আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাই সময়োপযোগী শক্তিশালী সংগঠন। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চাই সময়োপযোগী শক্তিশালী সংগঠন

প্রিয় কাউন্সিলার ভাই ও বোনেরা,
আমরা সবাই জানি, কোন রাজনৈতিক দলের করণীয় কর্তব্য পালনের জন্য চাই উপযুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অতীতে জাতীয় প্রয়োজনের সঠিক মুহূর্তে সঠিক রাজনৈতিক কর্তব্য ও লক্ষ্য ঠিক করেছে, সংগঠনের নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা জনগণকে সাথে নিয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে।
এই জন্যই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত প্রতিহত করে দীর্ঘ ২১ (একুশ) বছর পর পুনরায় জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেছে। এবারেও একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য আওয়ামী লীগকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু বলতেন, “ক্ষমতায় যাওয়া সহজ কিন্তু জনগণের মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন।” অতীতে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত আমাদের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। এবারেও চলছে একই খেলা। আমাদের সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে উপযুক্ত করে গড়ে তুলে এই ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে মোকাবিলা করতে হবে।
আমরা সবাই জানি যে, নির্দিষ্ট সময় শেষ হবার পর সরকারকে নয়, দলকেই জনগণের কাছে যেতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দলকে স্বাভাবিক নিয়মে যেতে হবে নির্বাচনে। শেষ বিচারে জনগণের কাছে দলকে জবাবদিহি করতে হবে। তাই এখনই দলকে প্রয়োজনের উপযোগী, সক্রিয়, সচেতন ও শক্তিশালী করতে হবে।
ক্ষমতার বাইরে থেকে আওয়ামী লীগ যেমন জনগণকে ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ঠিক তেমনি ক্ষমতাসীন দল হয়েও আওয়ামী লীগকেই জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হবে ভাতের অধিকার আদায়ে অর্থাৎ ক্ষুধার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে।
বিগত জাতীয় কাউন্সিলে আমরা পার্টির কার্যক্রম পরিচালনায় দুটো সাংগঠনিক নীতি গ্রহণ করেছিলাম-
১।গণতন্ত্রায়ন ও জবাবদিহিতা- এই দুয়ের সাথে গণতান্ত্রিক মতাদর্শগত ঐক্য, আচরণ ও গণতান্ত্রিক চর্চার পদ্ধতিগত দিকের বিকাশ সাধন এবং নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক তদারকি ও জবাবদিহিতাকে নল পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা;
২।আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শৃঙ্খলাপূর্ণ গণতান্ত্রিক আচরণ এবং অর্পিত দায়িত্বের সুচারু সম্পাদন নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের মাপকাঠি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। উপরোক্ত লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা আমরা কতটুকু বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হয়েছি তা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হবে।
এক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতিসমূহ দূর করতে হবে। তবে বিগত সময়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষা, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সফলতার সাথে অশংগ্রহণ এবং আজ জাতীয় কাউন্সিলে সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয় যে, উপরোক্ত নীতি বাস্তবায়নে আমরা ছিলাম একনিষ্ঠ ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি এই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আর একবার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। এই দুই নীতিকে সাংগঠনিক কাজে সামনে রাখতে আমি সকলের নিকট আহ্বান জানাচ্ছি।
বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগের প্রধান সাংগঠনিক কাজ হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে বাংলার জনগণের সাথে যে অটুট ও প্রগাঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করে গেছেন সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা। এ জন্য সরকার কোন্ ক্ষেত্রে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তা আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীকে জানতে-বুঝতে হবে এবং জনগণকে তা জানাতে হবে।
প্রতিটি সরকারী পদক্ষেপে জনগণ কি বলছে, জনগণের প্রতিক্রিয়া কি হচ্ছে তা জানতে হবে এবং দলকে তা জানাতে হবে। জনগণের সরকারের সাথে জনগণের মৈত্রী বন্ধনের সেতু হিসেবে কাজ করতে হবে দলকে। এই জন্য আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোর সাথে পর্যায়ক্রমে থানা, জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ ও মতামতের আদান প্রদান বাড়াতে হবে।জনগণের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে গড়ে উঠা দলের মতামতসমূহকে নির্দিষ্ট সময় পর পর বা বিশেষ অবস্থায় একত্রিত করা এবং মন্ত্রীসভায় বা মন্ত্রীদের কাছে তা তুলে ধরার একটা পদ্ধতি উদ্ভাবন আমাদের করতেই হবে।
আমাদের দ্বিতীয় সাংগঠনিক কাজ হচ্ছে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিটি বিভাগীয় দপ্তরের কাজ স্বতন্ত্রভাবে সংগঠিত করা। ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় বিভাগীয় দপ্তরের কাজ যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।তাছাড়া পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আমাদের যখন জনগণের কাছে যেতে হতে তখন কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ত্রাণ, আইন, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি সকল বিষয়েই কর্মসূচী দলের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে।
তাই প্রতিটি বিভাগের কাজ জাতীয় কাউন্সিলের পর পরই আবার নতুন পর্যায়ের উপযোগী করে গুছিয়ে তুলতে হবে। সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্রে প্রচার ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের কাজকে আমি বর্তমান সময়ের জন্য সবচেয়েগুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকারীরা এখন তৎপর। এদের মূল কাজ হচ্ছে বিকৃত তথ্য ও সংবাদ পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত ও হতাশগ্রস্ত করা। স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার আমাদের কতটুকু ক্ষতি করতে পারে।
তাই প্রচারের কাজে আমাদের যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের দেশ গঠনমূলক কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ আজ জরুরী। বঙ্গবন্ধু দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগী ছিলেন এবং এক্ষেত্রে কাজও অগ্রসর করেছিলেন। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই।
তাই জাতীয় কাউন্সিল শেষে এই কাজ শুরু করার জন্য আমরা সকল পর্যায়ের সংগঠন ও নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানাই। এ জন্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব এই মহতী সম্মেলনে আমি উত্থাপন করছি। গণতন্ত্র সম্পর্কে সচেতনতা, ভোটের অধিকার প্রয়োগ, দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণদানই হবে মূল উদ্দেশ্য।
দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা আমাদের সাথে দেশগড়ার সংগ্রামে আছেন,তাঁদের সহজেই সম্মানের সাথে আমরা এ কাজে সমবেত করতে পারি। আগামী বছর আওয়ামী লীগের ৫০ (পঞ্চাশ) বছর পূর্ণ হবে। আসুন, উল্লিখিত রাজনৈতিক সাংগঠনিক কর্তব্য পালনের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন-বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করি।
প্রিয় কাউন্সিলার ভাই ও বোনেরা,
সুদীর্ঘ ২১ (একুশ) বছর পর জনগণ আমাদের সুযোগ দিয়েছেন সরাসরি দেশের মানুষের সেবা করার, রাষ্ট্র পরিচালনার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, লক্ষ্য ছিল- বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করা; মাতৃভূমিকে স্বাধীন করা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন হয়েছে। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ বেয়ে একবিংশ শতাব্দীর অভিযাত্রায় আমাদেরও লক্ষ্য আছে, স্বপ্ন আছে, মিশন আছে। আগামী শতাব্দীর ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা, দারিদ্র, নিরক্ষরতার অভিশাপ মুক্ত। আসুন আমরা এই সময়ের মধ্যে জাতির জনকের আজন্ম লালিত স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলি।
যাতে আমাদের শস্যক্ষেতগুলো মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য শস্য উৎপাদনে সক্ষম হয়। আমাদের নদীনালা-হাওড়- বাওড়-পুকুর-বিল মাছে মাছে পরিপূর্ণ হয়। ‘সকলের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। কর্মসংস্থানের জন্য যেন আমাদের সন্তানদের আর সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশের জঙ্গলে গিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে না হয়।
আমাদের দেশেই একটি অগ্রসরমান শিল্প সভ্যতা গড়ে উঠে। আমরা আর পরনির্ভরশীল নই। বাংলাদেশে আর কোনো গৃহহীন নেই; স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী বছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম শহরের মতো নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে।
শত অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ, রান্নাঘরে বন্দী আমাদের দেশের মেয়েরা যেন মানুষের মর্যাদা নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি কলে-কারখানায়, অফিসে-আদালতে, শিক্ষা-দীক্ষায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় গরবিনী মা হিসেবে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার কাজে সমঅধিকার ও সমান সুযোগ ভোগ করতে পারে।
জাতির জনকের অতৃপ্ত আত্মা এমন বাংলাদেশ দেখার সুতীব্র বাসনা নিয়েই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন । আমরা কি এই মঞ্চ থেকে তাঁকে এ’সান্ত্বনাটুকু দিতে পারি না- পিতা তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও, আমরা তোমার স্বপ্ন সফল করবোই।

আসুন আমরা আমাদের পিতার সেই প্রিয় স্বপ্নটির বাস্তব রূপটি দেখি- আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যোজ্বল শতায়ু নিয়ে ২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী পালন করছে সুখে, শান্তিতে ও বর্ণাঢ্য উৎসবে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়-গোত্র-গোষ্ঠী-পেশা নির্বিশেষে নারী-পুরুষ দেশবাসীকে নিয়ে আমরা এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য কাজ করতে চাই। সমগ্র জাতিকে কর্মের উৎসবে, সৃষ্টির উল্লাসে উজ্জীবিত করতে চাই।
