তছনছ অর্থনীতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

তছনছ অর্থনীতি – বাংলাদেশের বহু এলাকার চাষী এখন আর খেতে ধান বুনছে ‘না, কেননা পাকবাহিনী ও বাঙালি স্বাধীনতা যোদ্ধাদের মধ্যে প্রতিদিন গোলাগুলির ফলে সে আর বাইরে আসতে সাহস পাচ্ছে না। ভারতীয় ভূখণ্ড পেরিয়ে ১০০০ মাইল দূরে পশ্চিম পাকিস্তানে বস্ত্রকলগুলো শস্তা সুতি কাপড় তৈরি করে চলছে যার বাজার কেবল পূর্ব পাকিস্তানেই এবং সেখানে তা বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না যতক্ষণ পর্যন্ত না পাক আর্মি স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে সক্ষম হচ্ছে।

 

তছনছ অর্থনীতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

তছনছ অর্থনীতি

পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক জীবনহানি ছাড়াও তিন সপ্তাহের যুদ্ধ দেশের উভয় অংশে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করছে এসব হচ্ছে তার কিছু নিদর্শন।

বর্তমান সংবাদদাতা পূর্ব পাকিস্তানে কোনো উপোষ থাকার ঘটনা প্রত্যক্ষ না করলেও গ্রামাঞ্চলে খাদ্য মজুতের পরিমাণ কমে গেছে এবং কোনো কোনো অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন কি স্বাভাবিক সময়েও পূর্ব পাকিস্তানকে বলা যেতে পারে ক্ষুধাপীড়িত এলাকা, কেননা এখানে বার্ষিক খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ২৫ মিলিয়ন টন।

পূর্ব পাকিস্তানে বিদেশী সংবাদদাতাদের প্রবেশ পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ করে রাখাতে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ এলাকার ব্যাপক জনঅধ্যুষিত চরগুলোর কোনো সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে না। গত নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে এখানে কেবল হাজার হাজার মানুষ মারা যায় নি, ফসলেরও ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপকভাবে। সেই থেকে রিলিফের ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে চরাঞ্চলের প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ।

মার্চে ঘনীভূত রাজনৈতিক সঙ্কট এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পরবর্তী সেনা আক্রমণের ফলে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকায় খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

বিদেশী কূটনীতিক ও অন্যরা আশঙ্কা করছেন যে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বর্ষা মৌসুম শুরু হলে অবস্থা আরো সঙ্গিন হবে কেননা বৃষ্টিপাতের দরুন এসময় মূল ভূখণ্ড থেকে চরাঞ্চল প্রায় পাঁচ মাস বিচ্ছিন্ন থাকে। এছাড়াও, অনুমান করা হয়, সেখানে প্রায় ১০০,০০০ দুর্গত লোকের এখনও কোনো আশ্রয় বা বাড়িঘর জোটে নি। বর্ষাকালে তাদের অবস্থা হবে করুণ।

যুদ্ধজনিত বিপর্যয় অর্থনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত করে তুলছে। সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা গঠিত পাকবাহিনী খাদ্যগুদাম, চা বাগান ও পাটকলগুলো ধ্বংস করছে। গেরিলা কায়দা অবলম্বনকারী প্রতিরোধ-যোদ্ধারা সেনাবাহিনীর চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থা বানচাল করার জন্য উপড়ে ফেলছে রেললাইন, উড়িয়ে দিচ্ছে সেতু, কেটে ফেলছে সড়ক।

চা বাগান ও পাটকলের ম্যানেজার, যাঁদের অধিকাংশ বিদেশী, বাঙালি সহকারীদের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করছে। পেছনে ফেলে আসা হাজার হাজার চা শ্রমিকদের মজুরি দেয়ার মতো অর্থের সংস্থান নেই এবং প্রায় সব বাগানেই কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এসব বাগানের অধিকাংশই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট জেলাতে। পালিয়ে আসা ম্যানেজারদের মতে, চা শ্রমিকদের বেশির ভাগই হিন্দু এবং তারা ইতিমধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে মূলত হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে চলে যেতে শুরু করেছে। পাকবাহিনী ব্যাঙ্ক ও দোকানপাট লুট করছে বলে জানা গেছে।

 

প্রতিরোধ বাহিনীর কম্যান্ডার কর্নেল এম. এ. জি. ওসমানী পূর্ব সীমান্তে তাঁর ঘাঁটিতে বলেন, ‘পাকবাহিনীর লক্ষ্য মূলত বেসামরিক নাগরিকজন। তারা জনগণকে সন্ত্রস্ত ও ভুখা রাখতে চাইছে।’ রান্নার জন্য লবণ, তেল, কুপি-হারিকেনের জন্য কেরোসিন তেল, গ্রাম এলাকার আটাকল ও অন্যান্য ধরনের মেশিনের জন্য জ্বালানি তেল-এসবের অভাব ঘটছে।

পূর্ব পাকিস্তানের ৭৫ মিলিয়ন অধিবাসীর মূল আহার্য ভাত ও মাছ-এদিকে চালের মজুত কমে আসার সাথে সাথে অনেকে কাঁঠালকে নিত্যকার খাদ্যসামগ্রী করে নিচ্ছে। তরকারি হিসেবে খাওয়া যায় কাঁচা কাঁঠাল এবং ফল হিসেবে পাকা কাঁঠাল। পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে এর প্রচুর ফলন হয়। তবে এতোকাল বাঙালির খাদ্যতালিকায় কাঁঠালের অংশভাক্ ছিল গৌণ।

সামরিক সরবরাহ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এখন আর কোনো পণ্য চলাচল করছে না বলে নিজেদের দেশে যা কিছু পাওয়া যায় তার ওপরই বাঙালিদের নির্ভর করতে হচ্ছে। শত বছরের বন্যা, মহামারী, ঝড় ও ব্যাপক দারিদ্রের ভেতর দিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকার তৎপরতায় কুশলী হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ যদিও পশ্চিম পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ করে নি, তা সত্ত্বেও পূর্বে সঙ্ঘটিত প্রায় প্রতিটি অর্থনৈতিক বিঘ্ন পশ্চিমে প্রতিক্রিয়া ফেলবে।

পূর্ব পাকিস্তানের পাট ছিল দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার বড় যোগানদার। বৈদেশিক আয়ের বেশির ভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে-সেনাবাহিনী লালন, বড় ব্যবসায়ীদের অর্থ যোগানো ও গণপূর্ত খাতে।

 

তছনছ অর্থনীতি | নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান | সিডনি শনবার্গ

 

১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশ ভাগ করে দুই অংশে বিভক্ত এই দেশের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বহাল থাকা এমনি শোষণ সমঅধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামে ইন্ধন যুগিয়েছে, যা পরিণামে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নেয়। পূর্ব পাকিস্তানের বন্ধ পাটকলগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য জটিলতা বয়ে আনবে।

পূর্ব পাকিস্তান বরাবরই পশ্চিম পাকিস্তানে উৎপাদিত পণ্য, বিশেষত সুতিদ্রব্যের প্রধান বাজার ছিল, সেই বাণিজ্য এখন বন্ধ। এই সুতা এতো নিম্নমানের যে দুনিয়ার আর কোথাও তার বাজার নেই। পশ্চিমের বস্ত্রকলগুলোকে রক্ষা করার জন্য সরকার-নির্ধারিত উচ্চ মূল্যে পূর্ব পাকিস্তানে তা’ বিক্রি করা হতো।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সংবাদ পাঠানোর ওপর সেন্সরশিপ আরোপের ফলে সেখানকার অর্থনীতিতে কী চাপ পড়ছে, সে সম্পর্কেও বলা কঠিন। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী শক্তির বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার কতকাল যুদ্ধ করে যেতে পারবে সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এটা নির্ভর করছে মূলত নিম্নোক্ত বিষয়ের ওপর:

সরকারের ভাণ্ডারে কী পরিমাণ গোলাবারুদ মজুত রয়েছে। ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে স্বল্পকালীন সংঘর্ষের সময় গোলাবারুদের বড় রকমের মজুত না থাকাটা খুবই প্রভাব ফেলেছিল যুদ্ধের ওপর।

বিমান ও গাড়ির জন্য জ্বালানি কতোটা সরকারের রয়েছে এবং তেল কেনার জন্য কি পরিমাণ অর্থ তার হাতে বর্তমান। আমেরিকা এবং পাকিস্তানকে সাহায্যদানকারী কনসোর্টিয়ামের অন্য সদস্যদের সামরিক অভিযান বন্ধের জন্য চাপ সৃষ্টির নীতি সাহায্য স্থগিত রাখা পর্যন্ত গড়াবে কিনা। পাকিস্তানকে প্রদত্ত কেবল মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্যই বার্ষিক ১৭৫ মিলিয়ন ডলারের মতো।

পাকিস্তানকে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন সবধরনের সহায়তা দিয়ে যাবে কিনা। পাকিস্তানকে সেনা অভিযান বন্ধের জন্য পরোক্ষ হুশিয়ারি জানিয়েছে আমেরিকা, তবে, মনে হয়, কোনো কঠোর ব্যবস্থা পরিহার করে যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা চালাতে ওয়াশিংটন আগ্রহী।

Leave a Comment