আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ জাফরওয়ালে অভিযান। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
জাফরওয়ালে অভিযান

জাফরওয়ালে অভিযান
এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের উত্তাপ চরমে পৌঁছে। আলহার দখলের পরদিন জেনারেল আবরার আমাকে ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টার্সে ডেকে পাঠান। তিনি আমাকে রাখ বাবা বড়ো শাহে ১/১ পাঞ্জাব রেখে ব্রিগেডের অপর দুটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে জাফরওয়াল যেতে বলেন।
জাফরওয়ালের অবস্থান আমাদের বর্তমান অবস্থান সড়ক পথে প্রায় ৪০ মাইল দূরে। সোজা পথে এই দূরত্ব খুব কম । গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয়রা জাফরওয়াল অক্ষে তাদের সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে। এ তৎপরতায় কেবল আমাদের ডিভিশনের দক্ষিণ পার্থই উন্মোচিত হবে না।
উপরন্তু গুজরানওয়ালা-লাহোর সড়কেও ভারতীয় সেনা হামলার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হামলা প্রতিহত করতে জারওয়াল দখল করা জরুরি হয়ে ওঠে।
দুটি ব্যাটালিয়নের অভিযানের সময় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দানের পর আমি প্রায় ৩টার সময় রেকি গ্রুপ নিয়ে জাফরওয়ালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) মাহমুদ, সবার কাছে উনি মাহমুদ নামে পরিচিত, তার অধীনস্থ ৪ এফএফ-এর একটি সেকশনসহ এসকর্ট হিসেবে আমার সঙ্গী হন। আমরা জারওয়ালে পৌঁছলাম রাতে। তখনো শহরে কিছু। বেসামরিক লোকজন ছিল।
আমি একটি হাইস্কুলে আমার ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার্স স্থাপন করি এবং স্থানীয় একটি রেকি করি। ৪ এফএফ, যেটা আমাকে অনুসরণ করছিল, তাকে মোতায়েন করা হয় জাফরওয়ালের চারদিকে। পরদিন ভোরে এক কাপ পান করার পর আমি এলাকাটা অনুসন্ধান করার জন্য বেরিয়ে পড়লাম এবং দ্বিতীয় ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করার জন্য জায়গা খুঁজে বের করলাম।
দ্বিতীয় ব্যাটালিয়ন একটি অস্থায়ী অবস্থানে রাত কাটায়। এখানে মেজর ইমতিয়াজ আমার সাথে ছিলেন।জাফওয়ান ছিল প্রায় ১ হাজার গজ প্রশস্ত এক থ নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর অপর তীরে ছিল গুচ্ছ গুচ্ছ গাছ এবং লম্বা ঘাস। এগুলোর উপস্থিতি প্রতিরক্ষার জন্য ভালো। অবস্থান গ্রহণের জন্য দুটি শক্ত জায়গা বাছাই করা হয়।
একটি জাফরওয়ালে, আরেকটি নদীর অন্য ধারে। এটা শত্রু বাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করবে। দুটি অবস্থান দখল করা ছাড়া শত্রুর পক্ষে এগিয়ে আসা সম্ভব নয়। সেকেন্ড ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের কাছে এ এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাকে নদীর অন্য পারে তার ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ব্যাটালিয়ন রওনা হবার আগে মেজর টান মাহমুদ আমাকে জানান যে, নদীর অপর পারে শত্রুর ট্যাংকে চলাচল করতে দেখা গেছে। তাদের সংখ্যা প্রায় এক স্কোয়াড্রন। ওরা এতো কাছে এসে পড়ায় মনে হচ্ছিল ওরা জাফরওয়ালে আমাদের উপস্থিতি একটুও টের পায় নি।
আমি জেনারেল আবরারকে আমাদের এলাকায় সামরিক ট্যাংক চলাচল সম্পর্কে অবহিত করি। তিনি আমাকে বললেন যে, শত্রুরা চাবিন্দা এলাকায় প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করেছে, সেখানে ভয়াবহ ট্যাংক যুদ্ধ চলছে। পদাতিক বাহিনী গোপনে তাদেরকে অনুসরণ করছে। তিনি বলেন যে, জাফরওয়াল। এলাকার ট্যাংকগুলো উদ্দেশ্যবিহীন হতে পারে। এগুলোকে থামানো নিশ্চিত
করতে হবে যাতে তারা সেক্টরে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিতে না পারে। আমি মেজর টনিকে বললাম আমাদের বাম পাশ রক্ষায় মোতায়েনকৃত ট্যাংক বিধ্বংসী কামানের দায়িত্ব নিতে এবং শত্রু ট্যাংকগুলোকে মোকাবিলা করতে। তিনি তৎপর হয়ে ওঠেন।
১৫ মিনিট পরে ট্যাংক বিধ্বংসী কামানের গর্জন শোনা যায়। শত্রুকে মোকাবিলা করতে আরো ট্যাংক বিধ্বংসী কামান মোতায়েন করা হয়। টনির কাছে একটি পদাতিক রাইফেল কোম্পানি ও দুটি এমজি পাঠানো হয় তার প্রতিরক্ষা ও গোলাশক্তি বৃদ্ধি করার জন্য। টনির দক্ষ বাহিনীর ট্যাংক বিধ্বংসী গোলাবর্ষণে শত্রু ট্যাংকগুলো পিছু হটে।
এক ঘণ্টা পর আমি আবার জেনারেল আবরারের সাথে কথা বললাম। তিনি আমাকে বললেন যে, তারা শত্রুপক্ষের একটি বার্তা মনিটর করেছেন, যাতে বলা হয়েছে জাফরওয়ালে তাদের রেজিমেন্ট আক্রান্ত হয়েছে।

তিনি সৈন্যদের কর্মতৎপরতায় সন্তুষ্ট এবং আমাকে বললেন জাফরওয়ালের প্রতিরক্ষা আরো সংহত করতে। দুটি ব্যাটালিয়নকে সতর্ক রাখা হয় শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায়। কিন্তু কোনো কিছু না ঘটায় তাদেরকে সরিয়ে আনা হয়। স্ক্রিন ও টহলদলকে সামনে পাঠানো হয় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য ।
