আওয়ামী লীগের সূচনা নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা। এই দলিলগুলো আওয়ামী লীগ এর প্রকাশিত আওয়ামী লীগ এর ইতিহাস ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” প্রকাশনা থেকে সংগৃহীত। আওয়ামী লীগের সূচনাকে দুটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। দুটি পর্বই পাবেন এই আর্টিকেলে।
আওয়ামী লীগের সূচনা

আওয়ামী লীগের সূচনা পর্ব-১
এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, বর্তমান শতকের শুরুতে যখন ভারতীয়দের অন্তরে জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ দানা বাঁধতে থাকে এবং এর পরিণামস্বরূপ যখন ব্রিটিশ কর্তৃক এক ধরনের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রবর্তিত হয় তখন থেকেই ভারতীয় সমাজের বহুত্ববাদী চারিত্র্য বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তির মধ্য দিয়ে পরিস্ফুট হয়ে উঠতে থাকে।
তিরিশ দশকের মাঝামাঝি নাগাদ একটি ধর্মভিত্তিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা ভারতীয় মুসলমানগণের অস্তিত্ব ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রশ্নে একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এই সব ভারতীয় মুসলমানের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বপালন বহুলাংশে বর্তেছিল নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ওপর। চল্লিশ দশকের মাঝামাঝি নাগাদ অধিকাংশ ভারতীয় মুসলমান তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার দাবিটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের সূচনা
ফলে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটলে ভারত উপমহাদেশের বিভক্তি হয় এবং সংখ্যাগুরু মুসলিম এলাকা নিয়ে গঠিত ভারতীয় মুসলমানদের আবাসভূমি পাকিস্তানের জন্ম হয় । তবে বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলি কিন্তু উবে যায়নি। ভারতীয় ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমিক একত্রীকরণের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী নীতিটি এ যাবৎ কেন্দ্রাতিগ শক্তিগুলিকে ধারণ করেছে। ওদিকে পাকিস্তানে সুসংহত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবর্তমানে আঞ্চলিক স্বার্থ ও ভাবাদর্শগত পার্থক্যের জন্য পাকিস্তানের পূর্বাংশে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি প্রকট হয় এবং পরিণামে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে যায়।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, দক্ষিণ-এশীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এই ঘটনা একটি নতুন মাত্রা যোগ করে এবং এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য স্থাপন প্রক্রিয়া নবরূপ লাভ করে । এভাবেই একটি নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে, যা বর্তমান শতকের গোড়াতে ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নেতৃত্বাধীন নিখিল ভারত মুসলিম লীগই ভারতীয় মুসলমানদের একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবস্থান থেকে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার মর্যাদায় সংজ্ঞায়িত করে এবং অবশেষে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা করে।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর নিখিল ভারত মুসলিম লীগ পাকিস্তান মুসলিম লীগ নাম ধারণ করে। কিন্তু যে নেতৃত্ব নিখিল ভারত মুসলিম লীগের মাধ্যমে সক্রিয় থেকে পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিল সেই নেতৃত্ব একটি সুসংহত পাকিস্তানী সমাজ গড়ে তোলার ব্যাপারে পাকিস্তান মুসলিম লীগের কর্মশক্তিকে পরিচালিত করতে পারেনি, যদিও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের আহ্বানে সাড়াদানকারী অনেকেই একটি সুসংহত সমাজব্যবস্থাই চেয়েছিলেন। এই ব্যর্থতার জন্য নানাবিধ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে, তবে এ ব্যাপারে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তা সর্বাধিক যুক্তিপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ বলেই প্রতীয়মান হয়।
১৯৫৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ভূমিকা প্রসঙ্গে কতিপয় প্রশ্ন উত্থাপন করতে গিয়ে বলেন যে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক দর্শন ছিল না এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের অবসান ঘটলে জাতীয় পুনর্গঠনকল্পে যেসব আনুপুঙ্খিক বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া সমীচীন ছিল তার প্রতি মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ কখনই মনোনিবেশ করেনি। এবং এটিই হলো পাকিস্তানে অদ্যাবধি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার যথাযথ কারণ।
নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কার্যকর ভূমিকা যখন একেবারে তুঙ্গে তখন তার একটিমাত্র লক্ষ্য ছিল, ভারতের মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির সৃষ্টি। এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পতাকাবাহক হিসেবে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তথাকথিত এক স্তম্ভমূলক (monolith) ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে সুপ্ত নৃতাত্ত্বিক, আঞ্চলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাবাদর্শগত পার্থক্য কমিয়ে এনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু এই একতা কোনো ঐকমত্যের ফসল নয়।
জিন্নাহ্ ঐকান্তিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাকিস্তান দাবির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিন্নতার ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য ভারতীয় মুসলমানদের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব মনোভাব সাময়িকভাবে চেপে রাখে। জিন্নাহ্ নিজেও জানতেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর এই মতপার্থক্যের কথা ।
একবার তিনি মন্তব্য করেন: “আমাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করার সময় আমরা পাবো তেমনি একটা সময় আসবে যখন আমাদের এই মতপার্থক্যের মীমাংসা করতে হবে, যখন অন্যায় ও অনিষ্টকর্মের প্রতিকার করতে হবে।” তাঁর মতে, ভারতীয় মুসলমানদের সর্বাগ্রে বিবেচনীয় বিষয় হওয়া উচিত একটি স্বতন্ত্র “আবাসভূমি ও সরকার”; “অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও রাজনীতি” বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে পরবর্তী পর্যায়ে।`
পাকিস্তান সৃষ্টির মতো একটি সীমিত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ভারতীয় মুসলমানেরা জিন্নাহ্ পরামর্শ মানলেও অনেকেই, বিশেষ করে, বাঙালি মুসলমানদের একটি অংশ ভিন্ন মত পোষণ করতো। আর সেই কারণে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি পূরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরোপিত ঐক্যের অন্তঃসারশূন্যতা দৃশ্যমান হয় । সদ্যোজাত পাকিস্তান রাষ্ট্রে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে নতুন নতুন দল গড়ে ওঠে এবং মুসলিম লীগের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দলছুট গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। এভাবে দেখা যায় যে,
১৯৪৯ সালের শেষ নাগাদ পাকিস্তানে প্রায় বিশটি বিরোধীদল সক্রিয় ছিল। শুধুমাত্র পাঞ্জাবেই তেরটি স্বীকৃত বিরোধীদল ছিল এবং এর মধ্যে আটটি দল দঠিত হয় মুসলিম লীগের ভিন্ন ভিন্নমতাবলম্বী সদস্যদের নিয়ে।
স্পষ্টত নবোজাত পাকিস্তানের জায়মান অবস্থা থেকেই পাকিস্তান মুসলিম লীগের এক ধরনের ভঙ্গুর সূচনা পরিলক্ষিত হয়। পূর্বাঞ্চলে এর অবস্থান সুদৃঢ়করণে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হওয়ার কারণ প্রমাণিত হয় পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের ফলাফল থেকে। বস্তুত এর অবক্ষয় অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল— পাকিস্তানের জন্মের আগে থেকে না হলেও এর জন্মলগ্ন থেকেই। পূর্ব বাংলার কতিপয় বিশিষ্ট মুসলিম লীগ কর্মী ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় গণআজাদী লীগ (পরবর্তীকালে ১৯৫০ সালে সিভিল লিবারটিজ লীগ নাম ধারণ করে) গঠন করেন।
এঁরা ছিলেন সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের সদস্য, যা আহসান মঞ্জিল গ্রুপ (খাজা নাজিমুদ্দিন ও খাজা শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন) থেকে স্বতন্ত্র ছিল। মুসলিম লীগের কতিপয় প্রগতিশীল তরুণ সদস্য ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন করে। এসব দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলি এবং মূল দল তথা মুসলিম লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলির মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য ছিল। যদিও এসব দলের মধ্যেও আনুপুঙ্খিক বিষয়ে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান ছিল তথাপি সামগ্রিকভাবে তাদের আক্রমণটি ছিল মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সঙ্কীর্ণ, দলীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও কর্তৃত্ববাদী অভিমুখিতার বিরুদ্ধে।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম লীগের করাচি অধিবেশনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যে প্রস্তাব দেন তাতে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টরূপে প্রতিফলিত হয়। এখানে তিনি অসাম্প্রদায়িক জাতীয় দলের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। ৬ মিয়া ইফতিখারউদ্দিন এবং সোহরাওয়ার্দীসহ মাত্র দশজন সদস্য এর পক্ষে রায় দান করলেও প্রস্তাবটি ছিল গণআজাদী লীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতাবর্গ এবং ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী শিবিরের উদ্যোক্তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
এসবই ছিল পূর্বানুসৃত সাম্প্রদায়িক স্বৈরতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির স্থলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি প্রবর্তনের প্রয়াস। এমনকি পাকিস্তান রাষ্ট্রের খোদ প্রতিষ্ঠাতার মতেও উক্ত সাম্প্রদায়িক স্বৈরতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির সঙ্গে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনের বাইরে কোনো প্রকার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না।
পরবর্তীকালে, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী একটি ব্যাপকভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় রাজনীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ গঠনের প্রস্তাব দেন, যা সকল পাকিস্তানী নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।’ এদিকে ১৯৪৯ সালের গ্রীষ্মের গোড়ার দিকে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। দলের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পক্ষপাতী সদস্যরা প্রাদেশিক পরিষদের টাঙ্গাইল আসনের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের দলীয় প্রার্থী খুররম খান পন্নীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঢাকার বিশিষ্ট মুসলিম লীগ কর্মী শামসুল হককে মনোনয়ন দান করে। শামসুল হক
উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধানে পন্নীকে পরাজিত করলে প্রদেশে পরিবর্তনের বিরোধিতাকারীদের নড়বড়ে অবস্থানের মুখোসটি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির পরবর্তী ঘটনাগুলি এরই স্বাভাবিক পরিণতি বৈ আর কিছুই নয় ।
১৯৪৯ সালের জুন মাসে কতিপয় মুসলিম লীগ এমএলএ ও কর্মী যারা দলীয় প্রভুদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা ঢাকায় দুদিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে তারা তরুণ ভিন্নমতাবলম্বী শামসুল হক কর্তৃক লিখিত মূল দাবি নামক পুস্তিকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাদের দাবি ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে।
সম্মেলনে তারা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে গণমানুষের মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কর্তৃক ৪০-সদস্যবিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব এই সম্মেলনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তারিখে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। তাঁরই সভাপতিত্বে ১৯৪৯ সালের ২৪ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুসলিম লীগের আরেকটি দলছুট গোষ্ঠী জন্মলাভের বিষয়টি অসাধারণ ছিল না। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত রাজনৈতিক গতিধারা এবং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ এই ঘটনা একটি নতুন মাত্রা লাভ করে। এই ঘটনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ মূল দলের প্রতি একটি বহুমুখী খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে মারে। কিন্তু এটিও হঠাৎ করে ঘটেনি।
১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে প্রণীত বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টো ব্যাপকভাবে অনুসরণ করেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম খসড়া ম্যানিফেস্টো তৈরি করা হয়;” বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের দলীয় ছাত্র শাখার প্রতিপক্ষ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবর্গ ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করে; ভাষার প্রশ্নে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় তাতে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যবর্গ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে এবং ১৯৪৭ সালে সূচিত এই বিতর্ক ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে প্রকট রূপ ধারণ করে এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তাতে আরো গতিবেগ সঞ্চারিত হচ্ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থার প্রসঙ্গে বলা যায় যে পূর্ব পাকিস্তান ১৯৪৭ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষাবস্থার সম্মুখীন হয়। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ ১৯৪৯ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ জুন তারিখে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এর দ্বিতীয় কাউন্সিল সভায় স্বীকার করে যে ক্রমাবনতিশীল বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ব্যাপারে মুসলিম লীগ সরকারের ঔদাসীন্য কেবল যে সরকারের জন্য অপবাদ বয়ে আনছে তা-ই নয় বরং তা মুসলিম লীগ সংগঠনেরও দুর্নামের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
খাদ্য ঘাটতি ছাড়াও দেশত্যাগী হিন্দুদের মূলধন স্থানান্তর এবং পাকিস্তান কর্তৃক অনুসৃত অর্থনীতির কারণে এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থব্যবস্থার ওপর দারুণ চাপ পড়ে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম এমন এক সময় ঘটে যখন পাকিস্তান সরকার এরূপ কতিপয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে যা পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে মুদ্রার মূল্যমান হ্রাসের পাশাপাশি পাকিস্তানে মুদ্রার মূল্যমান হ্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তান সরকার অস্বীকৃতি জানানোর পরপরই ভারত পূর্ব পাকিস্তানের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যাপারে যেসব সুবিধা দিয়ে আসছিল তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে কাঁচা পাটের মূল্য হ্রাস পায় এবং এতে করে পাটচাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সর্বপ্রথম যে বৃহৎ জনসভার আয়োজন করে তা এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পশ্চাৎপটেই অনুষ্ঠিত হয় । ভাসানীসহ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অধিকাংশ নেতাকেই এই জনসভার পর গ্রেপ্তার করা হয়।
বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এই ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো যে অবাঙালি পুঁজিপতিরা এই সুযোগ গ্রহণ করে সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করবে। পূর্ব পাকিস্তান পাট সমিতি ১৯৪৯ সালের ২৪ অক্টোবর তাদের এক সিদ্ধান্তে অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাগণ কর্তৃক পাট ব্যবসায় একচেটিয়াকরণ রোধ করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ জানায় । ১৪ কিন্তু বিষয়টি অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় ১৯৪৯ সালে আদমজী জুট মিল্স্ স্থাপিত হয় যা পাটের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৫ এছাড়া, তড়িঘড়ি করে গঠিত জুট বোর্ডেও কোনো বাঙালি প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বললেই চলে।১৬ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাসদস্য সাখাওয়াৎ হোসেন তাঁর সভাপতির ভাষণে পূর্ব পাকিস্তান বণিক সমিতির নিকট বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আশঙ্কার কথাও ব্যক্ত করেন।
বোম্বাইয়ের মুসলিম বণিক সম্প্রদায়ের দেশান্তরী হয়ে করাচিতে আগমন এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন প্রবাহের আশঙ্কায় “পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুঃখ-দুর্দশার ভিত্তি রচিত হয় ।”১৭ এভাবে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পঙ্গুদশা পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে এর রাজনৈতিক মতবিরোধ আরো বাড়িয়ে দেয়।
পাট ব্যবসায়ের সম্ভাব্য সুবিধালাভে বঞ্চিত হয়ে বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একে জাতীয়করণের দাবি জানান । এই দাবি অবশ্য ইতোমধ্যেই মূল দাবিতে ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে স্থান পায় এবং এছাড়া পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের পরপরই প্রকাশিত ৪২-দফা ম্যানিফেস্টোতেও এই দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয় ।
এই ম্যানিফেস্টোর অন্যান্য প্রধান দিক হলো: ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয়াবলি ও মুদ্রাব্যবস্থা ন্যস্তকরণ; বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান; বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারিপ্রথা উচ্ছেদকরণ এবং ভূমিহীনদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ; আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সমবায় কৃষিব্যবস্থা ও শিল্প- শ্রমিকদের সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠাকরণ; অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন।
যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকার উপরের দাবিগুলির প্রতি অনুকূল সাড়া দেয়নি সেহেতু পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ীমহল এবং কৃষক ও শ্রমিকেরা শাসকগোষ্ঠী মুসলিম লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে । পূর্ব পাকিস্তানী সমাজের বিভিন্ন স্তরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে এটিই প্রণিধানযোগ্য ।
মুসলিম লীগের ত্রুটি-বিচ্যুতি সংশোধননিমিত্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করা হলেও এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যদের একটি অংশের ঈপ্সিত কতিপয় আদর্শের সঙ্গে এটিকে আপোস করতে হয়েছিল ।
উদাহরণস্বরূপ, এর নামকরণ “মুসলিম” শব্দটিকে বাদ দিয়ে করা সম্ভব হয়নি, যদিও কতিপয় প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র থাকায় এবং সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতি তাঁদের অনুরাগ প্রকাশ করেছিলেন । ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে অগ্রাধিকার প্রদান করায় সোহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগের উপদলীয় শাসকগোষ্ঠী সন্দেহের চোখে দেখতেন। পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এর নিম্নরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন:
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রয়োজনে যখন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় তখন আমাদের সংগঠনটিকে একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের রূপ দিতে হয়েছিল । পাকিস্তানী জনগণের ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মুসলিম লীগ ইসলামকে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে স্বীয় ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখে।
এছাড়া, মুসলিম লীগ যে বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে তা থেকে জনগণ তখনো সম্পূর্ণরূপে নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে যদিও আমাদের সংগঠনটিকে ধর্মনিরপেক্ষতার রূপ দেওয়া সম্ভব ছিল তথাপি তা মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাবকে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হতো ।
রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির খাতিরে আপোস করার প্রবণতা আওয়ামী লীগের কর্মপরিচালনার একটি স্থায়ী কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে অবশ্য সবসময় লাভ হয়েছে সে কথা বলা যায় না । তা সত্ত্বেও বলা যায় যে এতে করে প্রায়শ সীমিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়েছে এবং তা দলকে অধিকাংশ সময়ই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও প্রকৃতপক্ষে বেঙ্গল মুসলিম লীগের আহসান মঞ্জিল গ্রুপের সদস্যদের থেকে আলাদা সেই সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপই প্রধানত উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং সোহারাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়। ২২ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে একটি ব্যাপকভিত্তিক জাতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে পুনর্গঠিত করার আশা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি চৌধুরী খালিকুজ্জামানকে এই মর্মে একটি পত্র লিখেছিলেন যে আগ্রহী সব নবাগতের নাম যেন তালিকাভুক্ত করা হয় এবং এই মর্মে হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন যে অন্যথায় তাঁরা তাঁদের নিজস্ব দল গড়ে তুলবেন। মুসলিম লীগের সংস্কারসাধনে স্বীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সোহরাওয়ার্দী একটি জাতীয় বিরোধীদল গঠনের দিকে মনোনিবেশ করেন।
২৩ তিনি আশা করেছিলেন যে এই ধরনের একটি দল যদি মুসলিম লীগকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরিয়ে দিতে পারে তাহলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা ভারসাম্য সৃষ্টি হবে। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্মীদের এক সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দীকে সভাপতি ও একমাত্র সংগঠক করে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়।
২৪ কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কোনো অংশ হিসেবে গঠিত হয়নি কিংবা ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম লীগেরও অংশে পরিণত হয়নি। ১৯৫১ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের সংসদ নির্বাচনের পরই কেবল সোহরাওয়ার্দী এদের একত্রীকরণের সূচনা করেন।
২৫ ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলা আইনসভায় বিরোধীদলের মর্যাদা লাভ করে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে যে ক্ষোভ ছিল তা সমর্থন ও বেসিক প্রিন্সিপস্ কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্টের (১৯৫০) বিরুদ্ধে আনীত প্রতিবাদী পদক্ষেপে অংশগ্রহণ করে পূর্ব বাংলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অধিকন্তু, সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এর ভূমিকা সম্পর্কে কমিনফরম-এর স্বীকৃতি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির একটি অংশের আস্থা লাভেও সহায়তা করে।
ওয়াকিবমহল সূত্রে জানা যায় যে ভাষা আন্দোলন বিষয়ক বিতর্কে অংশগ্রহণ ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ কর্মীরা ১৯৫১ সালের আদমশুমারি চলাকালে গণনাকারীদের নিকট জনগণ যাতে তাদের উর্দু ভাষার জ্ঞানের কথা স্বীকার না করে সে কথা বোঝানোর জন্য নীরব অভিযান চালায়। তারা যে এ ব্যাপারে কিছুটা সফলকাম হয়েছিল সেন্সাস কমিশনারের মন্তব্য থেকে তা জানা যায়।
বেসিক প্রিন্সিপস্ কমিটি রিপোর্ট বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জড়িয়ে পড়াটা ছিল একটি স্বাভাবিক ব্যাপার এবং দলের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি বিকাশমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে যে অগণতান্ত্রিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল তাতে মুসলিম লীগের কতিপয় সদস্যসহ পূর্ব বাংলার জনগণ ব্যাপকভাবে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে।
এমনকি, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান এই রিপোর্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন, যদিও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতির চাপে তাঁকে এই ধর্মঘট প্রত্যাহার করতে হয়। ২৮ বিকল্প প্রস্তাবমালা বিবেচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ একটি কমিটি গঠন করে।
একই সময়ে আতাউর রহমান খান, তাজউদ্দিন আহমদ, অলি আহাদ, সাখাওয়াৎ হোসেনসহ আওয়ামী লীগের কতিপয় সদস্য যাঁরা জেলের বাইরে ছিলেন তাঁরা ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটির আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বেসিক প্রিন্সিপস্ কমিটি রিপোর্ট বাস্তবায়নের বিরোধিতা এবং বিকল্প প্রস্তাবমালা প্রণয়ন করার জন্য ১৯৫০ সালের অক্টোবর মাসে এই নির্দলীয় কমিটি গঠন করা হয়।
চূড়ান্ত পর্যায়ে ঢাকায় ১৯৫০ সালের ৪ ও ৫ নভেম্বর মহাজাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে “সহযোগিতার সম্পর্ক” থাকার কারণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আতাউর রহমানকে সম্মেলনের সভাপতি করা হয় ।
ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটির ‘জনাব লিয়াকত আলী খান কি নিম্নলিখিত প্রশ্নাবলির জবাব দেবেন?’—শীর্ষক প্রচারপুস্তিকার বিষয়বস্তু থেকে ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটি এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক সাদৃশ্য স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় ।
সম্মেলনের প্রাক্কালে এই প্রচারপুস্তিকা বিলি করা হয়। ৩১ দুটি সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণাপুষ্ট লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০), পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের ভৌগোলিক অযৌক্তিকতা, পাটচাষীদের দুর্দশা লাঘবে জুট বোর্ডের ব্যর্থতা, উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার অপপ্রয়াস এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে রাখার ব্যাপারে পূর্ণ অনীহা প্রকাশ-এসব বিষয়ে উক্ত অ্যাকশন কমিটি এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ একই মত পোষণ করতো।
সভাপতির ভাষণে আতাউর রহমান খান বেসিক প্রিন্সিপস্ তথা বুনিয়াদী নীতিমালাকে ‘ক্ষমতাসীন কতিপয় ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির জন্য জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবিদাওয়াকে দাবিয়ে রেখে একনায়কতন্ত্র কায়েম করার হীন ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন এবং বিরাজমান পরিস্থিতির বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন যে ‘পাকিস্তান সৃষ্টির আদর্শের সঙ্গে এর আদৌ কোনো মিল নেই।’ তিনি আরো বলেন যে অখণ্ডতার নামে একটি একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতি গড়ে তোলার প্রয়াস চালানো হচ্ছে এবং একে গণতন্ত্রবিরোধী অধ্যাদেশ দ্বারা উৎসাহিত করা হচ্ছে। রাষ্ট্র, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে সমপর্যায়ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন যে ‘এহেন পরিস্থিতিতে ইসলামী কিংবা অন্য কোনো প্রকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি স্পষ্টতই গড়ে উঠতে পারে না।’ পরিশেষে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে গণপরিষদ কর্তৃক প্রণীত মৌলিক নীতিমালা ও সুপারিশকৃত মৌলিক অধিকারসমূহ, এমনকি কোনো প্রকার সংশোধনীসহ হলেও, সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য এবং সে কারণেই তা পরিত্যাজ্য।
যাহোক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটির প্রস্তাবের মধ্যে কতিপয় বিষয়ে পার্থক্য ছিল। প্রথমোক্ত দলটির প্রস্তাব ছিল জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মুদ্রাব্যবস্থা রাখা এবং এক মানুষ এক ভোট পদ্ধতি।
ডেমোক্র্যাটিক ফেডারেশন বিষয়ক অ্যাকশন কমিটি ভেবেছিল যে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এই পদ্ধতিকে প্রথমে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করবেন এবং পরে নিজেই একনায়কের রূপ পরিগ্রহ করবেন। তাছাড়া কমিটি এ চিন্তাও পোষণ করতো যে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি পৃথক রাষ্ট্র (তাদের ধারণা মতো) হওয়ায় জাতিসংঘ বা কমনওয়েলথে প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মতো এদেরও সমভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকা বাঞ্ছনীয়; তা না হলে এ কথাই মনে করতে হবে যে পাকিস্তানের ‘সমগ্র ভূখণ্ড’ যেন একটি রাষ্ট্রেরই পরিচায়ক।
এ কথা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে উপর্যুক্ত পার্থক্যের ফলে, যা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ৪২-দফা ঘোষণায় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি থেকে উদ্ভূত বলে প্রতীয়মান হয়, অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় এবং এতে করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিনিধিবর্গ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন থেকে বেরিয়ে যায়, যদিও বদরুদ্দীন উমর সাংগঠনিক বিষয়াবলি-সংক্রান্ত মতপার্থক্যকেই এর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন বলে মনে হয় ।
যাই হোক, সম্মেলনে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গঠনতন্ত্রের মূলনীতির একটি রূপরেখা গৃহীত হয় এবং এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ঘোষিত উদ্দেশ্যাবলির বড় একটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় না।
পূর্ব বাংলার রাজনীতি থেকে সোহরাওয়ার্দীকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও যখন পূর্ব বাংলায় অসন্তোষ ঘনীভূত হচ্ছিল তখন ১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম লীগকে অধিভুক্ত করা হয় । তবে এই অধিভুক্তি ছিল শর্তসাপেক্ষ । পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এর নামকরণ, ম্যানিফেস্টো ও কর্মসূচি থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে।
৩৬ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ১১ এপ্রিল সাংগঠনিক কমিটির এক বৈঠকে এই অধিভুক্তি অনুমোদন করে। ঐ বছরের শেষের দিকে কাউন্সিল সভায় মওলানা ভাসানী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে এই অধিভুক্তি, যা তাঁর কারাবন্দী থাকা অবস্থায় আলোচিত হয়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম -লীগের কর্মসূচি ও ম্যানিফেস্টো আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পরই কেবল চূড়ান্ত করা হবে |
সে কারণে নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম লীগের সঙ্গে কোনোরূপ বিরোধ দেখা দিলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম -লীগ দলের কর্মসূচি ও ম্যানিফেস্টোর প্রতি অবিচল থাকবে । এমনকি তিনি এ মর্মে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন যে, “যদি কেউ আমাদের কর্মসূচিতে নাক গলাতে আসে তাহলে কেন্দ্রীয় পার্টির সঙ্গে আমাদের অধিভুক্তির প্রশ্নটি পুনর্বিবেচনা করতে আমরা বাধ্য হবো।” তিনি দাবি করেন যে পরিস্থিতির বাস্তবতার নিরিখেই তিনি এই গুরুত্ব আরোপ করছেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, পাকিস্তানের দুটো অংশের সমস্যা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এবং পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম -লীগের অনড় অবস্থানের বিষয়টি সাংগঠনিক কাঠামোতে প্রতিফলিত হতে হবে। ৩৭ তথাকথিত একটি জাতীয় পার্টির অধিভুক্ত পার্টি হিসেবে এই অতিমাত্রিক স্বতন্ত্র চারিত্র্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম- লীগ এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরে রাখে ।
এমনকি ষাটের দশকে এই দল নতুন নেতৃত্বের অধীনে পুনর্জাগরিত হওয়ার পরও পার্টির দুটো শাখা একটি অভিন্ন ম্যানিফেস্টো দাঁড় করাতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণ-উত্তর গঠনতন্ত্রেও সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করা হয় যে, এর নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচিকে স্বীকৃতিদানের ভিত্তিতেই কেবল এটি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আঞ্চলিক শাখা হিসেবে গণ্য হবে। যা হোক, মামদোতের নবাবকে প্রত্যাহারের পর খোদ নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম -লীগই বস্তুতপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কে. কে. আজিজ মন্তব্য করেন:
এখানে (নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম- লীগ) এসে যারা ভিড় জমায় তারা হলেন মুসলিম -লীগের প্রাক্তন সদস্য ও হতাশাগ্রস্ত সদস্য, ছোটখাট বিরোধীদলীয় নেতা, রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি লাভের আকাঙ্ক্ষাতাড়িত তরুণ আইনজীবী, নবীন রাজনৈতিক দলগুলির পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে আগ্রহী ব্যবসায়ী, ‘মুরুব্বিয়ানা’ ভাব দেখাতে চায় এমন জমিদার, সোহরাওয়ার্দীর ভক্তবৃন্দ, গণতন্ত্রের সমর্থকগণ যারা দেশে একটি কার্যকর বিরোধীদলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং এমনকি স্বল্পসংখ্যক সুবিধাবাদী ফটকাবাজ।
এটা যেমন ঠিক নতুন কোনো দল নয় তেমনি তা যথাযথ সংবদ্ধ কোনো দলও নয়: এটা হলো বিভিন্ন প্রাদেশিক শক্তির এক অদ্ভুত কনফেডারেশন বা মৈত্রীবন্ধন । কর্মসূচির মধ্যে সামঞ্জস্য এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে মিল না থাকায় এটা হলো বিভিন্ন গোষ্ঠী বা অংশের মধ্যে এক ধরনের শিথিল বন্ধনবিশেষ, যার শুধুমাত্র একটি অভিন্ন লক্ষ্য হলো মুসলিম -লীগের বিরোধিতা করা।
মুসলিম-লীগের বিরোধিতা করার জন্য উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানকী শরীফের পীর, পাঞ্জাবের মামদোতের খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন নেতা সংঘবদ্ধ হন, কিংবা বলা চলে সোহরাওয়ার্দী এঁদের সংঘবদ্ধ করেন।
আপাতদৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম -লীগ কিন্তু ভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কোনো দল ছিল না। এটি ছিল মুসলিম -লীগের বিভিন্ন মতের সাবেক সদস্যদের নিয়ে গঠিত মুসলিম -লীগবিরোধী একটি প্ল্যাটফরম যার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতা- বিরুদ্ধবাদী, ডানপন্থী, বামপন্থী, কেন্দ্রবাদী, জাতীয়তাবাদী, আঞ্চলিকতাবাদী, মিশ্র মতাদর্শবাদী ইত্যাদির সমাবেশ হয়েছিল কিন্তু শুধুমাত্র নেতিবাচক প্রবণতাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম -লীগের পেছনে প্রণোদনা শক্তি হিসেবে কাজ করেনি, যদিও তা মুসলিম- লীগবিরোধী দলছুট গোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে সত্যি ছিল।
এই দলের নেতৃবর্গ ও অনুসারীদের একই ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাকায় এবং সর্বোপরি নিখিল ভারত মুসলিম -লীগের ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের অভিন্ন ব্যাখ্যার (যা তাদের মতে পাকিস্তানকে সার্বভৌম আঞ্চলিক জোটবদ্ধ ইউনিট হিসেবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে) কারণে এই দলের ছিল সমজাতীয় সাংগঠনিক ভিত্তি ও উদ্দেশ্য ।
পাকিস্তানের আঞ্চলিক বা জোটবদ্ধ ইউনিটের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কিত ধারণা এবং আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ধারণাটি, যা পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতার চেতনায় দৃঢ়ভাবে গ্রথিত ছিল, পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সকল কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদান রাখে । অনুরূপভাবে, এই পর্যায়ে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠা কতিপয় সমাজতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে অপরিহার্যরূপে বিকশিত উদারপন্থী গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা যুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনের মূলধারার পেছনে চালিকাশক্তিরূপে কাজ করে ।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম- লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে, যা আবুল হাশিমের ম্যানিফেস্টোর সমধর্মীপ্রায়, দাবি করা হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য পাকিস্তানে কী ধরনের কার্যক্রম ও পদ্ধতি গ্রহণ করা হচ্ছে তা সুস্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার সময় এসেছে। এতে বলা হয় যে জনগণই আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে রাষ্ট্রের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করবে: পাকিস্তান হবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম,
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসংঘ; এর দুটো আঞ্চলিক ইউনিট থাকবে, যথা পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল; পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিট দুটোকে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রদান করতে হবে। এতে বলা হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী থাকবে; ভূমিকে ক্রমান্বয়ে জাতীয়করণ করতে হবে; অর্থনৈতিক নিপীড়ন যা রাজনৈতিক দমন তথা নব্য-সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয় তা এড়ানোর জন্য বৈদেশিক পুঁজি সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে।
খনিজ, প্রতিরক্ষা, ব্যাংক, বীমা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাসায়নিক দ্রব্য, বনজসম্পদ, পাট, চা, চিনি ইত্যাদির ন্যায় মৌলিক শিল্পকে জাতীয়করণ করতে হবে; প্রধান প্রধান সব শিল্প প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত শ্রমিক-প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিকল্পিত ও পরিচালিত হতে হবে; সকল অগণতান্ত্রিক এবং অনৈসলামিক নীতি ও মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে হবে;

পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদগুলিকে অবিলম্বে ভেঙে দিতে হবে এবং শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের ভিত্তি নিরূপণের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে; কেন্দ্র এবং প্রদেশগুলির মধ্যে কর-রাজস্বের সমভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে; আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং পাকিস্তান যাতে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও রক্ষায় নেতৃত্বদান করতে পারে সেজন্য শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
পরিশেষে ঘোষণাপত্রে যে বিষয়টির ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয় তা হলো অর্থনৈতিক আগ্রাসন তথা অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ়সংকল্প। এই ঘোষণাপত্রের প্রথম ভাগে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে সেটিই হলো আবুল হাশিমের ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু থেকে একমাত্র প্রধান পার্থক্য এবং তা হচ্ছে পাকিস্তান যদি আগামী পাঁচ বছরে ইসলামের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয় তা হলে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের পথ প্রশস্ত হবে।

আওয়ামী লীগের সূচনা পর্ব-২
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া ম্যানিফেস্টোতে আবার এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল যা এই দল ভবিষ্যতেও অব্যাহতভাবে অনুসরণ করে। সমাজের সর্বস্তরের জনগণের দাবিদাওয়া ও সকল রাজনৈতিক বিশ্বাস যাতে ধারণ করতে পারে এমন ব্যাপকভিত্তিক স্বার্থসমূহ এই ম্যানিফেস্টোতে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
এতে এমন এক মধ্যপন্থী নীতি অনুসরণের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় যাতে “ইসলামী আদর্শের পথ” অনুসরণ করে কমিউনিজম ও নব্য-ঔপনিবেশিকতাবাদ এই উভয় মতবাদ থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস থেকে উদ্ভূত কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই হোক না কেন ইসলামী আদর্শের ওপর গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মলগ্নে যোগদান করার সময় থেকেই অনেকের কাছে নিরুৎসাহব্যঞ্জক ছিল।

বদরুদ্দীন উমরের মতে কামরুদ্দিন আহমদ, তাজউদ্দিন আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা প্রমুখ প্রগতিবাদী নেতা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক নামকরণের জন্য গোড়াতে এই দলে যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানান, যদিও এই দল গঠনের প্রাথমিক কাজের সঙ্গে এঁরা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।৪১ দলের নামের ‘মুসলিম’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের পর এঁদের মধ্যে কামরুদ্দিন আহমদ ১৯৫৫ সালের দিকে দলে যোগদান করেন।
৪২ ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন চলাকালে সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই অধিবেশনের উদ্দেশ্য ছিল দলের গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো চূড়ান্ত করা।
এখানে লক্ষণীয় যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে নিখিল পাকিস্তান জিন্নাহ্ আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাদেশিক শাখায় পরিণত হয়। সর্বমোট ৫৫ জন সদস্যের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমদের মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বসহ মোট ২৭ জন সদস্য এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন।৪৩ অবশেষে, গণমানুষের অনুভূতি যাচাই এবং পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিতব্য বিশেষ কাউন্সিল বৈঠকে তার ফলাফল উপস্থাপনের জন্য মওলানা ভাসানীকে প্রাধিকার প্রদান করা হয় ।
উপরোক্ত জুলাই বৈঠকে ভাসানী ঘোষণা করেন যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ যে কোনো মূল্যেই হোক প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রশ্নে অটল থাকবে। দলীয় কর্মসূচিতে কেন্দ্রের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয় ও মুদ্রাব্যবস্থা ছেড়ে দিয়ে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবির বিষয়েও অনুরূপ জোর দেওয়া হয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যের মধ্যে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল তা হলো— নিরাপত্তা আইন বাতিল; বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারিপ্রথা বিলোপ; পাট ব্যবসায় ও প্রধান প্রধান শিল্প জাতীয়করণ; রাজবন্দীদের মুক্তিদান; নতুন করে নির্বাচন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাংগঠনিক প্রতিবেদনে বলেন যে ১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এই দল গঠনের বিষয়টি ছিল নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের এক সমন্বিত প্রচেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে “আমরা এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করি যে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব হবে সরকারবিরোধী সকল শক্তির ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব গ্রহণ করা।” তিনি কাউন্সিলের প্রতি এই মর্মে আহ্বান জানান যে “আমরা যাতে ফ্রান্সের কনভেনশনপন্থীদের ন্যায় বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো কোনো পরিস্থিতির শিকার না হয়ে পড়ি সেদিকে যেন সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখি।
” পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয় এবং এছাড়া “সক্রিয় জোট-নিরপেক্ষ” নীতি ও কমনওয়েলথ থেকে বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে দলের প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করা হয়। দলের অভ্যন্তরীণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য এসবের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি ব্যাখ্যা করেন। প্রতিবেদনে বলা হয় যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ শিল্পায়নসহ ভূমি ব্যবস্থায় “বৈপ্লবিক পরিবর্তন” আনতে চায়, কিন্তু দেশ “সাম্রাজ্যবাদী আঁতাত” ও কমনওয়েলথের সঙ্গে যুক্ত থাকলে এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয় যে, উৎসাহী কৃষক, মধ্যবিত্ত শ্রেণী, ছাত্র ও যুবকদের জন্য সাংগঠনিক সুযোগ- সুবিধার কথা দল বিবেচনা করবে, কারণ বি. পি. সি.বিরোধী ও ভাষা আন্দোলন চলাকালে এ কথা প্রমাণিত হয়েছে যে এরা সকলেই “তাদের বর্তমান অবস্থার অবসান ঘটাতে দৃঢ়সংকল্প।
” তিনি বলেন, একেবারে ঢাকা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের জনগণ পর্যন্ত উপলব্ধি করে যে “আদর্শগতভাবে সকলের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করলেও সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে আওয়ামী মুসলিম লীগ তাদের সকলকে দলে নিয়ে আসতে পারবে না।” সে কারণেই তিনি সর্বস্তরে আন্তঃদল যোগাযোগ এবং ব্যাপক গণযোগাযোগের মাধ্যমে দলীয় কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
উপরের প্রতিবেদনের আলোকে বিচার করলে এ কথা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে কাউন্সিল বৈঠকে যে গঠনতন্ত্র গৃহীত হয় তাতে আট শতাধিক সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিলের ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি মোটেও বিস্ময়ের উদ্রেক করে না। যদিও তৎকালীন কতিপয় পর্যবেক্ষকের ন্যায় এম. রফিক আফজাল এটিকে “বিরাটাকারের হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক” কাজ ত্বরান্বিত করে।
১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল বৈঠকে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তা থেকে প্রতীয়মান হয় যে মূল লক্ষ্য এক হওয়া সত্ত্বেও শামসুল হক কর্তৃক প্রণীত খসড়া ম্যানিফেস্টোতে পাকিস্তানের জোটবদ্ধ ইউনিটগুলির “সার্বভৌমত্ব” বলতে যে ধারণা প্রকাশ করা হয় তা “পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন” শব্দনিচয়ের মাধ্যমে নবতররূপে ব্যাখ্যাত হয় । এটা ছিল কেবল রূপগত পরিবর্তন, বস্তুগত নয়। অবশ্য যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় তা হলো খসড়া ম্যানিফেস্টোতে কমিউনিজমকে ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হলেও এতে তা করা হয়নি ৭ এবং সম্ভবত তা করা হয়নি এই কারণে যে ১৯৫১ সালের
পরে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ করার অভিপ্রায়ে যে সংশোধিত কৌশল গ্রহণ করে তার প্রতি অনুকূল সাড়া দেওয়া এবং এইভাবে আওয়ামী লীগ কর্তৃক আরো সদস্য সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি করা।
এই বৈঠকে কর্মসূচি, সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিচালনা পদ্ধতির যে রূপরেখা তৈরি করা হয় তা-ই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কমবেশি স্থায়ী বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে পররাষ্ট্র নীতি ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত নীতির বাস্তবায়ন বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত ছিল এবং বাহ্যত এই সব প্রশ্ন দেখা দেওয়ায় ১৯৫৭ সালে এই দল বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অবশ্য লক্ষণীয় দিক হলো যে পূর্বের অবস্থান থেকে বিভক্তি-উত্তর ম্যানিফেস্টো ও কর্মসূচির ব্যত্যয় ঘটেনি। এ কথা দাবি করা হয় যে বিভক্তি-পূর্ব ম্যানিফেস্টোগুলিকে অগ্রাহ্য করে ১৯৬৪, ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালের ম্যানিফেস্টোগুলির একীভূত একটি সংশোধিত ও সুসংহত রূপই হলো ১৯৬৯ সালের ম্যানিফেস্টো;৪৮ তবে বিভক্তি-পূর্ব ও বিভক্তি-উত্তর এবং পুনর্জাগরণ-উত্তর দলের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অপরিবর্তিত থাকে এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিত্ববর্গ নির্বিশেষে এই দল এর গঠন পর্যায়ে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ধারণ করেছিল তার জন্য জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ ও গণসমাবেশের মাধ্যমে এককভাবে বিরোধীদলের নেতৃত্বদানের জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই দল অন্যান্য দলের সঙ্গে হাত মিলায়, যদিও পরবর্তীকালে এই সিদ্ধান্তের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
শাসক মুসলিম লীগ দলকে পরাভূত করার অভিপ্রায়ে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগকে কোয়ালিশনের প্রশ্নে অন্তর্দলীয় ও আন্তঃদলীয় বেশ কিছু মতপার্থক্য ধারণ করতে হয়েছিল।
কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর প্রাথমিক আপত্তি এবং মুজিবুর রহমানের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিরোধিতা সত্ত্বেও যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের সর্ববৃহৎ অঙ্গে পরিণত হয় । যুক্তফ্রন্ট সৃষ্টির পেছনে বড় রকমের যে কারণটি ছিল তা হলো গণদাবি এবং এই গণদাবির ব্যাপারে সোচ্চার ছিল ছাত্র সমাজ, যারা এই প্রদেশের সবচেয়ে বড় মুখর অংশ।
১৯৫৩ সালের গোড়ার দিক থেকেই বিরোধী দলগুলিকে নিয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনের অভিপ্রায়ের কথা আলোচিত হয়ে আসছিল। ঐ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, খেলাফত-ই- রব্বানী পার্টি এবং পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি একটি যুক্তফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে তাদের সমর্থনের কথা পৃথক পৃথকভাবে ঘোষণা করে।৫° পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল বৈঠকে কল্পিত যুক্তফ্রন্টে অংশগ্রহণের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ।
তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পূর্বাভিমত স্মরণ করে বলেন যে প্রস্তাবিত যুক্তফ্রন্টের প্রকৃতি মূলত মুসলিম লীগবিরোধী এক জোট বৈ আর কিছুই নয় এ কথা মনে করেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা করেছিলেন; কিন্তু একইসঙ্গে তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ জনগণের দল হওয়ায় সেখানে গণমানসের প্রতিফলন হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং সে কারণেই তিনি উক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করেন ।
তিনি সুস্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করেন যে প্রাথমিক পর্যায়ে যখন জনগণ হক-ভাসানী ঐক্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল তখন আভাস পাওয়া গিয়েছিল যে ফজলুল হক আওয়ামী লীগে যোগদান করবেন, যা তিনি নিজেই বলেছিলেন। কিন্তু অবশেষে ফজলুল হক যখন কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন করেন তখন আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টির যুক্তফ্রন্ট গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে, মুসলিম লীগবিরোধী কয়েকটি নবজাত দলকেও যুক্তফ্রন্টের আওতায় আনা হয়।
এইভাবে, “রাতারাতি গজিয়ে ওঠা দলগুলিকে দীর্ঘ সাত বছর ধরে সংগ্রামরত আওয়ামী লীগের ন্যায় একটি সংগঠনের সঙ্গে সমমর্যাদা দান করে আওয়ামী লীগ জনগণের স্বপ্ন তথা যুক্তফ্রন্টের বাস্তবায়ন ঘটায়।” কিন্তু তিনি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, “আজ আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে যুক্তফ্রন্ট নামক এই জগাখিচুড়ি থেকে আমাদের জনগণ কিছুই লাভ করেনি, বরং আমাদের সংগ্রাম প্রলম্বিত হয়েছে।”
পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল ২ থেকে দেখা যায় যে পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগেরই প্রাধান্য ছিল। কিন্তু ফজলুল হককে যুক্তফ্রন্ট সংসদীয় দলের নেতা মনোনীত করা হলে তিনি কিন্তু প্রথমে তাঁর ক্ষুদ্রাকার মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের কোনো সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। ৫৩ আওয়ামী লীগের তরুণ সদস্যরা বিষয়টি আগেভাগেই অনুমান করতে পেরেছিল।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের “তরুণ অনভিজ্ঞ ও চরমপন্থী” সদস্য সম্পর্কে হক সাহেবের কথিত আপত্তিকর মনোভাব থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি হক-মন্ত্রিসভার প্রতি সমর্থনদান অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের সদস্যের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে পরবর্তী যে কোনো ধরনের অগ্রগতির ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মওলানা ভাসানীকে প্রাধিকার প্রদান করে।
৫৪ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার কিংবা পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের পরাজয়ের কারণে ন্যূনতম সদিচ্ছাজ্ঞাপক পদক্ষেপ হিসেবে বাঙালি সদস্যদের পদত্যাগেরও দাবি জানায় । কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই অজুহাত দেখিয়ে এই দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানান যে এটা আর যা-ই হোক এটা একটি অংশের রায় মাত্র ।
কলকাতায় কথিত পাকিস্তানবিরোধী বিবৃতিদানের পরিপ্রেক্ষিতে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে যে সমালোচনার ঝড় তাঁর অবস্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে কেবল তারপরই তিনি নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেন এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের পাঁচজন সদস্যকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হন। কিন্তু তিনি দফতর বণ্টনের প্রক্রিয়া শুরু করার আগেই নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা বেধে যায়।
কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে যে এটি ছিল যুক্তফ্রন্টের সমর্থনপুষ্ট কমিউনিস্ট পরিচালিত ষড়যন্ত্র । হক সাহেব ও মওলানা ভাসানী উভয়েই এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং তাঁরা আমলা ও মিল কর্তৃপক্ষের পরোক্ষ সমর্থনে এই দাঙ্গা ঘটানোর জন্য পরাজিত মুসলিম লীগকেই দায়ী করেন। হক সাহেবকে করাচিতে ডেকে পাঠানো হয় এবং সেখানে তিনি কমিউনিস্টদের ব্যাপক ধর-পাকড়ের ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানান। এ কথাও জানা যায় যে ঐ সফরকালে হক সাহেব বারংবার উল্লেখ করেন যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদী চূড়ান্ত লক্ষ্যের তুলনায় যুক্তফ্রন্টের ২১- দফা কর্মসূচি স্বল্পমেয়াদী প্রকৃতির।
৫৭ ২১-দফা কর্মসূচি ছিল যুক্তফ্রন্টের ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার । এতে লাহোর প্রস্তাবের আলোকে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য যে দাবিদাওয়া উত্থাপন করা হয় তার মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয় ও মুদ্রাব্যবস্থা ব্যতিরেকে অন্যান্য সব বিষয়ের ওপর প্রাদেশিক অধিকার ও পূর্ব বাংলায় নৌবাহিনীর সদরদফতর স্থানান্তর, পূর্ব বাংলাকে প্রতিরক্ষার বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ‘আনসার’কে পূর্ণ মিলিশিয়ায় রূপান্তরণ ও পূর্ব বাংলায় অস্ত্র কারখানা স্থাপন। এতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিও অন্তর্ভুক্ত করা হয় । এসব ছাড়াও এতে আওয়ামী লীগের পূর্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পূর্ব বাংলার বিভিন্ন সামাজিক স্তর যথা কৃষক, স্থানীয় নব্য শিল্পপতি ও বণিক শ্রেণী, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের কথা তুলে ধরা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা, প্রশাসনের আস্থা আনয়নে ব্যর্থতা এবং প্রদেশে “শত্রুপক্ষের এজেন্টদের” উপস্থিতি রোধে ব্যর্থতার কারণে হক সাহেবের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেওয়া হয় ।৫৯ পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। প্রাপ্ত বিবরণ থেকে জানা যায় যে ১২০০ জন আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতা এবং ৩০ জন এম. এল. এ.কে কারারুদ্ধ করা হয় এবং “একমাত্র” আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের নেতা আতাউর রহমান খান মুসলিম লীগের “জুলুমশাহীর” বিরুদ্ধে আহ্বান জানান।
এই সময়ের পাকিস্তানী রাজনীতির একজন বিশ্লেষক, এম. রফিক আফজাল মনে করেন: কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক এই কঠোর ব্যবস্থা (যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল) গ্রহণের পেছনে যে দুটো মূল বিষয় কাজ করেছে তা হলো: প্রথমত, কেন্দ্র এবং প্রদেশগুলির মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনসহ এর ফেডারেল কাঠামো-সংক্রান্ত পরিকল্পনার বিষয়ে সম্মত হওয়ার জন্য যুক্তফ্রন্ট নেতৃত্বকে রাজি করানোর ক্ষেত্রে এর ব্যর্থতা; দ্বিতীয়ত, সম্পাদিত মার্কিন সামরিক সাহায্য ও চুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের দলগুলির সর্বসম্মতপ্রায় বিরোধিতা।
এই সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ দৃশ্যপট থেকে অনুপস্থিত থাকেন। সোহরাওয়ার্দী তাঁর চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যান্ড চলে যান এবং ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য সুইডেনে যান । পূর্ব পাকিস্তানের অপর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফজলুল হক বাহ্যত মৌনতা অবলম্বন করেন। ফলে নবনিযুক্ত গভর্নর ইস্কান্দার মীর্যার অধীনে দমনমূলক গভর্নর- শাসন রূপ লাভ করতে থাকে এবং অন্যদিকে শাসনতন্ত্র রচনার ক্ষেত্রে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকে ।৬২ এই অচলাবস্থার পরিণামে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে একটি বিল পাস করার পর জরুরি অবস্থা আরোপ করা হয়।
৬৩ গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন যে আমলা, জমিদার ও খ্যাতিমান শিল্পপতিরা তাঁকে সমর্থন দেবে। কিন্তু স্থিতাবস্থা (status quo) বজায় রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সমর্থনও তাঁর প্রয়োজন ছিল। সুতরাং বগুড়ার মোহাম্মদ আলী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যান। সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সমর্থন লাভের প্রচেষ্টা চালানো হয় ।
নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক উসমানী যখন আতাউর রহমানকে এই মর্মে অবহিত করেন যে গোলাম মোহাম্মদের বিরোধিতা করার অর্থই হবে সামরিক শাসনকে ডেকে আনা তখন তিনি নেতৃবৃন্দকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য ইউরোপ গমন করেন।
অনুমান করা যায় যে আতাউর রহমানের প্রত্যাবর্তনের পর গভর্নর জেনারেলের প্রতি তাঁর বাহ্যত কোমল মনোভাবের পেছনে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন ছিল, কেননা ফিরে আসার পর সোহরাওয়ার্দী নিজেই গোলাম মোহাম্মদের “বিজ্ঞ মন্ত্রিসভায়” (Cabinet of Talents) আইনমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। দলীয় লোকজনের প্রাথমিক বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, এমনকি তিনি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেননি।
যুক্তফ্রন্টকে উপেক্ষা করার কারণ হিসেবে বলা যায় যে সম্ভবত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তাঁকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করেছিল। এরই সম্ভাব্য প্রতিশোধ হিসেবে লক্ষ্য করা যায় যে যখন ফজলুল হক করাচি গমনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং একজন সদস্যকে মনোনয়নদান করতে সম্মত হয়ে আবু হোসেন সরকারের নাম প্রস্তাব করেন তখন তিনিও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কোনো পরামর্শ বা তাঁকে কিছু অবহিত করেননি।
এইভাবে দেখা যায় যে গভর্নর জেনারেল যুক্তফ্রন্টের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে তাঁর প্রতি বাধ্যতামূলকভাবে অনুরক্ত থাকার ব্যাপারে কৌশল অবলম্বন করায় ফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ দলাদলি প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পার্টির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই অন্তর্দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং যুক্তফ্রন্টের প্রধান অংশীদার হিসেবে তার ন্যায্য ও যথাযথ পাওনা লাভের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে।
এই কারণে আওয়ামী লীগ উক্ত বৈঠকে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনয়ন করে। ওদিকে কৃষক পার্টিও পাল্টা অনাস্থা প্রস্তাব আনে । প্রচণ্ড হট্টগোলের মধ্যে যদিও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়নি তথাপি উভয় দল স্বীয় বিজয় অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করে। বাস্তবিকপক্ষে অবশ্য আওয়ামী লীগ আবদুস সালাম খান, হাশিমুদ্দিন আহমদ ও আনোয়ারা খাতুনসহ কতিপয় সদস্যকে সাময়িকভাবে হারায়। এঁরা ফজলুল হক নেতৃত্বাধীন দলের সঙ্গে এই অজুহাতে যোগ দিয়েছিলেন যে প্রাথমিকভাবে এঁদের আনুগত্য ছিল যুক্তফ্রন্টের প্রতি ।
‘বিজ্ঞ মন্ত্রিপরিষদে’ সোহরাওয়ার্দীর যোগদান করার কারণ হিসেবে বলা হয় যে তিনি আশা করেছিলেন যে অচিরেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে এবং শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং এভাবেই তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিকে একটি সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হবেন। জাতীয় তাৎক্ষণিক স্বার্থ না কি দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ সোহরাওয়ার্দীকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছিল এ কথা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও তিনি ১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিলের কনস্টিটিউশন কনভেনশন অর্ডার ও পরের সংশোধনীসমূহ মেনে নেন।
কনভেনশনে পাকিস্তানের দুই অংশের সমপ্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা এই সংশোধনীতে রাখা হয়। অবশ্য যুক্তফ্রন্ট পার্লামেন্টারি পার্টি এক জরুরি বৈঠকের পর তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে। ৬৭ আওয়ামী লীগ স্পষ্টতই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। আবুল মনসুরের ভাষায় :
সমগ্র পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। কিন্তু শহীদ সাহেবের খাতিরে আওয়ামী লীগ এ ধরনের অন্যায়ের প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকে। আমরা তথা আওয়ামী লীগ কর্মীরা লজ্জায় মরে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিলাম । মওলানা ভাসানী কনভেনশনের বিরুদ্ধে ৬৮ কলকাতা থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের মুখ রক্ষা করেন।
আওয়ামী লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টিকে কনভেনশন প্রস্তাবের ব্যাপারে রাজি করানোর জন্য সোহরাওয়ার্দী তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মীর্যার সঙ্গে ঢাকা সফরে আসেন। পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিকভাবে যারা সোচ্চার ছিল তাদের অধিকাংশই এই দুই দলের প্রতিনিধিত্ব করতো। আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে জানায় যে তারা কনভেনশন প্রস্তাব মেনে নিতে সম্মত, যদি প্রত্যাবর্তনের পর মওলানা ভাসানীও এটিকে সমর্থন দেন । অবশ্য কৃষক শ্রমিক পার্টি কনভেনশন ও সমতা-সূত্র উভয় বিষয়ের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ জানায়, এবং শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য সার্বভৌম গণপরিষদের দাবি জানায়। এই দল কনভেনশন বয়কট করার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। পাকিস্তান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগও অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আবুল মনসুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “গণতন্ত্র ও পূর্ব বাংলার স্বার্থের জন্য সব দলই সংগ্রাম শুরু করে, কেবল আওয়ামী লীগই নীরব থাকে।
ইতোমধ্যে, করাচিতে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন দলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করে। সেগুলি হলো: (১) সংসদীয় সরকারের পুনরুজ্জীবন; (২) পাকিস্তানে ভাসানীর প্রবেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: (৩) রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিদান।
অবশ্য ১৯৫৫ সালের ১০ এপ্রিল ফজলুল হকের অনুসারীরা পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার দিবস পালন করে । এরপর আওয়ামী লীগ ১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিল উক্ত দিবস পালন করে । ১৯৫৫ সালের ২২ এপ্রিল ভাসানীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এবং এদিকে আওয়ামী লীগকে পলায়নপর মনোবৃত্তির জন্য বড় রকমের মূল্য দিতে হয়। আওয়ামী লীগকে যুক্তফ্রন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং আতাউর রহমান, আবুল মনসুর আহমদ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে যুক্তফ্রন্ট নেতা ফজলুল হককে সরানোর অপচেষ্টা, কেন্দ্রের সঙ্গে মাখামাখি ও ১৯৫৫ সালের ১৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক জনসভায় গালিগালাজপূর্ণ ও সংসদীয় আচরণ বহির্ভূত ভাষা ব্যবহার করাসহ সাতটি অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় ।
আওয়ামী লীগের বৈঠকে যোগদানের উদ্দেশ্যে ভাসানীসহ ঢাকায় ফিরে আসার পূর্বে সোহরাওয়ার্দী দুটি তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতি প্রদান করেন। প্রথম বিবৃতিতে তিনি বলেন যে শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কনভেনশনের সঙ্গে জনগণ যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে দেশে নিম্নলিখিত তিনটি বিকল্প পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে:
ক. বিপ্লব যা নব্য বিপ্লবী দল কর্তৃক নতুনভাবে সূচিত হবে;
খ. সামরিক সমর্থনপুষ্ট অসামরিক একনায়কতন্ত্র; এবং
গ. সামরিক আইন।
তিনি তাঁর দ্বিতীয় বিবৃতিতে সমতা-সূত্রের সমর্থনে বলেন যে এটি লিয়াকত আলীর আমল থেকেই সাধারণভাবে স্বীকৃত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এবং এমনকি যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা কর্মসূচিতেও এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়নি। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটি সোহরাওয়ার্দীর এই অবস্থানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করার আগে ভাসানী তাঁকে দিয়ে নিম্নলিখিত অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করিয়ে নেন:
আমি এতদ্বারা ঘোষণা করছি যে যুক্তফ্রন্টের ২১-দফা কর্মসূচি ও যুক্তনির্বাচনের প্রস্তাবসমূহ শাসনতন্ত্রকে যতটা প্রভাবিত করে ততটাই যেন শাসনতন্ত্র বিষয়ক কনভেনশন মেনে নেন তার জন্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো। এটি করতে ব্যর্থ হলে আমি মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেবো।
এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন যে এই ধরনের একটি অঙ্গীকারনামার ক্ষমতাবলে ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশা করেছিলেন। তবে এ থেকে যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হচ্ছে যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচির প্রতি তখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।
অন্য কথায় বলা যায় যে আওয়ামী লীগ স্বীকার করতো যে ২১-দফা কর্মসূচি আওয়ামী লীগেরও কর্মসূচি। ভাসানী তাঁর দলের অবস্থানের কথা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন যে পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হবে এই আশা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন ও সমঝোতা হিসেবে সমতা-সূত্র গ্রহণ করা হয়েছে এবং ৯২-ক ধারা অপেক্ষা অধিকতর খারাপ কিছু আরোপ করা হবে না এই আশা নিয়ে শাসনতান্ত্রিক কনভেনশন মেনে নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যাখ্যা আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিসঙ্গত এবং গৃহীত অবস্থান প্রায় অনিবার্য মনে হলেও কৃষক শ্রমিক পার্টি, নিজাম-এ-ইসলাম, গণতন্ত্রী খেলাফত-ই-রব্বানী, পাকিস্তান ন্যাশনাল কংগ্রেস ও পরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কনভেনশন বয়কট করায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ তৎসময়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিষয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর অভিযোগে ফজলুল হক ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দী উভয়কে অভিযুক্ত করেন।
৭৫ যা হোক, ফেডারেল আদালতের রুলিং কনভেনশনের কার্যকারিতা রহিত করে দেয় এবং দ্বিতীয় গণপরিষদ গঠন করা হয়। আশ্চর্য বিষয় হলো প্রতিনিধিত্ব করার সমতাভিত্তিক নীতি অপরিবর্তিত থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলি যারা ইতঃপূর্বে কনভেনশন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা আবার কোনো রকম প্রতিবাদ ছাড়াই দ্বিতীয় গণপরিষদে নির্বাচনের জন্য তাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন দান করে। পূর্ব পাকিস্তানের একত্রিশটি মুসলিম আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তেরটি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ষোলটি এবং মুসলিম লীগ | দুটি আসন লাভ করে ।
এ কথা সহজেই অনুমেয় যে সামরিক শাসন জারির আশঙ্কায় সোহরাওয়ার্দী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য কতিপয় সমঝোতা করতে রাজি ছিলেন। পশ্চাদ্দৃষ্টি প্রয়োগ করলে এ বিষয়টিও নিশ্চিতরূপে প্রতীয়মান হয় যে একটি আশু সংঘর্ষমূলক বিরুদ্ধতা নীতি অবলম্বন করলেও তা থেকে মূলত কোনো পৃথক ফল পাওয়া যেত না। বরং তা কর্তৃত্বের অধিকতর কেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতো, যা সম্ভবত অনিয়ন্ত্রণযোগ্য সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতো।
এ কারণেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অবস্থানটি ছিল আশু রাজনৈতিক সঙ্কট পরিহারের পন্থাবিশেষ। সোহরাওয়ার্দী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত অভিপ্রায় বাস্তবায়নের জন্য সার্বিক সমতা-নীতি ও এক ইউনিট-নীতি এ দুটোই ছিল অপরিহার্য। তিনি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে উক্ত প্রস্তাবে বিধৃত দুটি আঞ্চলিক ইউনিটের সার্বভৌমত্ব (যা ১৯৪৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনে শিথিল করা হয়) যা বিদ্যমান কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষমতা কাঠামো অস্বীকার করে চলেছে। তা কেবল সার্বিক সমতা-নীতি ও দুটি ফেডারেল ইউনিট-নীতির মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
কিন্তু সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর দলকে কূটকৌশলের মাধ্যমে পরাভূত করা হয়। মারী চুক্তির অন্তর্নিহিত ভাবাদর্শের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয় । এই চুক্তিতে সার্বিক আঞ্চলিক সমতা ও যুক্ত নির্বাচনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সোহরাওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বকেই যে কেবল অস্বীকার করা হয় তা-ই নয়, তাঁকে বিজ্ঞ মন্ত্রিসভা থেকেও বাদ দেওয়া হয় এবং এভাবে ৯২-ক ধারা প্রত্যাহারের পরেও পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়।
হৃত বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের জন্য পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ তার মূল দাবি অর্থাৎ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও যুক্তনির্বাচনের কথা ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে পুনরায় জোর দিয়ে উল্লেখ করে এবং এইভাবে জাতীয় আইনসভায় তাদের অভিযান অব্যাহত রাখার বিষয় ব্যক্ত করে। কাউন্সিল বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আশিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কথা বলা হয়।৬ এখানে লক্ষণীয় যে এই বৈঠকেই দলীয় সদস্যপদের ধর্মনিরপেক্ষতাকরণের বিষয়টি সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়।
উক্ত বৈঠকের (দু’বছরের মধ্যে প্রথম অনুষ্ঠিত) সভাপতির ভাষণে মওলানা ভাসানী বলেন যে বিগত দু’বছরে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সফরকালে সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদ্ধতি সম্পর্কে যে ‘অন্তরঙ্গ জ্ঞান’ লাভ করেছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পাকিস্তানে বিরাজমান পরিস্থিতিকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে অবলোকন করতে সক্ষম এবং তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি যে লব্ধ অভিজ্ঞতা আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি গ্রহণে সহায়তা করবে।
” তাঁর বক্তব্যের সারসংক্ষেপ থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে কল্যাণরাষ্ট্র বিষয়ক ধারণা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং তিনি পাকিস্তানকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রের রূপদানের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তবে তা এমন এক পাকিস্তানে করতে হবে যেখানে ११ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন থাকবে। তিনি বলেন:
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি বহু দিনের। পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সমৃদ্ধি এর ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রদেশ ও উপজাতীয় এলাকাসমূহ একত্রীকরণের পর এই দাবির যৌক্তিকতা আরো জোরদার হয়েছে। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রাব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয় ছাড়া যাবতীয় ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারের হাতে অবশ্যই ন্যস্ত করতে হবে।… নৌবাহিনীর সদর দফতর থাকবে পূর্ব বাংলায় এবং বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালিত হবে প্রাদেশিক সরকারের অধীনে। আমি আইনসভার সদস্যদের অনুরোধ করবো তাঁরা যেন আগামী অধিবেশনে এই আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এই উপমহাদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সূচিত যে কোনো উদ্যোগকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সমর্থন করার কথা ঘোষণা করে তিনি তাঁর অঙ্গীকৃত সাম্রাজ্যবাদ- বিরোধী অভিপ্রায় পুনরায় জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান বিজড়ন পূর্ব পাকিস্তানে যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করে তার পরিপ্রেক্ষিতে ভাসানীর বিবৃতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশেষ করে যখন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিবেদনে বলা হয়:
পাকিস্তানের দ্বৈত নীতি আমাদের মাতৃভূমিকে দুরবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রদেশগুলির সামাজিক রীতিনীতি নির্বিশেষে তাদের সহ-অবস্থান নীতিই কেবল পাকিস্তানের অগ্রগতি ও উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। আজ আওয়ামী মুসলিম লীগ পাকিস্তানের শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দ্বিধায় বিশ্বশান্তির জন্য আহ্বান জানাবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে এত বড় দায়িত্ব পালনের জন্য আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক- ভাবে ততটা শক্তিশালী নয় । তিনি বলেন যে এই সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই কেবল
প্রতিক্রিয়াশীলচক্র বারংবার আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে কর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি অধিকতর আনুগত্য দলকে তখনো সম্পূর্ণ সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা স্বীকার করায় তাঁর এ বিষয় সম্পর্কে অবহিত থাকার কথা প্রকাশ পায় যে জনগণ কর্তৃক দলের মতবাদ ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে গ্রহণ করা অপেক্ষা নেতিবাচক ভোটই (মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোটদানের জন্য একটিমাত্র বিকল্প থাকায়) ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে দলের সাফল্য (যুক্তফ্রন্টের অঙ্গ হিসেবে) বয়ে আনে এবং এ কারণে তৃণমূলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি ক্যাডারভিত্তিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক জরুরি হয়ে পড়েছে। দল যখন ১৯৫৬-৫৭ সালে ক্ষমতায় আসে তখন একটি শক্তিশালী সংগঠনের ব্যাপারে এই অব্যাহত উদ্বেগ ধীরে ধীরে এক গম্ভীর অন্তর্দলীয় স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
১৯৫৫ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে “মুসলিম” শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সকলের জন্য দলের সদস্যপদ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথম বিষয়টি উত্থাপিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভাসানী কর্তৃক জনমত যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে। ১৯৫৩ সালের অক্টোবর মাসে সভাপতির ভাষণে ভাসানী বলেন:
আওয়ামী লীগকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করার প্রশ্নটি দু’বছর আগেই উত্থাপন করা হয় এবং গত কাউন্সিল বৈঠকে যখন দলের গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হচ্ছিল তখন নামকরণ সম্পর্কিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব আমাকে অর্পণ করা হয় এবং জনমত যাচাই করে একটি বৈঠক আহ্বানের কথা আমাকে বলা হয়।
বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা পর্যায়ের দলীয় কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার পর আমি লক্ষ্য করি যে এই ভূখণ্ডের (তিনি অবশ্যই পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলেছেন) অধিকাংশ জনগণ, বিশেষ করে, দলীয় কর্মীদের বৃহৎ অংশই দলের ধর্মনিরপেক্ষ চারিত্র্যের অনুকূলেই কেবল মত প্রকাশ করেনি, বরং তারা এটিকে তাদের জোর দাবি হিসেবে উপস্থাপন করে।
যুক্ত নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের যে দাবি ছিল তারই অনুসরণে দলের ধর্মনিরপেক্ষতাকরণের বিষয়টি ছিল একটি পদক্ষেপ। এটি ছিল সময়োচিত দাবি, কারণ অমুসলমান সম্প্রদায়, বিশেষ করে, হিন্দু সম্প্রদায় যারা নিজেরাই যুক্ত নির্বাচনের পক্ষে ছিল তারা এবং ঐসব অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সদস্য যারা অন্যথায় দল ত্যাগ করতো তারাও এটি সমর্থন করে। এটা এমন একটা সময় ছিল যখন দলকে সুসংহত করার প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এ সময়ে যদি রাজনৈতিকভাবে সচেতন অংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দেখা দিতো তাহলে তা হতো দলের জন্য চরম আঘাতস্বরূপ ।
এই কাউন্সিল বৈঠকে গঠনতন্ত্র প্রণয়ন বিষয়ক সাবকমিটির আহ্বায়ক আবদুল হামিদ চৌধুরী, এম. পি. এ. (১৯৫৪ সালের ৫ এপ্রিল নিয়োগদান করা হয়) দলের গঠনতন্ত্র উপস্থাপন করেন এবং সাবজেক্ট কমিটির বৈঠকে এই গঠনতন্ত্রের ওপর দীর্ঘ এগারো ঘণ্টা আলোচনার পর চূড়ান্তরূপে তা গৃহীত হয়।৮৩ এই গঠনতন্ত্রে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ “এর গঠনতন্ত্র ও কর্মসূচির অনুমোদনের ভিত্তিতে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান আঞ্চলিক শাখা হিসেবে গণ্য হবে।

” এতদ্বারা দলের প্রথম সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পূর্বোক্ত দৃঢ় অবস্থানটিকেই বহাল রেখে এই প্রাদেশিক দলটির অনন্য নিজস্বতা নিশ্চয়ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়। অপরপক্ষে, এইভাবেই পাকিস্তান সমাজের সার্বিক প্রতিষ্ঠানমাত্রিকতার প্রয়াসের এক ফলপ্রসূ অংশীদারিত্ব থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই একরূপ স্বারোপিত সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।
এছাড়া, প্রাদেশিক দলের মধ্যে সংবদ্ধ থাকার প্রবণতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দুই ধরনের বিবাদ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছিল। পরস্পরবিরোধী স্বার্থসম্বন্ধিত এই বিবাদ ছিল কিছুটা আদর্শগত ও কিছুটা ব্যক্তিগত। দলীয় রাজনীতিতে এই ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব স্বাভাবিক এবং এর পরিণতিতে মেরুকরণও হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী আলোচনাসমূহ থেকে আমরা লক্ষ্য করবো যে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে অবশ্য এই সব অন্তর্দলীয় ঝগড়া-বিবাদ রাজনীতির সারবস্তুস্বরূপ ফলপ্রসূ মেরুকরণে ব্যর্থ হয়েছিল ।
উপসংহারে বলা যায় যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভেতরে বিভক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও এই দল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিকভাবে সচেতন জনমানসের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ পাকিস্তানের জাতীয় পুনর্গঠনে অর্থপূর্ণ ভূমিকা পালনে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল এবং সেই কারণেই এই দল প্রদেশে প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়েছিল।
