাকিস্তানের সার্বিক অসহায়ত্ব সকল বাঙালির চোখে প্রকট হয়ে দেখা দেয়।

একই সাথে ইসলামের নামে ও সাম্প্রদায়িক আবরণে পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের চিরাচরিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন যুদ্ধের সময় থেকে নগ্ন আকার ধারণ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘হিন্দু’ ছিলেন বলে তাঁর গান পাকিস্তানি বেতারে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। নজরুল ইসলামকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পরও তাঁর ইসলামী গানগুলো থেকে ‘হিন্দুয়ানি’ শব্দসমূহ বাদ দিয়ে পরিবেশন করা হতে থাকে।

এভাবে বিষয়টি এমনভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ বাহ্যত ভারতের বিরুদ্ধে হলেও যুগপৎ তা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও। পরবর্তী প্রেক্ষাপট দৃষ্টে মনে হয় আইয়ুব খান ভারতের বিরুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে কাশ্মিরের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ জয়ের নেশায় মত্ত হলেন ।

ছয় দফা দাবি উত্থাপনের পেছনে পাক-ভারত যুদ্ধের (১৯৬৫) প্রভাব

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছয় দফা দাবি উত্থাপনের পেছনে পাক-ভারত যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব কাজ করেছিল। ছয় দফা দাবির মূল ইস্যু পাকিস্তানের দু’ অঞ্চলের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বৈষম্য হলেও ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানকে নিরাপত্তাহীনতায় রাখা,

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা প্রভৃতি কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এজন্য ছয় দফায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ এ অঞ্চলের স্থানীয় নিরাপত্তার জন্য একটি আধাসামরিক বাহিনী গঠনের দাবি জানানো হয়। এই দাবিগুলো বাঙালির প্রাণের দাবিতে পরিণত হতে সময় লাগেনি। জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর মতে, এই যুদ্ধ এক অখন্ড পাকিস্তান ধারণার প্রতি সর্বশেষ আঘাতস্বরূপ ছিল।

ছয়দফা ভিত্তিক আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন ও আইয়ুব খানের পতন

আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবি উত্থাপন করলে সদ্য পাক-ভারত যুদ্ধে পরাজিত আইয়ুব খানের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটে। ফলে আইয়ুব কাশ্মির বিজয়ের ব্যর্থতার ক্ষোভ কড়ায়- গন্ডায় বাঙালির ওপর আদায় করতে উদ্যত হন এবং আগরতলা মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে বাঙালি নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।

১৯৬৮ সালে দেশব্যাপী ‘উন্নয়নের এক দশক’ নামে আইয়ুব খানের শাসনের এক ব্যাপক প্রচারণা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দু’অঞ্চলের ব্যাপক বৈষম্য এবং ব্যবধানের যে চিত্র দেখতে পায় তার ফলে তাদের মধ্যে তীব্র ক্রোধ সৃষ্টি হয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-জনতা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে এক দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে এবং এ আন্দোলনে অবশেষে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইয়ুব খানের পতন ঘটে।

সারসংক্ষেপ

১৯৬৫ সালে ভারতকে পরাজিত করে কাশ্মির বিজয় সংক্রান্ত আইয়ুব খানের পরিকল্পনা ছিল একটি অলীক স্বপ্ন। বস্তুতপক্ষে আইয়ুব নিজের দাম্ভিকতা প্রকাশের লক্ষে প্রতিপক্ষকে বিবেচনা না করে এ যুদ্ধে লিপ্ত হন। আর এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি নিজ দেশসহ বহির্বিশ্বেও নিন্দিত হয়েছেন। অপরপক্ষে, পাক-ভারত যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি প্রতিশোধ পরায়ন হন।

অবস্থা এমনই প্রমাণিত হলো যে, পূর্ব পাকিস্তানের কারণে আইয়ুব খান পরাজিত হয়েছেন। এটা ছিল আইয়ুব খানের একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। অবশেষে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি তাঁর এরূপ বৈরিভাব এ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরো যুক্তিযুক্ত করে তোলে এবং শেষপর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবির আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তাই বলা যায়, ১৯৬৫ সালের পাক- ভারত যুদ্ধ পরোক্ষভাবে আইয়ুব খানের পতনকে সুনিশ্চিত করেছিল।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। জি.ডব্লিউ. চৌধুরী, অখন্ড পাকিস্তানের শেষ দিনগুলো, ঢাকা, হক কথা প্রকাশনী, ১৯৯১ ।

২। কামরুদ্দীন আহমদ, স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় এবং অতঃপর, ঢাকা, নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৮২।

 

১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ

১। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের ঘটনাবলি লিখুন।

২। পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব খানের পতনের জন্য তাসখন্দ চুক্তি কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল লিখুন।

৩। ৬ দফা দাবি উত্থাপনের পেছনে এই যুদ্ধের কি কোন প্রভাব ছিল?

রচনামূলক প্রশ্ন:

১। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের কারণগুলো বর্ণনা করুন ।

২। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ঘটনাবলি আলোচনা করুন। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের উত্থাপিত ৬ দফা প্রণয়ন সহ পূর্ববঙ্গে এই যুদ্ধের প্রভাব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করুন।

Leave a Comment