আজকে আমদের আলোচনার বিষয় বাংলার বিভক্তি ১৯৪৭
বাংলার বিভক্তি ১৯৪৭

বাংলার বিভক্তি ১৯৪৭
ঐতিহাসিক এম. এ. রহিম “বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস” গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন, “এটি বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, হিন্দু নেতাগণ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিলেন তারাই আবার ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ বিভাগের দাবি করেছিলেন। আবার যে মুসলমান নেতারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার খুশি হয়েছিলেন তারা ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন।”
প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িক সমঝোতার অভাব, ব্রিটিশ সরকারের আন্তরিকতার অভাব সর্বোপরি তৎকালীন ভারতবর্ষের দু’টি প্রধান দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতার কারণে অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্তির সাথে সাথে বাংলাও বিভক্ত হয়। এভাবে ১৯০৫ সালে বাঙালি জাতিকে বিভক্ত করা হয়, অন্যদিকে ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ ও বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিদের বিভক্ত করে।
বাংলার বিভক্তির পটভূমি
ব্রিটিশ সরকারের আগ্রহ:
বাংলা একটি সমৃদ্ধশালী প্রদেশ ছিল। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর কলকাতার রাজধানী স্থাপনের ফলে এর গুরুত্ব ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। পশ্চিমবঙ্গ সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের সময় কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর হলেও বাংলার কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে বহাল থাকে। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলের লক্ষবস্তু ছিল পশ্চিমবঙ্গকে নিজ নিজ প্রভাব বলয়ে রাখা।
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম লীগ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির প্রস্তাব দিলে এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান দাবির ব্যাপারে অনমনীয় মনোভাব গ্রহণ করলে এই দাবি প্রতিরোধের জন্য কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাগের প্রস্তাব দেন। মুসলিম লীগ তখন ভারত বিভাগের পক্ষে থাকলেও বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তির পক্ষে ছিল না।
অবশ্য ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়লাভ ও ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে শ্রমিক দলের জয়লাভ ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। শ্রমিকদল ভারতের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারে বিশ্বাসী হলেও ভারত বিভাগের বদলে অখন্ডতা বজায় রাখার পক্ষপাতী ছিল।
তবে নতুন প্রধানমন্ত্রী এ্যাটলি ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করেন। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের পক্ষে এ নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেস সেই মুহুর্তে পাকিস্তানের বিপক্ষে ছিল। অন্যদিকে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির যৌক্তিকতা এ নির্বাচনের রায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
১৯৪৬ সালের নির্বাচন:
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগ অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ ১২২টি আসনের মধ্যে ১১৭টি লাভ করেন। অন্যান্য প্রদেশগুলোতেও মুসলিম লীগ জয়ী হয়। প্রাদেশিক আইন পরিষদের মোট ৫০৭টি সদস্য আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ৪৭২টি আসন পায়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পরিষদে মুসলিম লীগ মুসলমানদের সবগুলো আসনেই জয়ী হয়।
মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনার সুপারিশ বাস্তবায়ন:
নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে ‘মন্ত্রী মিশন’ নামে একটি প্রতিনিধি দলকে ভারতে পাঠায়। ১৬ এপ্রিল জিন্নার সাথে মন্ত্রী মিশনের বৈঠকে পাকিস্তান দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, দিল্লিতে এই বৈঠকে লাহোর প্রস্তাবের উল্লেখিত ‘রাজ্যসমূহের’ বদলে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
মন্ত্রী মিশন কংগ্রেস ও লীগের সাথে বৈঠকের পর মে মাসে তাদের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। যদিও এতে ভারত বিভক্তির কথা পরিষ্কার বলা হয়নি। তবে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। মুসলিম লীগ মিশনের গ্রুপিং ব্যবস্থার মধ্যে তাদের পাকিস্তান পরিকল্পনার দাবির স্বীকৃতি ও কংগ্রেস এককেন্দ্রিক সরকার গঠনের মধ্যে ভারতের অখন্ডতার স্বপ্ন দেখেন।
মন্ত্রী মিশন কেন্দ্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্তে মুসলিম লীগ রাজি হলেও কংগ্রেস রাজি হয়নি। নিয়মানুযায়ী মুসলিম লীগকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়ার কথা থাকলেও ব্রিটিশ সরকারের পক্ষপাতমূলক নীতির কারণে তা সম্ভব হয় নি। জুন মাসে নেহেরুর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। মুসলিম লীগ এর বিরোধিতা করে।
মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ঘোষণা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা:
১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে এ সম্মেলনে মুসলিম লীগ পাকিস্তান অর্জনের জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেয়। এর ফলে রাজনৈতিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়ে। ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ দেশব্যাপী ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ ঘোষণা করলে পরিস্থিতি সাম্প্রদায়িক সংঘাতের দিকে যায়। কলকাতায় শুরু হয় দাঙ্গা। যদিও এক-চতুর্থাংশ মুসলিম অধ্যুষিত কলকাতার মুসলমানরাই বেশি ক্ষতির শিকার হয়।
দাঙ্গা ক্রমান্বয়ে পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীসহ অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা দাঙ্গার জন্য কংগ্রেস সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করে মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনলেও অনাস্থা প্রস্তাব ভোটে বাতিল হয়। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতে সাম্প্রদায়িক সংকট কেন্দ্রিক আইন শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়।
ভারত ও বাংলা বিভাগে কংগ্রেসের অতি উৎসাহী মনোভাব:
এ পরিস্থিতিতে নেহেরু ও প্যাটেল ভারত বিভাগের ব্যাপারে তাদের ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে থাকেন। ভি. পি. মেনন বলেন, ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অথবা পরের বছর জানুয়ারি মাসেই তিনি এ দুই নেতাকে ভারত বিভক্তিতে রাজি করান। এসময় সর্বপ্রথম ভারত বিভাগের সাথে কংগ্রেস বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাগের দাবিও উত্থাপন করে।
ইয়ান স্টিফেনস এ সম্পর্কে বলেন, ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এরকম দাবি করা হতে থাকে যে, যদি প্রকৃতই উপমহাদেশ বিভক্ত করা হয়, তাহলে তাদের প্রদেশও বিভাগ করতে হবে। কারণ উভয় প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য এবং বিরাট সংখ্যক অমুসলমান অধিবাসীদের স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ বছর মার্চ মাসে পাঞ্জাবের শিখরাও একই দাবি জানালে কংগ্রেসের অধিবেশনে পাঞ্জাবকে দু’ভাগ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর সাথে যুক্ত হতে থাকে বাংলা বিভক্তিও। ৪ মার্চ প্যাটেল ঘোষণা করেন, যদি মুসলিম লীগ ভারত বিভাগের দাবি ত্যাগ না করে তবে পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাগের দাবি করা হবে। এই বক্তব্য থেকেই প্রমাণিত হয় যে, কংগ্রেসের বাংলা বিভক্তির হুমকি ছিল প্রকৃতপক্ষে মুসলিম লীগকে পাকিস্তান প্রস্তাব থেকে দূরে সরিয়ে আনা।
তবে কংগ্রেসের এই মনোভাব থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, কংগ্রেস ভারত বিভাগের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ্যাটলি এ সময় ১৯৪৮ জুন মাসে ভারতের শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেন। এ উদ্দেশে লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে নতুন ও শেষ বড়লাট নিযুক্ত করা হয়।
দীর্ঘ আলোচনার জন্য কংগ্রেস ও লীগের প্রস্তাব গ্রহণ করে ভারত বিভক্তি দাবিতে রাজি হন। যদিও কংগ্রেস নতুন একটি দাবি উত্থাপন করে, তা হলো বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্তিকরণ। জিন্নাহ, সোহরাওয়ার্দী সহ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ এর বিপক্ষে ছিলেন। কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ দেন হিন্দু মহাসভা। এভাবে বর্ণ হিন্দুদের নেতৃত্বে বাংলা বিভাগ আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হতে থাকে।
মাউন্টব্যাটনের কংগ্রেসের প্রতি পক্ষাবলম্বী মনোভাব:
মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ থেকে তাঁর কাজ শুরু করেন। অচল প্রায় কেন্দ্রীয় শাসন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, আইন-শৃংখলার চরম অবনতি- এমনি পরিস্থিতিতে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রথম থেকেই তিনি কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন করেন। লিউনার্ড মাসলির মন্তব্য থেকে এ বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাসলির ভাষ্য মতে, মাউন্টব্যাটেন প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনায় বলেন, মুসলিম লীগের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চেষ্টা করে ভারতের ঐক্য ও অখন্ডতা অপেক্ষা মুসলমানদের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ ছেড়ে দেয়াই যুক্তিযুক্ত হবে। নেহেরু ও প্যাটেল মাউন্টব্যাটেনের পরামর্শ গ্রহণ করেন। তবে পাকিস্তানের দাবি দুর্বল করার জন্য পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলমান অধ্যুষিত এলাকা পৃথক করার দাবি অব্যাহত রাখেন।
জিন্নাহ কংগ্রেসের এ দাবিকে ‘চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেন। বরং তিনি সংখ্যালঘু সমস্যা সমাধানের জন্য পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানের মধ্যে লোক বিনিময়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহকে অখন্ড ভারত এবং খন্ডিত বাংলা ও পাঞ্জাব- এ দু’টির মধ্যে একটি পছন্দ করতে বলেন।
তিনি এও বলেন যদি জিন্নাহ পাকিস্তান দাবি আকড়ে ধরে থাকেন তবে এই প্রদেশদ্বয় ভাগ করা হবে। এ পর্যায়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন তাঁকে হয় অখন্ড ভারত এবং অখন্ড পাঞ্জাব ও বাংলা অথবা খন্ডিত পাঞ্জাব ও বাংলা গ্রহণ করতে হবে। জিন্নাহ এ সময় তাই দ্বিতীয় সমাধান বিবেচনা করতে থাকেন ।
বাংলা বিভাগের পক্ষে কলকাতার জনমত গঠন:
মাউন্টব্যাটেনের একপেশে ও কংগ্রেস ঘেঁষা নীতির কারণে এ সময় পশ্চিম বাংলার হিন্দুদের বড় অংশ বঙ্গ বিভাগের পক্ষে অবস্থান নেয়। ১৯৪৭ সালের মার্চ- এপ্রিল মাসে কংগ্রেস ও মহাসভার নেতৃবৃন্দ শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসে এই ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয়। পশ্চিম বাংলার কংগ্রেস নেতারা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলা হতে আলাদা হয়ে পৃথক প্রদেশের প্রস্তাব করেন।
পূর্ববাংলার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এটা মেনে নিতে রাজি হননি। আনন্দবাজার ও হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা বাংলা বিভাগের পক্ষে ছিল। এপ্রিলে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কার্যনির্বাহক কমিটির বৈঠকেও বাংলা বিভাগ প্রস্তাব গৃহীত হয়।
অখন্ড বাংলা আন্দোলনের ব্যর্থতা:
তবে বাংলা বিভাগের বিপক্ষে ছিল মুসলিম লীগ ও শরৎ বসুর নেতৃত্বে কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য। মূলত মার্চ-এপ্রিলে যুক্ত বাংলার পক্ষে আন্দোলন গড়ে ওঠে। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের এ আন্দোলনে প্রথমে কেন্দ্রীয় লীগও সমর্থন দেয়। সোহরাওয়ার্দী এপ্রিলে দিল্লিতে এক বক্তৃতায় স্বাধীন অখন্ড বাংলার প্রস্তাব দেন যা শরৎ বসু সমর্থন করেন।
তাঁরা উভয়ে এ লক্ষে ২০ মে বৈঠক শেষে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন যা সোহরাওয়ার্দী-বসু চুক্তি নামে পরিচিত। কিন্তু কংগ্রেস এ পরিকল্পনা ও চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে। কেন্দ্রীয় লীগের অধিকাংশ সদস্য এর বিরোধিতা করে। এমনকি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি আকরাম খাঁ এ প্রস্তাব সমর্থন করেননি। বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ও কেন্দ্রীয় লীগ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে এ ব্যাপারটি বেশি দূর অগ্রসর হয়নি।
১৯৪৭ সালে বাংলার সীমানা নির্ধারণ
জুন মাসে বাংলার সীমানা নির্ধারণের জন্য কমিশন গঠিত হয়। মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনার পর কমিশনের চেয়ারম্যান স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ বাংলার সীমানা ঘোষণা করেন। এ ঘোষণায় কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। নদীয়া মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬১% মুসলমান) জেলা হওয়া সত্ত্বেও এর দুই- তৃতীয়াংশ এলাকা পশ্চিমবাংলাকে দেয়া হয়।
সম্পূর্ণ মুর্শিদাবাদ জেলা (৫৬.৬% মুসলমান) পশ্চিমবাংলায় যায়। মালদহ (৫৭% মুসলমান) জেলার নবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, নাচোল, গোমস্তাপুর এবং ভোলাহাট এই পাঁচটি থানা পূর্ববাংলায় দেয়া হয়। যশোর জেলার বনগাঁও (৫৩% মুসলমান) ও নৌহাটা পশ্চিমবঙ্গভুক্ত হয়। খুলনা (৪৯.৩৬% মুসলমান) পূর্ববাংলাকে দেয়া হয়।
মুসলমান অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া প্রভৃতি এলাকা ভারতকে প্রদানের ক্ষতিপূরণ স্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ববাংলাকে দেয়া হয়। সিলেট জেলার বড় অংশ রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পূর্ববাংলা পায়। বাংলার সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নবগঠিত পূর্ববাংলা অবিভক্ত বাংলার মোট ৬৩.৮% এলাকা এবং জনসংখ্যার ৬৪.৮৬% লাভ করে ।
ফলাফল
বাংলা বিভাগের বিরুদ্ধে বাংলার মুসলমান নেতাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাঁরা বাংলা অখন্ডতা বজায় রাখতে চেয়েছেন। যদিও মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে জিন্নাহর আগ্রহে শেষপর্যন্ত বাঙালি নেতারা বাংলা বিভাগে রাজি হন। সোহরাওয়ার্দী তাঁর অখন্ড বাংলা প্রস্তাব থেকেও সরে আসতে বাধ্য হন। তবে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লীগ নেতারা পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি বা বাংলা বিভাগ চেয়েছিল সে আশা পূর্ণ হয়নি।
ভারত বিভাগে মাউন্টব্যাটন যেমন কংগ্রেসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছেন, তেমনি বাংলা বিভাগের সিদ্ধান্তের পর গঠিত সীমানা কমিশনের চেয়ারম্যান র্যাডক্লিফ কংগ্রেসের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেন। ইতোমধ্যে ২২ জুলাই কমিশনের এক সভায় লীগ ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের উত্থাপিত একটি প্রস্তাব পাস করিয়ে নেন যাতে বলা হয় তাঁর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে এবং কোনো সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।
কমিশনের সদস্যদের কোন ক্ষমতাই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে তাঁর ইচ্ছে মতো সীমানা নির্ধারণ করায় বাংলা বিভাগ বহু সমস্যার সৃষ্টি করে। অনেক মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হিন্দু প্রধান ভারতের অধীনে যায়। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, নদীয়া জেলায় মুসলমানরা ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে আনন্দ উৎসব করে। অথচ পরেরদিন তারা জানতে পারে তারা ভারতের অধীনে গিয়েছে।
ড. মো: মাহবুবর রহমান যথার্থই বলেছেন, “সরেজমিনে তদন্ত না করে দিল্লির অফিসকক্ষে বসে মানচিত্রের ওপর সীমানা চিহ্নিত করায় সীমানা কোনো ক্ষেত্রে একটি গ্রামকে দ্বিখন্ডিত করে। কোথাও তা বাড়ির আঙিনার মাঝখান দিয়ে যায়। কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় কারো ঘরের দরজা পড়েছে পাকিস্তানে আর জানালা পড়েছে ভারতে।”
যদিও এই অসম সীমানা সাময়িক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। অবশ্য দেশত্যাগ, সম্পদ বন্টন ইত্যাদি স্বার্থের আবর্তে তা চাপা পড়ে যায়। বাংলার মানুষ নতুন করে জীবন শুরু করে। কিন্তু পূর্ববাংলা আবারো পাকিস্তানি শোষণের শিকার হয়, আবারো পরাধীন হয়। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ পরাধীনতার অবসান ঘটায় বাঙালি জাতি।
সারসংক্ষেপ
মূলত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতার কারণে ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্তি হয়। দুই বঙ্গের বাঙালি নেতৃবৃন্দের যুক্ত বাংলা গঠনের উদ্যোগ এতে ব্যর্থ হয়। পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কিছু এলাকা ভারতের অধীনে যাওয়ায় সম্পদশালী এলাকা যেমন দিল্লির শোষণের শিকার হয়, তেমনি পূর্ববাংলা পাকিস্তানি শোষণের শিকার হয়। পূর্ববাংলার জনগণ স্বাধীনতার মাধ্যমে বাংলা বিভাগ যে অযৌক্তিক ছিল তা প্রকাশ করে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
১। ড. মো: মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস (১৯৪৭-৭১), ঢাকা, সময় প্রকাশন, ১৯৯৯।
২। এম. এ. রহিম, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস (১৮৫৭-১৯৪৭), ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, ২০০২।
৩। আবু আল সাঈদ, সাতচল্লিশের অখন্ড বাংলা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, ঢাকা, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৯।
8 | Joya Chatterji, Bengal Devided, Cambridge, Cambridge University Press, 1995.
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নঃ
১। ১৯৪৭ সালের আগস্টের বাংলার নতুন সীমানার বর্ণনা দিন।
২। বাংলা বিভক্তির ফলাফল লিখুন।
রচনামূলক প্রশ্নঃ
১। ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্তির পটভূমি আলোচনা করুন। বাংলা বিভক্তির ফলাফল বর্ণনা করুন।
