যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন

আজকে আমরা আলোচনা করবো  যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন সম্পর্কে

ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনার উন্মেষ ও জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার পথ রচিত হয়। রোপিত হয় বাঙালির স্বতন্ত্র রাষ্ট্রচিন্তার বীজ। সূচিত হয় গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অকুতোভয় অভিযাত্রা। ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। নির্বাচনে করণীয় সম্পর্কে আলোচনা এবং নতুন কমিটি নির্বাচনের জন্য প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৩-এ ১৪ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

 

যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন
যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন

 

যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন 

এই কাউন্সিলে গঠিত কমিটিতে ছিলেন-

সভাপতি

১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

সহ-সভাপতি

২. আতাউর রহমান খান

৩. আবুল মনসুর আহমদ

8. আবদুস সালাম খান

৫. খয়রাত হোসেন

সাধারণ সম্পাদক

৬. শেখ মুজিবুর রহমান

সম্পাদকমণ্ডলী

৭. কোরবান আলী – সাংগঠনিক সম্পাদক

৮. আবদুর রহমান – প্রচার সম্পাদক

৯. মোহাম্মদ উল্লাহ – দফতর সম্পাদক

১০. ইয়ার মোহাম্মদ খান – কোষাধ্যক্ষ

 

যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন
যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন

 

সদস্য

১১. মুজিবুর রহমান (রাজশাহী) ১২. শামসুল হক (রাজশাহী) ১৩. মশিউর রহমান (যশোর) ১৪. আবদুল খালেক (যশোর) ১৫. ডা. মাযহার উদ্দিন আহমেদ (রংপুর) ১৬. রহিমুদ্দিন আহমেদ (দিনাজপুর) ১৭. মজিবুর রহমান (বগুড়া) ১৮. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (পাবনা) ১৯. সৈয়দ আকবর আলী (পাবনা) ২০. জহুর আহমদ চৌধুরী (চট্টগ্রাম) ২১. আবদুল আজিজ (চট্টগ্রাম) ২২. আবদুর রহমান খান (কুমিল্লা) ২৩. আবদুল বারি (কুমিল্লা) ২৪. জসিমুদ্দিন আহমদ (সিলেট) ২৫. সিরাজ উদ্দিন আহমদ (নোয়াখালী) ২৬. এ ডবলু লকিতুল্লাহ (বরিশাল) ২৭. আবদুল মালেক (বরিশাল) ২৮. আবদুল হামিদ (ময়মনসিংহ) ২৯. আছমত আলী খান (ফরিদপুর) ৩০. খোলা হর (টাঙ্গাইল) ৩১. আকবর হোসেন আখন্দ (বগুড়া) ৩২. আবদুল হাই (যশোর) ৩৩. শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা) খন্দকার মোশতাক এই কমিটিতে স্থান পায়নি।

যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্যাড সর্বস্ব কিছু দল ও নেতা অতি উৎসাহিত থাকায় প্রথমে ঢাকার অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে এ ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব নেওয়া হয়েছিল। বিশেষত সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্ট গঠনের চেয়ে একক দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু পরে শেরেবাংলা ও মওলানা ভাসানী একমত হওয়ায় (প্র. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান) যুক্তফ্রন্ট গঠন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

 

যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন
যুক্তফ্রন্ট ও ১৯৫৪ এর নির্বাচন

 

এ পটভূমিতে ১৯৫১ সালের ১১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বিশেষ কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের দাবি সংবলিত ২১-দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে, যা যুক্তফ্রন্টেরও নির্বাচনী কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগ, শেরেবাংলার কেএসপি, নেজামে ইসলামি প্রভৃতি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট।

তবে কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতন্ত্রী দল যুক্তফ্রন্টের বাইরে থেকে যুক্তফ্রন্টকে সমর্থন জানায়। তিন জাতীয় নেতা শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ২১-দফার পক্ষে বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক রায়- গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করে। পাকিস্তানের স্রষ্টা মুসলিম লীগ কার্যত প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

১৯৫৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে ৩০৯ আসনের প্রাদেশিক পরিষদে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। মুসলিম লীগ ৯টি, সংখ্যালঘু আসনে কংগ্রেস ২৫টি, তফসিলি ফেডারেশন ২৭টি, যুক্তফ্রন্ট ১৩টি, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি এবং গণতন্ত্রী দল ৩টি আসন লাভ করে। এ বিজয়ের পেছনে আওয়ামী লীগ পালন করে নিয়ামক ভূমিকা।

 

আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলার বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। যুক্তফ্রন্টের প্রাপ্ত মোট আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ প্রায় ১৪৩টি আসন, কেএসপি ৪৮টি, নেজামে ইসলামি ১৯টি এবং গণতন্ত্রী পার্টি ১৩টি আসন লাভ করে।

যুক্তফ্রন্ট এ. কে. ফজলুল হককে সংসদীয় দলের নেতা এবং যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করলেও শেরেবাংলা ৩ এপ্রিল তার প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের কাউকে অন্তর্ভুক্ত করেন নি। নানা তালবাহানার এক মাস পর ১৫ মে ৫৪ মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করা হয় এবং আওয়ামী লীগ থেকে ৭ জনকে মন্ত্রী করা হয়।

Leave a Comment