আজকে আমরা আলোচনা করবো- স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসনদ ৬ দফা প্রসঙ্গে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ স্থানান্তর অব্যাহত থাকায় পাকিস্তানের দুই অংশের অসম বিকাশ প্রকট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পূর্ব বাংলার বঞ্চনার চিত্রটির দিকে তাকালেই এর স্বরূপ বোঝা যাবে।

স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসনদ ৬ দফা
প্রশাসনিক বৈষম্যঃ
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আমলা অর্থাৎ আইসিএস ও আইপিএস অফিসারের সংখ্যা ছিল ৯৫ জন। এদের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ১ জন। ১৯৪৭-৬৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থায় ১ম শ্রেণীর বাঙালি কর্মকর্তা ছিল ২০%, দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ২৬%, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ২৭% এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী মাত্র ৩০%। সামরিক বাহিনীতে সামান্য কিছু নিম্নতম অফিসার ছিলেন বাঙালি এবং সৈনিকদের মধ্যেও বাঙালিদের সংখ্যা ছিল সামান্য। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল যথাক্রমে ৫%, ১০% ১৬%।
১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে কর্মরত ৯৩ জন সচিবের মধ্যে সকলেই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। ১৯ জন যুগ্মসচিবের মধ্যে ১ জন এবং ৫৯ জন উপ-সচিবের মধ্যে ৪ জন ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার অথচ পূর্ব বাংলার ছিল ২ হাজার ১০০ বেতন হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পেত ১১ কোটি ৪০ লক্ষ এবং বাঙালিরা পেত মাত্র ৬৫ লক্ষ টাকা ।
সামরিক বৈষম্যঃ
সামরিক বাহিনীতে সামান্য কিছু নিম্নতম অফিসার ছিলেন বাঙালি এবং সৈনিকের মধ্যেও বাঙালির সংখ্যা ছিল সামান্য। স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীতে বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব ছিল যথাক্রমে ৫%, ১০% ১৬%। ১৯৫৬ সালে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের সংখ্যা ছিল নিম্নরূপ-
| পদবি | পশ্চিম পাকিস্তান | পূর্ব পাকিস্তান |
| জেনারেল | ১ | ০ |
| লে. জেনারেল | ৩ | ০ |
| মেজর জেনারেল | ২০ | ১ |
| ব্রিগেডিয়ার | ৩৫ | ০ |
| কর্নেল | ৫০ | ০ |
| লে. কর্নেল | ১৯৮ | ২ |
| মেজর | ৫৯৩ | ১০ |
| নৌবাহিনী অফিসার | ৬৯৩ | ০ |
| বিমান বাহিনী অফিসার | ৬৪০ | ৬০ |
অর্থনৈতিক বৈষম্যঃ
১৯৪৭-৬৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে। শুরুতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৫২% ই ছিল পূর্ববাংলার অবদান। কিন্তু ১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানিদের আঞ্চলিক আয় বৃদ্ধি পায়। ১৯৪৯-৫০ সালে উভয় প্রদেশের মধ্যে বৈষম্যের মাত্রা ছিল ১৯%। ১৯৫৯-৬০ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩২% এবং ১৯৬৫-৬৬ সালে তা আরো বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫৫%। ১৯৬৪-৬৫ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বৈষম্য ছিল ৪৬%। ১৯৪৭-৬৬ সালের মধ্যে যে বৈদেশিক সাহায্য দেশের উন্নয়নে ব্যয় হয় তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল মাত্র ৩৪%। ব্যাংক, বীমা, শিল্প কলকারাখানার মালিকানা এককভাবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে চলে যায়। পূর্ব পাকিস্তান হয়ে পড়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাঁচামালের যোগানদাতা।

নিম্নের ছকের সাহায্যে এ বৈষম্যের চিত্র দেখানো হলো-
খাত/দিক | সময়কাল/সাল | মোট আয় (কোটি টাকায়) | মোট ব্যয় (কোটি টাকায়) | পূর্ব পাকিস্তান (কোটি টাকা) | পশ্চিম পাকিস্তান (কোটি টাকা) |
| বৈদেশিক মুদ্রা আয় | ১৯৪৭-৬৭ | ৩৯৯৯ | – | ২২৪০ | ১৭৫৯ |
| শাসন খাতে ব্যয় | ১৯৪৭-৬১ | – | ২২১৬ | ২৬৯ | ১৯৪৭ |
| উন্নয়ন খাতে ব্যয় | ১৯৫০-৭০ | – | ৭৫০৯ | ২১১৪ | ৫৩৯৫ |
| সামরিক খাতে ব্যয় | ১৯৪৭-৬৯ | – | ২৪২৪ | ২৪৪ | ২২০০ |
| মাথাপিছু ব্যয় | ১৯৪৭-৫৫ | – | ২৩৮ | ৩৭ | ২০১ |
| বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ | ১৯৪৭-৬০ | – | ৫৪২.১৫ | ৯৩.৮৯ | ৪৪৮.২৫ |
| সামরিক ও বেসামরিক খাতে মোট ব্যয় | – | – | ৩১৫৯ | ৪২৪ | ৩১৫৯ |
পাকিস্তানের উন্নয়ন, আমদানি, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ইত্যাদি খাতের প্রায় সমগ্র অংশই পশ্চিম পাকিস্তানের জন বরাদ্দ করা হয়। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ছিল খুবই কম। নিম্নের ছকে পাকিস্তানে প্রথম ১০ বছরে আমদানি খাতে উভয় অংশের জন্য বরাদ্দের পরিমাণের প্রতি লক্ষ করলে এটি সুস্পষ্ট হবে।
| অর্থবছর | পূর্ব পাকিস্তান (মিলিয়ন টাকা) | পশ্চিম পাকিস্তান (মিলিয়ন টাকা) |
| ১৯৪৭-৪৮ | ৪০ | ৩১৮ |
| ১৯৪৮-৪৯ | ২৮২ | ১১৭০ |
| ১৯৪৯-৫০ | ৩৮৫ | ৯১২ |
| ১৯৫০-৫১ | ৪৫৩ | ১১৬৭ |
| ১৯৫১-৫২ | ৭৬৩ | ১৪৭৪ |
| ১৯৫২-৫৩ | ৩৬৬ | ১০১৭ |
| ১৯৫৩-৫৪ | ২৯৪ | ৮২৪ |
| ১৯৫৪-৫৫ | ৩২০ | ৭৮৩ |
| ১৯৫৫-৫৬ | ৩৬১ | ৯৬৪ |
| ১৯৫৬-৫৭ | ৮১৮ | ১৫১৬ |
| ১৯৫৭-৫৮ | ৭৩৫ | ১৩১৪ |
পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ যোগান দিত পূর্ব পাকিস্তান। সেই সময়ের বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া প্রভৃতি দ্রব্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। মূলত পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে অর্জিত হতো সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা। পাকিস্তানের প্রথম ১০ বছরের রপ্তানি আয়ের উভয় অংশের তুলনামূলক অবস্থান নিম্নের সারণিতে দেখানো হলো-
| অর্থ বছর | পূর্ব পাকিস্তান (মিলিয়ন টাকা) | পশ্চিম পাকিস্তান (মিলিয়ন টাকা) |
| ১৯৪৭-৪৮ | ২৭২ | ৪৪৪ |
| ১৯৪৮-৪৯ | ১৩২৮ | ৫৪২ |
| ১৯৪৯-৫০ | ৬৮৩ | ৫৩৫ |
| ১৯৫০-৫১ | ১২১১ | ১৩৪২ |
| ১৯৫১-৫২ | ১০৮৭ | ৯২২ |
| ১৯৫২-৫৩ | ৬৪২ | ৮৬৭ |
| ১৯৫৩-৫৪ | ৬৪৫ | ৬৪১ |
| ১৯৫৪-৫৫ | ৭৩২ | ৪৯১ |
| ১৯৫৫-৫৬ | ১০৪১ | ৭৪২ |
| ১৯৫৬-৫৭ | ৯০৯ | ৬৯৮ |
| ১৯৫৭-৫৮ | ৯৮৮ | ৪৩৪ |
ওপরের সারণি থেকে দেখা যায়, পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অবদানই ছিল মুখ্য। কিন্তু এ অর্জিত বৈদেশিক আয়ের সিংহভাগ অংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য। পাকিস্তানের রাজস্ব বায়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতো পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হতো পূর্ব পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে রাজস্ব বায়ের হার কখনই ২৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি। নিজের সারণিতে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের মোট রাজস্ব ব্যয় এবং তাতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অংশ লক্ষ করলেই ব্যাপারটি সহজেই বোঝা যায়।

| বছর | মোট ব্যয় (মিলিয়ন রুপি) | পশ্চিম পাকিস্তান | শতকরা হার | পূর্ব পাকিস্তান | শতকরা হার |
| ১৯৫০-৫৫ | ৮৯১০ | ৭২০০ | ৮০.৮১ | ১৭১০ | ১৯.১৯ |
| ১৯৫৫-৬০ | ১১৫২০ | ৮৯৮০ | ৭৭.৯৫ | ২৫৪০ | ২২.০৫ |
| ১৯৬০-৬৫ | ১৭১৮০ | ১২৮৪০ | ৭৪.৭৪ | ৪৩৪০ | ২৫.২৬ |
| ১৯৬৫-৭০ | ২৮৭১০ | ২২২৩০ | ৭৭.৪৩ | ৬৪৮০ | ২২.৫৭ |
| মোট | ৬৬৩২০ | ৫১২৫০ | ৭৭.২৮ | ১৫০৭০ | ২২.৭২ |
উল্লিখিত বৈষম্য ও বঞ্চনা বাঙালি জাতিসত্তার স্বাভাবিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। পূর্ব বাংলাকে করে ঔপনিবেশিক শোষণের মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত করে। ফলে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্রমেই গভীরতর হতে থাকে। ষাটের দশকের শুরুতেই, ১৯৬১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান ‘দুই অর্থনীতির’ তত্ত্ব তুলে ধরেন।
২১-দফায় অভিব্যক্ত স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা থেকে অগ্রসর হয়ে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে যে অভিন্ন অর্থনীতি, এক ধরনের মুদ্রা ব্যবস্থা চলতে পারে না, বরং ফেডারেল রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে স্বশাসনের মধ্যেই এই বঞ্চনা- বৈষম্যের অবসান হতে পারে সে ধারণাটি ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আলোকে ১১-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১১-দফা নিয়ে সভায় উত্তপ্ত আলোচনা হয়। অনেকেই এই প্রস্তাবকে হঠকারী বা দুঃসাহসিক এবং দমননীতি উচ্চে তোলার চেষ্টা বলে অভিহিত করেন। এক অংশের বিধায়স্থ সত্ত্বেও ১১-দফা দাতি নির্বাহী সংসদে গৃহীত হয়। ১১ দফার দাবিগুলো হচ্ছে-
(১) ‘ফেডারেশন অব পাকিস্তান’ নামে সত্যিকার অর্থে ফেডারেল পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু ।
(২) সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন।
(৩) কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে সামরিক বাহিনীসহ সকল সরকারি উচ্চপদে মেধা অনুসারে বাঙালিদের নিয়োগ।
(৪) পাকিস্তানের উভয় অংশে বৃহৎ শিল্প কারখানা জাতীয়করণ ।
(৫) মোহাজেরদের জন্য সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রণয়ন ।
(৬) ফেডারেশনে বিভিন্ন জাতিভিত্তিক কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ সাধনে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি প্রণয়ন ।
(৭) পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন কায়েমের জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থাসহ পৃথক অর্থনীতি প্রণয়ন।
(৮) পূর্ব পাকিস্তানসহ পাকিস্তানের সকল প্রদেশের জন্য পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন ।
(৯) বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব-নিকাশ ও আয়-বায়ের পূর্ণ অধিকার প্রদেশের হাতে ন্যস্তকরণ,
(১০) পূর্ব পাকিস্তানে নৌ-বাহিনীর সদর দফতর প্রতিষ্ঠাসহ দেশরক্ষার উদ্দেশে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন
(১১) ছাত্রদের দাবি-দাওয়াসহ শ্রমিক-কৃষকদের ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণ।
উল্লিখিত ১১ দফা দাবি কার্যত ভবিষ্যৎ ৬ দফা দাবিরই ভিত্তি রচনা করে। কিন্তু ১৯৬৪ সালের বাস্তবতার কখনো এই ব্যাপক জনমত গড়ে তোলা এবং অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তোলার মতো পরিস্থিতি পরিপ ইতোমধ্যে হয়ে ওঠেনি। ১৯৬৪ সালের ১৭ মে আইউব সরকার ‘আরবী হরফে বাংলা লেখার এবং পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভাববিনিময়ের অংশ হিসেবে একটি অভিন্ন ভাষা বা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেয়। পঞ্চাশের দশকেও পাকিস্তানের ‘বাঙালি’ মন্ত্রী ফজলুর রহমান আরবি হরফে বাংলা লেখার বাস্তব উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাংলা জামা ও নাঙালি জাতিসত্তার ওপর এই আঘাত পূর্ব বাংলায় ব্যাপক জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা সাহাবুদ্দিন রেডিও, টিভিতে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

অন্যদিকে ছাত্রসমাজের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবির আন্দোলনও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ষাটের দশকের শুরু থেকেই এ কথা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ, বৈষম্য-বঞ্চনার অবসান এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পূর্ব বাংলাকে গড়ে তোলা খুবই দুরূহ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঔপনিবেশিক ধরনের শাসন-শোষণই বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিরাষ্ট্রের চিন্তাকে পরিপুষ্ট করে।
স্মর্তব্য যে, ১৯৬১ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের গোপন বৈঠকের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। আইউব-বিরোধী আন্দোলনের আগু কর্মসূচি ছাড়াও সেই বৈঠকে আলোচনাকালে শেখ মুজিবুর রহমান বারবার বলেছিলেন যে পাঞ্জাবের ‘বিগ বিজনেস’ যেভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করছিল ও দাবিয়ে রাখছিল তাতে ওদের সাথে আমাদের থাকা চলবে না। তাই এখন থেকেই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে: আন্দোলনের প্রোগ্রামে ঐ দাবী রাখতে হবে ইত্যাদি।
খোকা রায় লিখেছেন, ‘তখন আমরা (আমি ও মণিদা) শেখ মুজিবকে বুঝিয়েছিলাম যে, কমিউনিস্ট পার্টি। নীতিগতভাবে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের দাবি সমর্থন করে; কিন্তু সে দাবি নিয়ে প্রত্যক্ষ আন্দোলনের পরিস্থিতি তখনও ছিল না।
“স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ দাবী নিয়ে ঐসব আলোচনার পরের বৈঠকে শেখ মুজিব আমাদের জানিয়েছিলেন, “ভাই, এবার আপনাদের কথা মেনে নিলাম। আমাদের নেতাও (অর্থাৎ, সোহরাওয়ার্দী সাহেব) আপনাদের বক্তব্য সমর্থন করেন। তাই এখনকার মত সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমার কথাটা থাকলো” ইত্যাদি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬১ সন থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
শেখ মুজিব কেবল স্বাধীনতার স্বপ্নই দেখেননি, সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেন। স্বাধীনতা সামাম যে সশস্ত্র রূপও নিতে পারে, সে কথা বিবেচনায় রেখে মুজিব ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সামগ্রিক সহযোগিতারও ব্যবস্থা করেন। এ কারণেই পরবর্তীকালে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। ১৯৬২ সালেই স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে একইসঙ্গে শাস্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি প্রয়োজনে সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা মাথায় রেখে শেখ মুজিবের অনুরাগী বিশিষ্ট ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদ প্রমুখ মিলে একটি গোপন নিউক্লিয়াস গঠন করেন। প্রাথমিক পর্যায় পার হওয়ার পর এ ব্যাপারে তারা মুজিবের অনুমোদন গ্রহণ করেন।
দুই দশকের বঞ্চনা এবং ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ১৯৬৫ সালে সংঘটিত পাক-ভারত যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। সে সময় যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য লাহোরে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
বৈঠকে কাউন্সিল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী এবং আওয়ামী লীগ যোগদান করে। ন্যাপ ও এনভিএফ এই বৈঠকে যোগদান করে নি। নেজামে ইসলামী পার্টির নেতা চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে ৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরুর আগে আলোচ্যসূচী নির্ধারণের জন্য সাবজেক্ট কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা প্রস্তাব পাঠ করেন। তার প্রস্তাবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল-
১.শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টির আওতায় পাকিস্তানে ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিষ্ঠা যার ভিত্তি হবে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির, থাকবে সর্বজনীন বহুত ভোটাধিকার ও সার্বভৌম আইন পরিষদ।
২. ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়। অবশিষ্ট বিষয়গুলি ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে থাকবে।
৩. দুটি পরস্পর বিনিময়যোগ্য মুদ্রা বা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং ব্যবস্থাসহ একটি মুদ্রা ব্যবস্থা থাকবে। আর থাকবে পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধনপ্রবাহ রোধের শাসনতান্ত্রিক বিধান। ফেডারেশনের ইউনিটগুলির জন্য পৃথক রাজস্ব ও অর্থনীতি থাকবে।
৪. করারোপ ও লেডি বলবৎ করার বিষয় ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে থাকবে, কেন্দ্রের হাতে নয়। কেন্দ্র যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহে প্রয়োজনীয় তহবিলের জন্য প্রদেশগুলির কাছ থেকে সকল কর রাজস্বের একটা অংশ পায় তার শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে।
৫. প্রতিটি প্রদেশের জন্য বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি করে পৃথক হিসাব খোলা হবে এবং তারা প্রত্যেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করবে তার ওপর তাদের নিজ নিজ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। আর এর একাংশের বরাদ্দ থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের চাহিদা মেটানোর জন্য । দেশে উৎপাদিত পণ্যাদির আন্তঃপ্রদেশ চলাচল বা পরিবহনের বেলায় অভিতষ্কমুক্ত সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। প্রদেশগুলির বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি পাঠানোর এবং সংশ্লিষ্ট প্রদেশের স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা থাকতে হবে।
৬. প্রদেশগুলির জন্য আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী থাকতে হবে। শেখ মুজিব জানান যে, সম্মেলনের আয়োজকদের একটি প্রভাবশালী মহল এমনকি তাঁর বক্তব্য শুনতেও অস্বীকৃতি জানায়, ওসব নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা। আর সে কারণে তিনি ও তাঁর প্রতিনিধি দল ঐ সম্মেলনের সঙ্গে সকল প্রকার যোগসূত্র ছিন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রস্তাবটি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃত হলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সভা বর্জন করে। সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওই দিনই শেখ মুজিব লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে ৬ দফা উত্থাপন করেন। বিরোধী দলগুলোর সভা ভণ্ডুল হয়ে যায়।
ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করেন। লাহোরে ঘোষিত তার ৬ দফা প্রস্তাব ইতোপূর্বে আওয়ামী লীগের কোনো ফোরামেই আলোচনা হয়নি বলা যেতে পারে ৬ দফা ছিল একান্তভাবে শেখ মুজিবের প্রস্তাব। ১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬ দফা উত্থাপিত হলে দলের সভাপতি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তার কয়েকজন অনুসারীকে নিয়ে সভা ত্যাগ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভা অব্যাহত থাকে। সভায় কাউন্সিলে অনুমোদন সাপেক্ষে৬ দফা অনুমোদিত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে পুস্তিকাকারে ছয়-দফা বিতরণ করা হয়। কাউন্সিল ৬ দফা অনুমোদন করে।
মূল প্রতিপাদ্য এক থাকলেও ওয়ার্কিং কমিটি ও কাউন্সিলে অনুমোদিত ৬ দফার সাথে লাহোরে ঘোষিত ৬ দফার কিছুটা ভিন্নতা ছিল। কাউন্সিলে গৃহীত ৬ দফার বলা হয়-
১. দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সত্যিকার ধারণার ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে, সরকার হবে পার্লামেন্টারি পদ্ধতির, আর সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত আইন পরিষন হবে সার্বভৌমত্বের অধিকারী।
২. ফেডারেল সরকার মাত্র দুটি বিষয় পরিচালনা করবেন। এ দুটি বিষয় হলো প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়। আর অন্য সকল বিষয় ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে ন্যস্ত থাকবে।
৩. ৩) দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা দুই অঞ্চলে প্রবর্তন করা যেতে পারে। অথবা
খ) গোটা দেশের জন্য একটি মাত্র মুদ্রা রাখা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মূলধন পাচার বন্ধে শাসনতান্ত্রিক বিধান থাকতে হবে। পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভ রাখতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে:
৪. ফেডারেশনের ইউনিটগুলির হাতে করারোপ ও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে। ফেডারেল কেন্দ্রের হাতে এ রকম কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবে কেন্দ্র তার নিজ ব্যয় চাহিদা মেটানোর জন্য প্রদেশগুলির করের একটা অংশ পাবে। প্রদেশের সকল করের ওপর একটা নির্ধারিত হারে লেতি থেকে একটা সর্বমোট সুসংহত তহবিল গড়ে উঠবে
৫. ক) দেশের দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের জন্য দুইটি পৃথক বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রার হিসাব থাকবে:
খ) পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক বিনিময় মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
গ) ফেডারেল সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন দুই অঞ্চল কর্তৃক সমান হারে অথবা নির্ধারণযোগ্য অনুপাতে দুই অঞ্চল কর্তৃক মেটানো হবে:
ঘ) দেশজ পণ্য দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে শুল্কমুক্তভাবে অবাধে চলাচল করবে:
ঙ) শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতাবলে ফেডারেশনের ইউনিট সরকারগুলি বিদেশে বাণিজ্য মিশন খুলতে ও বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে:
৬. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি সামরিক বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন করতে হবে।
কাউন্সিলে মওলানা তর্কবাগিশ অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। সভাপতির পদ পাওয়ার আশায় ৬ দফা সমর্থন না করলেও সালাম খান দলে থেকে যান এবং ৬ দফার পক্ষে বক্তৃতা দেন। এই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। নতুন ওয়ার্কিং কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যগণ হচ্ছেন-
সভাপতি
১. শেখ মুজিবুর রহমান
সহ-সভাপতি
২. সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৩. আবদুস সালাম খান ৪. খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ৬. মজিবর রহমান ৭. শাহ আজির রহমান।
সাধারণ সম্পাদক
৮. তাজউদ্দিন আহমদ – সাধারণ সম্পাদক
সম্পাদকমণ্ডলী
৯. মিজানুর রহমান চৌধুরী – সাংগঠনিক সম্পাদক
১০. জহুর আহমদ চৌধুরী – শ্রম সম্পাদক
১১. কেএম ওবায়দুর রহমান – সমাজসেবা সম্পাদক
১২. আবদুল মমিন – প্রচার সম্পাদক
১৩. আমেনা বেগম – মহিলা সম্পাদক
১৪. মাহমুদুল্লাহ – দপ্তর সম্পাদক
১৫. হাফেজ মুসা – কোষাধ্যক্ষ
সদস্য
১৬. লকিয়তুল্লাহ ১৭. এবিএম নুরুল ইসলাম ১৮. জহির উদ্দিন ১৯. নুরুল ইসলাম চৌধুরী ২০. আবদুর রহমান খান ২১. এমএ রশিদ ২২. রওশন আলী ২৩. মোমেন উদ্দিন আহমেদ ২৪. আতিউর রহমান ২৫ রহিম উদ্দিন আহমদ ২৬. সা’দ আহমদ ২৭. জালাল উদ্দিন আহমদ ২৮ আমজাদ হোসেন ২৯. সোহরাব হোসেন ৩০, হোসেন মুনসুর ৩১. অধ্যাপক ইউসুফ আলী ৩২. আবদুল মালেক উকিল ৩৩. নুরুল হক ৩৪. বাহাউদ্দিন চৌধুরী ৩৫. শামসুল হক ৩৬. শেখ আবদুল আজিজ ৩৭. আফজাল হোসেন ৩৮.জাকিরুল হক ৩৯. মহিবুল সামাদ ৪০. আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ ৪১. মোল্লা জালাল উদ্দিন।

৬ দফা গৃহীত হওয়ার পর সমগ্র বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণের সৃষ্টি হয়। ২০ মার্চ প্রথম পল্টন ময়দানে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিব দেশবাসীর কাছে ৬ দফা ব্যাখ্যা করে আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন। অতঃপর ঝড়ের বেগে তিনি সমগ্র বাংলাদেশে ৬ দফার প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন। মাঝে দফায় দফায় গ্রেফতার হয়েছেন এবং জজকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন আবার গ্রেফতার হয়েছেন।
২০ মার্চ ঢাকার জনসভা দিয়ে শুরু করার পর ৮ মে নারায়ণগঞ্জের বিশাল জনসভার পর শেষবার গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ৩৫ দিনে সারাদেশে অসংখ্য পথসভাসহ ৩২টি বিশাল জনসভা করতে পেরেছিলেন। আর এসব জনসভার ফলস্বরূপ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দ্রুত প্লাবনের বেগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশে। স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের দাবিতে এক অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের সূচনা হয়।
ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ আইউব খান ৬ দফা নিয়ে আওয়ামী লীগ চাপাচাপি করলে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেওয়া হবে এবং দেশে গৃহযুদ্ধ হবে” বলে হুমকি দেন। আইউব সরকার ১৯৬৬ সালের ৮ মে শেখ মুজিবুর রহমানকে জামিন অযোগ্য। নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে।
একই সঙ্গে গ্রেফতার করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ, আবদুল মমিন, শামসুল হক, মোল্লা জালাল উদ্দিন, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, মোস্তফা সারোয়ার, মহিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদউল্লাহ, সিরাজউদ্দিন আহমেদ, শাহাবুদ্দিন চৌধুরী, সুলতান আহমদ, শেখ ফজলুল হক মণি সহ সমগ্র দেশব্যাপী বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে। ৭ মে থেকে ১০ মে-র মধ্যে সারাদেশের সাড়ে ৩ হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ইতোমধ্যে ওয়ার্কিং কমিটির পূর্ব নির্ধারিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬৮ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।
সর্বাত্মক হরতালে রাজধানীসহ সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। হাজার হাজার শ্রমিক-জনতা কারখানা বন্ধ করে রাজপথে নেমে আসে। এবারই প্রথম পূর্ব বাংলার ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শ্রমিক শ্রেণি এত বিপুল সংখ্যায় অংশগ্রহণ ও আত্মদান করে। পাশব হিংস্রতা নিয়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হরতালে ঢাকার রাজপথ শ্রমিক-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়। শ্রমিক মনু মিয়াসহ কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়। দমন-পীড়ন সকল সীমা ছাড়িয়ে যায়। অতঃপর বাঙালির প্রাণপ্রিয় কারাবন্দি নেতা শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা।
৬ দফাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়। বস্তুত আওয়ামী লীগ এককভাবেই এই আন্দোলনকে আসর করে নেয়। তবে ১৯৮২ সাল থেকেই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রভাবে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত গোপন কমিউনিস্ট পার্টি এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির অভান্তরে ভাবাদর্শগত বিরোধ চলতে থাকে। এর পরিণতিতে ১৯৬৫ সালে প্রভাবশালী বামপন্থি ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ভাগ হয়ে যায়।
মতিয়া গ্রুপ হিসেবে পরিচিত ছাত্র ইউনিয়ন ছিল মস্কোপন্থি এবং মেনন গ্রুপ ছিল। পিকিংপন্থি কমিউনিস্টদের অনুসারী। পিকিংপন্থিদের প্রভাবিত এবং আইউবের মদদপুষ্ট মওলানা ভাসানী ১৯৬৩ সালে চীন সফর করার পর থেকে কার্যত আইউব সরকারকে সমর্থনের নীতি নেন। ৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর চীনের অন্ধ ভারত ও সোভিয়েত বিরোধিতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল আইউবের ভারত-বিরোধী পররাষ্ট্রনীতি।
পিকিংপন্থিরা এ কারণে আইউবকে সমর্থন জানায়। তারা তত্ত্ব দেয়, আইউব স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে এবং গণচীনের একান্ত বিশ্বস্ত। অতএব “Don”t disturb Ayub seriously, ইতোমধ্যে, ১৯৬৬ সালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টিও ভাগ হয়ে যায়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মতাদর্শগত কারণে ১৯৬৭ সালে ন্যাপ ভাগ হয়। প্রফেসর মোজাফফর আহমেদকে সভাপতি করে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।
মওলানার বিপরীতে পাকিস্তানভিত্তিক ন্যাপও ভেঙে ওয়ালিখানকে সভাপতি করে নতুন ন্যাপ গঠিত হয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা করলে পিকিংপন্থিরা এবং মওলানা ভাসানী একে সিআইএ রচিত দলিল বলে অপপ্রচার চালায়। পক্ষান্তরে মস্কোপন্থিরা ৬-দফাকে মুক্তিসনদ হিসেবে গ্রহণ না করলেও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের ন্যায়সঙ্গত দাবি বলে সমর্থন জানায়। ৭ জুনের হরতালে অঘোষিতভাবে হলেও মতিয়া গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়ন অংশগ্রহণ করে। মস্কোপছিরা আওয়ামী লীগকে মূলধারার নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে স্বীকার করে নেয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধেও মস্কোপন্থিরা মূলধারার সঙ্গে ছিল।
১৯৬৬ সালের ২ মে পাকিস্তানের আইউব-বিরোধী (এবং একই সঙ্গে ৬-দফা বিরোধী) দক্ষিণপন্থি দলগুলি একটি ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গড়ে তোলে। এনডিএফ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও কাউন্সিল মুসলিম লীগসহ আরও কয়েকটি ক্ষুদ্র দলের এই মোর্চার নামকরণ হয় ‘পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট’ (পিডিএম)। তারা ৬-দফা ত্যাগ করে আওয়ামী লীগকেও এই মোর্চায় যোগদানের আহ্বান জানায়। আওয়ামী লীগ তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ৩০ এপ্রিল পিডিএম-এর কমিটি গঠিত হয়। জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ১৯৬৭ সালের ২৩ আগস্ট ৬- দফা বিরোধী মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশের নেতৃত্বে পিডিএমপন্থি আওয়ামী লীগ আত্মপ্রকাশ করে— যা জনসমর্থন না পাওয়ায় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
১৯৬৬ সালের ৭ জুনের হরতালের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বহুমুখী নাক্রমণ ও ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। ১৩ জুনের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৃতীয় সারির নেতারাও গ্রেফতার হয়ে যায়। –দফার সমর্থক দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে ১৫ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। ১৬ মাগস্ট ইত্তেফাক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
এই দমননীতি ও তৃণমূল পর্যন্ত গ্রেফতার-নির্যাতনের ফলে আন্দোলনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়ে যায় নি। এর মধ্যেই ১৯৬৬ সালের ১৯ আগস্ট আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল অধিবেশন হয়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং দলকে চাঙ্গা রাখার জন্যই এই কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল। কাউন্সিল সর্বসম্মতিক্রমে ও-পক্ষায় প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। কাউন্সিল থেকে রাজবন্দিদের মুক্তি দাবি করা হয় এবং বাঙালির মুক্তিসনদ ৬-দফা মেনে নেওয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর প্রতি আহ্বান জানান হয়।

পাকিস্তানভিত্তিক আওয়ামী লীগের পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের প্রধান অংশ ৬-দফা গ্রহণ করতে রাজি ছিল না। ফলে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ১৯৯৭ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। কাউন্সিলে একটি নতুন কমিটি গঠিত হয়। কমিটির কর্মকর্তা ও সদস্যরা হলেন-
সভাপতি
১. শেখ মুজিবুর রহমান
সাধারণ সম্পাদক
২. এএইচএম কামারুজ্জামান
সদস্য
৩. সৈয়দ নজরুল ইসলাম ৪. মিজানুর রহমান চৌধুরী ৫ খন্দকার মোশতাক আহমদ ৬. মিসেস আমেনা বেগম ৭. আমজাদ হোসেন ৮. সোহরাব হোসেন ৯. হোসেন মনসুর ১০ শাহ আজিজুর রহমান ১১ এবিএম নুরুল ইসলাম ১২. অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৩, আবদুল মালেক উকিল ১৪ নুরুল হক ১৫ বাহাউদ্দিন চৌধুরী ১৬. শামসুল হক ১৭. হাফেজ মুসা ১৮ শেখ আবদুল আজিজ ১৯. তাজউদ্দিন আহমদ ২০ আফজাল হোসেন ২১. জাকিরুল ইসলাম ২২. মহিবুস সামাদ ২৩. মোহাম্মদ উল্লাহ।
আইউব-বিরোধী আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানেও গতি সঞ্চারিত হয়েছিল ভুট্টোর নেতৃত্বে। আইউবের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তাসখন্দ চুক্তির সমালোচনা করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ভুট্টো পিপলস পার্টি নামে একটি নতুন দল গঠন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে আইউবের মন্ত্রী থাকাকালে এবং পরেও ভুট্টো ৬-দফার তীব্র বিরোধিতা করেন। ভুট্টোর পেছনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সমর্থন ছিল বলে পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়। ভুট্টোর বিরোধী নেতা হিসেবে আবির্ভাব পশ্চিম পাকিস্তানের আইউবের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে সুবিধা করতে না পারলেও আইউব সমর্থক ছাত্রসংগঠন এনএসএফ-এর একটি অংশ ভুট্টোর সমর্থনে বেরিয়ে আসে।
১৯৬৮ সালের ১৯ ও ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দু’দিনব্যাপী কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিল নেতা-কর্মীদের ভয়-ভীতি কাটাতে এবং নতুন করে আন্দোলন গড়ে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। চরম বৈরী পরিবেশেও আওয়ামী লীগ তার কোনো দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল স্থগিত বা সাংগঠনিক কার্যক্রম যে বন্ধ রাখে নি, এ কাউন্সিল সেটিই প্রমাণ করে।
১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে আবার কারা ফটকেই “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব” অর্থাৎ বহুল কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন ক্যান্টনমেন্টের সামরিক আদালতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি শুরু হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন-
১. শেখ মুজিবুর রহমান
২. লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন
৩. স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান
৪. এলএস সুলতান আহমেন
৫. এলএসডিআই নূর মোহাম্মদ
৬. আহমদ ফজলুর রহমান সিএসপি
৭. ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ
৮. আবুল বাশার মোহাম্মদ আবদুস সামাদ
৯. প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন
১০. ফ্লাইট সায়েন্টি মোহাম্মদ ফজলুল হক
১১. খন্দকার রুহুল কুদ্দুস সিএসপি
১২. ভূপতিভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী
১৩. বিধানকৃষ্ণ সেন
১৪. সুবেদার আবদুর রাজ্জাক
১৫. প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মজিবুর রহমান
১৬. প্রাক্তন সার্জেন্ট মোহাম্মদ আবদুর রজ্জাক
১৭. সার্জেন্ট জহুরুল হক
১৮. এটি মোহাম্মদ খুরশিদ
১৯. খান এম শামসুর রহমান সিএসপি
২০. হাবিলদার একেএম শামসুল হক
২১. হাবিলদার আজিজুল হক
২২. এএসসি মাহফুজুল বারী
২৩. সার্জেন্ট শামসুল হক
২৪. মেজর শামসুল আলম
২৫. ক্যাপ্টেন আবদুল মোতালেব
২৬. ক্যাপ্টেন এম শওকত আলীম
২৭. ক্যাপ্টেন নাজমূল হুদা
২৮. ক্যাপ্টেন এএনএম নূরুজ্জামান
২৯. সার্জেন্ট আবদুল জলিল
৩০. মোহাম্মদ মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী
৩১. ফার্স্ট লে. এএফএম রহমান
৩২. প্রাক্তন সুবেদার একেএম তাজুল ইসলাম
৩৩. মোহাম্মদ আলী রেজা
৩৪. ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ ও
৩৫. ফার্স্ট লে. আবদুর রউফ।
এদিকে ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৮ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত প্রকাশ্য গণ-আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়লেও সরকার-বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি নানা ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াস অব্যাহত রাখে। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের দুই গ্রুপের উদ্যোগে শিক্ষার দাবি, রাজবন্দির মুক্তি ও গণতন্ত্রের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রণীত হয় ৬-দফা ভিত্তিক ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচি। আন্দোলনের লক্ষ্যে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
প্রত্যেক ছাত্র সংগঠনের ২ জন করে এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে সদস্য করে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন : আবদুর রৌফ – সভাপতি, খালেদ মোহাম্মদ আলী- সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক ও সামসুদ্দোহা, মেননপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ, এনএসএফ-এর মাহবুবুল হক দোলন ও ফখরুল ইসলাম মুন্সি এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক নাজিম কামরান চৌধুরী।
এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, পিডিএম, ন্যাপ (ওয়ালী) ও জমিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলাম প্রভৃতি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ৮-দফা দাবিতে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি, সংক্ষেপে ডাক নামে একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্ল্যাটফরম গড়ে তোলে।
তবে কার্যত ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১৯৬৯ সালে ৬-দফা ভিত্তিক ১১-দফা আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আন্দোলনের এক পর্যায়ে আইউব খান রাজনৈতিক দলগুলোকে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ জানায়। গোলটেবিলে যোগদানের জন্য শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব এই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
গোলটেবিলে যোগদানের শর্ত হিসেবে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা হয়। প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে অবশেষে আইউব মাথা নত করতে বাধ্য হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাহৃত হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। বীরের বেশে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন শেখ মুজিব।
২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে মহাসমাবেশে শেখ মুজিব ভূষিত হন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে। মুক্ত শেখ মুজিব গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। বৈঠকে তিনি ৬-দফা ও ১১-দফা দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু দুই দফা সভা করেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো ঐকমত্য না হওয়ায় গোলটেবিল ব্যর্থ হয়ে যায়। ২৫ মার্চ পতন ঘটে আইউব স্বৈরাচারের । সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা দখল করেন। দেশে পুনরায় সামরিক আইন জারি হয়।
স্বাধীনতার আগে সর্বশেষ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৪ জুন। হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে ১১৩৮ জন কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন। এই কাউন্সিলটি ছিল উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের একটি মিলন মেলা।
কাউন্সিলে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । এই কাউন্সিলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফা আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচনকে একটি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান। কাউন্সিলে নির্বাচিত নতুন কমিটিতে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন-
সভাপতি
১. শেখ মুজিবুর রহমান
সহ-সভাপতি
২. সৈয়দ নজরুল ইসলাম
৩. ক্যাপ্টেন মনসুর আলী
৪. খন্দকার মোশতাক
সম্পাদকমণ্ডলী
৫. তাজউদ্দিন আহমদ – সাধারণ সম্পাদক
৬. মিজানুর রহমান চৌধুরী – সাংগঠনিক সম্পাদক
৭. আবদুল মমিন – প্রচার সম্পাদক
৮. মোহাম্মদউল্লাহ – দপ্তর সম্পাদক
৯. জহুর আহমদ চৌধুরী – শ্রম সম্পাদক
১০. সোহরাব হোসেন – কৃষি সম্পাদক
১১. কে. এম ওবায়দুর রহমান – সমাজসেবা ও সংস্কৃতি সম্পাদক
১২. বেগম বদরুন্নেসা – মহিলা সম্পাদক
১৩. মোহাম্মদ মোহসীন – কোষাধ্যক্ষ।
১৯৭০ সালের ৬ জুন একই স্থানে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় এবং এই কাউন্সিলে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নিম্নলিখিত কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়।
১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি, সহ-সভাপতি ২. কাজী ফয়েজ মোহাম্মদ ৩. মাস্টার খান ডন ৪. ব্যারিস্টার বরকত আলী সলমি ৫. সাধারণ সম্পাদক এএইচএম কামারুজ্জামান ৬. যুগ্ম সম্পাদক- মোহাম্মদ খান রাইসানি ৭. মোহাম্মদ শামসুল হক ৮. সাংগঠনিক সম্পাদক- সৈয়দ খলিল আহমেদ তিরমিজি ৯. প্রচার সম্পাদক- আবদুল মান্নান ১০. শ্রম সম্পাদক- মালিক ফখরুদ্দিন আওয়াম ১১: সমাজসেবা ও সংস্কৃতি সম্পাদক- জি মোস্তফা সারোয়ার ১২. দফতর সম্পাদক- শফিউল আলম ১৩. কৃষি সম্পাদক- সৈয়দ এমদাদ হোসেন শাহ ১৪. কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ১৫. মহিলা সম্পাদক- বেগম নূরজাহান মোরশেদ। (অসম্পূর্ণ তালিকা)
