১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

Table of Contents

১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের

 সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবাবলী

 

১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব

 

গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র

|পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও প্রতিনিধি সম্মেলনে গৃহীত| এক প্রস্তাবে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের দাবী জানানো হয়। ইহাতে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পার্লামেন্ট ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের প্রাধান্য ঘোষণা এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণকে সরাসরি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষমতা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তাদান এবং নিম্নলিখিত নীতিসমূহ সন্নিবেশিত করার জন্য দাবী করা হয় :

ক) পাকিস্তানের দুই অংশের সমান উন্নয়ন, এবং দুই অংশের মধ্যে বিরাট অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন। খ) সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে পূর্ব পাকিস্তানের দেশরক্ষা ক্ষমতা এমনভাবে গড়িয়া তুলিতে হইবে যাহাতে ইহা সৈন্যবল ও সরঞ্জামের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল হইতে পারে।

গ) ফেডারেল ধরনের পার্লামেন্টারী সরকার ব্যবস্থা।

ঘ) সংবাদপত্র ও সংগঠনের মারফত জনমত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা সহ জনগণকে রাজনৈতিক দল গঠন সংগঠনের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা দান।

ঙ) বেআইনীভাবে গ্রেফতার ও বিনা বিচারে আটক রাখা হইতে অব্যাহতিদান এবং মৌলিক অধিকারকে বিচার বিভাগের এখতিয়ারে আনয়ন।

 চ) বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ হইতে পৃথকীকরণ।

সার্বজনীন ভোটাধিকার

সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় পার্লামেন্ট ও প্রাদেশিক আইন পরিষদে প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি নির্বাচনের মৌলিক ও প্রাথমিক অধিকার হইতে জাতিকে বঞ্চিত রাখার জন্য বর্তমান সরকারের চেষ্টায় উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াসম্মেলনে অপর এক প্রস্তাব গৃহীত হয়। সম্মেলনে অবিলম্বে জাতীয়, প্রাদেশিক আইন পরিষদ ও অন্যান্য নির্বাচনমূলক সংস্থায় প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তন ও আশু নির্বাচনেও তাহা গ্রহণের জন্য দাবী জানানো হয়।

 

রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি

সম্মেলনে অবিলম্বে সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি, জামাতে ইসলামীর উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক কর্মীদের উপর জারিকৃত গ্রেফতারী পরোয়ানা বাতিল ও তাহাদের বাজেয়াফত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ, জাতীয় সংবাদপত্রের উপর আরোপিত সকল বিধিনিষেধ অপসারণ, প্রেস এন্ড পাবলিকেশন অর্ডিন্যান্স, নিরাপত্তা আইন, সীমান্ত অপরাধ দমন বিধি, রাজনৈতিক দল আইন, এবডো ও প্রোডো অর্ডিন্যান্স ও অন্যান্য বিধিনিষেধমূলক আইন রহিতের জন্য দাবী করা হইয়াছে ।

কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ সংগ্রাম

সম্মেলনে ভারতীয় উপনিবেশবাদের সশস্ত্রশক্তির বিরুদ্ধে অধিকৃত কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের জন্য সংগ্রামরত জনগণের দুর্দশায় উদ্বেগ ও সহানুভূতি প্রকাশ করা হয় এবং নিরপেক্ষ গণভোটের মারফত অবিলম্বে তাহাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার মানিয়া নেওয়ার জন্য দাবী জানানো হয়।সম্মেলনে জাতিসংঘ সংস্থার অনিশ্চিত ও অকার্যকরী ভূমিকায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় –ং নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতকে ইহার প্রতিশ্রুতি পালন করিতে বাধ্য করানোর জন্য উক্ত সংস্থার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। সম্মেলনে অধিকৃত এলাকার বীর কাশ্মীরীদের আজাদী সংগ্রামের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানানো হয়।

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামার নিন্দা

অপর কতিপয় প্রস্তাবে ভারত সরকার কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্য হইতে সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের জোরপূর্বক বহিষ্কারের তীব্র নিন্দা করা হয়। ভারতের মুসলমান নাগরিকদের উপর বর্বর হামলা বন্ধ করার ব্যাপারে ভারতকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রতিবাদ আপন ও বিশ্বের স্বাধীনতাকামী সকল রাষ্ট্রের দৃষ্টি বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য পাকিস্তান সরকারের নিকট সম্মেলনের পক্ষ হইতে আহ্বান জানানো হয়।

প্রস্তাবে ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তীব্র নিন্দা করা হয় এবং উভয় দেশের বিপন্ন সংখ্যালঘুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবী জানানো হয়। আওয়ামী লীগ সম্মেলন ভারত সরকারের নিকট পাকিস্তানে আশ্রিত দাঙ্গা-বিধ্বস্ত ভারতীয় মুসলমানদের স্ব-স্ব ভিটায় পুনর্বাসন এবং তাহাদের ক্ষতিপূরণ করার জন্য দাবী জানায়। কিন্তু যে সকল উদ্বাস্তুর পক্ষে ভারতে ফিরিয়া যাওয়া সম্ভব হইবে না পাকিস্তানে তাহাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য সম্মেলন পাকিস্তান সরকারের নিকট দাবী জানায়।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সম্মেলন ভারতের হাঙ্গামার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্তদের কঠোর হস্তে দমন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নিকট দাবী জানায় । সম্মেলন পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করে এবং ভারতের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হইয়া দেশত্যাগী না হওয়ার জন্য তাহাদের প্রতি আহ্বান জানায় ।

সালিসী আদালত

অপর এক প্রস্তাবে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সম্মেলন এইরূপ দৃঢ় অভিমত পোষণ করে যে, সালিসী আদালত অর্ডিন্যান্স শাসন বিভাগ হইতে বিচার বিভাগকে পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী। সম্মেলন আরও মনে করে যে, আইন ও আইনানুগ বিধান সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিফহাল নহে, এমন ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হইতে থাকায় সালিসী আদালতসমূহ গ্রাম্যরাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ায় সুবিচার ব্যাহত হইতেছে। কাজেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ও প্রতিনিধি সম্মেলন অবিলম্বে সালিসী আদালত অর্ডিন্যান্স রদ করার দাবী জানাইতেছে।

দল পুনরুজ্জীবন ও ‘এন.ডি.এফ.’

সম্মেলনে গৃহীত অপর এক প্রস্তাবে বলা হয় যে, পূর্ণ গণতন্ত্র এবং মৌলিক অধিকারসমূহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার সার্বজনীন দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে সচেতন জনমত সংগঠন ও গণদাবী প্রকাশের মাধ্যম রূপে কাজ করার জন্য সংগঠিত রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন রহিয়াছে, ইহাই আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর ও প্রতিনিধিদের সুচিন্তিত অভিমত। তদুপরি, সম্মেলন মনে করে যে, দল পুনরুজ্জীবন বিরোধী নীতির ভিত্তিতে যে এন.ডি.এফ. গঠিত হইয়াছিল, প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ফলে তাহার প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র লুপ্ত হইয়াছে এবং এন.ডি.এফ. এখন নিরর্থক হইয়া

পড়িয়াছে। আওয়ামী লীগ সম্মেলন বিশ্বাস করে যে, গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ আদায় করার জন্য সমবেত প্রচেষ্টা প্রয়োজন; কাজেই সম্মেলন পুনরুজ্জীবিত রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা এবং ঐক্যবদ্ধ কর্মপন্থা গ্রহণের ব্যাপারে কার্যকরী পরিষদের সহিত আলোচনাক্রমে সাধারণ সম্পাদককে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করিতেছে। 

 

১৯৬৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাব

 

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দরুন উদ্বেগ প্রকাশ

আওয়ামী লীগ সম্মেলন নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উচ্চ মূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, অত্যধিক ট্যাক্সের বোঝা, ইক্ষুসহ অর্থকরী ফসলের নিম্ন মূল্য প্রভৃতি কারণে জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতির দরুন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সরকারের প্রতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতি বিধান ও কৃষক যাহাতে অর্থকরী ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় তাহার নিশ্চয়তা সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক নীতি পুনর্নির্ধারণ, নগর শুদ্ধসহ মৌলিক গণতন্ত্রের মাধ্যমে প্রবর্তিত সকল নির্যাতনমূলক ট্যাক্স বাতিল, সীমান্তের ৫ মাইল এলাকায় পাট উৎপাদনের উপর হইতে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং পাট চোরাচালান প্রতিরোধকল্পে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানায়। 

(১১) ** একমাত্র সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিই জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি সাধন করিতে সক্ষম বলিয়া ধীরে ধীরে উহা প্রবর্তন,

(১২) অবিলম্বে প্রাইমারী শিক্ষকদের বেতনের স্কেল এবং মাধ্যমিক স্কুল ও বেসরকারী কলেজসমূহের শিক্ষকদের মাগি ভাতা বৃদ্ধি,

(১৩) মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য জীবিকার পথ খোলা,

(১৪) বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের জন্য এক প্রস্তাবে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসন দানের দাবী জানানো হয়। পশ্চিম পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপর আরোপিত বিধি-নিষেধমূলক অর্ডিন্যান্স প্রত্যাহারের জন্যও দাবী জানানো হয়,

(১৫) অবিলম্বে পে কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ ও নিম্ন বেতনভোগী সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ,

(১৬) এক প্রস্তাবে শ্রমিকদের ধর্মঘটের উপর বাধানিষেধ আরোপের প্রতিবাদ ও উহা প্রত্যাহারের দাবী জানানো হয়,

(১৭) সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার সুপারি ও নারিকেল চাষীদের বিনা সুদে দীর্ঘ মেয়াদী ঋণ দান,

(১৮) সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিকল্পনা কার্যকরী করা

(১৯) এক প্রস্তাবে করাচী হইতে ইসলামাবাদে কেন্দ্রীয় রাজধানী সরাইয়া নেওয়ার প্রতিবাদ জানানো হয়। করাচী রাজধানী উন্নয়নের পক্ষে অনুপযুক্ত হইলে সে ক্ষেত্রে ঢাকায় কেন্দ্রীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাবে পুনরায় দাবী জানানো হয়,

২০) জমির উপর স্বত্ত্বের দলিল তৈরীর সময় অনেক ক্ষেত্রে ভুল থাকিয়া যাওয়ায় বহু দরিদ্র লোকের অসুবিধা সৃষ্টি হয় বিধায় দলিলপত্র সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের দাবী জানানো হয়, (২১) উত্তর বঙ্গের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বাহাদুরাবাদের নিকটে যমুনা নদীর উপর পুল বা নদীর মধ্যদিয়া টানেল নির্মাণ,

(২২) উভয় প্রদেশের জন্য পৃথক অর্থনীতির নীতিকে শাসনতান্ত্রিক স্বীকৃতি দান এবং ইহার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ,

(২৩) পাশ্চাত্য কর্তৃক ভারতকে ব্যাপক সামরিক সাহায্য দানের ফলে জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দাদের লইয়া আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত আঞ্চলিক বাহিনী গঠন,

(২৪) দেশ ও বিশ্বশান্তির স্বার্থে স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ,

(২৫) পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক জনাব শামসুল হক নিখোঁজ হওয়ায় এক প্রস্তাবে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয় এবং তাঁহার সন্ধান ও মানসিক চিকিৎসার জন্য কমিটি গঠনের দাবী জানানো হয় ও

(২৬) বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য অবিলম্বে যমুনা নদীর পশ্চিম তীর বরাবর রংপুর হইতে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ।

Leave a Comment