১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

আজকে আমদের আলোচনার বিষয় ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

 

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

 

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত চলমান অসহযোগ আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম পর্ব। নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের অযথা গড়িমসি ও প্রতারণা এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর অসহযোগিতা ছিল এ অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান কারণ।

এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছিল খুবই ব্যাপক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই আন্দোলনের সাফল্যজনক পরিণতিতে বাঙালি জাতি যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট/পটভূমি

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি:

১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্পনের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি (মহিলা ১০টি সহ) আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি (মহিলা ৭টি সহ) আসন লাভ করে এবং ভুট্টোর পিপলস পার্টি ৮৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। তেমনি প্রাদেশিক পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানে ৩১০টি (মহিলা আসনসহ) আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়া ন্যায়সঙ্গত হলেও পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করেন। এর সঙ্গে একমত পোষণ করে পিপলস পার্টি।

ইয়াহিয়া ভুট্টো-মুজিব ব্যর্থ আলোচনা:

নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানি শাসকচক্রকে হতাশ করে। ইয়াহিয়া চেয়েছিলেন যে কোনভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে এবং ভুট্টো চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে দূরে সরিয়ে রেখে যেকোন মূল্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর হতে। অপরদিকে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ক্ষমতার বৈধ দাবিদার। এ তিন নেতার ত্রিমুখী অবস্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঢাকায় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু ভুট্টো চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে পাশ কাটিয়ে সরকার গঠন করতে। শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার ভিত্তিতে সরকার গঠনে তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন পাকিস্তানের কেউ ঢাকায় জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগ দিলে তার নিজ দায়িত্বে তা করবেন।

এর পেছনে তিনি কারণ হিসেবে নতুন সংবিধান প্রণয়ন তাঁর দলের মতামতকে প্রাধান্য প্রদানের দাবি ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানে তার ও নির্বাচিত অপরাপর সদস্যদের ওপর ভারতীয় হামলার অজুহাত দেখান । ফলে পরিস্থিতি অনেকটা রহস্যময় হয়ে ওঠে। এদিকে আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ও প্রাদেশিক আইনের খসড়া তৈরির কাজে অগ্রসর হতে থাকে।

১৮ ফেব্রুয়ারি জুলফিকার আলী ভুট্টো পত্রিকায় এক চাঞ্চল্যকর বক্তব্য প্রকাশ করেন। এতে তিনি ঢাকা এসে আওয়ামী লীগের সাথে আপোষ আলোচনা অবাস্তব ও অসম্ভব ঘোষণা করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো সংকট নিরসনে ৫ দফা ‘ফর্মুলা’ পেশ করেন। এতে তিনি সকল প্রদেশের জন্য সমান প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলেন এবং এজন্যে কেন্দ্রে একটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইন পরিষদ গঠনের কথাও বলেন।

ভুট্টোর এসব অসংলগ্ন বক্তৃতা-বিবৃতি পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাঁরা ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানান। এ অবস্থায় ২৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টিতে শেখ মুজিবুর রহমান-এর সভাপতিত্বে পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্র পেশ করা হয়।

একই দিন ভুট্টো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পেছানো হলে তিনি যোগদান করবেন বলে ঘোষণা দেন। অন্যথায় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে আন্দোলনের হুমকি দেন। এসময় ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর হুমকির কাছে নতি স্বীকার করে ১ মার্চ তারিখে হঠাৎ বেতার মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন ।

ছাত্র ও শ্রমিকদের কর্মসূচি:

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে পূর্ববাংলার ছাত্র সমাজ, শ্রমিক, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী তথা সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় জনতা পাক সেনাদের আক্রমণ করে। সংঘর্ষে বহুলোক নিহত ও আহত হয়।

ঐদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে আ.স.ম. আব্দুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন- এ চার নেতা মিলে এক বৈঠকে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। এ ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে পরদিন দেশব্যাপী ছাত্রলীগ ও শ্রমিকলীগ ধর্মঘট আহ্বান করে।

ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক ছাত্র সমাবেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন। সমাবেশে ছাত্রলীগ ৫ দফাভিত্তিক প্রভাব গ্রহণ করে-

ক. পাকিস্তান ঔপনিবেশবাদী শক্তির সেনাবাহিনীর এ জঘন্য হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে,

খ. স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী আহত বাঙালি ভাইদের বাঁচানোর জন্য স্বাস্থ্যবান বাঙালি ভাইদের ব্লাড ব্যাংকে রক্ত প্রদান,

গ. পাকিস্তানি ঔপনিবেশবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েমের শপথ গ্রহণ,

ঘ. স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা এবং

ঙ. এবং সভা দলমত নির্বিশেষে বাংলার প্রতিটি নর-নারীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় ।

পল্টনে ঐদিন ছাত্রলীগ এক ইশতেহার ঘোষণা করে যা “স্বাধীনতার ইশতেহার” নামে চিহ্নিত হয়। এতে বলা হয়-

১. স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে। ৫৪ হাজার ৫শত ৬ বর্গমাইল বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার ৭ কোটি মানুষের আবাসিক ভূমি হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম এ রাষ্ট্রের নাম “বাংলাদেশ”।

(ক) পৃথিবীর বুকে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশের ব্যবস্থা,

(খ) সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু করে কৃষক-শ্রমিক রাজ কায়েম করা,

(গ) বাক, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নির্ভেজাল গণতন্ত্র কায়েম করা।

২. বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন পরিচালনার জন্য নিম্নলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে-

(ক) প্রতিটি অঞ্চলে “স্বাধীনতা সংগ্রাম কমিটি” গঠন,

(খ) জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা,

(গ) মুক্তিবাহিনী গঠন,

(ঘ) সাম্প্রদায়িক মনোভাব এবং

(ঙ) লুটতরাজ ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ পরিহার।

৩. স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারা হবে নিরূপ-

(ক) বর্তমান সরকারকে বিদেশী সরকার গণ্য করে এর সকল আইনকে বে-আইনী বিবেচনা,

(খ) অবাঙালি সেনাবাহিনীকে শত্রুসৈন্য হিসেবে গণ্য এবং এদের খতম করা,

(গ) এদের সকল প্রকার ট্যাক্স-খাজনা দেয়া বন্ধ,

(ঘ) আক্রমণরত শক্তিকে প্রতিরোধ করতে সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ

৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক।

পল্টন জনসভায় ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন অর্ধবেলা হরতাল পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। ছাত্র সমাজের ইশতেহারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশে শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারি তথা আপামর জনতা সক্রিয়ভাবে হরতাল পালন করে। ঢাকা বেতার ও টেলিভিশন শিল্পীরা তাদের অনুষ্ঠান বর্জন করে। ছাত্র- শিক্ষক, আইনজীবীগণ তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করে আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

এ তিনদিনের হরতালে ঢাকা সহ সমগ্র দেশে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে বহু লোক আহত ও নিহত হয়। ইয়াহিয়া খান পরিস্থিতিতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অগত্যা ৬ মার্চ তারিখে বেতার ভাষণে ঢাকায় ২৫ মার্চ পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণা পূর্ববাংলার বিক্ষুব্ধ মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারে নি।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও সে ঘোষণায় তৃপ্ত হতে পারেন নি। ফলে ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার জন্য বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয় ।

 

৭ মার্চের ভাষণ ও এর গুরুত্ব

পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৭ মার্চ সমাবেশে লক্ষ লক্ষ জনতার ঢল নামে। বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট সময়ে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে দিক নির্দেশনামূলক ভাষণ দেন যা বিশ্বের ইতিহাসে খ্যাত হয়ে থাকবে। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ৪টি। যথা-

ক) চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার,

খ) সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া,

গ) গণহত্যার তদন্ত করা,

ঘ) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা ।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু উপর্যুক্ত দাবির পাশাপাশি কতগুলো ঘোষণা প্রদান করেন। তিনি পূর্ববাংলায় সকল অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। সেদিন জনসমাবেশের ওপর পাকিস্তান সরকারের কড়া নজর ছিল এজন্য যে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে।

এবং এ আশঙ্কা থেকে বঙ্গবন্ধু প্রত্যক্ষভাবে কোন ঘোষণা না দিয়ে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ব্যক্ত করে বলেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এর সাথে তিনি মুক্তিসংগ্রামের জন্য সকলকে প্রস্তুত হওয়ার আদেশ দেন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের আহ্বান জানান ।

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ভাষণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ভাষণ বাঙালি সৈন্য ও সাধারণ মানুষকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বস্তুতপক্ষে এটি ছিল বাঙালি সৈন্যদের প্রতি একটি “গ্রীণ সিগন্যাল” স্বরূপ। তাছাড়া এ বক্তৃতায় বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হয়।

এদিন বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দেশবাসীকে প্রস্তুত হতে আগাম নির্দেশ প্রদান করে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। তাই ৭ মার্চের বক্তৃতা বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে মাইলফলক হিসেবে খ্যাত। 

অসহযোগ আন্দোলন-এর ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব:

১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকে আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। আর ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরদিন থেকে দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। নেতার ঘোষণা অনুযায়ী দেশের স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, কল-কারখানা সব বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা পাকবাহিনী ও অফিসারদের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করতে থাকে। খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হয়ে যায়।

ইয়াহিয়া খান পরিস্থিতির পূর্বানুমান করতে পেরে ৭ মার্চ জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠান। কিন্তু বাঙালির দুর্দর্ঘ্য শক্তি ও মনোবলের নিকট টিক্কা খান ব্যর্থতার পরিচয় দিতে থাকলেন। ১০ মার্চ সরকার এক সামরিক আদেশ জারি করে। এতে বলা হয় সৈন্যদের খাদ্য সরবরাহে কোনো প্রকার বাধা প্রদান করা চলবে না এবং এতে কঠোর শাস্তির হুমকি প্রদান করা হয়।

কিন্তু তাঁর এ হুমকি বাঙালিকে দমাতে পারে নি। সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে যোগ দেয়ার কঠোর নির্দেশ দিলেও অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৩ মার্চ রেডিও পাকিস্তান করাচি কেন্দ্রের খ্যাতনামা বাংলা খবর পাঠক সরকার কবিরউদ্দিন রেডিও পাকিস্তান বর্জন করেন।

স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ এক বিবৃতিতে বার্মা ইস্টার্ন, এসো, পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েলস, দাউদ পেট্রোলিয়ামকে সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্যে কোন প্রকার জ্বালানী ও তৈল সরবরাহ করতে নিষেধ করেন। ১৩ মার্চ সরকার পুনরায় সামরিক আইন জারি করে । ১৪ মার্চ ভুট্টো এক অবাস্তব প্রস্তাবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার ফর্মুলা দেন।

বঙ্গবন্ধু এসব কথায় কান না দিয়ে ১৪ মার্চ ৩৫ দফাভিত্তিক এক নির্দেশনামা জারি করেন। এতে বলা হয়-

ক. সকল সরকারি বিভাগসমূহ, সচিবালয়, হাইকোর্ট, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহ পূর্বের মতোই বন্ধ থাকবে,

খ. বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে,

গ. জেলা প্রশাসক ও মহকুমা প্রশাসকগণ অফিস না খুলে আওয়ামী লীগ ও সংগ্রাম পরিষদের সহযোগিতায় শান্তি-শৃক্মখলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন,

ঘ. পুলিশ বিভাগও অনুরূপভাবে কাজ পরিচালনা করবেন,

ঙ. রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র চালু থাকবে। তবে গণআন্দোলনের খবর প্রচার না করলে কর্মীরা কাজে সহযোগিতা করবে না,

চ. কর-খাজনা দেয়া বন্ধ থাকবে,

ছ. তবে কোন কর আদায়যোগ্য বা আদায়কৃত থাকলে তা বাংলাদেশ সরকারের একাউন্টে জমা হবে।

বঙ্গবন্ধুর আদেশ জারির পর পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ মূলত অকেজো হয়ে যায়। কেবল সৈন্যবাহিনী ব্যতীত সর্বত্র বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অবস্থা উপলব্ধি করে ইয়াহিয়া ১৫ মার্চ ঢাকা সফরে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। বঙ্গবন্ধু প্রস্তাবে রাজি হলেও অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেননি।

১৬ মার্চ থেকে আলোচনা শুরু হয়। ২২ মার্চ হঠাৎ জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকা আসেন এবং আলোচনায় অংশ নেন। ইতোমধ্যে ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে নিরীহ মানুষের ওপর পাক সেনাদের হামলা ও হত্যা আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেয়। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন । আর এদিনই মধ্যরাতে বাঙালির ওপর নেমে আসে চরম আঘাত। ওই কালোরাতে পাক সেনারা বহু বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা করে ।

সারসংক্ষেপ

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনার পেছনে মূল দায়িত্ব পালন করেছে। নির্বাচনোত্তর ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি, প্রতারণা ও নির্বিচারে বাঙালি হত্যার প্রতিবাদে বাঙালি জাতি পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যে দুর্বার অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তা শেষপর্যন্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামে রূপ লাভ করে। আর পাকিস্তান সরকার শেষপর্যন্ত বাঙালির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১। মওদুদ আহমদ, বাংলাদেশ: স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৬।

২। আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশ : জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ২০০০।

৩। মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঢাকা, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ১৯৯২।

৪। মনসুর মুসা (সম্পাদিত), বাংলাদেশ, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪।

 

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চ

 

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন :

১। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকে ১ মার্চে ইয়াহিয়া খানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থার বর্ণনা দিন ।

২। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক গুরুত্ব লিখুন।

৩। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার তাৎপর্য লিখুন।

৪। ১৯৭১ সালের ১-২৫ মার্চ পর্যন্ত বাঙালি জাতির অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাপ্তি পর্যালোচনা করুন ।

রচনামূলক প্রশ্ন :

১। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করুন। শেখ মুজিবের ৭ মার্চের বক্তৃতার গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচনাপূর্বক অসহযোগ আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করুন।

Leave a Comment