প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা || এসএসসি – ইতিহাস

প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা এই বিষয়টি এসএসসি [ SSC ] নবম শ্রেণী [ Class 9] এবং দশম শ্রেণী [Class 10] এর ইতিহাস [History] বিষয় এর ৫ম অধ্যায়ের [Chapter 5] পাঠ।

 

প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা

বাংলাদেশের নানাস্থানে প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পের বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে। নানা কারণে এসব শিল্পকলা ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রাচীন যুগে বাংলার শিল্পকলা খুবই উন্নত ছিল।

স্থাপত্য : প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন অতি সামান্যই আবিষ্কৃত হয়েছে। চীন দেশের ভ্রমণকারী ফা-হিয়েন ও হিউয়েন-সাংয়ের বিবরণী এবং শিলালিপি থেকে প্রাচীন যুগে বাংলার কারুকার্যময় বহু হ্য, (চূড়া, শিখা) মন্দির, স্থূপ ও বিহারের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের স্থাপত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হচ্ছে বৌদ্ধ স্তুপ।

 

গৌতম বুদ্ধের দেহের হাড় বা তার ব্যবহার করা জিনিসপত্রের ওপর স্থূপ নির্মাণ করা হতাে। পরে জৈন ধর্মাবলম্বীরাও স্থূপ নির্মাণ করত। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস ও বিদ্যাচর্চা। করার জন্য বিহার নির্মাণ করতাে। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত সােমপুর মহাবিহার পাল যুগে নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া, কয়েক বছর পূর্বে কুমিল্লা জেলার ময়নামতিতে কয়েকটি বিহারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি শালবন বিহার নামে পরিচিত।

ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পের ইতিহাসে প্রাচীন বাংলার মন্দির এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রাচীনকালে অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এ সকল মন্দির পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, রাঢ়, বরেন্দ্র প্রভৃতি অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। প্রস্তর ও ধাতু নির্মিত দেব-দেবীর মূর্তি এ যুগের শিল্পকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়। মূর্তি নির্মাণে সাধারণত অষ্টধাতু ও কষ্টিপাথর ব্যবহার করা হতাে। এছাড়া, সােনা ও রুপার ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। অতি সম্প্রতি উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামে প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন এক নগর সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

 

শিল্পকলা প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা || এসএসসি - ইতিহাস

 

নরসিংদী জেলার বেলাব, শিবপুর ও রায়পুরা উপজেলার ৫০টি স্থান থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথর ও প্রস্তরীভূত জীবাশ্ম-কাঠের হাতিয়ার, তাম্র-প্রস্তর সংস্কৃতির প্রত্নবস্তু। উয়ারী-বটেশ্বর ছিল বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগরী। এখান থেকে। ই আবিষ্কৃত হয়েছে মাটির দুর্গ-প্রাচীর, পরিখা, পাকা রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তাসহ ইটনির্মিত স্থাপত্য কীর্তি। পুরাতন ব্ৰহ্মপুত্র নদ অববাহিকায় অবস্থিত উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি নদীবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র।

এখানে বিকশিত হয়েছিল স্বল্পমূল্যবান পাথরের নয়নাভিরাম পুঁতি তৈরির কারখানা। এখানে আবিষ্কৃত উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা ও মুদ্রাভাণ্ডার, অনন্য স্থাপত্যকীর্তি, হরেক রকমের পুতি,সুদর্শন লকেট ও মন্ত্রপূত কবচ, বাটখারা, পােড়ামাটির ও ধাতব শিল্পবস্তু, মৃৎপাত্র, চিত্রশিল্প ইত্যাদি শিল্পীর দক্ষতা, উন্নত শিল্পবােধ ও দর্শনের পরিচয় বহন করে। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বৌদ্ধধর্ম প্রচারক ও পণ্ডিত অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের প্রাচীন বজ্রযােগিনী গ্রামে সম্প্রতি একটি বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিকগণ মনে করছেন এটি অষ্টম বা নবম শতকে নির্মিত বিক্রমপুরী বৌদ্ধ বিহার। বিক্রমপুর থেকে আবিষ্কৃত তাম্রশাসন, দারু (কাঠ) ও পখির নির্মিত ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ প্রভৃতি প্রত্নবস্তু প্ৰাক-মধ্যযুগের সমৃদ্ধ সভ্যতার পরিচয় বহন করে।

ভাস্কর্য : প্রাচীন বাংলায় স্থাপত্য শিল্পের পাশাপাশি ভাস্কর্য শিল্পের চর্চাও হতাে। প্রাচীন বাংলায় বহু মন্দির ছিল। তাই ভাস্কর্য শিল্পকলাও যে উন্নত ছিল তাতে সন্দেহ নেই। অনেক স্থানে মন্দির ধ্বংস হলেও তার মধ্যের দেব-দেবীর মূর্তি রক্ষিত হয়েছে। পাহাড়পুরের মন্দির গাত্রে খােদিত পাথর ও পােড়ামাটির ফলক থেকে বাংলার নিজস্ব ভাস্কর্য শিল্পের বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। খােদিত ভাস্কর্য ছাড়াও প্রাচীন বাংলায় পােড়ামাটির শিল্প খুবই উন্নত ছিল। কুমিল্লার ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়ে বেশ কিছু পােড়ামাটির ফলক ও মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে।

চিত্রশিল্প : পাল যুগের পূর্বেকার কোনাে চিত্র আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রাচীনকালেই যে বাংলায় চিত্র অঙ্কনের চর্চা ছিল তাতে কোনাে সন্দেহ নেই। সাধারণত বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরের দেয়াল সৌন্দর্যময় করার জন্য চিত্রাঙ্কন করার রীতি প্রচলিত ছিল। তখনকার দিনে বৌদ্ধ লেখকা তালপাতা অথবা কাগজে তাদের পুস্তকের পাণ্ডুলিপি তৈরি করতেন।

এ সকল পুঁথি চিত্রায়িত করার জন্য লেখক ও শিল্পীরা ছােট ঘােট ছবি আঁকতেন। রেখার সাহায্যে চিত্রাঙ্কনেও প্রাচীন বাংলার শিল্পীরা যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছেন। রাজা রামপালের রাজত্বকালে রচিত ‘অষ্টসাহস্ত্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ পুঁথি বাংলার চিত্রশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। রেখার সাহায্যে চিত্রাঙ্কনের আর একটি দৃষ্টান্ত হলাে সুন্দরবনে প্রাপ্ত ডােম্মনপালের তাম্রশাসনের অপর পিঠে উৎকীর্ণ বিষ্ণুর রেখাচিত্র।

 

 

প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা, স্থাপত্য, ধর্ম, রীতি ও অনুষ্ঠান :

Leave a Comment