বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত

জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা

 

দীর্ঘ দিনের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, বঞ্চনা-বৈষম্যের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ও নির্দেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালী জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তার দোসরগণ শুধুমাত্র ৩০ লক্ষ বাঙালীকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ঘৃণ্য পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। দেশের ভৌত অবকাঠামো ছিল বিধ্বস্ত। কলকারখানা ছিল অচল। আর্থিক কাঠামো বলতে কিছু ছিল না।

পাকিস্তানীরা বহু কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া করে ফেলে রেখে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সরকারকে এ সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে হয়। ব্যাংক, বীমা এবং শিল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত জাতীয়করণ করা হয়, যার অধিকাংশই ছিল পাকিস্তানী মালিকানাধীন। তৎকালীন পরিস্থিতিতে এই ছিল জনগণের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা ও সময়ের দাবী।

বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করেছিলেন দুটি ভাগে- প্রথমত, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন এবং দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন ।

তিন কোটি ছিন্নমূল মানুষ, এক কোটি শরণার্থীর প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন সমস্যা, দেড় কোটি অগ্নিবদ্ধ ঘরবাড়ি, অনাবাদী জমি, অচল বন্দর, ডুবন্ত নৌযান, শূন্য খাদ্য গুদাম তখনকার অবস্থা ছিল এমনি ভয়াবহ। ধ্বংসস্তূপ চার দিকে।

তদুপরি জাতিসংঘের স্বীকৃতি— প্রতিবন্ধকতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত কারণে তেলের মূল্যবৃদ্ধির অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ ছড়ানো ছিটানো অস্ত্র, স্বাধীনতা বিরোধীদের অন্তর্ঘাত ও নাশকতামূলক তৎপরতায় জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। এমনি অবস্থায় সদ্য ধ্বংসপ্রাপ্ত অগ্নিদগ্ধ দেশে প্রকট সমস্যার মধ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্কন্ধে বৈরী পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের “নর্বাসন ও পুনর্গঠনের বিষয়টি ছিল বঙ্গবন্ধুর সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু সরকার উক্ত চ্যালেঞ্জ সাফল্যজনকভাবে মোকাবিলা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। নানা দেশ ও সাহায্য সংস্থা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা জরীপ করে আশংকা প্রকাশ করেছিল যে যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে খাদ্যাভাবে দু’কোটি লোক মৃত্যুবরণ করবে।

কারণ যোগাযোগ, পরিবহন এবং অভ্যন্তরীণ নৌ ও সমুদ্র বন্দরের অচলাবস্থা সহ সমস্ত অবকাঠামো ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অকার্যকর। এই সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিয়ে শহর-নগর, দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ৪ কোটি ৭৫ লক্ষ মণ খাদ্যসামগ্রী বিনা মূল্যে ও স্বল্প মূল্যে বিলিবণ্টন করে অবশ্যম্ভাবী এই মৃত্যু ঠেকাতে সমর্থ হয়েছিলেন।

হার্ডিঞ্জ ব্রীজ ও ভৈরব সেতুসহ ৫৬৭টি সেতু নির্মাণ ও মেরামত, ৭টি নতুন ফেরী, ১৮৫১টি রেলওয়ে ওয়াগন ও যাত্রীবাহী বগী, ৪৬০টি বাস, ৬০৫টি নৌযান ও ৩টি পুরাতন বিমান চালু করে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এবং মাইন উদ্ধার করে অচল বন্দরসমূহ সচল করা হয়। পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত ব্যাংক, বীমা

ও ৫৮০টি শিল্প ইউনিট যা ছিল সম্পূর্ণরূপে দেউলিয়া ও প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত সেগুলো জাতীয়করণ ও উৎপাদনক্ষম করে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। ঘোড়াশাল সার কারখানা, আগেও কমপ্লে কাজ ও অন্যান্য নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলার ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। -জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস’ এই ঘোষণা দিয়ে ১৯৭২ সালের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণ

জুয়া, হাউজী, ঘোড়দৌড়সহ সমস্ত ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী ফাউন্ডেশন গঠন মাদ্রাসা বোর্ড প্রতিষ্ঠা, পবিত্র হজব্রত পালনে সরকারী অনুদান প্রদান, ইসলাম সম্মলন সংস্থার সদস্যপদ লাভ ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

কৃষক ও কৃষি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল পাকিস্তান আমলের বকেয়া খাজনাসহ ২৫ বিঘা পর্যন্ত জি খাজনা চিরতরে মওকুফ, কয়েক লক্ষ কৃষি ঋণের সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহারসহ ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, চাষীদের জন্য সহজ শর্তে কৃষি ঋণদানের ব্যবস্থাকরণ, বিনা মূল্যে কীটনাশক ঔষধ, স্বল্পমূল্যে সার, বীজ ও যৎসামান্য ভাড়ায় পাওয়ার পাম্প ও গভীর নলকূপ সরবরাহ ইত্যাদি।

ভারত হতে প্রত্যাবর্তনকারী ১ কোটি লোকের পুনর্বাসন ও দেশের অভ্যন্তরে ৩ কোটি ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাসা সংস্থান, ৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যদের ফেরৎ পাঠানো ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ফিরিয়ে নেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ শহীদ পরিবারকে আর্থিক সাহায্য ও ২ লাখ নির্যাতিতা মা-বোনের দায়িত্ব গ্রহণ

চিকিৎসার জন্য পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেশ প্রেরণ, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্ট ও নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন, শিক্ষকদের সরকারী কর্মচারীর মর্যাদা দান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ডঃ কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন, ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন

৫৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগসহ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ পুনর্নির্মাণ, প্রতি থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও হাসপাতাল নির্মাণ এবং অস্থায়ী স্বাস্থ্য কর্মীদের স্থায়ী চাকুরের মর্যাদা দান, জাতীয় সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনীসহ প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জাতীয় মর্যাদায় পুনর্গঠন

কুমিল্লায় দেশের প্রথম সামরিক একাডেমী স্থাপন, পুলিশ, বি.ডি.আর, আনসার ও বেসামরিক প্রশাসনের অবকাঠামো গড়ে তোলা, পাকিস্তানে আটক প্রায় ৪ লক্ষ বাঙালীদের দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসিত করা, ৭ লক্ষ পাকিস্তানীদের ফেরৎ পাঠানো, বাঙালী জাতি ও বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলায় প্রথম ভাষণ দান, জাতিসংঘের সদস্যপদ ও ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ ।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি ও ফারাক্কার পানির বণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ৪৪ হাজার কিউসেক পানির ব্যবস্থা।জনগণের বিপুল সমর্থন, সহযোগিতা এবং সরকারের স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা ও সুষ্ঠু পদক্ষেপের ফলে চার দিকের বিরাজমান সমস্যাসমূহ কাটিয়ে অতি দ্রুত উন্নয়নের নবযাত্রা শুরু হয়।

অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কার্যক্রম যখন সুচারুভাবে সম্পন্ন প্রায়, কারখানায়, ক্ষেতে খামারে উৎপাদন বৃদ্ধি ও মুদ্রা নীতির সংস্কারের ফলে দ্রব্যমূল্য যখন দ্রুত কমে জনগণের ক্রয় ক্ষমতার আওতায় চলে এসেছে, মানুষ যখন প্রাথমিক সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে নব উদ্দীপনা ও প্রত্যয় নিয়ে অগ্রসর-উন্মুখ, ঠিক তখনি দেশী বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। দেশ নিক্ষিপ্ত হয় সামরিক অভ্যুত্থান ও স্বৈরশাসনের বেড়াজালে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব শান্তির স্বপক্ষে রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্ব, সমতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, শক্তি প্রয়োগ রোধ করা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, প্রত্যেক রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও সমস্যাবলীর শাস্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির নীতিমালার প্রতি জগৎসভায় বারবার স্বার্থহীন ঘোষণা দিয়েছেন।

জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ পূর্বে জাতির জনক বলেছিলেন, “কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে আমাদের সক্ষম করে তুলবে এবং সক্ষম করে তুলবে নাবিদ ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের সকলের শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করতে।

এই ধারণা হতে জন্ম নিয়েছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। ” শান্তির স্বপক্ষে বলিষ্ঠ ও দৃঢ় পদক্ষেপ কার্যকর করার অভিযাত্রায় বিশ্ব শাস্তি পরিষদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ খেতাব ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত করে সমগ্র দেশবাসীকে মহিমান্বিত করেছিল।

মাত্র সাড়ে তিন বছর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি রক্তস্রাত ধ্বংসস্তূপের মধ্য হতে শূন্য হাতে একটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন পর্ব সমাপ্ত করে। জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন তা বিস্ময়কর ব্যাপার।

১৯৭২ সাল হতে ১৯৭৫ সন কালপর্বের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে শুরু থেকে গড়ে তোলার প্রয়াসে তদানীন্তন সরকার কতখানি সফলতা অর্জন: করেছিলেন তার গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বিশ্ব ব্যাংকের ১৯৮৭ সালের প্রণীত রিপোর্টে ১৯৭২-১৯৭৫ সনে অর্থাৎ বাংলাদেশের সবচাইতে সমস্যা সংকুল ক্রান্তিকালে জাতীয় আয় বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল। গড়ে শতকরা ৫ ভাগ।

বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে এই সময়ে আর বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল শতকরা ৭ ভাগ। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব মতে ১৯৭৬-১৯৮০ সাল সময়ে জাতীয় আয়বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়ায় ৪.৭ ভাগ। ১৯৮০-৮১ হতে ১৯৮৫-৮৬ সালে জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী আরো হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩.৬ ভাগে দাঁড়ায়।

১৯৭২-৭৩ সন হতে ১৯৭৫-৭৬ সন পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন শতকরা ৮.৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৬-৭৭ সন থেকে ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত উৎপাদন শতকরা ২.১ ভাগ হারে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ১৯৮০-৮১ সাল হতে ১৯৮৫-৮৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র শতকরা ১.৭ ভাগ।

১৯৭৬ সনে কৃষি উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনের সূচক যে নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল, তা বঙ্গবন্ধুর আমলে গৃহীত পদক্ষেপেরই ফলশ্রুতিমাত্র। ১৯৭৫ সনের প্রথম দিকে প্রতি সের চালের দাম ৪.৫০ টাকায় এবং মে মাসে ৩.৭৫ টাকা দাঁড়ায়।

১৯৭২-৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারের গণমুখিনতাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পরিসংখ্যান দ্বারা প্রমাণ করা যায়। ১৯৭৩-৭৪ সালে রাজস্ব ব্যয়ের শতকরা ২০.৩৭ ভাগ শিক্ষা ও শতকরা ৪.০১ ভাগ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়েছিল। উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে ১৯৭৩-৭৪ সালে মোট উন্নয়ন ব্যয়ের শতকরা ৫.২ ভাগ শিক্ষায় ও শতকরা ৩.৭৭ ভাগ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়েছিল। একই বছরে গ্রামীণ শিল্প খাতে উন্নয়ন ব্যয়ের শতকরা ৬.৩ ভাগ এবং ভৌত কাঠামোর ক্ষেত্রে শতকরা ৭.৮ ভাগ ব্যয় করা হয়েছিল।

প্রশাসন ও অনুৎপাদনশীল খাতে ১৯৭৩-৭৫ সালে মোট ব্যয় করা হয়েছিল ১৬৬ কোটি টাকা মাত্র। ১৯৭৩-৭৪ সালে উন্নয়ন ব্যয়ের শতকরা ৫৫ ভাগই অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে মেটানো হয়েছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আমলে বিদেশী সাহায্য এসেছে মাত্র ১ হাজার ৮ শত ৩১ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ ব্যবহৃত হয় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন প্রকল্পে।

বিএনপি সরকারের আমলে বৈদেশিক সাহায্য এসেছিল ১০ হাজার ৬ শত ৮৭ কোটি টাকা। এরশাদ সরকারের সময় বৈদেশিক সাহায্য এসেছে ৩৭ হাজার ৬ শত ৪১ কোটি টাকা। বিএনপি বা এরশাদ সরকারকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে হয়নি।

দেশবাসী ভালভাবেই জানেন যে, এই দুই সামরিক স্বৈরাচারের আমলে এ সব সাহায্য জনগণের বা দেশের তেমন কোন কল্যাণমূলক কাজে লাগেনি। দুর্নীতির মাধ্যমে এ সব বৈদেশিক সাহায্যের হাজার হাজার কোটি টাকা মুষ্টিমেয় লোকের পকেটে গেছে এবং বিদেশে পাচার হয়েছে। এর ফলে দেশের ৮৬ ভাগ মানুষ আজ দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করছে।

এই সময়কালের গড় প্রবৃদ্ধির হারের তুলনা করলে দেখা যাবে যে, আওয়ামী লীগ আমলের প্রবৃদ্ধির হার ছিল। সর্বাপেক্ষা বেশী অর্থাৎ শতকরা ৭.০৬ ভাগ। জিয়ার আমলে প্রবৃদ্ধি কমে গিয়ে ৪.৭৫ ভাগে দাঁড়ায়। এরশাদের আমলে তা আরও কমে গিয়ে হয় ৩.৯৫ ভাগ। স্পষ্টতঃ জিয়া-এরশাদের আমলের চেয়ে আওয়ামী লীগের আমলে উন্নয়নমূলক কাজ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ মানুষের অবস্থাও ছিল অনেক সাচ্ছল।

বঙ্গবন্ধুর আমলে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ডলার। জেনারেল জিয়া ও এরশাদের আমলে তার পরিমাণ বেড়ে যথাক্রমে ৩৮০ কোটি ডলার ও ১০৩৫ কোটি ডলারে দাঁড়ালেও দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়, গণমানুষের দারিদ্র্য বেড়ে যায় এবং অর্থনীতি প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। ভূমিহীনের সংখ্যা বঙ্গবন্ধুর আমলে ছিল শতকরা ৩৫ ভাগ। জেনারেল জিয়ার আমলে ৫৫ ভাগ এবং এরশাদের আমলের শেষে ৭৫ ভাগের ঊর্ধ্বে দাঁড়ায়।

আওয়ামী লীগের আমলে অতি দরিদ্র লোকের শতকরা হার ছিল ৫০ জন। বিএনপি এবং এরশাদের আমলে এই হার বেড়ে যথাক্রমে ৬৫ এবং ৮৬ জনে দাঁড়ায়।চাল, ডাল, আটা, লবণ, ভোজা তেল, কেরোসিন, লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা ইত্যাদি প্রত্যেক জিনিষেরই নাম আজ ১৯৭৫ সালের তুলনায় অনেক বেশী।

১৯৭৫-এর তুলনায় ১৯৯০ সনে চাল, দুঙ্গা ও শাড়ির দাম বেড়েছে ৬ গুণ, আটার দাম বেড়েছে ৭ গুণ, ডালের দাম বেড়েছে ১২ গুণ, পিঁয়াজের দাম বেড়েছে ২৭ গুণ। আওয়ামী লীগ আমলে শতকরা ১৫ জন বেকারের জায়গায় বিএনপি আমলে তা দ্বিগুণ হয়ে ৩০-এ দ বর্তমানে ৪২ জন।

১৯৭৫ সালে খাদ্য গ্রহণের গড়পড়তা পরিমাণ ছিল ৮০৭ গ্রাম, ১৯৮১ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৭৬৪ গ্রাম এবং ১৯৯১ সালে তা আরো কমে গিয়ে গড়পড়তা ৬৯২ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। ভোগের হিসেবে ১৯৭৫ সালে ক্যালরী গ্রহণের গড়পড়তা পরিমাণ ছিল ২০৯৪, ১৯৮১ সালে ১৯৪৩ এবং ১৯৯১ সালে হ্রাসকৃত পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮৪০ ক্যালরিতে।

অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে বর্তমানে বাংলাদেশে শতকরা ৮৭ ভাগ মানুষ প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ থেকে বঞ্চিত। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ ভাগ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এর মধ্যে শিশু ও মায়েরাই বেশী আক্রান্ত। পুষ্টির অভাবে শিশু বিকলাঙ্গ, অন্ধত্ব ও পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এমন কি এর ফলে শিশু মৃত্যুর হার শতকরা ১৬ ভাগেরও ঊর্ধ্বে।

দেড় দশক ব্যাপী এই স্বৈরশাসনে সংবিধান ও রাজনীতিকে করা হয় বিকৃত ও কলুষিত, অর্থনীতিকে করে ফেলা হয় পঙ্গু ও সম্পূর্ণরূপে পরনির্ভরশীল, উৎপাদনের রাজনীতির গালভরা শ্লোগান সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে স্কু ব্যবস্থাপনার বদলে অবাধ লুটপাট ও অনুগ্রহ বিতরণের শিকারে পরিণত করা হয়।

বেসরকারী খাতকে উৎসাহ দেয়ার নামে সৃষ্টি করা হয় মুষ্টিমেয় অনুৎপাদনশীল সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করা হয় চরম বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য। শ্রমিক আন্দোলনকে বিপথগামী করার জন্য সৃষ্টি হয় এক শ্রেণীর দালাল ও টাউট নেতৃত্ব। গোটা অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হয়। এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত ও সম্ভাবনা সম্পর্কেই দেশে-বিদেশে প্রশ্ন উঠতে শু করে।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবিধান বহির্ভূতভাবে হত্যা করে স্বাধীনতা-প্রগতি-মানবতা বিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতকচক্র রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে এবং মার্শাল ল’ জারী করে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তে সামরিকতন্ত্র প্রবর্তন করা হয়। জনগণের সকল অধিকারকে অস্ত্র শক্তির মাধ্যমে পদানত করা হয়।

 

জনগণ হয় সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বারবার ক্ষমতার পরিবর্তন হতে থাকে, আর তার অশুভ ফলাফল দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সশস্ত্রভাবে ক্ষমতা দখল ও সেই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত রাখার লক্ষ্যে নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয় দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী এবং বহু সেনা-অফিসার ও সদস্যদের।

অদম্য ক্ষমতা লিপ্সা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষা, দেশকে আত্মঘাতী সংঘাতে লিপ্ত রাখা, জাতীয় ঐক্য-বিনাশী প্রক্রিয়ায় জনগণের অর্থও মুক্ত ও উদার চিন্তা-চেতনার মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি সর্বোপরি জাতিকে বিভক্ত করো, জনগণকে বিভক্ত করো, দলকে বিভক্ত করো- এই ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতির প্রবর্তন করে ক্ষমতা ভোগ করার নীতি দেশকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়।

ক্ষমতা দখল করে সেনা ছাউনি হতে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় দল গঠন শুরু হয়। লোভ-লালসা ও অনুগ্রহ বিতরণের মাধ্যমে রাজনীতির অঙ্গনকে কলুষিত করার রীতি শুরু হয়। দেশে অসৎ নীতি-বিবর্জিত আদর্শহীন রাজনীতির গোড়া পত্তন শুরু হয়। ন্যায় বিচার ও আইনের শাসনের পথ রুদ্ধ করা হয়।

সামরিক ফরমान সংশোধনীর মাধ্যমে সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত রাষ্ট্রপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর আত্মস্বীকৃত খুনীদের রেহাই দেয়া হয়। আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার ও ন্যায় বিচার প্রাপ্তির অধিকার রহিত করা

প্রতিক্রিয়াশীল এই পাকিস্তানী ধারার হত্যা, ক্যু, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও চক্রান্তে জাতি যখন হতাশারান্ত, দিশেহারা ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু করে। সাংবিধানিক ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনা, আইনের শাসন ও ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৫ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় গণতান্ত্রিক সংগ্রাম।

সংগ্রামের বিভিন্ন স্তরে ও পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগ ও আত্মবলিদানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক আন্দোলন এক বিশেষ অবস্থায় উপনীত হলে জাতির সামনে পনের দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৯০ সনের ৬ই নভেম্বর পাইপথে বিশাল জনসভায় সংবিধানের ৫১ ও ৫৫ অনুচ্ছেদ: অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা ঘোষণা করি।

সেই ঘোষণার পথ ধরেই স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধা হয়।আওয়ামী লীগের লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ। সেই লক্ষ্য অর্জনে স্বৈরাচারের অবসান ছিল আশু করণীয় জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য। আওয়ামী লীগ ত্যাগ, তিতিক্ষা, রক্ত, আত্মদান ও আত্মবলিদানের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনে অকুতোভয়, নিরবচ্ছিন্ন এবং আপসহীনভাবে অগ্রসর হয়েছে।

কেননা আওয়ামী লীগ মনে করে গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পূরক। উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র অপরিহার্য। জনগণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আওয়ামী লীগ অনির্বাণ দিশারী হিসেবে তার ঐতিহ্যবাহী অগ্রণী ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে এতটুকুও পিছপা হয়নি। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে বারবারই সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সেই লক্ষ্যে বিরোধী দলে থেকেও আওয়ামী লীগ জাতির সামনে তার প্রদত্ত ওয়াদা পূরণ করেছে।

স্বৈরতন্ত্রের পতন ও দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার পর দেশবাসী আশা করেছিল যে এবার হয়ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতি ফিরে পাবে ও স্বৈরশাসন আমলের অপশাসন ও উৎপাদন বিরোধী রীতিনীতির পরিবর্তন হবে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে যে দেশ চলছে সেই পুরনো ধারার এবং অর্থনীতিতে সজীবতা ফিরে আসার বদলে স্থবিরতা ও মন্দাই বরং গভীরতর হচ্ছে।

সম্পদের অপব্যবহার ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটি সুষ্ঠু দিক-নির্দেশনা দিতে। এই পরিস্থিতিতে জনজীবনে কেবল সংকটই বৃদ্ধি পাচ্ছে না, প্রকৃত উদ্যোক্তারাও আজ হতাশ ও দিশেহারা।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ এবং পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার আলোকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং তারই প্রেক্ষাপটে নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালা ও দর্শন প্রণয়ন করে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে দুটো দৃষ্টিকোণ বিবেচ্য – প্রথমত একটি অর্থনৈতিক, দ্বিতীয়ত বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট।

আমাদের সংগঠন সুদীর্ঘকাল বাংলা ও বাঙালীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে এসেছে। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি। এই লক্ষ্য থেকে আমরা কোন সময় সরে আসি নি বরং বিরতিহীন সংগ্রাম করে আসছি। এর জন্যই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন ।

সুদীর্ঘ স্বৈরশাসন এবং বর্তমান অযোগ্য সরকারের শাসন ও শোষণের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি আজ নাজুক ও নড়বড়ে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার খুবই নীচু পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। খাদ্য ঘাটতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি বিপদজনক অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক সংহতি বিনষ্টের পথে এবং সমাজে নতুন নতুন অস্থিরতা জন্ম নিচ্ছে। এর থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে আজ আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যমত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতা।

আমরা বিশ্বাস করি জনগণই ক্ষমতার মূল উৎস এবং ক্ষমতা জনগণের কল্যাণেই ব্যবহার করা উচিৎ। সকলের মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমাদের মূল লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। দেশকে অল্প সময়ের মধ্যে সমৃদ্ধির দিকে চালিত করার জন্য আশু প্রয়োজন সরকারী, বেসরকারী, বিভিন্ন শক্তি, সম্প্রদায় ও শ্রেণীর মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় ও ব্যাপক কর্মোদ্যোগ সৃষ্টির পরিবেশ তৈরী করা।

বিশ্ব অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা দিয়েছে ব্যাপক যুগান্তকারী পরিবর্তন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নামে প্রচলিত অর্থনীতির পরন এবং শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ক্রমাগত সংকট ও মন্দা ছোট বড় সব দেশকেই নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য করেছে।

ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি প্রতিবেশী দেশ প্রচলিত বিধিব্যবস্থার আমূল সংস্কার করে উদার ও উন্মুক্ত অর্থনীতি প্রবর্তনের সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিচ্ছে।

অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া যেমন জনকল্যাণের নীতি অকার্যকর, তেমনি জনকল্যাণের নীতি ছাড়া বাজার অর্থনীতিও দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ন্যায় বিচার ও রাজনৈতিক স্থিতি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ । দারিদ্র্য ও অনুন্নত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী অপরিহার্য।

বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ বর্তমান বিশ্ব পারস্পরিক নির্ভরশীল, তাই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কর্মসূচী গ্রহণের লক্ষ্যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সক্রিয় বিবেচনা রাখা অপরিহার্য।

চিন্তা-চেতনায় ও কর্মসূচীতে নূতনতর দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে, অপরিহার্য হয়ে পড়েছে নতুন পুঁজি ও প্রযুক্তির। জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়নকে পশ্চাদপদতা ও স্থ অন্ধকারে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির স্বার্থে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিশ্বব্যাপী প্রবাহমান ধারার সঙ্গে অবশ্যই আমাদের সম্পৃক্ত হতে হবে।

আধুনিকীকরণের বিশ্বের রাজনৈতিক চরিত্রে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের অবসান এবং আঞ্চলিকতার প্রভাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রবণতার দরুণ অর্থনৈতিক সাহায্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভিন্নতর অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর অর্থনীতিতে পরিবর্তনের নতুন ধারা সংযোজিত হয়েছে।

উন্নত দেশের পুঁজি ও প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক চরিত্র গ্রহণ করেছে। বিশ্ব বাজারে আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণ, রাজনীতির প্রসার ও সংযোজনের মেরুকরণ লক্ষ্যণীয়। এমতাবস্থায়, আওয়ামী লীগের নতুন অর্থনৈতিক দিক-নির্দেশনা জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ, পুঁজি গঠন ও বিনিয়োগ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং মানব সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন আনবে।

আওয়ামী লীগের সদ্যঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের সদ্যঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তি হিসেবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে বিশেষভাবে অবদান রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস :

 (১) উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

(২) জাতীয় ঐক্যমত ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

(৩) গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে অর্থনৈতিক শক্তির নতুন বিন্যাস ঘটাবে।

(৪) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে সঠিক ধারায় প্রবাহিত করবে।

(৫) উন্নয়নের বাস্তবসম্মত দিক-নির্দেশনা দেবে।

(৬) অর্থনীতিতে গতিশীলতা দান করবে এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে।

(৭) নতুন সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের মধ্যে বিরাজমান দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত দূর করে জাতীয় সমন্বয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

(৮) ব্যক্তি উদ্যোগ ও সামাজিক উদ্যোগের বাধা অপসারিত করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সকলের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করবে। সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র সম্পূরক ও সহায়কের ভূমিকা পালন করবে। 

(৯) রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আমূল পরিবর্তন করে জনগণের কাছে প্রশাসনকে গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক করার

ব্যবস্থা করবে।

(১০) বিদেশী সাহায্য, পুঁজি ও প্রযুক্তি গ্রহণ এবং জাতীয় চাহিদা অনুসারে এর ব্যবহার সুনিশ্চিত করবে।

 (১১) মৌলিক চাহিদা পূরণে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই নীতিমালায় অগ্রাধিকার থাকবে।

(১২) উন্নয়ন কৌশল হিসাবে প্রবৃদ্ধির সাথে সম্পদ বণ্টন প্রক্রিয়াকে সংযুক্ত করবে। 

(১৩) বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

(১৪) আঞ্চলিক সম্পর্ক, পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা দৃঢ় করবে।

এই পটভূমিতে জনগণের দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশে একটি যথার্থ উৎপাদনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নয়া কর্মসূচী পেশ করেছে। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি নয়- প্রবৃদ্ধি, প্রতিযোগিতা ও জনকল্যাণকে সম্পৃক্তকরণই এই কর্মসূচীর লক্ষ্য।

এই দিক-নির্দেশনা দিতে পার্টির অভ্যন্তরে ব্যাপক আলাপ আলোচনা ছাড়াও, দলমত নির্বিশেষে দেশের শ্রমিক, কৃষক সংগঠন সমূহের প্রতিনিধিবর্গ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্প প্রতিনিধিবর্গ এবং দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে উপর্যুপরি আলোচনা ও মতামত বিনিময়ের ফলশ্রুতিতে জাতির সামনে এই অর্থনৈতিক দিক-নির্দেশনা উপস্থিত করা সহজতর হয়েছে।

 

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঘোষিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা

 

তাদের সকলের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পরিশেষে বলতে চাই, অর্থনৈতিক দিক-নির্দেশনা ও নীতিমালা অতি সংক্ষিপ্তাকারে এখানে উপস্থাপিত।

এই দিক-নির্দেশনা ও নীতিমালাকে সামনে রেখে জনজীবনে ঘনীভূত স্থায়ী ও মৌলিক সমস্যা এবং প্রাত্যহিক সংকট সমাধানে জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক কর্মসূচীর বিশদ রূপরেখা প্রণয়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশের প্রাজ্ঞজনেরা যে আগ্রহ প্রকাশ করছেন এবং দেশের সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকবৃন্দ যেভাবে এই উন্নয়ন দর্শন গ্রহণ করেছেন, তার জন্য আমি সকলের প্রতি আমার ও দলের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে উপস্থাপিত জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শন আরো জনকল্যাণমুখী করার উদ্দেশ্যে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে।

খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ।

(শেখ হাসিনা)

সভানেত্রী

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Leave a Comment