আজকের আলোচনার বিযয় “ছয় দফা ফর্মুলা” যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত। ছয় দফা আন্দোলন বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে “৬ দফা দাবি” পেশ করেন।
ছয় দফা ফর্মুলা

ছয় দফা ফর্মুলা পর্ব-১
দেশের দুটি অঞ্চলের মধ্যে একনাগাড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সেই সাথে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগত গরিষ্ঠতার প্রতি পরিপূর্ণ অবহেলা এবং এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐক্য ও সামঞ্জস্য ক্ষুণ্ণ করার বারংবার অপপ্রয়াসে পূর্ব পাকিস্তানীদের মন গভীর হতাশায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে ।
পূর্ব পাকিস্তানের এই অসন্তোষ কেবল শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মাঝেই সীমিত ছিল না—এ কথা আগেই বলা হয়েছে। পল্লীর জনসাধারণের মাঝেও এ প্রতিক্রিয়া ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। তবে অসন্তোষের এই অনুভূতিকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়ায় রূপান্তরিত করার প্রয়োজন ছিল। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব পরিষ্কার আভাস দেন যে, তাঁদের দল এ ক্ষেত্রে সর্বাত্মক প্রয়াসী হবে। কিন্তু এই প্রয়াসের কেন্দ্রবিন্দু তখনো স্পষ্ট হয়নি।

সেটা স্পষ্টরূপ ধারণ করল যখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যে সব তথ্য প্রকাশ পায় তারই আলোকে ছয়-দফা ফর্মুলার আকারে এক প্রস্তাব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দেওয়া হলো। ছয়-দফায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তার পরিপূর্ণ পুনর্নির্মিতির কথা বলা হয় ।
ছয়-দফা ফর্মুলার কথা জনসমক্ষে প্রথমবারের মতো বলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এক কনভেনশনে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত তাসখন্দ চুক্তির বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে অসন্তোষের আলোকে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধীদল গঠন ছিল এই সম্মেলনের লক্ষ্য । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গোড়ার দিকে ততটা আগ্রহী না হলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে দশ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল পাঠায় ।
শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, সম্মেলনের বিষয়-নির্বাচনী কমিটির বৈঠকে তিনি তাঁর কথা অনুযায়ী দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা জোরদার করার উদ্দেশ্য সামনে রেখেই ছয়-দফা প্রস্তাব পাঠ করেন। তাঁর মতে, ছয়-দফা বাস্তবায়িত হলে দেশের ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিত হবে। দেশে ফিরে তিনি সাংবাদিকদের কাছে ব্যাখ্যা করে বলেন, ১৭ দিনের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা যায় যে, দেশের জনগণের প্রতি আরো সুবিচারের স্বার্থে দেশের প্রশাসন কাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজানো সম্পর্কে নতুন করে চিন্তাভাবনার দরকার।
তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধের ঐ বিভীষিকাময় দিনগুলিতে পূর্ব পাকিস্তানীদের ঐক্যবোধের উপলব্ধির কারণেই দেশের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যোগসূত্র ও সম্পর্ক রক্ষিত হয়েছে। তিনি যে সব প্রস্তাব করেছেন সেগুলির উদ্দেশ্য হলো ঐ একই মনোভাবের সংরক্ষণ যাতে করে দেশের একক রাজনৈতিক সত্তারক্ষা নিশ্চিত করা যায়। তাঁর প্রস্তাবগুলির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল:
১. শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টির আওতায় পাকিস্তানে ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিষ্ঠা যার ভিত্তি হবে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব; সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির, থাকবে সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকার ও সার্বভৌম আইন পরিষদ;
২. ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়; অবশিষ্ট বিষয়গুলি ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে থাকবে;
৩. দুটি পরস্পর বিনিময়যোগ্য মুদ্রা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ একটি মুদ্রা ব্যবস্থা থাকবে । আর থাকবে পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধনপ্রবাহ রোধের শাসনতান্ত্রিক বিধান। ফেডারেশনের ইউনিটগুলির জন্য পৃথক রাজস্ব ও অর্থনীতি থাকবে;
৪. করারোপ ও লেভি বলবৎ করার বিষয় ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে থাকবে, কেন্দ্রের হাতে নয় । কেন্দ্র যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহে প্রয়োজনীয় তহবিলের জন্য প্রদেশগুলির কাছ থেকে সকল কর রাজস্বের একটা অংশ পায় তার শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে;
৫. প্রতিটি প্রদেশের জন্য বৈদেশিক বণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি করে পৃথক হিসাব খোলা হবে এবং তারা প্রত্যেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে তার ওপর তাদের নিজ নিজ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে । আর এর একাংশের বরাদ্দ থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের চাহিদা মেটানোর জন্য। দেশে উৎপাদিত পণ্যাদির আন্তঃপ্রদেশ চলাচল বা পরিবহনের বেলায় অভিশুল্কমুক্ত সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। প্রদেশগুলির বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি পাঠানোর এবং সংশ্লিষ্ট প্রদেশের স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা থাকতে হবে;
৬. প্রদেশগুলির জন্য আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী থাকতে হবে।
শেখ মুজিব জানান যে, সম্মেলনের আয়োজকদের একটি প্রভাবশালী মহল এমনকি তাঁর বক্তব্য শুনতেও অস্বীকৃতি জানায়, ওসব নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা! আর সে কারণে তিনি ও তাঁর প্রতিনিধি দল ঐ সম্মেলনের সঙ্গে সকল প্রকার যোগসূত্র ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনের প্রাক্কালে তিনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর প্রস্তাবগুলির সিদ্ধতার মূল্যায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ছয়-দফা নিয়ে রাজনৈতিক দরকষাকষির কোনো অবকাশ নেই ।
ছয়-দফা কোনো রাজনৈতিক ভোজবাজি নয়। ছয়-দফা পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি যুক্তি দেখান যে, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের এখনো বৈধতা রয়েছে । কেননা, ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের ব্যবস্থাপকদের কনভেনশনে ঐ প্রস্তাবে পরিবর্তন আনা হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মূল প্রস্তাবের ভিত্তিতে।
১৯৬৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ছয়-দফা ফর্মুলা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুস সালাম খান, জহিরুদ্দিন, তাজউদ্দিন, হাফেজ হাবিবুর রহমান ও এ. কে. মুজিবুর রহমানকে নিয়ে পুস্তিকার আকারে এই ছয়-দফা ফর্মুলা প্রকাশের জন্য একটি উপকমিটি গঠিত হয় । পরে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় ব্যাখ্যামূলক টীকাভাষ্যসহ এটি প্রকাশিত হয়।
পুস্তিকার প্রণেতা হিসেবে ছাপা হয় শেখ মুজিবুর রহমান-এর নাম। ১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় পুস্তিকাটি বিতরণ করা হয়। এ পুস্তিকা দলীয় কর্মীদের মধ্যে রীতিমতো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এ ফর্মুলা ঘোষিত হওয়ার পর কোনো কোনো মহল থেকে সমালোচনার একটা ঝড় বইলেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় আগত ১৪৪৩ জন কাউন্সিলর শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে।
কাউন্সিল সভা হয়-দফার ভিত্তিতে সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্রের একটি খসড়া অনুমোদন করে। কাউন্সিল সভার সমাপ্তিসূচক জনসভায় শেখ মুজিব এক শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এই ছয়- দফা আদায়ের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।
১৯৬৬ সালের ১৯ মার্চ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ উল্লিখিত কর্মসূচিকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে জোরদার করার এবং এ প্রদেশের আর্থ-রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সুপারিশযোগ্য কর্মসূচি বলে বর্ণনা করে এবং এই দাবিও করে যে, এ কর্মসূচি সত্যিকারের আন্তরিকতায় বাস্তবায়িত করা হলে পাকিস্তানের সংহতি অনেক বেশি জোরদার হবে এবং পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদের বিকাশে বিপুল অবদান যোগাবে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অনুমোদিত ছয়-দফা ফর্মুলাটি নিম্নরূপ:
১. দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সত্যিকার ধারণার ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে, সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির, আর সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষদ হবে সার্বভৌমত্বের অধিকারী;
২. ফেডারেল সরকার মাত্র দুটি বিষয় পরিচালনা করবেন। এ দুটি বিষয় হলো প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়। আর অন্য সকল বিষয় ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে ন্যস্ত থাকবে;
৩. ক) দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা দুই অঞ্চলে প্রবর্তন করা যেতে পারে; অথবা
খ) গোটা দেশের জন্য একটি মাত্র মুদ্রা রাখা যেতে পারে । তবে এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধে শাসনতান্ত্রিক বিধান থাকতে হবে। পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভ রাখতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে;
৪. ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে করারোপ ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে। ফেডারেল কেন্দ্রের হাতে এ রকম কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবে কেন্দ্র তার নিজ ব্যয় চাহিদা মেটানোর জন্য প্রদেশগুলির করের একটা অংশ পাবে । প্রদেশের সকল করের ওপর একটা নির্ধারিত হারে লেভি থেকে একটা সর্বমোট সুসংহত তহবিল গড়ে উঠবে;
৫. ক) দেশের দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের জন্য দুইটি পৃথক বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রার হিসাব থাকবে;
খ) পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে;
গ) ফেডারেল সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন দুই অঞ্চল কর্তৃক সমান হারে অথবা নির্ধারণযোগ্য অনুপাতে দুই অঞ্চল কর্তৃক মেটানো হবে;
ঘ) দেশজ পণ্য দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে শুল্কমুক্তভাবে অবাধে চলাচল করবে;
ঙ) শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে ফেডারেশনের ইউনিট সরকারগুলি বিদেশে বণিজ্য মিশন খুলতে ও বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে;
৬. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন করতে হবে ।
ফর্মুলার মূল বিষয়বস্তু ছিল আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। এই দাবিটি বাস্তবিকপক্ষে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম নেওয়ারও আগের। আর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার প্রথম থেকেই বরাবরই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছিল। স্বায়ত্তশাসন পুস্তিকার লেখক শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ছয়-দফা ফর্মুলা জনগণের বিপুল স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া লাভ করেছে কারণ বিষয়গুলি কোনো “নতুন আবিষ্কার” নয় বরং “প্রকৃতপক্ষে জনগণেরই দীর্ঘকালের দাবি, আর তাদের নেতাদের অঙ্গীকারও বটে যা কয়েক দশক ধরে পূরণের অপেক্ষায় রয়েছে।”
বিভাগ-পূর্ব ভারতে মুসলিম রাজনীতির প্রকৃতি ও প্রবণতা এবং গোড়ার দিকে থেকেই পাকিস্তানের শাসকচক্রের মনোভাবে ভবিষ্যতে দেশের রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে পূর্বাঞ্চলের অবস্থান
কী হবে তা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকদের সন্দেহ ছিল। এমনকি ‘৫০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতাদেরও এ সবের প্রতিকার কী হতে পারে সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ ছিল না। তাঁরাও বেশ বাস্তববাদী পথেই ব্যবস্থা গ্রহণের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এই অর্থে ছয়-দফা ফর্মুলার আকারে যে সব সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয় তার বিশেষ কোনো নতুন বৈশিষ্ট্য ছিল না ।
‘৫০-এর দশকের মধ্যভাগে যখন পাকিস্তানী সমাজের দুটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের বিষয়ে যুগপৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল তখন এই প্রবণতাটি বেশ লক্ষ্যগোচরভাবেই কায়েমি হয়। এর একটি ছিল, গণপরিষদ কর্তৃক শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়ন ও অন্যটি হার্ভার্ড উপদেষ্টা গ্রুপের’ নির্দেশনায় ১ম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়ন।
শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়া চলাকালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকেরা, বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকেরা, যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অধিকারগুলিকে আইনের বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শাসনতন্ত্রে যতখানি বেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক উপাদান সন্নিবেশের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেই সময়েই ১ম পাঁচসালা পরিকল্পনা প্রণয়নকালে পূর্ব পাকিস্তানী অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তানের অবনতিশীল অর্থনৈতিক দুর্দশা ও এর প্রতিকারের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণে নিয়োজিত ছিলেন।
এই দুই অংশের মধ্যে যোগসূত্র অর্থাৎ একদিকে রাজনীতিকবৃন্দ এবং অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও বিদ্বজ্জন তথা চিন্তাশীল পূর্ব পাকিস্তানীদের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তাদের মধ্যে ভাব ও তথ্যবিনিময় ঘটে। এ সবের পরিস্রাবণ প্রক্রিয়ার পথ ধরে সমস্যা সমাধানের এক ধরনের ফর্মুলা ক্রমান্বয়ে গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আওয়ামী লীগের নেতা আবুল মনসুর আহমদ দু’দিনে (১৬ ও ১৭ জানুয়ারি ১৯৫৬) সাত ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্য প্রদান করেন ।
তাঁর আলোচনার বিষয় ছিল: পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরাট ব্যবধানে অবস্থিত দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের আলোকে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের আবশ্যকতা, দুই অঞ্চলের মধ্যেকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত তারতম্য, এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় আয়ের সিংহভাগ কেবল পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অপরাধতুল্য অবহেলা এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরি/সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালিদের উনপ্রতিনিধিত্ব। তাঁর গোটা বক্তৃতায় অসংখ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে বক্তব্যকে প্রামাণ্য করা হয় ও তিনি কয়েকটি যুক্তি ও বাস্তবতার কারণে কেবল তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে একটি বিকেন্দ্রায়িত সরকার বা শাসনব্যবস্থা কেন প্রয়োজন সে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
স্পষ্টত আবুল মনসুর আহমদের বক্তৃতার মূল বিষয় ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও এর কারণগুলি । তিনি যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকার কাঠামোর প্রস্তাব দেন সেগুলি ঐ সব সমস্যার সমাধান বলে ধারণা করা হয় । বাস্তবিকপক্ষে, আবুল মনসুর আহমদের ঐ চাঞ্চল্যকর বক্তৃতা ছিল রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের প্রয়াসের যৌথ ফসল। ঐ দলে ছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিসংখ্যান
বোর্ডের ড. এ. সাদেক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক ও ড. এএফএ হুসেন। তাঁরা সকলেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে করাচিতে যান এবং সম্মিলিতভাবে ভাষণের প্রধান বিষয়বস্তুগুলি তৈরি করেন। ড. এ. সাদেকই প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের গোড়ার দিকে আন্তঃআঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য ও এ বৈষম্য একটানা চলতে থাকার কারণগুলি এবং সেগুলির প্রতিবিধান নির্দেশ করেন।
এখানে উল্লেখ আবশ্যক, এই দলের দুই সদস্য: রাজ্জাক ও হুসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিকল্পনা বোর্ডের সদস্যও ছিলেন । তাঁরা পাকিস্তানে পাঁচসালা পরিকল্পনার খসড়ার ওপর অনুষ্ঠিত আলোচনা বিতর্কে অংশগ্রহণও করেন।
ড. এএফএ হুসেন ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার নিয়োজিত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন কমিটিরও অন্যতম সদস্য ছিলেন। ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের এক বিশেষ সম্মেলনে প্রণীত খসড়া পরিকল্পনার ওপর ইস্ট পাকিস্তান ইকনমিস্টস রিপোর্ট প্রণয়নেও রাজ্জাক ও হুসেন সংশ্লিষ্ট ছিলেন।১০ খসড়া পরিকল্পনার অসংলগ্ন পদ্ধতি সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে ঐ রিপোর্টে বলা হয়:
উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তান দুটি অর্থনৈতিক ইউনিট মিলে গঠিত—এভাবে ধরতে হবে। তবে বিশেষ কোনো কোনো উদ্দেশ্যে, দৃষ্টান্ত দিয়ে যেমন বলা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৈদেশিক সম্পদ সমাবেশ ও নিয়োজনের জন্য দেশকে একক অর্থনীতির বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।
পূর্ব পাকিস্তান সম্পদের ঘাটতি আমাদের অতীতের কারণে তৈরি হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে যে সম্পদ তৈরি হচ্ছিল কিংবা এ অঞ্চলের প্রয়োজন কী ছিল তার সাথে পাকিস্তানের প্রথম আট বছরের উন্নয়ন এবং বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রার বরাদ্দ ইত্যাদির সম্পর্ক তেমন ছিল না। তাই যা আজকে সবচেয়ে যথার্থ ও উপযুক্ত তা হলো, ভবিষ্যতের জন্য আমাদের নীতি গ্রহণের বেলায় অতীত অবহেলাকে হিসেবে ধরে সে ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য স্থির করা। এ ক্ষেত্রে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অতীতের নিহিত তাৎপর্য বিস্মৃত হওয়ার কাজটি হবে অদূরদর্শী ও অবাঞ্ছনীয় ।
১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির (PEA) সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দুর্ভাবনা ও উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে আবুল মনসুর আহমদের কথার প্রায় পুনরুক্তি করে বলেন:
পাকিস্তান আজ যে সব অর্থনৈতিক সমস্যার মোকাবেলা করছে তা কেবল খুব জটিল প্রকৃতিরই নয়, বরং কোনো না কোনোভাবে বলা যায়, এ সমস্যা পৃথিবীর অর্থনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমধর্মী । পাকিস্তান বস্তুতপক্ষে দ্বিঅর্থনীতির দেশ। এ দেশের দুটি ইউনিটের স্বকীয় সুনির্দিষ্ট সমস্যাদি রয়েছে যেগুলির মোকাবেলা আলাদাভাবে ইউনিট বা অঞ্চলভিত্তিতেই করতে হবে।
পাকিস্তান ইকনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহিদ হুসেন খসড়া পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের সংশয়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি অবশ্য পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সম্পদ বরাদ্দের বিষয় উল্লেখ করে বলেন এ সমস্যার প্রতিকার সহজেই করা যায় । কেননা:
আজকে মনে হচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তান উন্নয়নের পথে এক দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার মতো অনুকূল অবস্থায় রয়েছে। আপনাদের রাজনৈতিক অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল । আপনাদের এমন একটি রাজনৈতিক দল (তিনি নিশ্চয়ই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কথাই বলেছেন যে দলটি পূর্ব পাকিস্তানের কোয়ালিশন সরকারে তখন প্রধান অংশীদার ছিল) ক্ষমতায় রয়েছে যা দৃষ্টত সাফল্যের দিক থেকে রেকর্ডের অধিকারী। কেন্দ্রে আপনাদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত প্রায় সকল দপ্তর আপনাদের নিয়ন্ত্রণে। দেশ বিভাগের আগের শোষণ থেকে আমরা সকলে যে ভীতি ও আতঙ্ক ওয়ারিশ হিসেবে পেয়েছি সেই দুঃস্বপ্ন আর কতকাল পূর্ব পাকিস্তানকে তাড়া করে ফিরবে! আপনাদের নিয়তি রয়েছে আপনাদের হাতে। আমি আপনাদেরকে এ বাস্তবতা উপলব্ধি ও মূল্যায়ন করার জন্য একান্ত বিনীত অনুরোধ জানাই। আমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়ে আমাদের সকল শক্তি ক্ষয় করে পাকিস্তানকে সবল করতে পারবো না। এ অবস্থার অবসান যদি না ঘটে, তাহলে দিনের পর রাত যেমন আসে তেমনি বিপর্যয়ও আসবে সুনিশ্চিতভাবেই ।
জাহিদ হুসেন যা বলতে চেয়েছেন তাত্ত্বিক দিক থেকে তাতে কোনো খুঁত নেই । কিন্তু যখন পূর্ব পাকিস্তানীরা পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত প্রণেতা সংস্থাগুলিতে থেকে তাদের বিবেচনা প্রয়োগ করতে গেলেন তখনই পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমি স্বার্থবাদী মহলগুলিতে তার বিরুদ্ধে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। যেমনটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ওরা তারপর এও সুনিশ্চিত করলো যাতে ভবিষ্যতে কখনো আর এমনটি না ঘটে।
পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের তথা বিকাশের নিরিখে খসড়া পরিকল্পনার ফাঁক ও গলদগুলি তাঁদের কাছে স্পষ্ট ধরা পড়ে যাঁরা খসড়া পরিকল্পনার ব্যাপারে বিরুদ্ধ মতপ্রকাশ করেছিলেন। এই মত প্রধানত অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্ক (Colin Clark)-এর একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। তিনি ‘৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে তাঁর এ প্রতিবেদন তৈরি করে পাকিস্তান সরকারের কাছে জমা দিয়েছিলেন । কলিন ক্লার্ক ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চল সফর করার পর তাঁর এই প্রতিবেদন তৈরি করেন।
তাঁর এ প্রতিবেদন ছিল এক কূটনৈতিক দলিলবিশেষ যা অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র বিষয় বিভাগ সরকারিভাবে পাকিস্তান সরকারে কাছে পেশ করে। এ দলিল ছিল “গোপনীয়”।১৫ প্রতিবেদনে১৬ কলিন ক্লার্ক দেশের আধুনিক শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে একটা ভাগ দেওয়ার জন্য অত্যন্ত জোরালো সুপারিশ করেন ও সেভাবেই বক্তব্য দেন । তাঁর নানা সুপারিশে জোর দিয়ে বলা হয় যে, পাকিস্তানের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক শিল্প বিকাশ একটা পূর্বশর্ত ।
তবে সরকার দৃষ্টত এ পরামর্শে কান দেননি । পরে ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এক আইন পরিষদ সদস্য জহিরুদ্দিন এ রিপোর্টের বিষয়বস্তু চেপে যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।১৭ অবশ্য কলিন ক্লার্কের সুপারিশগুলি ১৯৫২ সালের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন কমিটির রিপোর্টে নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হয়।
কমিটির রিপোর্টে বলা হয়: “আমাদের অভিমত এই যে, আমাদের সমস্যাগুলির সমাধান খুঁজতে হবে সুষম কৃষি- শিল্প উন্নয়ন ও বিকাশের মাঝে।”১৮ তবে অন্তত পূর্ব পাকিস্তান যেখানে সংশ্লিষ্ট সেখানে বা সেই বিষয়ে স্পষ্টতই নীতি নির্ধারকদের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
কলিন ক্লার্ক তাঁর সুপারিশগুলি১৯ স্থির করেছিলেন, প্রত্যাশিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি-সংক্রান্ত এক সংখ্যাতাত্ত্বিক অভিক্ষেপ বা হিসাবের ভিত্তিতে। এতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনুযায়ী, শ্রমশক্তিতে কত সংখ্যা বৃদ্ধি প্রত্যাশিত তা নিরূপণ করা হয় । অন্য কথায়, কর্মসংস্থান প্রার্থীর সংখ্যা কত বৃদ্ধি পাবে সেটি বের করা হয়। কলিন ক্লার্কের হিসেব অনুযায়ী, পাকিস্তানে তখন বার্ষিক মোট কর্মসংস্থান প্রার্থী বা অতিরিক্ত শ্রমজীবীর সংখ্যা ৩,০০,০০০ করে বাড়ার কথা। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বাড়বে ২,০০,০০০ ।
তিনি আরো বলেন যে, শ্রমশক্তির ৭০ শতাংশ কৃষিকর্মে নিয়োজিত । কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি জমির ঘাটতি ও পশ্চিম পাকিস্তানে পানিসম্পদের ঘাটতির কারণে অনিবার্যভাবেই পল্লীজনপদের বহু শ্রমজীবী মানুষ বেকার থেকে যায়। সেচ ব্যবস্থার যত রকমে উন্নতি সম্ভব সে সব ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করার পরেও পশ্চিম পাকিস্তান তখনকার তুলনায় সামান্য কিছু বেশি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।
আর পূর্ব পাকিস্তানে এখনকার চেয়ে বেশি কোনো লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব হবে না । তিনি আরো বলেন, “পাকিস্তানের সম্পদের অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবহারের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে ধান, পাট, চা ও নারকেল এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ধান, গম ও ভুট্টা আবাদেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং জাতীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রয়াস পরিত্যাগ করা উচিত।”
অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার নিরিখে কৃষি বহির্ভূত খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য কঠোর প্রয়াস যদি চালানোর কথাই বলা হয় তাহলে পশ্চিম পাকিস্তান শুধু কোনোক্রমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাল রক্ষা করে চলতে সক্ষম হবে আর পূর্ব পাকিস্তানে কয়েক বছর ধরে কৃষি থেকে জীবিকানির্বাহে প্রয়াসী মানুষের সংখ্যা কেবল বাড়তেই থাকবে ।
শিল্পোন্নয়নের সকল প্রস্তাবে পশ্চিম পাকিস্তান অপেক্ষা পূর্ববাংলাকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিতে হবে আর পূর্ব পাকিস্তানে ফি বছর যে অতিরিক্ত ২,০০,০০০ কর্মসংস্থানকামী মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে তাদের জন্য কৃষিবহির্ভূত কর্মসংস্থানের জন্য পরিকল্পনা নিতে হবে । তিনি আরো বলেন:
১৯৫১ সালে পাকিস্তানে অকৃষি খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬.৫ মিলিয়ন অথবা মোট শ্রমশক্তির ৩০%। এ অনুপাত পূর্ব পাকিস্তানের বেলায় ছিল মাত্র ২২% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বেলায় ৪৬%।
অন্যান্য দেশের এবংবিধ রেকর্ডের সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে দেখা যায়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি যতই বলিষ্ঠ হোক না কেন, শিল্পে নিয়োজিত ব্যক্তির মোট সংখ্যা বার্ষিক ৩% হারের বেশি বাড়ানো যাবে না…. ৩% হারে এই বার্ষিক প্রবৃদ্ধিতে বছর প্রতি সর্বাধিক যত মানুষের কর্মসংস্থান আমরা বর্তমান অকৃষি খাতে আশা করতে পারি তা হতে পারে পূর্ব পাকিস্তানের বেলায় বার্ষিক ৮০,০০০ ও পশ্চিম পাকিস্তানে বার্ষিক ১,২০,০০০। এটা স্পষ্ট যে, অকৃষি খাতে কর্মসংস্থানের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তান তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি অংশ পেয়েছে। সে জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে সকল শিল্পোন্নয়ন প্রকল্পের বেলায় আনুকূল্য প্রদানে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্তত কয়েক বছর ধরে হলেও পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় সমৃদ্ধতর হয়ে উঠবে যখন পূর্ব পাকিস্তান আরো দরিদ্র হতে থাকবে যতদিন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে আরো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না তোলা হয়; অথবা জনসমষ্টির কিছু লোক অন্যত্র না চলে যায়।
পরে প্রকাশ পায়, ক্লার্ক পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য যে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার প্রতি কর্তাব্যক্তিরা আমল দেননি (যদিও পশ্চিম পাকিস্তান সম্পর্কিত তাঁর কোনো কোনো সুপারিশ যেমন, মৃত্তিকার লবণাক্ততা মুক্তকরণ ও লভ্য পানিসম্পদের সর্বাধিক ব্যবহারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়)। বরং পাকিস্তানে স্পষ্টত হার্ভার্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপের পরামর্শে এমন এক প্রবৃদ্ধিমূলক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হয় যার জন্যে (পূর্ব পাকিস্তানের) কৃষি খাতের সম্পদ (পশ্চিম পাকিস্তানের) শিল্প খাতে স্থানান্তর করতে হয়।
এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানী অর্থনীতির ক্রমাবনতি ঘটতে থাকে। অর্থনৈতিক সম্পদের অসঙ্গত বিলিবণ্টনের কারণে ‘৬০-এর দশকের মধ্যভাগে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভ ও অভাব অভিযোগ দেখা দেয়। তবে এরও আগে প্রবৃদ্ধি উন্নয়ন নীতি-কৌশলের২১ কুফল খুব বেশি দ্রুত পরিদৃশ্যমান না হয়ে উঠলেও একটি ভারসাম্যহীন জাতীয় অর্থনীতির ফলাফল ‘৫০-এর দশকেই অনেকের নজরে আসে। ড. সাদেক পাকিস্তানের খসড়া প্রথম পরিকল্পনার ঘাটতিগুলি নির্দেশ করে এ বিষয়ে “পুনরায় চিন্তাভাবনা” করে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি অত্যন্ত বিশদ ব্যাখ্যায় বলেন: ভৌগোলিক কারণে দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে শ্রম ও মূলধনের গতিবিধি প্রায় অসম্ভব থাকায় পাকিস্তানে দুই অর্থনীতির ভিত্তিতে এক অর্থনৈতিক আদর্শের রাষ্ট্র পরিচালনা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আর এটি করতে হলে, তাঁর পর্যায়ে একদিকে কেন্দ্রীয় রাজস্ব আয়-ব্যয় ও অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি খাতে অঞ্চল মতে, রাষ্ট্রীয় ভিত্তিতে দ্বৈত ভারসাম্য রক্ষার সচেতন প্রয়াস চালাতে হবে।
এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা বের করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তার তৎকালীন উপনিবেশ যুক্তরাষ্ট্রের যোগসূত্র রক্ষাকারী আর্থ-বাণিজ্যিক কার্যব্যবস্থাটি ছিন্ন হয়ে যায়। কেননা, যুক্তরাজ্য ও তার আমেরিকান উপনিবেশগুলির মাঝে ছিল কার্যত দুই অর্থনীতির ব্যবস্থা।
রাজস্ব ব্যয়ের উপকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে এই উপলব্ধিই এক অশান্ত রূপ নেয়, ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া করারোপ নয়’-এই শ্লোগানে। আর এই শ্লোগান তুলেই আমেরিকানরা একটা দ্বিঅর্থনীতির বাস্তবতায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তার এক আর্থ- বাণিজ্যিক ব্যবস্থার বন্ধন ছিন্ন করে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ব্রিটিশ দক্ষিণ আফ্রিকা—অন্য সকল ব্রিটিশ ডোমিনিয়নকে এ ঘটনার পর একাদিক্রমে দ্রুত আর্থ-বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়। আর সেই পথ ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বহুঅর্থনীতি সংবলিত দেশ বহু একক অর্থনীতির দেশ হিসেবে আলাদা হয়ে যায়।
ড. সাদেক যা বলতে চেয়েছিলেন তা হলো, একান্তভাবে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের বেলায় যদি এ ধরনের উদার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে অবশ্যই তা পাকিস্তানেও সম্ভব, অন্তত গোটা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে। দেশটির একাংশের স্বার্থ বিকিয়ে অন্য অংশের উন্নয়ন বা সমৃদ্ধির জৌলুসের ব্যবস্থা করা যাবে না।
আর ঠিক এ বিষয়টিই ‘৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মুখপাত্রদেরকে দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্যগুলিকে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে এবং পরিস্থিতির দাবির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য উঁচু মাত্রায় বিকেন্দ্রায়নের ব্যবস্থাসহ পাকিস্তান ফেডারেল রাষ্ট্রের একাধিক ইউনিট আকারে ঐ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নির্দেশে অনুপ্রাণিত করে।
আবুল মনসুর আহমদ নির্দেশিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলির (‘৫০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে যতগুলি বক্তব্য দিয়েছে সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে সর্বাঙ্গীণ ও নিটোল) অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার বিশ্লেষণ দিয়েছেন ড. এ. সাদেক। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, পাকিস্তানের এক ব্যতিক্রমধর্মী ভৌগোলিক অবস্থানজনিত প্রেক্ষাপটে দেশটির ফেডারেল রাজধানীর অবস্থান, প্রতিরক্ষা ব্যয়, যুক্ত ফেডারেল অর্থব্যবস্থা, এক মুদ্রানীতি, এক বাণিজ্যনীতি, এক মুদ্রা বিনিময় হার, এক শিল্পনীতি—এসব কেমন করে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলছে।
যদি এ সবের বদলে পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক দিক থেকে কমবেশি স্বশাসিত করা যেতো তাহলে “পাকিস্তানের মতো দ্বিঅর্থনীতিভিত্তিক রাষ্ট্র বিশ্বের যে কোনো এক অর্থনীতিভিত্তিক রাষ্ট্রের মতো সুদৃঢ় ও সুষ্ঠু বুনিয়াদের ওপর দাঁড়াতে পারতো।
ড. সাদেক তাঁর লেখায় এই বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন যে, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে ভৌগোলিক বা ভূখণ্ডগত নিরবচ্ছিন্নতা নেই বলেই এ দেশে একক অর্থনীতির কথা বলা হলেও আসলে সেখানে দুই অর্থনীতিই বাস্তবতা। জোর করে তত্ত্বকথার এক অর্থনীতি চাপানোর ফলে দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য গুরুতর আকার ধারণ করছিল। অথচ বিচক্ষণতার সাথে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করা হলে দেশের দুই অঞ্চল পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠে পাকিস্তানের সামগ্রিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারতো।

এ কারণে “আওয়ার রাইট টু লিভ” (আমাদের বাঁচার অধিকার) লেখায় একই সুরে যুক্তি দেখিয়ে উল্লেখ করা হয় যে, পাকিস্তানকে শক্তিশালী ও শীর্ষক ঐক্যবদ্ধ করতে হলে দেশটির জন্য এমন নেতৃত্ব দরকার যাদের দূরদৃষ্টি “অসাধারণ রকমে সুদূরপ্রসারী। ২৪ এই লেখায় লেখক এ সব কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন যা আগেই বলা হয়েছে, বিস্তৃত কলেবরে সে সবের বিশদ ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবিকপক্ষে, ড. সাদেক যা লিখেছেন, ১৯৫৬ সালের গণপরিষদে আবুল মনসুর আহমদ যা বলেছেন, ঐ একই বছর পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির সম্মেলনে আতাউর রহমান খান যা বলেছেন এবং ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভাঙন- পূর্ববর্তী কাগমারী কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী যা উল্লেখ করেছিলেন এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও আতাউর রহমান ‘৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে যা বলেছিলেন এগুলিকে ক্রমান্বয়ে দেখলে বোঝা যায় “আওয়ার রাইট টু লিভ” পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ছয়-দফা ফর্মুলাটি এসেছে ড. সাদেক কর্তৃক রচিত “ইকনমিক ইমার্জেন্স অব পাকিস্তান” (Economic Emergence of Pakistan, vol. II) ২৫ গ্রন্থে প্রদত্ত পরামর্শসমূহের সরল অনুসরণে ।

ছয়-দফা ফর্মুলা পর্ব-২
ছয় দফা ফর্মুলা এই সত্যকে পরিষ্কার লক্ষ্যগোচর করে তোলে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে দু’দশককাল অতিবাহিত হওয়ার পর দেশের পূর্বাঞ্চল আদৌ উপকৃত হয়নি বলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা বুঝতে পারেন।
তাঁদের এ উপলব্ধিও ঘটে, তাঁরা যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের শরিক হয়েছিলেন সেগুলি পূরণ করতে হলে দেশের শাসনতন্ত্রের গ্যারান্টির আওতায় আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষমতা করায়ত্ত করার মাধ্যমে এ বিষয়ের একটা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে হবে। এর অর্থ হবে পাকিস্তানী রাষ্ট্রসত্তার পরিপূর্ণ পুনর্নির্মাণ ।

হয়-দফা ফর্মুলার প্রবক্তাদের নিশ্চিত ধারণা ছিল যে, পাকিস্তানী জাতির সংহতি ও প্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পাকিস্তানের প্রধান আর্থ-রাজনৈতিক স্রোতধারা থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। আর এ বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানী শাসকচক্রের বিষম আচরণ ও ব্যবস্থা থেকে।
পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনচক্রে সর্বদাই আধিপত্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের, বিশেষ করে পাঞ্জাবীদের। এই ফর্মুলাটি প্রধানত দেশের আন্তঃআঞ্চলিক আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যাবলির টেকসই সমাধানের মৌলিক নীতি হলেও এতে ৫ কোটি ৫০ লাখ পূর্ব পাকিস্তানীর মনোভাবের ও তাদের বেঁচে থাকার অধিকারের দাবির সত্যিকারের প্রতিফলন ঘটেছে।২৬ এ ছাড়া ছয়-দফা ফর্মুলাতে জাতি গঠনের সমস্যার মতো অধিকতর মৌলিক প্রকৃতির সমস্যা সমাধানের রূপরেখাও ছিল!
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটির শাসক অভিজাতবর্গ একটি গঠন নির্মিতি বা কাঠামোকে স্থিতিশীলতার নামে শক্তিশালী করে তুলতে চেয়েছে যাতে কেন্দ্রের কর্তৃত্ব ও অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করার কারণে শাসকগোষ্ঠীতে কার্যকরভাবে প্রতিনিধিত্ব নেই। সে কর্তৃত্বের অলঙ্ঘনীয়তা নিশ্চিত করা যায় ।
কেন্দ্রের চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিষয়ে এমন বিভিন্ন অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক লোকের আর্থ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা ক্ষুন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সর্বাধিক দূরে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তানই দুর্ভোগ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছে সবচেয়ে বেশি। তবে এ সবের প্রতিকার কী হতে পারে এ নিয়ে আঞ্চলিক দাবিদাওয়া প্রশ্নে, বিশেষ করে, কোনো কোনো নীতিগত সাড়ার কারণে বিভ্রান্তি বিরাজ করে (এ বিষয়ে ইতঃপূর্বে অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে)।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ গ্রহণের নিষ্ফলতা বুঝতে পারে, পূর্ব পাকিস্তানের অন্য যে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চেয়ে অনেক আগে বিষয়টি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে। তাই এই দলটিই ছয়-দফা ফর্মুলায় অত্যন্ত পরিষ্কার ও প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রথমবারের মতো সমস্যাবলির একটা বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান তুলে ধরে। ছয়-দফা পাকিস্তানী রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে আর সেই সাথে পাকিস্তানের রাজনীতিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এক নবপর্যায়ও সূচিত হয়।
জাতীয় রাজনৈতিক দলের তথা মুসলিম লীগের একটি বিকল্প সংগঠনের ভূমিকা পালন ও পাকিস্তানে এক রাজনৈতিক জনসমাজ গড়ে তোলা থেকে এ দল এখন প্রত্যয়বলিষ্ঠ এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠে যার লক্ষ্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরে পূর্ব পাকিস্তানকে এক রাজনৈতিক জনসম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তোলা । নিঃসন্দেহে গোটা বিষয়টি ছিল এক ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা । তবে এ কথাও সত্যি, পাকিস্তান রাষ্ট্র ও তার রাজনৈতিক ব্যবস্থাও ছিল ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
পাকিস্তানী পরিস্থিতির এই ব্যতিক্রমধর্মিতার বাস্তবতা তথা পাকিস্তানের ইতিহাস ও ভূগোলসঞ্জাত বৈশিষ্ট্য পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন অভিজাতবর্গ কখনো স্বীকার করেনি । আর সেই কারণেও দেশের আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যাবলির ব্যতিক্রমী সমাধানও শাসকচক্রের কাছে কোনো সুবিবেচনা লাভ করেনি। বরং এ রকম পরিস্থিতিতে যে ধরনের গতানুগতিক বাঁধাধরা প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে তার নমুনা হিসেবে প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের এই জবানিরই বরাত দেওয়া যায়: “অস্ত্রের ভাষায় এর জবাব দেওয়া হবে।”
যে রূঢ় বাস্তব পরিস্থিতি পূর্ব পাকিস্তানকে কনফেডারেশনের একটি ইউনিটের মর্যাদা দেওয়ার মতো এক প্রস্থ দাবিদাওয়া তুলে ধরার পথ দেখায় আসলে তার সৃষ্টি হয় উদ্ভূত কতকগুলি সমাজ-সাংস্কৃতিক, আর্থ-রাজনৈতিক সমস্যা থেকে । তবে এ সব সমাজ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান কেবল কিছু প্রতিবাদী কর্মসূচিতেই নিহিত ছিল না। বরং দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যেকার রাজনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণেও একটা পরিবর্তন একান্ত অপরিহার্য ছিল ।
পূর্ব পাকিস্তানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভাব অভিযোগের প্রতিকারের জন্য দ্বিবিধ পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল। এক, রাজনৈতিক ব্যবস্থার আগাগোড়া পরিবর্তন; দুই, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক পরিবর্তন । প্রথম দফায় বর্ণিত পরিবর্তনের বাস্তবায়ন হলেও তাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয় দফা পরিবর্তন সাধিত হবে এমন সম্ভাবনা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের যে দাবি ছয়-দফায় রয়েছে তার মাঝেই উল্লিখিত উভয় পরিবর্তনের ভিত্তি নিহিত।
সাদেক ও অন্যদের প্রস্তাবিত একটি যুক্তিসঙ্গত আর্থ-রাজস্বনীতি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত বিকেন্দ্রায়িত। শাসন পদ্ধতিসহ ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় ‘৫০-এর দশকে অনুসৃত হলে তেমন অবস্থায় স্বার্থের সংঘাত সৃষ্ট সমস্যাবলির প্রতিকারসমূহের একটা দাবি-ফর্মুলার আনুষ্ঠানিকীকরণের প্রেরণা খুব সম্ভবত নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতো কিংবা নিদেনপক্ষে অনেকটা প্রশমিত বা ন্যূনতম পর্যায়ে স্তিমিত হয়ে যেতো।
কেননা, এভাবেই কোনো একটা চলনক্ষম ব্যবস্থা কাজ করে ও যে কাঠামোর মধ্যে তা কাজ করে সে কাঠামো বা নির্মিতিও সেটিই টিকিয়ে রাখে । তবে এই ব্যর্থতা, ইচ্ছাকৃত, পরিকল্পিত কিংবা অনিচ্ছাকৃত যা-ই হোক, পরিস্থিতির বাস্তবতা শুধুমাত্র কবুল করলেই পরিস্থিতি বদলায় না। এতে কেবল ঐ পরিস্থিতি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন অংশের চেতনার ব্যাপ্তি বাড়ে, চেতনা প্রখরই হয়ে ওঠে। ছয়-দফা ফর্মুলার অভ্যুদয় তারই নজির। ‘৫০-এর দশকে এ ছিল অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি-সচেতন শিক্ষাবিদ ও ছয়-দফা ফর্মুলার সূচনার জন্য সমবেতভাবে প্রয়াসী কিছু রাজনীতিকের সমন্বয়কর্ম।
সামরিক শাসনামলে কমবেশি এরাই একত্রে ধারণাটি আরো চাঁছাছোলা করে শাণিত, তীক্ষ্ণ, নিটোল করে তোলে। ‘৬০-দশকের মাঝামাঝি নাগাদ ছাত্র ও কোনো কোনো বাঙালি আমলা এতে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট হন। এভাবে সমাজের ব্যাপকতর অংশ এতে সংশ্লিষ্ট না হওয়া অবধি প্রতিকারমূলক প্রস্তাবগুলি বহুলাংশেই কল্পনাবিলাসের পর্যায়ে থেকে যায় কিংবা আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, ঐ সব ধারণা বাস্তব রাজনৈতিক দাবি হিসেবে অভিব্যক্ত না হয়ে কেবল ‘বাসনা’র চৌহদ্দিতেই আটকে থাকে । বস্তুতপক্ষে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন-পরবর্তী নয়া নেতৃত্বের আশাবাদী বাস্তববোধই ঐ ‘বাসনাকে পূর্ব পাকিস্তানের ‘দাবি’র ফর্মুলায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়।
ছয়-দফা ফর্মুলার বিবর্তন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায় সম্বন্ধে নানা ধরনের ভাষ্য রয়েছে। এদের একটিতে এই ফর্মুলার খসড়া রচনার কৃতিত্ব দেওয়া হয় আলতাফ গওহরকে আর তিনি নাকি সেটি করেন লাহোরে বিরোধীদলীয় কনভেনশনকে কূটাঘাত করার জন্য। কিন্তু ছয়-দফা ফর্মুলার ক্রমগঠন প্রক্রিয়াটির হদিস বের করার পর মনে হয়, উল্লিখিত সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ । যদিও এটি অবশ্য খুবই সম্ভব যে, আইয়ুব খানের একজন একনিষ্ঠ নিশানবরদার হিসেবে গওহর হয়তো বা শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাঁর ঐ ফর্মুলাটি আইয়ুববিরোধী লাহোর কনভেনশনে পেশ করতে।
আর তার নেপথ্য মতলব ছিল আইয়ুবের সমালোচকদের ভঙ্গুর ঐক্য ভেঙে দিয়ে তাঁদের দৃষ্টি তাসখন্দ চুক্তির “ভ্রান্তি” থেকে সরিয়ে ছয়-দফার “ফলাফলে” আকৃষ্ট করা। আবুল মনসুর আহমদই ছয়-দফার প্রণেতা বলে যে দাবি করা হয়ে থাকে সেটি বরং বেশি বোধগম্য । কিন্তু খোদ আবুল মনসুর আহমদ তা অস্বীকার করেছেন যদিও তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রকাশিত পুস্তিকার লেখক বলে দাবি করেছেন।
আবুল মনসুর আহমদ ও কামরুদ্দিন আহমদ ছাড়াও এ ব্যাপারে কয়েকজন আমলার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন: শামসুর রহমান সিএসপি, ফজলুর রহমান সিএসপি, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, সানাউল হক সিএসপি, একেএম আহসান সিএসপি প্রমুখ । এঁদের মধ্যে তিনজন পরবর্তীকালে তথাকথিত “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়” দোষী সাব্যস্ত হন। ওয়াকেফহাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী লাহোর বিরোধীদলীয় কনভেনশনে যে আকারে ফর্মুলাটি পেশ করা হয় প্রকৃতপক্ষে রুহুল কুদ্দুস সে আকারেই ছয়-দফা ফর্মুলার খসড়া তৈরি করেন আর অন্য আমলারা বিষয়টি জানতেন।
তবে তাঁদের কেউ শেখ মুজিবের সাথে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির কোনো কোনো সদস্য এবং মকসুমুল হাকিম, এ. কে. মুসা, সাংবাদিক আবদুল গফফার চৌধুরী ও একজন পূর্ব পাকিস্তানী ব্যাঙ্কার খায়রুল কবির বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন । শেষোক্ত ব্যক্তির অফিসে ফর্মুলার খসড়াটি টাইপ করা হয়।
নিঃসংশয়ে বলা যায়, যে সব আমলা শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন তাঁরা সেটি করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁরা নিজেরা ঝুঁকে পড়েছিলেন বলে। তবে তাঁদের জড়িত হওয়ার বিষয়টি সোহরাওয়ার্দী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বের মধ্যে পার্থক্য উপলব্ধির কারণে দ্রুততর হয়।
তাঁদের ধারণায় পূর্ববঙ্গের সাথে সোহরাওয়ার্দীর কোনো সামাজিক একাত্মতা না থাকার ফলে তিনি কখনো তাঁদের সাথে এতো ঘনিষ্ঠ বিবেচিত হননি যাতে তিনি তাঁদের নেতা হতে পারেন। এ ছাড়াও সোহরাওয়ার্দীর সাথে এই আমলাদের কখনো সরাসরি যোগসূত্র না থাকায় শেষোক্তদের আরো ধারণা হয় যে, সোহরাওয়ার্দী কখনো প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণা গ্রহণের কাছাকাছিও আসেননি কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর মনোভাব কখনো প্রকাশ করেননি, চেপে রেখেছিলেন।
তবে অনেকে এ ধারণার ব্যাপারে ভিন্নমতও পোষণ করতে পারেন কেননা, স্বায়ত্তশাসন ইস্যু প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী সম্পর্কে মূল্যায়ন করে তাঁরা অত্যন্ত স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অংশ বুঝে পাওয়ার ব্যাপারে তিনি বরাবরই একান্ত আগ্রহী ছিলেন আর বস্তুত সেটিই ছিল স্বায়ত্তশাসনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এ সবের পরেও আমলাদের কল্পিত ধারণার বাস্তবতা ছিল । আর সেটি ছিল নেতা সোহরাওয়ার্দী এবং এই ঐ সব আমলা ও অনুরূপ ধারণার অধিকারী অন্যদের মধ্যে যোগাযোগের অভাবের সুনির্দিষ্ট আভাস ।
এ কারণে যদি এ ধরনের ফর্মুলা এর আগেও প্রণীত হয়ে থাকে কিংবা এ রকম কিছু ভাবা হয়ে থাকে তা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দী যতদিন আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন ততদিন যোগাযোগের অভাবে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে তার প্রচার করা যায়নি। তাই তাঁদেরকে এমন নেতার অভ্যুদয়ের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে যাঁর স্থানীয় পর্যায়ে জোরালো সম্পর্ক রয়েছে, অপেক্ষা করতে হয়েছে তদ্দিন যদ্দিন না পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক ধাঁচের সম্পর্কটি নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হচ্ছে এবং নয়া নেতৃত্বের এ কথার যথেষ্ট পরিষ্কার উপলব্ধি না ঘটছে যে, সোহরাওয়ার্দীর কৌশল তার বাঞ্ছিত লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে আর পরিস্থিতির দাবিই হলো ভিন্ন পন্থা নেওয়ার ।
স্বায়ত্তশাসন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই ছিল। তবু দলের নতুন নেতা সে স্বায়ত্তশাসনের পরিসর সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন। বিশেষ করে এটি এই কারণে যে, তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খান দাবি করেছিলেন, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র যদি সোহরাওয়ার্দীর দাবি অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানকে ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে থাকে তাহলে ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র পূর্ব পাকিস্তানকে শতাংশ স্বায়ত্তশাসনই দিয়েছে। এই কাজটি করা যেতো দলের জাতীয় বা প্রাদেশিক স্তরে প্রকাশ্য আলোচনার মাধ্যমে। এর অন্য বিকল্প ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে রুদ্ধদ্বার আলাপ-আলোচনা।
বলা হয়েছে, শেখ মুজিব শেষোক্ত পথই বেছে নেন। আর এ প্রক্রিয়ায় রুহুল কুদ্দুস স্বকীয় উদ্যোগে একটি ফর্মুলা প্রণয়ন করেন। তাতে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের একটি রূপরেখাও দেন। তিনি তাসখন্দ চুক্তির পর খসড়াটি শেখ মুজিবকে দেন। পরবর্তীকালে ছয়-দফা ফর্মুলা যে আকার নেয় তাতে সকল দফা তো ছিলই বরং তাতে নির্বাচিত প্রাদেশিক গভর্নরের জন্য আরেকটি বাড়তি দফাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
স্থির হয়েছিল যে, পাকিস্তানের প্রস্তাবিত ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোতে এই ফর্মুলা হবে কেন্দ্র- প্রদেশ সম্পর্কের আদর্শ ভিত্তি আর তাই এ ফর্মুলায় কোনো বিচ্ছিন্নতা বা স্বাধীনতার জন্য কোনো পরিকল্পিত প্রয়াস নেওয়া হয়নি। এমনকি, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আঞ্চলিক মিলিশিয়া বা সেনাবাহিনীর জন্য যে দফাটি ফর্মুলায় রয়েছে সেটি ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরই ছয়-দফাভুক্ত করা হয়। কেননা ‘৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানীরা নিজেদের একান্তই অসহায় ও প্রতিরক্ষাহীন বলে মনে করে ।
তাই যখন লাহোরে বিরোধীদলীয় কনভেনশন ডাকা হয় তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্পাদক শেখ মুজিবের কাছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তার এক বৈপ্লবিক পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব ছিল । তিনি এ নিয়ে দলে তাঁর কয়েকজন সহযোগী এবং দলের বাইরে কয়েকজন বন্ধুর সাথে আলোচনাও করেছিলেন। তিনি এ ক্ষেত্রে তখনো দলের ওয়ার্কিং কমিটিকে আস্থায় নেননি। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠক নির্ধারিত ছিল। সম্পাদক চাইলে এ বৈঠক পূর্বেই হতে পারতো। তবে এর বদলে ঐ বৈঠক স্থগিত করা হয় লাহোর কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যোগদানের সুবিধার জন্য।
বিষয়টি সুনিশ্চিত আভাস দেয় যে, তাঁর ফর্মুলার ব্যাপারে বিরোধিতার কোনো ঝুঁকিই তিনি নিতে চাচ্ছিলেন না সেটি লাহোর কনভেনশনে উত্থাপনের আগে । কেননা, অন্যথায় ফর্মুলার প্রাকঅনুমোদনের জন্য দলের স্বাভাবিক কার্যকলাপের আওতায় একটি জরুরি বৈঠক ডাকা যেতো। ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্য তাঁর ফর্মুলার ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন সে বিষয়ে সম্ভবত তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যদিও তিনি জনগণের অনুকূল প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সুনিশ্চিতভাবেই আস্থাবান ছিলেন। আর তাই তিনি এমন কুশলী উপায় অবলম্বন করলেন যাতে করে ওয়ার্কিং কমিটির মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাব্য বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের পক্ষে ওটা ঠেকানোর কোনো পথ রইলো না ।৩৪ কৌশলটি ভালোই কাজে দিল।
কেননা গোড়ার দিকে অনেকে যাঁরা ফর্মুলার ব্যাপারে অনেকটাই শীতল মনোভাব দেখিয়েছিলেন তাঁরা আর এই পর্যায়ে তেমন বিরোধিতা করতে পারলেন না। এভাবে ওয়ার্কিং কমিটিকে পাশ কাটানোর কাজটি বস্তুত অগণতান্ত্রিক হলেও এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি, কেননা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পারস্পরিক সমঝোতা ও সমন্বয়ক্রমে। আর এটির একটি “প্রয়োজনীয় কৌশলগত তাৎপর্যও” ছিল ।
এভাবে লাহোর কনভেনশনে ছয়-দফা প্রস্তাব উত্থাপনের কর্মপদ্ধতিগুলি থেকে আভাস পাওয়া যায়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট নয় বরং দলের সম্পাদকই কার্যপরিচালনাগত দিক থেকে দলের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন।
আবার কনভেনশনে যখন নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানের সভাপতিত্বে তাসখন্দ চুক্তিবিরোধী প্রস্তাব গৃহীত হয় সেই অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এ কথাই নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে যে, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নিতান্তই সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানী চরিত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হওয়ার দাবিটি অতিকথা, যদিও নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে কনভেনশনে যোগ দিয়ে একে সাফল্যমণ্ডিত করার আবেদন জানিয়েছিলেন ।
বাস্তবিকই, শেখ মুজিব ও যাঁরা তাঁর আস্থাভাজন ছিলেন তাঁরা এ ধরনের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে, বিশেষ করে, তাঁদের নিজেদের পায়ের তলার মাটি যথেষ্ট শক্ত কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে অনানুষ্ঠানিক ও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারেন। না । শেখ মুজিব সম্পর্কে বলা যায়, ফর্মুলার যৌক্তিকতা কিংবা প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিঃসংশয় ছিলেন। ছয়-দফা ফর্মুলার বিবর্তনশীল উন্মেষের গোড়ার দিনগুলি থেকেই তিনি পাকিস্তানী রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
১৯৫৬ সালে আবুল মনসুর আহমদ যখন গণপরিষদে ভাষণ দেন তখন তিনিও গণপরিষদের একজন সদস্য ছিলেন। তিনিও তখন মাঝেমাঝেই পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে কিছু তিক্ত সত্য মন্তব্যও করেন। সাদেক ও অন্যান্য ব্যক্তির পূর্বে উল্লিখিত পটভূমির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তার সুষ্ঠু নির্ভুলতা ও প্রামাণিকতা সম্পর্কেও তিনি ভালোভাবে অবহিত ছিলেন ।
তিনি বলেন, সামরিক আইন যদিও দেশে সূচিত প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত ফলকে নস্যাৎ করে দিয়েছে তবু সামরিক আইন, মূল বিষয়গুলির আরো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, প্রাঞ্জলিকরণ ও পরিশীলন এবং প্রস্তাবিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলিকে কেন্দ্র করে ধ্যানধারণার বুনট আরো জোরদার হওয়াকে ঠেকাতে পারবে না। বরং সামরিক আইনের শাসনামলেই আতাউর রহমান ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রকাশ্যে। ‘সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘দ্বিঅর্থনীতি’ ব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন।
দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ কর্মী ফজলুল হক মণি, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খানের মতো ছাত্রলীগ নেতাদের সাথে শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তো ছিলই, তিনি । পূর্ব পাকিস্তানী জনসমাজের ঐ স্তরের নাড়িও বুঝতেন যে স্তরটি একাধারে শহরের বুদ্ধিজীব ও রাজনীতি সচেতন গ্রামবাংলার মানুষেরও প্রতিনিধিত্বশীল। বস্তুত লাহোরে ছয়-দফা উপস্থাপনের ঠিক আগে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তার এক বর্ধিত সভায় একই ধরনের দাবিদাওয়া সংবলিত এক প্রস্তাব পাস করে।
বিষয়টি দাবিদার, কেননা ঐ সভায় “পাকিস্তানের আঞ্চলিক বৈষম্য” শীর্ষক একটি নিবন্ধ পাঠ হয় ও ঐ নিবন্ধের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সভার আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আঞ্চলিক বৈষম্যগুলি মৃদু দরকষাকষি দিয়ে দূর করা যাবে না, এ জন্য পূর্ব পাকিস্তানীদের দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ নিবন্ধটি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা দপ্তর থেকে বই আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । এই পুস্তকের মুখবন্ধটি লেখেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মাযহারুল হক বাকী ও আব্দুর রাজ্জাক। এই মুখবন্ধে বলা হয়, বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঔপনিবেশিক সম্পর্কের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গ্রহণযোগ্য নয় । সে জন্যই বলতে হয়, ছয়-দফা ফর্মুলা ৩৮ কতখানি ব্যাপ্তিতে আশু সমর্থন লাভ করবে শেখ মুজিব সে সম্পর্কে অবশ্যই অবহিত ছিলেন।
সর্বোপরি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনের একজন সক্রিয় মুসলিম লীগার হিসেবে দেখেছিলেন কীভাবে বাঙালি মুসলমানরা তাদের উন্নততর জীবনযাপনের জন্য নিজস্ব স্বদেশভূমি লাভের সুযোগ গ্রহণের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন— কেমন করে তা অর্জিত হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত চিন্তাভাবনা না করেই।
তাই তিনি জানতেন যে মঞ্চ এখন প্রস্তুত; পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগে সিদ্ধান্ত প্রণেতা সংস্থার অভ্যন্তরে যদি কিছু ভিন্নমতের লোক থেকেও থাকে তাহলে তাতে কিছু এসে যাবে না শুধু একবার এ ধারণাগুলি যদি শহর-নগরের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায় ও তাদের মাধ্যমে সে ধারণা গ্রামবাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফর্মুলার প্রতি জনসমর্থনের বিষয়টি সুনিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হয় । পরবর্তীকালের ঘটনাবলিতে—যা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন নামে পরিচিত—এর সত্যতা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করাটাই অভীষ্টমূলক হতে পারতো অর্থাৎ এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিকল্পিত পূর্ব পাকিস্তানের শোষণ হতে পারতো কিংবা এটি কেবল ভ্রান্তিপ্রসূত অভীষ্টের উপায়ও হতে পারতো অর্থাৎ কিনা বণ্টন সুবিচারের স্বার্থ বিকিয়ে দ্রুততর অর্থনৈতিক শিল্প ও শ্রীবৃদ্ধিকেই উন্নয়নের প্রধান বিষয় বলে গণ্য করা হয়ে থাকতে পারে । কিন্তু তার বাস্তবতা এই যে, ফলস্বরূপ পূর্ব পাকিস্তানকে জাতীয় সম্পদ ও সমৃদ্ধিতে তার ন্যায্য অংশ ও প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়।
এমনকি, পূর্ব পাকিস্তানের মৌলিক চাহিদাগুলিও পূরণ করা হয়নি। সন্তোষজনক জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অনুপস্থিত থাকায় তা পাকিস্তানী জাতিসত্তার সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের একাত্মতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ১৯৬৬ সাল নাগাদ এ ধরনের বিচ্ছিন্নতা বোধ এতই বিস্তৃতি লাভ করেছিল যে, মুজিব এ দাবি করতে সক্ষম হন: “এখন যেহেতু ছয়-দফা কর্মসূচি আওয়ামী লীগ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবেই গৃহীত হয়েছে সেহেতু তা জনগণের, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে।”
সত্যিকার অর্থেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছয়-দফা ফর্মুলাকে ও এ ছয়-দফা দলীয় কর্মসূচি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক গৃহীত হওয়াকে স্বাগত জানায় । পূর্ব পাকিস্তানী নেতাদের একাংশ ও পশ্চিম পাকিস্তানী আওয়ামী লীগাররা অবশ্য এ কর্মসূচি সম্পর্কে তাঁদের নানা সংশয় ব্যক্ত করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে পরবর্তীকালের পটপরিবর্তন থেকে এই প্রবণতাটি পরিষ্কার বোঝা যায়। ছয়-দফা ফর্মুলাকে শেখ মুজিবের “জাতীয় দাবি” বলে উল্লেখকে কার্যত বৈধ বলা যেতে পারে। কেননা পাকিস্তানী জনসমষ্টির ৫৬ শতাংশের তথা সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করে পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু লাহোরে বিরোধীদলীয় মহাসম্মেলনের পক্ষ থেকে এই ফর্মুলা প্রত্যাখান পশ্চিম পাকিস্তানের সাড়ার বিপরীতে ভাবী ইঙ্গিতবহ ছিল ।
ফর্মুলাটি ঘোষণার পরপরই সমালোচনার ঢেউ বয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম এই ছয়-দফায় পাকিস্তান ভাঙার পরিকল্পনা দেখতে পান। ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক এমএইচ উসমানীর মতে, “ছয়-দফা নিশ্চিতভাবেই দেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করবে।” আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির অন্যতম সদস্য আরশাদ চৌধুরী একে “দেশ ও দল ভাঙার এক অশুভ কর্মসূচি” বলে অভিহিত করেন।
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা যারা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের শ্লোগান তুলছে তাঁদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা সম্পর্কে জাতিকে হুঁশিয়ার করে দেন। পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লুন্দখোর বলেন, তিনি ফেডারেশনের ইউনিটগুলিকে অধিকতর ক্ষমতা দেওয়ার বিরোধী, কেননা সেটি করা হলে কেন্দ্রীয় সরকার পররাষ্ট্রনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে। তাঁর বিবেচনায় পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেশনে পরিণত করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তাতে জাতীয় সংহতি ক্ষুণ্ণ হবে।
তিনি দাবি করেন যে, পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মালিক সরফরাজ ও বেগম আহমদের অভিমতও তাঁর অনুরূপ ছিল। তিনি অবশ্য পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার আয়োজন-সংক্রান্ত দাবি সমর্থন করেন ।
১৯৬৬ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তাঁর পক্ষকালের সফর শেষে মন্তব্য করেন যে, পূর্ব পাকিস্তান ‘খুব চমৎকার অবস্থায় রয়েছে’। সবুর খানের মতো সরকারি মুখপাত্র এ রকম ধারণা দেওয়ার প্রয়াস পান যে, ছয়-দফা ফর্মুলা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মাথাব্যথা নেই। এ সব তাঁরা বলেন ঠিকই কিন্তু এরই মাঝে তাঁদের উদ্বেগও স্পষ্ট ধরা পড়ে। যেহেতু ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর মুখপাত্ররা ভালো করেই জানতেন যে, পূর্ব পাকিস্তানী জনসাধারণের মাঝে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে নেই বললেই চলে সেহেতু তাঁরা কায়েদ-ই-আযম, সোহরাওয়ার্দী, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদির ভাবমূর্তির নামাবলি গায়ে চড়ান।
পূর্ব পাকিস্তানীদের কাছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বিশ্বাসযোগ্যতা কার্যত উবে যায় যখন তৎকালীন পাকিস্তানী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো মুখরক্ষার চেষ্টা করেন এই বলে যে, সেপ্টেম্বরের যুদ্ধ থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে •কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার আওতায় নিরাপদ রাখা হয়েছে। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বলেন:
এ সব বিবৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সব বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে পূর্ব পাকিস্তানকে দেশরক্ষার দিক থেকে অসহায় করে রাখা হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে… বস্তুনিষ্ঠভাবে বলতে হয়, আগ্রাসনের শিকার হওয়ার চেয়ে বরং বিচ্ছিন্ন বা আলাদা থাকাই ভালো… পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে আমি কোনো গোপন কিছু ফাঁস করবো না। আমি এখন যা বলবো, তা কোনো গোপনীয় তথ্য উন্মোচন নয় । বৃহৎ শক্তিবর্গ জানে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন জানে, সম্ভবত সোভিয়েত ইউনিয়নও জানে, কেন সংঘাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।… ভারত কেন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর হামলা চালায়নি, সেটি নিজেদেরকেই জিজ্ঞাসা করে দেখুন। কী সেই কারণ? এগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ যা বিবেচনার দাবিদার। দেশের ভবিষ্যতের জন্যও এ সব বিচার-বিবেচনার প্রাথমিক গুরুত্ব রয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে চীন গণপ্রজাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের ওয়ারশতে আলোচনা ও বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় । এ নিয়ে বিচার-বিবেচনাও চলে। ঐ সময়ে পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই প্রস্তাব নিয়ে আসেন যে, পূর্ব পাকিস্তানকে যুদ্ধের আওতামুক্ত রাখতে হবে। কেন?… আমার এখতিয়ারে সকল দায়িত্বসহকারেই আমি বলতে চাই যে, ভারত তখন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর তর্জনী তুলতেও সাহস করেনি….।
তবে একদিন গোটা দেশ, জাতি, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ জানবে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়েও পূর্ব পাকিস্তানের কথাই বেশি ভেবেছে। এমনি করে পাকিস্তান সরকারের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানীদের কাছে এই তথ্য প্রকাশ করেন যে, পাকিস্তানের শাসকচক্র পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার ভার অধিকতর উত্তম বিদেশীদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে; কাজেই তাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।
আবেগ-উত্তেজনা যখন তুঙ্গে তখন এহেন বক্তব্য বরং ছয়-দফা ফর্মুলাকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার পথকেই প্রশস্ত করে এবং এমনকি যেসব সমালোচক একাধিক কারণে এই ফর্মুলার নিন্দামুখর ছিলেন তাঁরা এর যে নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরেন তা-ও উপেক্ষিত হয়। ‘আমাদের বাঁচার অধিকার’ শীর্ষক লেখার উপসংহার অংশে শেখ মুজিব বলেন:
আমি যখন বলি, পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়ে সেখানেই পুঞ্জীভূত হচ্ছে, আমি তখন আঞ্চলিক কেন্দ্রায়নের কথাই শুধু বলি। আমি তাতে এ কথা বোঝাই না যে, ঐ সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে গণমানুষের হাতে পৌঁছেছে।.
আমি এও জানি যে, দেশের মোট সম্পদ গুটিকয়েক পরিবারের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। আমাদের সমাজের পুঁজিবাদী ধাঁচ না বদলানো পর্যন্ত এই ধারা চলতেই থাকবে। কিন্তু সমাজ বদলানোর আগে এই আঞ্চলিক শোষণ অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। আমি অবশ্য আঞ্চলিক শোষণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানীদের দোষ দিই না। বরং আমার কথা হলো ভৌগোলিক অবস্থা ও বর্তমানে অনুসৃত অস্বাভাবিক ব্যবস্থাই এই অবিচারের জন্য দায়ী।
ছয়-দফা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল প্রাগুক্ত সমস্যা দূর করার শর্ত হিসেবে শেষোক্ত সমস্যার নিরসন। পাকিস্তানে উল্লিখিত পুঁজিবাদী ধাঁচের সমাজ পুনর্নির্মাণের লক্ষ্য স্পষ্টতই এই ছয়-দফা কর্মসূচির ছিল না। বরং এর লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রসত্তার শাসনতান্ত্রিক পুনর্নির্মাণ। তাই স্বাভাবিক কারণেই পাকিস্তানের বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের প্রবক্তাদের তা মনঃপূত হয়নি। তবু এতে অস্তিত্বশীল পুঁজিবাদী ধারার অভিশাপ ও মন্দ দিকের উল্লেখ ও নতুন সমাজ ব্যবস্থাকে এর স্থলবর্তী করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আভাস, ইঙ্গিত, বিশেষ করে, কিছু পশ্চিম পাকিস্তানীর তরফ থেকে এই কর্মসূচির প্রতি অনুকূল সাড়ার কারণে—সে সাড়া যতই সীমিত হোক না কেন—সেখানকারই কিছু রক্ষণশীল নেতা আঁতকে ওঠেন।
পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের করাচি শাখা তার ১৯৬৬ সালের ১৫ই মার্চের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ছয়-দফা ফর্মুলার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে। বৈঠকে বলা হয়, বিষয়টি নতুন কিছুই নয়। করাচি আওয়ামী লীগের সভাপতি মঞ্জুরুল হক ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, গোড়ার দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ছয়-দফা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হলেও, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুদ্দিন বিষয়টি ব্যাখ্যা করার পর ছয়-দফাকে এখন এখানে তার যথার্থ পারম্পর্যেই দেখা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানীরা অপেক্ষাকৃত কম রাজনীতি সচেতন হলেও, গণতন্ত্রের ডাক ঠিকই তাদের কাছে পৌঁছেছে। কাজেই ‘আমি আমার পূর্ব পাকিস্তানী ভাইদের এই আশ্বাস দিতে পারি যে, ছয়-দফা আদায়ের জন্য একবার পূর্ণাঙ্গ আন্দোলন শুরু হলে আপনারা দেখবেন, পশ্চিম পাকিস্তানীরা আপনাদের পাশে রয়েছেন।
করাচি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিরমিযী একই মনোভাব ব্যক্ত করে এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেন: পাকিস্তানের দুইটি অংশে কি সোনার দর ভিন্ন নয়? সেটি কি দুই আলাদা অর্থনীতির অস্তিত্বের কথা বলে না? আরেক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিরমিযী বলেন, পূর্ব পাকিস্তানী নেতারা গোটা দেশের আর্থ-রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও প্রতিরক্ষা চাহিদা বিবেচনায় রেখে ছয়-দফা প্রস্তাব রচনা করেছেন। আশা করা যায়, অচিরেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা এই ফর্মুলার কার্যকারিতা উপলব্ধি করবেন এবং ছয়-দফার প্রতি তাঁদের পরিপূর্ণ সমর্থন জানাবেন । তিনি এও মন্তব্য করেন যে, ছয়-দফা যেহেতু অসংখ্য নিপীড়িত মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যাভিসারী সেহেতু এক শ্রেণীর কায়েমি স্বার্থবাদী, বিশেষ করে, কোনো কোনো পুঁজিপতি এর বিরোধিতায় নেমেছেন ।
ওরা চিরকালই জনগণের যে কোনো কল্যাণ প্রয়াসকে সর্বদাই ‘চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছে, তাই ছয়-দফার বেলায় তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।’ সুনিশ্চিত বোঝা যায় যে, অন্তত কোনো কোনো পশ্চিম পাকিস্তানী বুঝতে ছয়-দফা বহুল প্রত্যাশিত সমাজ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। অবশ্য এই ছয়-দফায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এ ধরনের পরিবর্তন আনার কর্মপন্থা কী হবে • নির্দেশ ছিল না।
শেখ মুজিব কেবল বলেছিলেন, শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের জন্য দেশে অসাধারণ ব্যাপ্তির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃবৃন্দের প্রয়োজন রয়েছে। এ থেকে পেরেছিলেনবাস্তবিকপক্ষে পাকিস্তানের একেবারে গোড়া থেকেই প্রয়োজন থাকলেও এই ‘অসাধারণ ব্যাপ্তির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন’ নেতৃত্ব দেশটির ছিল না।
কেননা, পাকিস্তানে রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের জটিল কাজটি পাকিস্তান আন্দোলনের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য, পাকিস্তানের ভূগোল, ভৌগোলিকভাবে বিরাট ব্যবধানে অবস্থিত দেশের দুই ইউনিটের স্ব স্ব জনসমষ্টির রাজনৈতিক চেতনাস্তরের পার্থক্য এবং পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনচক্রের পটভূমি ও গঠনবিন্যাস ইত্যাদির কারণে জটিলতর হয়ে ওঠে। পাকিস্তানে জাতি গঠনে সমস্যাবহুলতার কারণে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী নেতৃত্বের উচিত ছিল দেশের কল্যাণে নতুন করে সব কিছু চিন্তাভাবনা করে দেখার এবং অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়ার ।
কিন্তু সেটি না করে তাঁরা এমন পথ বেছে নেন যা সীমিত মেয়াদে তাদের ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করে মাত্র। তাঁরা অন্যান্য বহু নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের মতো বাহ্যত এমন এক উন্নয়নের মডেল বেছে নেন যার পূর্বশর্ত ছিল রাজনৈতিক গণতন্ত্র ও জনগণ অবধি অংশীদারির সম্প্রসারণের আগেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। তাঁরা বাহ্যিক টেকসই অবস্থার প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত হিসেবে স্থিতিশীলতাকেই অগ্রাধিকার দেন। সংক্ষেপে এর অর্থ ছিল জাতি গঠনকে পিছে রেখে আগে রাষ্ট্র গঠন।
আর এই ব্যবস্থা বা পদ্ধতির সাথে ছিল বৈদেশিক সাহায্য, ঋণ সহায়তা গ্রহণ ও তাদের সাথে আঁতাত তত্ত্ব। বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যগ্রহীতা দেশগুলির সাহায্যদাতা দেশগুলির ওপর বড় রকমের নির্ভরশীলতার সম্পর্কের নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে চলতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার কাঠামোটিকেও বহাল রাখা ও সংহত করার প্রয়োজন হয়। তাই এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের নিরীক্ষা আর সেই অবকাশে কোনো নতুন ও অজ্ঞাত পরিচয় উপাদানের উল্লিখিত ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার আশঙ্কাকে সুনজরে দেখা হয়নি। আর এই প্রক্রিয়ায় তাই পদ্ধতির সামরিকীকরণই প্রায় স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে|
‘৬০ দশকের পাকিস্তানে ঐ দেশের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক অভিজাতকুল গঠিত ছিল আমলা- সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে। তারা তাদের ক্ষমতা কায়েমি রাখতে অন্য যে কোনো ক্ষমতাসীনচক্রের মতোই কাজ করে।
এটি করা হয় স্থিতিশীলতা রক্ষা, ভারতের হাত থেকে রক্ষা ও দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অজুহাতে। পাকিস্তানের বিভিন্ন মিত্রদেশ বিভিন্ন কারণে পাকিস্তানের এই কৌশলের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানায় আর এ প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানী পরিস্থিতির একান্ত স্বকীয়ত্ব সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়। আত্তীকৃত জাতীয় সংহতির নিশ্চয়তা বিধানের পদ্ধতির অপ্রযোজ্যতা উপেক্ষা করা হয়। এর ফলে ১৯৬৮-৬৯ সালে দেশের উভয় অংশেই বিশৃঙ্খল অবস্থা চরম শিখরে পৌঁছে।

এই ব্যবস্থার সম্ভবত অন্যতম শিকার পূর্বাঞ্চলে এ সবের প্রতিক্রিয়া বরাবরই খুবই লক্ষণীয় ।। তবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তার ছয়-দফা ফর্মুলার সুবাদে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবিকে একটা সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রবিরোধী ভূমিকায় রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়। এর ফলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রাও যুক্ত হয়। এ পর্যায়ে কোনো এক ধরনের প্রত্যক্ষ আন্দোলন পদ্ধতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর তারই প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় ছাত্রলীগের পূর্বোক্ত প্রকাশনায় ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বিদ্রোহাত্মক এই মনোভাব লক্ষ্য করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সূচনা করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দল ও মুখপাত্র হিসেবে নিজ অবস্থান মজবুত করতে সক্ষম হয়।
