আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস – যা ইতিহাসের ভূমিকা এর অন্তর্ভুক্ত।
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উৎস

প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনের উৎসগুলোকে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। এগুলো হচ্ছে (ক) সাহিত্যিক উৎস, (খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস এবং (গ) বিদেশীদের বিবরণ।
(ক) সাহিত্যিক উৎস
প্রাচীন ভারতে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ও বিভিন্ন বিষয়ে লেখা বহু গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেলেও ইতিহাস সম্পর্কে লেখা কোনো গ্রন্থ পাওয়া যায় না। প্রাচীনকালে ভারতীয় পন্ডিতগণ কেন ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেননি সে সম্পর্কে আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।
স্মিথ বলেছেন যে প্রাচীনকালে ভারতীয় পন্ডিতগণ ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, কিন্তু কীট-পতঙ্গের আক্রমণে এবং – ভূমিকম্প ও বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। কীথের মতে খ্রিস্টের জন্মের আগে ভারতে বড় ধরনের কোনো বৈদেশিক আক্রমণ না হওয়ায়, ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ না ঘটায় ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয়নি। কীথ আরো বলেছেন যে ভারতবাসীরা পরলোক ও অদৃষ্টের ওপর অধিকতর বিশ্বাসী হওয়ায় ইতিহাস রচনার মত ইহলৌকিক বিষয়ে উৎসাহ বোধ করেনি।
কিন্তু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এবং স্থাপত্য-ভাস্কর্য সৃষ্টিতে পরলোক-চিন্তা বাধা না হলে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এটা বাধা হবে কেন? আল-বেরুনী বলেছেন যে হিন্দুরা বিভিন্ন ঘটনার ঐতিহাসিক পরম্পরার প্রতি মনোযোগী ছিলেন না। প্রাচীনকালে হিন্দুদের প্রকৃত ইতিহাসবোধ আদৌ ছিল কিনা সে সম্পর্কে কোনো কোনো ঐতিহাসিক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে সে সময়ে ইতিহাস-চেতনা বা ইতিহাসের উপাদান-কোনটিরই অভাব ছিল না। অভাব ছিল বিভিন্ন তথ্যের সাহায্যে প্রকৃত সাহিত্যগুণ সম্পন্ন ইতিহাস রচনার ইচ্ছার এবং উৎসাহের।
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার জন্য আমরা সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় উপাদান খুঁজে পাই। ভারতের প্রাচীনতম সাহিত্য হল বেদ যা চার ভাগে বিভক্ত। ঋগ্বেদ রচিত হয়েছিল ১৫০০-৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। অন্য তিনটি বেদ- সাম, যজুর এবং অথর্ব বেদ ৯০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বেদগুলো থেকে আর্য জাতির ভারত-আগমন এবং তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে জানা যায় । পুরাণ এক ধরনের ইতিহাস সাহিত্য যাতে বিভিন্ন রাজবংশের উল্লেখ রয়েছে। ভারতের দুই প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ন ও মহাভারতে বহু ঐতিহাসিক উপাদান পাওয়া যায়।
রামায়ন রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর আগে, আর মহাভারতের রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে। পুরান এবং মহাকাব্য দুটিতে প্রাচীনকালের রাজাদের দীর্ঘ তালিকা আছে। বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্য থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উপাদান পাওয়া যায়। সাহিত্যের অন্যান্য শাখা, যেমন নাটক, কাব্য, এমনকি ব্যাকরণ বই থেকেও মাঝে মাঝে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য :
দীপবংশ- খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে রচিত কাব্যে শ্রীলংকার ইতিহাস, এর লেখকের নাম জানা যায় না।
মহাবংশ- মহানাম রচিত একই সময়কালের শ্রীলংকার ইতিহাস ।
পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী- খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের পূর্বে রচিত একটি ব্যাকরণ বই।
পতঞ্জলির মহাভাষ্য- এটা পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীর টীকা, রচিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে।
অর্থশাস্ত্র- রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী কৌটিল্য।
রঘুবংশ- কালিদাস রচিত এ কাব্যে সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য বিজয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কালিদাসের মালবিকাগ্নিমিত্রম এর নায়ক অগ্নিমিত্র ছিলেন শুঙ্গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা পুষ্যমিত্র শুঙ্গের পুত্র।
মুদ্রারাক্ষস- গুপ্তযুগে বিশাখদত্ত রচিত এ নাটকে রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
নীতিসার- গুপ্ত আমলে কামন্দক রচিত এ গ্রন্থের বিষয়বস্তু কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের অনুরূপ। প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনার উৎস হিসাবে বিভিন্ন সময়ে রচিত রাজাদের জীবন-চরিতগুলোর উল্লেখ করা যেতে পারে।
হর্ষচরিত- হর্ষবর্ধনের জীবনী অবলম্বনে হর্ষচরিত লিখেছিলেন বাণভট্ট। এটা সংস্কৃত ভাষায় গদ্যে লিখিত। গৌড়বাহ- খ্রিস্টিয় অষ্টম শতাব্দীতে বাকপতি এটা প্রাকৃত ভাষায় রচনা করেন। এটা কনৌজের রাজা যশোবর্মণ কর্তৃক গৌড়ের এক রাজাকে পরাজিত করার কাহিনী। বিক্রমাঙ্কদেব চরিত- এর লেখকের নাম বিল্হন। ১০৮১-৮৯ খ্রিস্টাব্দে রচিত এ গ্রন্থে চালুক্য বংশীয় রাজা ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের কীর্তিসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে।
রামচরিত- দ্ব্যর্থবোধক এ কাব্যের রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দী। এক ভাবে অর্থ করলে এটা রামায়নের কাহিনী, কিন্তু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলে এতে বাংলার পালবংশীয় রাজা রামপালের রাজত্বকালের কিছু বিবরণ পাওয়া যায়।
এ সব জীবন-চরিত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ইতিহাস রচনা করা যায়, তবে এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। রচয়িতাগণ ছিলেন সভাকবি এবং রাজার অনুগ্রহপুষ্ট। ফলে রাজাদের প্রতি দুর্বলতা থাকা এবং তাঁদের অহেতুক গুণকীর্তন করা ছিল কবিদের পক্ষে স্বাভাবিক।
প্রাচীন ভারতে রচিত একটি মাত্র গ্রন্থকে আধুনিক বিচারে বিজ্ঞান সম্মত ইতিহাস বলা যায়। বইটির নাম রাজতরঙ্গিনী, এর লেখকের নাম কল্হণ।তিনি ছিলেন কাশ্মিরের অধিবাসী এক ব্রাহ্মণ পন্ডিত । রাজতরঙ্গিনী কাশ্মিরের ইতিবৃত্ত। ১১৪৯-৫০ খ্রিস্টাব্দে এটা লেখা হয়েছিল। বইটি সংস্কৃত ভাষায় এবং পদ্যে লেখা।
(খ) প্রত্নতাত্ত্বিক উৎস
শুধুমাত্র সাহিত্যিক উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হলে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের অনেক কিছুই আমাদের অজানা থেকে যেত। কিন্তু লেখ, মুদ্রা ও স্মৃতিসৌধের মত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানগুলো প্রাচীন ভারতের ইতিহাস জানতে আমাদের সাহায্যে করে। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের বিকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিককালে। লর্ড কার্জনের শাসনামলে এ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন স্যার জন মার্শাল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও গবেষণা কর্মে প্রধানত ড. বুকানন হ্যামিল্টন, জেমস প্রিন্সেপ, স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম, জেমস বার্জেস, স্যার জন মার্শাল, স্যার মর্টিমার হুইলার -এর মত কয়েকজন ইউরোপীয় পন্ডিত অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ভারতীয়দের মধ্যে যারা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, কে. এন. দীক্ষিত, ননীগোপাল মজুমদার, ড. আহমদ হাসান দানী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
লেখ বা লিপি
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে লেখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাথর বা ধাতব বস্তুতে উৎকীর্ণ হওয়ায় এগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এগুলো পরিবর্তন করা সহজ নয়। বৃহদাকার লেখগুলো স্থানান্তরযোগ্য না হওয়ায় এগুলোতে রাজ্যের সীমানা নির্ধারণে সাহায্য করে। লেখগুলোতে সব সময় তারিখ না থাকলেও এগুলো ব্যবহৃত লিপির প্রকৃতি থেকে এগুলোর প্রায় সঠিক সময়কাল নির্ণয় করা যায়। স্মিথ এবং ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার উভয়েই নির্ভরযোগ্য উপাদান হিসাবে লেখকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বলে মনে করেন।
ভারতীয় লেখগুলোর মধ্যে অশোকের লেখগুলো প্রাচীনতম না হলেও গুরুত্বের দিক থেকে সেগুলোর স্থান প্রথম। শিলাখন্ড বা স্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ রয়েছে সম্রাটের আদেশ ও নির্দেশ যা থেকে আমরা তাঁর ব্যক্তিত্ব, চরিত্র ও কার্যাবলী সম্পর্কে জানতে পারি। উত্তর পশ্চিম এলাকায় কয়েকটি লেখে খরেষ্ঠি বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়েছে যা ডান দিক থেকে বামে লেখা হয়। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে পাওয়া অশোকের বাকী লেখগুলোতে ব্যবহৃত হয়েছে ব্রাহ্মী বর্ণমালা যা বাম দিক থেকে ডান দিকে লেখা হয়। ১৮৩৭ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা জেমস প্রিন্সেপ সর্বপ্রথম অশোকের লেখগুলোর পাঠোদ্ধার করেন।
অশোক-পরবর্তী সময়কালের লেখগুলোকে সরকারি ও ব্যক্তিগত- এ দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। সরকারি লেখগুলো সাধারণত প্রশস্তিমূলক বা ভূমিদান সম্পর্কিত। রাজকবিদের দ্বারা রচিত প্রশস্তি হচ্ছে রাজাদের গুণকীর্তন যার বিখ্যাত দৃষ্টান্ত হচ্ছে এলাহাবাদ প্রশস্তি। এর রচয়িতা ছিলেন হরিষেণ এবং এতে সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যবিজয় ও ব্যক্তিগত গুণাবলীর উল্লেখ রয়েছে। এলাহাবাদ প্রশস্তি আংশিক গদ্য ও আংশিক পদ্যে রচিত এবং এর ভাষা হচ্ছে সংস্কৃত। এ ধরনের প্রশস্তিমূলক অন্যান্য লেখের মধ্যে কলিঙ্গরাজ খরবেলের হাতিগুম্ফ লিপি, শকক্ষত্রপ রুদ্রদমনের জুনাগড় লিপি, চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর আইহোল লিপি, এবং বিজয়সেনের আমলের দেওপাড়া প্রশস্তি উল্লেখযোগ্য।
সরকারি লিপির মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে ভূমিদান সম্পর্কিত যা থেকে দান বা বিক্রির মাধ্যমে ভূমি হস্তান্তরের কথা জানা যায়। ভূমিদান সম্পর্কিত এ লেখগুলোর অধিকাংশই তামারপাতে উৎকীর্ণ বলে এগুলোকে সাধারণভাবে তাম্রশাসন বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ ধরনের কিছু কিছু লেখ কচিৎ প্রস্তর বা মন্দিরের দেওয়ালেও উৎকীর্ণ দেখা যায়।
এ লেখগুলো থেকে হস্তান্তরিত ভূমির সীমানা, দানের উদ্দেশ্য ও শর্তাবলী, জমির মূল্য, জমি মাপার একক ইত্যাদি বিষয়ে জানা যায়। অনেকগুলো তাম্রশাসনে দাতা বংশের বিবরণ এবং শাসনকারী রাজার জীবনী ও কৃতিত্বের বিবরণও থাকে যেমনটি রয়েছে ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রশাসনে । ভূমিদান সম্পর্কিত এ তাম্রশাসনগুলো অর্থনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা ছাড়াও রাজনৈতিক, ধর্মীয় ইত্যাদি অন্যান্য বিষয়েও জানতে সাহায্য করে।

প্রশস্তিমূলক লেখগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করে সেগুলো থেকে তথ্য আহরণ করা প্রয়োজন । প্রশস্তি রচয়িতাগণ রাজকবি হওয়ায় তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল রাজার গুণকীর্তণ ও তুষ্টি বিধান । ফলে জীবন-চরিতগুলোর মত প্রশস্তিগুলোতে অতিরঞ্জন বা সত্যগোপনের সম্ভাবনা থাকে ।
সরকারি লেখের সংখ্যা খুব বেশি নয়। সে তুলনায় ব্যক্তিগত বা বেসরকারি লেখের সংখ্যা অনেক। এগুলো দুই বা তিন শব্দের ছোট লিপি থেকে দীর্ঘ কবিতাও হতে পারে। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে দানের ক্ষেত্রে এ লিপিগুলো মূর্তির গায়ে বা মন্দিরের দেওয়ালে উৎকীর্ণ করা হয়ে থাকে।
