সীমাহীন সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –সীমাহীন সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

সীমাহীন সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ

 

সীমাহীন সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ

 

আওয়ামী লীগের সেই সংগ্রামী পতাকাবাহীর দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই আমি এবং আমার সহকর্মীবৃন্দ এক বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলাম । একদিকে জাতীয় স্বাধীনতার শত্রুদের মোকাবিলা করে স্বাধীনতাকে অর্থবহরূপ দিয়ে নব- পর্যায়ের উত্তরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে রাজনৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর সরকারের সাথে সমন্বয় সাধন করে জাতীয় সমস্যার মোকাবিলা করা।সমগ্র জাতির সাথে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ইতিহাসের নজীরবিহীন সমস্যা আমাদের যাত্রাপথ অক্টোপাশের মত ঘিরে ফেলেছে।

কোটি কোটি ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, ধ্বংসকৃত নগর-বন্দর-পোতাশ্রয়ের পুনর্নির্মাণ, শিল্প, কারখানাগুলিকে উৎপাদনযোগ্য করণ- ক্রমাগত অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এবং যুদ্ধাবস্থায় নিষ্কর্মা কৃষকের ফেলে রাখা লক্ষ কোটি একর অনাবাদী জমিকে চাষাবাদ যোগ্যকরণ- অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের যোগান দেওয়া বিশেষ করে বিশ্বের ঘাটতি খাদ্যের বাজার হতে বরাবরের লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণ করা, প্রতিটি সমস্যাই আশু সমাধানের দাবীদার।

অন্যদিকে স্বাধীনতাত্তোর সমস্যার সুযোগ নিয়ে কালোবাজারী, মুনাফাখোর, মজুতদার, অসাধু ব্যবসায়ী প্রভৃতি সমাজের দুষ্ট কীট চাংগা হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক স্ফীতি ঘটিয়ে বাংলার গণজীবনকে এক চরমতম দুর্বিসহ যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষেপ করলো। আমাদের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা জটিল থেৱে জটিলতর হলো। তাই মুক্তি আন্দোলনের সময় আমাদের সমাজে যে আবেগ আশা ও আকাঙ্ক্ষার মিনার গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পর পরই সমস্যার প্রকটতায় তা দারুণভাবে আহত হলো। ফলে সমাজ জীবনে খানিকটা হতাশার সৃষ্টি হলো।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান যার ইতিহাস সুদীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত। সেই নেতার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অগ্রাভিযান যিনি সারা জীবন প্রতিকূলতার সাথে সংগ্রাম করার জন্য তাঁর সংগঠনের কর্মীদের ট্রেনিং দিয়েছেন। সংগ্রামের উত্তাল তরঙ্গ মালার সঠিক লক্ষ্য পথে বাধার পাহাড় ভেঙ্গে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমেই এর বিকাশ ও অগ্রগতি। আর প্রতিকূলতার সঙ্গে এ সংগ্রামে বাংলার জনগণ দিয়েছে আওয়ামী লীগকে সকল পর্যায়ে অকুণ্ঠ সমর্থন।

 

তাই সেদিন সমস্যার ভয়াবহ বিপুলতা আমাদের বিচলিত করেছে কিন্তু হতাশ করেনি। আমরা বাংলার সংগ্রামী জনতার ঐক্যবদ্ধ কর্মশক্তিতে সর্বক্ষণই আস্থাবান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং আওয়ামী লীগের ত্যাগী কর্মীদের নিষ্ঠা ও সাধনার অনুশীলনে বুকভরা আস্থা নিয়ে এ বন্ধুর পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এ দুরূহ সমস্যার সমাধানের পথে কামনা করেছিলাম বাংলার জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা।

গত কাউন্সিল অধিবেশনে আলোচনার আলোকে এবং আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত পথ ধরে আমরা কাজ শুরু করি। সে দিনের সমস্যাসঙ্কুল দেশে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা চলছিল পাশাপাশি। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আমাদের বরাবরের বিরোধী ভূমিকার গতি পরিবর্তন করে জাতীয় গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে দেশগড়ার কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করার দায়িত্ব এলো। প্রাক-স্বাধীনতা আমলের সামাজিক জঞ্জালমুক্ত করে সঠিক বক্তব্যের মাধ্যমে একটি সদ্যমুক্ত জাতিকে ইতিহাসের নবতর পর্যায়ে সার্থক উত্তরণে সহায়তা আমাদের রাজনৈতিক কর্তব্য ছিল । সেদিন দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই লক্ষ্য করেছিলাম সারাদেশে সংগঠনের কর্মীরা এক চরম অবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর হানাদার বাহিনী সুপরিকল্পিতভাবে যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে তাতে কর্মীরা হয়ে পড়ে নিঃস্ব। হানাদার বাহিনীর সমগ্র আক্রোশ পড়েছিল আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর। কারণ তারা স্বাধীনতা আন্দোলনে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রামে গ্রামে সংগঠন গড়ে তুলেছিল । তাই সামরিক জান্তার বিশেষ নির্দেশ ছিল “আওয়ামী লীগ কর্মীদের ঘর-বাড়ী জ্বালাও-তাদের পুরুষদের হত্যা কর এবং নারীদের ধর্ষণ কর”।

তারা বাংলার ৬৫ হাজার গ্রামে খুঁজে খুঁজে বের ক’রে আওয়ামী লীগ কর্মীদের হত্যা করেছে- হত্যা করে তারা ১৭ হাজার আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মীদের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে দেয় এবং সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বহু নেতা এবং কর্মী হানাদার বাহিনী কর্তৃক নৃশংসভাবে নিহত হয়। এমতাবস্থায় কর্মীদের আদর্শ ভিত্তিক বক্তব্যের মাধ্যমে জাতি গঠনের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বস্বহারা, প্রিয়জন হারানোর বিয়োগ ব্যথায় ঝিমিয়ে পড়া কর্মীদের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করে নূতন উদ্যমে সংগঠনের কাজে নিয়োগ করানোকে আমাদের প্রাথমিক দায়িত্ব বলে ধরে নিয়েছিলাম।

সে প্রেরণা হলো বাংলার চিরকালের শোষিত, বঞ্চিত মানুষের আশা, আকাংখার নিরিখে বাংগালী জাতির স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতাত্তোর নীতি-নির্দেশনা। সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসকরা আমাদের সমাজ ও জীবনকে যে পঙ্কিলতার আবর্তে নিক্ষেপ করেছিল সেখান থেকে ইতিহাসের নবতম অধ্যায়ে উত্তরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা উদ্ভূত এ নির্দেশনা আমরা মাথা পেতে গ্রহণ করেছিলাম।

 

সীমাহীন সমস্যার মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ

 

জাতির সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে চরম পরীক্ষায় পরীক্ষিত নেতার জীবন-দর্শন এক মহামূল্যবান পাথেয়। মহান নেতা: নীতি-নির্দেশকে সেদিন আওয়ামী সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা মুজিববাদ। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে জাতীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হয়। একদিকে হঠকারী রাজনীতিকদের উদ্দেশ্যহীন বক্তব্য আর অন্যদিকে আমরা দিলাম বাস্তবতার ভিত্তিতে রচিত একটি সঠিক জাতীয় জীবন-দর্শন, যার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা সুসংহত করা এবং বাংলার মানুষের প্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত এবং সুদৃঢ় করার সংগ্রাম শুরু করি।

Leave a Comment