আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –যুক্তফ্রন্ট গঠনের ইতিহাস। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
যুক্তফ্রন্ট গঠনের ইতিহাস

বন্ধুগণ! এই প্রসঙ্গে একটি কথা আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে না দিলে অত্যন্ত ভুল করা হবে। এটা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, জনাব ফজলুল হক পাকিস্তান সংগ্রামে আমাদের পাশে থেকে কোন দিন সাহায্য তো করেনই নি বরং পাকিস্তানের দাবীকে বানচাল করবার জন্যে, যে শক্তি দুর্জ্জয় বিক্রমে আমাদেরকে বাধা দিতেছিল তাদেরকে তিনি সর্বাতোভাবে |সর্বতোভাবে] সহায়তা করেছিলেন।
আমাদের তদানীন্তন রাজনৈতিক শত্রুদের হাতের ক্রীড়ণক রূপে তিনি কাজ করেছিলেন। শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও যখন দশকোটি লোকের চির আকাঙ্খিত পাকিস্তান বাস্তবে রূপায়িত হলো এবং এর ভিত্তিতে ভারত বিভাগ হয়ে দুটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হল, তখন তিনি পাকিস্তানের শাসকবৃন্দ কর্তৃক নূতনভাবে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান মুসলিম লীগের একজন সভ্য শ্রেণীভূক্ত হলেন।
কায়েদে আজমের মৃত্যুর পর পূর্ববাংলার তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাতারাতি পাকিস্তানের বড়লাট পদে অধিষ্ঠিত হলেন এবং নমিনেশন যোগে নুরুল আমীণ সাহেবকে পূর্ব বাংলার প্রধান মন্ত্রীত্বের গদীতে বসানো হলো। পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রীত্বের গদিকে নিষ্কণ্টক করবার জন্যে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের তদণীন্তন সদস্য জনাব ফজলুল হককে পূর্ববাংলা সরকারের এডভোকেট জেনারেলের চাকরী দিয়ে তাহার পরিষদ সদস্যপদের ইস্তেফাপত্র (ইস্তফাপত্র গ্রহণ করা হল।
তার পর হতেই জনাব ফজলুল হক সুদীর্ঘকাল মুসলিম লীগ কর্তৃক নিযুক্ত এডভোকেট জেনারেল হিসেবে অত্যাচারী মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক প্রতিটি অত্যাচার ও অন্যায়কে সমর্থণ দিতে গিয়ে আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের প্রতি অন্যায় গ্রেফতারাদেশ হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস মামলায় ন্যায় ও আইনত বলে প্রমাণ করবার কোশেশ করেছেন।
এরূপে পরোক্ষভাবে তিনি নির্বাচনের পূর্বে তাহার পদত্যাগ পর্যন্ত জুলুম শাহীর প্রতিটি কার্যকে আইনের গণ্ডীর ভিতর দিয়ে সমর্থন জুগিয়েছেন। যখন মুসলিম লীগ সরকার গণদাবীর চাপে পূর্ববঙ্গ আইন সভার নির্বাচন ঘোষণা করলো তখন তিনি এডভোকেট জেনারেলের চাকুরী ছেড়ে রাতারাতি দেশপ্রেমিক বনে, তদাণীন্তন মুসলিমলীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃত্তি দিতে শুরু করলেন। সরলপ্রাণ
জনসাধারণ হক সাহেবের এই রাজনৈতিক চাতুর্য্যাপূর্ণ বিবৃতি দেখে ও শুনে কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। ফল দাঁড়ালো এই যে তিনি যেখানেই সভা করতেন সেখানেই বিপুল জসনসমাবেশ | জনসমাবেশ] হ’ত। এর কারণ স্বরূপ একথা বলা যায় যে সুদীর্ঘ এগার বছর পরে তিনি যখন রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হলেন এবং সস্তা জনপ্রিয় বুলি আওড়াতে সুরু করলেন তখন জনসাধারণ ভেবে নিল যে তিনি তার এই জীবন সায়াহ্নে জনগণের খেদমত করতে করতে জীবনের বাকী কটি দিন বোধ হয় কাটিয়ে দিতে চান।
হক সাহেবের সস্তা জনপ্রিয় উক্তি সমূহের জন্যে তাকে সর্ববৃহৎ ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন মনে করে জনগণ হক-ভাসানীর মিলন দাবী জানালো।কারণ জনগণ ভেবেছিল যে এই মিলনেই বোধ হয় জনগণের মুক্তি নিহিত। এমনি যখন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ তখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে হক সাহেবের যে সামান্য সাঙ্গ পাঙ্গ তারই সঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল তারা এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের যে সমস্ত সদস্য এই দেশের প্রত্যেকটি গণদাবী ও গণ আন্দোলনকে বানচাল করবার জন্য মুসলিম লীগ সরকারের দমননীতিতে সক্রীয় অংশ গ্রহণ করেছিল ।
অথচ রুটি গোস্তের বখরা নিয়ে গোলমাল হওয়ার ফলে নুরুল আমীণ প্রভাবিত মুসলিম লীগ কর্তৃক বহিষ্কৃত হয়েছিল তারা সুযোগ বুঝে জনাব হকের চারি পাশে জড়ো হোতে লাগল । চাঁদপুরে আওয়ামী লীগ কর্তৃক আহূত জনসভায় এবং ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় নিজে আওয়ামী লীগে যোগদান করার অভিপ্রায় জানিয়ে জনগণকে দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগদানের আহ্বান জানান সত্তেও [সত্ত্বেও এই সব সাঙ্গ পাঙ্গদের ঘোরাফেরার ফলে উৎফুল্ল হয়ে জনাব হক নিজেই নূতন পার্টি গঠণ করবার কথা চিন্তা করতে লাগলেন।
বড়ই পরিতাপের বিষয়, আমাদের আওয়ামী লীগের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক ক্ষমতা লোভের বশবর্তী হয়ে একথাই চিন্তা করতে লাগল যে যদি জনাব হকের দ্বারা একটি নূতন প্রতিষ্ঠান গঠণ করান যায় এবং জনাব হকের চারি পাশে ঘোরা ঘুরি করে তার প্রিয়ভাজন হওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
তারা ভেবেছিল হক সাহেব যদি নতুন পার্টি গঠণ করেন তাহলে আওয়ামী লীগ ও হক সাহেবের পার্টি মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হবে, কারণ জনগণ হক ভাষাণীর মিলন চায়। অতএব নির্বাচনে যদি এই যুক্তফ্রন্ট দলের জয় হয় তাহলে হক সাহেবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খুবই সম্ভাবনা থাকবে, কারণ আওয়ামী লীগের নেতৃবন্দ মন্ত্রীত্ব লোভী নন। সেই অবস্থায় আওয়ামী লীগের উপরোক্ত ব্যক্তিদের একটি ভবিষ্যৎ হিল্লা হতে পারে, কারণ তারা হক সাহেবের প্রিয়পাত্র।
নিজ প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের মারফতেও যে উক্ত ব্যাক্তিদের হিল্লা হোতে পারে একথা তারা চিন্তা করতে সাহস করেনি কারণ তারা নামেই শুধু আওয়ামী লীগের সদস্য ছিল। কস্মিন কালেও তারা আওয়ামী লীগকে জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবার কোন চেষ্টাই করেনি বরং আওয়ামী লীগ কর্তৃক পরিচালিত প্রত্যেকটি গণ আন্দোলন থেকে তারা জেল জুলুমের ভয়ে দূরে থাকত।
তবুও তারা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়ে ছিল কারণ মুসলিম লীগের নিকট তারা কখনও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এরাই হক সাহেবের বাড়ীতে ঘুরা ফেরা করে একটা নূতন পার্টি গঠণ করবার জন্য প্রেরণা যোগাতে লাগল, ফল দাঁড়াল এই যে, হক সাহেব রাতারাতি পাকিস্তান কৃষক শ্রমিক পার্টি নামে এক রাজনৈতিক দল গঠণ করলেন। এসব সত্ত্বেও জনগণের দুর্বার ইচ্ছা ছিল হক ভাষাণীর মিলন প্রতিষ্ঠা করা। তাই ২১ দফা সম্বলিত গণদাবীর এক সনদের স্বীকৃতির ভিত্তিতে হক-ভাষাণীর মিলনের মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হোল।

এরপর এই যুক্তফ্রন্টের মধ্যে আরও কয়েকটি সদ্যগঠিত মুসলিম লীগ বিরোধী বলে কথিত রাজনৈতিক দলকে গ্রহণ করা হোল। ফলে জনগণ কর্তৃক ধিকৃত ও অবাঞ্ছিত কতিপয় লোক হক সাহেবের নিজস্ব পার্টির মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টে প্রবেশ করল কিন্তু এসব জেনে শুনেও তাদেরকে যুক্তফ্রন্টে গ্রহণ করতে হয়েছিল কারণ তাদের ছাড়া হক সাহেব যুক্তফ্রন্ট করতে রাজী ছিলেন না। কাজেই নির্বাচনের পূর্বে যে সমস্ত পার্টি রাতারাতি গজিয়ে উঠল তাদেরকে সমমর্যাদা দান করে সাত বছরের সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান আওয়ামী মুসলিম লীগ জনতার দাবী যুক্তফ্রন্ট বাস্তবে রূপায়িত করল।
কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে জনাব হক এই যুক্তফ্রন্ট গঠণ করবার পর কাহারো সঙ্গে পরামর্শ না করে গোপণে নিজামে ইসলাম কর্তৃক রচিত দশদফা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। নেজামে ইসলাম পার্টিভূক্ত বর্তমাণ যুক্তফ্রন্ট কর্তৃক মণোণীত পাকিস্তান গণপরিষদের জনৈক সদস্যের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে উল্লিখিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একথা আমাদের জানা ছিল না। উক্ত চুক্তির শর্তাবলী কাগজে প্রকাশিত হওয়ায় দেখা গেছে যে উহার কয়েকটি ধারা হক-ভাসাণীর নেতৃত্বে রচিত যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা ওয়াদার পরিপন্থী।
