আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ পশ্চিম পাকিস্তানে যুদ্ধের বিস্তার। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
পশ্চিম পাকিস্তানে যুদ্ধের বিস্তার

পশ্চিম পাকিস্তানে যুদ্ধের বিস্তার
১৯৭১ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু না করতে পরামর্শ দিয়েছিলাম আমরা এবং আরো বলেছিলাম যে, যেখানে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় ভারত আমাদের বিরুদ্ধে সীমিত লড়াই করছে সেখানে সে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে পারে না। কিন্তু আমাদের এসব পরামর্শ ও নিষেধ উপেক্ষা করে পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ শুরু করা হয়।
আমরা জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, ভারতের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ। ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধে আমাদের ধারণাই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। এ সময়ের যুদ্ধে শত্রু উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয় এবং ভারতীয় সৈন্যরা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণে বাধ্য হয়। সকল ফ্রন্টে ভারতীয় সৈন্যদের ঠেকিয়ে রাখা হয়।
১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর আমি সেনাবাহিনী প্রধানের কাছ থেকে একটি বার্তা পাই। বার্তায় আমাকে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সর্বাত্মক হামলার আশঙ্কা থাকায় আপনাকে বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে সৈন্য মোতায়েন করতে হবে এবং নতুন নতুন অবস্থান দখলের প্রচেষ্টা চালানোর সময় কৌশলগত, রাজনৈতিক এবং সামরিক গুরুত্ব রয়েছে এমন সব এলাকাকে বিবেচনায় আনতে হবে।”
একই দিন আমার কাছে আরেকটি বার্তা পাঠানো হয়। এতে বলা হয় যে, ভারত কাশ্মীর এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে। আমি ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন অবস্থান দখলে নির্দেশ জারি করেছিলাম। সেনাবাহিনী প্রধানের নির্দেশও ফরমেশন কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
১৩ দিন পর সেনাবাহিনী প্রধান কৌশলগত, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কেন নতুন করে সৈন্য মোতায়েনের নির্দেশ জারি করলেন, আমি তার কারণ বুঝতে পারি নি। কারণ, ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর থেকে ভারতের সাথে লড়াইয়ে ইতোমধ্যেই আমাদের সৈন্য মোতায়েন করা ছিল।
সেনাবাহিনী প্রধান নিজেও এ ব্যাপারে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি আমাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা এবং সৈন্য মোতায়েন অনুমোদন দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২৯শে নভেম্বর আমাদের তৎপরতার প্রশংসা করে সি-ইন- সি একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাদেরকে জানিয়েছিল যে, ভারত পশ্চিম পাকিস্তানে হামলা করেছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, আমরাই পশ্চিম রণাঙ্গনে লড়াই শুরু করেছিলাম। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাদেরকে এ ভুল সংবাদ কেন পরিবেশন করেছিল, আমি তাও বুঝতে ব্যর্থ হই।
জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স কি কয়েকদিন আগে একজন কুরিয়ারের মারফত পশ্চিম রণাঙ্গনে তাদের পরিকল্পিত হামলা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করতে পারতো না? অথবা তারা কি একজন কর্মকর্তাকে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠাতে ভয় পাচ্ছিলেন? এতে কি তাদের পূর্ব পাকিস্তান পরিত্যাগের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যেতো? অথবা ক্ষমতায় থাকার তাদের উদগ্র আকাঙ্ক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতো?
১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বর সেনাবাহিনী প্রধান নিম্নোক্ত বার্তা পাঠান : “শত্রু আপনার বিরুদ্ধে চাপ জোরদার করেছে এবং তারা সম্ভবত এ চাপ সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যাবে। শত্রু শিগগির পূর্ব পাকিস্তান দখলের চেষ্টা চালাবে এবং এরপর অধিকাংশ সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোতায়েনের জন্য সেখানে তাদের স্থানান্তর করবে।
এটা কোনো মতেই হতে দেওয়া যাবে না। সামান্য ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হলে ছেড়ে দেবেন। তবে শত্রুর অধিকাংশ সৈন্যকে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যস্ত রাখার জন্য আপনাকে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সৈন্য মোতায়েন অব্যাহত রাখতে হবে। খুব শিগগির চীনের সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। আপনার মঙ্গল কামনা করি এবং এ ধরনের প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মুখেও আপনার চমৎকার নৈপুণ্য বজায় রাখুন।
ওপরের বার্তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, পশ্চিম রণাঙ্গনে বিজয়ের ফয়সালা । করার জন্য আমাদেরকে পূর্ব রণাঙ্গনে অধিকাংশ ভারতীয় সৈন্যকে যুদ্ধে ব্যস্ত রাখতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুযোগ না দিতে আমাদেরকে ইতোপূর্বে যে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, সেনাবাহিনীর প্রধানের বার্তায়ও একই দিক- নির্দেশনা ছিল।
আমাদের কৌশলগত ধারণা থেকে ভাবছিলাম যে, ৫ ডিসেম্বরের পর যে কোনো সময় চূড়ান্ত লড়াই শুরু হবে এবং সেনাবাহিনী প্রধান অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কোনো ক্রমেই সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে না।
এতে এ কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক নির্দেশনার আওতায় জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদেরকে তখনো লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। আমার ওপর ন্যস্ত নতুন মিশন সম্পন্ন করার কাজ আত্মসমর্পণের নির্দেশ দানের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এগিয়ে চলছিল।
হাই কমান্ডের যদি এই পরিকল্পনাই ছিল যে, ভারতের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের তরফ থেকে বড়ো ধরনের হামলা ছাড়াই ইস্টার্ন কমান্ডকে শত্রুদেরকে অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখতে হবে তাহলে ৩রা ডিসেম্বর সর্বাত্মক যুদ্ধ।
শুরু করা ছিল হাই কমান্ডের সবচেয়ে বড়ো ভুল। পশ্চিম রণাঙ্গনে তারা যদি যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা করে থাকে এবং এ পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়ে থাকে তবে এককভাবে তারাই দায়ী। ইস্টার্ন কমান্ডকে বাদ দিয়ে ভারতের সাথে আমাদের শক্তির সর্বোত্তম ভারসাম্য ছিল।
পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে পদাতিক বাহিনীতে ছিল সমতা। এ ছাড়া, ভারতের সাঁজোয়া ডিভিশন যেখানে ছিল ৩টি সেখানে পাকিস্তানের ছিল পাঁচটি। এ জন্য আমি অবশ্যই বলবো যে পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা ছিল পুরোপুরি।
আমাদের কখনো ভারতের সাথে শক্তিতে এমন শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না এবং আমি মনে করি না যে, আমরা সেই জায়গায় কখনো যেতে পারবো । হাইকমান্ডের বোকামি ও সিদ্ধান্তহীনতা এবং রিজার্ভ বাহিনী নিয়ে পরিকল্পিত আঘাত হানতে জেনারেল টিক্কা খানের ব্যর্থতার দরুন শক্তির ভারসাম্য শত্রুর অনুকূলে চলে যায়।
কৌশলগত ধারণা অনুযায়ী, পশ্চিম রণাঙ্গনে এ হামলার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে চাপ কমানো এবং পশ্চিম রণাঙ্গনে অধিকৃত ভূখণ্ডের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পেতে দর কষাকষি করার কথা ছিল।
হাই কমান্ডের নিষ্ক্রিয়তা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, পূর্ব পাকিস্তান রক্ষায় তাদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। চীন তৎপরতার উদ্ধৃতিতে আমরা ধারণা করতে থাকি যে, চীনের সহায়তায় পশ্চিম রণাঙ্গনে সর্বাত্মক যুদ্ধ চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে।
পূর্ব রণাঙ্গনে শত্রুর অধিক সৈন্যকে ব্যস্ত রাখা। এবং চীনা সহায়তার মানে ছিল যে, পশ্চিম রণাঙ্গনে আমাদের সুনির্বাচিত, সুরক্ষিত ও সুসজ্জিত অবস্থান থেকে চূড়ান্ত লড়াই শুরু হবে এবং এতে আমাদের ভাগ্যের ফয়সালা হবে।
আমরা শত্রু বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার জন্য বেশ কটি হামলা চালাই এবং তাদেরকে এক মেরু থেকে আরেক মেরুতে স্থানান্তরে বাধ্য করি। আমরা তাদের চলাচল ব্যাহত করি এবং কয়েকটি রুটে তাদের প্রাধান্যকে ১:২ অথবা ১:৩ অনুপাতে নামিয়ে আনি। দেশের ভেতরে আমাদের সর্বশেষ লড়াইয়ের অবস্থানগুলোতে যেসব সড়ক ও মহাসড়ক এসে মিলিত হয়েছে সেগুলোতে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকি
আমাদের কমান্ডো তৎপরতা এবং অন্যান্য অভিযান এবং আমাদের ধারাবাহিক প্রত্যাহারের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ সংখ্যক ভারতীয় সৈন্যদের ব্যস্ত রাখায় সফল হই। সক্ষম হই শত্রুদেরকে আমাদের সুবিধাজনক অবস্থানের কাছাকাছি নিয়ে আসতে। বস্তুত, আমরা শত্রুর ৬ মাউন্টেন ডিভিশনকে ঠেকিয়ে রাখি। তারা এ ডিভিশনকে পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল।
১৯৭১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আমরা জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স থেকে একটি সংকেত পাই। এতে আমাদেরকে ফেনির উত্তর-পূর্ব দিকে সীমান্ত চৌকি পুনরায় দখল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দৃশ্যত জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাদেরকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে চেয়েছিল।
পক্ষান্তরে, আমি সুরক্ষিত ঘাঁটিতে আমার অবস্থান সংহত করে তুলি। ৬ই ডিসেম্বর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে আমার কৌশলগত ধারণা সম্পর্কে আমি একটি বার্তা পাঠাই এবং শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে লড়াই করার সংকল্প প্রকাশ করি।
এক.
৩রা ডিসেম্বর থেকে শত্রু সর্বাত্মক লড়াই শুরু করেছে এবং পূর্ব রণাঙ্গনের সকল ফ্রন্টে শত্রুর হামলা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ৪টি পূর্ণাঙ্গ ট্যাংক রেজিমেন্টের সমর্থনে শত্রুর ৮ ডিভিশন সৈন্য এ হামলায় অংশ নিচ্ছে।
এদের সাথে আরো রয়েছে ৩৯ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ এবং ৬০ থেকে ৭০ হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিদ্রোহী। বিমান বাহিনীর ছত্রছায়ায় শত্রুরা হামলা চালাচ্ছে। ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও মাধ্যমসহ সকল উপায়-উপকরণের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক, সেতু, ফেরি এবং নৌকা প্রভৃতি।
স্থানীয় জনগণও আমাদের বিপক্ষে। অভাবে শক্তিবৃদ্ধি, ঘাটতি পূরণ অথবা অবস্থানের পুনর্বিন্যাস কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের সাথেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে যোগাযোগ। এতে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার আরো অবনতি ঘটবে।
ভারতীয় নৌবাহিনী চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া, তারা সব নদীও অবরোধ করার চেষ্টা করছে। রংপুর, সিলেট, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, চাঁদপুর ও যশোরের ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি হয়ে উঠতে পারে আরো জটিল।
দুই.
নিজেদের সৈন্যরা গত ৯ মাস ধরেই সক্রিয় লড়াইয়ে জড়িত রয়েছে এবং তারা আরো তীব্র লড়াইয়ের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কার্যত তাদের কোনো স্বস্তি অথবা বিশ্রাম নেই। বিগত ১৭ দিনের তীব্র লড়াইয়ে সৈন্য ও সাজ-সরঞ্জাম উভয় ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নিজেদের ট্যাংক, কামান ও বিমানের ছত্রছায়া না থাকায় পরিস্থিতির ঘটেছে অবনতি। অস্ত্রসহ রাজাকারদের স্বপক্ষ ত্যাগের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজেদের সৈন্যরা শত্রুদের ক্ষতি করেছে অনেক এবং সম্ভাব্য সর্বাধিক শত্রু সৈন্য হত্যা করেছে। স্থল হামলায় প্রতিটি সফলতার জন্য শত্রুকে প্রচুর মূল্য দিয়ে হয়েছে।
তিন
এ কমান্ডের আওতায় ফরমেশনগুলোর বর্তমান তৎপরতা পূর্ব পরিকল্পিত প্রতিরক্ষা লাইনে পৌঁছেছে। দুর্গ অথবা সুরক্ষিত ঘাঁটিগুলোতে আশ্রয় গ্রহণ। শত্রুরা নীতিবিবর্জিত উপায়সহ সকল ধরনের পন্থা অবলম্বন করবে। আমরা শেষ রক্তবিন্দু ও শেষ বুলেট থাকা পর্যন্ত লড়াই করবো।” সিজিএস ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ এক সংকেতের মাধ্যমে সুরক্ষিত দুর্গে সৈন্য প্রত্যাহারে আমার কৌশলগত ধারণা অনুমোদন করেন।।
উপরে বর্ণিত ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, যুদ্ধের শুরু থেকে যে কৌশলগত ধারণা গ্রহণ করা হয় এবং ইন্টার্ন কমান্ডের ফরমেশনে যা অনুসরণ করা হতো জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের কাছে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল।
এ কৌশলগত ধারণার লক্ষ্য ছিল শত্রুর সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন, সর্বাধিক সংখ্যক শত্রু সৈন্যকে যুদ্ধে জড়িত করা, সময় নেওয়া ও প্রত্যাহার করা এবং সুরক্ষিত দুর্গ ও অবস্থানে আশ্রয় নিয়ে যতক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ লড়াই করা।
৮ই ডিসেম্বর আমি সিজিএস এর কাছ থেকে জি-০৯১২, নম্বর আরেকটি সংকেত পাই। এতে বলা হয়, “তৎপরতা শুরু হয়েছে। ৭ই ডিসেম্বর প্রেরিত জি-০৯০৭ সংকেত অনুযায়ী আপনি লড়াই অব্যাহত রাখুন।”
“তৎপরতা’ বলতে মূলত চীনাদের তৎপরতার কথাই বোঝানো হয়। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স আমাকে ধোকা দিচ্ছিল। কারণ, চীনারা তখনো কোনো যোগাযোগ করে নি অথবা সংকেত দেয় নি। ৬ই ডিসেম্বর আমি যে বার্তা।
পাঠিয়েছিলাম তাতে শেষ রক্তবিন্দু ও শেষ বুলেট অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত লড়াই করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলাম। চিফ অব জেনারেল স্টাফ আমার কৌশলগত ধারণা অনুমোদন করেছিলেন। এরপর আমার সাথে কেন এ প্রতারণা করা হলো?
“এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ৬ই ডিসেম্বরের পর ইস্টার্ন ফ্রন্টে লড়াইয়ে ভারতের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ, ভারতীয় সেনাবাহিনী সকল সুবিধা ভোগ করছিল। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তারা ছিল।
অধিকতর সুসজ্জিত এবং আকাশ ও সমুদ্র পথে তাদের ছিল পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্ত পর্যন্ত চমৎকার সরবরাহ লাইন প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানের নদ-নদী ও সড়ক-মহাসড়কে তাদের অবাধ বিচরণ ছিল।
পক্ষান্তরে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের সরবরাহও ছিল অপর্যাপ্ত। পাকিস্তানিদেরকে স্থানীয় বৈরি জনগণেরও মোকাবেলা করতে হয়েছে। অন্যদিকে, মুক্তিবাহিনী ও আওয়ামী লীগ ভারতীয়দের সহায়তা দিয়েছে।

ভারতীয়দের স্থানীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও ছিল চমৎকার। এগুলো পাকিস্তানিদের ওপর জয়লাভে ভারতীয়দের যথেষ্ট সহায়ক হয়। উপরন্তু, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অধিকাংশ ইউনিট অন্তত ৬ মাস বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে জটিল লড়াইয়ে জড়িত ছিল। এতে তারা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাদের মনোবল হ্রাস পায়”
