আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ কমান্ড রিজার্ভের অপারেশন। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
কমান্ড রিজার্ভের অপারেশন

কমান্ড রিজার্ভের অপারেশন
৫৩তম ব্রিগেড ছিল কমান্ড রিজার্ভ। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে এটাকে চাঁদপুর-লাকসাম সেক্টরে পাঠানো হয়। নভেম্বরে আমাকে ৮টি ব্যাটালিয়ন দেওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাটালিয়নগুলো পাঠানো হলে আমার শক্তি বেড়ে যেতো। ১৭ই অক্টোবর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল হামিদ আমার কাছে একটি বার্তা পাঠান। এ বার্তায় তিনি বলেন :
“বিদ্রোহী তৎপরতা সম্পর্কে আপনার ধারণা এখানে প্রাপ্ত রিপোর্টের আলোকে সত্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। রিজার্ভের সাহায্যে বিদ্রোহ নির্মূলের পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধে আপনার লড়াইয়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আপনার কমান্ড রিজার্ভ ও প্রাপ্ত অন্যান্য রিজার্ভকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে হবে। আপনার অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ বিবেচনাধীন রয়েছে।
এটা পরিষ্কার যে, আমি কমান্ড রিভান্ডের গুরুত্বের কথা ভুলে যাই নি । জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স প্রতিশ্রুত ব্যাটালিয়ন না পাঠিয়ে আমার সাথে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণা করেছে। তাই রিজার্ভ পুনর্গঠনের চেষ্টা করি এবং খুলনায় কর্নেল হামিদের নেতৃত্বাধীন এডহক ব্রিগেডকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনি ।
৩রা ডিসেম্বরের মধ্যে ১৪তম ডিভিশনের একটি ব্যাটালিয়ন এবং সাবেক ৯ম ডিভিশনের কিছু সৈন্যও ঢাকায় পৌঁছে যায়। জেনারেল রহিমের এডহক ডিভিশনকে ঢাকা প্রত্যাহার করা হয় এবং নারায়ণগঞ্জে মোতায়েন করা হয়।
৯৩তম এডহক ব্রিগেডকে ঢাকা তলব করা হয় এবং মিরপুর এলাকার বিপরীত দিকে তারা অবস্থান গ্রহণ করে। আমি ঢাকার প্রতি ইঞ্চি ভূমির জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলাম এবং লড়াই করার জন্য সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে অবস্থান গ্রহণ করি ।
তবে অঘোষিত যুদ্ধের পক্ষে ছিলাম আমি। কারণ, এ যুদ্ধ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। তখন ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদের গভীর অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে আসে নি। ভারতীয় নৌবাহিনীও সমুদ্র অবরোধ অথবা নদী বন্দর কিংবা সমুদ্র উপকূলে হামলা চালাচ্ছিল না।
এমনকি তারা আমাদের নদীতেও প্রবেশ করে নি। পিআইএ ফ্লাইট পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চলাচল করছিল এবং ডাক ও কিছু অফিসার আসা-যাওয়া করতে পারছিলেন। মারাত্মক আহত ও নৃগণদের পশ্চিম পাকিস্তানে অপসারণ সম্ভব হচ্ছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরেরও কিছু কিছু বিমান চলাচল সম্ভব ছিল। নদী ও সড়ক পথেও যাতায়াত করা যেতো। উদাহরণস্বরূপ, ২৫শে নভেম্বর আমি যশোর যাই এবং ৯ ডিভিশনের একটি সেক্টরে যুদ্ধ তৎপরতা প্রত্যক্ষ করি।
২৬শে নভেম্বর আমি ১৬ ডিভিশনের এলাকায় যাই এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মমতাজকে সাথে নিয়ে হিলি সেক্টর পরিদর্শন করি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মমতাজকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্বাসীর স্থলাভিষিক্ত করা হয়।
৪ এফএফ- এর কমান্ডিং অফিসার কর্নেল আব্বাস আহত হয় এবং আগের দিন তাকে সরিয়ে আনা হয়। ওরা ডিসেম্বর আমি ময়মনসিংহ সেক্টরে যাই এবং ব্রিগেডিয়ার কাদির নিয়াজির নেতৃত্বাধীন ৯৩ এডহক ব্রিগেড পরিদর্শন করি। একইভাবে সমুদ্রপথও নিরাপদ ছিল। কারণ, তখনো ভারতীয় নৌবাহিনী সমুদ্রপথ অবরোধ করে নি। এ জন্য জাহাজ চলাচলে কোনো রকম বাধা ছিল না।
ভারতীয় এলাকায় গোলাবর্ষণের সুবিধাও আমার ছিল। তখন পর্যন্ত আমরা ভারতীয় এলাকায় গোলাবর্ষণ করছিলাম এবং কমান্ডো ও গেরিলা হামলা চালাচ্ছিলাম। আমাদের এসব তৎপরতা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। ভারতীয়দের গোলা-বারুদও অস্ত্রশস্ত্রের মুজদ ছিল তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে এগুলোর ওপর আমাদের হামলার আশংকায় আশপাশের বেসামরিক লোকজন।
ভারতীয় সীমান্ত থেকে ভেতরের দিকে সরে যাচ্ছিল। এতে শরণার্থী সমস্যা দেখা দেয়। তখনো রুশরা প্রকাশ্যে যুদ্ধে যোগ দেয় নি। কিন্তু পশ্চিম রণাঙ্গনে। অসময়ে ও দূরদর্শিতাপূর্ণ লড়াই শুরু হওয়ায় আমরা এতোদিন যে সুবিধা কাজে লাগাচ্ছিলাম তা হাতছাড়া হয়ে যায়। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে, এখন যা কিছু ঘটবে তা শুধু আমাদের ভূখণ্ডেই ঘটবে।
২১শে নভেম্বর ভারত যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছিল পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তার অবসান ঘটে। অঘোষিত যুদ্ধকালে আমরা তিন সপ্তাহ ভারতীয়দের সীমান্তে আটকিয়ে রেখেছিলাম। ইয়াহিয়া খান পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু না করলে আমরা ভারতীয়দের সেখানে ঠেকিয়ে রাখতে পারতাম। অবশেষে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা পূর্ব পাকিস্তানের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে।
সীমান্তে অবস্থানরত বাঙালিরা দলে দলে ভারতীয়দের সাথে যোগদান করে। ভারতীয় নৌবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তারা আমাদের নদীতে প্রবেশ করে। আমাদের উভয় পাশে ও পেছনে সৈন্য নামায়। আমাদের নৌকা ও ফেরির ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। এবং সমুদ্র উপকূল ও নদীর তীরে আমাদের অবস্থানে হামলা করে। আমাদের ৪টি গানবোট ভারতীয় যুদ্ধজাহাজে সামনে দাঁড়াতেই পারছিল না।
ভারতীয় বিমান বাহিনী কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের চলাচল বিপর্যস্ত করে দেয়। ৬ই ডিসেম্বর আমাদের একমাত্র বিমান ঘাঁটি ঢাকা বিমানবন্দরও বিষান্ত হয় এবং আমাদের এক স্কোয়াড্রন জঙ্গি বিমান একেবারে অকেজো হয়ে যায়। আমাদের অধিকাংশ সেতু, ফেরি, ফেরিঘাট, রেললাইন, রেলইঞ্জিন ও তেল মজুদ ধ্বংস হয় এবং আমাদের অবস্থান ও চলাচলের ওপর অবিরাম বিমান হামলা চলতে থাকে।
ভারতীয় বিমান হামলায় আমাদের যেসব প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম তখনো ধ্বংস হয় নি বাঙালিরা সেগুলোও ধ্বংস করে। রুশরা ময়মনসিংহ সেক্টরে আমার সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে। আমি আগেই কম-বেশি বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ ছিলাম।

কিন্তু পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আমি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই এবং পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দিনের বেলা চলাফেরা করার অর্থই ছিল হয়তো প্রাণহানি, নয়তো সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি।
