আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭ এর উপসংহার। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-৮৭ এর উপসংহার

আইনের শাসন, জনগণের শাসন এবং সংবিধানের সার্বভৌমত্ত্বের অনুপস্থিতিতে গণবিরোধী চক্র এবং তাদের প্রতুনের স্বার্থে দেশে আজ স্বৈরাচারী ডিরেটরী শাসন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে জাতীয় সমান দুইন করে অসৎ উপায়ে নবা কোটিপতিদের জন্য হয়েছে, অন্যদিকে ভূমিহীন, বেকার এবং দারিদ্র সীমার নীচে অবস্থানকারী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে।
শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির নামে রাষ্ট্রীয়করণকৃত কল-কারখানা এই গণবিরোধী সরকারের পোষ্যদের হাতে নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে শত শত কোটি টাকার শিল্প স্বর্ণ দেখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শিল্পোৎপাদনে বন্ধ্যাত্ব ঘোচেনি। কৃষি ক্ষেত্রেও সংকট দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে।
“৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে”- এই মর্মে সরকারের গালভরা শ্লোগান উচ্চারিত হলেও মে বসবাসরত কৃষকদের বেঁচে থাকার কোন ন্যূনতম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। পাট, আখ, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে কৃষককূল। দ্রব্যমূল্যের গণ্ডিতে জনগণ আর দিশেহারা। ি মাধ্যমে বা সব দুর্নীতি হয়েছে সর্বব্যাপী। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ আসন থেকে শুরু করে
ক্যান্সারের মতো তা সমাজ দেহের প্রতিটি স্তরে বিস্তার লাভ করেছে। আজ লজ্জার সাথে বলতে হয়, সারা বিশ্বে বাংলাদেশের সরকারকে বিশ্বের দ্বিতীয় দুর্নীতিবাজ সরকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে চলছে মহা সংকট ও নৈরাজ্য। শিক্ষাঙ্গন আজ রণাঙ্গনের রূপ পরিগ্রহ করেছে।
সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় ও মদদে অস্ত্রধারী বিশেষ বাহিনীর দৌরাত্ম্য সময় পরিবেশকে কলুষিত করেছে। এর ফলে মাসের পর মাস বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকলেন। শিক্ষকরা ধর্মঘট করছেন, ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবী মেনে নেওয়া হচ্ছেনা। ডঃ কুদরত এ খুদার শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়িত না করে গণবিরোধী শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চলছে।
নিরক্ষরতার হার বেড়েই চলেছে। বাড়তি জনসংখ্যার চাপে ছাত্র সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে শিক্ষালাভের মৌলিক অধিকার হতে এ দেশের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের ন্যূনাতন দাবী মেটাতে এই সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সার্বিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সমাজ জীবনে এনেছে চরম হতাশা।
দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। হত্যা, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন আজ নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুককে রাজনীতির অঙ্গনে টেনে আনা হয়েছে।
কতিপয় ডাকাত ও চিহ্নিত খুনীদের বানানো হয়েছে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও সরকারী ছত্রচ্ছায়ায় অগ্রধারী ব্যক্তিদের দাপটে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি চরমভাবে বিঘ্নিত। অন্যদিকে সৎ, দেশপ্রেমিক এবং মুক্তিযুদ্ধে। নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের উপর চলছে নির্যাতন। বীরোত্তম কাদের সিদ্দিকী, চিত্রসূতার, হেমায়েত উদ্দিন আওরঙ্গসহ অনেকে যাপন করছেন নির্বাসিত জীবন। দীর্ঘদিন যাবত ফাঁসীর আসামী হিসাবে মহীউদ্দিন মৃত্যুর প্রহর গুণছে।
দেশের এই চরম সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে দেশব্যাপী শুরু হয় আন্দোলন, যে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বভৌম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর।
কিন্তু নির্বাচনে গণবিরোধী সামরিক সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ, জালিয়াতি, মিডিয়া ক্যু, ভোট ডাকাতি, ও নজীরবিহীন সন্ত্রাস সৃষ্টির ফলে সামরিক শাসন থেকে জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্য হয় বাধাপ্রাপ্ত।
নির্বাচন পদ্ধতি এবং নির্বাচনের উপর জনগণের আস্থা হয় বিনষ্ট এবং এর ফলে জাতীয় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। বাঙ্গালী জাতি তার গৌরবোজ্জল ঐতিহ্যকে সামনে রেখে সামরিক শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি চেয়েছিল। বিগত নির্বাচনকালে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়।
এরশাদ জাতির কাছে প্রদত্ত নিরপেক্ষতার সমস্ত প্রতিশ্রতি ভংগ করে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্র, সম্পদ, রেডিও, টেলিভিশন, উপজেলা প্রশাসন জাতীয় পার্টির স্বার্থে ব্যবহার করা সত্ত্বেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নিশ্চিত ভরাডুবি ঠেকানোর লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়েও সামরিক বাহিনীর রীতিনীতি ও প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে নগ্নভাবে জাতীয় পার্টির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।
কিন্তু এতেও কুল না পেয়ে সামরিক বাহিনী, বিডিআর, পুলিশ এবং বিশেষ বাহিনী ব্যবহার, ভোট, ডাকাতি, নির্বাচনী আইন লংঘন, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোটকেন্দ্র জবর দখল, ব্যাপক ভোট কারচুপি এবং সর্বশেষ নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা চলাকালীন সময়ে হঠাৎ নির্বাচনী ফল ঘোষণা স্থগিত এবং মিথ্যা বানোয়াট নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা ইত্যাদি হীন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এরশাদ জনতার ভোটাধিকার নসাৎ করে দেন। এইভাবে জনগণের ব্যাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়।
ক্ষমতার সম্পূর্ণ অপব্যবহার, জালিয়াতি এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে যদি এইভাবে আইন লংঘন করতে নিয়োজিত করা না হতো, তা হলে জনগণের আন্দোলনের লক্ষ্য জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর অর্জিত হতো।
জনগণের রায়ের সুষ্ঠু প্রতিফলন ঘটলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তথা ১৫ দলই দু-তৃতীয়াংশ আসনেরও বেশী আসনে জালাভ করতো। এই সত্য শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত হয়েছে। নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংসদে জাতীয় পার্টিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ঘোষণা করে জনগণের রায়কে উল্টে দেয়া হয়।
ভোট ডাকাতি এবং মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে বিজয়ী ঘোষিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সত্যিকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে দাবী করতে পারেন না। তাই অসাংবিধানিকভাবে ও অবৈধ সংসদ সদস্য দ্বারা সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী পাশ করা একটি প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়।
তাছাড়া সামরিক আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় সংবিধানের কোন সংশোধনী আইনের চক্ষে বৈধ হতে পারে না। এই কলংকিত ৭ম সংশোধনী এরশাদ কোন দিনই সংসদে পাস করতে পারতো না যদি মুসলিমলীগ, জাসনের উভয় গ্রুপ, বাকশাল ও নির্দলীয় কতিপয় সংসদ সদস্য জাতির সাথে বেঈমানি না করতেন। জনগণ কোন দিনই এই অবৈধ সংশোধনী গ্রহন করবেনা।
বিগত ১০ই অক্টোবর ৮৮ যারা গণ-কারফিউর মাধ্যমে তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্ব করে এরশাদকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করো। এই অবস্থান পদত্যাগ না করে বরং যেখানে ১ ভোটার ভোটকেন্দ্রে যায়নি সেখানে বিপুল ভোটে নিজেকে রেডিও টেলিভিশনে বিজয়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বানোয়াট ঘোষণা দিয়ে তিনি গোয়েবলসের মিথ্যা প্রচারণাকেও হার মানান।
এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আমেরিকাসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান সংবাদ সংস্থা ও প্রচার মাধ্যমগুলি নির্লজ্জ মিথ্যা ও তামাশা হিসেবে অভিহিত করে। সম্পূর্ণ একটা মিথ্যাকে সত্তা হিসেবে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি ইহা সর্বৈ (সর্বৈব মিথ্যা সংখ্যা এবং জনগণের আস্থাভা মিথ্যা। দেশে প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠা হয়েছে- এটাও মিথ্যা। এই সব মিথ্যার ভিতের উপর রাজনৈি স্থিতিশীলতা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা। এদেশের জত জনতার পক্ষ থেকে আমরা এই মিথ্যাচারকে প্রত্যাখ্যান করাছি।
আমাদের দাবী, এরশাদকে পদত্যাগ করতে হবে এবং ভোট ডাকাতির মাধ্যমে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিল করতে হবে। জনগণের ক্ষমতা ১৫ দলীয় ঐকা জোটের নির্বাচিত গণ-প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করতে হবে।
তাই বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের দায়িত্ব হবে সারা দেশব্যাপী এমন এক দুর্বার গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে ফোর্ট ডাকাত এবং ক্ষমতা জবরদখলকারী এরশাদ ও তার সরকারকে উৎখাত করে সত্যিকার জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্দোলনের বিকল্প কিছু নেই। তাই আসুন, গণতন্ত্রপ্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ দলীয় ঐতিহ্য স্বৈরাচার বিরোধী আপোষহীন সঙ্ঘাদের মাধ্যমে শেষ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করি।
খোদা হাফেজ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু। জয় আওয়ামী লীগ।
