পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচী,৬ জুন,১৯৭০

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচী,৬ জুন,১৯৭০। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

পাকিস্তান আওয়ামী লীগের

কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচী,৬ জুন,১৯৭০

 

পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচী,৬ জুন,১৯৭০

 

একচেটিয়া পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জমিদারী, জায়গীরদারী, সরদারীর বিলোপ সাধন করিয়া গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে দেশব্যাপী সাম্যবাদী অর্থনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় সমুন্নত করার কল্যাণময় প্রতিশ্রুতি বিধৃত করিয়া নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ গতকাল (শনিবার) উহার কর্মসূচী ঘোষণা করে। ঢাকার ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রথম জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় কর্মসূচী অনুমোদিত হয়।

কোটি কোটি মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষকে পরিপুষ্ট করার সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিত্যাগ করিয়া আওয়ামী লীগ ন্যায়পরায়ণতার আলোকে মানুষে মানুষে এবং অঞ্চলে অঞ্চলে সাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নয়া শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও সমাজব্যবস্থা কায়েম করিয়া গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির মাধ্যমে দেশে বিপ্লব সাধনই উক্ত কর্মসূচীর লক্ষ্য বলিয়া ভূমিকায় উল্লেখ করা হইয়াছে।

উক্ত কর্মসূচী মতে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অধিকার ফেডারেশনের ইউনিটগুলির মধ্যে বন্টন করিয়া দেওয়া হইবে। এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধুমাত্র দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি থাকিবে। মুদ্রা ব্যবস্থাও ফেডারেল সরকারের হাতে থাকিতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের শর্ত হইল : দুই অঞ্চলের মধ্যে অবাধে বিনিময়যোগ্য দুইটি পৃথক মুদ্রা থাকিবে বিকল্পে একটি মুদ্রাও থাকিতে পারিবে, তবে শেষোক্ত ক্ষেত্রে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যবস্থা থাকিতে হইবে এবং এই ব্যবস্থাধীনে উভয় অঞ্চলে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থাকিবে যাহারা দেশের এক অঞ্চল হইতে অপর অঞ্চলে সম্পদ বা মূলধন স্থানান্তর বা পাচার বন্ধ করার ব্যবস্থাদি উদ্ভাবন করিবে।

অর্থ সংক্রান্ত নীতির (Fiscal Policy) সার্বিক দায়িত্ব ফেডারেশনের অঙ্গ ইউনিটসমূহের হাতে থাকিবে। শাসনতান্ত্রিক বিধান বলে ফেডারেল সরকার সামরিক বাহিনী ও পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্ব পালনের ব্যয় নির্বাহের জন্য স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ইউনিটসমূহের আয় হইতে প্রয়োজনীয় অর্থ ফেডারেল সরকারের তহবিলে জমা হওয়ার বিধান থাকিবে । শাসনতন্ত্রে নির্দেশিত পদ্ধতিতে হারাহারি মতে এই অর্থ কেন্দ্রীয় তহবিলে যাইবে। ইউনিটসমূহের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব রাখার ব্যবস্থা থাকিবে।

ফেডারেল সরকারের প্রয়োজনীয় বিদেশী মুদ্রা শাসনতান্ত্রিক বিধান মতে সাব্যস্ত হইবে। বিদেশী বাণিজ্য ও সাহায্যের ব্যাপারে দেশের বৈদেশিক নীতির আওতাধীনে আঞ্চলিক সরকারসমূহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবেন। ফেডারেশনের ইউনিটসমূহ জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সক্রিয় ও কার্যকর সহযোগিতা দানের জন্য মিলিশিয়া বা প্যারামিলিটারী বাহিনী গঠনের অধিকারী হইবে। পাকিস্তান নৌবাহিনীর সদর দফতর ও ট্রেনিং সংস্থাসমূহ করাচী হইতে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হইবে।

 

দলীয় কর্মসূচীতে ঘোষণা করা হইয়াছে যে, দেশে ‘প্রাণবন্ত গণতন্ত্র’ কায়েমের মাধ্যমে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হইবে এবং এমন সমাজব্যবস্থা কায়েম করা হইবে যেখানে ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্যবাদ হইবে বিঘোষিত ও আচরিত নীতি। কোরান ও সুন্নার নির্দেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানে যাতে কোন আইন পাস না হইতে পারে, তজ্জন্য আওয়ামী লীগ শাসনতান্ত্রিক বিধান রাখার কথাও দলীয় কর্মসূচীতে ঘোষণা করে।

শাসনতন্ত্রের মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের পবিত্রতা রক্ষার গ্যারান্টি দেওয়া হইবে এবং সকল পর্যায়ে ধর্মীয় শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হইবে। আইনের দৃষ্টিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সমমর্যাদার অধিকারী বিবেচিত হইবে এবং আইনের দ্বারা সমানভাবে তাদের নিরাপত্তাবিধান করা হইবে। সংখ্যালঘুদের নিজ নিজ ধর্ম আচরণ, প্রচার ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পূর্ণ স্বাধীনতা  থাকিবে। নিজ নিজ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষা করার ব্যাপারেও তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকিবে।

জীবনের মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়াদি প্রতিজন নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করিবে। খাদ্য, বস্ত্র, আবাস, শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং কর্মের সুযোগ সৃষ্টি করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলিয়া বিবেচিত হইবে। আইনের চোখে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক সমান বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমুন্নত রাখার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হইবে।

পশ্চিম পাকিস্তানে জির্গা প্রথা বিলোপ এবং বৈষম্যমূলক উপজাতীয় সকল আইনকানুন বাতিল করা হইবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও জন্মেতিহাস নির্বিশেষে সকল মানুষ পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হইবে। মানুষের সার্বিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার শাসনতান্ত্রিক বিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হইবে। বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সভাসমিতি সংগঠনের স্বাধীনতা, গতায়তের স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা, তামাদি অপরাধের জন্য শাস্তি দান হইতে রক্ষা এবং সর্বোপরি নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটক রাখার বিরুদ্ধে শাসনতান্ত্রিক নিরাপত্তাবিধান করা হইবে।

অস্পৃশ্যতা, ক্রীতদাসত্ব ও জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়ের ব্যবস্থা আইনতঃ নিষিদ্ধ করা হইবে। বিশ্বমানবিক অধিকারের ঘোষণাপত্রে নির্দেশিত সকল মানবিক অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য সু-নিশ্চিত করা হইবে। যুদ্ধের সময় “সত্যিকারের আক্রমণকাল” ছাড়া কোন সময়ই যাতে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা না যায়, সেজন্য শাসনতান্ত্রিক নিশ্চয়তাবিধান করা হইবে। “জাতীয় জরুরী অবস্থার” অজুহাতে নাগরিক সাধারণের মৌলিক অধিকার হরণ করা চলিবে না।

আওয়ামী লীগ প্রশাসন বিভাগ হইতে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ ভাবে পৃথক করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিয়াছে।বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা শাসনতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করা হইবে। পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশন ঘোষণা করা হইবে এবং ৬-দফার ভিত্তিতে ফেডারেশনের সকল ইউনিটকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হইবে। দেশের সরকার হইবে ফেডারেল পার্লামেন্টারী পদ্ধতির। ফেডারেল আইনসভা ও ইউনিটসমূহের বিধান, পরিষদের নির্বাচন বিশ্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হইবে। ফেডারেল আইনসভায় জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বের বিধান থাকিবে।

 

পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত কর্মসূচী,৬ জুন,১৯৭০

 

ঔপনিবেশিক সরকারের প্রতিভূ সরকারী প্রশাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করিয়া গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষিতে প্রশাসন ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করা হইবে। বর্তমান নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস বিলোপ করা হইবে। ফেডারেশনের আয়ত্তাধীন বিষয়সমূহের জন্য ফেডারেল সার্ভিস গঠন করা হইবে এবং পাকিস্তানের সকল অংশ হইতে লোকসংখ্যার ভিত্তিতে এই সার্ভিসে লোক নিয়োগ করা হইবে।

ইউনিট সরকারগুলির নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের বৃত্তিগত সার্ভিস চালু করা হইবে। তাহাদের জন্য মেধা ও কর্মক্ষমতার উপর ভিত্তিশীল নুতন সার্ভিস রুল করা হইবে। জেলা পর্যায়ের শাসনব্যবস্থা নির্বাচিত পরিষদের উপর ন্যস্ত হইবে। মহকুমাসমূহকে জেলায় রূপান্তরিত করা হইবে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দমনের জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা করা হইবে।

Leave a Comment