আজকের আলোচনার বিযয় স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, ১৯৬৭ সালের ১৯ ও ২০ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী- লীগ ওয়ার্কিং- কমিটির বৈঠকে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা পিডিএম-এর দলীয় উপকমিটির পক্ষ থেকে আবদুস সালাম খানের পেশ করা একটি রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁরা পিডিএম-এর তিন-দফা কার্যক্রমের বদলে ছয়-দফা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন।
অবশ্য এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী- লীগ কাউন্সিলকে ছেড়ে দেওয়া হয়, ইত্যবসরে ওয়ার্কিং- কমিটি ছয়-দফার কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পিডিএম-এর সাথে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয় ।
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 2 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ02.jpeg.webp)
স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২
এই সঙ্কট সন্ধিক্ষণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যখন একদিকে সরকার ও দলের ভেতরে ছয়-দফা ফর্মুলা ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে মধ্যপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়ছে তখন ছাত্ররা, বিশেষ করে, ছাত্রলীগ কর্মীরাই বহুলাংশে আন্দোলনের প্রাণপ্রবাহ সঞ্জীবিত রাখে।
এর পরে যা ঘটে তাকে নিছক উপদলীয় কোন্দলই বলা যায়। দলের ওয়ার্কিং- কমিটির ১৩ জন পিডিএমপন্থী সদস্য পিডিএম-এর জন্য প্রতিনিধি মনোনয়নের উদ্দেশ্যে ওয়ার্কিং -কমিটির এক রিকুইজিশন সভা ডাকেন।
এটি করা হয় এ বিষয়ে আগের আলোচনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। কেননা, কথা ছিল প্রয়োজনে বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে উত্থাপন করা হবে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁরা তা করলেন না। কাউন্সিলকে মোকাবেলায় তাঁদের এই অনীহায় বরং দলের বৃহত্তর সংস্থায় তাঁদের নিজ দুর্বলতাই উন্মোচিত হলো; ছয়- দফাপন্থীদের অধিকতর গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বনে, ওয়ার্কিং -কমিটিতে পিডিএমপন্থীদের সংখ্যালঘিষ্ঠ অবস্থানটি ধরা পড়লো।
১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট দলের কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয় । এই সভায় দলের মোট ৯৫০ জন কাউন্সিলরের মধ্যে ৮৮৬ জন যোগ দেন। তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে এই মর্মে প্রস্তাব পাস করেন যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পিডিএম-এ যোগ দেবে না। এতে দলের পিডিএমপন্থী গোষ্ঠীর দুর্বলতা আরো প্রকট হয়ে ওঠে। তবে এ সভায় অধিকতর বিতর্কিত ইস্যুটি ছিল রিকুইজিশনপন্থীদের দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি।
সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিলরগণ তাঁদের অনতিবিলম্বে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান এবং “বিশ্বাসঘাতকদের বহিষ্কার করো” “নওয়াবজাদা বাংলা ছাড়ো”— ইত্যাকার শ্লোগান দেন। পরিশেষে বর্ণিত ব্যক্তিদের প্রতি কারণ দর্শাও নোটিশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । এঁরা হলেন: আবদুস সালাম খান, জহিরুদ্দিন, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, মুজিবুর রহমান (রাজশাহী), আবদুর রহমান খান, এমএ রশিদ, রওশন আলী, মমিনউদ্দিন আহমদ, লিয়াকত উল্লাহ, সা’দ আহমদ, রহিমুদ্দিন আহমদ ও জালালুদ্দিন খান।
এই কাউন্সিল সভায় করাচি আওয়ামী লীগের একাধিক প্রতিনিধি ভাষণ দেন। তাঁরা ছয়-দফা সমর্থন করেন এবং পিডিএম-এ যোগদানের বিরোধিতা করেন। এক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, করাচি আওয়ামী লীগ ছয়-দফা ফর্মুলা সমর্থন করে । তাঁরা এর প্রতি বৃহত্তর জনসমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
কাউন্সিল সভার উদ্বোধনী ভাষণে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্তর্দলীয় সংঘাতের পরিস্থিতি ও পটভূমি বর্ণনা প্রসঙ্গে এক তাৎপর্যময় বাস্তব সত্য প্রকাশ করে বলেন যে, নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অদ্যাবধি কোনো গঠনতন্ত্র নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমেনা বেগম এ মত পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নীতি অত্যন্ত নিখুঁত ও ত্রুটিহীন। অতি সাম্প্রতিককালের তিক্ত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, এ ধরনের ফ্রন্ট খুব বেশি দিন টেকে না।
আর কোনো উদ্দেশ্যও হাসিল করতে পারে না । সে কারণে, “আমরা ছয়-দফা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ভিত্তিতে কোনো আন্দোলনে যেতে তৈরি নই ।” সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আমেনা বেগম উভয়েই দলের ভেতরে বিভেদের জন্য কতিপয় পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগারকে দোষারোপ করেন।
ছয়-দফার সমালোচনা করে পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগ নেতা লুন্দখোর দাবি করেন যে, আমেনা বেগম দলের মুখপাত্র নন; তাঁর গ্রুপটি “নীরব গ্রুপ”। আর পূর্ব পাকিস্তানে ১৭ দিন থাকার পর নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান সাংবাদিকদের বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে পিডিএম-এর কার্যকলাপ প্রভাবিত হবে না। ১৯৬৭ সালের ১৯ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভা ছিল অবৈধ আর এ সভায় যাঁরা অংশগ্রহণ করে তারা সত্যিকারের আওয়ামী লীগ কর্মী নয় ।
আর তাঁর মতে, এ সব লোক বরং সরকারকেই মদদ যোগাচ্ছে। এ ছাড়াও, ১৯৬৭ সালের ২৩ আগস্ট ঢাকায় নসরুল্লাহর সভাপতিত্বে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং -কমিটির এক সভা ঐ দিন থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং- কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। এর পরিবর্তে ২৪ সদস্যের এক অ্যাড-হক কমিটি গঠন করা হয়। যার বৈধতার মেয়াদ সীমিত থাকবে ১৯৬৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এ ছাড়াও এ সভা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে কেন তাঁদের দলের প্রাদেশিক সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হবে না—এই মর্মে শোকজ নোটিশ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ঐ সময় নাগাদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (ছয়-দফাপন্থী) কাউন্সিল সভার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়ে যায় ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ১৩ জন সদস্যের প্রত্যেকের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে কারণ দর্শাও নোটিশ জারি সম্পন্ন হয়।
দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এক যৌথ বিবৃতিতে পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ২নং অনুচ্ছেদে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়টি পরিষ্কার নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে ও ঐ অনুচ্ছেদ অনুসারে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং- কমিটি বিলুপ্ত করার কোনো অধিকার কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেই।” এর পর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য ৪৮ সদস্যের (উভয় অঞ্চল থেকে ২৪ জন করে সদস্য নিয়ে) এক সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই কমিটিকে ছয়-দফা ফর্মুলা সন্নিবেশিত করে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য একটি গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো প্রণয়নের দায়িত্ব এবং একই সঙ্গে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা আহ্বানের ক্ষমতাও দেওয়া হয়।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সকল ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং উক্ত সাংগঠনিক কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠানের পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয় জাতীয় পরিষদ সদস্য ও পদাধিকারবলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং- কমিটির অন্যতম সদস্য এএইচএম কামারুজ্জামানকে । সভায় তথ্য প্রকাশ করে জানানো হয় যে, ১৯৬৪ তে নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানের সভাপতিত্বে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের একটি অ্যাড-হক কমিটি গঠিত হয়।
কিন্তু সেই কমিটি সাংগঠনিক নির্বাচনগুলির আয়োজন অনুষ্ঠান এবং দলের গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো রচনায় ব্যর্থ হয় । এক প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং-কমিটি বিলোপ করার কোনো ক্ষমতা নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেই। আর এই যে সিদ্ধান্ত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিয়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবৈধ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং- কমিটির এই সিদ্ধান্তের পর কামারুজ্জামান পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেন। করাচিতে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, করাচি ও সিন্ধু আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে তাঁর কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অত্যন্ত ফলদায়ক আলোচনা হয়েছে।
অচিরেই নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে ছয়-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করা হবে। এর পর দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। হায়দরাবাদ, করাচি ইত্যাদি স্থানে কামারুজ্জামান আরো এ কথা বলেন বলে জানা যায় যে, পিডিএম-এর প্রতি জনসাধারণের কোনো আস্থা নেই, তবে ছয়-দফা কর্মসূচিতে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে এ কারণে যে, তাদের বিশ্বাস, সত্যিকারের গণতন্ত্র কেবল এর মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে।
নসরুল্লাহ খান দলীয় নির্বাচন না করে দলের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করায় তিনি তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। পরে কামারুজ্জামান ঘোষণা করেন যে, নসরুল্লাহ আর নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নন।
নসরুল্লাহ খান তাঁর কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছেন— এ কথা বারংবার সবিশেষ জোর দিয়ে উল্লেখ করার তাৎপর্য স্পষ্টতই এ যুক্তি দিতে চাওয়া যে, ছয়-দফা নিয়ে নানা রকম মতভেদজনিত বিভেদের কারণে নয় বরং দলের ভাঙনটি ঘটেছে প্রধানত টেকনিক্যাল কারণে। কারণ, হাজার হলেও ছয়-দফার গ্রহণযোগ্যতা গোটা পাকিস্তানে সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছায়নি—এ নিরেট বাস্তবতার প্রচার থেকে ছয়-দফাপন্থীদের কোনো লাভই হতো না। এই আলোকেই কামারুজ্জামান তাঁর এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আমাদের নেতার অতীত ভুল শোধরাতে সংকল্পবদ্ধ। তিনি দলের কার্যাবলি যথাযথভাবে না করলেও আমরা তা করতে চাই।”
১৯৬৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ৪৮ সদস্যের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, করাচি, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান আওয়ামী লীগ এই নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠনকে সমর্থন জানিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে তারাও নসরুল্লাহ খানের নেতৃত্বে কোনো নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। পাঞ্জাবে নতুন সাংগঠনিক কমিটির পক্ষে বেশ ব্যাপক সমর্থন রয়েছে ।
তবে পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ অদ্যাবধি তার কোনো আনুষ্ঠানিক অভিমতের কথা জানায়নি। তিনি জানান যে, পশ্চিম পাকিস্তানে, বিশেষ করে, পাঞ্জাবে নসরুল্লাহ খান ও গোলাম জিলানী ছয়-দফাবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাংগঠনিক কমিটির ২৪ জন পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন: মালিক হামিদ সরফরাজ, চৌধুরী নাজিরুদ্দিন, সৈয়দ আবু আছিম, সৈয়দ খালিদ আহমদ তিরমিযী, সৈয়দ শাহ বোখারি ও মোহাম্মদ মুরতাজা প্রমুখ।
পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কোনো এলাকায় মানুষের অনুভূতি সম্পর্কে কামারুজ্জামানের মূল্যায়ন ছিল বাস্তবতাভিত্তিক। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, ১৯৬৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জ্যাকোবাবাদে অনুষ্ঠিত সিন্ধু আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং- কমিটির সভা সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে যে, তখনকার নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আস্থা হারানোর পর আর বৈধ থাকতে পারে না। সভা ছয়-দফার ভিত্তিতে অনতিবিলম্বে দলীয় পুনর্গঠনের দাবি জানায় এবং মতপ্রকাশ করে যে, পিডিএম-এ যোগ দিয়ে তখনকার নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সিন্ধু আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টো অগ্রাহ্য করেছে ।
নবগঠিত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং -কমিটির প্রথম সভা ১৯৬৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। সভা ওয়ার্কিং -কমিটির বর্তমান কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কামারুজ্জামান এই কমিটির স্থায়ী আহ্বায়ক নির্বাচিত হন ।
পুনর্গঠিত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো প্রণয়নের জন্য এক ১০ সদস্যের উপকমিটি গঠিত হয় । উপকমিটিকে ছয়-দফা, পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট বিলোপ ও সমাজবাদী অর্থনীতির ভিত্তিতে গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর পূর্বে এক ইউনিট বলবৎ হওয়ার আগে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলি যে স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদার অধিকারী ছিল প্রদেশগুলিকে সে মর্যাদায় পুনর্বহাল করার পক্ষে এক সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়।
একই দিনে পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগের অ্যাড-হক কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান দলের নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠনের সমালোচনা করেন। তবে ১৯৬৭ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই দলের কাউন্সিল সভায় পূর্ব পাকিস্তানে পিডিএম-এর মূল দুর্বলতা আর গোপন থাকেনি। পিডিএম-এর পূর্ব পাকিস্তানী সহযোগীদের গলায় অনেকটা আত্মরক্ষামূলক (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মোকাবেলায়) কৈফিয়তের সুর ধ্বনিত হয়।
তাঁদের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা আসে এই বলে যে, পিডিএম-এর ধারণাটি তোলা হয়েছে দেশব্যাপী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অসামর্থ্য। স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর ৷ তাছাড়া, পিডিএম গঠনের উদ্দেশ্যটি আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় কেবল পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা ছয়-দফার মৌল বিষয়বস্তুগুলি স্বীকার করে নেওয়ার পরেই। এ ছাড়াও যদিও এ দাবি করা হয় যে, পিডিএম-এর আট-দফা কর্মসূচির যথা -বাস্তবায়ন হলে তাতে পূর্ব পাকিস্তানের দাবিদাওয়াগুলি রক্ষিত হবে,
তবু এ কথাও জানিয়ে দেওয়া হয় যে, অদূর ভবিষ্যতে পিডিএম কোনো বাস্তবধর্মী কর্মসূচি শুরু করতে ব্যর্থ হলে তাঁরা তাঁদের নিজ কর্মসূচি নির্ধারণ করতে বাধ্য হবেন কারণ পিডিএম-এর কোনো অঙ্গসংগঠন পিডিএম-এ যোগ দিয়ে তাদের নিজ নিজ দলীয় কর্মসূচি চিরকালের জন্য বিসর্জন দেয়নি। অতএব, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে তারা বিকিয়ে দেয়নি। স্পষ্টতই লক্ষণীয় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সপক্ষত্যাগীদের ছয়-দফা সম্পূর্ণত বিসর্জন দেওয়ার সাধ্য ছিল না । আর সে জন্য তারা দাবি করেন যে, আট-দফা ফলত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নৈতিক বিজয়কেই সূচিত করে।
পাকিস্তানী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতায় পিডিএম-এর অভ্যুদয় অপ্রত্যাশিত ছিল না, বিশেষ করে এই কারণে যে, ছয়-দফার সূচনায় এর কার্যকারিতা নিয়ে আবদুস সালাম খান ও মওলানা তর্কবাগীশের মতো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারাও সন্দিহান ছিলেন। বস্তুত আবদুস সালাম খান ১৯৬৬ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, “(জাতীয়) রাজনীতিতে ছয়-দফাই শেষ কথা নয়”—আর “কোনো মহল বা গোষ্ঠী যদি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্যের হিমালয় অপসারণে এগিয়ে আসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তাকে স্বাগত জানাবে।’ ”
পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সাথে তাঁর দরকষাকষির আলোচনায় হয়তোবা তাঁর এ রকম উপলব্ধি ও আস্থা জন্মাতে পারে যে, আট-দফা ছয়-দফার একটা সক্ষম বিকল্প হতেও পারে। আর বাস্তবিকপক্ষেও আট-দফা নিশ্চিতভাবেই ৫৬ সালের শাসনতন্ত্র থেকে উন্নততর ব্যবস্থা ছিল।
এতে এমন সব দাবির বিষয় সন্নিবেশিত ছিল যেগুলি পূরণ হলে খুব জরুরি চাহিদাগুলি পূরণ হতে পারতো। কিন্তু নিজ অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় পূর্ব পাকিস্তানের নিজ অধিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পূর্ব নির্ধারিত শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়াই যে দাবিগুলি পূরণ হবে তার গ্যারান্টি কি? পিডিএমপন্থী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা সম্ভবত সোহরাওয়ার্দীর একদাকৃত ভুলের পুনরাবৃত্তিই করতে যাচ্ছিলেন । সোহরাওয়ার্দী, বলাবাহুল্য, কোনো কোনো মৌলিক বিষয়ে রফা করে ভুল করেছিলেন। আর ছয়-দফা ছিল কোনো এক বিশেষ কৌশলের প্রমাণিত ব্যর্থতাপ্রসূত পরিণামের ফল।
এখন এ সব রাজনীতিক সেই একই জিনিসের ওকালতি করছিলেন। আট-দফা যা-ই ছিল পাকিস্তানে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ভালো করে শেকড় গেড়ে থাকলে সেগুলিই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পর্যাপ্ত হতে পারতো। দেশ গঠনের বছরগুলিতে পাকিস্তান দেশে গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রীতি গড়ে তুলতে পারেনি।
মধ্যবর্তী বছরগুলিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনায় বিরোধী প্রেসার গ্রুপগুলির প্রভাব- প্রতিপত্তি মোটেও কমেনি বরং পাকিস্তানী সমাজে আরো মজবুত করে তাদের শেকড় গেড়ে বসার অনুকূলে আরো নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। আর তাই গোড়ার দিকে যে সব প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ব্যাধির নিরাময় করতে পারেনি এ সব উপসর্গ আরো ঘোরতর হওয়ায় এ সব চিকিৎসায় স্বাভাবিক কারণেই কোনো ফলোদয় হয়নি। এ জন্য ছয়-দফাপন্থী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পিডিএম-এর কর্ম ও নীতিকৌশল প্রত্যাখ্যান করে।
পূর্ব পাকিস্তানে ছয়-দফার জনপ্রিয়তা ও আট-দফার প্রতি ঔদাসীন্য পিডিএম-এর কর্মসূচি গ্রহণে যে সব ঝুঁকি নিহিত সেগুলির কোনো উপলব্ধির কারণেই ঘটে— এমনটি নাও হয়ে থাকতে পারে। তবে পিডিএমবিরোধী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা নিশ্চয়ই বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন ও পূর্ব পাকিস্তানের জনসমষ্টির এক বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ছয়-দফার প্রশ্নে স্পষ্ট অগ্রাধিকারের আদি ও প্রাথমিক (primordial) ভাবাবেগের আবেদন সৃষ্টি করে পিডিএম-এর আট-দফা যাতে প্রাধান্য না পায় তার নিবারণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন ।
পিডিএম যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি-সচেতন জনসমষ্টির কোনো একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের জনমত তাদের অনুকূলে সংগঠিত করতে পারতো তাহলে সফল হলেও হতে পারতো । কেননা, হাজার হলেও এক শ্রেণীর পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকের তরফ থেকে পিডিএম-এর প্রতি যথেষ্ট সমর্থন ছিল । কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে পিডিএম-এর জনসমর্থনের বুনিয়াদ প্রধানত এবডোমুক্ত রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত অনুসারীদের মধ্যে নিহিত থাকায় পিডিএম-এর কর্মসূচি ছয়-দফা থেকে জনগণের মনোযোগ সরিয়ে সপক্ষে, আট-দফা কর্মসূচিতে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানেও পিডিএম-এর একটা পাল্টা শক্তি গড়ে উঠছিল । যখন আদি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পিডিএম গঠনের পর ভেঙে পড়ছিল ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কোনো অঞ্চলে ছয়-দফা, সমাজবাদী অর্থনীতি ও এক ইউনিট বাতিলকে গুরুত্ব প্রদান করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের লাইনে আদি পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার পক্ষে স্পষ্টত সমর্থন পরিলক্ষিত হচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এক নতুন রাজনৈতিক দল গড়ছিলেন।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠার সময়টি কাকতালীয় কিংবা পশ্চিম পাকিস্তানে, বিশেষ করে, সিন্ধু ও বেলুচিস্তানে জোরালো বুনিয়াদসহ পুনর্গঠিত পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অভ্যুদয় রোধ করার জন্য এক পরিকল্পিত উদ্যোগ—যা-ই হোক নেপথ্য ঘটনা আসলে কী ছিল তা নিরূপণ করা কঠিন। এমনও অসম্ভব নয় যে, পূর্ব পাকিস্তানে যেমন করে স্বায়ত্তশাসনবাদীদের অভ্যুদয় ঘটেছে তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানেও পিপিপির আবির্ভাব ঘটেছে স্বাভাবিকভাবেই। পক্ষান্তরে মনে হয়, পিডিএম-এর পরিকল্পনা করা হয়েছে পাকিস্তানকে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনবাদী ও প্রগতিবাদী পিপিপির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ।
বলাবাহুল্য, ঘটনা যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে পিডিএম নিদারুণ ব্যর্থতাই বরণ করেছে বলতেই হয়। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ক্রমেই তার মতাদর্শ প্রকাশে সোচ্চার ও অদম্য হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন:
ছয়-দফার মাধ্যমে আমরা চাই পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ পূর্ব পাকিস্তানেই থাকুক। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থও সেখানে থাকুক। এতে জাতিবিরোধী কী থাকতে পারে? যদি ছয়-দফা। প্রশ্নে গণভোট দেওয়া হয় আর তাতে ছয়-দফার বিপক্ষে এমনকি ৩০ শতাংশও ভোট পড়ে আমরা ছয়-দফা কর্মসূচি ছেড়ে দেব।… (আমাদের বলুন) কেন আপনারা আমাদেরশত শত নেতাকর্মীকে বিনাবিচারে অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে রেখেছেন?… গণদাবি মেনে নিন ।
কোনো আন্দোলনের প্রয়োজন আর থাকবে না। আমরা ক্ষমতা চাই না। আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক কর্মসূচি সমাজতান্ত্রিক। আমরা এক সমাজবাদী অর্থনীতির মাধ্যমে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। স্বাধীনতা এই জন্য হাসিল করা হয়নি যে একটি বিশেষ অঞ্চলের দুইশটি পরিবার জনসাধারণের রক্ত শোষণ করবে এবং সারা দেশের (জাতীয়) সম্পদ গ্রাস করবে।
সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির প্রতি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি দৃষ্টত মনে হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্তত একাংশের মনে ধরে । কামারুজ্জামান করাচিতে সাংবাদিকদের তথ্য প্রদানের সময় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের চলতি পুনর্গঠন সম্পর্কিত বিস্তারিত উল্লেখ করে এই মর্মে ঘোষণা দেন যে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তানে ৬৫ “শ্রেণীহীন সমাজ” ও “সংসদীয় গণতন্ত্র” চায়। অবশ্য এ দুটি দাবি পশ্চিম পাকিস্তানের একই গোষ্ঠী না ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর তরফ থেকে এসেছে তা স্পষ্ট নয় ।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা ভাসানী পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনপন্থী আওয়ামী লীগারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমাতে পারতেন। তিনি পারতেন খুব সহজেই চাষীসমাজ ও শহরের বামপন্থীদের সুসংগঠিত করতে। কেননা কৃষকনেতা হিসেবে তাঁর প্রতিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তা বহুদিনের । তাঁর দল ছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও কর্মীদের আশ্রয় । তিনি ‘৬০-এর দশকের মধ্যভাগে তাঁর চীনপন্থী অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছিলেন ।
ঐ সময়টিতেই পূর্ব পাকিস্তানে চীনপন্থী বাম রাজনীতিকদের আবির্ভাব ঘটছিল। কিন্তু মওলানা ভাসানী রাজনৈতিক কার্যকলাপের কোনো বোধগম্য ধারা দিতে পারেননি। এ কাজে সক্ষম হলে আওয়ামী লীগের প্রাধান্য ও আধিপত্যের একটা সম্ভাব্য বিকল্প তিনি দিতে পারতেন। আর তা পারেননি বলেই তাঁর অবস্থান অপুনরুদ্ধারযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে যায়, ফলে তার দল প্রথমে মাঝামাঝি বরাবর দু’ভাগ হয়ে যায়। পরে যে উপদলটি তখনো তাঁর সাথে ছিল সেটিতেও ভাঙন দেখা দেয়।
তবে সে যাই হোক, ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের মধ্যেকার আঁতাত তখনো সম্ভব ছিল । কারণ, ভাসানী উল্লেখ করেছিলেন যে, এক ইউনিট, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতির বিষয়ে আওয়ামী লীগ তাঁর অবস্থান বা ভূমিকা বদলানোর পর আওয়ামী লীগের সাথে ন্যাপের মতপার্থক্য বহুলাংশেই দূর হয়েছে।
পেছনের দিকে নজর দিলে মনে হবে যে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চেও পাকিস্তান পিপলস পার্টির আবির্ভাবের সাথে সাথে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিশেষ করে, পশ্চিম পাকিস্তান ন্যাপ নিজ পক্ষে সমর্থনের ভিত্তি সেখানে বাড়াতে না পারলেও যা ছিল তা বজায় রাখার জন্য খুব স্বাভাকিভাবেই মিত্রের সন্ধান করবে। তাই পুনর্গঠিত আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো কোনো এলাকায় যার সমর্থন ছিল সেই দলটিকেই হয়তোবা তাই ন্যাপের কাছে তার সম্ভাব্য ত্রাতা মনে হয়ে থাকবে।
পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের কিছু নেতা (যারা মস্কোপন্থী বলে অভিহিত) তাদের দলের ভেতরের মতভেদ ও বিভক্তিকে সরকারের প্রতি দলীয় নীতি, একটি বিরোধীদলীয় যুক্তফ্রন্ট গঠন, স্বায়ত্তশাসন ও আন্দোলনের প্রকৃতি নিয়ে মতপার্থক্যেরই ফল হিসেবে চিহ্নিত করেন। ন্যাপের আরেকটি উপদল (পিকিংপন্থী বলে পরিচিত) আলোচিত সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিরোধী ছিল বলেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে। তারা উল্লিখিত চারটি ইস্যু নিয়ে পুরোপুরি সরকারবিরোধী সম্মিলিত বিরোধীদলীয় মোর্চার আন্দোলনের জন্য তৈরি ছিল না। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদও সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, ন্যাপের (তথাকথিত) জাতীয়তাবাদী উপদলটি এখন আর (তথাকথিত) আন্তর্জাতিকতাবাদী উপদলটির সঙ্গে উল্লিখিত কারণগুলির জন্য কাজ করতে পারছে না।
উল্লিখিত বিভেদের কারণে ন্যাপই শুধু ভাগ হয়ে গেল না, মওলানা ভাসানীর ভাবমূর্তিও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ১৯৬৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ন্যাপ রিকুইজিশনপন্থীদের সভায় শ্লোগান দেওয়া হয়: “ভাসানী আইয়ুব খানের দালাল” । মহিউদ্দিন আহমদ এক লিখিত বক্তৃতায় বলেন, দলের অন্য উপদলটি আইয়ুব সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে এই অজুহাতে যে, সরকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আর সাম্রাজ্যবাদই দেশের প্রধান দুশমন। তাঁরা অবশ্য জনসমক্ষে প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করছিলেন না, সরকার কেমন করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা পালন করছেন। আবার সেই তাঁরাই সরকারকে সরাসরি সমর্থনও দিচ্ছিলেন না অথচ সরকারকে বিব্রত না করার নীতি অনুসরণ করছিলেন ঠিকই।
৭ জুনের পরবর্তী আন্দোলনে শরিক না হওয়ার জন্য মহিউদ্দিন তাঁর কথিত ন্যাপের অন্য উপদলটিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করেন। এর জবাবে মাহমুদুল হক উসমানী বলেন, তাঁরা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তবে তাই বলে তিনি একে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গুরুতর জাতীয় সমস্যাগুলিকে খাটো করতে চাননি।
তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, যখন, সংসদীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, কিংবা মৌলিক অধিকার বলতে কিছুই দেশে নেই তখন সেখানে ‘জনগণতন্ত্রের’ আলোচনা নিরর্থক। তিনি এই সাথে যোগ করে বলেন, জনগণের ক্ষমতা ছাড়া জনগণতন্ত্রও তো অর্জিত হতে পারে না। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমেও সমাজবাদী সমাজ গড়া বেশ সম্ভব । তাঁর এ সব যুক্তি যদিও একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বলা তবু তিনি ন্যাপের বিভিন্ন গোষ্ঠী বা উপদলকে মস্কোপন্থী বা পিকিংপন্থী এভাবে আখ্যায়িত করার বিরোধিতা করেন। এ ফাটল বা বিভেদ দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলির সাথে সম্পর্কিত হলেও তিনি বলেন, এ সবই সত্যিকার অর্থে আসল ইস্যুগুলিকে ধামাচাপা দেওয়ার সমান।
তাই স্পষ্টত ন্যাপের বিভেদ দেশে সমাজতন্ত্র কায়েমের উপায় ও পন্থার মতো আদর্শিক ইস্যুতে ঘটলেও বাস্তব তাৎপর্য ছিল এই যে, ভাসানীর নেতৃত্বে পরিচালিত বলে কথিত পিকিংপন্থীরা সরকারের প্রতি দলীয় নীতি কী হবে সে বিষয়ে ছিল দ্বিধান্বিত, পক্ষান্তরে কথিত মস্কোপন্থীরা সরকারবিরোধী ছিল সুনিশ্চয়।
ন্যাপের একাংশ কর্তৃক সরকারকে সমর্থনের কথা বলা হলেও স্পষ্টত দলটি সরকারের সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না, আর পূর্ব পাকিস্তানীদের সম্পর্কে আইয়ুব খানের অবমাননাকর মন্তব্যে ভাসানী তখনো ক্রুদ্ধ ছিলেন। তিনি তাঁর এই ক্ষুব্ধ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বলেছিলেন “প্রেসিডেন্ট হয়তো ভুলে গেছেন যে পাকিস্তানীদের শতকরা ৫৬ জনের বাস এই পূর্ব পাকিস্তানেই ৷”
ন্যাপসহ অন্যান্য বিরোধীদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সমর্থন না থাকায় ছয়-দফা আন্দোলনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া কিছুটা কম হলেও পূর্ব পাকিস্তানে এটি মনোযোগের কেন্দ্র হয়েই থাকে, এর প্রেরণাও এ অঞ্চলের মানুষের মনে গভীর শেকড় গাড়ে। এটি অত্যন্ত রেখাপাতযোগ্য বিষয় যে, বিভ্রান্তি ও বিভেদের সেই আমলেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের তুলনামূলকভাবে নবীন নেতা যাঁরা তখন জেলের বাইরে ছিলেন তাঁরা দলীয় কর্মসূচির প্রতি দৃঢ়চিত্তে অটল ও অবিচল থাকেন যদিও বিরোধী পক্ষের বাকিদের অনেকে ও কোনো কোনো খোদ দলীয় সদস্য তাদেরকে দাবির স্বরগ্রাম খাদে নামিয়ে আপোসমনা নেতাদের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্য রাজি করাতে চেষ্টা চালায় ।
এমনকি, আওয়ামী লীগের কথিত সাংগঠনিক দুর্বলতাও ঐ সময়ে (পূর্ব পাকিস্তানে) দলের দায়িত্বে আসীন আওয়ামী লীগারদের বিশ্বাস ও প্রত্যয়ে ফাটল ধরাতে পারেনি। এ থেকে দেখা যায়, তাঁরা যথাপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি উপলব্ধি করেছিলেন।
তাঁদের হেতু প্রয়োগের ধারাটি ছিল এই যে, একবার এই জনপ্রিয় আন্দোলন পরিত্যাগ করার পর দরকষাকষির আলোচনা শুরু হলে সে আলোচনা যদি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে বিকল্প পথ খোলা থাকবে না ।৭১ তাই তাঁদের এ ভূমিকায় তাঁদের একটা বড় মাপের রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রতিফলন ঘটেছে, অত্যন্ত স্পষ্ট হয়েছে, কোনো ব্যক্তিত্বের মহিমায় নয় কিংবা কেন্দ্রবিরোধীর নেতিবাচক মনোভঙ্গির কারণেও নয় বরং তাঁরা ছয়-দফা কর্মসূচির ইতিবাচক উদ্দেশ্যে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই দলীয় কর্মসূচিতে অটল ছিলেন।
এই বিশ্বাসই তাঁদেরকে ও এ আন্দোলনকে সঠিক পথে রেখেছে। অন্য সব বিরোধীদল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো বাস্তব বিকল্প হয়ে উঠতে না পারায় সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, কেননা ক্ষমতাসীন শাসকচক্রের স্বার্থে একান্ত জরুরি আওয়ামী লীগকে নির্বীর্য করার কাজটি সম্ভব হয়নি। সরকারের সামনে একটি মাত্র পথই খোলা ছিল।
তা হলো, বিভিন্ন আঞ্চলিক আন্দোলন ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের স্বার্থে দীর্ঘ সাহচর্যে দলটির যে বৈধতার ভিত গড়ে উঠেছে তাতে আঘাত হানা। এ কাজটি করাও হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ছয়-দফা কর্মসূচির প্রধান প্রবক্তা শেখ মুজিব যিনি ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি থেকেই কারাগারে ছিলেন তাঁকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে ।
এ ধরনের ব্যবস্থার নেপথ্যে উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবকে খলনায়ক হিসেবে দেখানো ও সেভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে জনমত গড়ে তুলে “হিন্দু” ভারতের বিরুদ্ধে মুসলিম ভাই-বেরাদরির পক্ষে সরকারের পেছনে লোকজন জড়ো করা।
প্রত্যাশিত ছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে “ভারতের দালাল” হিসেবে কলঙ্কিত করা গেলে অপবাদদুষ্ট আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের কাছে তার বৈধতা হারাবে । যাঁরা এ কৌশলের প্রণেতা তাঁরা সম্ভবত ১৯৬৬ সালে নুরুল আমিন যে সব কথাবার্তা বলেছিলেন সে ধরনের কথাবার্তায় উৎসাহিত হয়েছিলেন। নুরুল আমিন বলেছিলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদের কথা এমনকি কারও ভাবনায় এসেও সে সোসে এক আদালতে তার বিচার ও যথাযোগ্য শাস্তি হওয়া উচিত।
তবে বড়যন্ত্র মামলার কার চলাকালে ক্ষমতাসীনচক্র এ ধরনের বিবৃতি বা কথাবার্তায় যে জনপ্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা নিতে স্পষ্টত ব্যর্থ হয়। বরং শাসকগোষ্ঠীর এ প্রয়াসে উল্টো ফল পর্ণার। পূর্ব পাকিস্তানে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া বিলম্বিত হলেও প্রমাণিত হয় যে, আওয়ামী লী রাষ্ট্রদ্রোহে লিপ্ত এ অতিকথায় তারা বিশ্বাস করে না। বস্তুত সরকারিভাবে আগরতল ষড়যন্ত্র’ নামে আখ্যায়িত মামলাটি বরং শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা এবং আস্থাযোগ্যেতা বাড়িয়ে আওয়ামী লীগকে নবজীবন দান করে ও পূর্ব পাকিস্তানে এ দলের বৈধতা অনেক পানি বেড়ে যায় ।
গোড়ার দিকে, ‘ষড়যন্ত্রের’ কথা ঘোষণা এবং এ ষড়যন্ত্রে শেখ মুজিবের জড়িত থাকার বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিক ও আওয়ামী লীগারদের স্তম্ভিত করে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রায় সকলেই কারাগারে ছিলেন। কোনো কোনো নেতা দলত্যাগ করে পিডিএম-এ যোগ দেন।
বহু গুরুত্বপূর্ণ দলকর্মী আত্মগোপন করেন এবং দলের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠী ভীতিতে পড়েন। অনেকের মতো, দলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমেনা বেগম নিশ্চিত জানতেন যে, শেখ মুজিব ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে কোনো উপায়ই বাদ রাখা হবে না। তবে তারপরেও তাঁর বিশ্বাস ছিল যে দেশব্যাপী জনআন্দোলন ঘটলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ৪ তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং -কমিটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রকাশ্য বিচার এবং প্রচলিত আইনের আওতায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে এক বিবৃতি দেওয়া।” সরকার নিজ পদক্ষেপের নির্ভুলতা প্রমাণ করার আশায় সম্ভবত এই মামলার প্রকাশ্য শুনানির সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৬৮ সালের এপ্রিলে এক অধ্যাদেশবলে প্রেসিডেন্ট সাবেক প্রধান বিচারপতি এসএ রহমান, বিচারপতি মুজিবুর রহমান ও বিচারপতি মকসুমুল হাকিমকে নিয়ে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য মামলার বিচার পরিচালনার জন্য এক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। 96 ঢাকার কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন মামলা শুরু হয়। এখানেই মামলার সকল অভিযুক্তকে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী আইনে ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে আটক রাখা হয়েছিল।
এ রকম এক পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগাররা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে এ মামলায় শেখ মুজিব দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি কেবল দেশের। রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকেই অপসারিত হবেন না বরং এ ঘটনা দলের কার্যত অবস্থান ঘটাবে ও দলের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন অর্জনে যে সব বুনিয়াদ রচনামূলক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে সেগুলিও নিশ্চিহ্ন হবে। এ জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে অত্যন্ত সীমিত লক্ষ্য স্থির করা হয় আর সেটি হলো, যে কোনো উপায়ে শেখ মুজিবের মুক্তি হাসিল করা। মামলার আইনগত প্রক্রিয়াটি পরিচালনার
আওয়ামী লীগাররা কৌঁসুলি নিয়োগ করে এবং ব্যয় নির্বাহের জন্য চাঁদা তুলে তহবিল গঠন করে । ৭৮ দ্বিতীয়ত, জনসভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের লক্ষ্যে গণমত সংগঠনের কর্মসূচি বজায় রেখে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা দলের স্থানীয় ইউনিটগুলিকে বিপদ ও ঝামেলার বিষয়গুলি বিশদ অবহিত করেন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি দাবির লক্ষ্যে বিক্ষোভের জন্য তাঁদেরকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৈরি করেন।
তৃতীয়ত ও সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন যে কাজটি করা হবে বলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা স্থির করেন তা হলো পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসা যাতে করে তাঁরাও শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য পূর্ব পাকিস্তানের দাবির প্রতি সমর্থন জানান।
যখন মামলার বিচার অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছিল তখন গোটা রাজনৈতিক তৎপরতা চলছিল অনেকটাই নিচু লয়ে। একজন ভাষ্যকার এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এই মামলার কারণে মনে অপরাধ থাকলে যা হয় সে রকমভাবেই বিরোধীদলের নেতারা শামুকের মতো খোলসের মধ্যে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছেন— যেন তাঁরা চাচ্ছেন সব কিছু বিলকুল সাফ—এ রকম সবুজ সঙ্কেত না পাওয়া অবধি ওরকম চুপটি মেরেই থাকবেন।৮ তবু ন্যাপের উভয় উপদলের সভাসমিতির তুলনায় আওয়ামী লীগের জনসভাগুলিতে ভালো জনসমাগম হতে থাকে।
আগরতলা মামলার বিচার শুরুর সময় নাগাদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ: ‘এক পা এগুনো ও দু’পা পেছানোর কৌশল বের করে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে তোলার জন্য। সেই অনুযায়ী ১৯৬৮ সালের ৪ জুলাই ওয়ার্কিং কমিটির অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত এক প্রস্তাবে জনগণের কাছে এক সম্মিলিত আন্দোলন পরিচালনার আহ্বান জানানো হয়। ৮২
অবশ্য, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এ পদক্ষেপকে অনেকে রক্ষণশীল পিডিএম-এর বিরুদ্ধে এক পাল্টা শক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ বলে ব্যাখ্যা করেন। আর এ সবের ফল হিসেবে বেশ কিছু জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। এগুলির অন্তর্ভুক্ত ছিল, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (ভাসানী) ও পিপিপির এক জোট গঠনের সম্ভাবনা।
এ ধরনের কোনো সম্মিলিত আন্দোলনের স্বার্থে কোনো ব্যাপকতর আদর্শের (ও আবশ্যিকভাবে প্রগতিশীল ধ্যানধারণা) জন্য ছয়-দফা কর্মসূচির অপরিবর্তনযোগ্যতা বিসর্জন দেওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেয়। এ জন্য মনে করা হয় যে, এ লক্ষ্যে কোনো উদ্যোগের সাফল্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সক্রিয় কামারুজ্জামান এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে সক্রিয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আমেনা বেগমের মতো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের সংগঠনের “কিছু পুরানো বটবৃক্ষ” উৎপাটনে নিজেদেরকে কতখানি ভালো করে তৈরি করেন তার ওপর নির্ভর করবে।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতারা সুনিশ্চিতভাবে নিজেদেরকে তৈরি করেছিলেন তবে তা আগাগোড়া ভিন্ন এক উদ্দেশ্যে। সেটি হলো, আগের মতো ছয়-দফা কর্মসূচিকে দরকষাকষির বাইরে রেখে আশু প্রয়োজনে সাহায্য-সহায়তাও যুগপৎ সংগ্রহ করা ।
শেষোক্ত কাজটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদদের সমর্থন নিয়ে গণআন্দোলনে শেখ মুজিবের মুক্তি আদায় করা। এই অনুসারে ১৯৬৮ সালের অক্টোবরে ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভা কতিপয় জরুরি দাবি আদায়ের জন্য জনগণের কাছে অনতিবিলম্বে এক সম্মিলিত আন্দোলন শুরুর আহ্বান জানান। এ জন্য চার পর্যায়ের কার্যসূচি ঘোষণা করা হয় । এগুলি হলো: (১) সভা ও মিছিল; (২) ধর্মঘট; (৩) অসহযোগ; ও (৪) প্রয়োজনে, শান্তিপূর্ণ আইন অমান্য কার্যক্রম।
পরের এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করে এক প্রস্তাব গৃহীত হয় । সভায় গৃহীত অন্যান্য প্রস্তাবের অন্তর্ভুক্ত ছিল: সকল রাজবন্দীর মুক্তি এবং ছয়-দফা বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে সংগঠিত করে তোলার আহ্বান ।
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 3 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ01.jpg.webp)
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মিলিত আন্দোলনের আহ্বানে আশু সাড়া পরিলক্ষিত না হলেও পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক প্রবণতায় একটা বোধগম্য পরিবর্তন সে সময় ঘটে । মওলানা ভাসানী সরকারকে এতদিন যে (পরোক্ষ) সমর্থন দিয়ে আসছিলেন তা প্রত্যাহার করেন । তিনি আইয়ুব খানের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন, কেননা সরকার গরিবদের অবস্থার উন্নতি বিধানে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি স্বীকার করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি “প্রদেশের সর্বসম্মত দাবি”।৮৫ স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের বৈধতার প্রশ্নে তাঁর এই স্বীকৃতি পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তাঁর সংশ্লিষ্টতার সূচনা করে । তিনি শেখ মুজিবের মুক্তির জন্যও এ আন্দোলনকালে জোর দাবি জানান ।
আর শেষে এই আন্দোলনই প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের পতনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। পরিস্থিতির এ সব পটপরিবর্তন সুনিশ্চিতভাবেই পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আধিপত্যশীল ভূমিকার ইঙ্গিতবাহী। দলটি স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন সূচনা করার পর বহু বাধার মুখে একে এগিয়ে নেওয়ার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোধায় চলে আসে।
![স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ] 1 স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন পর্ব-২](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/স্বায়ত্তশাসন-আন্দোলন-পর্ব-২.png.webp)