বাংলায় সেন শাসন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় বাংলায় সেন শাসন – যা বাংলায় বংশানুক্রমিক শাসন এর অন্তর্ভুক্ত।

বাংলায় সেন শাসন

 

বাংলায় সেন শাসন

 

একাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় ‘সেন বংশ’ নামক এক নতুন রাজবংশের উদ্ভব ঘটে। উত্তর বাংলায় সামন্তচক্রের বিদ্রোহের সময় পাল সাম্রাজ্যে দুর্বলতার সুযোগে এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয়সেন ধীরে ধীরে নিজ ক্ষমতা প্রসারিত করেন। পাল সম্রাট মদনপালের রাজত্বকালে সেন রাজবংশ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়। পশ্চিম ও উত্তর বাংলা হতে পাল শাসন এবং দক্ষিণ পূর্ব বাংলা হতে বর্ম শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেনরা প্রায় সমগ্র বাংলায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। তাঁদের শাসনাধীনেই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলায় একক স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিক দিয়ে বাংলার ইতিহাসে সেন শাসনের গুরুত্ব রয়েছে।

সেন বংশের আদি পরিচয়

সেন রাজাদের পূর্বপুরুষ দাক্ষিণাত্যের অন্তর্গত কর্ণাট দেশের (মহারাষ্ট্র ও হায়দ্রাবাদ অঞ্চলের দক্ষিণ ও মহীশূর রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিম ভাগ) অধিবাসী ছিলেন। সেন রাজাদের লিপি হতে জানা যায়, তাঁরা চন্দ্রবংশীয় ও ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় ছিলেন। সেনরা কোন সময়ে এবং কিভাবে বাংলায় আগমন করেন সে বিষয়ে সঠিক কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলেও সেন লিপিমালার ভিত্তিতে কিছুটা ধারণা করা যায়। সেনদের আগমন কাল সম্বন্ধে বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপি থেকে জানা যায় যে, সামন্ত সেন রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত যুদ্ধাভিযান করে এবং দুর্বৃত্ত কর্ণাটলক্ষ্মী লুণ্ঠনকারী শত্রুদেরকে ধ্বংস করে শেষ বয়সে গঙ্গাতটে পূণ্যাশ্রমে জীবনযাপন করেছিলেন।

এ থেকে অনুমিত হয় যে, সামন্তসেনই প্রথমে কর্ণাটে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন এবং শেষজীবনে বাংলায় এসে গঙ্গাতীরে বাস করেন। বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে বলা হয়েছে চন্দ্রবংশজাত অনেক রাজপুত্র রাঢ়দেশের অলংকার স্বরূপ ছিলেন এবং তাদের বংশে সামন্তসেনের জন্ম হয় এবং সামন্তসেনের পূর্বেই কোন এক পূর্বপুরুষ রাঢ়দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। দেওপাড়া লিপি ও নৈহাটি তাম্রশাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধন করে বলা যায় যে, কর্ণাটের এক সেন বংশ বহুদিন ধরে রাঢ় অঞ্চলে বাস করেছিল। এই বংশের সামন্তসেন কর্ণাটে বীরত্ব প্রদর্শন করে শেষ বয়সে রাঢ়ে এসে জীবনযাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁরই বংশধর বাংলায় রাজক্ষমতা অধিকার করেন।

সেন বংশ কিভাবে সুদূর কর্ণাট হতে এসে বাংলায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, তার সঠিক জবাব সেন লিপিমালায় পাওয়া যায় না। তবে এ বিষয়ে আনুমানিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা যায়। সেন বংশ সুদূর কর্ণাট হতে এসে বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মনে হয় না। বরং এমন মনে করাই স্বাভাবিক যে, কর্ণাট দেশীয় সেনবংশ কোন এক সময়ে সম্ভবত সামন্তসেনের সময় বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং ধীরে ধীরে ক্ষমতা অর্জন করে প্রথমে সামন্তরাজা ও পরে সার্বভৌম স্বাধীন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

এই প্রেক্ষাপটে সেনবংশের আগমন সম্বন্ধে দুটি গ্রহণযোগ্য সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা যায়। প্রথমত, পাল রাজাদের সৈন্যদলে বিভিন্ন অঞ্চলের লোক ছিল। পাল তাম্রশাসনে প্রাপ্ত কর্মচারী তালিকায় নিয়মিতভাবে ‘গৌড়-মালব-খশ-হুন-কুলিক-কর্ণাট-লাট-চাট-ভাট’ পদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে মনে হয় যে, কর্ণাটবাসীও পাল সৈন্যদলে ছিল। সৈন্যদলেরই একজন সেনবংশীয় কর্মচারী শক্তি সঞ্চয় করে পশ্চিম বাংলায় এক রাজ্যাধিপতি হন এবং পরবর্তীতে পাল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে স্বীয় আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, কর্ণাটের চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য ১০৪২ ও ১০৭৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে একাধিকবার উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলা আক্রমণ করেন।

এ সময় সেন রাজবংশের পূর্বপুরুষ কোন আক্রমণকারী সৈন্যদলের সাথে দাক্ষিণাত্য হতে বাংলায় এসে বসতি স্থাপন করেন। পরে এদেরই কেউ স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বল্লালসেনের সাথে চালুক্য রাজকন্যা রামদেবীর বিবাহ সেনবংশের সাথে চালুক্যদের সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে। এখানে উল্লেখিত দুটি সম্ভাবনাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। যদিও সেন লিপিতে এ বিষয়ে কোন আভাস না থাকায় কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব নয়।

সামন্তসেনের পূর্বে সেনবংশের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। সামন্তসেনই এই বংশের প্রথম ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কর্ণাটদেশে যুদ্ধে যশোলাভ এবং বৃদ্ধ বয়সে গঙ্গাতীরে বাস ব্যতিত আর বিশেষ কিছু জানা যায় না। সামন্তসেনের পুত্র হেমন্তসেন। হেমন্তসেনকে বিজয়সেনের লিপিতে ‘মহারাজাধিরাজ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এই উপাধি হতে ধারণা করা হয়, হেমন্তসেনই সেনবংশের প্রথম রাজা। তবে তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বলে মনে হয় না। কারণ বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রলিপিতে তাঁকে ‘রাজরক্ষা সুদক্ষ’ বলে উল্লেখ করা হয়। এ থেকে মনে হয় তিনি পাল সাম্রাজ্যের রাঢ় অঞ্চলে সামন্তরাজা ছিলেন এবং অধিরাজের সাম্রাজ্য রক্ষায় দক্ষতা প্রদর্শন করেন।

বিজয় সেন

হেমন্তসেনের পুত্র বিজয়সেন সামন্তরাজা হতে নিজেকে স্বাধীন রাজারূপে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং স্ববংশীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় সফল হন।বিজয়সেনের একটি তাম্রশাসন ও একটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। তাম্রশাসনটি তাঁর ৬২ রাজ্যাঙ্কে লিখিত বলে সাধারণভাবে গৃহীত। সে অনুযায়ী বিজয়সেনের রাজত্বকাল ধরা হয় ১০৯৮ হতে ১১৬০ খ্রি: পর্যন্ত ।

পালরাজা রামপালের রাজত্বকালে বিজয়সেন খুব সম্ভবত রাঢ় অঞ্চলে প্রথমে সামন্ত রাজা হয়েছিলেন। পরে ক্ষুদ্র ভূ-খন্ডের অধিপতি হন।যে সকল সামন্তরাজা রামপালকে বরেন্দ্র উদ্ধারে সাহায্য করেছিলেন নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ ছিলেন তাঁদেরই একজন। এই বিজয়রাজই সেনরাজা বিজয়সেন, সে ধরনের ইঙ্গিত রয়েছে কবি উমাপতি বিরচিত দেওপাড়া প্রশস্তির ঊনবিংশ শ্লোকে। সেখানে বলা হয়েছে, বিজয়সেন দিব্যভূমি বিপক্ষ দলীয় নরপতিকে দান করেছিলেন এবং প্রতিদানস্বরূপ বিপুল অধিকার লাভ করেছিলেন। শ্লোকে ব্যবহৃত ‘দিব্যভূব’ দিব্য কর্তৃক শাসিত ভূমি অর্থাৎ বরেন্দ্রকে বোঝাতে পারে।

এরূপ অর্থে শ্লোকের ব্যাখ্যা দাঁড়ায় যে, বরেন্দ্র উদ্ধারে বিজয়সেন পাল রাজাকে সাহায্য করেছিলেন এবং প্রতিদানে তিনি রাঢ়ে স্বাধীন ক্ষমতা লাভ করেছিলেন।শ্লোকে পাল রাজাকে বিপক্ষ দলীয় বলার কারণ হয়তো এই যে, পরবর্তীকালে তাঁদেরকে পরাস্ত করে বিজয়সেন গৌড় ও উত্তরবঙ্গ অধিকার করেছিলেন। দেওপাড়া শিলালিপিতে গৌড়ের বিরুদ্ধে বিজয়সেনের সাফল্যের কথা উল্লেখ আছে।

বরেন্দ্র উদ্ধারে রামপালকে সাহায্য করার পরিবর্তে বিজয়সেন স্বীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন এমন মনে করাও অযৌক্তিক নয়। কারণ রামচরিতে উল্লেখ আছে যে, রামপাল বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও উপঢৌকনের বিনিময়ে সামন্তদের সাহায্য লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। সুতরাং দেওপাড়া প্রশস্তির শ্লোকের ওপর ভিত্তি করে বিজয়সেনের ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রথম পর্যায় সম্বন্ধে অনুমান করা যায় যে, তিনি রাঢ়ের সামন্তরাজা ছিলেন, রামপালকে বরেন্দ্র উদ্ধারে সাহায্যের বিনিময়ে তিনি স্বীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি পান এবং পরবর্তীতে ক্ষমতা সম্প্রসারণ করে সমগ্র বাংলায় স্বীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজয়সেন কর্তৃক স্বীয় ক্ষমতার ক্রমোন্নতির কোন ধারাবাহিক বিবরণ নেই। মনে হয় শূরবংশীয় রাজকন্যা বিলাসদেবীর সাথে বিয়ে তাঁর ক্ষমতা সম্প্রসারণে সাহায্য করেছিল। এই বিয়ের কথা তাঁর ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে। বিজয়সেন উড়িষ্যারাজ অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গেরও সাহায্য লাভ করে থাকতে পারেন। বল্লাল চরিত গ্রন্থে বিজয়সেনকে ‘চোড়গঙ্গসখা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

কবি উমাপতিধর রচিত দেওপাড়া শিলিলিপিতে বিজয়সেনের ক্ষমতা সম্প্রসারণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, নান্য, বীর, রাঘব ও বর্ধন নামক রাজাগণ তাঁর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন। তিনি কামরূপরাজকে দূরীভূত, কলিঙ্গরাজকে পরাজিত ও গৌড়রাজকে দ্রুত পলায়নে বাধ্য করেন এবং গঙ্গার স্রোত ধরে এক ‘পাশ্চাত্যচক্রের’ বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান প্রেরণ করেন।কিন্তু উমাপতিধর ধারাবাহিকতা বজায় না রাখায় বিভিন্ন দিকে বিজয়সেনের অভিযান কোনটির পর কোনটি সংঘটিত হয়েছিল তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তবে সম্ভাব্য ঘটনাক্রম সম্বন্ধে অনুমান করা যায়।

খুব সম্ভবত নিড়োলে সামন্তরাজা হিসেবে বিজয়সেনের উত্থান শুরু। উত্তর বাংলায় সামন্তবিদ্রোহের সুযোগে তিনি নিজশক্তি বৃদ্ধি করেন। কৈবর্তদের বিরুদ্ধে রামপালের সাফল্য কিছুদিনের জন্য তাঁর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার অভিযান স্থগিত রাখতে বাধ্য করে এবং তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। ইতোমধ্যে শূর পরিবারে তাঁর বিয়ে রাঢ় অঞ্চলে তাঁর ক্ষমতা দৃঢ় করতে সাহায্য করে। রামপালের দুই দুর্বল উত্তরাধিকারীর রাজত্বকালে অন্যান্য সামন্তরাজাদের ক্ষমতা খর্ব করে নিজ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। বীর (কোটাটবীর রাজ বীরগুণ) ও বর্ধন (কৌশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধন কিংবা মদনপাল কর্তৃক পরাজিত গোবর্ধন) প্রমুখের বিরুদ্ধে বিজয়সেনের সাফল্য এই পর্যায়ের।

রাঘব ও কলিঙ্গরাজ সম্ভবত একই ব্যক্তি। রাঘব ছিলেন উড়িষ্যারাজ চোড়গঙ্গের পুত্র। তিনি ১১৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। সুতরাং বিজয়সেনের রাজত্বের শেষদিকে রাঘবের সাথে তাঁর সংঘর্ষ হতে পারে। বিজয়সেন কর্তৃক বাংলায় ক্ষমতা বিস্তারের পর পার্শ্ববর্তী রাজ্য উড়িষ্যার বিরুদ্ধে অভিযান খুবই স্বাভাবিক।

মিথিলার রাজা নান্যদেবের বিরুদ্ধে বিজয়সেনের যুদ্ধ ১১৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগেই সংঘটিত হয়েছিল। কারণ, ১১৪৭ খ্রি: ছিল নান্যদেবের রাজত্বের শেষ বছর। সুতরাং মনে করা হয়, নান্যদেব ১০৯৭ খ্রি: উত্তর বিহারে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে হয়তো বাংলা অভিমুখে যাত্রা করেন এবং বিজয়সেনের সাথে তাঁর সংঘর্ষ বাঁধে। প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সাফল্য তাঁর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করে।

দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিকালে বিজয়সেন প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বর্মরাজ বংশের ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে তিনি সেখানে সেন প্রভুত্ব বিস্তার করেন। সম্ভবত একই সময়ে উত্তর বাংলা হতে পাল শাসনেরও অবসান ঘটে এবং সমগ্র বাংলায় সেন শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজয়সেন যে গৌড়রাজকে দ্রুত পালাতে বাধ্য করেন তিনি যে পালরাজা মদনপাল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। মদনপালের অষ্টম রাজ্যাঙ্ক পর্যন্ত অর্থাৎ ১১৫২-৫৩ খ্রি: পর্যন্ত উত্তর বাংলায় পাল আধিপত্যের প্রমাণ মনহলি তাম্রশাসন হতে পাওয়া যায়।

সুতরাং এই সময়ের পরেই বিজয়সেন পাল সাম্রাজ্যের ওপর আঘাত হানেন এবং স্বীয় প্রভুত্ব বিস্তার করেন। রাজশাহীর সাত মাইল পশ্চিমে দেওপাড়া নামক স্থানে বিজয়সেনের প্রাপ্ত লিপি হতে জানা যায় তিনি ঐ স্থানে প্রদ্যুশ্বের শিবের এক বিরাট মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সুতরাং এই লিপি প্রমাণ করে যে, বরেন্দ্রে বিজয়সেনের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

রামচরিত গ্রন্থে মদনপাল কর্তৃক আক্রমণকারী সৈন্যদলকে কালিন্দী পর্যন্ত হটিয়ে দেবার যে উল্লেখ আছে তাতে সম্ভবত বিজয়সেনের আক্রমণের কথাই বলা হয়েছে। মদনপাল প্রাথমিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করলেও মদনপালের অষ্টম রাজ্যাঙ্কের পর উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাল লিপির অনুপস্থিতি বিজয়সেন কর্তৃক এই অঞ্চলে প্রভুত্ব বিস্তারের কথাই প্রমাণ করে।

পাল শক্তির বিরুদ্ধে সাফল্যের পর বিজয়সেন গঙ্গাস্রোত ধরে কোন এক পাশ্চাত্য শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়াভিযান প্রেরণ করা খুব অস্বাভাবিক নয়। সম্ভবত গাহড়বাল রাজই এই পাশ্চাত্য শক্তি । কারণ সে সময় গাহড়বাল শক্তিই বিহার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। তবে এই নৌ-অভিযানে বিজয়সেনের সাফল্য সম্বন্ধে কোন ধারণা পাওয়া যায় না ।

বিক্রমপুর হতে প্রকাশিত বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসন হতে প্রমাণিত হয় যে, চন্দ্র ও বর্ম রাজবংশের রাজধানী বিক্রমপুর সেন রাজ্যের রাজধানী হয়েছিল। একাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ হতে দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বর্মরাজাদের শাসন বজায় ছিল।বিজয়সেন বর্মরাজাদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই অঞ্চলে সেন প্রভূত্ব বিস্তার করেন।

বিজয়সেন কর্তৃক উল্লেখিত অভিযানসমূহ সেন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার পর ক্ষমতা সম্প্রসারণের চেষ্টারই অভিব্যক্তি।তাঁর সাফল্যের বিবরণ হতে দেখা যায়, বহুযুদ্ধে তিনি জয়লাভ করে প্রায় সমগ্র বাংলায় এক অখন্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। বিজয়সেন কর্তৃক পাল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে সমগ্র বাংলায় স্ব-বংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠা বাংলার ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সেন বংশের অধীনেই সর্বপ্রথম বাংলা দীর্ঘকালব্যাপী একাধিপত্যে ছিল।

এই আধিপত্যের ফল বাংলার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়, সে কারণেই সেন যুগের এত গুরুত্ব। বিজয়সেন পরম মহেশ্বর, পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন এবং “অরিরাজ বৃষভ শঙ্কর’ গৌরবসূচক নামেও পরিচিত ছিলেন। দেওপাড়া প্রশস্তিতে বিজয়সেন কর্তৃক অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞের উল্লেখ রয়েছে।

এসব যাগযজ্ঞ হতে অনুমান করা হয়, বৈদিক ধর্মের প্রতি তিনি বিশেষ শ্রদ্ধাবান ছিলেন। ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর অনুগ্রহে ব্রাহ্মণগণ বিত্তশালী ও ধনবান হয়ে উঠেছিল। তাই বিজয়সেন কর্তৃক উদ্বুদ্ধ হয়ে কবি শ্রী হর্ষ তাঁর বিজয় প্রশস্তি ও গৌড়বীর্শকূল-প্রশস্তি রচনা করেছিলেন, এরূপ মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।সুতরাং একদিকে বিজয়সেন যেমন সমরাঙ্গনে সাফল্য অর্জন করে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তেমনি অন্যদিকে ধর্মকর্মের দিকেও তিনি যত্নবান ছিলেন। তাই বাংলায় সেন রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিজয়সেন স্মরণীয় হয়ে আছেন।

বল্লালসেন

বিজয়সেনের পর তাঁর পুত্র বল্লালসেন সিংহাসনে আরোহণ করেন। নৈহাটিতে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন, ভাগলপুর জেলার কহলগ্রাম হতে ১১ মাইল দূরে সনোখার গ্রামে প্রাপ্ত একটি মূর্তিলিপি, বল্লালসেন রচিত ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভূতসাগর’ নামক দুটি গ্রন্থ এবং আনন্দভট্ট রচিত ‘বল্লালচরিত’ গ্রন্থ হতে বল্লালসেনের রাজত্বকালের ইতিহাস জানা যায়। বল্লালচরিত সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এর মধ্যে সমসাময়িককালের বিশেষ করে সামাজিক ইতিহাসের কিছু তথ্য অন্তর্নিহিত আছে। তথাপি পরবর্তীকালে সংকলিত যে কোন গ্রন্থের মতই বল্লালচরিতের তথ্যকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করা হয়।

নৈহাটি তাম্রশাসনে বল্লালসেনের কৃতিত্ব সম্বন্ধে তেমন কোন বিবরণ নেই। তবে সনোখারে প্রাপ্ত মূর্তিলিপি বল্লালসেন কর্তৃক পূর্ব মগধ অঞ্চল জয়ের কথা ঘোষণা করে। মদনপালের পর গোবিন্দপাল মগধের রাজা হন। সম্ভবত তাঁকে পরাজিত করে বল্লালসেন পূর্বাঞ্চল (ভাগলপুর জেলা) অধিকার করেন। গৌড়ের ওপর গোবিন্দপালের কোন অধিকার না থাকলেও তিনি “গৌড়েশ্বর” উপাধি ধারণ করতেন।

“অদ্ভূতসাগর” গ্রন্থে গৌড়রাজ্যের সাথে বল্লালসেনের যে যুদ্ধের উল্লেখ আছে তা নিঃসন্দেহে গোবিন্দপালের বিরুদ্ধে মগধের পূর্বাঞ্চল অধিকারের যুদ্ধ। এই গ্রন্থে আরো বলা হয়, পিতার জীবদ্দশায় বল্লালসেন মিথিলা জয় করেন। তবে মিথিলা সেন সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নান্যদেবের উত্তরাধিকারীগণ মিথিলায় রাজত্ব করেন এরূপ প্রমাণ পাওয়া যায়। কয়েক শতাব্দীকাল পরে সংকলিত জনপ্রবাদ আছে, মিথিলা বল্লালসেনের রাজ্যের পাঁচটি প্রদেশের একটি ছিল, এটি সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তাছাড়া উত্তর বিহারে প্রচলিত ‘লক্ষণ-সম্বৎ’ এর সাথে বাংলার সেনবংশের কোন সম্বন্ধ ছিল কিনা তা আজও প্রমাণের অপেক্ষায় আছে। কারণ লক্ষণ সম্বৎ’ যদি সেনরাজা লক্ষণসেনের নামের সাথে জড়িত হয়ে থাকে তাহলে বাংলার কোন জায়গায় কিংবা সেনরাজাদের বিশেষ করে লক্ষণসেন ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের সরকারি দলিলে এই ‘সম্বৎ’ এর ব্যবহার থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেন দলিলে সবক্ষেত্রেই রাজ্যাঙ্কের প্রচলন। সুতরাং ‘লক্ষণ-সম্বৎ’ এর প্রচলনের ভিত্তিতে বলা যায় না যে মিথিলা সেন রাজ্যভুক্ত হয়েছিল।

বল্লালসেনকে প্রচলিত কুলীন প্রথার প্রবর্তক মনে করা হয়।তবে ইদানিংকালের গবেষণার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করা হয় যে, কুলীন প্রথার সাথে বল্লালসেনের সম্পর্কের কোন যুক্তিযুক্ত ভিত্তি নেই । অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় কুলীন প্রথার বহুল প্রচলন দেখা দেয়। এই প্রথার উদ্যোক্তা ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় নিজেদের দাবীকে জোরদার করতে একে ঐতিহাসিক ভিত্তি দেয়ার চেষ্টা করেন। ফলে বিগত হিন্দু শাসনকালে অর্থাৎ সেনযুগে কুলীন প্রথার উৎপত্তি হয়েছিল, এ ধরনের মতবাদ প্রচার করেন। যদি এই প্ৰথা সেনযুগে প্রবর্তিত হতো তাহলে সে যুগের সাহিত্য ও লিপিমালায় এর উল্লেখ থাকা স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু ভবদেব ভট্ট, হলায়ুধ মিশ্র, অনিরুদ্ধ প্রমুখ সেনযুগের পন্ডিতগণ বহু বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করলেও কুলীন প্ৰথা সম্বন্ধে কোন গ্রন্থ রচনা করেননি। এমনকি এ বিষয়ে কোন উক্তিও তাঁদের লেখনিতে নেই। সুতরাং কুলীন প্রথার সাথে বল্লালসেনকে সম্পর্কিত করার কোন ভিত্তি নেই বললেই চলে। বাংলার সামাজিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এ ধরনের একটি কল্পিত উপকথার প্রচার করেছে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়।

বল্লালসেন বিদ্বান পন্ডিত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। প্রশস্তিকার তাঁকে ‘বিদ্বানমন্ডলীর চক্রবর্তী বলে উল্লেখ করেন। বল্লালসেন কর্তৃক রচিত দুটি গ্রন্থ প্রশস্তিকারের এই উক্তির সত্যতা প্রমাণ করে। ১১৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি দানসাগর রচনা সমাপ্ত করেন। এবং ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে অদ্ভূতসাগর গ্রন্থ রচনা শুরু করেন। কিন্তু সেই গ্রন্থ সমাপ্ত করেন তাঁর পুত্র লক্ষণসেন। দানসাগরের উপসংহার হতে জানা যায়, গুরু অনিরুদ্ধের কাছে বল্লালসেন বেদস্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন।

বল্লালসেন শৈব ছিলেন। তিনি অন্যান্য উপাধির পাশাপাশি “অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর” উপাধি গ্রহণ করেন। অদ্ভূতসাগরের একটি শ্লোকে বল্লালসেনের মৃত্যুর বিবরণ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষনসেনের হাতে রাজ্যভার হস্তান্তর করে বল্লালসেন সস্ত্রীক ত্রিবেণীর কাছে গঙ্গাতীরে বাণপ্রস্থ অবলম্বন করে শেষ জীবন কাটান । বল্লালসেন তাঁর ১৮ বছর (আনু: ১১৬০-১১৭৮ খ্রি:) রাজত্বকালে পিতৃরাজ্য অক্ষুন্ন রাখেন এবং সেনরাজ্য মগধে সম্প্রসারিত করেন। তবে জ্ঞানী ও পন্ডিত হিসেবেই তাঁর খ্যাতি অধিক। এই খ্যাতি বাংলায় তাঁর নাম চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

লক্ষণসেন

বল্লালসেনের পর তাঁর পুত্র লক্ষণসেন পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন। লক্ষণসেনের রাজত্বে প্রকাশিত ৮টি তাম্রশাসন, তার সভাকবিগণ কর্তৃক রচিত কয়েকটি স্তুতিবাচক শ্লোক, তাঁর পুত্রদ্বয়ের তাম্রশাসন ও ঐতিহাসিক মিনহাজুদ্দিন বিরচিত “তাবাকাত-ই-নাসিরি” নামক গ্রন্থ হতে তাঁর রাজত্বকাল সম্পর্কে জানা যায়।

মাধাইনগর তাম্রশাসন ও ভাওয়াল তাম্রশাসন ব্যতিত অন্য তাম্রশাসনগুলো তাঁর রাজত্বের ৬ষ্ঠ বছরের মধ্যে উৎকীর্ণ। এগুলোতে লক্ষণসেন সম্বন্ধে সাধারণভাবে প্রশংসাসূচক শ্লোক রয়েছে। তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে সঠিক বর্ণনা নেই। তবে মাধাইনগর ও ভাওয়াল তাম্রশাসনে তাঁর কৃতিত্বের অতি স্তুতিবাচক বর্ণনা পাওয়া যায়।

এখানে বলা হয়েছে, তিনি কৌমারে উদ্ধত গৌড়েশ্বরের শ্রীহরণ ও যৌবনে কলিঙ্গদেশ অভিযান করেন। তিনি যুদ্ধে কাশীরাজকে পরাজিত করেন এবং ভীরু প্রাগজ্যোতিষের (কামরূপ ও আসাম) রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন । মাধাইনগর তাম্রশাসনে লক্ষণসেনকে অতি উচ্চ সম্মানসূচক উপাধি ‘বীর চক্রবর্তী সার্বভৌম বিজয়ী’ দেয়া হয়েছে।

 

বাংলায় সেন শাসন

 

সারসংক্ষেপ

সেনদের শাসনাধীনে বাংলা সর্বপ্রথম একক স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজয়সেন হলেন এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। উমাপতি ধরের দেওপাড়া প্রশস্তির আলোকে বিজয়সেনের গৌরবগাঁথা বিস্তারিত জানা যায়। বিজয়সেনের পর বল্লালসেন ও লক্ষণসেন রাজত্ব করেন।

বল্লালসেনকে কুলীন প্রথার প্রবর্তক মনে করা হয়, যদিও এর কোন যুক্তিযুক্ত ভিত্তি নেই। তিনি একজন পন্ডিত হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। লক্ষণসেনের আমলে মুসলিম আক্রমণে সেন শাসনের অবসান ঘটে। ক্রমাগত বৈদেশিক আক্রমণেও সেনদের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বখতিয়ার খলজীর নদীয়া আক্রমণের পর লক্ষণসেন দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় পালিয়ে যান। সুপন্ডিত এবং কবি হিসেবে লক্ষণসেন বিখ্যাত ছিলেন।

Leave a Comment