নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ

 

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ

 

শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অল্পকাল পরই তদানীন্তন গণপরিষদ সদস্যদের কার্যকাল শেষ হবার পূর্বেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করেছিলাম। কারণ-

(ক) গণ-পরিষদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্বের পর পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এবং গণতান্ত্রিক নিয়মে নির্বাচনে যেতে হয়। (

খ) জাতীয় স্বাধীনতার শত্রু, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্রীড়নক গণধিকৃত শক্তি গুপ্তহত্যা, অরাজকতার মাধ্যমে একথা প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা পাচ্ছিল যে আমাদের সরকারের পেছনে জনসমর্থন নাই।

তাই এ চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করেছিলাম। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহ সংসদে ১১-১-৭৩ তারিখের বৈঠকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের সার্বভৌম পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য এবং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে কাজ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় কয়েকটি নির্বাচনী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিগুলো হলো-

(১) পার্লামেন্টারী বোর্ড;

(২) নির্বাচনী মেনিফেস্টো সাব-কমিটি;

(৩) নির্বাচনী প্রচার সাব-কমিটি

২১শে জানুয়ারীর (১৯৭৩) মধ্যে আবেদনপত্র গ্রহণের শেষ তারিখ ঘোষিত হয়। ২৩, ২৪, ২৫, ২৬শে জানুয়ারী তারিখে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে একটি নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড গঠিত হয়। আমার নেতৃত্বে গঠিত এ বোর্ডের অন্যান্য সদস্য ছিলেন জনাব মুস্তফা সারওয়ার, বরিশালের প্রাক্তন পরিষদ সদস্য জনাব নূরুল ইসলাম, জনাব মোশাররফ হোসেন, জনাব আশরাফউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।

এমনি করে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কর্মসূচী সুশৃংখলভাবে পরিচালিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশের মোট তিন’শ টি সিটে আমরা প্রার্থী দাঁড় করাই। এর মধ্যে আমাদের পূর্ণ নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হবার আগেই আমাদের প্রার্থীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ মোট নয়টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষিত হন। জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার দুরূহ দায়িত্ব আমি ও আমার সহকর্মীরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করে পালন করেছি।

 

সাধারণ নির্বাচনে জাতির পিতার নির্দেশনা প্রতিনিয়ত প্রেরণা দিয়েছে। তাঁর অসুস্থ শরীরে তিনি বাংলার জনগণের সাথে নিবীড় সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সফরে বেরিয়েছিলেন। এবং তাঁর সফরের পর সংগঠনের প্রার্থীদের দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হয়। বাংলার সংগ্রামী জনতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগকে সত্তুর-এর নির্বাচনের মতো তিয়াত্তরের নির্বাচনেও শতকরা ৯৮টি আসনে জয়ী করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, “এ জয় আমার নয়, এ বিজয় বাংলার জনগণের।”

বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ বাংলার সংগ্রামী জনতার কাফেলার পুরোভাগে থেকে সকল সময়েই জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়েছেন। স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতি শত চক্রান্তের মাঝেও সেদিন আওয়ামী লীগের পক্ষে রায় দেয়। এবারের নির্বাচন ছিল মুজিববাদের উপর। নির্বাচন ছিল জাতীয় আদর্শের উপরে ম্যান্ডেট। বাংলার মানুষ সর্বপ্রথম আদর্শভিত্তিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে একটি সঠিক মতাদর্শকে সমর্থন জানায়। বাংলার সংগ্রামী জনতাকে তাই এই কাউন্সিল সম্মেলনে জানাই হাজারো সালাম এবং সংগ্রামী অভিনন্দন ।

এ নির্বাচনে মোট ২৯৫টি আসনে আমাদের প্রার্থীরা জয়ী হয়। আদর্শভিত্তিক এ নির্বাচনে আমাদের একক জয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্রাজ্যবাদী ও তথাকথিত উগ্র প্রগতিবাদীরা প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। এবং তাদের মুরুব্বীদের হতবাক করে দিয়ে বাংলার মানুষ মুজিববাদের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেন। বঙ্গবন্ধু এবারের নির্বাচনে শতকরা ৪০ জন রাজনৈতিক চেতনা সম্পন্ন যুবক কর্মীকে মনোনয়ন দান করেছিলেন।

 

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ

 

বঙ্গবন্ধু নিজেও সারা বাংলাদেশে নির্বাচনী সফর করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনটি ঐতিহাসিক দিক থেকে ঐতিহ্যমণ্ডিত। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংগালী জাতিকে প্রথমবার বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। আর ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ মুক্ত পরিবেশে জাতির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার জন্য এ দিনটিই নির্ধারিত হয়েছিল ।

Leave a Comment