আওয়ামী লীগের বিপর্যয়

আজকের আলোচনার বিযয় আওয়ামী লীগের বিপর্যয় – যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত। আওয়ামী লীগ তার শুরু থেকেই নানা রকম বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। আন্দোলন সংগ্রামের বন্ধুর পথের পাশাপাশি ছিল আভ্যন্তরীণ ভাঙ্গন, ষড়যন্ত্র সহ নানা বিষয়। এই পর্বে সেই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের বিপর্যয়

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ লোগো, Bangladesh Awami League Logo 1

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-১

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-১

আগের অধ্যায়ের রূপরেখা থেকে পরিষ্কার যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের হাতেখড়ি হয়েছিল এক প্রাদেশিক বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে।

পরে এ সংগঠন এক জাতীয় বিরোধীদলের “নামধেয়” শাখা হয়ে ওঠে। এ দল পাকিস্তানে এক ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে এমন এক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয় যে- ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার ন্যায্য ভূমিকা পালন করতে এবং যথাযথ অংশীদার হতে সক্ষম হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে দলটি কতকগুলি কৌশলগত আপোস করতে তৈরি ছিল।

দলীয় ফর্মুলা, দলের লোকায়তকরণের মতো সংঘাতসঙ্কুল ইস্যুগুলির নিষ্পত্তি হওয়ার আলোকে মনে হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। তবে বাহ্যত সাধারণ ঐকমত্যের গভীরে সংগঠনের নানা স্তরে মতানৈক্য ও অবিশ্বাসের অন্তঃস্রোতধারা প্রবাহিত ছিল। ১৯৫৬ সালে এ দল পূর্ব পাকিস্তানে ও কেন্দ্রে ক্ষমতায় অংশীদার হওয়ার পর প্রধানত দুটি ধারার সংঘাত দানা বেধে ওঠে ।

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-১

প্রদেশ পর্যায়ে সংগঠন ও সংসদীয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন যথাক্রমে শেখ মুজিবুর রহমান ও আতাউর রহমান খান। তাঁদের দু’জনের মধ্যে আমলাতন্ত্র / প্রশাসনের মোকাবেলায় দলীয় সংগঠনের সঙ্গত ভূমিকার প্রশ্নে গুরুতর বিরোধ ছিল। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও সে কারণে প্রশাসন বা সরকারপ্রধান হিসেবে আতাউর রহমান এক অরাজনৈতিক আমলা ব্যবস্থার সনাতন ধারণায় দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে এ আমলা ব্যবস্থা কাজ করবে রাজনৈতিক চাপমুক্ত অবস্থায় সরকারের ঘোষিত নীতিমালা বাস্তবায়নে।

আর সে জন্য শাসক দলের কর্মকর্তাদের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে না। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান জোরালো এক ক্যাডারভিত্তিক দলীয় সংগঠন নির্মাণের অভিলাষী ছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর দলীয় পরিকল্পনা ও কর্মসূচির প্রতি আমলাদের বৈরীপ্রায় মনোভাবের কথা। আর সে জন্যই তিনি বিভিন্ন স্তরের প্রশাসক ও প্রশাসনের বিভিন্ন এখতিয়ারের ওপর দলীয় কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন তীক্ষ্ণ নজরদারির পক্ষপাতী ছিলেন।

এ ব্যবস্থায় এমনও হতে পারে যে, দলীয় কর্মীদের “পুরস্কার” দিয়ে সংগঠনের প্রতি তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করা গেলো। এটা, ব্রিটিশ যে সনাতন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল সেটিকে ছাপিয়ে বা কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাও হতে পারে। একে সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবেও দেখা যায়।

সংসদীয় গণতন্ত্রে দলের সংসদীয় শাখার ওপর দলীয় সংগঠনের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি একটি নিরবচ্ছিন্নভাবে বিতর্কিত প্রশ্ন এবং এই দ্বন্দ্বে জড়িত ব্যক্তিত্বদের ভিত্তিতেই পরিস্থিতি তার নিজ খাতে এগিয়ে যায়। তবে সে যাই হোক দলীয় সংগঠনের শ্রেষ্ঠত্বে তাঁর বিশ্বাস ও সরকারের নীতি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা মনে করে আমলাদের প্রতি তাঁর অবিশ্বাস ছিল অনেকটা তাঁর বদ্ধ ধারণার মতো।

সম্ভাবনার দিক থেকে গুরুতর এই স্থানীয় প্রকৃতির সংঘাতকে ছাপিয়ে ওঠে তার চেয়েও আরো বেশি জরুরি ও জটিল প্রকৃতির এমন কিছু সংঘাত যার ফলাফল বা পরিণতি ছিল দেশের জন্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এগুলি ছিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি এবং দেশের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনমূলক অভ্যন্তরীণ নীতির সাথে সম্পর্কিত। এ দুটি বিষয়ই কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি সিদ্ধান্তের এখতিয়ার। এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল।

আওয়ামী লীগ জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি ও একটি ফেডারেল কাঠামোর আওতায় কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য সীমিত ক্ষমতাসহ পরিপূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষপাতী। কিন্তু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই ঘোষিত নীতি থেকে সরে গিয়ে সিয়াটো (SEATO), সেন্টো (CENTO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সামরিক চুক্তিতে অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সাথে পাকিস্তানের জোটভুক্তি নীতির প্রবক্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। আপাতদৃষ্টিতে তিনি স্বায়ত্তশাসন ইস্যুর অগ্রাধিকারমূলক গুরুত্বের মাত্রাও লঘু করে বাহ্যত পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গত ও ন্যায্য স্বার্থের প্রশ্নে আপোস করেন।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানীই প্রধানত এই সব বিচ্যুতির বিষয় আলোকপাত করে নেতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর বৈধতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। ১৯৫৫ সালের শেষের দিক থেকে জনাব সোহরাওয়ার্দী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। বিশেষ করে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী পদে তখনই এসব ইস্যুকে ঘিরে সঙ্কট ঘোরতর হয়ে উঠছিলো। সোহরাওয়ার্দীর মোকাবেলায় ভাসানীর একটি বাড়তি সুবিধে ছিল।

আওয়ামী লীগ সংগঠনের মূল্যায়নে দলের সংসদীয় শাখার জাতীয় পর্যায়ের কাজ সন্তোষজনক ছিল না। এক অর্থে এটি দুই নেতার মধ্যে এক লড়াইও বটে—এক নেতা প্রাদেশিক স্তরের হলেও তাঁর ছিল গণভিত্তি, অন্যজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা যাঁর তৎপরতা প্রধানত নগরভিত্তিক ও সমাজের শিক্ষিত শ্রেণীর মাঝে। এই বিবাদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দু’জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা তাঁদের জাতীয় নেতার পক্ষাবলম্বন করেন।

এতে নামধেয় প্রাদেশিক দলপ্রধান তাঁদের সমর্থন হারান। চূড়ান্ত বোঝাপড়ায় সোহরাওয়ার্দী প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী হলে দলে ভাঙন দেখা দেয় এবং আরেকটি জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয়ের পথ অবারিত হয়। এই দলের নাম ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। এ দলের কর্মসূচি অধিকতর ব্যাপক পরিসরের বলেই ধরে নেওয়া হয়।

পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী বিরোধের বিষয়টি সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই বোধগম্য হয়ে ওঠে আর সেটি দিবালোকের মতোই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে।

সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগের পরিপূর্ণ ধ্বংসের কারণগুলি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে হুঁশিয়ারি জ্ঞাপন করেন। প্রসঙ্গত তাঁর জিজ্ঞাস্য ছিল: “রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের আদর্শ কী হবে?” আর এর জবাবও তিনি দেন ফরাসী বিপ্লবের “নতুন দর্শন ও মূল্যবোধের” দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে যাতে রয়েছে ভাবপ্রকাশ, সংগঠন, জীবিকার্জন ও বাকস্বাধীনতার ধারণাগুলি । তিনি ঘোষণা করেন:

আমাদের আজকের লক্ষ্য হলো, পাকিস্তানের জনসাধারণের জন্য এসব মৌলিক অধিকার আদায় … এদেশের মানুষ অবশ্যই এক গণতান্ত্রিক জীবনধারা ও উৎপাদন ব্যবস্থা কায়েম করবে এতে কোনোরকম আপোসরফা করা হবে না। জনগণ যেমন হিটলারি ফ্যাসিবাদ সহ্য করবে না বা কোটারি শাসন মেনে নেবে না, তেমনি কমিউনিজমকে বরণ করবে না।

তিনি প্রস্তাব করেন, পাকিস্তানের কমবেশি লক্ষ্য হওয়া উচিত “ব্রিটেনের প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা” কায়েম করা। কেন্দ্রে ক্ষমতা আংশিক করায়ত্ত করার পর থেকে আওয়ামী লীগের অর্জিত সাফল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৭৫ শতাংশ অর্জিত হলেও ২৫ শতাংশ অনর্জিত রয়ে গেছে এখনো। আর সে জন্য প্রচুর কাজ করার রয়ে গেছে। ২১- দফা ও আওয়ামী লীগ ম্যানিফেস্টোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একমাত্র পররাষ্ট্র বিষয়, দেশরক্ষা ও মুদ্রা ব্যবস্থা ছাড়া সকল বিষয় প্রদেশের আওতায় নিয়ে আসা ।

কেননা মনে করা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তান যে বিদেশী বিনিময় মুদ্রা আয় করে তা যদি সে নিজের কাজে লাগাতে না পারে, শিল্প ও বাণিজ্য, রেল ও ডাকবিভাগকে যদি প্রদেশের পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে আসা যায়, পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম—দুই অংশের অর্থনীতি আলাদা—এর স্বীকৃতি যদি না আসে তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি তাঁর শ্রোতাদের মনে করিয়ে দেন, “আমরা সংখ্যার সমতা মেনে নিয়েছি দেশের সকল বিষয়ে আমরা সমান আচরণ পাবো বলে, দেশের মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য নয় ।

” তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, অত্যন্ত বেশি ঘনবসতির কারণে পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি খাতে বিরাট আকারের উন্নয়ন সম্ভব নয় যা পশ্চিম পাকিস্তানে সম্ভব। আর সে কারণে এর বৈজ্ঞানিক প্রতিকার হতে পারে পূর্ব পাকিস্তানকে শিল্পায়িত আর পশ্চিম পাকিস্তানে আধুনিক যান্ত্রিক কৃষির প্রবর্তন করে। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রয়োজনের ওপরে জোর দেন।

এ ব্যাংক থাকবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। ভাসানীর এসব কথা আসলে কলিন ক্লার্ক ও এ. সাদেকের মতো কিছু অর্থনীতিবিদের সুপারিশের প্রতিধ্বনি ছিল। জনাব সাদেকের মতো অর্থনীতিবিদ এবং এম. এ. চৌধুরী ও আব্দুর রাজ্জাকের মতো বিদগ্ধ ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারিয়ানরা গণপরিষদ ও অন্যত্র ব্যাপক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা সংবলিত এক ফেডারেল শাসনতন্ত্রের পক্ষে বলতে গিয়ে ইতঃপূর্বে এসব বক্তব্য দিয়েছিলেন। এগুলিকেই পরে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের (ভাঙন পরবর্তী ও পুনরুজ্জীবন পরবর্তী) ৬-দফায় রূপান্তরিত করা হয়।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে ভাসানী তাঁর আগের অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলকে সকল সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবমুক্ত করার জন্য এশীয় ও আফ্রিকীয় জনগণের মাঝে বন্ধুত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক বলিষ্ঠ ও স্বাধীন নীতি গ্রহণের সুপারিশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “সাম্রাজ্যবাদীদের উস্কে দেওয়া বিরোধে নিজেরা জড়িত হলে তা হবে আত্মহত্যার শামিল।

” ডলার, রুবল কোনো কিছুই কোনো দেশে উন্নয়ন নিয়ে আসবে না—এ সাবধানবাণী উচ্চারণ করে তিনি এ ধরনের নীতির ব্যর্থতার উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে চিয়াং কাইসেকের কথা উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কাশ্মীর হলো পাক-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। আর তাই তিনি তাঁর ভাষণে কাশ্মীরে অবাধ ও নিরপেক্ষ গণভোট অনুষ্ঠানে সম্মত হয়ে এ সমস্যা নিরসন করার জন্য ভারতের জনসাধারণ ও ভারতের “শান্তিপ্রিয়” প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছে আবেদন জানান ।

দলের কাজ সম্পর্কে ভাসানীর এই অভিমতে দলের ভেতরে সাংগঠনিক ও আদর্শিক উভয় ক্ষেত্রে কতকগুলি ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে তাঁর আপত্তির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে। এতে তিনি কী চান তা পরিষ্কার। যেমন দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, তিনি বলেন, দলের কর্মীরা হলো “দেশের জীবনদায়িনী রক্তপ্রবাহ” আর সে কারণে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা সরকারের উচিত তাদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া।

আর সেই পথে দলের অপেক্ষাকৃত নবীন ও প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে আদর্শিক উপলব্ধি গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রয়াসী হওয়া। আর শুধুমাত্র কর্মীদের বেলায় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিলেই চলবে না, প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান নেতাদেরকেও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করতে হবে। যাদের দলত্যাগ অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে তাদেরকে দলে পুনরায় নেওয়ার বিরুদ্ধেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ।

তিনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট সদস্যদের মনে করিয়ে দেন যে, দলের সংসদীয় শাখা মূল দলেরই অংশবিশেষ। সে কারণে তাদেরকে দলের নীতি, আদর্শ ও গঠনতন্ত্র মেনে চলতেই হবে। বস্তুত তিনি এসব বক্তব্যে দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের রেষারেষিতে শেখ মুজিবুর রহমানকেই সমর্থন করেছিলেন। কথাটা এভাবেও বলা যায় যে, সাধারণ সম্পাদক সভাপতির মতো একই অভিমত পোষণ করতেন।

কিন্তু তবু এই অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও দলের এ দুই কর্মকর্তাকে একত্রে রাখতে পারেনি। পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক নানা প্রশ্নে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। পরের কয়েক বছরে শেখ মুজিবের কার্যপরিচালনা কৌশল থেকে আভাস পাওয়া যায়, ভাসানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনো মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে বদলায়নি। বরং তা বদলায় স্বল্পমেয়াদী বিষয়ের কারণে। এর অন্যতম কারণ ছিল প্রতীক্ষিত ও প্রত্যাশিত নির্বাচন ।

পাকিস্তানের শাসকচক্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে একটানা মার খেয়েও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশ তখনো স্পষ্টত বিশ্বাস পোষণ করতো যে, এমনকি ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের আওতার মধ্যে হলেও জাতীয় পর্যায়ে নবনির্বাচিত আইনসভার সদস্যদের সুবাদে আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তার দাবি আদায় করতে সক্ষম হবে।

আর তাই কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর মোকাবেলায় একটা নতজানু ভূমিকা অবলম্বন করা হয় প্রত্যাশিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অবধি। এবং এটিকে সর্বোত্তম কৌশল বলেই ধরে নেওয়া হয়। ভাসানী অনতিবিলম্বে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের প্রস্তাব করেছিলেন । ফলে ধরে নেওয়া যায় যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা তিনিও নাকচ করে দেননি। অবশ্য সব সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রত্যয়ের পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি পাকিস্তানের উভয় অংশের পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন লাভের ওপর নির্ভরশীল।

আওয়ামী লীগের পরের কয়েক বছরের রাজনীতির মূল্যায়ন করলে পরিষ্কার লক্ষ্য করা যাবে ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা এই দলের কৌশল ও কর্মসূচির প্রকৃতি স্থির করে দিয়েছে, যদিও পরবর্তীকালে মওলানা কেবল অন্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই দেননি বরং বেশিরভাগ সময়ই তিনি আওয়ামী লীগকে তাঁর সমর্থন জানাননি। উদাহরণস্বরূপ, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে ‘জনগণের বেঁচে থাকার’ অধিকার বলে তিনি যে উল্লেখ করেন তা ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে এই দল কর্তৃক জনগণকে সংগঠিত করার উপায় হয়ে উঠলেও মওলানা আওয়ামী লীগের সমালোচনায় মুখর ছিলেন ।

রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার প্রশ্নে দলীয় বিচ্যুতির প্রবণতাগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরার সাথে সাথে, স্বীয় রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সুবাদে ভাসানী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা শোষণের উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহারের বিরুদ্ধে দলকে সতর্ক করে দেন ।

মওলানা ভাসানীর কাছে ধর্ম কেবল আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্যই প্রয়োজন। ভাসানী কাগমারী সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতার শেষে তাঁকে দলের সভাপতির পদ থেকে অবসরদানের ও দলের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ করতে দেওয়ার আবেদন জানান । কারণ হিসেবে তিনি তাঁর দৈহিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কথা উল্লেখ করেন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, দল যে তাঁকে দলীয় নেতৃত্ব থেকে অবাধে বাদ দিতে পারে এটি তারই ইঙ্গিত। আসলেও অল্পকালের মধ্যেই দল তাঁর নেতৃত্ব ছাড়াই চলার সিদ্ধান্ত নেয় যদিও ঐ পর্যায়ে তিনি যে সব নীতিকে সমুন্নত রাখতে লড়াই করেছেন দল সেগুলি বাতিল করেনি।

তাঁর এ ভাষণের সাথে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট বিচার-বিবেচনা করলে সংঘাত-বিরোধের একটা পরিষ্কার আভাস পাওয়া যায়। কিছু পর্যবেক্ষক ও অন্যান্যের লিখিত বিবরণ থেকে নিশ্চিত জানা যায় যে দুটি বিবদমান উপদলের মধ্যে তখন তীব্র বিরোধ-সংঘাত চলছিল কাগমারী অধিবেশনে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

ভাসানী এ কথা স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন (সাবজেক্ট কমিটি/ওয়ার্কিং কমিটি বৈঠকে) যে, পশ্চিম পাকিস্তান যদি পূর্ব পাকিস্তানের দাবিগুলি স্বীকার করে না নিতে পারে তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের উচিত হবে পশ্চিম পাকিস্তানকে বিদায় জানানো। ভাসানী এ রকম সরাসরি হুমকি দিয়ে থাকলে তা ছিল একজন বিক্ষোভপ্রবণ রাজনীতিকের স্পষ্ট অভিব্যক্তি যার আভাস আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা জাতীয় আইনসভায় ইতোমধ্যে দিয়েছিলেন।

কাগমারী সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতি প্রশ্নে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরম পর্যায়ে চলে যায় । এমনকি, সোহরাওয়ার্দীও ইস্তফা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর অনুসারী আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদে এগিয়ে এসে ভাসানীর তখনকার প্রধান অবলম্বন যুব আওয়ামী লীগ সদস্যদের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করে ভাসানীকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা করেন।

অবশ্য, সম্মেলনের প্রস্তাব অনুসারে ভাসানীকে প্রতিরক্ষা ও সামরিক চুক্তির ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ঘোষিত নীতি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া হয়। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন সংসদীয় দলকেও আবার কেন্দ্রে কোয়ালিশনে থেকে কাজ চালিয়ে যাওয়ারও অনুমতি দেওয়া হয়। এর আগে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৫৫ সালের অক্টোবর ও ১৯৫৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিল অধিবেশনগুলিতে সামরিক জোট আঁতাত প্রশ্নে নিজ অবস্থান ব্যক্ত করে।

অক্টোবর ১৯৫৫ অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সামরিক চুক্তিগুলিকে পার্লামেন্টে উপস্থাপন করার দাবি জানায় ও বলে যে, এভাবে যে চুক্তিগুলি অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হবে সেগুলি বাতিল হয়ে যাবে । ভবিষ্যতে পার্লামেন্টের পূর্বানুমোদন ছাড়াই এ ধরনের কোনো চুক্তি সম্পাদন করা হলে চুক্তিগুলি সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্ট সমীপে পেশ করতে হবে।

পরের বছরের কাউন্সিল অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের আবেদন জানায় এবং পাকিস্তান যে জন্য মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতি হারিয়েছে সেই সামরিক আঁতাত বা জোটের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করে। অবশ্য, সোহরাওয়ার্দী সামরিক জোটের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, শূন্যের সাথে শূন্য যোগ করলে যোগফল শূন্যই হয় ।

নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পশ্চিম পাকিস্তানী শাখাগুলি সাধারণত স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে মত প্রকাশ করে। তবে দলের কেন্দ্রীয় সংগঠন সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্বভার গ্রহণ না করা অবধি এ বিষয়ে কোনো দৃঢ় মত ব্যক্ত করেনি। পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সরকারের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি অনুমোদন করে বলে যে ওঠে সে বিষয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু, করাচি ও লাহোরের দলীয় সদস্যরা দাবি প্রশ্ন তোলে ও বিষয়টি আলোচনার জন্য ওয়ার্কিং কমিটির পূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠানের দাবি জানায়।

১৯৫৭ সালের ৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক উল্লিখিত মর্মে প্রদত্ত বিবৃতি সঠিক বলে জানায় । এই বৈঠক কেন্দ্রীয় দলের (নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের) সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক উসমানীর দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়ও অনুমোদন করে। এই বহিষ্কারের কথা পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তাঁর সাথে মতপার্থক্যের দরুন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আগেই ঘোষণা করেছিলেন। এরও আগে ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জানুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নির্ধারিত কনভেনশন ১৯৫৭ সালের মে অবধি মুলতবি করা হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানে প্রচ্ছন্ন ও ধূমায়িত অসন্তোষ ও বিরোধিতার বহিঃপ্রকাশ অচিরেই ঘটে । ১৯৫৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের কাগমারীতে যখন ভাসানী- সোহরাওয়ার্দী সংঘাত মোকাবেলা চলেছে তখন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে পশ্চিম পাকিস্তানের আনুমানিক একশ’ আওয়ামী লীগ সদস্য এক কনভেনশনে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রতি সোহরাওয়ার্দীর অগণতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নিন্দা করে । আরো তাৎপর্যের বিষয় হলো এই যে, কনভেনশন মওলানা ভাসানীর প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে।

১৯৫৭ সালের মার্চে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাত সদস্যের এক কমিটি (বিরুদ্ধ মতাবলম্বী গ্রুপ) ও পাকিস্তান ন্যাশনাল পার্টি গঠন করা হয়। গফফার খান, ইফতেখার উদ্দিন, উসমানী, মানকি শরীফের পীর, আবদুল মজিদ সিন্ধি, আবদুল গফফার ও মাহমুদ আলী কাসুরিকে নিয়ে নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক একটি দল গঠন করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। 

 

পূর্ব পাকিস্তানে কাগমারী সম্মেলনে পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকাকে কেন্দ্র করে শেষ পর্যন্ত দলের আনুষ্ঠানিক ভাঙন এড়ানো সম্ভব হলেও তা স্পষ্টত আওয়ামী লীগের অবস্থান বিরুদ্ধ হওয়ায় দলীয় কাঠামোর বুনিয়াদ পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশেই গুরুতর রকমে দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন: “এই একটি ইস্যুর প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ এতই ঐক্যবদ্ধ যে ছোট-বড়, নতুন-পুরানো যে রাজনৈতিক দলই হোক না কেন স্বায়ত্তশাসনের দাবির বিরোধিতা করে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে টিকে থাকার আশা করতে পারে না।”

মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমানের অনুপস্থিতিতে ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দানের পুনরুক্তি করে এক প্রস্তাব গৃহীত হলে সুনিশ্চিত বোঝা যায় যে মওলানা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানের জননেতাদের মনোভাব সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

ঐ সময় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোলাম আলী খান তালপুর এক বিরূপ মন্তব্য করাতে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । আওয়ামী লীগের অন্যতম পূর্ব পাকিস্তানী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এম. এ. খালেক এর জবাবে পাকিস্তানের দুশমনদের তুষ্ট করেছে তাহলে তো যুক্তির খাতিরে বলতেই হয় সকল পূর্ব পাকিস্তানই পাকিস্তানের দুশমন। কিন্তু খোদ সোহরাওয়ার্দী বিষয়টিকে এক রাজনৈতিক ভেলকি বলে অভিহিত করেন।

তিনি এমন মন্তব্যও করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, স্বায়ত্তশাসনের দাবি জনসাধারণের দাবি নয় বরং নেতারা যাঁরা এ বিষয়ে সোচ্চার তাঁরাও এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। ভাসানী এর পাল্টা জবাব দেন ১৯৫৭ সালের ৫ এপ্রিল। ঐ দিন তিনি সোহরাওয়ার্দী স্বাক্ষরিত ২১-দফা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারপত্র সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন। 

দৃষ্টত আওয়ামী লীগের দলীয় সংগঠন রীতিমতো অবিন্যস্ত, বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। যারা দলীয় ম্যান্ডেট লঙ্ঘন করে কেন্দ্রীয় আইনসভায় পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সমর্থন জানায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের ১৩ জন এমপির মধ্যে কেবল নূরুর রহমান দলীয় ম্যান্ডেটের প্রতি অবিচল থাকেন।

আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান আইনসভার ভোট গ্রহণের সময় ঢাকায় ছিলেন। তাঁরা পরে জনাব সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতি অবস্থানের প্রতি তাঁদের সমর্থন ঘোষণা করে এক বিবৃতি দেন।১৪ অবশ্য যদি দলীয় ম্যান্ডেটের প্রতি ঐ ১৩ জন এমপি একযোগে বিশ্বস্ত থাকতেন তাহলেও সংখ্যাগত দিক থেকে তার কোনো প্রভাব থাকতো না । যা হতো, তা হলো এ সংহতি দলকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করতো। এই ভাঙনই পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দরকষাকষিতে পূর্ব পাকিস্তানের সামর্থ্যকে দুর্বল করে দেয় ।

১৯৫৭ সালের ৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি বৈঠকে কথিত সোহরাওয়ার্দীপন্থীরা কথিত ভাসানীপন্থীদের পরাজিত করে। ভাসানীপন্থী যুবলীগার ও দলীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদকে শৃঙ্খলাজনিত কারণে বহিষ্কার করা হলে তার প্রতিবাদে অন্য নয়জনও পদত্যাগ করেন।

১৩ ও ১৪ জুন ঢাকায় এক কাউন্সিল বৈঠক ডাকা হয় । এই বৈঠকের আলোচ্যসূচির অংশ ছিল ওয়ার্কিং কমিটিতে ২৫ জন সদস্যের মনোনয়নদানের বেলায় সভাপতির ক্ষমতা খর্ব করার জন্য এক সংশোধনীর ব্যবস্থা। এ কথাও ঘোষণা করা হয় যে, ভাসানীর ইস্তফাদানের বিষয়টিও (১৯৫৭ সালের মার্চে সাধারণ সম্পাদকের কাছে এক পত্রে তিনি ঐ ইস্তফা দেওয়ার কথা বলেন বলে জানা যায়) বিবেচনা করা হবে ।

কয়েকজন পর্যবেক্ষকের বিবরণ অনুযায়ী জুনের ঐ কাউন্সিল বৈঠকে কী হবে না হবে তার সব কিছুই ম্যানেজ করে রেখেছিলেন কথিত সোহরাওয়ার্দীপন্থী গ্রুপ যার নেতৃত্বে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। এর মধ্যে মওলানা ভাসানী উত্তরবঙ্গে এক কৃষক সম্মেলন ডেকেছিলেন। তিনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। আত্মশুদ্ধির জন্য এক সপ্তাহব্যাপী অনশনও শুরু করেছিলেন। জুনের দলীয় কাউন্সিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগ্রহ তাঁর ছিল না বরং একটি নতুন গঠনের আভাস পাওয়া যাচ্ছিল তাঁর কাছ থেকে। 

বিভিন্ন খবরাখবর অনুযায়ী ঐ কাউন্সিল বৈঠকে তুমুল হট্টগোল, সহিংসতা ও অগঠনতান্ত্রিক চাতুরির মধ্য দিয়ে সরকারের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে এক প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।। এসব ঘটনার নেপথ্যে হাত ছিল সোহরাওয়ার্দীপন্থী গ্রুপের। এছাড়া, যুবলীগারদেরকেও দলছাড়া করার ব্যাপারে আরো একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত প্রস্তাবে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়িত করার জন্য ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র সংশোধনের আহ্বান জানানো হয় । অবশ্য, সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এই ইস্যু নিয়ে মাঠে নামবে ।

ভাসানীর ইস্তফা গৃহীত হলো না । তিনি এ বিষয়ে সংবাদপত্রে এক বিবৃতি দিয়ে কাউন্সিলরদের বললেন, ঐ কাউন্সিল বৈঠকের অধিবেশনে যে সব ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে সেগুলি সৎ কিনা তা নিজেদের বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখতে । তিনি এ কথাও বলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়, “মুজিব এ কথা বুঝতে পারছে না যে, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন হাসিল করতে হলে তাকে অবশ্যই পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে অর্থাৎ সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

কেননা, সামরিক চুক্তির আওতায় পাওয়া অস্ত্র যে কেবল পূর্ব পাকিস্তানীদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হবে—এ কেবল অন্ধ মানুষই দেখতে অক্ষম।”১৬ ভাসানী ১৯৫৭ সালের ২৫-২৬ জুলাই ঢাকায় এক গণতান্ত্রিক কনভেনশন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর সম্পর্কচ্ছেদের বিষয়টি পাকাপোক্ত করেন। এ কনভেনশনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হয় । দলের সভাপতি হন মওলানা ভাসানী।১৭ পরের বেশ কয়েকটি বছর এই দল পাকিস্তানের বামপন্থীদের জন্য ছত্রচ্ছায়া হিসেবে কাজ করে ।

সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার অন্যতম মন্ত্রী (কেন্দ্রীয় মন্ত্রী) আবুল মনসুর আহমদের সন্দেহ ছিল এই যে, আওয়ামী লীগের ভাঙন ও ন্যাপ গঠনের নেপথ্যে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যা জড়িত থাকতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাগমারী অধিবেশনের আগে থেকেই তিনি জানতেন যে, প্রেসিডেন্ট মীর্যা ভাসানীকে গ্রেপ্তার করার জন্য সোহরাওয়ার্দীকে চাপ দিচ্ছিলেন। আর সেটি না করতে পেরে সেই তিনিই হয়তো ভাসানীকে রাজি করিয়েছেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে এক নতুন দল গঠন করতে।

১৮ এ সময় প্রায় সবাই জানতো যে জাঁকজমকপূর্ণ কাগমারী সম্মেলনের সংগঠক ভাসানীকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল ইস্পাহানীরা যাদের ব্যবসার স্বার্থ নিহিত ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আর একই সাথে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন চক্রেরও ঘনিষ্ঠ ছিল। তারা হয়তোবা মীর্যার কথিত চক্রান্তে সহযোগিতা করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে যে রাজনৈতিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে উঠছে সেটিকে ধ্বংস করতে।

এও অসম্ভব নয় যে, দলীয় কর্মসূচি অনুসরণের ব্যাপারে সোহরাওয়ার্দীর আন্তরিকতা বা নিষ্ঠায় আস্থাবান হতে না পেরে (কিংবা সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে) ও একই সময়ে জাতীয় রাজনীতির কৌশলগত অবস্থানে থাকার কারণে সোহরাওয়ার্দীকে রুখতে না পেরে তিনি চাইছিলেন, নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক একটি সভাপতির পদ হাসিলের মাধ্যমে নিজের প্রাদেশিক নেতার মর্যাদাকে জাতীয় নেতার মর্যাদায় উন্নীত করে সোহরাওয়ার্দীর সাথে লড়তে, যাতে করে প্রয়োজনে তিনি সমান শক্তিতেই তাঁর সাথে যুঝতে পারেন । এও খুবই সম্ভব ইস্কান্দার মীর্যা ভাসানীর নিজের নেওয়া কৌশলের সুযোগটি সদ্ব্যবহার করেছিলেন ।

নাটের গুরু যে বা যারাই হয়ে থাকুক না কেন ভাসানীর আপোসহীন মনোভাব এমন সময় আওয়ামী লীগের ভাঙন ত্বরান্বিত করে যখন দলটি বহু প্রতিকূলতার মুখে সবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোতে ঠাঁই করে নিতে কোনোমতে সমর্থ হয়েছে আর একই কারণে স্বীয় সহজাত সীমাবদ্ধতার চৌহদ্দির মধ্য থেকেই তার উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই ক্রান্তিকালে ভাসানী নিজেই অবশ্য উল্লেখ করেছিলেন যে, আইনসভার বাইরে ও ভেতরে দলের যুগপৎ সংগ্রাম পরিচালনার আবশ্যকতা রয়েছে।

১৯ দলের ভাঙন প্রদেশ- কেন্দ্র উভয় পর্যায়েই সংগঠনের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, খোদ ন্যাপ স্বকীয় অসঙ্গতি ও নড়বড়ে নীতির পরিচয় দেয়। ফলে তাতে না সাহায্য হয় দল গঠনে, না উপকার হয় পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের যা নাকি ছিল ভাসানীর সমসাময়িক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

ভাসানীপন্থীদের মনোভাব আরো কঠোর হয়ে ওঠার জন্য সোহরাওয়ার্দীপন্থী গোষ্ঠীও কম দায়ী ছিল না। তারা যদি এই বিশ্বাস করতো যে, সোহরাওয়ার্দীর বাহ্যত অসঙ্গতি সত্ত্বেও তিনি আসলে পূর্ব পাকিস্তান যাতে তার ন্যায্য-পাওনার যতটা বেশি সম্ভব আদায়ের লক্ষ্যে সঠিক পথে এগিয়ে চলেছেন তাহলে, তারা কথিত প্রগতিবাদীদের বহিষ্কার করে ভাসানীকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার পরিবর্তে এ বিষয়ে দলের ভেতরে একটা ঐকমত্যের জন্য প্রয়াসী হতে পারতো।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে কাজটি আদৌ সম্ভব ছিল কি? দলের ভেতরে প্রগতিবাদীদের থাকতে দিলে আওয়ামী লীগের শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর নীতি অবস্থান অস্বীকার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকতো না । আর সে ক্ষেত্রে হয় দলের সাথে সোহরাওয়ার্দীর সম্পর্ক ছিন্ন হতো নইলে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে বেরিয়ে আসতে হতো। আর এ দুইয়ের যেটিই হোক আওয়ামী লীগ ক্ষমতার কাঠামোর সাথে যে সামান্য যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল সে যোগসূত্র হারিয়ে যেতো। বলাবাহুল্য ক্ষমতার এই কাঠামোটি সামগ্রিক সমতার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের দাবির প্রতি প্রচ্ছন্ন-প্রকাশ্য উভয়ত বৈরী ছিল।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি মেটানোর লক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার কিছু নীতি সিদ্ধান্তের প্রবল সমালোচক ছিল কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আর বিষয়টি নিয়ে রাখঢাক ছিল না মোটেও। এই জমিদার ও শিল্পপতিরা কার্যত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানস্থিত ক্ষমতার কাঠামোর বুনিয়াদ ।

এই সব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকদের ক্রমাগত দাবির মুখে বিব্রত হয়ে প্রেসিডেন্ট মীর্যার কাছে কেন্দ্রের যে হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন তালুকদার মনিরুজ্জামান তার এক সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়েছেন।২° দৃষ্টান্তস্বরূপ, এক বার্ষিক ভোজ সভায় শিল্পবণিক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি মি. রেঙ্গুনওয়ালা প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যার উদ্দেশে এক ভাষণে বলেন:

আমাদের রাজনীতিকেরা পরিস্থিতি ঘোঁট পাকিয়ে তুলেছেন। তাঁদের দলীয় রাজনীতির কারণে কেবল যে দেশের রাজনৈতিক মর্যাদাই ক্ষুণ্ণ হয়েছে তাই নয় বরং জাতির অর্থনৈতিক জীবনেও এর অভিঘাত গুরুতর। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সমতা হয়তোবা কার্যত সম্ভব কিন্তু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নের বেলায় অন্যান্য অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে এর প্রয়োগ ঘটলে তা হয়তো আমাদের এক কানাগলিতে নিয়ে পৌঁছে দেবে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায় থাকবে না। এ ধরনের অভিযোগে সোহরাওয়ার্দীর প্রতিক্রিয়া ছিল:

যাদের স্বার্থ কায়েমি তাদের কাছে যদিও এরকমটাই মনে হতে পারে যে, এই নীতিগুলি অসামঞ্জস্যময়, কিন্তু আসলে ঘটনা তা নয়। দেশকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা দেশের একটা অংশবিশেষের স্বার্থ বিকিয়ে অন্য অংশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে পারি না। কেননা, প্রশ্নটি সার্বিক উন্নয়নের।

আবুল মনসুর আহমদ আরো কিছু ঘটনার কথা বলেছেন। এসবের বেলায় দেখা যায়, দেশের দুই অংশের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক অসমতা দূর করার লক্ষ্যে কেন্দ্রের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তিনি কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিলে পশ্চিম পাকিস্তানী আমলা ও ব্যবসায়ী স্বার্থগোষ্ঠী সে সবের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ২৩ এমনি করে কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ দেখতে পায় যে, পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়িত করা বেশ কঠিন কাজ ।

তবু সে প্রয়াস থেমে থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ ও চাহিদার প্রতি ইচ্ছাকৃত অবহেলার অভিযোগ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে উঠলেও, এমনকি তাঁর কট্টর সমালোচকও এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট অবহেলার দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেননি। এ ছাড়াও তিনি উল্লিখিত বিবৃতিটি দিয়েছিলেন, আওয়ামী লীগের ভাঙনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর।

তাতে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, তিনি তখনো ভাঙন-পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের মৌলিক নীতিগুলি আদায়ের জন্য লড়ছিলেন। বাস্তবিকপক্ষেও, কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকারের ক্ষমতার অংশীদার কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে একইসঙ্গে প্রদেশের স্বার্থে কাজ করে প্রদেশটির জন্য বিশেষ “ফল” লাভ করা এবং কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার অভিজাতবর্গকে তুষ্ট রাখা খুবই কঠিন ছিল ।

তবুও এ কথা স্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানী রাজনীতির অত্যন্ত নাজুক মুহূর্তে এক অনিবার্য ও অপরিহার্য বহুমাত্রিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন আর সেই জন্যই পশ্চিম পাকিস্তানী অভিজাত ক্ষমতাধরদের হাতে খেলার পুতুল হওয়ার দুর্বলতার জন্য অভিযুক্ত হন। এভাবে যে শিক্ষালাভ ঘটে বলে মনে হয় তার যথেষ্ট প্রভাব পড়ে পরের বছরগুলিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যপরিচালনায় যখন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দরকষাকষির প্রক্রিয়াটির পরিবর্তে জায়গা নেয় শান্তিপূর্ণ গণসংগঠনের প্রয়াস। অবশ্য এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়নি।

পাকিস্তানের একেবারে গোড়ার দিনগুলি থেকে সোহরাওয়ার্দী ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাজনৈতিক দল, যুক্তনির্বাচন, এক ইউনিট ও সার্বিক সমতার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর পাঁচ প্রদেশের একটি প্রদেশ না হয়ে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের একটি অঞ্চল হতে পারবে। এক ইউনিট মেনে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি এই ছিল যে সে ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানে তিনি যে কোনো মূল্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে একান্ত আগ্রহী ছিলেন।

এ থেকে গণতান্ত্রিক পন্থায় সকল রকমের অনিয়মতান্ত্রিকতা ও গলদ দূর করার পূর্বশর্ত হিসেবে সংহতিনির্ধারক নানা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তাঁর জরুরি বিবেচনাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর এই ধরনের আগ্রহের আতিশয্যে, এমনকি, তিনি তাঁর দলের জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিকেও বিসর্জন দেন। এর কারণে তাঁর যে সমালোচনা হয় তাতে অবশ্য। প্রতীয়মান হয় ঐ সমালোচনায় বাস্তব পরিস্থিতির সহজাত কোনো কোনো বাধ্যবাধকতাকে আমলে নেওয়া হয়নি।

যেমন, সোহরাওয়ার্দী যে ধরনের কোয়ালিশন গড়ে তোলার প্রয়াসী ছিলেন তার কারণেই তাঁর নিজের “জাতীয়” নেতা হওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু তখনো পাকিস্তানী মানসে (বরং বলা যায় পশ্চিম পাকিস্তানী মননে) তাঁর ‘জাতীয়’ আত্মপরিচয়কে বৈধতার বুনিয়াদে দাঁড় করানো বাকি ছিল ।

আর সে কারণেই বোধ করি বলা যায়, পাকিস্তানের সামরিক আঁতাত অনুমোদন অপেক্ষা আর কী তাঁর সেই কাজে ভালো করে সহায়ক হতে পারতো? কারণ, আর যাই হোক, পাকিস্তানী দৃষ্টিকোণ থেকে এসব আঁতাতের অর্থ তার পশ্চিমী সহায়কদের লক্ষ্য অনুযায়ী কেবল কমিউনিস্ট ঠেকানো নয় বরং পাকিস্তানের চির দুশমন ভারতকে ঠেকিয়ে রাখাও বটে । আরো বলতে হয় তিনি জাতিসংঘে কাশ্মীর ইস্যুকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা একাধিকবার করেছিলেন।

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-১

 

এর চেয়ে আর কী-ই বা তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানবাদী মনোভাবের আরো ভালো পরিচয় তুলে ধরতে পারে? তবে সে যাই হোক তাঁর সে কৌশল মার খায়। একদিকে, যারা তাঁর সমর্থনের ভিত তাদের একটা বড় অংশ থেকে বিরোধিতা আসে আর অন্যদিকে, কেন্দ্রের সন্দিহান ক্ষমতাধারী অভিজাতকুল তাঁকে বর্জন করে। যারা ইতোমধ্যে আমলা, সামরিক বাহিনী ও উঠতি ব্যবসায়িক স্বার্থবাদী মহলের আঁতাতের ভিত্তিতে ক্ষমতার কায়েমি কাঠামো চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিল তারা রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতন্ত্রায়নের সম্ভাবনায় আঁতকে ওঠে।

তারা টের পায় পূর্ব পাকিস্তানীদের রাজনৈতিক মনোভাব যদি একবার শেকড় গেড়ে বসতে পারে তা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় স্থিতাবস্থার জন্য এক গুরুতর হুমকি হয়ে উঠবে। এ কারণে রাজনৈতিক চক্রান্তের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয় । দুর্বলতর আওয়ামী লীগ এ কাজটিকে আরো সহজ করে দেয়।

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-২

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-২

দেশের উভয় অংশে দলের ভাঙন, বিশেষ করে এক ইউনিট নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বিরোধিতা যখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে ঠিক সেই সময়ে কেন্দ্রে সুযোগভিত্তিক মোর্চা গড়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ অনেকটা ক্ষমতাও হারায়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সোহরাওয়ার্দীকে পদচ্যুত করা হয়। তবে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সোহরাওয়ার্দী তারপরেও এমন একটা শক্তি হিসেবে থেকে যান যা উপেক্ষণীয় নয় ।

পৃথক নির্বাচনপ্রথা পুনঃপ্রচলনের জন্য মুসলিম লীগ রিপাবলিক্যান কোয়ালিশনের সর্বাত্মক প্রয়াসের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তীব্র বিরোধিতার মুখে ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্ৰীগড় প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। তাঁর উত্তরসূরি ফিরোজ খান নূন কেবল সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সহযোগিতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের সমর্থনে কাজ করে যেতে সমর্থ হন।

বিষয়টি আরো পরিষ্কার করতে বলা দরকার, ১৯৫৮ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এ. কে. ফজলুল হক পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে কৃষক শ্রমিক পার্টির আবু হোসেন সরকারকে মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করলে সোহরাওয়ার্দী এই নতুন মন্ত্রিসভাকে ও সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরকেও বরখাস্ত করতে বাধ্য করেন।

এরপর আবারও ১৯৫৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে ছয়জন আওয়ামী লীগ সদস্যকে আসনচ্যুত করাতে নির্বাচন কমিশনের রায়কে অগ্রাহ্য করানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের এক অধ্যাদেশ জারি করাতে সক্ষম হন। আবার ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সোহরাওয়ার্দীর ইঙ্গিতে নূন তাঁর মন্ত্রিসভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সদস্যদের বাদ দিতে বাধ্য হন। এমনি করে সোহরাওয়ার্দী তখনো কেন্দ্রীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে একজন বিবেচ্য ব্যক্তি হিসেবে রয়ে যান। তবে তাঁর দল পূর্ব পাকিস্তানে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে থাকলেও সেখানে দলটি অত্যন্ত গুরুতর গোলযোগে পড়ে যায় ।

আওয়ামী লীগে ভাঙনের পর এই দল পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে প্রায় ত্রিশজন সদস্যের সমর্থন হারায়। তাঁরা ন্যাপে যোগ দেন। প্রাদেশিক পরিষদের বাইরেও কিছু লোক দল থেকে বেরিয়ে যায়। এ কারণে আওয়ামী লীগের জন্য মিত্রের প্রয়োজন দেখা দেয়। কৃষক শ্রমিক পার্টির একটি অংশের সাথে এ বিষয়ে দরকষাকষি সোহরাওয়ার্দীর অনীহার কারণে শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারেনি।২৪ মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দল এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও সোহরাওয়ার্দীর ওপর দোষারোপ করে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।

তারা প্রধানত যুক্তনির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা চালায়। এই সমালোচনার প্রচারণা অভিযান যখন চলছে তখন আওয়ামী লীগ বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা যাতে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠান অবধি টিকে থাকে সেই বাস্তব কারণে ন্যাপ পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের মতো ন্যাপেরও আশঙ্কা ছিল এই যে, কোনো না কোনো অজুহাতে হয়তো ৯২-ক বা ৯৩ ধারা জারি করে নির্বাচন স্থগিত করা হবে।

মুসলিম লীগ ও অন্যান্য দল তাদের আওয়ামী লীগবিরোধী (ও সোহরাওয়ার্দীবিরোধী) প্রচারণা প্রদেশব্যাপী চালায় । দৈনিক আজাদে (মুসলিম লীগের ঐতিহ্যবাহী মুখপত্র) প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের নিম্নবর্ণিত সারাংশ থেকে এ প্রচারণা অভিযানের ধরন ও প্রবণতাটি বোঝা যাবে।

১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, পাবনা, টাঙ্গাইল, সৈয়দপুর, রংপুর, কিশোরগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ১৫টি জনসভার মধ্যে ছয়টিতে নুরুল আমিন, তিনটিতে আই. আই. চুন্দ্ৰীগড়, তিনটিতে ফজলুর রহমান ভাষণ দেন। এ ছাড়া এসব জনসভায় শাহ আজিজুর রহমান ও অন্য স্থানীয় নেতারাও বক্তৃতা দেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তনির্বাচন পদ্ধতি এবং এর প্রবক্তা আওয়ামী লীগ ও সোহরাওয়ার্দী ।

তাদের এসব প্রচারণার বক্তব্য ছিল সোহরাওয়ার্দী ও আওয়ামী লীগের যুক্তনির্বাচন প্রস্তাবের নেপথ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, হিন্দু তোষণ ও ভারত-পাকিস্তান কনফেডারেশন (এক আন্তর্জাতিক চক্রান্ত) গঠনের দুরভিসন্ধি। আর এর পরিণতি হিসেবে বলা হয় এতে পাকিস্তানের বুনিয়াদ দুর্বল হয়ে পড়বে।

পাকিস্তান আন্দোলন যে আদর্শকে ভিনি করে হয়েছিল তা অস্বীকৃত হবে, দ্বিজাতিতত্ত্ব অস্বীকৃত হবে এবং সকল নির্বাচনী এলাকায় সমতার ভারসাম্য চলে যাবে সংখ্যালঘু জনসম্প্রদায়ের (অর্থাৎ হিন্দুর) হাতে পূর্ব পাকিস্তানে আবার হিন্দুর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, চোরাচালান স্থায়ীরূপ লাভ করবে। এবং পাকিস্তানী অর্থনীতির ভিত্তি ও কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে। এই নেতারা এমনকি, হিন্দুদের একাংশকে আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে এই বলে যে, যুক্তনির্বাচন পদ্ধতির আওতায় তফসিলী হিন্দু ও তফসিলী উপজাতীয় লোকেরা বর্ণ হিন্দুদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে।

এদের অনেকে একদিকে আওয়ামী লীগ ও সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে হিন্দু তোষণের অভিযোগ করলেও, তাদেরই কেউ কেউ আবার এই দাবিও করেন যে, হিন্দুরা নিজেরাই পৃথক নির্বাচন পদ্ধতির পক্ষপাতী। অভিযোগ ওঠে যে, পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা মনোরঞ্জন ধর (একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতা, তৎকালে পাকিস্তান ন্যাশনাল কংগ্রেস সদস্য) কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এ ছাড়া আরো উল্লেখ করা হয় যে, যুক্তফ্রন্টের ২১-দফায় যুক্তনির্বাচনের দফাটি নেই আর সে কারণেই আওয়ামী লীগের এই নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তনের কোনো অধিকার নেই।

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি আনুকূল্য করার অভিযোগও তোলা হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে । বন্যা সমস্যার প্রতিকার, চোরাচালান রোধ ও বন্যার পুনরাবৃত্তি নিবারণে এই সরকারের ব্যর্থতার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও সর্বসাধারণকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, এই সেই আওয়ামী লীগ যে দল পাকিস্তানকে “ইসলামী” অভিধায় অভিহিত করা, শাসনতন্ত্রে চিরন্তন ইসলামী বিধিবিধানের অন্তর্ভুক্তি করা এবং ইসলামভিত্তিক শিক্ষার বিরোধিতা করে, এমনকি, একজন অমুসলিমও পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান হতে পারবেন- এই মর্মে শাসনতন্ত্রের বিধান রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করে।

এ ছাড়া, এই দল দেশের শাসনতন্ত্রে স্বাক্ষর পর্যন্ত করেনি। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি অধ্যাদেশ বলে দেশ শাসনের বিষয় সমর্থন করে । গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ায় সোহরাওয়ার্দী গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদকে অভিনন্দন জানান এবং দেশের ওপর প্রস্তাবিত গণতন্ত্রবিরোধ শাসনতান্ত্রিক কনভেনশন চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করেন। আরো অভিযোগ ওঠে যে প্রথমত যুক্তফ্রন্ট ও পরে আওয়ামী লীগের কুশাসনে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ভো পড়ছে।

আর পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগ চোরাচালান রোধে সশন্ত বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করছে। তারা ধর্মশিক্ষা একেবারেই বন্ধ করে আর সর্বোপরি সোহরাওয়ার্দী চাচ্ছিলেন এমন এক একনায়কসুলভ ব্যবস্থা যার থাকবেন খোদ তিনি। জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে সোহরাওয়ার্দীর ধারণা পাশ্চাত্যের দেবে কর্তৃত্বেজড়বাদী সংস্কৃতি ও লোকায়ত রাজনৈতিক তত্ত্বাবলির বুনিয়াদে প্রতিষ্ঠিত। আর সে কারণে, পাকিস্তান সোহরাওয়ার্দীর হাতে নিরাপদ নয়।

১৯৫৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকার এক ঘোষণায় যুক্তনির্বাচনের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়ার পরেও সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে নিন্দাবাদ চলতেই থাকে। জামায়াত-ই- ইসলামীর মওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী ৪৩ দিনব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। তিনি ঢাকার পল্টন ময়দানে প্রদত্ত ভাষণে যুক্তনির্বাচনের নানা কুফলের বিশদ ব্যাখ্যা দেন। অবশ্য তাঁর এসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তাঁর মুসলিম লীগের সহযোগীরা এর আগে যা বলেছিলেন সে সবের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। একই সুরে কথা বলেন, নিজাম- এ-ইসলামের মওলানা আতাহার আলী ১৯৫৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জের এক ২৫ জনসভায় ।

প্রায় একই সময়ে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেন । করাচিতে তিনি এক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে এক আওয়ামী লীগবিরোধী ফ্রন্টের প্রস্তাব দেন। এর আগে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এমএইচ উসমানী ঢাকার এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানীদের উস্কে দেওয়া ও প্রাদেশিকতাবাদের বীজ রোপণের জন্য সোহরাওয়ার্দীকে দোষারোপ করেন।

উসমানী অবশ্য এর আগে উল্লেখ করেছিলেন যে, সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ন্যাপ কোয়ালিশন সরকারকে সমর্থন জানাবে, তবে এক ইউনিট বিরোধিতায় স্বীয় অবস্থানে অবিচল থাকবে। ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগ নীতি পরিবর্তন না করলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে না।

একটি গোষ্ঠী যখন যুক্তনির্বাচন সম্পর্কিত নীতির কারণে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করছিল ও দলটিকে জাতীয়তাবিরোধী বলে অভিহিত করছিল এবং অপর একটি গোষ্ঠী যখন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে অপারগতার কারণে আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করছিল তখন ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে শহীদ দিবস পালন উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেন যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন হলো পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দাবি।

তিনি দাবি করেন যে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গেলে পূর্ব পাকিস্তানের বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যেমন দেশের দুই অংশের বার্ষিক রাজস্ব খাতে যে বৈষম্য রয়েছে তা আর থাকবে না, কেননা রাজস্ব খাতের উৎসগুলির বণ্টন সে ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অনেকখানি সুষম হয়ে উঠবে দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে ।

শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয় ও মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে রাখার দাবির পুনরাবৃত্তি করে তিনি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে রাজস্ব আয়ের উৎসগুলি প্রদেশের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানান। সমাপনী ভাষণে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা কেবল ভাষাবিশেষের জন্য জীবনদান করেননি বরং জাতীয় জীবনের গণতান্ত্রিক দাবিগুলির জন্যও জীবন উৎসর্গ করেছেন। ভাষা আন্দোলন তাই ভাব প্রকাশেরই এক আঙ্গিক 

এভাবেই আতাউর রহমান দৃষ্টত সাংস্কৃতিক ইস্যুকে আর্থ-রাজনৈতিক ইস্যুর সাথে সম্পর্কিত করেন। অনেকটা এই সময় নাগাদ দলীয় সংগঠনের ভূমিকার প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী। লীগের অভ্যন্তরে মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান ও দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘদিনের মতবিরোধ নিয়ে একটা সঙ্কটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সোহরাওয়ার্দী এ বিরোধ নিষ্পত্তির দায়িত্ব দিয়েছিলেন আবুল মনসুর আহমদকে। তিনি দেখলেন দলের সংসদীয় ও সাংগঠনিক শাখা দুটির মধ্যে বিশেষ ধরনের মতবিরোধের এই সংঘাতটি তুঙ্গে উঠেছে দলের সম্পাদকের এ বিষয়ে নিজস্ব কিছু দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে । আবুল মনসুরের মতে সমস্যাটি এরকম: দলের সম্পাদকের ধারণা জেলা আওয়ামী লীগের স্থান অপেক্ষাকৃত ঊর্ধ্বে, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের স্থান অপেক্ষাকৃত ঊর্ধ্বে।

২৮ অবশ্য আতাউর রহমানের নিজস্ব ধারণা ছিল এই যে, শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই মুখ্যমন্ত্রী হতে চান আর ঐ মতভেদ ছিল তাঁকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে উৎখাত করার একটা অজুহাত মাত্র। তিনি এমন বহু দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যেসব ক্ষেত্রে দলের কর্মীরা এমনকি মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত প্রণয়নের এখতিয়ারেও হস্তক্ষেপ করেছে, আর জেলা কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে হস্তক্ষেপ তো করেছেই।

২৯ আতাউর রহমান নিশ্চিত ছিলেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান দলের অভ্যন্তরে একটি চক্র গড়ে তুলেছেন তাঁর ওপর কলঙ্কারোপের উদ্দেশ্যে, আর এতে মুজিব অন্তত এই অবধি সফল হয়েছেন যে, এমনকি, সোহরাওয়ার্দীও আতাউর রহমানের বিশ্বাসযোগ্যতায় সন্দিহান হয়ে ওঠেন ও তাঁকে সরাতে চান । আবুল মনসুর আহমদ এই সাক্ষ্যও দিচ্ছেন যে, সোহরাওয়ার্দী আতাউর রহমানকে সরিয়ে দিয়ে তাঁকেই সেখানে বসানোর চিন্তা করছিলেন, কিন্তু আসন্ন নির্বাচনের মুখে তেমন কাজ কৌশলগত দিক থেকে ঠিক হবে না বুঝতে পেরে সে উদ্যোগে ক্ষান্ত দেন। 

খুব সম্ভবত আতাউর রহমান দলের কাছে সম্পদ গণ্য হওয়ার চেয়ে দায় হয়ে উঠেছিলেন “অপারেশন ক্লোজড ডোর” (OCD)-এর নানা প্রতিক্রিয়ার কারণে । এ অভিযান চলে হিন্দুদের ওপর। আওয়ামী লীগের একাংশের কাছে এ ব্যবস্থা জনপ্রিয় ছিল না। ওসিডি অভিযান শুরু হয় ১৯৫৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর । এ সময় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আতাউর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত বরাবর এলাকায় চোরাচালান বন্ধ করার কাজে সশস্ত্র বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানান।

এর আগে আওয়ামী লীগ পরিষ্কার অবস্থান নিয়েছিল যে, বেসামরিক প্রশাসনে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো হস্তক্ষেপ হতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রীর। উল্লিখিত কার্যব্যবস্থা ছিল দলের অবস্থানের একান্ত পরিপন্থী। ইতঃপূর্বে যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার খাদ্যপণ্যের চলাচল ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনী তলব করার জন্য তীব্রভাবে সমালোচিত হন। যুক্তি দেখিয়ে বলা হয় যে, চোরাচালানের নেপথ্যে নানারকমের সুগভীর অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। সে কারণগুলি দু’ভাবে দূর যায়। একটি ব্যবস্থা হলো আইনসম্মত সীমান্ত বাণিজ্য; অন্যটি পূর্ব পাকিস্তানের দ্রুত

অর্থনৈতিক উন্নয়ন । কিন্তু শেষোক্ত দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে কাজ না করে মুখ্যমন্ত্রী। এক অনিশ্চিত নিরাময় ব্যবস্থা অবলম্বন করেছেন। দৃষ্টত মনে হয়, জনাব আবু হোসেন সরকারের সেনাবাহিনী নিয়োগের সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রের প্রভাবমুক্ত ছিল না।

যদিও তিনি এ কথা অস্বীকার করে সিদ্ধান্তের সকল দায়দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নেন তবু তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদ দেওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যার ১ প্রস্তাবের সত্যতা তিনি স্বীকার করায় এ আভাসই মেলে যে ওসিডি-এর বেলায় সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে আতাউর রহমান খানের খোলা মনের পরিচয় পেয়ে প্রেসিডেন্ট সম্ভবত নিজের প্রয়োজনে তাঁর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে একটি যোগসূত্র গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। আর প্রস্তাবিত ওসিডি ছিল এ ক্ষেত্রে এক যাচাই নিরীক্ষামূলক ব্যবস্থা।

তবে নেপথ্যে যেসব কারণই ক্রিয়াশীল থাক না কেন, অন্তর্দলীয় কোন্দল ছিল এক বহুল আলোচিত বিষয়। এতে আওয়ামী লীগের গঠন কাঠামোর দুরবস্থাই প্রতিফলিত । অনেকের দল ছেড়ে ন্যাপে যোগ দেওয়া এবং ওসিডি চলাকালে হিন্দুদের ওপর নিগ্রহ নির্যাতনের খবরে আওয়ামী লীগ থেকে হিন্দুদের সমর্থন তুলে নেওয়ার ফলে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদেও আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের দুর্বলতা মুসলিম লীগে উদ্যম সঞ্চার করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভরাডুবির পর প্রথমবারের মতো মুসলিম লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি জনসভা করতে সক্ষম হয় । এমনকি, নুরুল আমিন আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ দেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকালে হত্যাকাণ্ডের হোতা তিনি ছিলেন বলে যে দাবি করা হয় তার সত্যতা প্রমাণ করার জন্য (কেননা, এখন তো তাদের হাতে সব রেকর্ডপত্র রয়েছে)। আওয়ামী লীগ তাঁকে “খুনি” বলেছিল।

আবদুস সাত্তার অভিযোগ করেন, কংগ্রেসের যোগসাজশে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ মসজিদের চেয়ে মন্দির মেরামতে বেশি ব্যয় করছে। এর কয়েকদিন পরে মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক আবুল কাসেম প্রকাশ্যে বলেন, আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পোন্নয়ন বিঘ্নিত করছে। 

মুসলিম লীগ প্রচারণার যে প্রবণতা গড়ে তোলে তাতে স্পষ্টত ন্যাপ উদ্বিগ্ন হয় । কিন্তু নিজ থেকে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষমতা তার ছিল না । এ কারণে, ন্যাপের একাংশ ১০-দফার ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের সাথে একটা কাজের আঁতাতে আসার পক্ষপাতী ছিল। এ ছিল ভাসানী ও ন্যাপের পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের প্রকাশ্য অভিপ্রায় বিরোধী। তবে ন্যাপের উল্লিখিত ভিন্ন মতাবলম্বীরা আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা উৎখাতে বিরোধীদলের প্রয়াসে কোনো রকম সহযোগিতা না দিতে দৃঢ়সংকল্প ছিল।

ফলে, ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম তিন মাসের জন্য বাজেট হিসাব-সংক্রান্ত সরকারের আনীত এক প্রস্তাবের পরাজয় থেকে রক্ষা করে। ১৯৫৮ সালের ২৪ মার্চ ন্যাপ (পার্লামেন্টারি দল) সিদ্ধান্ত ওপর গৃহীত ভোটের সময় ন্যাপ পরিষদে অনুপস্থিত থেকে মন্ত্রিসভাকে তার নিশ্চিত নেয়, যদিও দল মন্ত্রিসভার গণবিরোধী কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত তবুও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ঐ মন্ত্রিসভাকে উৎখাত করার চেষ্টা করবে না।

কেননা, সে রকম পদক্ষেপ ধারা জারির সুযোগ করে দেবে আর তাতে আসন্ন নির্বাচন বিলম্বিত হবে। মন্ত্রিসভাকে উৎখাতের জন্য “প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির” যে কোনো প্রয়াসের বিরোধিতা করার এবং ১০-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের সাথে দরকষাকষিমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । 

ন্যাপের হাজী মোহাম্মদ দানেশ তাঁর দলের এ ভূমিকার সপক্ষে এই বলে যুক্তি দেখান যে, পরিষদে এই দলের ভূমিকা হলো সরকারকে সঠিক দিকনির্দেশনায় পরিচালনা করা। নিছক (নেতিবাচক অর্থে) মন্ত্রিসভার পতন ঘটানো নয়। এতে তুষ্ট আতাউর রহমান সমর্থনদানের জন্য ন্যাপকে অভিনন্দন জানান।৩৫ এই পর্যায়ে মওলানা ভাসানী তাঁর। ইতঃপূর্বেকার ভূমিকার কতকটা ব্যত্যয় ঘটিয়ে এক বিবৃতি দেন।

এ বিবৃতিতে তিনি আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভাকে উৎখাতের চক্রান্ত প্রতিরোধের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান ১৯৫৮ সালের ৩০ মার্চ ঢাকায় ন্যাপ তার সংসদীয় দলের এক ৩৬ সভায় দলের এ সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করে এবং পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চক্রান্ত সম্পর্কে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকার ও চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য জনগণকে সতর্ক করে দেয়। এই সভায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কলকাঠি নাড়াচাড়ায় দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রয়াসে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

 

কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাপের পূর্ব পাকিস্তান শাখা এ বিষয়ে পরিপূর্ণ একমত হতে পারেনি। একদা ঢাকা আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা ও পরবর্তীকালে ন্যাপের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইয়ার মোহাম্মদ খান দলত্যাগ করেন। তিনি এক বিবৃতিতে ন্যাপ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তারা সুবিধাবাদী ও একইসঙ্গে কমিউনিস্ট। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, দলের অপেক্ষাকৃত অনুগত সদস্যরা সক্রিয় নন আর যারা সক্রিয় তারা ভাসানীকে তাদের নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কাজে লাগাবেন। কাজ ফুরিয়ে গেলেই তাঁকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে ।

সাংগঠনিক দিক থেকে দেখলে ধারণা হয়, ন্যাপ, দল হিসেবে এতই দুর্বল ছিল যে, শুধুমাত্র কৌশলের কারণে হলেও আওয়ামী লীগের সাথে একটা যোগসূত্র রাখতে বাধ্য হয়েছিল । সে যাই হোক, এই দল তারপরেও নিজেকে আওয়ামী লীগের ত্রাণকর্তা হিসেবে। দেখানোর চেষ্টা করে । আওয়ামী লীগের সমস্যাও ছিল অনেক । আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে তার অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছিল । দলের অন্তর্কলহ ও কোন্দল নানা মাত্রায় বাড়ছিল ।

মুসলিম লীগ তার স্বকীয় পন্থায় নিজের ভিত প্রশস্ত করার চেষ্টা করছিল । সর্বোপরি, দলের একমাত্র জাতীয় পর্যায়ের নেতা সোহরাওয়ার্দী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এসবের কোনো কোনোটির দৃষ্টত সঙ্গত কারণও ছিল । তবু বহু পূর্ব পাকিস্তানী অন্যান্য দল ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেয় ৷ বিষয় এ ক্ষেত্রে এই যে, তাদের প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগে যোগ দেয় এ কারণে যে, তাদের ধারণা আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর দল এবং তাদের বিশ্বাস এ দল কৌতূহলোদ্দীপক অগ্রগতি ও প্রগতি নিশ্চিত করবে ।

এ দলের নেতৃবৃন্দ নিবেদিতপ্রাণ, সহিষ্ণু ও নিঃস্বার্থপরায়ণ বলে মনে করা হতো । সংবাদপত্রের নানা প্রতিবেদন দেখে বোঝা যায়, ১৯৫৮ সালের প্রথম সিকিভাগে কমপক্ষে ৪০০০ পূর্ব পাকিস্তানী ঠিক এসব গুণগত কারণেই আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

এ সময়ে যারা আওয়ামী লীগে যোগ দেন তারা তাদের এ সিদ্ধান্তের পক্ষে বিশটির মতো কারণ দেখান । এ ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব সর্বাধিক বিবেচনা লাভ করে। এর পরের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনাটি ছিল এই মর্মে বিশ্বাস যে, একমাত্র আওয়ামী লীগই বাঞ্ছিত পথে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের ত্যাগতিতিক্ষায় নির্ভর করা যায় ।

সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে আওয়ামী লীগে নবাগতদের বেশিরভাগই ছিল কেএসপির। এর পরের স্থান যথাক্রমে রক্ষণশীল মুসলিম লীগ ও প্রগতিবাদী ন্যাপের। এতে আওয়ামী লীগের মঞ্চসূলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আরো জোরদার হয় । এই নবাগতদের চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, ঢাকা, বগুড়া, ময়মনসিংহ ও সিলেটে প্রায় দেশজোড়া অবস্থান বিন্যাসের সুবাদে দলের দেশব্যাপী পরিসর বাড়তে থাকে।

একই সময়ে এই মর্মে খবর পাওয়া যায় যে আওয়ামী লীগ স্থানীয় স্তরে তথা ওয়ার্ড, থানা, ইউনিয়ন ও মহকুমা পর্যায়ে শাখা কার্যালয় স্থাপন করছে, কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করছে, কর্মকর্তা বাছাই করছে ও আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করছে। ৩৯ এ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দী নিজে প্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সফরে গিয়ে জনসভায় ভাষণ দেন। ফলে মার্চ ১৯৫৭ ও ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ৬টি উপনির্বাচনের পাঁচটিতে জয়লাভ করে।

উল্লেখ করা যায়, ঐ একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করছে এমন অন্যসব দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের দল গঠন তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি। এমনকি সরকারি বা বেসরকারি মুখপত্রেও অন্য কোনো সংগঠনেরও এরকম তৎপরতার খবর পাওয়া যায়নি বাহ্যত দেখা যায়, ঐ সব দল গোটা পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় সভাসমিতি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত এবং এমন একটা ধারণার সৃষ্টি করে যেন তারা আওয়ামী লীগকে পরাভূত করার কৌশল আঁটছে।

আওয়ামী লীগের সমস্যাবলির একটি তৃতীয় মাত্রাও ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের দলীয় রাজনীতিতে নাক না গলাবার কথা থাকলেও তিনি কেএসপির মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে কাজ করার জন্য খুবই চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন । তাই আওয়ামী লীগের মুখ্যমন্ত্রী ১৯৫৮ সালের ৩০ মার্চ প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার পরামর্শ দিলে গভর্নর এই অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত মুখ্যমন্ত্রীকে পদচ্যুত করলেন যে, তিনি আর আইনসভার আস্থার অধিকারী নন। আর একইসঙ্গে কেএসপির আবু হোসেন সরকারকে ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করা হয় । কিন্তু কেন্দ্রে নূন

মন্ত্রিসভার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সোহরাওয়ার্দী অপরিহার্য হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর মন্ত্রিসভাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজন ছিল। তাই ফজলুল হককে পদচ্যুত করা হয়। তৎকালে পূর্ব পাকিস্তানের অস্থায়ী গভর্নর ও পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য সচিব, একজন সিএসপি অফিসার আবু হোসেন সরকারকে ১৯৫৮ সালের ১ এপ্রিল পদচ্যুত করে আতাউর রহমানের পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভাকে পুনর্বহাল করেন। ঐ একই দিনে আতাউর মন্ত্রিসভার পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক আনীত ও ন্যাপের মাহমুদ আলী কর্তৃক সমর্থিত আস্থা প্রস্তাব পাস করা হয় ।

প্রস্তাবটির পক্ষে ১৮২, বিপক্ষে ১১৭ ভোট পড়ে এবং ১০ জন সদস্য ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। বোঝা যায়, ন্যাপের সঙ্গে এক সমঝোতায় আসার জন্য সময় কেনার ও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ যে চেষ্টা করে যাচ্ছিল সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে হতাশ করার জন্য ফজলুল হক উদ্যোগী হয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী-নূন আঁতাত তাঁর সে উদ্যোগে বাধা হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ-ন্যাপ সমঝোতাও ফলপ্রসূ হয়নি ।

আর সে কারণে ন্যাপ মন্ত্রিসভা থেকে স্বীয় সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে ১৯৫৮ সালের ১৯ জুন এক ছাঁটাই প্রস্তাবে আতাউর রহমান মন্ত্রিসভার পতন ঘটে । এরপর কেএসপি মন্ত্রিসভার দায়িত্বভার নিলেও ১৯৫৮ সালের ২২ জুন এক অনাস্থা ভোটে পরাজিত হয় । শেখ মুজিবুর রহমান অনাস্থা প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে প্রস্তাবের পক্ষে ১৫৬ ও বিপক্ষে ১৪২ ভোট পড়ে। এতে প্রথমে ১৯৩ ধারা বলবৎ করার পর সকল মহলের প্রবল দাবি ও চাপের মুখে ১৯৫৮ সালের ২৫ আগস্ট আতাউর রহমানকে মুখ্যমন্ত্রী পদে পুনর্বহাল করা হয়।

তবে আতাউর রহমান খান ও আবুল মনসুর আহমদ উভয়েই বলেছেন যে সোহরাওয়ার্দী ততদিনে আতাউর রহমানকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর ব্যাপারে উপদলীয় চাপের কাছে কার্যত নতিস্বীকার করেছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে স্বপদে বহাল রাখা হয়। পরবর্তী মন্ত্রিসভার সদস্য কে কে হচ্ছেন এমনকি তার তালিকা নিয়ে তাঁর সাথে কোনো রকম আলোচনাও করা হয়নি। 

এক বছর মেয়াদে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় ফিরে আতাউর রহমান লক্ষ্য করেন, পাটের দাম পড়ে যাওয়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদির দাম চড়ে যাওয়ায় প্রদেশে বিক্ষোভ বিরাজ করছে । দ্রব্যমূল্য কমাতে না পারলে গদি ছাড়ার দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভ হয়। বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা বর্ধিত মহার্ঘ ভাতা ইত্যাদির দাবিতে অনশন ধর্মঘট করেন । 

অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ, অসন্তোষ কোনো নতুন বিষয় ছিল না । তবে সাধারণ নির্বাচন ঘাড়ের ওপর এসে পড়ায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় ফিরতে চাওয়া যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য বেশ উদ্বেগজনক বটে । এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অবধিও ক্ষমতায় টিকে থাকা রীতিমতো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। কারণ কোয়ালিশনের মিত্ররা মোটেও নির্ভরযোগ্য ছিল না। এভাবে যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় সেই উত্তেজনার আগুনে ঘৃতাহুতি দেন প্রাদেশিক পরিষদের তৎকালীন বৈরী

স্পিকার । জানা যায়, এই স্পিকার মহোদয় সর্বদাই সরকারের জন্য সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেন। তাই পরিষদে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে চেয়েছিলেন। স্পিকার তাঁর সচিবালয়ের জন্য বর্ধিত ব্যয় বরাদ্দের অনুমোদন চেয়েছিলেন ও তাঁর নিজেকে আরো ক্ষমতাবান করার আইন পাস করতে চেয়েছিলেন, তাঁর সে প্রস্তাব অবশ্য সফল হয়নি। ১৯৫৮ সালের জুনে সোহরাওয়ার্দী তাঁর এ প্রয়াসে বাধা দেন । তবে আগস্টে এ উদ্যোগ আবার নেওয়া হয় বিরোধীদলের সহযোগিতা ছাড়াই ।

২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভাকে অপদস্থ, হেয় করার এক পরিকল্পিত প্রক্রিয়া শুরু হয় । প্রাদেশিক আইনসভা থেকে আওয়ামী লীগের ছয়জন সদস্যকে বহিষ্কার করার দাবি ওঠে, কেননা তাঁরা সরকারি পদে থাকায় নির্বাচন কমিশন তাদেরকে পরিষদ সদস্য থাকার অযোগ্য ঘোষণা করেন । তবে প্রকৃত পরিস্থিতি কী তা স্পষ্ট ছিল না, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার এক বিশেষ অধ্যাদেশ বলে নির্বাচন কমিশনের ঐ রায় নাকচ করেছিলেন।

এদিকে স্পিকার তাঁর রুলিং ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংরক্ষিত রাখেন ও ন্যাপ সদস্য দেওয়ান মাহবুব আলী কর্তৃক স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করার অনুমতি দেননি৷ দৈহিক সহিংসতা সৃষ্ট হট্টগোলের মধ্যে স্পিকার পরিষদকক্ষ ত্যাগ করলে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পরিষদে স্পিকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মাহবুব আলীর প্রস্তাব ও পিএনসির পিটার পল গোমেজ আনীত অপর এক প্রস্তাবে স্পিকারকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা করা হয় ও হৈ হট্টগোলের মধ্যে ঐ প্রস্তাব পাস হয়। 

নির্বাচন কমিশন কী রায় দিয়েছে তার জন্য বিরোধীদলের দাবি যতটা নয় তার চেয়েও বরং পরিষদে আওয়ামী লীগের শক্তি হ্রাস করার জন্যই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো হয় । আর আওয়ামী লীগও কেন্দ্রে তার শক্তির কলকাঠি কাজে লাগিয়ে উল্লিখিত অধ্যাদেশ স্বীয় উদ্দেশ্যসাধনে ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব খাটো করে। অথচ নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও এখতিয়ার হলো গণতান্ত্রিক কর্মপরিক্রমায় এক অপরিহার্য অঙ্গ। এতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পদ্ধতি ও সরকার কাঠামোর শূন্যভিতই উন্মোচিত হয়েছে।

২৩ সেপ্টেম্বর নাগাদ আওয়ামী লীগ কেএসপির কয়েকজন সদস্যকে সপক্ষে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। সংখ্যা শক্তির দিক থেকে দুর্বল হয়ে বিরোধীপক্ষ দৈহিক শক্তি প্রয়োগে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার শাহেদ আলীকে (আওয়ামী লীগের সদস্য) তাঁর কাজে বাধা দেয়। চেয়ার ও হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র তাঁকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হলে তিনি আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সভাপতি প্যানেলের অন্যতম সদস্য জিয়াউল হাসান পরিষদের কাজ চালানোর দায়িত্ব নিয়ে পরিষদের অধিবেশন পরের দিন পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেন ।

২৬ তারিখে জনাব শাহেদ অনেকগুলি আঘাতজনিত কারণে মারা যান। বিরোধীদলের যে সব সদস্যকে হাঙ্গামা, হট্টগোলের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় তাদেরকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয় ৪৫ আবুল মনসুর আহমদ এ বিষয়ে পরিতাপের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, “আওয়ামী লীগকে রক্ষা করতে গিয়ে শাহেদ আলী বিরোধীদলের নিক্ষিপ্ত ইটপাটকেলের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। এ সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের দুশমনরা এখনো বলে থাকে আওয়ামী লীগই শাহেদ আলীকে হত্যা করেছে।” তিনি এ “অভিযোগ মিথ্যা বলে অভিহিত করেন।

অবশ্য, বিগত কয়েক মাস ধরে পরিস্থিতি যেভাবে গড়াচ্ছিল তাতে আওয়ামী লীগও কোনো কোনো দায়িত্ব থেকে রেহাই পেতে পারে না। ন্যাপের মাঝে মাঝে ভ্রান্তিজনিত কার্যকলাপের কারণেও পরিস্থিতি আরো অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। সে যাই হোক, বলা হয়ে থাকে যে, প্রধানত এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে দেশে সামরিক আইন জারি করা হয় । এর মধ্যবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যার কথিত প্ররোচনায় ফিরোজ খান নূন আওয়ামী লীগকে তোষামোদ করে কেন্দ্রীয় সরকারে মন্ত্রীর পদ গ্রহণে রাজি করান ।

আওয়ামী লীগ এ প্রস্তাব গ্রহণ করে পুনরায় তার পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের পরিপন্থী কাজ করে। শাসকচক্রের চক্রান্তের শিকার হওয়ার মতো দুর্বলতা আওয়ামী লীগের ছিল—এ থেকে অন্তত সে রকম ব্যাখ্যাই করা যায়। কিন্তু আঞ্চলিক ইস্যুগুলির জন্য এক জাতীয় ঐকমত্য গড়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের তথা সোহরাওয়ার্দীর আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় এনে এরকম ব্যাখ্যায় যাওয়া চলে যে, আঞ্চলিক ইস্যুগুলি সম্বন্ধে জাতীয় স্তরে মতপার্থক্য দূর করার জন্য এ অভিপ্রায় এক প্রয়োজনীয় নমনীয়তারই বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলির বেলায় একটি বাস্তবতা লক্ষণীয়।

সেটি হলো এই রাজনৈতিক দলগুলি তাদের সীমিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ঘন ঘন তাদের অবস্থান বদলায় । যেমন পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কখনো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করেছে, কখনো বা তার বিরোধিতা করেছে, আর সেটা কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে। মুসলিম লীগ হঠাৎ করেই পাকিস্তানের পাশ্চাত্যপন্থী পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনায় অবতীর্ণ হয়।

তাই সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যদি বিভিন্ন ইস্যুর ভ্রান্ত মোকাবেলা করে একটা অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামরিকীকরণ দ্রুততর ও সেই পথ প্রশস্ত করে থাকে তাহলে খান আবদুল কাইয়ুম খানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগকেও মাত্রাতিরিক্ত বিদ্রোহী হঠকারিতার ভূমিকার জন্য সমানভাবেই দায়ী করা যায় ।

পরিস্থিতি আরো বেশি করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, কেননা, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও সিন্ধু প্রদেশে গফফার খান, জিএম সৈয়দ, মোহাম্মদ আইয়ুব খুরো, মীর গোলাম আলী তালপুর, পীর পাগারো ও মানকি শরীফের পীরের মতো বিভিন্ন ও বিচিত্র মতবাদের নেতাদের এক ইউনিটবিরোধী জোট বা জমায়েত আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বেলুচিস্তানের কালাত রাজ্যের খান প্রকাশ্যে বিদ্রোহীর মনোভাব প্রদর্শন করেন ।

এসব মিলে অবস্থা যা দাঁড়ায় তা রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, কারণ, না ছিল তাঁর কোনো রাজনৈতিক সমর্থন লাভের বুনিয়াদ, না ছিল বৈধতা যদিও তা সত্ত্বেও তিনি স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা করছিলেন । অরাজক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি সামরিক আইন আরোপ করেন, শাসনতন্ত্র বাতিল করেন, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদগুলি ভেঙে দেন, সকল মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন এবং রাজনৈতিক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করেন ।

এমনকি তাদের সম্পদ আটকে দেন আর তারপর তিনি তাঁর আগ বাড়ানো কাজের কৈফিয়ত উদ্ধত ভঙ্গিতে এই বলে দেন যে, “আমার এসব কাজের পেছনে আইনের কিংবা শাসনতন্ত্রের অনুমোদন নেই । আমি যা করেছি তা কেবল নিজ বিবেকের অনুশাসনে । ” তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতে এর কারণ হলো “প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্যার চারপাশে যে ছোট একদল ক্ষমতার অভিজাতদের সমাবেশ ঘটে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অঙ্গীকারের অভাব ছিল।

” তালুকদার উপসংহার টেনেছেন এই বলে: “রাজনৈতিক পতনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে ১৯৫৭ কিংবা ১৯৫৮ সালের গোড়ার দিকেও যদি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো তাহলে পাকিস্তানের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের (আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগ) প্রতিফলন ঘটতো জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আর তাতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ এড়ানো যেতো।

” কিন্তু পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, প্রেসিডেন্ট মীর্যা ও তাঁর অনুসারীরা ঐ অনিবার্য সমাধানকে সহজে ও পরিকল্পিতভাবেই পাশ কাটাতে পেরেছিলেন, কেননা সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রের শীর্ষস্তরগুলির ব্যক্তি ও সাংগঠনিক উচ্চাভিলাষগুলি একাট্টা হয়েছিল। এই সমাবেশ বা জোটকে সমর্থন জানিয়েছিল ব্যবসায় মহলের অভিজাতবর্গ, এতে আরো ইন্ধন যুগিয়েছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আগ্রহী বিদেশী স্বার্থান্বেষী মহল।

 

আওয়ামী লীগের বিপর্যয় পর্ব-২

 

যুগপৎ তারা আওয়ামী লীগসহ সেইসব পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাকে হটিয়ে দেয় যারা পাকিস্তানের মতো সদ্যোজাত দুর্বল দেশে রাষ্ট্র ও জাতিগঠনমূলক কাজগুলি করছিল। তখন পাকিস্তানের জনসমাজে সংহতির অভাবের কারণ ছিল: খোদ পাকিস্তান আন্দোলনের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যাবলি, পাকিস্তানের ভৌগোলিকভাবে খণ্ডিত অবস্থান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সমাজ-রাজনৈতিক চেতন স্তর এবং শাসকবর্গের পটভূমি ও বিন্যাস ।

পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহের স্রোত পাকিস্তানকে ফেডারেল-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রণয়নের থেকে বহুদূরে নিয়ে যায়। যদিও আওয়ামী লীগ তার দরকষাকষি ও আপোসের রাজনীতির মাধ্যমে প্রয়াস করছিল পাকিস্তানে ফেডারেল-গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য ।

Leave a Comment