মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন

আজকে আমরা আলোচনা করবো- মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন প্রসঙ্গে

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন

 

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন 

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবন করেন। শুরু হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দুরূহ সংগ্রাম।

১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু সাময়িক বা শাসনতান্ত্রিক আদেশ ১৯৭২ জারি করেন। সায়েমকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেন। ১২ জানুয়ারি প্রথমে তিনি বিচারপতি সায়েমের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসে শপথ নেন। আর ওই দিনই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়। ১২ জানুয়ারি বিকেলে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং মন্ত্রিসভা গঠন করে ১১ জানুয়ারি থেকে দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।

৯ মাসের যুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তার দোসররা বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছি রেলপথ, সড়কপথ, ব্রিজ, কালভার্ট, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দরসহ সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো হয় পার নয়তো মারাত্মকভাবে ক্ষতিরাপ্ত হয়েছিল ক্ষেতে-খামারে, কল-কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্য অচল বাজার ভস্মীভূত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং বিধ্বস্ত হয়েছিল ঘরবাড়ি নগর-জনপদ।

 

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন

 

এক কোটি মানুষ দেশান্তরী উপ আর তার সঙ্গে আরও তিন কোটি মানুষ দেশের ভেতরেই ভিটেমাটি ছেড়ে ছিন্নমূল হয়ে পলাতক জীবনযাপন করে বাধা হয়। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ছিল শূন্য। না ছিল সম্পদ, না ছিল নিজস্ব কারেপি। পাকিস্তানিরা ব্যাংক দুটি। ভস্মীভূত করায় ছিল না নগদ অর্থ, ছিল না কোনো উপযুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো, দক্ষ লোকবল।

বস্তুত, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে শূন্য হাতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের কাছে আত্মনিয়োগ করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর ক্যারিসমেটিক নেতৃত্ব এবং বিজয়ী অনগণের বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা আত্মত্যাগের মনোভাবের কারণে স্বল্পতম সময়ে বাংলাদেশ যুদ্ধের ক্ষত মুছে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। ব অবিলম্বে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার ব্যবস্থা ও জাতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে দ্রুততার সঙ্গে দেশ পুনর্গঠনের কারে কাঁপিয়ে পড়েন।

বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, কল-কারখানা ও ক্ষেতে-খামারে উৎপাদন শুরু এক কোটি ভারত প্রত্যাগত, উদ্ধার তিন কোটি ছিন্নমূল অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষ প্রতিষ্ঠান চালু এবং ফিরিয়ে আনা হয় জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।

বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়কোচিত ব্যক্তিত্বের কারণেই মাত্র তিন মাসের মাথায় ১২ মার্চ ভারতীয় মিত্রবাহিনী স্বদেশে ফিরে যায়। তিনি ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব সেনা, নৌ, বিদ বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) দ্রুত সংগঠিত করে দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেন সুসংগঠিত করেন। পুলিশ, আনসার প্রভৃতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে।

১৯৬৯-এর ১১-দফা এবং ‘৭০-এর নির্বাচনের অঙ্গীকার বাস্তব সর্বোপরি নিয়ন্ত্রণহীন শোষণমূলক ধনতান্ত্রিক বিকাশের পরিবর্তে পরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বৃহৎ শিল্প, ব্যাংক, বীমা ও বৈদেশিক বাণিজ্য জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার বকেয়া ও সুদসমেত ২৫ বিঘা জমির খাজনা মওকুফ করেন। ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে জমির ঊর্ধ্বতম সীমা ১০০ বিঘার নির্ধারিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নেন।

 

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন

 

১৯৭২-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি গঠন করেন পরিকল্পনা কমিশন। সাভারে জাতীয় স্মৃতি সৌধ নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সরকার ড. কুদরে ঘুমাকে প্রধান করে ১৯৭২ সালের ২৮ মে শিক্ষা কমিশন গঠন, ১৯৭২ সালের ১৯ মে দালাল আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু এবং ১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন। কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আটোড (UNCTAD) কমনওয়েলথ, জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন সংস্থা এবং ওআইসি-র সদস্যপদ লাভ করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল। কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্বাহী সংসদের অন্যান্য কর্মকর্তা ও সদস্য মনোনয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাউন্সিলে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৬ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ কাউন্সিলের পূর্ব পর্যন্ত মেয়াদের জন্য ৪৪ সদস্য বিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণা করেন। কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যগণ হলেন-

সভাপতি

১. শেখ মুজিবুর রহমান

সহ-সভাপতি

২. মো. কোরবান আলী,

৩. জহিরুল কাইয়ুম,

৪. মো. আবদুর রহিম

সাধারণ সম্পাদক

৫. জিল্লুর রহমান

সম্পাদকমণ্ডলী

৬. মো. আবদুর রাজ্জাক – সাংগঠনিক সম্পাদক

৭. সরদার আমজাদ হোসেন – প্রচার সম্পাদক

৮ মুস্তাফা সারোয়ার – সমাজকল্যাণ সম্পাদক

৯. আনোয়ার চৌধুরী – দফতর সম্পাদক

১০. আবদুর রউফ – কৃষি সম্পাদক

১১. রুহুল আমীন ভূঁইয়া – শ্রম সম্পাদক

১২. মিসেস সাজেদা চৌধুরী – মহিলা সম্পাদিকা

১৩. আবদুল মোমিন – কোষাধ্যক্ষ

সদস্য

১৪. সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৫ তাজউদ্দিন আহমদ ১৬. মনসুর আলী ১৭. খোন্দকার মুশতাক আহমদ ১৮ এএইচএম কামারুজ্জামান ১৯. অধ্যাপক ইউসুফ আলী ২০. শ্রী ফণীভূষণ মজুমদার ২১. জহুর আহমদ চৌধুরী ২২. দেওয়ান ফরিদ গাজী ২৩, রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া ২৪. শামসুদ্দিন আহমদ মোল্লা ২৫ রওশন আলী ২৬, গাজী গোলাম মুস্তাফা ২৭. মঈজুদ্দিন আহমদ ২৮ নূরুল হক ২৯. একে মুজিবর রহমান ৩১. নূরুল ইসলাম মঞ্জু ৩২. সালাহউদ্দিন ইউসুফ ৩৩. আবদুল মোমিন তালুকদার ৩৪. আবুল কাসেম ৩৫ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ৩৬. কেএম ওবায়দুর রহমান ৩৭. আজিজুর রহমান আক্কাস ৩৮ আবদুল হান্নান ৩৯. শেখ ফজলুল হক মণি ৪০. লুৎফর রহমান (রংপুর)৪১. আবদুল মান্নান (শ্রমিক লীগ) ৪২. তোফায়েল আহমদ ৪৩. শামসুর রহমান খান ৪৪. ডা. ক্ষিতীশ চন্দ্র ৪৫. রাফিয়া আখতার গুলি।”

 

মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন
মুক্তিযুদ্ধোত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার ও জাতীয় পুনর্গঠন

 

১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ রাষ্ট্রপতি ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আইন’ জারি করেন। ১৯৭০-৭১ এর নির্বাচনে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত ৪৬৯ সদস্যের মধ্যে ৪০৩ জনকে নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। ১০ এপ্রিল গণপরিষদের অধিবেশন বসে। ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটি ১০ জুন ‘৭২ সংবিধানের প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন করে। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভে গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে সংবিধান কার্যকর হয়। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবান ও সমাজতন্ত্র- এই চার স্তম্ভকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সংবিধানের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

বাংলাদেশের ১৪টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ১১টি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীগণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১টি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় নির্বাচন স্থগিত থাকে। ১৪টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ২৮৯টি আসনে ১০৭৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ৩০০টির মধ্যে ২৯৩টি আসন এবং ৭৩.১৭ শতাংশ ভোট লাভ করে। নির্বাচনে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট লাভ করে।

 

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু এর দীর্ঘ নীতি-নির্ধারণী ভাষণ দেন। এই কাউন্সিলেই এএইচএম কামারুজ্জামানকে আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ দলের কর্মকর্তা পদে থাকতে পারবেন না বিধায় বঙ্গবন্ধু সভাপতি পদ ত্যাগ করেন। সৃষ্টি হয় গণতন্ত্র চর্চায় নতুন ঐতিহ্য। ১৯৭৪ সালের কাউন্সিলে নিম্নলিখিত কমিটি নির্বাচিত হয়-

সভাপতি

– এএইচএম কামারুজ্জামান

সহ-সভাপতি

– মহিউদ্দীন আহমদ

ডা. আসহাবুল হক

রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া

সাধারণ সম্পাদক

– সরদার আমজাদ হোসেন

সাংগঠনিক সম্পাদক 

– জিল্লুর রহমান

প্রচার সম্পাদক

– আবদুর রাজ্জাক

দফতর সম্পাদক

– আনওয়ার চৌধুরী

শ্রম সম্পাদক

– কাজী মোজাম্মেল হক

কৃষি সম্পাদক

– রহমত আলী

সংস্কৃতি সম্পাদক

– মোস্তফা সারওয়ার

সমাজকল্যাণ সম্পাদক

– শেখ শহীদুল ইসলাম

কোষাধ্যক্ষ

-হামিদুর রহমান

মহিলা সম্পাদিকা

– বেগম সাজেদা চৌধুরী

(অসম্পূর্ণ)

Leave a Comment