আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর

ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পর
১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর যুদ্ধ থেকে শান্তিতে উিত্তরণ ঘটে। অফিসারদের বদলি ও রদবদল শুরু হয়। আমি ১৪তম প্যারা ব্রিগেডের কমান্ডেই রয়ে গেলাম। যুদ্ধ থেমে যাবার পর আজাদ কাশ্মির এবং শিয়ালকোট অপারেশনের সময় নেতৃত্ব দেন ব্রিগেড ১। এরপর আমার বদলির আদেশ এলো। আবার আমাকে কোয়েটায় স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি আছে ট্যাকটিকসের কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োগ করা হয়।
এ বদলিতে খুশি হলাম আমি। ট্রেনিং ইনস্টিটিউশনের কমান্ড্যান্ট হিসেবে আমি কিছু প্রজেক্ট কে করলাম। আমি চেয়েছিলাম অসমাপ্ত কাজগুলোকে স করতে। স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসে কয়েক মাস অবস্থানের পর আমাকে পদোন্নতি দিয়ে শিয়ালকোটে ৮ম ডিভিশনে বদলি করা হলো।
১৯৬৬- সালের ১৮ অক্টোবর আমি মেজর জেনারেল মোজাফফর উদ্দিনের কাছ থেকে ৮ম ডিভিশনের কমান্ড গ্রহণ করলাম। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে আমি এই এলাকাতেই ছিলাম। তাই আমাকে নতুন করে এলাকার সাথে একটুও পরিচিতি হতে হয় নি।
তারপরও আমি আরো কিছু জানার চেষ্টা করলাম। মাঝে মাঝে আমরা কোথাও তাঁবু খাটিয়ে বেশ কিছুদিন কাটাতাম। আমি ডিভিশনের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করলাম। বিভিন্ন ইউনিটের শক্তি ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
ব্যাটালিয়নের প্রতিরক্ষামূলক কাঠামোর আওতায় প্রতিটি কোম্পানির প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। সত্যিকার অর্থে আমি আমার ডিভিশনের আওতায় প্রতিটি এলাকা হেঁটে বেড়াতাম।
গোলাবর্ষণের কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর প্রতিটি মেশিনগান ও ট্যাংক-বিধ্বংসী কামানের অবস্থান নির্বাচন এবং এসব অবস্থান তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করা হয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো তদারক করা হতো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করতেন।
কোর কমান্ডার জেনারেল আবদুল হামিদ খান প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানও প্রশংসা করতেন। ৮ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা অবস্থান ঠিক হলে আমাকে লাহোরে ১০ম ডিভিশনে নিয়োগ দেওয়া হলো।
৮ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে আমাকে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং যথেষ্ট ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তারপরও আমাকে এই ডিভিশন থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়। এ ব্যাপারে জেনারেল হামিদকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান।
যে, ১০ম ডিভিশনে আমাকে দুটি কারণে বদলি করা হয়েছে। প্রথমত ৮ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে সাজানো হয়েছে, একইভাবে ১০ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাজানোর জন্য কমান্ডার-ইন-চিহ্নের ইচ্ছা এবং দ্বিতীয়ত সামরিক শাসনের দায়িত্ব পালনের জন্য।
সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে করাচিতে আমার অভিজ্ঞতা ও তৎপরতা বিচার করে আমাকে লাহোরে পাঠানো হলো। আমি মেজর জেনারেল খোদাদাদের কাছ থেকে ১৯৬৯ সালের ২২শে জু ১০ম ডিভিশনের কমান্ড গ্রহণ করলাম। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমি অপারেশনাল এলাকায় টহল দান শুরু করি এবং ১০ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা বিন্যাস সম্পন্ন করি।
৮ম ডিভিশনের চেয়েও এখানে এই কাজ চমৎকারভাবে সম্পন্ন হয়। শিয়ালকোটে যেসব ঘাটতি ও বাধা-বিপত্তি ছিল লাহোরে ১০ম ডিভিশনের ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘাটতি ও বিপত্তিগুলো দূর করা হলো। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হলো সৈন্য সংখ্যা ও প্রাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের ভিত্তিতে।
১০ম ডিভিশনের বিন্যাস আমি যেভাবে রেখে এসেছিলাম, এতো বছর পর তখনো সেভাবেই ছিল। অন্য কোনো জেনারেল এতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারেন নি।
দুটি ডিভিশনের ফ্রন্টই ১৯৭১ সালে যুদ্ধের ধাক্কা সামলেছে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ভারতীয়রা আমাদেরকে ১০ম ডিভিশনের এলাকা বামবানওয়ালা-রাভি-বেদিয়ানা সংযোগ খাল (বিআরবি) বরাবর সৈন্য মোতায়েনে বাধ্য করে।
বিআরবি এলাকার অপর পাশের সব এলাকা দখল করে নেয় ভারতীয়রা। সেখানে বলতে গেলে ভারতীয় সৈন্যরা বিনা বাধায় প্রবেশ করে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বিনা প্রতিরোধে মাইলের পর মাইল ভূখণ্ড শত্রুর হস্তগত হওয়ায় সেনাবাহিনী এবং জনগণ উভয়ের মনোবলে প্রচণ্ড ধাক্কা খায়।
আমি ১০ম ডিভিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করে আমাদের অতীত ভুলগুলো শোধরানোর চেষ্টা করি। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ১০ম ডিভিশনের প্রতিরক্ষা লাইনকে বিআরবি ডিঙিয়ে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়া হয় যাতে শত্রুকে আমাদের সীমান্তেই থামিয়ে দেওয়া যায়।
আমার প্রতিরক্ষা বিন্যাসে বিআরবি প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ব্যূহে পরিণত হয়। আমাদের দূরদর্শিতার জন্য শত্রুকে তাদের ভূখণ্ডের ৩ মাইল ভেতরে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলতে বাধ্য হতে হয় ।

আরো, আমি ১০ম ডিভিশনের অবস্থানের সামনে ট্যাংক প্রতিরোধকারী খালের পাড় বরাবর কিকার ও রাবার গাছ রোপণ করেছিলাম। এ গাছগুলো এখন ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে এবং সৈন্যদের আত্মগোপন এবং আচ্ছাদনে অনেক সহায়ক হয়েছে। এটি আমাকে গর্বিত ও আপ্লুত করে।
