আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ঢাকা বৃত্ত সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা। যা ” দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান- এ এ কে নিয়াজি” বইয়ের অংশ।
ঢাকা বৃত্ত সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা

ঢাকা বৃত্ত সম্পর্কিত ভুল ধারণা এবং ভারতীয় পরিকল্পনা
ঢাকা বৃত্ত সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা
বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ডেলটা সার্কেলে তার অবস্থান। তাই পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী ঢাকার নিচে একত্রিত হয়েছে এবং এগুলো গঠন করেছে একটি অসম ত্রিভুজের দুটি বাহু। এ ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু ছিল উত্তরাঞ্চলে যেখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
ঢাকার এ এলাকা এবং এর উপকণ্ঠকে ভারতীয়রা তিনটি নদীর নামের আদ্যাক্ষর অনুসারে ‘পিবিএম’ বা ‘ঢাকা বৃত্ত’ বলে অভিহিত করতো। আমি যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই তা হচ্ছে ভারতীয়দের ধারণা অনুযায়ী পিবিএম এলাকায় আমার সৈন্য মোতায়েন করা উচিত ছিল কি-না।
এ ভুল ধারণা সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে ভারতীয়দের মনে এ ধরনের প্রশ্ন কীভাবে জন্ম নিলো তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। ভারতীয়দের ধারণা অনুযায়ী পিবিএম-এর অভ্যন্তরে সৈন্য মোতায়েন করলে আমার ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের একটিও আমি বাস্তবায়ন করতে পারতাম না এবং বিনা যুদ্ধে শত্রুদের কাছে আমাকে হার মানতে হতো। আমি কীভাবে ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিবাহিনীর অনুপ্রবেশের রুটগুলো বন্ধ করতাম?
যোগাযোগ কেন্দ্র, ঘাট, সেতু ও ফেরিঘাটের মতো রুটগুলো আমাকে খোলা রাখতে হয়েছে। আমরা সীমান্তে উপস্থিত না থাকলে কীভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পুনরুদ্ধার করা যেতো এবং সেখানে কীভাবে নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হতো?
প্রদেশের তিন-চতুর্থাংশ এলাকা থেকে সরে এলে আমরা কীভাবে সকল বিভাগীয় জেলা ও মহকুমা সদর দপ্তর ও থানা নিয়ন্ত্রণে রাখতাম? অথবা আমরা কীভাবে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠায় এবং ভারতীয় ঢাকা ত্রিভুজের অভ্যন্তরে অবস্থান করলে অথবা আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে অবস্থান না করলে এসব কোনো কিছুই করা সম্ভব ছিল না।
সর্বোপরি, আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া আরো বহু সমস্যা ছিল যেগুলো হতো আরো জটিলতর। আমাদের উপযুক্ত সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। আমরা এডহক ব্যবস্থা এবং অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেছি।
আমরা যুদ্ধ ও বাঁচার জন্য হাতের কাছে যা পেয়েছি সেগুলোর ওপরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ভর করেছি। বিরাট এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্যই আমরা তা করতে পেরেছি। পিবিএম এলাকার ভেতরে সীমিত থাকলে আমরা গোটা বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত টাটকা রেশন সংগ্রহ করা দুরূহ হতো। তখন আমাদেরকে পুরনো ও শুষ্ক রেশনের ওপর বেঁচে থাকতে হতো।
টাটকা খাবারের ঘাটতির কারণে অপুষ্টির শিকার ও অর্ধভুক্ত সৈন্যদের নানা রকম রোগ-বালাই দেখা দিতো। হাজার হাজার উর্দুভাষী লোক নিরাপত্তার জন্য এ এলাকায় ভীড় জমাতো এবং তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা এক কঠিন সমস্যা হয়ে দেখা দিতো।
শত্রুরা খাদ্য সরবরাহের রুটগুলো বন্ধ করে দিতো। ক্ষুধা, চিকিৎসা ও পয়ঃপ্রণালীর অভাবে একটি মহামারী দেখা দিতে পারতো এবং আমার সৈন্যসহ লোকজন মশা-মাছির মতো মারা যেতো। তখন তাদেরকে যথাযথভাবে কবর দেওয়াও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াতো।
পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (পিবিএম) নদীর ভিত্তিতে প্রতিরক্ষার ধারণা খুবই। বিতর্কিত। এ বিষয়টি জটিলতর করতে আবেগ একটি বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। ভারতীয়রা তাদের বোকামি ও ব্যর্থতা, তাদের হাই কমান্ডের অদক্ষতা, তাদের ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা এবং অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সত্ত্বেও তাদের ফিল্ড কমান্ডারদের নিম্নমানের তৎপরতা আড়াল করার অশুভ উদ্দেশ্যে তারা এ পিবিএম ধারণার কথা উল্লেখ করেছে।
ভারতীয়রা তাদের জনগণকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে, ১৯৬৫ সালের পর থেকে তাদের সশস্ত্র বাহিনীর তৎপরতার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বাইরের শক্তির সহায়তা ছাড়া ভারত তার নিজের শক্তিতে এ লড়াইয়ে বিজয়ী হতে পারতো না। তাদেরকে এ সহায়তা দিয়েছে আমার হাই কমান্ড যারা ভারতীয়দের মতো পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছিলেন।
ঢাকা ত্রিভুজ’ ধারণাকে এর সত্যিকার পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করা হয় নি। মেজর জেনারেল ফজল মুকিম, মেজর সিদ্দিক সালিক ও মেজর জেনারেল ফরমান আলীর মতো কিছু পাকিস্তানি লেখক ও ভারতীয়দের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছেন যে, পিবিএমই ছিল আমার অবরুদ্ধ ইস্টার্ন কমান্ডের লড়াইয়ের একমাত্র কৌশল। তবে তাদের কথা বলার সাহস নেই যে, ইন্টার্ন গ্যারিসনের স্বল্পসংখ্যাক ক্লান্ত, অবসন্ন ও অর্ধসজ্জিত সৈন্য শত্রুদেরকে কেবল ঠেকিয়েই রাখে নি, তাদেরকে তাদের কোনো মিশনও পূরণ করতে দেয় নি।
পক্ষান্তরে, চলাচলের সুযোগ এবং উভয় পার্শ্ব ও পশ্চাৎভাগ আশংকামুক্ত এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো উদ্যোগ গ্রহণ করার ও যুদ্ধে জয়লাভের প্রতিটি সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ওয়েস্টার্ন গ্যারিসন যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারে নি। কিন্তু এটা বিবেচনায় আনা হচ্ছে না। কান দেওয়া হচ্ছে ভারতীয়রা উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে ভুল ধারণা প্রচার করছে তার ওপর।
ভারতীয়দের এ প্রচারণায় বিভ্রান্ত হওয়ার আগে কেউ প্রাসঙ্গিক পয়েন্টগুলো তলিয়ে দেখছে না। ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা বিন্যাস অনুসরণ করা হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে এখনো এলাকার অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা ও অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা বিন্যাস অনুসরণ করা হচ্ছে।
এক কথায়, আমরা পুরোপুরি আমাদের জাতীয় ভূখণ্ড ও শহর, নগর, যোগাযোগ কেন্দ্র, বন্দর প্রভৃতি রক্ষা করছি। এটা হচ্ছে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাওয়া একটি প্রতিরক্ষা ধারণা। পাকিস্তান ও ভারত উভয়েই উত্তরাধিকার সূত্রে এ ধারণা লাভ করেছে। অগ্রবর্তী অবস্থান গ্রহণের অন্যতম কারণ হচ্ছে ভৌগলিক সীমাবদ্ধতা।
পাকিস্তানের এ সীমাবদ্ধতা থাকায় কোনো ক্রমেই শত্রুকে দেশের ভেতরে ঢোকার সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। রাশিয়ার মতো বড়ো বড়ো দেশগুলো শত্রুকে ভেতরে ঢোকার সুযোগ দিতে পারে। কারণ, এসব দেশের ভেতরে প্রচুর জায়গা আছে।
সে জন্য তারা শত্রুকে ভেতর ঢোকার সুযোগ দিয়ে তাদের ধ্বংস করতে পারে। সীমান্তের কাছে অবস্থিত শহর, যোগাযোগ কেন্দ্র ও রাস্তাঘাটের পতন হলে তাতে একটি বিরাট বিরূপ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়। চীনের সাথে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারত সেলায় প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করে। কিন্তু বোমদিলা ছিল প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহণ করার উপযুক্ত জায়গা। ভারতীয় মন্ত্রিসভা এবং সে দেশের জনগণ লড়াই ছাড়া জাতীয় ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার কৌশলগত ধারণা মেনে নিতে পারে নি।
ইস্টার্ন গ্যারিসনকে একটি জটিল লড়াই করতে হয়েছে। একদিকে, তাকে লড়াই করতে হয়েছে ভূখণ্ডের ভেতরে বিদ্রোহীদের সাথে এবং অন্যদিকে, বহির্শক্তি ভারতের বিরুদ্ধে। আমাকে পূর্ব পাকিস্তান রক্ষার রাজনৈতিক মিশন দেওয়া হয়। এ মিশনের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, মুক্তিবাহিনীর হাতে কোনো ভূখণ্ডের পতন হতে না দেওয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ভারতকে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠায় বাধা দেওয়া।
পশ্চিম রণাঙ্গনে শত্রুর সাথে শক্তির ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে পূর্ব রণাঙ্গনে অধিক ভারতীয় সৈন্যকে ব্যস্ত রাখার সামরিক মিশনেও আমাকে শৃঙ্খলিত করা হয়। পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গন ছিল পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। কারণ, উভয় রণাঙ্গনের লড়াই নিয়ন্ত্রণ করেছে জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স।
পশ্চিম রণাঙ্গনে আমাদের ছিল ৫টি সাঁজোয়া ডিভিশন এবং অন্যদিকে, ভারতের ছিল মাত্র ৩টি। এ ছাড়া পশ্চিম রণাঙ্গনই যুদ্ধ শুরু করেছিল। তাই আক্রমণাত্মক তৎপরতার মাধ্যমে তাদের ইন্সিত বিজয় অর্জন করা উচিত ছিল। বাঙালিদের সমর্থন দানে ভারতকে বিরত রাখতে এবং আমাদের সম্ভাব্য দখলীকৃত ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ভারতকে চুক্তি স্বাক্ষরে তারা বাধ্য করতে পারতো। এভাবে পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যেতো।
আমার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব আমি পালন করি। আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১২তম ডিভিশন পদাতিক সৈন্য, ৩৯তম ব্যাটালিয়ন বিএসএফ, কয়েক স্কোয়াড্রন ট্যাংক, ১৭তম স্কোয়াড্রন জঙ্গিবিমান ও ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি বিরাট অংশকে পূর্ব রণাঙ্গনে ব্যস্ত রাখি এবং পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতের বিপরীতে আমাদের ভারসাম্য রক্ষা করি।
কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, ওয়েস্টার্ন গ্যারিসন তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করতে পারে নি। ‘ঢাকা ত্রিভুজ’ নিয়ে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখব যে, ঢাকা বিভাগের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে এ ত্রিভুজ গঠিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগের এক বৃহৎ অংশ এবং আরো তিনটি বিভাগ চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী হচ্ছে এ ত্রিভুজের বাইরে।
আমি কি চট্টগ্রাম (সমুদ্র বন্দর) ও বিভাগীয় সদর দপ্তর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চালনা (সমুদ্র বন্দর), খুলনা (সমুদ্র বন্দর) ও বিভাগীয় সদর দপ্তর, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী (বিভাগীয় সদর দপ্তর), হিলি, সৈয়দপুর, নাটোর, পাবনা, বেড়া, রংপুর, বগুড়া, সিলেট, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, চাঁদপুর, টেকনাফ ও নোয়াখালী ছেড়ে দিতে পারতাম?
ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের বাদবাকি অংশ ছিল এ ত্রিভুজের বাইরে। এসব জায়গা থেকে সৈন্য প্রতাহ্যারের অর্থ ছিল লড়াই করা ছাড়া অথবা একটি গুলি খরচ করা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের তিন-চতুর্থাংশ জায়গা ছেড়ে দেওয়া। তখন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেতো।
একইভাবে, পশ্চিম রণাঙ্গনে মারালা (হেডওয়ার্ক), শিয়ালকোট, পাসরুর, নারোয়াল, জাফওয়াল, শকরগড়, ওয়াগা (হেডওয়ার্ক), বেদিয়ান (হেডওয়ার্ক), কাসুর, রাওয়ালনগর, রেতি, ধারকি, ওমরকোট, মিরপুরখাস, চর ও বাদিনের মতো সীমান্ত শহর ও নগরগুলো ছেড়ে আমরা নদ-নদীর পেছনে হটে আসতে পারি নি।
আমরা যা পশ্চিম রণাঙ্গনে করতে পারি নি, পূর্ব-রণাঙ্গনে আমরা তা কীভাবে করতে পারি? একই দেশে ও একই সেনাবাহিনীতে দুই রকম মানদণ্ড কেনা নির্দেশ ছাড়া সৈন্য প্রত্যাহারে পুরো যুদ্ধ পরিকল্পনাই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, তা হতো বিপর্যয়কর এবং কোর্ট মার্শালযোগ্য অপরাধ।
অদূরদর্শী হলে ঢাকা ত্রিভুজের ভেতর সৈন্য প্রত্যাহার করে আমি আমার প্রতিরক্ষা এলাকার আয়তন সীমিত করতে পারতাম। বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে, ঢাকা ত্রিভূজের ভেতরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে হলে আমাকে আমার ভারী অস্ত্রশস্ত্র, ট্যাংক ও গোলাবারুদের একটি বড়ো অংশ পেছনে ফেলে আসতে হতো। এটা হতো ভারতীয়দের জন্য একটি আশীর্বাদ।
আমি এ ত্রিভুজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে ভারতের ১২ ডিভিশন সৈন্যের বেশির ভাগ উদ্বৃত্ত হয়ে পড়তো। মুক্তিবাহিনী ও বাঙালি ভিন্নমতাবলম্বীদের সহায়তায় তিন থেকে চার ডিভিশন ভারতীয় সৈন্যই এ ত্রিভুজে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অবরুদ্ধ ও আটক করে ফেলতে পারতো এবং ভারত তার উদ্বৃত্ত ৭/৮ ডিভিশন সৈন্য, অধিকাংশ সমরাস্ত্র ও বিএসএফ ব্যাটালিয়ন, বিমান ও নৌ বাহিনীর একটি বৃহৎ অংশ অতি সহজে পশ্চিম রণাঙ্গনে সরিয়ে নিতে পারতো।
সে ক্ষেত্রে ভারতীয়রা বড়ো ধরনের জটিলতা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান গ্রাস করার অবস্থায় উন্নীত হতো। নদী পারাপার ভারতীয় পদাতিক বাহিনীর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দেখা দিতে পারতো। তবে বিমান ও হেলিকপ্টারে সৈন্য পরিবহন করে তারা সে বাধাও অতিক্রম করতে পারতো। আমাদের বিমান বাহিনী যেখানে ছিল ক্ষুদ্র ও নিশ্চল এবং সৈন্য চলাচল ছিল রুদ্ধ সেখানে আমাদের পক্ষে ভারতীয় সৈন্য পরিবহনে বাধা দেওয়া সম্ভব হতো না।
বিমান বাহিনীর পরিপূর্ণ আধিপত্য, স্থানীয় জনগণের সহায়তা, ছত্রী সেনা অবতরণের সুযোগ এবং উত্তর দিক থেকে নিরাপদে এগিয়ে আসার সুবিধা ভারতীয়দের এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতো যেখানে ঢাকা ত্রিভুজকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শুধু অকার্যকরই নয়, ইস্টার্ন গ্যারিসনের সৈন্যদের জন্য একটি মরণ ফাঁদও হতো।
অধিকাংশ নদীর উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ভারত। সেখান থেকে পরে নদীগুলো পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। এ জন্য ভারতীয়রা নদী পাড়ি না দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের গভীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারতো। শুধু ঢাকায় প্রবেশ করার জন্য নদী অতিক্রম করতে হতো। তবে এ কাজও তারা বিমানের ছত্রছায়ায় উভচর যান ও জাহাজ এবং স্থানীয় মাঝি-মাল্লাদের সহায়তায় সম্পন্ন করতে পারত।
শক্তি প্রয়োগই ছিল ভারতীয়দের নদী পাড়ি দিয়ে ঢাকায় প্রবেশে বাধা দেওয়ার সর্বোত্তম উপায়। তাদেরকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ঢাকা থেকে দূরে রাখার মানে ছিল নদীর বিপরীত পাশে অবস্থান নিয়ে ভারতীয়দের আটকে রাখা।
একজন মানুষের মতো একটি সেনাবাহিনীও ঘুরে না দাঁড়ালে সে শত্রুর আঘাত থেকে যথাযথভাবে তার পশ্চাৎভাগ রক্ষা করতে পারে না। ঘুরে দাঁড়াতে গেলে সাময়িকভাবে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। পেছনে হামলার ভয়ে মস্তিষ্ক খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
উল্লিখিত নদ-নদীর বাইরে সৈন্য মোতায়েন করায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারা দেশে ছড়িয়ে যায় এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সম্ভব হয়। তখন আমি সামনাসামনি ভারতীয়দের ওপর হামলা করতে পেরেছি ।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের উভয়পার্শ্ব ও পশ্চাৎভাগ রক্ষায় পর্যাপ্ত সৈন্যের প্রয়োজন দেখা দেয় নি। তাই আমি আমার পশ্চাৎভাগ রক্ষা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে মুক্তিবাহিনী ও বাঙালি ভিন্ন মতাবলম্বীদের বৃহদাংশকে বিচ্ছিন্ন রাখার জন্য বড়ো বড়ো নদীগুলো ব্যবহার করি।
পক্ষান্তরে, ঢাকা ত্রিভুজকেন্দ্ৰিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলা হলে তা মরণ ফাঁদে পরিণত হতো যা ভারতীয়দের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিতো। অনুগত জনগণ বিশেষ করে উর্দুভাষী স্থানীয় বিহারীদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করা ছিল ইস্টার্ন কমান্ডের অন্যতম দায়িত্ব। আমরা এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হই। নয়তো জাতিগত নিধন চলতো।
বেলুচিস্তান অভিযানকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো পিএনএ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিয়াউল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন শান্তিকালীন অবস্থানে সৈন্যদের ফিরিয়ে আনতে কতো সময় লাগবে। তাকে তখন জানানো হয়েছিল যে, কমপক্ষে ৪৫ দিন সময় লাগবে। বেলুচিস্তানে ছিল মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ কট্টর গেরিলা।
অন্যদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে ছিল লাখ লাখ মুক্তিবাহিনী, ১২ ডিভিশন ভারতীয় সৈন্য এবং হাজার হাজার সশস্ত্র বাঙালি। বেলুচিস্তানে সৈন্যদেরকে অভিযান চালাতে হয়েছে কেবল শহরগুলোতে। সৈন্য চলাচলে কোনো বাধা-বিঘ্ন ছিল না। সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অক্ষুণ্ণ
পক্ষান্তরে, পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্যদেরকে নোয়াখালী, চালনা, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহী, হিলি, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর, সৈয়দপুর, সিলেট,ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, টেকনাফ ও কক্সবাজারসহ অন্যান্য বহু শহরে অভিযান চালাতে হয়েছে। সকল যোগাযোগ ছিল অবরুদ্ধ। কোনো যানবাহন, বিমান ও নৌ সহায়তা ছিল না।
এমনকি সৈন্য প্রত্যাহারকালে আমাদের নিরাপত্তা রক্ষায় কোনো দূরপাল্লার কামান অথবা ট্যাংকও ছিল না। পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও সিন্ধুতে অগ্রবর্তী অবস্থানে মোতায়েন সৈন্যদের কেউ যদি নদীর পেছনে অথবা নদী বরাবর প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা করে তাহলে তা হবে খুবই হাস্যকর একটি অনুশীলন। এমন পরিকল্পনা কেউ করতে পারে না। যার কোনো দায়িত্ব নেই তার পক্ষে সমালোচনা করা খুবই সহজ ।

“নিয়াজি শুধু ঢাকা অথবা তিনটি প্রধান শহর অথবা ৯টি বড়ো শহর রক্ষায়ও তার কমান্ডকে কেন্দ্রীভূত করতে পারেন নি। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী অবশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তান দখল এবং বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারতো। ডিভিশন ও ড্রিগেডগুলো বিধ্বস্ত হতে পারতো । এনিয়ে জাতি সংঘে কোনো হইচই হতো না।’ (মেজর জেনারেল শওকত রিজা, দা পাকিস্তান আর্মি ১৯৬৫-৭১)।
