আজকে আমরা মুলনীতি বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করব
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম গণপরিষদে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ভবিষ্যৎ সংবিধান রচনার লক্ষ্যে আদর্শ প্রস্তাব (অবজেকটিভ রেভ্যুলেশন) নামে একটি প্রস্তাব পাস করে। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানের রূপরেখা, কাঠামো, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কি হবে তা বর্ণনা করাই ছিল এই প্রস্তাবের লক্ষ্য। কিন্তু এই প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার পরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

মুলনীতি বিরোধী আন্দোলন
১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ ‘আদর্শ প্রস্তাব’ গৃহীত হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে গণপরিষদে ২৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি মূলনীতি নির্ধারক কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে একটি অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট পেশ করেন। মূলনীতি কমিটির ওই রিপোর্টে পেশকৃত সুপারিশগুলো সংক্ষিপ্ত সার হলো-
১. পাকিস্তান হবে একটি যুক্তরাষ্ট্র। প্রদেশগুলো সংবিধানে বর্ণিত বিধি-নিষেধ সাপেক্ষে শাসন কর্তৃত্ব ভোগ করবে।
২. প্রস্তাবিত ফেডারেশনের শাসন কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের উপর অর্পিত হবে। কেন্দ্রীয় আইনসভার উভয় পরিষদের যুক্ত অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। প্রেসিডেন্টের কার্যকাল হবে ৫ বছর। সশস্ত্রবাহিনী তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকবে।
৩. রাষ্ট্রের প্রকৃত নির্বাহী প্রধান (Real Executive) হবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট এমন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দান করবেন, যিনি তাঁর মতে কেন্দ্রীয় আইনসভার উভয় পরিষদের অধিকাংশ সদস্যের আস্থাভাজন বলে প্রতীয়মান হবেন। প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিসভার সদস্যগণকে নিযুক্ত করবেন। মন্ত্রিসভা সকল কাজের জন্য যৌথভাবে আইনসভার নিকট দায়ী থাকবে।

৪. কেন্দ্রীয় আইনসভার কার্যকালের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। কেন্দ্রীয় আইনসভা হবে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট। আইনসভা অধিবেশনে না থাকাকালীন সময়ে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন। তবে এই অধ্যাদেশ আইনসভার পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করতে হবে।
৫. প্রাদেশিক গভর্নর হবেন প্রদেশের নিয়মতান্ত্রিক শাসক প্রধান। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে প্রাদেশিক গভর্নর মন্ত্রিগণকে নিযুক্ত করবেন।
৬. রাষ্ট্রীয় বিষয় ও ক্ষমতা তিনভাগে বিভক্ত করা হবে।
যথা- ১। কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় বিষয়, ২।প্রাদেশিক বিষয় এবং ৩। যুগ্ম বিষয়। যুগ্ম বিষয় উভয় সরকারের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক কর্তৃত্বাধীন থাকবে।
৭. পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু ও ইংরেজি।

মূলনীতি কমিটির এই রিপোর্ট পূর্ব বাংলার জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। মূলনীতি কমিটির রিে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আইন পরিষদে জনসংখ্যার আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের বিধান না থাকায় এবং বাংলাকে অন রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেওয়ায় এই ক্ষোভ আন্দোলনে রূপ নেয়। মূলনীতি কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়িত হলে- ক আইন পরিষদে পূর্ব বাংলা সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।
এছাড়া পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটিও উপেক্ষিত মূলনীতি কমিটির রিপোর্টের বিরুদ্ধে ১৯৫০ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলার বিশিষ্ট রাজনীতি সাংবাদিক ও আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি গণতান্ত্রিক ফেডারেশন সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির উে ১৩ অক্টোবর আরমানিটোলা মাঠে প্রতিবাদ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। চার ও পাঁচ নভেম্বর গণতান্ত্রিক ফেডারেশন স কমিটির উদ্যোগে একটি মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং অন্তর্বর্তীকালীন মূলনীতির রিপোর্টের বিপরীতে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতির প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হয়।
“এই খসড়া প্রস্তাবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, সংবিধানে দে অধিকারের সন্নিবেশকরণ, সুপ্রিম কোর্ট, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সু করা হয়। খসড়া সংবিধানের সুপারিশমালায় বলা হয় যে, বাংলা এবং উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’’
এই মূলনীতির বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং ১২ নভেম্বর সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয় আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৫০ সালের ২১ নভেম্বর রিপোর্টটি গণপরিষ প্রত্যাহার করে নেন।
