আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার

আজকের আমরা আলোচনা করবো আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেষ্টোর অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ভূমি সংস্কার বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ এবং প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, যৌথ খামার ও সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ, শিল্প-কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, শ্রমিকদের সন্তানদের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং তাদের ধর্মঘটের অধিকার প্রভৃতি।

ম্যানিফেস্টোতে তখনকার বাস্তবতায় ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অপপ্রচারের মুখ বন্ধ করার কৌশল হিসেবে। আওয়ামী লীগকে যাতে ইসলাম-বিরোধী, পাকিস্তান-বিরোধী এবং ভারতের দালাল হিসেবে প্রচার করেও জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে সে জন্য এই রক্ষণশীল এবং প্রগতিবিরোধী লক্ষ্য কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এই একই ম্যানিফেস্টোতেই আবার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষিত হয়। সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার
আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার

 

বৃটিশ সরকার তাহার অনুগত ভৃত্যদের সাহায্যে আমাদের দেশের গ্রামে গ্রামে কায়েম করিয়াছিল জমিদারী প্রথা ও তার অনুসধিক | আনুষঙ্গিক সৰ্ব্বাংগীন শোষণ ব্যবস্থা। জমিদারী প্রথার সংগে আসিয়াছিল সুদখোর মহাজন অতিরিক্ত মুনাফাখোর মহাজন গ্রামাঞ্চলকে অতি নিষ্ঠুর ও অতি ব্যাপকভাবে শোষনের এই পরিকল্পনার ফলে এ দেশের গ্রামগুলি আজ স্বাস্থ্য সম্পদ শ্রীহীন হইয়া পড়িয়াছে। কৃষকদের অবস্থা ভয়াবহ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার
আওয়ামী মুসলিম লীগের ভূমি সংস্কার

 

পঞ্চাশের সম্বন্তরের মতো দুর্দৈবের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশংকা সব সময়ই রহিয়াছে। কৃষকদের এক বিরাট অংশ আজ ভূমিহীন, অনুরূপ বিরাট অংশের ভাগে পড়িয়াছে আনাচে কানাচের অতি সামান্য ভূমির অংশ। অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অভাব ও উন্নত কৃষি ব্যবস্থার অভাব ও দুর্দৈবের প্রাচুর্য শস্য-শ্যামলা দেশকে করিয়াছে অভাব দুর্দশা ও দুর্ভিক্ষগ্রহ।

 

উপরন্ত যাহারা পরিশ্রম করিয়া খাদ্যশস্য উৎপন্ন করে ভাগচাষ মুনাফাখোরী বাজারের অস্থিরতা মওজুতদারী ও বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত সৈন্যের নিষ্পেশন চক্রান্তের তাহাদের ভাগে অনেক সময়ই অনাহার ও অন্যান্য দুর্দ্দশা ছাড়া আর কিছুই বাকী থাকে না। অথচ আমাদের দেশের অধিকাংশই এই পর্যায়ের। এই দুর্দশা দূর করার একমাত্র উপায় সুচিন্তিত জমি পুনবর্ষাবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

নবগঠিত আওয়ামী লীগের নেতাদের ধারণা ছিল ব্রিটিশ কমনওয়েলথ-এর সদস্য থাকা মানে দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জিত না হওয়া। সে জন্যই কমনওয়েলথের প্রশ্নে সম্পর্কোচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুটি তখন পাকিস্তানের উভয় অংশের মানুষের কাছে খুবই আবেগ ও স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। আওয়ামী লীগ তাই আগ বাড়িয়ে তিন মাসের আলটিমেটাম দিয়ে জাতিসংঘ ত্যাগের হুমকি দেয়। এসব দাবিই ছিল তখনকার বাস্তবতায় জনগণের মনোস্তত্ত্বকে তুষ্ট করার কৌশল।

তবে ম্যানিফেস্টোতে ভূমি সংস্কার ও বিনা খেসারতে জমিদারি উৎখাতের দাবিটি যথার্থ ছিল। কিন্তু যৌথ খামার ও জমির সমবণ্টন এবং সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ ও শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কারখানা পরিচালনার দাবিগুলো ছিল কিছুটা স্বপ্ন-কল্পনা বা ইউটোপিয়া।

Leave a Comment