আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বৈদেশিক নীতিমালা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বৈদেশিক নীতিমালা

এছাড়াও আমাদের কার্যকালে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সরকারের কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করতে চাই । শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের মাত্র দু’বছর সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার সরকার আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে যেমন সাফল্য অর্জন করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এই কৃতিত্ব ও সাফল্যের মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে বিঘোষিত নীতি-নির্দেশের তাগিদ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে প্রদত্ত সকল প্রতিশ্রুতি পালনে বদ্ধ পরিকর। তাই, বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে আমরা সব সময়ই সরকারকে প্রয়োজনীয় উপদেশ, নির্দেশ বা পরামর্শ দিয়েছি। এই উদ্দেশ্যে সাংগঠনিক কমিটিতে ২৯-৭-৭২ তারিখের সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
. ‘সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কাউরো প্রতি বিদ্বেষ নয়’, এটাই আমাদের বৈদেশিক নীতির মূল সুর ও দর্শন। এই দর্শনের আলোকে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের নীতিতে আমরা অবিচল এবং অটল। কাজেই বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত এই প্রত্যয় স্মরণ রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আমরা সার্থকভাবে অগ্রসর হতে পেরেছি। আমাদের অনুসৃত জোট বহির্ভূত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির জন্য জাতি আজ বিশ্ব সমাজে যে গৌরবময় আসন লাভ করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এর তুলনা খুবই বিরল।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব বৃদ্ধির চেষ্টাতেও আমরা সরকারকে সব সময়ই পরামর্শ দিয়েছি। দলীয় অনুপ্রেরণা ও উৎসাহে বঙ্গবন্ধুর সরকার এ বিষয়ে সার্থক ভূমিকা পালন করছে। আওয়ামী লীগ সংগঠনের নির্দেশিত বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশে আমাদের বন্ধুত্বের দিগন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে।
ইতিমধ্যেই ১১৬টি রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। ফলে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাওয়ার দলীয় সংকল্প এবং আমাদের সংবিধানে এই সংগ্রামকে বৈদেশিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সে নিজস্ব মর্যাদার আসন দখল করেছে। অটোয়ায় কমনওয়েলথ সম্মেলন ও আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনের কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এ এক মহাবিজয় এবং পরম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় । বাংগালী জাতির ইতিহাসে এই গৌরবগাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এমন সাফল্য খুব কম জাতির ললাটেই জয়টিকা পরিয়েছে।কমনওয়েলথ সম্মেলন ও আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ সম্মানিত সদস্য হিসেবে যোগদান করতে পারায় প্রকৃতপক্ষে সে বিপুল গৌরবের অধিকারী হয়েছে।
আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশকে গ্রহণ করে অধিকাংশ আরব ও আফ্রিকান দেশ তার সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদর্শন করেছে এবং এইসব দেশের নেতৃবৃন্দের সাথে বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সামনে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছিলেন, তাতে করে তাঁরা আমাদেরকে ভাই বলে গ্রহণ করেছেন এবং আমাদের সম্বন্ধে যে ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছিলো তার অবসান হয়।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আরব ও আফ্রিকান দেশ সমূহের সাথেও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আওয়ামী লীগ নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এরই ফলশ্রুতি এবং বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ ব্যক্তিত্বে এই ধরনের কঠিন কাজে সাফল্য লাভ সম্ভব হয়েছে।আরব দেশগুলোর মধ্যে মিশর, ইরাক, মরক্কো, তিউনিশিয়া, আলজিরিয়া, কুয়েত, দক্ষিণ ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, সুদান, জর্দান প্রভৃতি দেশের স্বীকৃতি লাভ বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিঘোষিত নীতি ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফল।
আমাদের গৃহীত বৈদেশিক নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সদাসোচ্চার এবং এদের চক্রান্তে নিষ্পেষিত নিরীহ নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে সংগ্রাম করে যাওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। আর এ জন্যই সাম্প্রতিক আরব-ইসরাইল যুদ্ধে বাংলাদেশ ও আরবদেশগুলোর দিকে সাহায্যের ও সৌভ্রাতৃত্বের হাত বাড়িয়ে প্রমাণ করেছে যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। আমাদের এই ভূমিকায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির আর এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়েছে।
জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে আরব নেতৃবৃন্দের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির ফলে জাতি যে সব বন্ধুরাষ্ট্রের হৃদয়ের উত্তাপের সন্ধান পেলো, তা আজ আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ বলে পরিগণিত। এই সম্পদ লাভ শান্তির দূত বিশ্ব বরেণ্য নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্য সম্ভব হয়েছে। জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর বাণী আরব দেশগুলোর ঘরে ঘরে পৌছার সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার জনসাধারণ বাংলাদেশ সম্বন্ধে নিবীড়ভাবে জানতে পারে এবং নিঃশঙ্কচিত্তে তারা বাংলাদেশকে তাদের সত্যিকার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছে।
কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ যে অপূর্ব ভূমিকা পালন করে তাতে বিশ্ববাসী বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়েছে। স্বতঃ প্রণোদিত ভাবে বহুদেশ আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতা দানের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই বিজয়ে আমরা গর্বিত। কারণ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রাণ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই ছিলেন কমনওয়েলথ সম্মেলনের প্রধান আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।
তাঁর সুচিন্তিত রাজনৈতিক বক্তব্য কমনওয়েলথের গতানুগতিক চরিত্র পরিবর্তন করে বিশ্বের উন্নয়নকামী দেশসমূহের নির্যাতিত মানুষের বিজয় সূচীত করেছে। বিশ্বের নেতৃবৃন্দ সেদিন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠনিসৃত বাণী শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার তথা বাংলাদেশের জনগণের কণ্ঠ হয়ে তিনি সেদিন কমনওয়েলথ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্য রেখেছিলেন। কমনওয়েলথ সম্মেলনের পর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্ববাসীর ধারণা আরও সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ।
আওয়ামী লীগের বিঘোষিত বৈদেশিক নীতির ফলশ্রুতির হিসেবে বিশ্বের শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সকল দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আজ আরও আন্তরিকতাপূর্ণ হয়েছে। বিশ্বের সকল নিপীড়িত ও মুক্তি সংগ্রামীদের পাশে বাংলাদেশ যে সব সময়ই রয়েছে তার প্রমাণ আমরা দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ও গিনি বিসাউকে স্বীকৃতি দিয়েছি।

এছাড়া, এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আমরাই সর্ব প্রথম সমাজতন্ত্রের উপাসক প্রেসিডেন্ট সালভেদর আলেন্দের হত্যাকারী চিলির সাম্রাজ্যবাদ চক্রের ক্রীড়নক সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপন করেছি। আাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটির ১৩-৯-৭৩ তারিখের সভায় এই মর্মে আমরা প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলাম। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পেয়েছি বলেই আমরা ঘোষণাপত্রে বর্ণিত বৈদেশিক নীতির সার্থক রূপায়ন এতো দ্রুত এবং সহজে সম্ভব করতে পেরেছি।
এজন্য আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কাছে চিরকৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ রয়েছে।আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য এক শুভ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতেও আমরা আমাদের বৈদেশিক নীতির আদর্শকে সমুন্নত রাখার ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করছি।
