স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন 

আজকে আমরা আলোচনা করব স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে

তিন জোটের রূপরেখা ঘোষণার পর স্বৈরাচারী এরশাদের পতনে দেশবাসী আস্থাশীল এবং উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯৯০- এর ২৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক বীরত্বব্যাঞ্জক গৌরবোজ্জ্বল নতুন অধ্যায় সংযোজিত হয়।

 

স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন 
স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন

 

স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন 

অব্যাহত ছাত্র ধর্মঘট, পেশাজীবীদের আন্দোলন, হরতাল-সমাবেশ-প্রতিবাদের মুখে শাসকগোষ্ঠী মরিয়া আঘাত হানে। ঢাকাসহ সারাদেশে অগণিত মানুষ নিহত ও আহত হয়। ২৭ নভেম্বর রিকশাযোগে যাওয়ার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে বিএমএ নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে এরশাদের সন্ত্রাসী গুন্ডারা গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকার আগুনে ঘি ঢালার মতোই দাবানলের সৃষ্টি করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তাররা এর প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করতে থাকে এবং রাজপথে নেমে আসে।

এই দিন বিকেলে শেখ হাসিনাকে আটক করে গৃহবন্দি রাখা হয়। খালেদা জিয়া পুলিশের চোখ এড়িয়ে আত্মগোপন করেন। দেশে সান্ধ্য আইন জারি, পত্রিকায় সেন্সরশিপ আরোপ, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ এবং আন্দোলন দমনে সেনাবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ নামালেও পরিস্থিতি এরশাদ প্রশাসনের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। ৪ ডিসে রাজধানী ঢাকায় অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হয়।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। অসহায় অবস্থায় সেনাবাহিনী বিডিআর এবং পুলিশ প্রত্যাহার করতে হয়। শেখ হাসিনা ১৫-দলের সমাবেশ থেকে এই মুহূর্তে এরশাদের পদত্যাগ দাবি করেন। খালেদা জিয়া এবং পাঁচ দলও নিজ নিজ জোটের সমাবেশ থেকে একই দাবি জানায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এরশাদের ওপর থেকে সেনাবাহিনীও সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

 

স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন 
স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন

 

১০টায় জেনারেল এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি উপ-রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগের জন্য তিন জোটের কাছে নাম দেওয়ার প্রস্তাব করেন। যার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। ৫ ডিসেম্বর তিন জোট প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব করেন। অবশেষে তিনজোটের রূপরেখা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর এরশাদ বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসনের।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করে। দৃশ্যত এই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী জোটভুক্ত দলগুলো ১৯টি আসন লাভ করে। বিএনপি পায় ১৪২টি আসন। তারপরও সরকার গঠনে বিএনপিকে জামায়াতের ১৮ সদস্যের সমর্থন নিতে হয়। বিনিময়ে বিএনপি সংরক্ষিত মহিলা আসনের দুটি জামাতকে ছেড়ে দেয়।

আওয়ামী লীগের কাছে নির্বাচনের ফল ছিল অপ্রত্যাশিত। বিজয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ছিল অতি প্রত্যয়ী, নির্বাচনে পরাজয়ের কারণগুলোর মধ্যে ছিল, প্রথমত বিএনপির শক্তিকে খাটো করে দেখার প্রবণতা, বিএনপি ও জামায়াতের গোপন আঁতাত এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোর সমন্বিত একক প্রার্থী দিতে না পারা। ১৫ দলের শরিক বাকশাল, সিপিবি ও ন্যাপ নৌকাসহ একাধিক মার্কায় প্রার্থী দাঁড় করায়। ফলে ভোট বিভাজন হয়, জোটের ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনী কার্যক্রম দুর্বল হয়। দ্বিতীয়ত একটি বিশেষ মহল, বিএনপিকে বিজয়ী করার সুখ কারচুপির আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফল মেনে নিয়েই সংসদে যোগদান করে। তিন জোটের রূপরেখার অঙ্গীকার ছিল সংসদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা তথা সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। কিন্তু খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে গড়িমসি করতে থাকে। বিএনপি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য চেষ্টা করে।

 

স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন 
স্বৈরশাসনের অবসান ও সংসদ নির্বাচন

 

এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনের বেসরকারি বিল উত্থাপন করে। বস্তুত আওয়ামী লীগের চাপে এবং তিন জোটের অধীকারের কারণে দলমত নির্বিশেষে দেশবাসী সোচ্চার হওয়ার প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য বিল উত্থাপনে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সর্বসম্মতিক্রমে সংবিধানের একাদশ সংশোধনী বিল পাস হয়। দেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম পাঁচ বছরের শাসন জাতির জন্য সুখকর ছিল না। অতীতের সামরিক শাসন ও একনায়কত্ববাদী স্বৈরশাসনের ঐতিহ্য ঝেড়ে ফেলে দেশকে প্রত্যাশিত সহিষ্ণু গণতন্ত্র চর্চার ধারায় উত্তরণে বিএনপি বার্থ হয়।

খালেদা তার স্বামীর পথ অনুসরণ করে একটা কর্তৃত্ববাদী অগণতান্ত্রিক ধারায় দেশ শাসনের দিকে অগ্রসর হয়। প্রথমেই তারা মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি কমিটির সদস্য বিতর্কিত ব্যক্তি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে স্পিকার নির্বাচন করে। পরে এই রহমান বিশ্বাসকেই তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। সংসদে বিরোধীদলীয় নেতাকে কথা বলতে বাধাদান, বিরোধী দলের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, গণতান্ত্রিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করে।

 

১৯৯১ সালের ৩১ জুলাই আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন বাকশাল আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ১৪ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হয়। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে দলের অভ্যন্তরে আবার উপদলীয় কর্মকার শুরু হয়।

১৯৯২ সালের ২১ জুন ড. কামাল হোসেন ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’ গঠন করেন। এই গণতান্ত্রিক ফোরামই ১৯৯৩ সালের ২৩ আগস্ট ‘গণফোরাম’ নামে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কামাল হোসেন ছাড়াও কিছু সংখ্যক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী দলত্যাগ করে গণফোরামে যোগদান করে। গণফোরাম আওয়ামী লীগকে সংগঠনগতভাবে তেমন ক্ষতি করতে পারে নি।

Leave a Comment