রাজধানী নির্মাণ, পীর-ফকিরদের প্রতি আকবরের ভক্তিই সিক্রীর ভাগ্য খুলে যেতে সহায়ক হয়। সেই একটা ছোটখাটো বসতি ও তার সন্নিকটস্থ অনাবৃত পাহাড়ের কলেবর পরিবর্তিত হতে থাকে। আবুল ফজল লিখেছেন “বাদশাহের মহামহিম পুত্র (সলীম ও মুরাদ) সিক্রীতে জন্মলাভ করেন।
রাজধানী নির্মাণ | সিক্রী রাজধানী | আকবর
সিদ্ধপুরুষ সন্ত সলীমের নিবাস ছিল সিক্রী। সেই অধ্যাত্মিক সম্পত্তিকে বাদশাহ বাহ্যিক বৈভবে রূপান্তরিত করতে চাইলেন। ….বাদশাহ হুকুম দিলেন, শাহী ঘরবাড়ি বানানো হোক। ” সিক্রী গ্রামের চতুর্দিকে প্রাচীর নির্মাণ শুরু হল, যদিও তা কখনও সম্পূর্ণ হয়নি। শাহী মহল ও সরকারী মন্ত্রণালয়ের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি শুরু হল, উদ্যান তৈরি হতে লাগল, আমির ও অন্যান্য লোকজনের জন্য আবাসন নির্মিত হল।
গুজরাত বিজয়ের পর নগরীর নাম ফতেহবাদ রাখা হয়েছিল, তবে ফতেহপুর হিসেবেই লোকজনের কাছে তা স্বীকৃতি লাভ করে। সলীম চিশতী ১৫৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই শুরু ঊষর পাহাড়ে বন্য জীবজন্তুর মধ্যেই বাস করতে শুরু করেন। এবার তা ইন্দ্রপুরী হয়ে উঠতে লাগল। সিক্রীর নিকটে প্রচুর লাল পাথর পাওয়া যায়। বাড়িঘর তৈরিতে তা দেদার ব্যবহার করা হল । সম্ভবত ম্যায়মার (রাজগির) মসজিদ সিক্রীর সবচেয়ে পুরাতন বাড়ি, বাদশাহী মহলগুলোর ত্রিশ বছর পূর্বে তা নির্মিত হয়েছিল।
সলীম চিশতী ভবঘুরে আপনভোলা ফকির ছিলেন। তিনি বাইশ বার হজ করেন। প্রথম বার গিয়ে চোদ্দ বার, দ্বিতীয় বার গিয়ে আট বার। শেষ বারে চার বছর থাকেন মদীনায় এবং চার বছর মক্কায়। মদীনায় থাকার সময়েও তিনি মক্কায় চলে আসতেন হজ করতে। খুব বিদ্বান ছিলেন। মক্কাবাসীরা তাঁকে শেখুল-হিন্দ (ভারতের সন্ত) বলত।
হজ ও পর্যটনের পর ৯৭১ হিজরীতে (১৫৬৩-৬৪ খ্রিস্টাব্দে) ভারতে ফিরে আসেন। সিক্রী পাহাড়ের গুহায় সাম্যবাদী সন্তু নিয়াজী-ও (তাঁকে সলীমেরও শিষ্য বলা হয়ে থাকে) বহুকাল কাটিয়েছিলেন। সেখানে সলীমও আস্তানা গাড়েন।
ধীরে ধীরে সেখানে খানক্বাহ (গুরুদওয়ারা) ও মসজিদ গড়ে ওঠে। পরে ওই জায়গাতেই আকবর ৯৮২ হিজরীতে (১৫৭৪-৭৫ খ্রিস্টাব্দে) ইবাদতখানা (উপাসনা-গৃহ) নামে একটি বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেন। ইবাদতখানার কাছেই অনূপ পুষ্করিণীর প্রতিষ্ঠা করেন, আকবর তা এক কোটি টাকার স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রায় পূর্ণ করে দেন।
পুষ্করিণীর তীরে প্রাসাদ ও বৈঠকখানা নির্মিত হয়, তার দেওয়াল-দরজা, উঠোন, তাক ইত্যাদি জরিদার পরদায় সুসজ্জিত করা হয়, নিচে বিছানো হয় মখমলের কার্পেট, রেশমের চাদর। ইবাদতখানার পূর্বদিকে আমিরেরা, পশ্চিমে সৈয়দেরা, দক্ষিণে আলিম ও মৌলবীরা এবং উত্তর দিকে সন্ত-ফকিরেরা বসতেন। বাদশাহ যার উপর খুশি হতেন, পুষ্করিণী থেকে মুঠো-ভর্তি আশরফি তুলে নিয়ে দিতেন।
৯৮৬ হিজরীতে (১৫৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে) বদখশার শাসক মির্জা সুলেমান তাঁর পৌত্রের অত্যাচারে ভারতে পালিয়ে এলে, এই অনূপ পুষ্করিণীতেই তাঁকে স্বাগত জানান আকবর। সলীম চিশতীর দর্শনলাভের জন্য এখানেই তাঁর ঝুপড়িতে আসতেন আকবর।
মোল্লা বদায়ূনাও শেখের সেবায় প্রায়ই এসে উপস্থিত হতেন। মোল্লা বলেছেন— “আমি তাঁর অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা দেখেছি যে শীতকালে ফতেহপুরের মতো ঠাণ্ডা জায়গায় তাঁর গায়ে সুতা জামা ও মখমলের চাদর ছাড়া অন্য কোনো পোশাক থাকত না। সৎসঙ্গে ব্যস্ত থাকার দিনেও তিনি দুইবার স্নান করতেন।
অর্ধেক তরমুজেরও কম ছিল আহার।” জাহাঙ্গির তার তুজুকে লিখেছেন— “একদিন আমার পিতা জিজ্ঞাসা করলেন— আপনার এখন বয়স কত আর কবে আপনি ইহলোক ত্যাগ করবেন, দয়া করে বলবেন কি? শাহ জবাব দিলেন— গুপ্ত রহস্যের কথা জানেন খোদা। পিতা বারবার জিজ্ঞাসা করলে তিনি আমার (সলীমের, জাহাঙ্গিরের) দিকে ইঙ্গিত করে বললেন— যখন শাহজাদা এতটা বড় হবে যে কেউ কিছু স্মরণ করিয়ে দিলেই সে সঙ্গে সঙ্গে তা শিখে নিতে পারবে।”
শেখ সলীম গান-বাজনা শুনতে খুব ভালোবাসতেন, তানসেন ও অন্যান্য শাহী কালোয়াত তার খানকায় যাতায়াত করতেন। ৯৭৯ হিজরীতে (১৫৭১-৭২ খ্রিস্টাব্দে) সলীম দেহত্যাগ করেন, অর্থাৎ আকবর যখন সিক্রীতে থাকতে শুরু করেন, তার কিছুদিন পরেই। শেখের সন্তান-সন্ততি ছিল।
শেখের জ্যেষ্ঠপুত্র শেখ বদরুদ্দীন পিতার পদাঙ্কই অনুসরণ করতে চাইতেন। মক্কায় গ্রীষ্মকালে নগ্ন পায়ে কাবা পরিক্রমা করার ফলে পায়ের চামড়া উঠে যায়, জ্বরে আক্রান্ত হন এবং ৯৯০ হিজরীতে (১৫৮০-৮১ খ্রিস্টাব্দে) সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
দ্বিতীয় পুত্ৰ শেখ ইব্রাহিমের মৃত্যু হয় ৯৯৯ হিজরীতে (১৫৯০-৯১ খ্রিস্টাব্দে) সন্তের গৃহে লক্ষ্মীর কৃপা বর্ষণ হতো, সেটা বোঝা যায়, শেখ ইব্রাহিম মৃত্যুকালে রেখে গিয়েছিলেন চব্বিশ কোটি নগদ । যদি তা দামও হয়, তাহলেও সাড়ে বাষট্টি লক্ষ টাকা। তদ্ব্যতীত হাতি, ঘোড়া ও অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী ছিল। অপর পুত্রের নাম শেখ জীওয়ন, জাহাঙ্গিরের সঙ্গে দুগ্ধপান করেছিলেন তিনি।
তিনিই বড় হয়ে নবাব কুতুবুদ্দীন খান হন। শের আফগানকে হত্যা করে নূরজাহানকে নিয়ে পালিয়ে আসার জন্য জাহাঙ্গির তাঁর এই গুরু-পুত্রকে পাঠান। গুরু-পুত্র শের আফগানের সঙ্গেই বেহেশতের যাত্রী হন— এটা সেই বছরের ঘটনা, যে-বছর আকবর প্রাণত্যাগ করেন।
যদিও সিক্রীতে আট্টালিকাদি নির্মাণ আরম্ভ হয়েছিল ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে, তথাপি আকবর দু’বছর পরেই (১৫৭১ খ্রিঃ) সেখানে থাকতে শুরু করেন। সিক্রীতে আসার আগেই আকবরের হৃদয়ে দেশের প্রতি বিশেষ পক্ষপাত জন্মায়, সেজন্য সিক্রীর অট্টালিকাদিতে ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পের স্পষ্ট ছাপ নজরে পড়ে। জাহাঙ্গির মহল (যোধাবাঈ মহল) সেখানকার সবচেয়ে বৃহৎ ও প্রাচীন অট্টালিকাগুলির অন্যতম ।
সম্ভবত ওই গৃহে সলীমের মাতা কছওয়াহা রানী (মরিয়ম জমানী) থাকতেন। সেরকম সলীমের এক বেগম, শাহজাহানের মাতা যোধপুর-কুমারীও ছিলেন। বড় মসজিদকে মক্কার মসজিদের আদলে নির্মাণ করা হয়েছিল, নির্মাণ-কার্য সমাপ্ত হয় ৯৭৯ হিজরীতে (মে ২৩, ১৫৭১-এপ্রিল ১৫, ১৫৭২ খ্রিঃ)। মসজিদের বিশাল ফটক (বুলন্দ দরওয়াজা) শেষ হয়েছিল চার বছর পরে।
সেটাকে ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে গুজরাতের দ্বিতীয়- বিজয়ের স্মারক হিসেবে নির্মাণ করা হয়। অন্য একটি মত অনুসারে, দাক্ষিণাত্য- বিজয়ের পরে (১০১০ হিঃ, ১৬০১-২ খ্রিঃ) তার স্মারক হিসেবেই সেটি নির্মিত হয়। কিন্তু ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের পর আকবর আর মুসলমান ছিলেন না, সেজন্য এই সময়কালে মসজিদের দরজা বানানোর সম্ভাবনা নেই। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দেই আকবর সিক্রীকে ধ্বংসের হাতে ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে সরে পড়েন, সেজন্যও এটা সম্ভব না হতে পারে ।
১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে সলীমের জন্ম হয়। আকবর মোটামুটি তখন থেকেই সিক্রীতে থাকতে শুরু করেন। তুরানী উজবেকদের আক্রমণের আশঙ্কায় ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের শরৎকালে আকবর চিরতরে সিক্রী ত্যাগ করেন। সাধু-সন্তের প্রতি ভক্তির প্রাবল্যে আকবর সিক্রীকে রাজধানী করেছিলেন, কিন্তু এত বড় নগরীর জন্য সেখানে কতকগুলি অসুবিধে ছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জলের।
আকবর পাহাড়ের উত্তর দিকে ছয় মাইল দীর্ঘ, দুই মাইল প্রশস্ত একটি বিশাল ঝিল তৈরি করিয়েছিলেন। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের অতিবৃষ্টিতে তার বাধ ভেঙে যায়, তাই থেকে তিনি বুঝতে পারেন, নগরের অবস্থান অনুকূল নয়। শেষবারের মতো সিক্রী ত্যাগ করার অল্পকাল পরেই ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে ইংরেজ লেখক রাল্ফ ফিচ সেখানে এসে পৌঁছান । তিনি লিখেছেন—
“আগরা খুব জনবহুল ও শ্রেষ্ঠ শহর। বাড়িঘর পাথরে তৈরি। চমৎকার চমৎকার দীর্ঘ পথ। পাশে একটি সুন্দর নদী (যমুনা) বয়ে চলেছে, সেটা গিয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। উত্তম পরিখা-যুক্ত একটি উন্নতমানের সুদৃঢ় দুর্গ রয়েছে এখানে । শহরে বহু হিন্দু-মুসলমান বাস করে।
রাজার নাম জেলাবদীন (জালালুদ্দীন) এখর (আকবর)। এখান থেকে আমি ফতেহপুরে যাই, সেখানে বাদশাহের দরবার ছিল। এ শহরটা আগরা থেকে বড়, কিন্তু ঘরবাড়ি ও রাস্তাগুলো ততো ভালো নয়। এখানে অনেক হিন্দু-মুসলমান থাকে। …লোকে বলে, বাদশাহের এক হাজার হাতি, তিরিশ হাজার ঘোড়া, চোদ্দ শত পোষা চিতাবাঘ, আট শত বেগম, অজস্র বাঘ, মোষ, মুরগি, বাজপাখি আছে, দেখে বড় অবাক হতে হয়। …
আগরা ও ফতেহপুরের মধ্যে ব্যবধান বারো ক্রোশ (২৩ মাইল)। সারা পথে পান-ভোজনের ও অন্য নানা রকমের দোকানপাট রয়েছে… । লোকজনের ভালো ভালো রথ আছে, কতরকম কারুকার্য- খচিত, সোনার সাজে সজ্জিত। দু’টো করে চাকা থাকে, দু’টি বলদে টানে… সে-রথ ঘোড়াতেও টানতে পারে।
এগুলোতে দুই-তিনজন লোকের বসা যায়। রথগুলো ঢাকা থাকে রেশমী কিংবা আরও দামী বস্ত্রে।… সারা ভারত ও ইরানের ব্যবসায়ীরা রেশমী ও অন্যান্য বস্ত্র, বহুমূল্য পাথর— লাল, হীরে ও মুক্তো— এখানে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। ফতেহপুরে আমরা তিনজন ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে সেপ্টম্বর পর্যন্ত থাকি। আমি জহুরী উইলিয়ম লীকে ফতেহপুরে জেলাবদীন এখ়রের নিকটে রাজসেবায় রেখে দিই, তিনি তাঁর খুব সম্মান করেন। একটা বাড়ি, পাঁচটা ক্রীতদাস, একটা ঘোড়া দেন এবং প্রতিদিন ছয় শিলিং (চার টাকা) নগদ দিতেন। …আগরায় এক শত আশি নৌকো লবণ, আফিম, হিং, সিসে, কার্পেট ও অন্যান্য মালপত্রে ভরতি করে আমি যমুনা দিয়ে সাতগাঁওয়ে (হুগলী জেলা) যাই।”
রাজধানী স্থানান্তরিত হতেই সিক্রীর দশা খারাপ হতে থাকে। দরবার ও আমিরেরা না থাকলে ব্যবসায়ীরা সিক্রীতে কি করবে? যদিও তার মানে এই নয় যে তারা সঙ্গে সঙ্গে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফেলল (আজও সিক্রী দশ হাজার জনসংখ্যার একটা মোটামুটি ভালো শহর)।
মুহম্মদশাহ (১৭১৯-৪৮ খ্রিঃ) কিছুদিন এখানে এসে বসবাস করেছিলেন, তাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বার্ধে ক্ষণিকের ক্ষণপ্রভা দ্যুতি ছড়িয়েছিল মাত্র। আকবরের মনে যখন ধর্ম বিষয়ে তীব্র কৌতূহল, সেই সময় তিনি এখানে আসেন। ১৫৭৪ থেকে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতেরা এখানে শাস্ত্র ব্যাখ্যা করতেন। “তর্ক-বিতর্কে তত্ত্বজ্ঞান নাশ…” অনুসারে আকবরের এখানে এরূপ তত্ত্বজ্ঞান লাভ হয় যে ইসলামে তার আস্থা চলে যায় ।
সিক্রীর বাদশাহী বাড়িঘরগুলি তৈরি হয় ১৫৭০ থেকে ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। তারপরে কিছু ছোটখাটো মসজিদ, সমাধি ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল। সিক্রী ত্যাগ করার পর ১৬০১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে দাক্ষিণাত্য জয় করে আগরা প্রত্যাবর্তনকালে আকবর তাঁর পুরাতন রাজধানী স্রেফ এক নজর দেখেছিলেন।
আকবরের এই শহর পাহাড়ের উপর উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাত মাইল অর্ধবৃত্তাকারে চলে যায়। শহরের উত্তর-পশ্চিমে কুড়ি মাইল জুড়ে কৃত্রিম ঝিল ছিল, জলপূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিখা রূপে শহরের একদিকে প্রতিরক্ষারও কাজ করত।
বাকি তিন দিকের নগর-প্রাচীরের সামরিক গুরুত্ব কিছুই ছিল না। শহরে নয়টি দ্বার ছিল, তার মধ্যে চারটি প্রধান— আগরা দরওয়াজা (উত্তর-পূর্ব), দিল্লী দরওয়াজা, আজমেরী দরওয়াজা, গওয়ালিয়র অথবা ধওয়লপুর দরওয়াজা। অন্যান্য দ্বারগুলি হল— লাল দরওয়াজা, বীরবল দরওয়াজা, চন্দনপাল দরওয়াজা, টেঢ়া দরওয়াজা এবং চোর দরওয়াজা । সাধু মোনসেরেত অনেক কাল সিক্রীতে কাটান। তিনি চারটি দ্বারের কথাই উল্লেখ করেছেন । ভনসেন্ট স্মিথ সিক্রীর অট্টালিকাদি বিষয়ে লিখেছেন —
“দর্শক উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আগরা দরওয়াজা দিয়ে যখন ভিতরে প্রবেশ করে, তখন সে একটা বাজারের ধ্বংসাবশেষের ভিতর দিয়ে গিয়ে নহবতখানায় পৌঁছে টাকশাল ও কোষাগারের মাঝখানে একটা চতুষ্কোণ খোলা জায়গায় উপস্থিত হয়। এরই পশ্চিমে দীওয়ান-আম। সড়ক ধরে আরও দক্ষিণ-পশ্চিমে অগ্রসর হলে আর একটি মাঠে পৌছানো যায়, তার উত্তরে খওয়াবগাহ্ (শয়নাগার) এবং দক্ষিণে দরখানা। তারপর সড়ক বড় মসজিদ থেকে শাহী দরওয়াজায় গিয়ে পৌঁছায় ।
“দীওয়ান-আমের পশ্চিম-সংলগ্ন দীওয়ান-খাস ও অন্তঃপুরের গৃহাদি, সেগুলো দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে বড় মসজিদের কাছ-বরাবর চলে গেছে। বহু অট্টালিকাই বিধ্বস্ত, তবে আকবর কর্তৃক নির্মিত বহু বাড়িঘর এখনও রয়েছে। শাহী দরওয়াজা (বুলন্দ দরওয়াজা) সিক্রীর বিশাল এবং আকর্ষণীয় নির্মাণ, কথিত আছে, দ্বিতীয় গুজরাত- বিজয় উপলক্ষ্যে সেটি নির্মিত হয়।
মুসলমান থাকা কালে আকবর এই দ্বার দিয়েই সম্ভবত নামাজ পড়তে যেতেন। একবার স্বয়ং ইমাম হয়ে মসজিদে খুৎবা (উপদেশ) পড়ার আগ্রহ হয় তাঁর। ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে কাবুলে থাকার সময়েও ইসলাম তাঁর খুব পছন্দ ছিল। পরের বছর ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে দীন-ইলাহী’র ঘোষণার সঙ্গে নামাজের পরিবর্তে দিন-রাতে চারবার সূর্য-পূজা করতে শুরু করেন। “এই মসজিদের মধ্যে শেখ চিশতীর মাজার রয়েছে। শেখের মৃত্যু হয় ১৫৭২
খ্রিস্টাব্দে। তারপর কয়েক বছর ধরে এই সৌধ নির্মাণ করা হয়। উপরের নির্মাণ মর্মর পাথরের নয়, লাল পাথরের। তার উপর সাদা পলেস্তারাও আছে। এই সৌধের কিছু পরিবর্ধন করেন জাহাঙ্গিরের দুগ্ধ-ভ্রাতা সলীম-পুত্র কুতুবুদ্দীন (মৃত্যু: ১৬০৭ খ্রিঃ)। মাজারের স্থাপত্য—শৈলী ইসলামীক নয়, বরং হিন্দু, যা আকবর কর্তৃক নির্মিত সৌধের পক্ষে স্বাভাবিক। জাহাঙ্গিরের কথা অনুসারে সমাধি ও পুরো মসজিদ তৈরি করতে ব্যয় হয় পাঁচ লক্ষ টাকা। জাহাঙ্গিরের কথায় এ-ও জানা যায় যে আকবর সমাধি নির্মাণ করিয়েছিলেন লাল পাথরে, তাতে মর্মরের কাজ করান জাহাঙ্গির ।
“সলীম চিশতীর মাজার ব্যতীত সিক্রীর সমস্ত অট্টালিকাই লাল পাথরের, যা আশপাশে প্রচুর পাওয়া যায় । আকবরের সৌধগুলিকে মর্মর পাথর, ঝিনুক ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে, দেওয়াল ও ছাদ সুন্দর সুন্দর চিত্রে অলঙ্কৃত করা হয়েছিল। খওয়াবগাহ ও মরিয়ম-মহলের প্রাচীরে এখনও তার কিছু চিহ্ন আছে। বীরবল মহল ফতেহপুর সিক্রীর অট্টালিকাগুলির মধ্যে দোতলা, ছোট আকারের, তবে খুবই সুন্দর, সেটা নির্মিত হয় ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে। এর নির্মাণ হিন্দু-মুসলিম মিশ্রণ-শৈলী ও প্রস্তর-শিল্পকলার উৎকৃষ্ট নমুনা । ছাদ পাঠান-শৈলীর গোল গম্বুজ আকারের।
“দীওয়ান-খাস বাইরে থেকে দেখলে একটি দোতলা বাড়ি মনে হয়, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায় মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত একটাই কক্ষ। মধ্যস্থলে দারুণ অলঙ্কৃত একটি চতুষ্কোণ প্রস্তর-স্তম্ভ রয়েছে। তারই উপর অবস্থিত গদিতে বসে আকবর রাজকাজ দেখাশোনা করতেন। কক্ষের চার কোণে চার মন্ত্রী— খানখানা বীরবল, আবুল ফজল ও ফৈজী— দাঁড়িয়ে থাকতেন।”
ভিনসেন্ট স্মিথ সিক্রী সম্পর্কে বলেছেন— “ফতেহপুর সিক্রীর মতো নির্মাণ পূর্বে কেউ করেনি, পরেও কেউ পারবে না। এই পাষাণময় অদ্ভুত ঘটনা, আকবরের বিচিত্র স্বভাবের ক্ষণিক চিন্তা-ভাবনার মূর্ত রূপ। তাঁর সেই মেজাজ থাকতে থাকতে তিনি তড়িৎ-গতিতে শুরু করে এই কাজ সম্পূর্ণ করে গেছেন।… পৃথিবী সেই স্বৈরাচারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে যদি কেউ এরূপ প্রেরণাদায়ক বোকামি করতে সক্ষম হয়।”
