৩৯তম এড হক ডিভিশন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ৩৯তম এড হক ডিভিশন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।

৩৯তম এড হক ডিভিশন

 

৩৯তম এড হক ডিভিশন

 

৩৯তম এড হক ডিভিশন

৪ ডিসেম্বর আমাকে ফেনী পুনর্দখলের নির্দেশ দেওয়া হয়। কৌশলগত গুরুত্ব না থাকায় বিরাজমান পরিস্থিতিতে আমি সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছিলাম। কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাকে আবার ফেনী দখলের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। বস্তুতপক্ষে, জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের হস্তক্ষেপ ছিল বাস্তবজতাবর্জিত। তারা মাঝে মাঝে পরিস্থিতি না বুঝে অথবা এলাকা সম্পর্কে কোনো খোঁজ-খবর ছাড়াই নির্দেশ দিতো।

লাকসাম ফেনীর প্রতিরক্ষায় ৩৯তম এডহক ডিভিশন গঠনের বিষয় মূল পরিকল্পনার অংশ ছিল না। আমি চাঁদপুরকে একটি কভারিং পজিশন হিসেবে রেখে ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুর্গকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। লাকসাম অথবা ফেনীর চিন্তা কখনোই আমার মাথায় ছিল না। কিন্তু জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে আরাম- কেদারায় উপবিষ্ট জেনারেল গুল হাসান আমাকে ফেনী ও লাকসাম ধরে রাখার নির্দেশ দেন।

জেনারেল গুল হাসান কখনো কোনো লড়াইয়ে সৈন্য পরিচালনা করেন নি। তিনি নানা অজুহাতে পূর্ব পাকিস্তান সফর এড়িয়ে গেছেন। এ জন্য তার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জটিল পরিস্থিতি বুঝার কথা ছিল না। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পদাতিক যুদ্ধের কৌশলগত চাহিদা এবং মৌলিক কৌশল বুঝতে ব্যর্থ হন। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমার মতামত উপেক্ষা করে সৈন্য পরিচালনার নির্দেশ দেয়।

ফেনী সীমান্ত চৌকি দখলের নির্দেশ দিয়ে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স মূলত এ এলাকায় আমাকে আমার নাক বাড়িয়ে দিতে বাধা করে। তারা বুঝতে পারে নি যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্ত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এবং অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা লাইন (এফডিএল) গুলোই সীমান্তে পরিণত হয়।

মেজর জেনারেল আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বে ৩৯তম এডহক ডিভিশন। গঠন করা হয় ১৯৭১ সালের ২১শে নবেম্বর। বিদ্রোহ দমন অভিযানে ১৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে জেনারেল রহিম অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন।

তার সাহসিকতা, বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার জন্য তাকে চাঁদপুর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ৩৯তম এডহক ডিভিশনে ছিল দুটি ব্রিগেড। এর একটি ছিল ৫৩তম এবং আরেকটি ১৭৭তম। ১১৭তম ব্রিগেড কুমিল্লা থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত এবং ৫৩তম ব্রিগেড কুমিল্লা ও চৌদ্দগ্রামের আরো দক্ষিণে ফেনী পর্যন্ত এলাকা রক্ষার দায়িত্ব ছিল।

৫৩তম ব্রিগেডের নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আসলাম নিয়াজী। তিনি ঢাকার জন্য গঠিত রিজার্ভের কমান্ডার ছিলেন। ৫৩তম ব্রিগেড চাঁদপুর রক্ষার দায়িত্বে ছিল এবং পরে এটি ঢাকায় পিছু হটে আসে। এ ব্রিগেডকে ৩৯তম এডহক ডিভিশনের কমান্ডে ন্যস্ত করা হয় এবং লাকসামে মোতায়েন করা হয়।

 

৩রা ডিসেম্বর রাতে ভারতের ৩০১তম মাউন্টেন ব্রিগেড লালমাই পাহাড় ও লাকসামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসে। ৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে তারা মুজাফ্ফরগঞ্জ দখল করে এবং ২৫ এফএফ-এর একটি বড়ো অংশ দখল করতে সক্ষম হয়।

কমান্ডিং অফিসার তার মনোবল হারিয়ে ফেলেন। লড়াই করার মতো অবস্থা তার ছিল, কিন্তু বিনা লড়াইয়ে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। আমি তাকে কোর্ট মার্শাল করার জন্য সুপারিশ করেছিলাম। ভারত থেকে ফিরে আসার পর তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কারণ, সরকারের সাথে তার সম্পর্ক ছিল ভালো। মেজর জেনারেল রহিম মোজাফ্ফরগঞ্জে আক্রান্ত হন। সে সময় তিনি অগ্রবর্তী অবস্থানে তার সৈন্যদের দেখার জন্য লাকসামের পথে ছিলেন।

৫৩তম ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আসলাম অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালান চাঁদপুরে পৌঁছানোর জন্য। হাজীগঞ্জে ভয়াবহ লড়াই হয়। উভয়পক্ষে প্রাণহানী ঘটে। ১৩ দিন পর ১৯৭১ সালের ৮ই ডিসেম্বর হাজীগঞ্জের পতন ঘটে। ব্রিগেডিয়ার আসলাম ব্রিগেডিয়ার আতিফের নেতৃত্বাধীন ১১৭তম ব্রিগেডে যোগদান করার জন্য লালমাই অবস্থানে পিছু হটে আসেন।

আমি জেনারেল রহিমকে চাঁদপুর ছেড়ে দিয়ে তার চাঁদপুরস্থ গোটা গ্যারিসনসহ ঢাকায় পিছু হটে আসার নির্দেশ দিই। তাকে ঢাকা নিয়ে আসার জন্য ফেরিগুলো রাতের প্রথমভাগে নোঙর ফেলে। ফেরিগুলো রওনা হওয়ার পর চরায় আটকা পড়ে। ফলে তাকে দিনের বেলা রওনা দিতে হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদেরকে ধাওয়া করে। এতে আমাদের কেউ কেউ হতাহত হয়।

জেনারেল রহিমও আহত হন। আহতদের ঢাকার পিলখানায় বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনী সদর দপ্তরে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এদেরকে পরে ঢাকা সিএমএইচ-এ স্থানান্তর করা হয়। আমি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ মেজর জেনারেল রহিমকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠাই।

ব্রিগেডিয়ার মিয়া মনসুর মোহাম্মদ। মেজর জেনারেল রহিমের সৈন্যদের কমান্ড গ্রহণ করেন। জেনারেল রহিমের নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় মোতায়েন ছিল। ব্রিগেডিয়ার সোধির নেতৃত্বে ভারতের একদল ছত্রী সৈন্য এ এলাকায় এগিয়ে আসার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাদের এ চেষ্টা ব্যর্থ হয় । এখানে এবং অন্যান্য জায়গায় তীব্র প্রতিরোধের মুখে ভারতীয়রা তাদের প্রচেষ্টায় বিরতি দেয়।

এ সময় আমরা নারায়ণগঞ্জ ও মিরপুরে প্রচুর সৈন্য মোতায়েন করি । ঢাকায় হামলা চালানোর আগে ভারতীয়দের ব্যাপকভাবে সমরসজ্জা গড়ে তুলতে হতো । কিন্তু তারা সে অবস্থায় পৌঁছার আগেই আমাদেরকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

১১ই ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংকে ঢাকা দখলের দায়িত্ব দেওয়া হয় । সেদিন তিনি ঢাকা দখলের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য ৭ দিন সময় চেয়েছিলেন। আমার হিসাব অনুযায়ী তার আরো বেশি সময়ের প্রয়োজন ছিল।

 

৩৯তম এড হক ডিভিশন

 

প্রকৃতপক্ষে, ভারতীয়রা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে এমনভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল যে, তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সৈন্য প্রত্যাহার করতে পারছিল না। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমি ট্যাংক অথবা ভারী অথবা মাঝারি কামান ছাড়াই ঢাকা অঞ্চলে মোতায়েন ভারতীয় সৈন্যদের তাড়িয়ে দিতে পারতাম।

Leave a Comment