আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে পুনরুজ্জীবনের পথে

আজকের আলোচনার বিযয় পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত। শুরু থেকেই নানা রকম বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। আন্দোলন সংগ্রামের বন্ধুর পথের পাশাপাশি ছিল আভ্যন্তরীণ ভাঙ্গন, ষড়যন্ত্র সহ নানা বিষয়। আবার উঠে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। আবার নতুন করে নেতৃত্ব দিয়েছে জাতির। এই পর্বে সেই ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ এর ইতিহাসে পুনরুজ্জীবনের পথে

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-১

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-১

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর আরোপিত সামরিক আইন তুলে নেওয়া হয় ১৯৬২ সালের ৮ জুন। আর এই সাথে দুটি ঘটনা যুগপৎ ঘটে। এক, নতুন শাসনতন্ত্রের শুরু ও দুই, ঐ একই দিনে নতুন জাতীয় পরিষদ উদ্বোধন। অবাধ কার্যপরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য এর এক মাস আগে রাজনৈতিক সংগঠন (অনিয়মতান্ত্রিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

প্রেসিডেন্ট তার পরিকল্পনা বানচাল করার জন্য রাজনৈতিক তৎপরতার আশঙ্কা করেছিলেন। তাই স্পষ্টত এ ধরনের কোনো তৎপরতা নিবারণের অন্যতম ব্যবস্থা হিসেবেই এ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর আওতায় জাতীয় পরিষদ কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলির কার্যকলাপ ও তৎপরতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবধি সকল রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করা হয়।

আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, জামায়াত-ই-ইসলামী, নিজাম-এ-ইসলাম, রিপাবলিকান পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি—এসব দলের নাম উল্লেখ করে এ অধ্যাদেশে বলা হয়: এসব দল স্বনামে কিংবা ছদ্মনামে রাজনীতিতে লিপ্ত হতে পারবে না।

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-১

এভাবে যে কঠোর প্রাক- সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তা যে পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হচ্ছে তার সহজাত দুর্বলতা কতটুকু ও এ পদ্ধতির বাস্তবায়নে কী পরিমাণ বিরোধিতার মোকাবেলা করতে হবে সে বিষয়ে আইয়ুব খান যে সচেতন ছিলেন কেবল সেটাকেই স্পষ্ট করেছে । তাঁর এসব বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থা কিন্তু সকল নিষ্ক্রিয় রাজনীতিককে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অসন্তোষের অন্যতম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬২ সালের ২৪ জুন পূর্ব পাকিস্তানের নয় নেতা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে। নুরুল আমিন, আতাউর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, মাহমুদ আলী, ইউসুফ আলী চৌধুরী, পীর মোহসেন উদ্দিন, শেখ মুজিবুর রহমান (সদ্য কারামুক্ত) ও সৈয়দ আজিজুল হক এ বিবৃতিতে সই করেন।

ব্যাপক মতপার্থক্যসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা এই যুক্ত বিবৃতিতে এক বাক্যে একটি গণভিত্তিক শাসনতন্ত্র, ফেডারেল সংসদীয় ব্যবস্থা, পাকিস্তানের উভয়াঞ্চলের বৈষম্যের প্রতিবিধান ও ইতোমধ্যে সরকারের কাজ পরিচালনার জন্য শাসনতন্ত্রে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের কতিপয় বিধান অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। ১ এগুলি নতুন কোনো দাবি না হলেও সম্মিলিতভাবে উত্থাপিত হওয়ায় বিবৃতিটি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ঐ সব দাবির সর্বজনীন আবেদনকে স্পষ্ট করে তোলে ।

 

রাজনৈতিক নেতাদের ঐক্যের বিষয়টি অবশ্য তাঁদের জন্য কোনো শুভলক্ষণ ছিল। না যাঁরা রাজনৈতিক নেতাদের অনৈক্যের কারণেই ফায়দা লুটছিলেন। আর সে কারণেও অনৈক্যের মাঝেই তাঁদের টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল। ১৯৬২ সালের ১৫ জুলাই এক আইন পাস হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল শাসকচক্রের লক্ষ্য । স্পষ্টত এ আইন পাসের প্রয়াসও তাতেই নিহিত।

কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী যা তখনো তার অবস্থান তেমন মজবুত করে তুলতে পারেনি, এনডিএফ-এর মতো ‘একমেরু’ ফ্রন্টকে ‘বহুমেরু’ বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি দলের তুলনায় অধিকতর হুমকি বলে মনে করতো। রাজনৈতিক দলগুলিকে দুটি ফ্রন্টে লড়তে হতো। এক, সরকারি কায়েমি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, দুই, তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে।

আইয়ুব খানও উপলব্ধি করেন (বা তাঁকে সেই ধারণা দেওয়া হয়) যে, একটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে কাজ করাতেই নিহিত রয়েছে তাঁর নিজের শাসনতান্ত্রিক অবস্থানকে বৈধতা দেওয়ার সংক্ষিপ্ত পথ । সেই জন্য পাকিস্তানে কিছু রাজনৈতিক দলের আবশ্যকতা রয়েছে। তাই একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন পুরোপুরি উপেক্ষা করা যাবে না।

 

পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইতে লিপ্ত থাকলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের আসল ভূমিকা পালনে দুর্বল হয়ে পড়বে—এই ধারণাটি একটি বাস্তবতাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি। পূর্ব পাকিস্তানে যে কোনো বিরোধীদলীয় আন্দোলন তা দলবিহীন যুক্তফ্রন্টের নৃেতত্বে হোক কিংবা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হোক উভয় তরফকেই পূর্ব পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ পল্লীময় জনপদ থেকে উঠে আসা রাজনীতি সচেতন উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীমানসে অগ্রগণ্য ইস্যুগুলিকে অবশ্যই আমলে নিতে হচ্ছিল।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা ও পল্লীপূর্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতায় অবস্থানের এই অন্যতম বুনিয়াদকেই কব্জা করতে চেয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের এই গুরুত্বপূর্ণ জনশ্রেণীর মনোভাব, কি ছিল সামরিক আইনের শাসনামলেও পরিষ্কার বোঝা যায়, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। সামরিক আইন তুলে নেওয়ার সময় নাগাদ পরিস্থিতিতে কোনো মৌলিক বা বড় রকমের পরিবর্তন না হওয়ায় উক্ত মনোভাব বা অভিমত আগের তুলনায় আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে।

মোদ্দা কথা, ৬২ শাসনতন্ত্র তাদের পছন্দনীয় ছিল না, এই আমলে নেওয়া ব্যবস্থাদির কারণে দেশের দুই অংশের মধ্যেকার বৈষম্য কমেনি (বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যেকার বৈষম্য বেড়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়)। স্বভাবতই। সালের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে পূর্ব পাকিস্তানকে দীর্ঘদিন যাবৎ যে পন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল সেটিই চালু রাখতে হয়।

বলাবাহুল্য, সেই পন্থা বা পদ্ধতির তাত্ত্বিক উপস্থাপনার হলো: এক কার্যোপযোগী কাঠামোর মধ্যে “দুই অর্থনীতি” তত্ত্বের প্রয়োগ যার অর্থ এক স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব পাকিস্তান, যার থাকবে আইনত বৈধ এক স্বতন্ত্র অর্থনীতি। এভাবে এ প্রদেশটি অভিন্ন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির আওতায় পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানে বরাবরই এ ধরনের ব্যবস্থার অনুকূল অভিপ্রায়ের অস্তিত্ব স্পষ্টত লক্ষ্য করা যায়।

সামরিক আইন শাসকগোষ্ঠী গণতন্ত্রের সহজাত আত্মচর্চার প্রক্রিয়াকে বানচাল করে । তবু পূর্ব পাকিস্তানীদের উল্লিখিত অভিপ্রায় প্রশমিত হয়নি। এমনকি আরোপিত নিষ্ক্রিয়তার আমলে এবং তারপরেও এ বিষয়টি ‘নিষ্ক্রিয়’ রাজনীতিকদের দৃষ্টি এড়ায়নি । বরং বলা যায়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় নেতারা এ বাস্তবতা সম্পর্কে ঢের বেশি সচেতন ছিলেন। কিন্তু তখনকার দলীয় নেতৃত্ব আশাবাদী ছিলেন ও সঙ্কীর্ণতর “প্রাদেশিক” বা “আঞ্চলিক” ভূমিকার পরিবর্তে এক বিস্তৃততর জাতীয় ভূমিকা পালনেই মনোযোগী ছিলেন।

আর তাই প্রকাশ্য ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক “জাতীয় সমস্যা”র (এবং সম্ভবত ভারতাতঙ্ক ছাড়া) প্রতি নিরবচ্ছিন্ন গুরুত্বারোপ করেছিলেন। এই জাতীয় সমস্যাটি ছিল “পরিপূর্ণ সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি”র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এ কারণেই “জাতীয়তাবাদী” সোহরাওয়ার্দী “ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট” (এনডিএফ)-এর কল্পনা করেছিলেন। তাঁর এ কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেন দুটি বর্গ বা গোষ্ঠীর রাজনীতিক।

এর একটি গোষ্ঠীতে ছিলেন, তাঁর একান্ত অনুসারীর দল আর অন্যটিতে ছিলেন, কিছুকাল আগেও যাঁরা ছিলেন তাঁর প্রবল সমালোচক । এখানে বলা দরকার, ‘এবডো’ বিধির আওতায় স্বয়ং সোহরাওয়ার্দীসহ বেশ কিছু রাজনীতিকের বেলায় সক্রিয় রাজনীতি ১৯৬৬ সালের শেষ অবধি নিষিদ্ধ ছিল। তাই সোহরাওয়ার্দী কথিত নির্দলীয় আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প পথ অনুসরণের পরামর্শ কেন দিয়েছিলেন তার কারণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে খুব বেশিদূর এগিয়ে যাওয়ার দরকার পড়ে না।

ক্ষমতার কায়েমি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি কার্যকর সংহতি গড়তে সকল রাজনীতিককে একত্রিত করার আর কোনো বিকল্প ছিল না। তাঁর সাথে যাঁরা যোগ দেন তাঁরাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, রাজনৈতিকভাবে পরিস্থিতি আরো অনুকূল না হয়ে ওঠা অবধি অস্তিত্ব রক্ষার এই একটি মাত্র উপায়ই হাতে আছে। অবশ্য এরপরেও রাজনৈতিক দলগুলিতে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগে, পুনরুজ্জীবনের অনুকূল অন্তঃস্রোত বইতে থাকে ।

দলের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমদ স্বীকার করেন যে, “সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদার” কারণেই কেবল “স্বৈরাচারী ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট হিসেবে” এনডিএফ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তবে তিনি আরো ব্যাখ্যায় বলেন যে, আওয়ামী লীগের একাংশ। এনডিএফকে আপাতত শূন্যস্থান পূরণ ব্যবস্থা হিসেবেই মাত্র গ্রহণ করেছিল। বস্তুত, তাদের অনেকেই ছিল দলীয় পুনরুজ্জীবনে প্রবল আগ্রহী।

এক, নিজ নিজ দলীয় কর্মসূচির পক্ষে কাজ করার উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক দলগুলির তুলনামূলকভাবে মুক্তরাজনীতি পুনরুজ্জীবনের পর তাই দুটি ধারা দৃশ্যমান হয়ে পুনরুজ্জীবনের জন্য একেকটি দলের ভেতরের আলাপ-আলোচনা; ও দুই, সম্মিলিতভাবে একটি অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির পক্ষে কাজ করার জন্য এনডিএফ ফর্মুলাকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও এ এই দুই ধারাই যুগপৎ কাজ করতে থাকে।

এনডিএফ-এর সাথে আওয়ামী লীগের থাকলেও বিভিন্ন স্তরের বহু আওয়ামী লীগার স্বীয় দলের নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় নিয়োজিত হন । এই অংশেরই অভিমত প্রতিফলিত হয় ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনে এবং পুনরুজ্জীবিত দলের নীতি ও কর্মসূচিতে।

সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগারদের নেতা হলেও বাহ্যত তিনি আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের বিরোধী ছিলেন। তাঁর এ অবস্থানের কারণে পুনরুজ্জীবনবাদী আওয়ামী লীগাররা তেমন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারছিলেন না। ১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর এনডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলে আওয়ামী লীগ ফ্রন্টের অন্যতম শরিক হয়ে যায়।

এ ঘটনা ঘটে করাচিতে কিছু সাবেক মুসলিম লীগারের এক কনভেনশনে চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে মুসলিম লীগ (কনভেনশন) গঠনের এক মাস পরে। বাদবাকি মুসলিম লীগার অক্টোবরের শেষের দিকে ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) গঠন করেন। এরই মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে নিজাম-এ-ইসলাম ও জামায়াত-ই-ইসলামী পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল।

এভাবে এনডিএফ একটি পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন হয়ে ওঠে। এ সংগঠনের প্রতি মওলানা মওদুদী, মিয়া মমতাজ দৌলতানা, সরদার বাহাদুর খান, মোহাম্মদ আইয়ুব খুরো প্রমুখ পশ্চিম পাকিস্তানী নেতার সমর্থন ছিল। এই ফ্রন্ট একটি বলিষ্ঠ গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে পারতো। কিন্তু এনডিএফ যে যে রাজনৈতিক দলের সমবায়ে গঠিত এক মোর্চা ছিল সেই সব দলের আদর্শ ও অগ্রাধিকারগুলির মধ্যে মিল ছিল না আর সেই সাথে ছিল স্বতন্ত্রভাবে দলীয় পুনরুজ্জীবনের হাতছানি।

পরের ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে গড়ায় তাতে প্রমাণিত হয় যে, যেমন জোরদার গণআন্দোলন সম্ভব নয় তেমনি দলীয় পুনরুজ্জীবনের প্রলোভন কাটিয়ে ওঠাও সম্ভব নয়। ফলে সর্বাত্মক ঐক্যভিত্তিক প্রবল গণআন্দোলন সে সময়ে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবুও এরপরেও পূর্ব পাকিস্তানের এনডিএফ-এর কিছু জনপ্রিয়তা থেকে যায় প্রধানত সোহরাওয়ার্দীর প্রদেশব্যাপী বিভিন্ন সভা-সমিতিতে ভাষণ ও বক্তবা প্রদানের কারণে। তিনি এসব সভায়-সংসদীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক দেন।

১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র এভাবে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ফলে ১৯৬২ সালের রাজনৈতিক দল আইন সংশোধন করে “রাজনৈতিক দল”-এর পুনঃসংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়; এবডো অধ্যাদেশকে আরো কঠোর করে তোলা হয় একটি বিধান সংযোজনার। মাধ্যমে। এই বিধান বলে এবডোর আওতাধীন রাজনীতিকদের এমনকি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার জন্য আরো দণ্ডের ব্যবস্থা করা হয়। আবার একই সাথে প্রেসিডেন্টের।

জারি করা ইশতেহার অনুযায়ী, অযোগ্যতার মেয়াদ মওকুফ বা হ্রাসের জন্য প্রেসিডেন্ট সমীপে আবেদন করার অধিকারও দেওয়া হয় এবডোর আওতায় পড়া রাজনীতিকদেরকে। এভাবে এই যে টোপ দেওয়া হলো তা স্পষ্টতই “আনুগত্যের” বিনিময়ে “ক্ষমা” বা “ইনাম”। দানের শামিল। সরকার ও রাজনীতিকদের মধ্যে এ ধরনের পোষক মক্কেল সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাপক পর্যায়ে সমালোচিত হয় ।

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র নেতারাও এক যুক্তবিবৃতিতে এই অধ্যাদেশের সমালোচনা করেন। তাঁরা সরকারকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেন যে, দমন-নিপীড়ন চলতে থাকলে ছাত্রদের জন্য সে অবস্থায় একটি মাত্র পথই খোলা থাকবে আর তা হলো এক “চূড়ান্ত ও জোরদার আন্দোলন শুরু করা, কেননা ইতিহাস তার নিজ-নির্ধারিত পথ ধরেই এগিয়ে যাবে।

” বাস্তবিকপক্ষেও ১৯৬২ সালের গোড়ার দিকে সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। জনসমাজের অপরাপর রাজনীতি সচেতন অংশের মতোই ছাত্ররাও নতুন শাসনতন্ত্র মেনে নিতে অস্বীকার করে ও ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রের যতগুলি কপি তারা হাতের কাছে পায় সেগুলি পুড়িয়ে তাদের বিরোধিতা প্রকাশ করে। এর পরের পর্যায়ে শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে তাদের অসন্তোষ আরো ঘোরতর হয়ে ওঠে।

কেননা তাদের মনে হয় যে, ঐ শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের লক্ষ্য আরো বিধিনিষেধ আরোপ করে শিক্ষার সুযোগ সঙ্কুচিত করা। ছাত্রদের আহূত প্রতিবাদ আন্দোলন সাধারণ ধর্মঘট অবধি গড়ায়—এ সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয় ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে। শিক্ষা কমিশনের ঐ রিপোর্টের সংশোধন করে ছাত্রদের দাবিদাওয়া আংশিক পূরণ করা হলেও সরকারের প্রতি সাধারণ অনাস্থার বিষয়টি নানা প্রতীকী ঘটনায় প্রকাশ পায় । আর বলাবাহুল্য, এ ধরনের অধিকাংশ ঘটনাই সহিংসতায় পর্যবসিত হয় । ছাত্র নেতারা গ্রেপ্তার হন । রাজনীতিকদের ওপর আরো বেশি করে কড়াকড়ি আরোপ করা হতে থাকে।

 

এনডিএফ-এর প্রতি সরকারের বিরূপ মনোভাব ছিল বেশ স্পষ্ট। সরকার সোহরাওয়ার্দীর মনোভাব ও উদ্দেশ্যের ইচ্ছাকৃত ভুল ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিতে থাকেন। এছাড়া, পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সম্ভাবনার একটা ভ্রান্ত কল্পভীতিও ছিল। শাসনব্যবস্থায় কেবল গণতন্ত্রায়ন অভিলাষী এনডিএফ-এর তুলনায় স্বায়ত্তশাসন ইস্যুর প্রশ্নে দৃঢ় ভূমিকায় অবতীর্ণ আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে অধিকতর ‘খোশ আমদেদ’ হবে—এ কথা ভাবাও অতিমাত্রিক কল্পনাবিলাসীরই সাজে।

যদি এ ধরনের বেঠিক মূল্যায়ন প্রেসিডেন্টের নানা সিদ্ধান্তের বুনিয়াদ হয়ে থাকে আর তা যদি তাঁকে নিজ অগ্রাধিকার জাতীয় সংহতি থেকে দূরে ঠেলে নিয়ে যায় তাহলে বলতেই হয় তিনি নিজেই স্বীয় সৃষ্ট অপ্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার শিকার কিংবা কয়েদি; তা না হলে এই বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় থাকে না, যা কিছু করা হয়েছে এসবই সংহতিনাশক শক্তিতে মদদ দেওয়ার সুপরিকল্পিত প্রয়াসের ফল।

সোহরাওয়ার্দী প্রায় অসম্ভব একটি কাজ করার চেষ্টা করছিলেন। কঠিন কাজটি ছিল দেশের বিভিন্ন ধারার সমাজ-রাজনৈতিক শক্তিগুলির মাঝে একটি সংহতি বিধান। আর এ মিশনটি তিনি সম্পন্ন করতে চেয়েছিলেন এক অভিন্ন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের নামে (যেমনটি জিন্নাহ্ করতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় মুসলমানদের জাতীয়তাবাদের নামে) যাকে বিরোধী নানা শক্তির নানা পাল্টা কৌশলের মোকাবেলা করতে হয়। এতে গোড়ার দিকে কিছুটা এগিয়েও ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে সোহরাওয়ার্দীর প্রবল সমালোচক ও বৈরী মওলানা ভাসানী ও নুরুল আমিন তাঁর এ ধারণাকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী পশ্চিম পাকিস্তানেও বেশ উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৯৬২ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে পরিস্থিতি পর্যালোচনার আলোকে কর্মপন্থা ও কৌশল নির্ধারণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের এক বৈঠক আহ্বানেও সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ হোসেন সাজ্জা ও জেডএইচ লারি, জামায়াত-ই-ইসলামীর মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ ও চৌধুরী গোলাম মোহাম্মদ, নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, রিপাবলিক্যান পার্টির মেজর সৈয়দ মোবারক আলী শাহ ও সর্দার আবদুর রশিদ, নিষ্ক্রিয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির খান আবদুল ওয়ালী খান ও মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরিকে সদস্য করে ঐ সময় পরিপূর্ণ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এক সর্বদলীয় সমন্বয়কারী সাবকমিটি গঠন করা হয়।

এনডিএফ তার ন্যূনতম কর্মসূচিকে যখন পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য ইস্যুকে স্থগিত রেখে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তখন পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঢাকায় দেওয়া কথিত এক বিবৃতি দেশের উভয় অঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে বেশ বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঐ মার্কিন রাষ্ট্রদূত নাকি এ কথা বলেন যে, তিনি তাঁর দেশ ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার চেষ্টা করবেন আর আমেরিকানদের সাথে পূর্ব পাকিস্তানীদের বৃহত্তর সমঝোতাও থাকা উচিত ।

তিনি বিশেষ করে বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানীদের আরো বেশি সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র সফর করা উচিত । তিনি এ কথাও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ দেখবে এবং এ অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগকে উৎসাহিত করবে।

পিপিএ ও এপিপির খবরে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার বিষয়টি গুরুতর বলে গণ্য করছেন ও একই খবরে কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রীর বরাতে বলা হয় যে, প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। ঐ সময়ে পাকিস্তানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতিকে “গোলমেলে, দুরভিসন্ধিমূলক”” বলে অভিহিত করে বিরক্তি প্রকাশ করেন ।

সামান্য ব্যতিক্রম বাদে বিষয়টি নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবেই ভিন্ন। পশ্চিম পাকিস্তানে এমন মনোভাব লক্ষ্য করা যায় যার বক্তব্য: যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবির নেপথ্যে রয়েছে (পশ্চিমাঞ্চলে একে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী উদ্যোগ’ বলে অভিহিত করা হয়)।

লাহোরের জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন। ও করাচি মুসলিম লীগের (কনভেনশন) মতো কিছু সংগঠন ঐ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথিত প্রস্তাব দেওয়ার জন্য বিবৃতির নিন্দা জ্ঞাপন করে ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকা হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ও ঢাকা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের

মতো সমিতি-সংগঠনগুলির কাছে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঐ বিবৃতি তেমন আপত্তিকর বিবেচিত হয়নি। বরং এসব সংগঠনের বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের বিশেষ প্রয়োজনের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের খেয়ালের বিষয়টির প্রশংসা করা হয়। 

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিকদের মধ্যে তৎকালে নিষ্ক্রিয় পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ আলী পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা করেন। অবশ্য, আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। নিষ্ক্রিয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুদ্দিন বলেছিলেন, মার্কিন সরকার সকল ক্ষেত্রে এ যাবৎ অবহেলিত পাকিস্তানের ‘পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে সাহায্য-সহায়তা করার ব্যাপারে যে আগ্রহ ও উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন, তা প্রশংসনীয়।

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, যেখানে মার্কিন ও অন্যান্য সাহায্য-সহায়তার ৭০ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করার বিষয় অবিসংবাদিত “সেখানে মার্কিন সরকার পাকিস্তানে পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার আলোকে যদি পূর্ব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় সাহায্য-সহায়তা বিলিবণ্টন সমস্যার সমীক্ষার চেষ্টা করে থাকে” তাতে দোষের কিছু নেই।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানের কথা কোনো বিবেচনায় না রেখেই পশ্চিম পাকিস্তানের বিশেষ বিশেষ প্রকল্পের জন্য সাহায্য চাওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতির ব্যাপারে যে আপত্তি তা “রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত যা অনভিপ্রেত মনে করা যায়। ” 

গোটা বিষয়কে ‘চায়ের পেয়ালায় তুফান’ হিসেবে বর্ণনা করে পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতিকে যৌক্তিকতা দেওয়ার প্রয়াস পায় । পত্রিকায় বলা হয়, সাহায্য-সহায়তা দাতাসংস্থা পাকিস্তান সরকার প্রণীত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও বাঞ্ছনীয়তার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেবে সেটা নতুন কিছুই নয়।

এ কাজ আগেও করা হয়েছে, তখন কোনো কথা ওঠেনি। পত্রিকায় ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘যে কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়েছে তার মতলব মিশ্র, একটি মতলবের জন্ম সেই কট্টর মহল থেকে যাদের “মার্কিন বিরোধিতা সাধারণভাবে তাদের পূর্ব পাকিস্তানের জন্য দরদের চেয়ে বেশি” আর দ্বিতীয়টি তাদের যারা “যে সব পূর্ব পাকিস্তানী তাদের প্রদেশের জন্য বরাবরই অর্থনৈতিক সুবিচারের দাবি জানিয়ে আসছে তাদের দাবিয়ে রাখতে চায়।”

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যের যে উদ্দেশ্যই থেকে থাক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা সেটিকে পূর্ব পাকিস্তানের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরার কাজে লাগিয়েছিলেন। তাছাড়া, জহিরুদ্দিনও বলেছিলেন, পাকিস্তানের একজন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কর্তৃপক্ষকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, ১ম পাঁচসালা পরিকল্পনার উন্নয়ন কার্যকলাপ কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য হওয়ায় তা দেশের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে আর সৃষ্টি হচ্ছে দুই অঞ্চলের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। তিনি এ দাবিও করেন যে, ২য় পাঁচসালা পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক ভারসাম্য পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে আনতে চাওয়ায় সোহরাওয়ার্দীকে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব খোয়াতে হয়েছে। এ ছাড়া বৈষম্যও

চলেছে। কাজেই স্পষ্টত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ও অন্যান্য সহায়তা যা পাওয়া যায় তার সিংহভাগ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে সমৃদ্ধতর করা হয়েছে, ঐ অঞ্চলকে উন্নত করে তোলা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ এ ধরনের বিদেশী সাহায্য-সহায়তায় উপকার না পাওয়ায় স্বভাবত বিদেশী সাহায্য-সহযোগিতার সার্থকতা ও উপযোগিতা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ঐ সব সাহায্যদাতা দেশের প্রতি বৈরিতা পোষণ করতে থাকে।

এ রকম পরিস্থিতিতে এ ধরনের যে কোনো দেশের প্রতিনিধি খুব স্বাভাবিক কারণেই দেখতে চাইবে যে, তার দেশ অকারণে যেন যে দেশ তাদের সাহায্য পাচ্ছে সেই দেশের একটা অংশ বা অঞ্চলের চক্ষুশূল না হয়ে পড়ে। সাবেক মন্ত্রী আবদুল খালেক এর সুযোগ নিয়ে দাবি তোলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতির উন্নতি সাধনের জন্য দ্বিঅর্থনীতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ৩য় পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। 

উল্লেখনীয় এই যে যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই যদি পূর্ব পাকিস্তানে নিজের জন্য অনুকূল জনমত সৃষ্টির প্রয়াস পেয়ে থাকে—যা নাকি লক্ষ্যগোচরভাবেই ৫০-এর দশকের গোড়া থেকে অনুপস্থিত ছিল—সেই কাজটি করা হলো যখন সদ্য সদ্য পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এসেছে জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে যিনি তখন তেমন পাশ্চাত্যপন্থী বলে পরিচিত ছিলেন না। কাকতালীয়ভাবে তখন ভারত-চীন বৈরিতার সময়কালে মার্কিন তরফ থেকে সহযোগিতার অনুরোধে আইয়ুবের তৃষ্ণীভাব প্রকাশ পায়।

বিষয়টি এমন সময়ে ঘটে যখন তৃতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ চলছিল।১৪ আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য নিয়েও উত্তপ্ত আলোচনা চলছিল জাতীয় পরিষদে। আর তাতে যে সব প্রতিক্রিয়া হয় তাও এই ইস্যুতে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করে। অবশ্য তা আইয়ুব খানের আত্মবিশ্বাসের অবয়বে মৃদু চিমটির তাৎপর্য বহন করলেও (পূর্ব পাকিস্তানে) বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের ধারক এনডিএফ-এর ন্যূনতম কর্মসূচি থেকে তাঁর আগ্রহ আঞ্চলিক ইস্যুতে নিবদ্ধ করানোর কাজটি করে।

এর কোনো আশু লক্ষণীয় প্রভাব-প্রতিক্রিয়া না। থাকলেও এই মার্কিন উদ্যোগে দুইজন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতার সাগ্রহ সমর্থন ও এর অনুকূল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থেকে মনে হয় এটি ঐ সব আওয়ামী লীগারদের উদ্দীপনা- উৎসাহ যুগিয়েছে যাদের এনডিএফ ভাবধারা খুব বেশি আকৃষ্ট করতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রতি এনডিএফ-এর কোনো কোনো অঙ্গ সংগঠনের মতপার্থক্যের কারণে এনডিএফ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। 

এনডিএফ-এর মতো অবয়বহীন একটি সংগঠনের মধ্যে দ্বিধা-সংশয় স্বাভাবিক। তবে এই “ন্যাশনাল” ফ্রন্টের ওপর পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাব ছিল বেশ স্পষ্ট। ১৯৬৩ সালের গোড়ার দিকে ঢাকায় ফ্রন্টের সভায় অন্য বিষয়াবলিসহ পরিষ্কার উল্লেখ করা হয় যে, কোনো শাসনতন্ত্র গ্রহণযোগ্য হতে হলে তাতে (ক) ফেডারেশনের ইউনিটগুলির জন্য সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন; (খ) আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগত ব্যবস্থা; এবং (গ) স্থানীয় জনশক্তি ও অন্যান্য আবশ্যকতার ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তবে এ ফ্রন্টের কার্যপরিচালনা ও সম্পাদনে প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। এ অভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়েছিল আওয়ামী লীগ দলীয় পুনরুজ্জীবনের পক্ষপাতী গোষ্ঠীতে। নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবের এক বক্তব্যে এই মনোভাব ব্যক্ত হয়। তিনি বলেন:

দশ মাস আগে, একই পল্টন ময়দানে নয় নেতার বৈঠকের পর আমরা বাংলাদেশের ১৭টি জেলায় জনসভার আয়োজন করি। এসব জনসভায় আমরা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আবেদন জানাই । আমরা সেই মতো প্রস্তাবও গ্রহণ করি, কিন্তু হুজুররা আমাদের কথায় কান দেননি—আমাদের সকল আবেদন ও দাবিদাওয়া উপেক্ষা করা হয়েছে।

তাই শুধু বক্তৃতা-ভাষণ শুনে ঘরে ফিরে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকলে কাজ হবে না। এ জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন লড়াই – এ বিশ্ব বহু নিপীড়ককে দেখেছে, কিন্তু তাদের কেউই টিকতে পারেনি। আপনারা যদি গণদাবি উপেক্ষা করেন তাহলে নিজেরাই খতম হয়ে যাবেন। জাগ্রত জনতাকে দুনিয়ার কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না। 

পরবর্তীকালে কর্মী ও সাবেক দলীয় কর্মকর্তাদের বৈঠকে এনডিএফকে তার ন্যূনতম কর্মসূচি কৌশলভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়ার কথা স্থির করা হয়। আর তা করা হয় সভায় গৃহীত কয়েকটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, আইন পরিষদসমূহের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, ফেডারেল সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার বিধিবিধান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের চূড়ান্ত রায় সাপেক্ষে এক ইউনিট ব্যবস্থার বিলুপ্তি—প্রস্তাবগুলির অন্তর্ভুক্ত ছিল । 

স্পষ্টত এনডিএফ এ যাবৎকাল যে ন্যূনতম কর্মসূচির পক্ষে কাজ করেছে এগুলি তা থেকে সরে যাওয়ার সূচনা। আর তা সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন সত্ত্বেও এনডিএফপন্থীদের জন্য এক বিপর্যয়েরও ইঙ্গিত বহন করে।

এনডিএফ-এ ন্যাপের অব্যাহতভাবে থাকার বিষয়টিও সংশয়াপন্ন হয়ে পড়ে। নাজিমউদ্দিনও নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন হিসেবে এনডিএফ-এর ভবিষ্যৎ প্রশ্নে তাঁর নিজ সন্দেহ প্রকাশ করেন। এর কিছুকালের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের কথাবার্তা শোনা যেতে থাকে। ১৯

নিজ নিজ দলীয় পুনরুজ্জীবন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের সিদ্ধান্তহীনতায় তাদের নিজ নিজ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের প্রশ্নে দ্বিধা-সংশয়ের অস্তিত্ব প্রতিফলিত হয়। তাই শাসনতন্ত্র গণতন্ত্রায়নের এক-স্তর না গণতন্ত্রায়ন ও স্বায়ত্তশাসনের দ্বি-স্তর আন্দোলন—এ দুয়ের কোনটিকে বেছে নেওয়া হবে সে প্রশ্ন দেখা দেয়। এ নিয়ে দ্বিধা-সংশয় যখন চলেছে তখন আইন পরিষদের বিভিন্ন বিতর্কে আন্তঃআঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি (এটি স্বায়ত্তশাসন অভিপ্রায়ের বুনিয়াদ) ঘন ঘন উত্থাপিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন ছাত্র ফোরামেও এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।

ঢাকার এক ছাত্র সিম্পোজিয়ামে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন যে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে যে অসমতার অস্তিত্ব রয়েছে তা শোধরানো না হলে এ বৈষম্য দূর করা যাবে না। তার মতে, এ জন্যে প্রথম শর্ত হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের আমদানি নীতি আগাগোড়া সংশোধন করা না হলে এমনকি দুই বা তিনটি পাঁচসালা পরিকল্পনাও দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক অসমতা দূর করার জন্য পর্যাপ্ত হবে না।

এই সিম্পোজিয়ামের সভাপতি ড. আবু মাহমুদ বলেন, মূলধন বিনিয়োগের ওপর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভরশীল। পূর্ব পাকিস্তানের মূলধন নেই তা নয় তবে সে মূলধন পশ্চিম অঞ্চলে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বাইরের যাঁরা পুঁজিবিনিয়োগ করছেন তাঁদের মুনাফাও চলে যাচ্ছে এখান থেকে। তিনি এ অবস্থায় প্রশ্ন তোলেন: “তাহলে ব্রিটিশ আমলে যে অবস্থা ছিল তার সাথে এর তফাৎ কোথায়?”২০ তাঁর এ কথায় পূর্ব- পশ্চিমাঞ্চলের সম্পর্কের ঔপনিবেশিক বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত পরিষ্কার।

বিভিন্ন ছাত্র ফোরামে এ ধরনের আলোচনার তাৎপর্য নিহিত ছিল এই বাস্তবতায় যে, এটি পূর্ব পাকিস্তানের জনসমষ্টির একাংশের চেতনায় গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার গণতন্ত্রায়নের মতো সরল দাবি ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য দাবি জাগরূক রাখতে সাহায্য করে। আসলেও এই ছাত্রসমাজই অতীতে এই প্রদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে বরাবরই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্রসমাজ আইয়ুব খানের নেতৃত্বে সামরিক আমলাতান্ত্রিক বৃহৎ শিল্পপতি আঁতাতের শাসনের বিরুদ্ধে জঙ্গি বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয় ।

এই বিশেষ সিম্পোজিয়ামটি যখন অনুষ্ঠিত হয় সেই সময়েই আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক ছাত্র শাখা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নিজকে তার প্রস্তাবিত কাউন্সিল অধিবেশনের আগে বিরাট আকারে পুনর্গঠনে নিয়োজিত ছিল। 

সিরাজুল আলম খান (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ), কাজী জাফর আহমদ (পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন), রেজাউল হক সরকার (পাকিস্তান ছাত্রশক্তি) ও আবদুল হালিম (জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন)—জাতীয় পরিষদের উপনির্বাচন প্রশ্নে এক স্বাক্ষরিত যুক্তবিবৃতি দেন। এই বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ রাজনীতিতে কত গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট তার পরিষ্কার পরিচয় পাওয়া যায়। বিবৃতিতে “গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট” প্রার্থীদের ভোট প্রদানের ও মনোনীত “ছদ্ম” সরকারি প্রার্থীদের বিরোধিতা করার জন্য মৌলিক গণতন্ত্রীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় । তাঁরা বলেন, “আসুন, আমরা ছাত্র ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে মুক্তি ও গণতন্ত্রের বিরোধী সকল চক্রান্ত খতম করি।” এই বিবৃতিতে স্মৃতিচারণ করে বলা হয়, ১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্রসমাজ আইয়ুব খানের সরকারের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণিত দাবি নিয়ে সংগ্রাম করে আসছে:

১. পূর্ণ গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ও গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন;

২. মৌলিক অধিকারসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিনা বিচারে আটক সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তিদান এবং রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে সকল হুলিয়া প্রত্যাহার;

৩. পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান “গগনচুম্বী” অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান;

৪. সমাজের সকল স্তর থেকে শিক্ষা সঙ্কোচন নীতির অবসান; এবং

৫. কোনো রকম প্রতিরক্ষা আঁতাতের বাইরে অবস্থান এবং সাম্রাজ্যবাদী কিংবা কমিউনিস্ট কোনো শিবিরে যোগদান না করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ।

এই বিবৃতিতে ছাত্র ও জনগণের ঐ সব দাবি পূরণের লক্ষ্যে সম্মিলিত আন্দোলনের ওপর “স্টিমরোলার” চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য “স্বৈরাচারী, একনায়ক আইয়ুব সরকারকে অভিযুক্ত করা হয় । তবে তাঁরা একই সাথে ঘোষণা করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের চির জাগ্রত ও সজাগ ছাত্রসমাজের “আপোসহীন ও অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম” এখনো চলছে ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান না হওয়া পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে। 

ছাত্রদের ব্যাপারে তখন প্রায়ই উল্লেখ করা হতো যে তারা ভবিষ্যতের নেতা। এই ছাত্ররা বলিষ্ঠ যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুললেও প্রবীণ রাজনীতিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে, এমনকি একেকটি রাজনৈতিক দলের ভেতরেও ঐক্যের অভাব ছিল। আর এনডিএফ তার নামমাত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। এর অঙ্গ রাজনৈতিক দলগুলি তাদের নিজ নিজ দলীয় পুনরুজ্জীবনের বিষয় বিবেচনা করে দেখছিল বলে প্রায়ই খবর পাওয়া যেতে থাকে।

সোহরাওয়ার্দীর নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা আপাতদৃষ্টিতে বজায় থাকলেও, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে এই ইস্যুতে বিভক্তি দেখা দেয়। আর মওলানা ভাসানীর ভূমিকা এ ব্যাপারে মোটেও স্পষ্ট না থাকায় সর্বত্র, বিশেষ করে, নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে।

ন্যাপের সহযোগিতা ছাড়া কোনো অর্থবহ সম্মিলিত আন্দোলন সম্ভব নয় বলে মনে হওয়ায়, এই দলের পুনরুজ্জীবনের পরপরই আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবনের দরকার পড়ে। এ বিষয়ে এমনকি সোহরাওয়ার্দীরও কোনো সংশয় ছিল না। বাস্তবিকপক্ষেও তিনি নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের কর্মকর্তাদেরকে এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ন্যাপ তার নিজ দলের পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত নিলে আওয়ামী লীগকেও অনতিবিলম্বে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। 

এখন ন্যাপ নিজে পুনরুজ্জীবিত হবে, না প্রস্তাবিত জাতীয় দলে সম্মিলিত হয়ে যাবে—সে বিষয়টি মওলানা ভাসানীর দাবি অনুযায়ী আওয়ামী লীগ তাঁর পাঁচ-দফা শর্তের বিষয়গুলি স্বীকার করে কিনা তার ওপর নির্ভর করবে:

১. সকল রাজবন্দীর মুক্তি;

২. নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি;

৩. সিয়াটো ও সেন্টো থেকে সরে আসা;

৪. পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন;

৫. বয়স্ক ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার ও পার্লামেন্টের স্বাধীনতা। 

এমনি করে ন্যাপ পুনরুজ্জীবিত হবে কি হবে না তার দায় বর্তায় আওয়ামী লীগের ওপর। তবে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠনের প্রশ্নে মওলানা ভাসানীর আগ্রহ তেমন আন্তরিক বলে মনে হয়নি। কেননা মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগকে তাঁর এ শর্তগুলি দেওয়ার সময় এ মন্তব্যও করেন যে, তাঁর এসব দাবি বা শর্ত যদি সরকারি দল মেনে নেয় তাহলে তিনি ঐ সরকারি দলের সাথেও সহযোগিতা করবেন।

আবার, পশ্চিম পাকিস্তান সফরে গিয়ে তিনি সেখানে সকল রাজনৈতিক দলের কাছে একটি ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা সম্মিলিত গণতন্ত্রী দল গঠনের জন্য আবেদন জানান এবং একইসঙ্গে এ কথাও উল্লেখ করেন যে, “এসব রাজনৈতিক দলের আদর্শ, মৌলিক নীতি ও আচরণ ভিন্ন।” তিনি আরো বলেন, তিনি সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এ কারণে যে, একা ন্যাপের পক্ষে লড়াই করা সম্ভব নয়। 

আসলে মূল সমস্যাও সেখানে। সাংগঠনিক দুর্বলতা রাজনৈতিক দলগুলিকে একটি একত্রীভূত আকার গঠনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায় । ন্যাপকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে, না একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করা হবে—এ নিয়ে ভাসানীর দোদুল্যমান ভূমিকার নেপথ্যে ভিন্ন প্রকৃতির কিছু কারণও থেকে থাকতে পারে। এবডো বিধির কারণে সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় সে পটভূমিতে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠিত হলে এ ধরনের দলের অবিসংবাদিত নেতা হতেন মওলানা ভাসানী।

আওয়ামী লীগ ও তাঁর কৃষক সমর্থকদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী রাজনীতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণ সফল হওয়ার আশাও তিনি সঙ্গতভাবেই করতে পারতেন। আওয়ামী লীগ পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের বিষয় স্বীকার করে নেবে—এ রকম আশাবাদী তিনি ছিলেন। তাঁর এ আশাবাদে একটা আপোসরফার হিসেবী মনোভাবও ছিল । পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফেরার পর তিনি এ রকম দাবিও করেন যে, পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের মতপার্থক্যের বিষয় ইতোমধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

তিনি আরো জানান, সোহরাওয়ার্দীর সাথে কথা বলার পরে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তরাজ্য থেকে ফিরলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার হয়ে উঠবে । তিনি কি তাহলে আশা করেছিলেন যে, মুজিব হয় সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত নিয়ে ফিরবেন নইলে সোহরাওয়ার্দীকে অগ্রাহ্য করে তাঁর সাথে যোগ দেবেন? আসলে এ দুইয়ের কোনোটিই ঘটেনি। মুজিবের দেশে ফেরার পরেও ধোঁয়াটে পরিস্থিতি পরিষ্কার হয়নি।

তিনি সম্মিলিত এক জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন সম্পর্কে শুধু উল্লেখ করেন যে, এ ধরনের কোনো প্রয়াস হাতে নেওয়ার আগে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিচার-বিবেচনা করে একটি পূর্ব পরিকল্পিত কার্যক্রম স্থির করা দরকার। তিনি আশ্বাস দেন, আওয়ামী লীগ প্রস্তাবটি সযত্নে বিচার-বিবেচনা করবে। অবশ্য তিনি এই মর্মে মনোযোগ আকর্ষণ করেন যে, বিভিন্ন দলের সমবায়ে গঠিত একটি যুক্তফ্রন্টের (অর্থাৎ এনডিএফ) অস্তিত্ব তো রয়েছেই।

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-১

 

আর এই ফ্রন্ট শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন ও দেশে গণতন্ত্রের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করে চলেছে। তাঁর এ বক্তব্যে পরিষ্কার ইঙ্গিত রয়েছে যে, কোনো অভিন্ন ভিত্তিতে স্বীকৃত এনডিএফ অপেক্ষা ব্যাপকতর কর্মসূচি ছাড়া কোনো সংগঠন গড়ায় কোনো তারতম্য ঘটবে না। এ ধরনের অবস্থানের যৌক্তিকতা না বুঝতে পারারও কোনো কারণ নেই । কেননা, এ ধরনের প্রস্তাবিত নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক একটি রাজনৈতিক দলকে তার সম্ভাব্য সংগঠনের পরস্পরবিরোধী অবস্থা বা ভূমিকাকে জায়গা করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে আর তাতে সুনিশ্চিতভাবেই ঐ জাতীয় রাজনৈতিক দলের চালিকাশক্তি ও কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ব্যাহত হবে।

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-২

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-২

পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অবস্থানের বিষয়ে শেখ মুজিবুর রহমানও কোনো অঙ্গীকার করেননি। তবে একটি বিষয় ছিল পরিষ্কার, সোহরাওয়ার্দী তখনো পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রতিরোধের ধারায় অবিচল ছিলেন।

তিনি জানান, যাঁরা গণতন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য এখনো লড়ছেন তাঁদের জন্য দেশের পররাষ্ট্রনীতি অস্বস্তির প্রধান কারণ হতে পারে না, তাছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য দেশের ভেতরের সমস্যা পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে ঢের জরুরি। তাছাড়া পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অবস্থান পরিষ্কার: “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়।” তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী পররাষ্ট্রনীতির যে কাঠামো গড়েছিলেন তা অপরিবর্তিতই রয়েছে। তবে সে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন কীভাবে হচ্ছে তা বাইরে থেকে বলা সম্ভব নয় ।

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-২

আর দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ঘটছে কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। এখানে বলা দরকার, এর মাত্র একদিন আগে মওলানা ভাসানী দেশের গণতন্ত্রের ব্যর্থতার ও বিরাজমান বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় বিদেশী হস্তক্ষেপকে দোষারোপ করেন। শেখ মুজিব আরো স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেন, ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ যে নীতিমালা ও কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে তার পুনঃসংস্কার বা সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই ।

ভাসানীর উল্লিখিত সব শর্ত মেনে নিয়ে একটা সমন্বিত জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ ও প্রয়াসে আওয়ামী লীগের শীতলবারি নিক্ষেপের কোনো ইঙ্গিত যদি এসবেও পর্যাপ্ত না হয়ে থাকে তাহলে ভাসানীর দাবি বা শর্তের জবাবে ‘আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আহ্বানের কোনো সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে নেই’—এই প্রত্যয়ী বিবৃতিই বলতে হয় উল্লিখিত উদ্দেশ্যে কোনোরকম আলাপ-আলোচনার সম্ভাবনায় নেতিবাচক চূড়ান্ত সীলমোহর এঁটে দিয়েছে । 

অবশ্য নিষ্ক্রিয় ন্যাপের ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাবিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সুদীর্ঘ আলোচনার পর মওলানা ভাসানী কর্তৃক ইতঃপূর্বে উত্থাপিত ৫-দফাসহ ১৪-দফা প্রস্তাব ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার তাঁর দাবি মেনে নিতে ব্যর্থ হলে তিনি আইন অমান্য আন্দোলন গৃহীত হয়। পল্টন ময়দানে এক জনসভায় মওলানা ভাসানী ঘোষণা করেন যে, ১৫ শুরু করবেন। ন্যাপ সংগঠনের একাংশ এনডিএফ-এর কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট ছিল।

তারা ছিল একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক দল গঠনের পক্ষপাতী। কিন্তু তা সম্ভব না হলে তারা ন্যাপকেই পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষে ছিল। আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর দেশে না ফেরা পর্যন্ত কোনো অঙ্গীকারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। 

আওয়ামী লীগ ন্যাপের মতো তার নিষ্ক্রিয় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক না করলেও দলটি নিজ ভবিষ্যৎ নিয়ে একেবারেই পা গুটিয়ে বসে ছিল না, আবার এনডিএফ-এর গোটা কার্যক্রমেও তৎপর ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্ক্রিয় আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক/কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয় । দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ (নিষ্ক্রিয়) ১৯৬৩ সালের ২৫ আগস্ট এক সম্মেলনের আয়োজন করে । ছয় ঘণ্টাব্যাপী এ সভায় প্রায় দেড়শ’ দলীয় কর্মী যোগ দেন। সভায় ডজনখানেক প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেগুলির মধ্যে ছিল:

১. নাগরিক ভোটাধিকার কমিশন রিপোর্টের সংশোধন ও বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠান;

২. জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব;

৩. পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাকে বিবেচনায় রেখে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিমানবাহিনী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন;

৪. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে কেন্দ্রের হাতে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় (বৈদেশিক বাণিজ্য বাদে) রেখে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ ঘোষণা;

৫. ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত কারণে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনীতিকে পৃথক করা;

৬. এক দীর্ঘ সামরিক শাসনে জনমনে সৃষ্ট অসন্তোষ ও হতাশার অবসানে মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক দলের এক যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণকনভেনশন ডাকার জন্য জাতীয় নেতৃবর্গের প্রতি আহ্বান জ্ঞাপন । 

এ সব প্রস্তাবে বৈদেশিক বিষয় থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য বাদ দেওয়া ছাড়া এমন নতুন কিছুই ছিল না। তবে এতে গণকনভেনশন ও যুক্তফ্রন্টের (যদি তা এনডিএফ থেকে স্বতন্ত্র কিছু হয়ে থাকে) যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তার সাথে (নিষ্ক্রিয়) দলের সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক প্রায় একই সময়ে প্রদত্ত বক্তব্যের (যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে) পুরোপুরি মিল নেই । এ কথাও স্পষ্ট যে এই সভা, কেবল ‘জাতীয়’ দাবিসমূহের “ন্যূনতম কর্মসূচিতেই” সন্তুষ্ট ছিল না ।

এই সভা পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক দাবিসমূহের বিষয়েও উদ্বিগ্ন ছিল, যে সব দাবির কথা এনডিএফ তুলে ধরতে পারেনি। ওদিকে, এ সব দাবি বহুকাল ধরেই আওয়ামী লীগ ম্যানিফেস্টোর একান্ত অঙ্গীভূত ছিল। অন্যভাবে বলা যায়, বস্তুত এ বৈঠকে যেগুলি পূর্ব পাকিস্তানের জরুরি দাবি বলে বিবেচিত হয় সে সব দাবির পক্ষে লড়াই-সংগ্রামের দায়িত্ব তথা কাজের দায়িত্ব নিতে পারে—পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বা পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কিংবা এ ধরনের সমমনা দলগুলির এক মোর্চা।

বাস্তবিকপক্ষে, দলীয় পুনরুজ্জীবনের পর এগুলিই ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দাবি। এ সব বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টিপাত করে উল্লিখিত বৈঠক দলীয় পুনরুজ্জীবনের বিষয়টির প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। পরে পূর্ব পাকিস্তানের আরো কয়েকটি। জেলায় এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্পষ্টতই এ সব বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল, আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা ও এ দলের কর্মসূচি ও দাবিদাওয়ার প্রতি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গের সবিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ । 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূর্ত প্রতীক ছিলেন অবিসংবাদিতভাবে সোহরাওয়ার্দী । জাতীয় স্তরে সকল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাঁর ধারণায় তখনো একমাত্র পথ ছিল শাসনতন্ত্র গণতন্ত্রায়নে ন্যূনতম কার্যক্রমভিত্তিক ঐক্য । লন্ডনে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ মুজিব এই বার্তাই জ্ঞাপন করেছিলেন । দলীয় পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত মতামত যাই থাক তিনি তাঁর প্রকাশ্য বক্তৃতা- বিবৃতিতে তার প্রতিফলন এড়িয়ে যান।

অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইস্যুর ব্যাপারে তাঁর উদ্বেগ ও চিন্তাভাবনার কোনো রাখঢাক ছিল না। ফরিদপুরে তাঁর নিজ জেলার জাতীয় পরিষদ উপনির্বাচনের নির্বাচনী এলাকায় সফর থেকে ফিরে ১৯৬৩ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে এক ‘জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে’ শেখ মুজিবুর রহমান যা বলেন তাতে অনেক নিগূঢ় তথ্য উন্মোচিত হয় । তিনি বলেন, পরিস্থিতির চাপে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানীরা বিশ্বাস করে যে, তারা এখন এক উপনিবেশে পর্যবসিত হয়েছে। আর তাই তিনি মনে করেন এই উপনিবেশের নাগপাশ থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে হলে তাদেরকে নিরন্তর সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারযন্ত্রের (তাঁর মতে) পাঁচ স্তম্ভ: আমলাতন্ত্র, ফেডারেল রাজধানীর অবস্থান, পুঁজি গঠন, সশস্ত্র বাহিনী ও রাজনৈতিক সমতার কোনোটিতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশীদারি নেই। তিনি বলেন, সরকার আন্তঃপ্রাদেশিক সমতার বিষয়টিকে যেভাবে দেখছেন তাতে আর সংখ্যার সমতা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সরকারকে মনে করিয়ে দেন যে, সমতা বলতে কেবল জাতীয় পরিষদের সংখ্যায় সমান প্রতিনিধিত্বকেই বোঝায় না বরং জাতি ও রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে সমতাকে বুঝিয়ে থাকে।

তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৫৫ সালে সংখ্যাসাম্য মেনে নেওয়া হয় এই পরিষ্কার বোঝাপড়ার ভিত্তিতে যে, পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তার বদলে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ একচেটিয়া ভোগের সুবিধা দেওয়া হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানকে। করাচি থেকে ফেডারেল রাজধানী সরিয়ে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে । কেননা, খাত থেকে নেওয়া যথেষ্ট পরিমাণ অর্থে।

তিনি করনীতিরও সমালোচনা করেন। তিনি এর আগে করাচিসহ গোটা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের অভিযোগ করেন যে, এই করনীতি পূর্ব পাকিস্তানের শক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থ বিনষ্ট করার মতলব নিয়ে প্রণীত হয়েছে |

এর সপ্তাহ দুয়েক আগে লন্ডন থেকে ফিরে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তার বক্তৃতার মেজাজ তা থেকে একেবারেই অন্যরকম। বরং তাঁর এ সব কথাবার্তার সুর ভাঙনপূর্ববর্তীকালের মওলানা ভাসানীর অবস্থান ও দাবিদাওয়ার সঙ্গে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব এনডিএফ কিংবা ন্যূনতম কর্মসূচির কথা মুখেই আনেননি যদিও মাত্র পক্ষকাল আগেও করাচির “আউটলুক” পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সোহরাওয়ার্দী “ন্যূনতম কার্যক্রম”, “শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন”, “সকল দল ও গোষ্ঠীর জন্য অভিন্ন প্ল্যাটফরম”, “১৯৬৫ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ” এবং “শাসনতন্ত্র সংশোধনের জন্য পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে জনমত গঠন”—ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অগ্রাধিকার বিবেচনার পুনরুক্তি করেছিলেন। 

যশোর আওয়ামী লীগের (নিষ্ক্রিয়) এক কর্মিসভায় শেখ মুজিবুর রহমান একই সুরে কথা বলেন। তিনি সেখানে আরো উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ পাকিস্তানের দুই অংশের ঐক্যের প্রশ্নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু তার অর্থ এই নয়, উন্নয়ন ব্যয়ের সিংহভাগই পশ্চিম পাকিস্তানে কাজে লাগানো যাবে।

বয়স্ক ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার, বাক-স্বাধীনতা, শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন এবং আন্তঃআঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে তিনি গোটা পাকিস্তানভিত্তিক সম্মিলিত গণআন্দোলনের ডাক দিলেও এনডিএফ-এর মধ্য দিয়েই যে ঐ আন্দোলনকে অনিবার্যভাবেই পরিচালিত করতে হবে সে বিষয়ে বিশেষ করে কিছু যেমন উল্লেখ করেননি তেমনি এর ন্যূনতম কর্মসূচির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথাও বলেননি। তিনি অন্যান্য উপায়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন বলেই নয় বরং তাঁর পূর্ব পাকিস্তানের জরুরি সমস্যাগুলির বারংবার উল্লেখে তাঁর নিজের অগ্রাধিকারগুলি খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেউ কেউ আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে থাকলেও সে কথা প্রকাশ্যে বলেননি। অনেকে সোচ্চারও ছিলেন অবশ্য। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, ১৯৬৩ সালের মধ্য নভেম্বরে ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ কর্মীদের চার ঘণ্টা স্থায়ী এক সম্মেলনে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনের অনুকূলে মত প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয় অংশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার জন্যও দাবি করা হয়। ঐ সম্মেলনে ফেডারেল রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরেরও দাবি করা হয়।

এ সবের অর্থ যদি হয় দলীয় পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি কেন্দ্রীয় নেতাদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ তাহলে দেখা যায়, সে বার্তা শেষাবধি সোহরাওয়ার্দীর কাছে পৌঁছায় । সোহরাওয়ার্দী তখনো আওয়ামী লীগের পুরোধা ব্যক্তি।

বৈরুতে জং পত্রিকাকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে সোহরাওয়ার্দী এ কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলে জানা যায় যে, “কেন আমাকে পাকিস্তানে ফিরতেই হবে? কেন লোকজন আমাকে ফেরার অনুরোধ করছে? কেন তারা নিজেরা নিজেদের জন্য কিছু করতে পারে না? কেন ওরা আমার অপেক্ষায় আছে? কেন ওরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে না?” তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ বা প্রস্তাবিত ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কিছু বলতে অস্বীকার করেন ।

 তিনি কি তাহলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে তাঁর অপরিহার্যতার কথাটিই এভাবে তুলে ধরতে চাচ্ছিলেন, না তিনি তাঁর দলের পুনরুজ্জীবনপন্থীদের কাছে নিজের পরাজয়ের ব্যাপারটি মেনে নিচ্ছিলেন? এই মর্মে কিছু কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে, সোহরাওয়ার্দীর নরমপন্থী লাইনের লোকেরা রাজনীতির অঙ্গনে নতুন অভিলাষী প্রজন্ম ছাত্রদের রাজনৈতিক চেতনাকে পথ ছেড়ে .,দিচ্ছিলেন।

যেমন ধরা যাক, ১৯৬৩ সালের নভেম্বরের গোড়ার দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রাদেশিক সম্মেলনকালে সংগঠনের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন পুনরুক্তি করেন, গণতান্ত্রিক, লোকায়ত ও সমাজবাদী ব্যবস্থার জন্যই তাঁর সংগঠন কাজ করবে। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ বিশ্বাস করে, পরিপূর্ণ সমাজতন্ত্র বিরাজ করে এমন শোষণমুক্ত সমাজেই কেবল আর্থ-রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভব। রাজনীতিতে ছাত্রদের অংশগ্রহণের পক্ষে মত প্রকাশ করে তিনি বলেন:

 আমরা নিশ্চিত জানি, ছাত্ররা কেবল রাজনীতির জন্য রাজনীতির কথা বলে না। অধিকার, শিক্ষা, অন্ন-বস্ত্র যখন রাজনীতির বিষয় হয় তখন ছাত্ররা নিশ্চয়ই এ সব নিয়ে কথা বলবে। কেননা, তাদের বাবা-মায়েরা এ সব সমস্যার ঊর্ধ্বে নয়। যখন কোনো বাবা পাটের দাম পড়ে যাওয়ার জন্য ছেলের কলেজের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন তখন ঐ ছেলের নিশ্চয় জিজ্ঞাসার অধিকার রয়েছে: কেন পাটের দাম পড়ে গেল, কে এর জন্য দায়ী? আর এই-ই যদি হয় রাজনীতি তাহলে ছাত্রদের রাজনীতিতে না থেকে গত্যন্তর নেই।

পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ যে সব সমস্যার মুখোমুখি সেগুলির মূল কারণ দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমে সম্পদ স্থানান্তরকে দায়ী করে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে বলেন, এ রকম অবস্থায় নিজ অধিকারের জন্য লড়াই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর দাবি, সেখানেই নিহিত রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের সকল ছাত্র আন্দোলনের মূল কারণ।

পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ বিকিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সমৃদ্ধির বিষয়ে আলোকপাত করে গোটা বিষয়টির যে তীক্ষ্ণ সারসংক্ষেপ তিনি নিম্নবর্ণিত বক্তব্যে প্রকাশ করেন তা সম্ভবত পাকিস্তানী পরিস্থিতির বাস্তবতা সম্পর্কে ছাত্রসমাজের চেতনা ও ধারণারই সর্বাগ্রগণ্য বিষয় । তিনি বলেন:

যদি দেশ এ ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত হয়েই থাকে, যদি এ সব পাকিস্তানে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যকে প্রতিফলিত করে থাকে, আর এ সব কিছুই যদি ঘটে থাকে ইসলাম ও ইনসাফ অনুযায়ী, তাহলে আমায় স্বীকার করতেই হচ্ছে, আমরা এ সবের ফলাফল ও তাৎপর্য বুঝে ওঠার সামর্থ্যই হারিয়েছি। 

পূর্ব পাকিস্তানী জনসমষ্টির এক অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন ও সোচ্চার অংশের উদ্দেশে এ ধরনের স্পষ্ট বক্তব্যের প্রভাব প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তার কল্পনা আদৌ কষ্টসাধ্য · নয়। বাস্তবিক পক্ষেও পূর্ব পাকিস্তানী ছাত্ররা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলির মোকাবেলায় কেবল প্রেসার গ্রুপের মর্যাদাই অর্জন করেনি বরং অন্যান্য সংগঠিত খাতের কার্যত অবর্তমানে তারা সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী প্রেসার গ্রুপও হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বেলায় যোগসূত্রগত ধাঁচ থেকে এটা কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যে কোনো সঙ্কটজনক পরিস্থিতির মোকাবেলায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ যথেষ্ট ক্ষমতা রাখতো। এটি অত্যন্ত রেখাপাতযোগ্য বিষয় কারণ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ যদিও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক অঙ্গসংগঠন তবু শেষোক্ত সংগঠন ছাত্র সংগঠনটিকে কখনো তাদের কী করণীয়, কী নয় তা নির্ধারণ করে দিতে পারেননি।

আর ঠিক এই বিশেষ ক্রান্তিকালে রাজনীতিতে ছাত্রদের অংশীদার হওয়ার অধিকারের বিষয়টির প্রতি সবিশেষ জোর দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ আসলে পরোক্ষ পূর্ণ রাজনৈতিক কার্যকলাপ পুনরুজ্জীবনের পক্ষে নিজ সমর্থন ব্যক্ত করেছিল। এটি ছাত্রদের নিজ প্রতায় না তারা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবনপন্থী লবির সঙ্কেত-ইশারায় তাদেরই দাবি নিয়ে সরব হয়েছিল সে প্রশ্ন থাকলেও এতে যোগসূত্র যে রীতিমতো শক্তিশালী ও দ্বিমুখী ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ফলে খুব পরিষ্কার বোঝা যায় যে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একটি অংশ সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যকলাপ পুনরুজ্জীবন ও সরকারের তরফ থেকে ন্যায় আচরণ পাওয়ার ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তানের আশা-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে জনমত সৃষ্টির পক্ষপাতী ছিল । আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূর্তপ্রতীক সোহরাওয়ার্দী এবং আতাউর রহমান ও আবুল মনসুর আহমদের মতো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো কোনো বলিষ্ঠ নেতা তখনো দলীয় পুনরুজ্জীবনের পক্ষপাতী ছিলেন না। আতাউর রহমান খান ১৯৬৩ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় এক বিবৃতিতে এ বিষয়ে তাঁর মতামত খুবই পরিষ্কার করে তুলে ধরেন। তিনি বলেন:

এনডিএফ প্রতিষ্ঠার মূলনীতি ছিল এই যে, দেশে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কায়েম না হওয়া অবধি রাজনৈতিক দলগুলিকে পুনরুজ্জীবিত না করা। আমাদের এ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলি পুনরুজ্জীবিত না করার ব্যাপারে আমরা জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ রকম এক পরিস্থিতিতে কোনো অজুহাতে আমাদের সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করার কাজটি দেশের রাজনীতিতে এক গুরুতর সমস্যার সৃষ্টি করবে। কাজেই এ কাজ সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগের এই পুনরুজ্জীবনবাদী বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনবাদীদেরকে তাদের সামনে আপাতত খোলা একমাত্র বিকল্প – এনডিএফ ও এর ন্যূনতম কর্মসূচি নিয়ে তুষ্ট থাকতে হয়। ১৯৬৩ সালের উপনির্বাচনে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটে । কেননা, আওয়ামী লীগাররা এ বিষয়ে উৎসাহ দেখায়নি। আর ন্যাপ নেতা ভাসানীও দোদুল্যমান ছিলেন। ফলে এনডিএফ-এর ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে বলেই মনে হয় ।

অবশ্য এ সবের পরেও সংগঠনটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যেও টিকে থাকে । আর সম্ভবত এ রকম নিষ্ফল, অক্ষম অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতো এনডিএফ আরো বহুদিন, কিন্তু ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক মৃত্যুর সাথে সাথে এনডিএফ-এর ওপর যবনিকা নেমে আসে। বস্তুত এনডিএফ-এর ঘরোয়া কোন্দল ও সংঘাতের নিষ্পত্তি কোনোদিনই এ সংগঠনের অস্তিত্বকালে সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সোহরাওয়ার্দীর বিদায়ের পর কথিত জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন এক অপূরণীয় বিপর্যয়ে পড়ে।

কোনো জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গঠনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আস্থার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে আর সেই প্রেক্ষাপটে নিখিল পাকিস্তান। আওয়ামী লীগ ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্রভাবে এবং ন্যাপ পুনরুজ্জীবিত হয়। আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধীদলের (COP) পক্ষে আঞ্চলিক পর্যায়ে তারতম্যমূলক ভোট প্রদানের বৈশিষ্ট্যের মাঝে জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী কোনো দলীয় যুক্তফ্রন্টের অবস্থা কী হতে পারে তা আরো একবার প্রমাণিত হয়।

“জাতীয় গঠন কাঠামোর” মধ্যে কোনো সম্মিলিত বিরোধীদলীয় আন্দোলন যে সম্ভব নয় সে বিষয় পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ ও পশ্চিম পাকিস্তান এনডিএফ-এর পৃথক পৃথকভাবে স্বীকৃত লক্ষ্য ও কর্মসূচির মধ্যে তীক্ষ্ণ ও শাণিত হয়ে ফুটে ওঠে। বৈশিষ্ট্যমূলকভাবেই পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে গঠিত পশ্চিম পাকিস্তান এনডিএফ পূর্ব পাকিস্তানের দাবিদাওয়া সংবলিত পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ-এর কোনো উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিষয় তাদের আলোচনায় উত্থাপন করেনি। 

এই সময় নাগাদ ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে মহানবীর পবিত্র কেশ চুরির কথিত অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরা এতে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হয় সে সম্পর্কে ব্যাপক পর্যায়ে মনে করা হয়, জনগণের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চেতনা ও সংশ্লিষ্টতাকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য সরকার এ সব সাম্প্রদায়িক ঘটনার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ায়। পরে পুনরুজ্জীবনবাদী ও পুনরুজ্জীবনবাদী নয়—উভয় অংশই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিস্তাররোধ প্রয়াসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নিষ্ক্রিয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে জনসাধারণ, বিশেষ করে, ছাত্রদের প্রতি তাদের সকল শক্তি দিয়ে মানবতার দুশমনদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ ছাড়াও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বুনিয়াদ ধ্বংস হবে। পূর্ব পাকিস্তানের দেউলে অর্থনীতি আরো খান খান হয়ে ভেঙে পড়বে যদি সাম্প্রদায়িক প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার ধারণা আরো বেশি করে প্রশ্রয় পায়।

কেননা, তার ফলে এদেশ অভিমুখে সীমান্তের ওপার থেকে মোহাজের আগমনের ঢল নামবে। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, “যাঁরা সাম্প্রদায়িকতায় উস্কানি দিচ্ছেন তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানের দুশমন।’ তাঁকে পরে “পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও” শীর্ষক বাংলায় ছাপা প্রচারপত্র বিলির এক মামলায় জড়ানো হয়। প্রচারপত্রটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরোধ কমিটি কর্তৃক এ সময় প্রকাশিত হয়েছিল ।

ইতোমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তাদের ওয়ার্কিং কমিটিতে দু’দিনব্যাপী ছয় ঘণ্টার অধিবেশনে আলোচনার পর দলকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। বলা হয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবন ও আওয়ামী লীগ দলকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ঐ সব দলের ক্রমাগত অনুরোধ এবং ন্যাপের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা — ইত্যাদি বিষয়ের সতর্ক ও নিরাসক্ত বিচার-বিবেচনার আলোকে ওয়ার্কিং কমিটি উল্লিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এ বিষয়ে কমিটির বক্তব্য ছিল: কমিটি এ বিষয়ে সতর্কতা ও সাবধানতার প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন রয়েছেন। তাঁরা দেখবেন, এনডিএফ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সংগ্রাম শুরু করেছে তা যেন পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের ফলে কোনো রকম বিপর্যস্ত না হয়। 

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি এখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠ নিষ্ক্রিয় দলের সাধারণ সম্পাদক ইতোমধ্যেই ১৯৬৪ সালের ৯ জানুয়ারি এক নোটিশ দিয়েছিলেন যে, সোহরাওয়ার্দীর প্রত্যাশিত পূর্ব পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন সাপেক্ষে তোল ডিসেম্বরে ওয়ার্কিং কমিটির যে বৈঠক আতাউর রহমান খানের বাসগৃহে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল তা সোহরাওয়ার্দীর ইন্তেকালের কারণে স্থগিত হয়ে যায়। এখন এই স একই স্থানে ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় নিষ্ক্রিয় দলের ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগ শাখাগুলির সভাপতি ও সম্পাদক, এবং আওয়ামী লীগের সকল জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যকে ঐ সভায় উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানে হয়। তবে ওয়ার্কিং কমিটিতে কারা থাকবেন সে বিষয়ে কিছু সংশয় দেখা দেয়। কেননা ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন প্রশাসন কর্তৃপক্ষ দলের নথিপত্র ও দলিলাদি আটক করার ফলে দলের হাতে রেকর্ডপত্র ছিল না।

এ কারণে অনেকে আশঙ্কা করেন যে, শেষ মুজিব হয়তো তাঁর পছন্দমাফিক কমিটি সদস্য বাছাই করবেন। দলীয় পুনরুজ্জীবন বিরোধীদের এই আশঙ্কা আরো ঘনীভূত হয় এ কারণে যে, আতাউর রহমান খান ও আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে শেখ মুজিবের আগে যে সমঝোতা ছিল তার পাশ কাটিয়ে আতাউর রহমান ও আবুর মনসুর আহমদের সঙ্গে আগে কোনো পরামর্শ না করেই কমিটির এ সভা ডাকা হয়। 

যাই হোক পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী ১৯৬৪ সালের ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। সভার প্রথম দিনে তাজউদ্দিন আহমদ নিষ্ক্রিয় প্রাদেশিক আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্গঠিত করার প্রস্তাব দেন। তাঁর সে প্রস্তাব সমর্থন করেন যশোরের মশিউর রহমান। সভায় ওয়ার্কিং কমিটির মোট ৩১ জন সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ২৩ জন সদস্যের সকলে সর্বসম্মতভাবে এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

 

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক কর্মীদের সক্রিয় করা, চরম হতাশা থেকে দেশকে রক্ষা করা, মৌলিক অধিকারসমূহ রক্ষা এবং জনসাধারণের সার্বভৌমত্বের বুনিয়াদে পূর্ণ গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জনগণকে শিক্ষিত ও সংগঠিত করার জন্য আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন । অন্য এক প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করে যে, এনডিএফ-এর অন্যতম অঙ্গসংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ এনডিএফকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা দেবে।

১৯৬৪ সালের ২৬ জানুয়ারির মুলতবি সভায় আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে দলের কাউন্সিল সভা ও প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । দলের ম্যানিফেস্টো প্রণয়নের জন্য নিম্নবর্ণিত সদস্যদের নিয়ে ঐ একই সভায় একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়: প্রফেসর হাফেজ হাবিবুর রহমান (আহ্বায়ক), ড. আলীম আল রাজী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া আনোয়ার, আবদুর রহমান খান ও তাজউদ্দিন আহমদ । সভা জেলা, নগর- শহর, মহকুমা ও অন্যান্য নিম্নতর স্তরের আওয়ামী লীগ কমিটিগুলিকে তাদের নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করার নির্দেশ দেয়। সভায় গৃহীত অন্যান্য প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল:

ক. গণতান্ত্রিক সংসদীয় শাসনতন্ত্র;

খ. সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকার;

গ. প্রত্যক্ষ নির্বাচন;

ঘ. পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসন;

ঙ. পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যেকার দূরত্বের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিঅর্থনীতি ব্যবস্থা গ্রহণ; 

চ. পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে জোরদার করা;

ছ. চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর সদরদপ্তর স্থাপন;

জ. এবডো, রাজনৈতিক দল আইন ও নিরাপত্তা আইন বাতিল;

ঝ. রাজবন্দীদের মুক্তি ও হুলিয়া প্রত্যাহার; 

ঞ. পাটের ন্যূনতম বাজারদর নির্ধারণ;

ট. মূল্যস্ফীতি রোধ;

ঠ. জামায়াত-ই-ইসলামীর নেতা ও কর্মীদের মুক্তিদান ।

সভায় জামায়াত-ই-ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণারও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা হয়। সভায় অনুপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন: আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুল জব্বার খদ্দর, নূরুর রহমান, খয়রাত হোসেন ও জহুর আহমদ চৌধুরী।৪৫ কোনো কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, সভায় উপস্থিত ২৩ জন সদস্যদের মধ্যে মাত্র ৬ জন ছিলেন মূল নিষ্ক্রিয় ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট ওয়ার্কিং কমিটির “খাটি সদস্য”  আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন:

আমি জানতে পেরেছি যে, আওয়ামী লীগে আমার কয়েকজন বন্ধু সংবাদপত্রের কাছে এ কথা ঘোষণা উপযুক্ত মনে করেছেন যে, তাঁরা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। আমরা যখন এনডিএফ-এর মাধ্যমে জনগণের, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের ঐক্য রক্ষার ঐকান্তিক আশা পোষণ করছি ঠিক তখন এই ঘোষণা দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।

এনডিএফ হলো সেই বুনিয়াদ তথা ভিত্তি যার ওপর আমাদের মহান নেতা মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিপুল সাফল্যের সৌধ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজ প্রাণের বিনিময়ে। তাই কোনো রাজনৈতিক দলকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে আমাদেরই মূল্যবান কেউ সে ঐক্য ভাঙবেন তা নিশ্চয়ই কারও প্রত্যাশিত হতে পারে না। এনডিএফ-এর সেই

সূচনালগ্ন থেকেই স্বার্থান্বেষী মহল লাগাতার এ ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করে আসছে। আর এ জন্যই তারা রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনকে উৎসাহিত করছে। দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি অবশ্য এ ধরনের অশুভ প্রয়াসকে প্রতিরোধ করে চলেছে।

আমি এ কথা ভেবে রীতিমতো মর্মাহত যে, ঘটনাক্রমে কিছু আওয়ামী লীগারই এই চক্রান্তের কলকাঠি নাড়ছে। তবু এনডিএফ জনগণের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে নিজ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের কয়েক বন্ধুর বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও। 

তিনি “স্বার্থান্বেষী মহল” বলতে কনভেনশন মুসলিম লীগ ও তার হোতা আইয়ুব খানকে বোঝাতে চেয়েছেন, কেননা, পরবর্তীকালে তিনি লেখেন, রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনে আইয়ুব খানের খুশি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক এবং সেটিই ছিল তাঁর “অন্তরের বাসনা”; এতে ঐ দলগুলির নিজেদের মধ্যে কোন্দলের সুযোগ তৈরি করা গেলে তিনি “স্বস্তির হাফ” ছাড়তে পারবেন। আর সে অবকাশে তাঁর বিরুদ্ধে সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ গড়ার সম্ভাবনাও উবে যাবে। 

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সংবাদপত্রে অভিমতের তিনটি ধারা দৃশ্যমান ছিল। তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া নামে বহুল পরিচিত) সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাক ছিল সোহরাওয়ার্দীর অনুগত বিশ্বস্ত। গোড়ার দিকে এ পত্রিকা বিষয়টি অনেকটা এড়িয়ে যায় । মানিক মিয়াকে দল পুনরুজ্জীবনবিরোধী মনে করা হতো । তবে দেখা যায়, তিনি এ বিষয়ে সম্পাদকীয় ভাষ্যে বা অন্য কোনোভাবে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।

পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকা কেএসপির হামিদুল হক চৌধুরীর প্রতি অনুগত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে নেতৃত্বের শূন্যতায় এনডিএফ-এর মাধ্যমে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন জনাব চৌধুরী। তিনি ছিলেন সোচ্চার দলীয় পুনরুজ্জীবনবিরোধী। তাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের খবর পরিবেশন প্রসঙ্গে পাকিস্তান অবজার্ভার এমন একটি ধারণা দেয় যে, দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমত অগ্রাহ্য করে এনডিএফ-এর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে কুঠারাঘাত করতে চাচ্ছে।

মর্নিং নিউজ (ঢাকা) পত্রিকা পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের পক্ষ নিয়ে ঠিক এর উল্টো অভিমত প্রকাশ করে। মর্নিং নিউজের মতে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের খুবই একটি ছোট অংশই মাত্র দলীয় পুনরুজ্জীবনের বিরোধিতা করছে। পত্রিকায় আরো খবর দেওয়া হয় যে, কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি খাজা নাজিমুদ্দিন ও ন্যাপ হাইকম্যান্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রের মতে, দেশ যে রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন তার সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলির পুরুজ্জীবনই একমাত্র সমাধান।

তাই যারা জনগণের মুখোমুখি হতে ভয় পায় তাদের কাছেই শুধু দলীয় পুনরুজ্জীবনের নীতি অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। রিপোর্টে আরো জানানো হয়, কাউন্সিল মুসলিম লীগের মতে পুনরুজ্জীবিত রাজনৈতিক দলগুলির একটি জোটই কেবল পরিবর্তনের কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক একমাত্র সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলিই পারে দেশের জনসাধারণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে’—এই বাস্তবোচিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দন জানান।

পত্রিকায় পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি আব্দুল জব্বারের মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। ঐ মন্তব্যে তিনি বলেন, “ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি বশে কিছু ব্যক্তির বিক্ষিপ্ত সমাবেশের চেয়ে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সাপেক্ষ একটি বিরোধী পক্ষ দেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য অনেক বেশি উপকারী হবে। সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে এ ধরনের রাজনৈতিক দলগুলি দেশের জন্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে ।” পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হাশিম উদ্দিন আহমদ অপেক্ষাকৃত এক দীর্ঘ বিবৃতি দেন রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনের পক্ষে ।

তিনি আওয়ামী লীগারদের মধ্যে এ ধরনের মতপার্থক্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন কেননা তাঁরাই তাদের দলের ‘প্যারিটি ফর্মুলা’, শাসনতন্ত্র-সংক্রান্ত নীতি পদ্ধতি, ১৯৫৪-৫৫ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বিরোধিতা এবং ইঙ্গ-মার্কিন চাপের কাছে সোহরাওয়ার্দীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও সুয়েজ সঙ্কটে মুসলিম বিশ্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার মতো প্রশ্নে দলের “নীতিবিগর্হিত সিদ্ধান্তে” সায় জানানোর ক্ষেত্রে বরাবরই এক ছিলেন ।

তিনি আরো একটি বাস্তবতার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে উল্লেখ করেন যে, দলের পুনরুজ্জীবনবিরোধী গ্রুপের নেতারা সকলেই “রাজনৈতিক দল আইনের আওতায়” রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ছিলেন। কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের দিক থেকে সুশৃঙ্খল, সুস্থ, বাস্তববাদী, গঠনাত্মক ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির এক বিরোধীদলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এ ধরনের গুণাবলিসম্পন্ন বিরোধীদল বাস্তবিকপক্ষে গণতন্ত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ।

কিন্তু যতই আমার এই অশুভ আঁতাত নজরে পড়ছে যে আঁতাতে শরিক রয়েছে পরস্পরবিরোধী ও সংঘাতে লিপ্ত কিছু গোষ্ঠী ও ব্যক্তি আমি ততই এদের উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতায় বিশ্বাস হারাচ্ছি। ওয়াশিংটন, মস্কো, নয়াদিল্লি, পিপিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকা এসব লোককে যুগপৎ একমঞ্চে রাখার এই জোটকে সত্যিই আমার কাছে এক অসম্ভব রাজনৈতিক নিরীক্ষা বলেই মনে হয়।” অবশ্য তিনি এই সুযোগটিকে “সকল সুস্থ ও সঠিক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ, বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্মের কাছে আবেদন পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করেছিলেন।” সে আবেদন ছিল, তাঁর দলে যোগ দেওয়ার। তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁর দল হবে: “গতিময় ও বলিষ্ঠ” আর “জনগণের বিচারবুদ্ধি ও মানসিকতা/মেজাজের উপযোগী।”

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবনে কনভেনশন মুসলিম লীগের অতি উৎসাহের কারণ বোধগম্য। বক্ষ্যমাণ অধ্যায়ের গোড়ার দিকে উল্লেখ করা হয়েছে আর আওয়ামী লীগের দলীয় পুনরুজ্জীবনের বিরোধীরাও দাবি করেছেন, আইয়ুব খান রাজনৈতিক দলগুলির পুনরুজ্জীবনকে উৎসাহিত করেছেন, কারণ রাজনৈতিক দলগুলিকে পুনরুজ্জীবনে মদদ দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজ শাসন কায়েম রাখার আদর্শ পরিস্থিতি “বিভেদ ও শাসন” (Divide and Rule) তৈরি করা যাবে।

অবস্থা সে রকমটা হলে যা দাঁড়াবে তা হলো আবুল মনসুর আহমদ ও আতাউর রহমানবিহীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ!—তার চেয়ে সুসংবাদ আর কী হতে পারে! তেমন আওয়ামী লীগ তো খোশ আমদেদ! কেননা আবুল মনসুর আহমদ ও আতাউর রহমান কেন্দ্রের ক্ষমতাচক্রের কাছে ১৯৫০-এর দশকে কেন্দ্রীয় আইনসভা ও অন্যত্র তাঁদের কার্যকলাপের কারণে গোলযোগ সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

আইয়ুব খান ও তাঁর সহযোগীরা হয়তো আশা করেছিলেন যে, দলের দীক্ষাগুরু সোহরাওয়ার্দীসহ এবডোকৃত ঝানু নেতাদের অবর্তমানে দুর্বল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে সামাল দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজতর হবে। ধরে নেওয়া চলে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আশু পুনরুজ্জীবনের বিষয়টিই ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের কথিত চাল বা উদ্যোগের মূল মনোনিবেশকেন্দ্র, এনডিএফ-এর ব্যবচ্ছেদ নয়।

কারণ, আর যা-ই হোক এনডিএফ তার প্রাথমিক পর্যায়ের পর, বিশেষ করে, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আর বড় রকমের হুমকি ছিল না, কিন্তু পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কেবল দলের প্রতিষ্ঠাতাদের উদ্দেশ্য ও কর্মসূচিকে বহাল রাখার কথাই পুনর্ব্যক্ত করেনি, বরং এবডোকৃত রাজনীতিকরা ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের যে সব দাবির সূচনা করে গিয়েছিলেন সে প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার, আরো শাণিত করার পথই অনুসরণ করতে থাকেন।

আর শাসক কোটারির সঙ্গে এ নিয়ে দরকষাকষির নিষ্ফলতা সম্পর্কে নিশ্চিত পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ সব ইস্যু জনগণের কাছে তুলে ধরার কাজে মনোনিবেশ করে। ফলে এই প্রক্রিয়ায় ‘ইচ্ছার’ বিষয়টি অপরিবর্তনীয় ‘দাবি’তে রূপান্তরিত হয়। 

তবে পুনরুজ্জীবিত দলের চেহারা ও ভূমিকা কী হবে তা তখনো অজ্ঞাত থেকে যায়। তাই এ নিয়ে একটি অংশে যখন উদ্বেগ-আশঙ্কা চলেছে তখন অন্য অংশে তা নিয়ে এসেছে স্বস্তিবোধ। উভয়েরই অবশ্য একাধিক কারণও ছিল। কিন্তু এ দুটিকে নিয়েই বাড়াবাড়ি করা হয়েছে।

দল পুনরুজ্জীবনের বিরোধী শিবিরের নেতারা, বিশেষ করে, আতাউর রহমান ঠাওর করে উঠতে পারেননি যে জাতীয় নেতা ছাড়া ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট কখনো বাস্তবে রূপ নিতে পারবে না। আর এও খুবই বিস্ময়ের বিষয় এই যে, এনডিএফ-এর যাঁরা সোহরাওয়ার্দীর প্রতি ও তাঁর ন্যূনতম কর্মসূচির প্রতি আনুগত্য প্রকাশে নিরন্তর কথার খৈ ফোটাতো তাঁরা কেমন করেই বা এনডিএফ-এর পূর্ব পাকিস্তান কমিটির উদ্দেশ্যাবলির প্রতি সমর্থন জানাতে পারে ।

১৯৬৪ সালের জানুয়ারির গোড়ার দিকে এই উদ্দেশ্যগুলি ঘোষণা করা হয়। এনডিএফ-এর নিখিল পাকিস্তান কমিটি এ সব উদ্দেশ্য নিজেদের সম্মতিক্রমে স্থির করে থাকলে ব্যাপারটি হতো আলাদা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের এনডিএফ কর্মসূচিতে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, সে রকমটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই ।

এমনকি গঠন-কাঠামোর দিক থেকেও পশ্চিম পাকিস্তান এনডিএফ ও পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন । পশ্চিম পাকিস্তান এনডিএফ গঠিত ছিল দলীয় পুনরুজ্জীবনবাদী ও পুনরুজ্জীবনবিরোধী উভয় গ্রুপকে নিয়ে কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ-এ ছিল কেবল পুনরুজ্জীবনবিরোধীরা। ৫৩ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে কেবল যে একটি জায়গায় মিল ছিল তা হলো সোহরাওয়ার্দীর ন্যূনতম কার্যক্রম যা বিশেষত সোহরাওয়ার্দীর অবর্তমানে পূর্ব পাকিস্তানকে সক্রিয় করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।

এ পর্যায়ে দল পুনরুজ্জীবিত হলে রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবেন—এমন আশঙ্কা যদি না করতেন তাহলে এবডোর নিষেধাজ্ঞাধীন দলীয় পুনরুজ্জীবনবিরোধীরা এ বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারতেন না। অনুরূপভাবে, নরমপন্থী সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপবিহীন একটা বলিষ্ঠ সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এ ছিল এক সুযোগও বটে ।

পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ অবশ্য পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একাংশ”৫৪ বলে অভিহিত করতে থাকে। আর নিষ্ক্রিয় দলের ৩৭ জন পুনরুজ্জীবনবিরোধী এই দলের পুনরুজ্জীবন সম্পর্কে এই বলে মন্তব্য করেন যে, “কাজটি কেবল রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, কৌশলগত সুবিধাবাদ (ও) গঠনতান্ত্রিক উপযুক্ততার নিরিখেই নয় বরং নৈতিকতার দিক থেকেও ঠিক নয়।’ তবে পুনরুজ্জীবনবিরোধী হাতেগোনা কিছু কট্টর দলের কথা বাদ দিলে, দল পুনরুজ্জীবনের যুক্তিগুলি বাহ্যত বলিষ্ঠতর হয়ে উঠতে থাকে । 

যাই হোক সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনবিরোধীরা ও পূর্ব পাকিস্তান এনডিএফ নিখিল পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হলে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।৫৭ এভাবে অস্থিকঙ্কালসার এনডিএফ দলবিহীন এক গণআন্দোলনের ধারণা ব্যক্ত করে চলতে থাকে যা আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় এক ‘দুর্বল কণ্ঠস্বর’ ।

আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ সকল দলের পক্ষ থেকে সম্মিলিত কার্যব্যবস্থা গ্রহণের বাঞ্ছনীয়তা নিয়ে আলোচনা চালাতেই থাকে। কিন্তু তাদের নিজ নিজ দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্তের বাস্তবতাই বরং প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতির প্রতি তাদের অগ্রাধিকার প্রকাশ করে ।

 

পুনরুজ্জীবনের পথে পর্ব-২

 

সামরিক আইন জারির প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অনুমিত ক্ষয়িষ্ণু জনপ্রিয়তা এবং কনভেনশন মুসলিম লীগের আনুকূল্যপ্রাপ্ত অবস্থানের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনে দলটি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে-কনভেনশন মুসলিম লীগ এই প্রত্যাশাই করেছিল । কিন্তু ভুলে যাওয়া হয়েছিল যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যাবলি নিহিত ছিল পূর্ব পাকিস্তানীদের রাজনৈতিক চেতনতার সর্বাগ্রগণ্য বিষয়গুলি— এবং তারা তাদের নিজ প্রজ্ঞা ও মেজাজমত কার্যক্রম চালাবার যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ কথা ভালভাবেই জানতো এবং এই ধারণার ভিত্তিতেই পুনরুজ্জীবন পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও কর্মপদ্ধতির সঠিক ধারা নির্ধারিত হয়।

Leave a Comment