আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ সিলাট ও আখাউরা সেক্টর। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
সিলাট ও আখাউরা সেক্টর

সিলাট ও আখাউরা সেক্টর
১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল কাজী আবদুল মজিদ সিলেট, আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলেন। পরিকল্পনা করা হয় যে, তিনি অগ্রবর্তী অবস্থান, সুরক্ষিত ঘাঁটি ও দুর্গে ভারতীয়দের সাথে লড়াই করার পর ঢাকা পিছু হটে আসবেন।
ব্রিগেডিয়ার রানার নেতৃত্বে ৩১৩তম পাকিস্তানি ব্রিগেড সিলেট রক্ষা করছিল। ৮ম ভারতীয় মাউন্টেন ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল কৃষ্ণ রাও শমসেরনগর ও কুলাউড়ায় হামলা চালান। এ দুটি জায়গায় একটি করে ভারতীয় ব্রিগেড হামলায় অংশ নেয়।
৮১তম মাউন্টেন ব্রিগেড কৈলাশবাহার, শমসেরনগর ও মৌলভীবাজার মেরু বরাবর অগ্রসর হয়। শমসেরনগর ও কুলাউড়ায় ২২ বালুচ ও টচি স্কাউটের একটি করে কোম্পানি নিয়ে গঠিত আমাদের সৈন্যরা বীরত্বের সাথে লড়াই করে।
এবং দীর্ঘদিন শত্রুর ব্রিগেডকে ঠেকিয়ে রাখে। ৩১ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত এবং ৮৭ জন আহত হয়। বিপরীত মেরুতে ৬৯তম ভারতীয় ব্রিগেড কুলাউড়ায়। হামলা চালায়। কিন্তু ৬ই ডিসেম্বর নাগাদ তারা তা দখল করতে পারে নি। তবে ব্যাপকভাবে নাপাম বোমা ব্যবহারের পর এর পতন ঘটে।
১৯৭১ সালের ৫ই ডিসেম্বর ৮১তম ভারতীয় মাউন্টেন ব্রিগেড মুন্সীবাজারে। হামলা করে। এ শহর রক্ষায় ৩০ এফএফ-এর একটি রাইফেল কোম্পানি বীরত্বের সাথে লড়াই করে। এতে কোম্পানি কমান্ডারসহ ২২ জন নিহত হয়। ইতোমধ্যে হেলিকপ্টারযোগে দুই ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য সিলেট শহরের দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবতরণ করে। ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে আমাদের ২০২তম এডহক ব্রিগেড এ শহর দখল করে নিয়েছিল।
ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লাহ অগ্রবর্তী অবস্থান থেকে পিছু হটে আসা কয়েকটি ইউনিটের সৈন্য নিয়ে এটাকে একটি দুর্গে পরিণত করেন। ব্রিগেডিয়ার আসগর হোসেনের নেতৃত্বাধীন আমাদের ৩১৩তম ব্রিগেড মৌলভীবাজার থেকে সিলেটে পিছু হটে আসে।
শত্রু এ ব্রিগেডের গতিরোধ করতে পারে নি। মেজর জেনারেল কৃষ্ণ রাও তার ডিভিশনের ৬টি ব্রিগেড নিয়ে এ শহর অবরোধ করেন। বিমান সহায়তা এবং নাপাম বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও তিনি সামনে এগিয়ে আসতে পারেন নি। অথবা সিলেটের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভাঙতে সাহস পান নি।
আর এটা উল্লেখযোগ্য যে, যুদ্ধে ক্লান্তি এবং একটি অসম যুদ্ধের সম্ভাবনা সত্ত্বেও শমসেরনগর ও কুলাউড়া থেকে পিছু হটে আসা দুটি কোম্পানি এবং আরো কিছু আধা সামরিক সৈন্য বিমান সহায়তা ছাড়া সামান্য কয়েকটি কামানের সাহায্যে কৃষ্ণ রাওয়ের ডিভিশনকে বেশ কয়েক দিন আটকে যা এবং নিজেদের প্রচণ্ড প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা সিলেট থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়।
এমন শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার কৃতিত্ব ছিল ব্রিগেডিয়ার সলিমুল্লাহ ও ব্রিগেডিয়ার আসগরের। তাদের সাহসিকতায় শত্রুর একটি গোটা ডিভিশনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শত্রুর এ ডিভিশনকে ঢাকা পাঠানোর কথা ছিল। ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লাহ ২৭তম ব্রিগেডের কমান্ডার তার ব্রিগেড নিয়ে ভৈরব বাজার সেক্টর রক্ষা করছিলেন।
সাদউল্লাহ ছিলেন একজন সাহসী অফিসার, প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি থাকতেন সম্মুখভাগে। তিনি বেয়নেটের সাহায্যে পাল্টা হামলায় ব্যক্তিগতভাবে যোগদান করে কয়েকটি জায়গা থেকে শত্রুকে হটিয়ে দেন। তাকে ‘নিশান-ই- হায়দার’ পদক প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল, কিন্তু তার পরিবর্তে তাকে দেওয়া হয় ‘হিলাল-ই-জুরাত’। এটা খুবই দুঃখজনক যে, তার মতো একজন যোগ্য অফিসারের পদোন্নতি হয় নি। তাকে মৌলবাদী হিসেবে বিচেনা করা হয়েছিল। এতে আমি মানসিক কষ্ট পেয়েছিলাম।
সাদউল্লাহর ব্রিগেড মোতায়েন ছিল। আগরতলার কাছে আখাউড়া- ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রধানত ছিল তিস্তা নদী ভিত্তিক। এর চারপাশে ছিল প্রচুর ঝিল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। আখাউড়া থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে নাম গঙ্গাসাগর। প্রতিটি শহরে আমাদের একটি করে। ব্যাটালিয়ন মোতায়েন ছিল।
লড়াই শুরু হওয়ার পর আগরতলায় ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে আমাদের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক গোলাবর্ষণ করা হতো। ২৭তম ব্রিগেড তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ২১শে নবেম্বর থেকে ৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতীয়রা আমাদের একটি অবস্থানও দখল করতে পারে নি। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রতিরক্ষা অবস্থান আশুগঞ্জ এবং পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগ পর্যন্ত ২৭তম ব্রিগেড ১৫ দিন তাদের হামলা প্রতিহত করেছে।
৫ই ডিসেম্বর, ৩১১তম ভারতীয় ব্রিগেডের অগ্রবর্তী সৈন্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। ৭৩তম ব্রিগেডও পরদিন এগিয়ে আসতে থাকে। মেজর জেনারেল গনজালভেজের নেতৃত্বে একটি মুক্তি ফৌজ ২১শে নবেম্বর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তৎপরতা চালাচ্ছিল। ভারতীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রায় মুক্তিবাহিনী সর্বোতভাবে সাহায্য করেছে। মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীকে আমাদের অবস্থান, অস্ত্রশস্ত্র ও শক্তি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে।
অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও যখনি প্রয়োজন হতো, একদল স্থানীয় লোক শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতো। ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে (ভারতীয় বাহিনীর কাছে তথ্য সরবরাহের জন্য কোনো স্থানীয় লোককে সন্দেহ হলে পাকিস্তানিরা তাকে নির্যাতন করে হত্যা করতো) তারা রাতে উধাও হয়ে যেত এবং সকাল হওয়ার আগে শত্রুর সুরক্ষিত অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে ফিরে আসতো।
এ উপায়ে আমাদের সৈন্যরা অথযাত্রা বজায় রাখতে, শত্রুর অবস্থানের আশপাশে তৎপরতা চালাতে এবং বরাবর এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দেশের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বহন করার প্রয়োজন হলে বাঙালি গ্রামবাসী, প্রতিরোধ যোদ্ধা, স্কুলের ছাত্র প্রভৃতি লোকজনকে তৎক্ষণাৎ পাওয়া যেত- সবাই সাহায্য করার জন্য ছিল প্রস্তুত।
‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সিডনি সেনবার্গ সে সময় একটি অগ্রবর্তী ব্রিগেডের সাথে ছিলেন। তিনি একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন । ২২ জন স্থানীয় লোককে ‘একটি ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চি মাঝারি কামানকে পানিতে ভর্তি একটি মাঠের মধ্য দিয়ে ঠেলে নিয়ে যেতে এবং অন্যান্যদের গোলা-বারুদ বহন করতে দেখেছেন।’
ভারতীয়রা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত পাকিস্তানি সৈন্যদের মোকাবেলা করার লক্ষ্যে আগরতলার দক্ষিণ দিক থেকে কুমিল্লা অভিমুখে একটি বহর পাঠায়। শত্রুরা দ্রুত আশুগঞ্জ সেতু দখলের চেষ্টা চালায়।
কিন্তু আমরা তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিই। আমরা তাদের ডিভিশনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘাঁটি গেড়ে বসতে দিই নি। আমরা আশুগঞ্জ সেতু ধ্বংস এবং আখাউড়ার পশ্চিম দিকের সেতুটি শত্রুর ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য। অকেজো করে দিই।
৯ই ডিসেম্বর ভারতের ৩১১তম ব্রিগেডের অগ্রবর্তী সৈন্যরা এগিয়ে আসার, আগে আমাদের ২৭তম ব্রিগেড আশুগঞ্জে বাংকারে অবস্থান গ্রহণ করে। ভারতীয়দেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আশুগঞ্জ আসতে দেওয়া হয়। আশুগঞ্জে তাদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়েছিল। ফরমেশনগুলোর গোলাবর্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়। আমরা ভারতীয়দেরকে আমাদের সুরক্ষিত এলাকায় এগিয়ে আসার সুযোগ দিই। এরপর শুরু হয় তাদের ওপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ ।
আমাদের কার্যকর গোলাবর্ষণে ১২০ জন ভারতীয় সৈন্য নিহত এবং তাদের ৪টি ট্যাংক ধ্বংস হয়। আরেকটি ব্যাটালিয়ন শত্রুর শক্তি বৃদ্ধি করে। ব্রিগেডিয়ার সাদউল্লাহর নেতৃত্বে একটি পাল্টা হামলায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।
১৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল কাজী মজিদ আশুগঞ্জ সেতু উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ সময় আমাদের ২৭তম ব্রিগেড ছিল মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে। তবে তখনো আশুগঞ্জ সেতুর প্রতি তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি ছিল না। ব্রিগেড নদী পার হয়ে ভৈরব বাজারে পৌঁছতে সক্ষম হয়।
ভারতীয়রা হেলিকপ্টারের সাহায্যে মেঘনা অতিক্রম করে ভৈরব বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবতরণ করতে থাকে। নরসিংদীতে ভারতীয়দের সমরসজ্জা ছিল ধীর-স্থির। এখানে আমাদের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের বাধা দেওয়া হয় নি।
মেঘনা নদী দিয়ে ট্যাংক ও কামান বয়ে নিয়ে আসা ছিল একটি দুরূহ কাজ। আমাদের মাঝারি ও ভারী কামান না থাকায় আমরা শত্রুর অবতরণে বাধা দিতে। পারি নি। আমার কাছে ট্যাংক রেজিমেন্ট ও দূরপাল্লার কামান থাকলে শত্রুবা হেলিকপ্টার যোগে সৈন্য অবতরণ অথবা টাঙ্গাইলে ছত্রসেনা নামাতে পারতো না।
আমার কাছে অন্তত কয়েক স্কোয়াড্রন জঙ্গী বিমান থাকলে আমি শত্রুর ট্যাংক চলাচলে বাধা দিতে সক্ষম হতাম, ছত্রীসেনা ও হেলিকপ্টার সৈন্য অবতরণ অথবা টাঙ্গাইলে ছত্রীসেনা নামাতে পারতো না। আমার কাছে অন্তত কয়েক স্কোয়াড্রন জঙ্গী বিমান থাকলে আমি শত্রুর ট্যাংক চলাচলে বাধা দান, ছত্রীসেনা ও হেলিকপ্টারে সৈন্য অবতরণ এবং তাদের নদী অতিক্রম রুখে দাঁড়াতে পারতাম।
সার্বিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার আওতায় ১৪তম পদাতিক ডিভিশনের ওপর নরসিংদী নারায়ণগঞ্জ সেক্টর রক্ষার দায়িত্বও অর্পণ করা হয়। সিলেট ও আশুগঞ্জ থেকে তাদেরকে সেখানে পিছু হটার নির্দেশ দেওয়া হয়। সিলেট ব্রিগেড মৌলভীবাজারে এসে পড়ে। মজিদকে এসব সৈন্য ঢাকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি তাদেরকে পুনরায় সিলেটে পাঠিয়ে দেন।
ভৈরব সেতু ধ্বংস করে দেওয়ার পর মজিদকে ঢাকায় পিছু হটার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি প্রথমে তাকে নরসিংদীতে পিছু হটতে বলি। কিন্তু তিনি আমার নির্দেশ পালনে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। রেলওয়ে লাইন তখনো উন্মুক্ত ছিল। ঢাকা আসার জন্য তাকে ৬পি ফেরি দেওয়া হয়। ভারতীয়রা রেলপথ দখল করে নেয়। মজিদের সৈনারা নীরব দর্শকের মতো চেয়ে চেয়ে এ ঘটনা দেখেছে।
মজিদ খুব সহজেই ঢাকা পৌঁছতে পারতেন। কিন্তু তিনি কখনো ঢাকা আসার চেষ্টা করেন নি। তার এ অবাধ্যতা হচ্ছে ইস্টার্ন গ্যারিসনের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। তিনি জানতেন যে, ঢাকার প্রতিরক্ষা হচ্ছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তা জেনেও তিনি আমার নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হন। এরপর আমি তাকে ডিভিশনের কমান্ড থেকে অপসারণ করি এবং তার সৈন্যদেরকে।
৩৬তম (এডহক) ডিভিশনের আওতায় ন্যস্ত করি। সিলেট-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলকে এ ডিভিশনের আওতায় ন্যস্ত করা হয়। ১৪তম ডিভিশনের ঢাকায় নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছতে ব্যর্থ হওয়ার পর আমাকে এসব পুনর্বিন্যাস করতে হয়।
যুদ্ধ তুঙ্গে থাকার কারণে মজিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মতো সময় তখন আমার হাতে ছিল না। যুদ্ধের পুরোটা সময় সাদউল্লাহ অত্যন্ত চমৎকারভাবে যুদ্ধ করেন। তাকে ঢাকায় ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। তার সৈন্যরা ঢাকা মেরুতে নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছতে পারলে শত্রুরা সাফল্যের সাথে নরসিংদীতে হেলিকপ্টারে সৈন্য নামাতে পারতো না।
ঢাকার প্রতিরক্ষা জোরদারে মৌলভীবাজারে মোতায়েন ব্রিগেড ও সাদউল্লাহর ব্রিগেডকে না পাঠানোয় জেনারেল গুল হাসানের নেতৃত্বাধীন জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সের একটি গোষ্ঠীর সাথে মজিদের যোগসাজশ সম্পর্কে আমার মনে একটি দৃঢ় সন্দেহ দেখা দেয়।
জেনারেল গুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ওই গোষ্ঠীটি ইস্টার্ন গ্যারিসন ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। আমি মজিদের অসৈনিকসুলভ আচরণ এবং নির্দেশ পালনে অক্ষমতা তুলে ধরে তার সম্পর্কে একটি কঠোর রিপোর্ট পেশ করি। তার অবাধ্যতার জন্য তার এলাকায় শেষ মুহূর্তে লড়াইয়ে চরম বিপর্যয় দেখা দেয়।
তিনি ভৈরববাজারের কাছে হেলিকপ্টার থেকে অবতরণকারী ভারতীয় সৈনাদের, ওপর খুব সহজে হামলা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাদের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালান নি। হেলিকপ্টার থেকে অবতরণের সময় ভারতীয় সৈন্যরা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। সে সময় খুব সহজেই তাদেরকে ফাঁদে ফেলে ধ্বংস করা যেত। জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স মজিদকে শাস্তি দানের পরিবর্তে পুরস্কৃত করে। অবসর গ্রহণের পর তাকে লোভনীয় চাকরিও দেওয়া হয়।
ইতোপূর্বে ভৈরব বাজারের পেছনে ভারতীয় ছত্রীসেনা অবতরণ করলে ১৪তম ডিভিশন এবং ২৭তম ব্রিগেড তাদের ওপর হামলা চালাতে এবং ঢাকার প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণ করতে ঢাকায় আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদেরকে হামলা, চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় নি।
জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স ফজল মুকিমকে নিযুক্ত করে ঘটনাবলি সম্পর্কে তাদের নিজেদের ভাষ্য লেখার জন্য। কাজী মজিদ ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদের (ভূপালী) ভাই। লাহোরে অবস্থানরত অফিসারদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে ইন্টার্ন কমান্ড ও আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের জন্য জেনারেল টিক্কা জেনারেল হামিদকে নিযুক্ত করেছিলেন।
মজিদকে নির্দোষ প্রমাণ এবং ইস্টার্ন কমান্ডের ওপর দোষ চাপানোর এটা ছিল একটি সুচিন্তিত প্রচেষ্টা মজিদ ভৈরব সেতু উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তার এ নির্দেশ দান খুবই রহস্যময়। কারণ, এ সেতুর প্রতি তখন কোনো হুমকি ছিল না।
তদুপরি সাদউল্লাহর ব্রিগেড ছিল মেঘনা নদীর অপর পাড়ে। নিজের এলাকায় শত্রুর ওপর হামলার জন্য একজন জেনারেলের অনুমতি চাওয়ার প্রয়োজন নেই। মজিদকে ঢাকায় পিছু হটে আসার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
সুতরাং পূর্ব-নির্ধারিত এলাকায় আসার জন্য তাকে অনুমতি চাইতে হবে কেন? মুকিম কার কাছ থেকে এ তথ্য জানতে পেরেছেন, তা আমি বুঝতে পারছি না। তিনি যখন এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বই লেখা শেষ করেছেন তখন কাজী মজিদসহ আমরা ছিলাম ভারতে যুদ্ধবন্দি। আরেকটি কথা হলো, ভারতের হেলিকপ্টারবাহিত সৈন্যদের মোকাবেলায় মজিদের গুরুতর অক্ষমতার অভিপ্রায় সম্পর্কে মুকিমের বইয়ে কিছুই বলা হয় নি
মুকিম হচ্ছেন একজন ভাড়াটিয়া লেখক। তিনি তার কলম এবং বিবেক বিক্রি করেছেন। তাকে যা বলা হয়েছে তিনি তাই লিখেছেন। ভৈরবে মজিদের পেছনে ছত্রীসেনা নয়; হেলিকপ্টারবাহিত সৈন্য অবতরণ করেছিল। এর একদিন আগে টঙ্গীর কাছেও ছত্রীসেনা অবতরণ করেছিল। জায়গাটি ছিল মজিদের অবস্থান থেকে বহুদূরে।
তিনি সেখানে যান নি এবং তাই তার এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করার প্রশ্নই ওঠে না। হিলির পতন সম্পর্কে মুকিম যে ধরনের মিথ্যাচার করেছেন মজিদের অবস্থানের কাছে ভারতীয় সৈন্য অবতরণ সম্পর্কেও তিনি একই ধরনের মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো, গুল হাসান, টিক্কার মতো লোক যারা পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত করেছিলেন, তাদের অপরাধ ও স্খলন চাপা দেওয়ার জন্যই মুকিম কলম ধরেছিলেন।
সেতু এলাকা থেকে প্রায় দুই মাইল দক্ষিণে ভারতীয় সৈন্যরা মেঘনা নদী অতিক্রম করে। ভৈরব বাজারে শত্রু গ্যারিসন নদী পারাপার বন্ধের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয় নি। এমনকি তারা হেলিকপ্টারে সৈন্য নামানোর ঘটনাও প্রত্যক্ষ করতে পারে নি। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে এবং নিজেদের মনোবল ভেঙে যাওয়ায় তার বাংকারে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখে।
এই একটিমাত্র ঘটনায় একজন ভারতীয় লেখক আমাদের সৈন্যদের সাহসিকতা ও মনোবল সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। কাজী মজিদের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ভূমিকার জনাই ভারতীয় লেখক এমন মন্তব্য করতে পেরেছেন। অথচ তার এসব সৈনাই ১৫ দিন শত্রুর একটি ডিভিশনকে কোণঠাসা করে রেখেছিল এবং আশুগঞ্জে ট্যাংকের সমর্থনপুষ্ট শত্রু বাহিনীকে বেয়নেটের সাহায্যে বিতাড়িত করেছিল।

সৈন্যদের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় উদ্দীপনা ছিল এবং কমান্ডারদের আরোপিত যে কোনো দায়িত্ব পালনের আগ্রহও তাদের ছিল। মজিদের কাপুরুষোচিত মন-মানসিকতার জন্যই ভারতের। হেলিকপ্টারবাহিত সৈন্যরা আমাদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
