আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-২ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ]

আজকের আলোচনার আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-২, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত,  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আনুমানিক ২৫০ জন সাক্ষীর শুনানি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জবানবন্দীর কাজ ১৯৬৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হয় । এই মামলায় সরকারের প্রধান কৌঁসুলি মঞ্জুর কাদির ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাদীপক্ষের যুক্তি প্রদর্শন শুরু করেছিলেন তবে আদালতের প্রসিডিংস ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করা হয় ও পরে এই মুলতবি আদেশ ১০ মার্চ, ১৯৬৯ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

ইতোমধ্যে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে দেশ থেকে জরুরি অবস্থা ও পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন প্রত্যাহার করা হয় । আর পরিশেষে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামিকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয় । পাকিস্তান সরকারের এক প্রেসনোটে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে, জরুরি আইন প্রত্যাহারের সাথে কোনো রকম ভুল বোঝাবুঝি এড়ানোর জন্য মৌলিক অধিকার পুনর্বহাল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বিলুপ্ত করা হয়েছে আর সেই পটভূমিতেই শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। 

 

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-২

 

 

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-২

সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের যে টেকনিক্যাল আইনগত কারণই দেখিয়ে থাকুন না কেন, বাস্তবিকপক্ষে গণউত্থানের কারণেই সরকার ঐ সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য হন । পরিশেষে মোনেম খানও ২২ মার্চ ১৯৬৯ পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে রাওয়ালপিণ্ডি রওনা হন। তিনি আর তাঁর পদে ফিরে আসেননি। আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিয়ে ক্ষমতা ছাড়েন। কিন্তু ইতোমধ্যে, “দরকষাকষির আলোচনা”র নামে আরো অনেক রক্তপাত ঘটে। অ্যাপস্যাক ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয় সে পরিবর্তন পরবর্তীকালে যতই সামান্য প্রতিভাত হোক না কেন ।

এগারো-দফা বিকিয়ে কোনো আপোস হবে না—এই মর্মে অ্যাপস্যাকের ঘোষণার প্রতি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়াও তাতে সমর্থন ঘোষণা করে কলকারখানার শ্রমিকরা । জোরালো সমর্থন জানিয়েছিলেন, উপমহাদেশে বিক্ষোভ রাজনীতির অন্যতম পুরোধা মওলানা ভাসানী। ভাসানী পরপর কয়েক দফা জনসভায় পরিষ্কার উল্লেখ করেন যে, এগারো-দফা দাবির অস্বীকৃতি পূর্ব পাকিস্তান মেনে নেবে না। শুধু তাই নয়, ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ন্যাপ (ভাসানী)-র এক সভায় তিনি ঘোষণা করেন যে, অহিংস নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের দিন অতিক্রান্ত হয়েছে, এবার আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায় হবে সহিংস ও অনিয়মতান্ত্রিক। তিনি আরো ঘোষণা করেন, তাঁর এক সময়ের সহপথযাত্রী শেখ মুজিব ও অন্যদের যদি অবিলম্বে মুক্তি না দেওয়া হয় তাহলে ফরাসী বিপ্লবের সময়কার মতো জনসাধারণ জেলের তালা ভেঙে তাদের মুক্ত করবে।

তিনি আরো বলেন, এগারো দফা দাবি পূরণ না করা হলে জনগণ খাজনা ও কর পরিশোধ বন্ধ করে দেবে। পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাসানীর মূল্যায়ন জনগণের ঐ সময়ের ক্রোধানুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। আগরতলা মামলার অন্যতম প্রধান আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার পর জনগণের মাঝে এ ক্রুদ্ধ অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

ক্যান্টনমেন্ট কারাগারের একজন প্রহরী সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করে। তাঁর লাশ যখন মিছিল করে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন ঢাকার অধিবাসীরা পথিমধ্যে কয়েকটি ভবনে আগুন লাগিয়ে দেয় । এর মধ্যে চার কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মন্ত্রীর সরকারি ও বেসরকারি বাসভবন, রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন, আগরতলা মামলার জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন, পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তানের আহ্বায়কের বাসভবন, কনভেনশন মুসলিম লীগের তৎকালীন কার্যালয় ভবন ও একই দলের নির্মীয়মাণ কার্যালয় ভবন, ঢাকা জিমখানা ক্লাবের কোনো কোনো অংশ ও একটি ছাপাখানা রয়েছে।

শেখ মুজিবের মুক্তি সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর উল্লেখ এক নতুন শ্লোগানের জন্ম দেয়: “জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো” আর তা পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিকে এই মর্মে প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে প্রস্তাব নিতে শক্তি যোগায়: প্রেসিডেন্ট ও রাজনীতিকদের মধ্যে প্রস্তাবিত গোলটেবিল বৈঠকে ড্যাকের যোগদানের জন্য আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবি । ইতঃপূর্বেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৬৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গোটা পূর্ব পাকিস্তানে ‘শেখ মুজিব দিবস’ ও ‘ছয়-দফা’ দিবস পালিত হয়।

করাচি আওয়ামী লীগও শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করে। বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা আব্দুল মান্নান নারায়ণগঞ্জের আদমজিনগরে এক শ্রমিক সমাবেশে ঘোষণা করেন যে, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া না হলে কলকারখানার শ্রমিকরা এক বিরাট আন্দোলন শুরু করবে। রুহুল আমিন ও মওলানা সাইদুর রহমানের মতো অন্যান্য শ্রমিক নেতা একই ধরনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।২ তাৎপর্যপূর্ণভাবে সৈয়দ নজরুল ইসলামও বলেন, “আজকে আমাদের সংগ্রামের বিভিন্ন স্তর বা পর্যায়কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে।

স্পষ্টত এ কথা বলার মধ্য দিয়ে তিনি আভাস দিয়েছিলেন যে কেবল ড্যাক বৈঠকে, এমনকি গোলটেবিল আলোচনাতে অংশগ্রহণই সব নয়, বরং ধরে নিতে হবে এ সব হলো অভীষ্ট লক্ষ্যে “পৌঁছানোর উপায়।” এই পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল দলের অস্তিত্ব রক্ষা আর সেটি অনেকখানিই নির্ভর করছিল। দলনেতার বেঁচে থাকার ওপর। তাই নানা সমস্যার জট একাদিক্রমে ও অগ্রাধিকারের ধারাবিন্যাসে সমাধানের দরকার ছিল, যেমন, প্রথমে নেতার অস্তিত্বরক্ষা, পরে দলের অস্তিত্বরক্ষা ও শেষে স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্বরক্ষা।

আর তাই যে কৌশল তথা সীমিত লক্ষ্যে ড্যাকে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে কড়াকড়ি নৈতিক ধারণায় একটা সুবিধাবাদের গন্ধ পাওয়া গেলেও সে সিদ্ধান্ত ছিল বাস্তবসম্মত। এই বাস্তববাদ যে কোনো সঙ্কটে বরাবরই আওয়ামী লীগের জন্য তুরুপের তাসের কাজ কথার শাণিত উল্লেখ করেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর বক্তৃতায়। তাতে ড্যাকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যোগদানের প্রকৃতি কী তার একটা পরিষ্কার ইশারা রয়েছে যদিও ড্যাকের কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কর্মসূচি থেকে অনেক সীমিত ।

ড্যাক স্টাইলে গণতন্ত্রায়নের প্রয়োজনীয় সূচনামাত্র হবে বলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের যুক্তি বাহ্যত বোধগম্য হলেও তাতে পিডিএম-এ যোগদানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের রূঢ় স্থূল প্রত্যাখ্যানের ব্যাখ্যা মেলেনি, কারণ, পিডিএম-এরও লক্ষ্য ছিল অন্তত কিছু না হলেও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতন্ত্রায়ন। অবশ্য ধরে নেওয়া চলে, পিডিএম যদি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানোর পর গঠিত হতো তাহলে সম্ভবত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য পিডিএমকে কাজে লাগাতো।

শেখ মুজিবের মুক্তির প্রশ্নে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ও অবদান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের জন্য শক্তির উৎস হলেও তাতে হুমকিও যুগপৎ প্রচ্ছন্ন ছিল। আন্দোলন খুব বেশি মারমুখী হয়ে গেলে পরিস্থিতি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ঘোষিত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সীমার বাইরে চলে যেতে পারতো আর তাতে বিপন্ন হতে পারতো দলের নেতা, দল এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কল্পনার পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ।

এ ছাড়াও ড্যাকের আট-দফার মধ্যে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবির অন্তর্ভুক্তি পশ্চিম পাকিস্তানী সংশ্লিষ্ট নেতাদের অনুমোদনকেও সূচিত করেছে। তাই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা যদি এই মর্মে আশাবাদী হয়ে থাকেন যে, শেষাবধি ছয়-দফাও পশ্চিম পাকিস্তানী নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে তাতে তেমন বিস্ময়ের কিছু নেই । ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তিলাভের অব্যবহিত পর তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে চলতি আন্দোলনে দেশের উভয় অঞ্চলের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।

তাঁর এই বক্তব্য দেওয়ার নেপথ্য নিয়ন্ত্রক কারণটি নিশ্চয়ই ছিল আন্দোলনের পরিস্থিতির সহিংসতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা এবং যুগপৎ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রত্যাশা। অল্পকাল পরেই তাঁকে আন্দোলনের পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের পূর্ণ বিশদ বিবরণ অভিহিত করা হলে তিনি বলেন, গণআন্দোলন ও রাজনীতিকদের আলাপ-আলোচনা একইসঙ্গে চলতে থাকবে । বস্তুত এতে স্বীয় বিকল্পগুলি খোলা রাখতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কৌশলই প্রতিফলিত হয় । তবে তিনি ‘আন্দোলনে’র প্রকৃতি কী হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি ।

কাজেই এখন আন্দোলনের মনোযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি । কেননা দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একমাত্র তিনিই গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন । তবে সাম্প্রতিককালে যে সব নেতাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় ও যাঁরা কঠিন সঙ্কটময় বছরগুলিতে দলকে পরিচালনা করছিলেন তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই যোগাযোগের অভাব ঘটে থাকবে।

ড্যাকের লাহোর বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে কিছু প্রারম্ভিক বিভ্রান্তি দেখা দেয় বলেই মনে হয়। কেননা, সাধারণ সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির মধ্যে মতভেদের একটা আভাস পাওয়া যায়। অবশ্য এই মতপার্থক্যের দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অন্যতম ডেলিগেট (প্রতিনিধি) ময়েজুদ্দিনকে ঢাকায় পাঠানো হয় শেখ মুজিবের স্ত্রীর মাধ্যমে তাঁকে অবহিত করানোর জন্য যে, তিনি যেন প্যারোলে মুক্তি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

তখন এই মর্মে এক গুজব রটেছিল যে, শেখ মুজিব হয়তো প্যারোলে গোলটেবিল আলোচনায় যোগ দিতে পারেন। আর এ প্রস্তাব তাজউদ্দিনের সবুজ সঙ্কেতে তিনি নাকি মেনে নিয়েছেন । মুজিব এ পরামর্শ শুনতেন কিনা তা নিশ্চিত ছিল না তবে এও ঠিক এ সম্ভাবনার বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল ।৩৫ মওলানা ভাসানীও শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি না নেওয়ার জন্যেই পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেই বিশ্বাস করা হয় । অবশ্য গোলটেবিল বৈঠকে মওলানার কোনো কিছুই করার ছিল না । কারণ, তিনি এই গোলটেবিল বৈঠককে দেশকে কব্জা করে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত হিসেবে নিন্দা করেন। 

কোনো কোনো রাজনীতিবিদ গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পূর্বশর্ত প্রেসিডেন্টকে মেনে নিতে সম্মত করানোর ব্যাপারে ড্যাকের সাফল্য নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা করেন । তাঁরা আশা করেন যে, গোলটেবিল সম্মেলনে দেশের গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।

আর তার ফলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক তৎপরতার দ্বার উন্মোচিত হবে। অন্য কিছু রাজনীতিক এ বিষয়ে তাঁদের সংশয় প্রকাশ করলেও উভয় তরফের রাজনীতিবিদরা পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। কেননা, ছাত্ররা পূর্ণ উদ্যম ও বিপুল অধ্যবসায়সহকারে তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শন অব্যাহত রাখে। পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণও তাঁদের আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়া দেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যার খবর এলে ঢাকাবাসীরা “সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো ঢাকার রাস্তায় মানুষের ঢল নামায়।’

আন্দোলনের প্রথম প্রয়াসেই সাফল্য তথা বিজয় প্রায় হাতের মুঠোয় এসে যায়। ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেন, তিনি পরবর্তী নির্বাচনে দাঁড়াবেন না। ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং শেখ মুজিবসহ অন্যান্য বামপন্থী নেতা যেমন, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিং প্রমুখকে মুক্তি দেওয়া হয়। শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের তথ্য ও বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন কর্তৃক গোলটেবিল সম্মেলনে আমন্ত্রিত হন ৷

কারামুক্তির অব্যবহিত পরই শেখ মুজিব মওলানা ভাসানীর সাথে বৈঠকে মিলিত হন ও এগারো দফার প্রতি তাঁর সমর্থন ঘোষণা করেন। ” অ্যাপস্যাক শেখ মুজিবের জন্য গণসংবর্ধনার আয়োজন করে। আর তার মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব ও অ্যাপস্যাক নেতৃত্বের মধ্যে পরিপূর্ণ সমঝোতার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যময় ও বিশিষ্ট হয়ে ফুটে। ওঠে। শেখ মুজিব তাঁর ভাষণে বলেন, তাঁর মুক্তিতে ছাত্রদের বিজয়ই সূচিত হয়েছে।

তিনি এগারো-দফার প্রতি তাঁর সক্রিয় সমর্থনের আশ্বাস দেন । এই মর্মে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, (গোলটেবিল আলোচনায়) সম্পৃক্ত সকল দাবিই উত্থাপন করবেন ও সেগুলি মেনে না নেওয়া হলে গণআন্দোলন তীব্রতর করবেন। প্রয়োজনে তিনি কারাগারে ফিরে যাবেন। ছাত্ররাই তাঁকে আবার মুক্ত করবে। ৩৯ এতে আবারও প্রমাণিত হলো যে, ড্যাকের সাথে তাঁর দলের সংশ্লিষ্টতা ছিল এক কুশলী চাল যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দলের জন্য কিছু আশু সুবিধা নাগালে আনা।

এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও ড্যাকের মধ্যেকার মতভেদজনিত পার্থক্য বেশ দৃষ্টিগোচর হয়ে ওঠে যদিও আঁতাতের একটা মুখোশ ১৯৬৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গোলটেবিল আলোচনার সূচনা পর্যন্ত ধরে রাখা হয় । যা হোক, গোলটেবিল সম্মেলন আয়োজনের পথে সবচেয়ে কঠিন বাধাটি অপসারিত হওয়ার পর ড্যাক তার নিজ সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে অন্যান্য জটিলতা দূর করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবু ড্যাকের সহজাত অনৈক্য চেপে রাখা গেল না। গোলটেবিল সম্মেলনের কার্যঅধিবেশনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ সম্পর্কে পূর্বশর্তগুলি কী হবে সে সম্পর্কে স্বীয় অবস্থানের বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বৈঠকে ড্যাক মিলিত হলে উল্লিখিত অনৈক্য পরিষ্কার হয়ে ওঠে ।

ড. কামাল হোসেন যথার্থই মন্তব্য করেন যে, “ড্যাক ছিল সহজাতভাবে সংঘাতময় নানা স্বার্থের বাহক মহলগুলির সমাবেশ। যখনই পরিষ্কার বোঝা গেল আইয়ুব আর ক্ষমতা হাতে রাখতে পারবেন না এবং নতুন একটা শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাপত্রও সত্যিকার অর্থে সম্ভবপর হয়ে উঠেছে তখনই ঐ সব সংঘাতময় স্বার্থগুলি স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। “

চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান ও মওলানা মওদুদীর নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসনবিরোধী ও এক ইউনিটপন্থী ড্যাক উপগোষ্ঠীটি ফেব্রুয়ারির এক প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে ইতোমধ্যেই রায় দিয়েছিলেন যে, যেহেতু ড্যাকের আট-দফায় স্বায়ত্তশাসন ও এক ইউনিট ইস্যু নেই—এগুলি গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা করা যাবে না।

এদিকে, স্বায়ত্তশাসনপন্থী ও এক ইউনিটবিরোধী উপগোষ্ঠী তথা ছয়-দফাপন্থী আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ (ওয়ালী) তাঁদেরকে বোঝাতে অক্ষম হন যে, যেহেতু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল গণআন্দোলনের এক অসাধারণ পরিস্থিতিতে যে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আর এ আন্দোলনে মূল প্রেরণা ছিল এগারো-দফা তাই এই এগারো-দফার অন্তর্ভুক্ত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও এক ইউনিট বাতিলের দাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে গোলটেবিল সম্মেলনে যদি আলোচনা না-ই করা যায় তাহলে তেমন গোলটেবিল আলোচনার সার্থকতা কোথায়? একটি অভিন্ন অবস্থান রচনায় ড্যাক উপকমিটি পূর্ব পাকিস্তানী ডেলিগেটদের সর্বসম্মত পাঁচ-দফার প্রশ্নে ঐকমত্য অর্জন করতে পারেনি।

পূর্ব পাকিস্তান ডেলিগেটদের এ পাঁচ-দফায় অন্তর্ভুক্ত ছিল: সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকার, ফেডারেল সংসদীয় সরকার, পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব এবং এক ইউনিট বাতিল। সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করা হয় স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে। ফলে, পূর্ব পাকিস্তানী প্রতিনিধি দল এগারো দফায় ঘোষিত অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার কারণে গোলটেবিল সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেয়। উল্লেখ করা দরকার, এগারো দফায় ছয়-দফা অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

পূর্ব পাকিস্তানী প্রতিনিধি দল ৯ তারিখে যখন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরতি যাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল সেই সময় এয়ার মার্শাল আসগর খান সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি আপোস ফর্মুলা বের করতে সক্ষম হন। এর ফলে নসরুল্লাহ খান সর্বসম্মত দাবিগুলির উত্থাপনের ক্ষমতা লাভ করেন আর ঠিক হয় গোলটেবিলে যোগদানকারী অন্য সব দল তাদের নিজ নিজ প্রস্তাব গোলটেবিল আলোচনায় উত্থাপন করতে পারবে। এরই প্রেক্ষাপটে ড্যাকের আহ্বায়ক, নসরুল্লাহ খান –

১. ফেডারেল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা; ও

২. সর্বদলীয় বয়স্ক ভোটাধিকারেরভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা—প্রবর্তনের দাবি জানান । 

নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের (ছয়-দফাপন্থী) সভাপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর

রহমানের দাবি ছিল: 

১. ফেডারেল আইনসভায় জনসংখ্যাভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন;

২. ছয়-দফা ফর্মুলায় প্রদত্ত রূপরেখা অনুযায়ী পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন;

৩. দেশের পশ্চিমাঞ্চলে এক ইউনিট বাতিল ।

 

শেখ মুজিবের বক্তৃতা অন্যান্য অংশগ্রহণকারীর ওপর কোনো প্রভাব-প্রতিক্রিয়া ফেলে থাকুক না থাকুক, তিনি আওয়ামী লীগের অবস্থানটি রেকর্ডে দেওয়ার এই সুযোগটি হারাননি । তিনি দেশ যে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছে সেই সঙ্কটের সমাধান এগারো-দফা ও ছয়-দফা ফর্মুলার বাস্তবায়নে নিহিত রয়েছে বলে জোর উল্লেখ করে তাঁর পার্টিকে কিছুটা বিপ্লবাত্মক রূপে প্রতিবিম্বিত করার জন্যও এই মঞ্চটিকে কাজে লাগান। তিনি স্বীকার করেন, জনসমাজের পুনর্নির্মাণ আবশ্যক। আর এও স্বীকার করেন যে, এগারো-দফা কার্যক্রম সঠিকভাবেই দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

 

তবে তিনি ঐ সভাকে মনে করিয়ে দেন, ছয়-দফা কর্মসূচি অর্থনীতির বৈপ্লবিক পুনর্গঠনের প্রয়োজনের কথা স্বীকার করে আর মনে করে যে, কর্মসূচিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে তা ফলদায়ক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাদি বাস্তবায়নের এক জরুরি পূর্বশর্ত। এমনি করে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের যুবসম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করে বলেন, ছয়-দফা কর্মসূচির বাস্তবায়নই একমাত্র অভীষ্ট বলে ধরা হয়নি বরং এ সব দফায় যে সব বৃহত্তর পরিবর্তন দাবি করা হয়েছে সেগুলির অবকাঠামো বা বুনিয়াদ হিসেবে এর কাজ করার কথা।

তবে তিনি উল্লেখ করেন আপাতত তিনি চান শাসনতান্ত্রিক। পরিবর্তনগুলির রূপরেখা তৈরিতে নিজেকে সীমিত রাখতে যা মানুষ ও মানুষের অঞ্চল ও অঞ্চলের মাঝে অর্থনৈতিক সুবিচার অর্জন করার পূর্বশর্ত। 

১৯৬৬-৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বিরোধীদলগুলির রক্ষণবাদী গোষ্ঠীগুলির দলে না ভিড়ে নিজের অবস্থান আরো মজবুত করে। ভাসানীর নেতৃত্বে উগ্রপন্থী বিরোধীদল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অভিমত গ্রহণ না করায় অনেকখানি আস্থা হারায়। ১৯৬৯ সালে আওয়ামী লীগ অ্যাপস্যাক তথা ছাত্রদের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রীতে উপনীত হয়ে নিজ অবস্থানকে শক্ত করে তোলে । কেননা, এই ছাত্ররা পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে সোচ্চার ও সঙ্কল্পে অটল অংশ। তাই এই মৈত্রী আওয়ামী লীগের পরবর্তী পর্যায়ের সংগ্রামে বিরাট সুবিধা করে দেয় ।

আওয়ামী লীগের এই মনোভঙ্গি ভারতের জাতীয় কংগ্রেস গৃহীত কৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়। কংগ্রেসের অভ্যন্তরে প্রগতিবাদীরা ছিল। তারা যে কর্মসূচির বিষয় স্থির করেছিল তার বেশির ভাগ উজ্জ্বলতা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির কর্মসূচিতে প্রগতিবাদী দাবির কথা বলে তা সন্নিবেশিত করেছিল তৎকালীন কংগ্রেস হাইকম্যান্ড। আর এভাবে প্রকাশ্য সংঘাতের ঝুঁকি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে এনেছিল ।

বাস্তবিকপক্ষেও ঐ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পক্ষে ছাত্রদের নাখোশ করা সম্ভব ছিল না । দলটি উদাসীন মনোভাব দেখালে তারা হয়তো পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে ভাসানীর দিকে ঝুঁকে পড়তে পারতো। ড্যাকের অন্যান্য পক্ষের মনোভাব ও ক্ষমতাসীনচক্রের মনোভাব খুবই পরিষ্কার থাকার আলোকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই সচেতন ছিল, তাদের এ সংগ্রামকে গোলটেবিল আলোচনাকেও ছাড়িয়ে উত্তরিত করতে হবে। আর তাই ছাত্রদেরকে তাদের সপক্ষে রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার সংঘাত সম্পর্কিত ব্যাপক শাসনতান্ত্রিক ইস্যুগুলির আশু সমাধান না হলে কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে খুব বিশদ আভাস দিয়েছিলেন শেখ মুজিব। গোলটেবিল সম্মেলনে বক্তৃতার সূচনায় তিনি বলেন, “আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নই আমাদের কাছে বড়।” পরে তিনি বলেন, “আমি যে সব প্রস্তাব এ সম্মেলনে পেশ করছি তা এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, পাকিস্তানের হেফাজত, এমনকি পাকিস্তানকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য তা একান্ত জরুরি।

কিন্তু পাকিস্তানের “অস্তিত্বরক্ষা” ও “হেফাজত” করার উল্লেখের নেপথ্যে যে হুঁশিয়ারি সঙ্কেতটি প্রচ্ছন্ন ছিল প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ও ড্যাকের সংখ্যাগরিষ্ঠ পক্ষগুলি তা উপেক্ষা করেন। গোলটেবিল সম্মেলনে সমাপনী ভাষণে আইয়ুব বক্তব্য পেশ করেন যে, যেহেতু মাত্র দুইটি ইস্যুতে যেমন, ফেডারেল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সর্বদলীয় বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেহেতু তাঁর পক্ষে আপাতত মাত্র এ দুটিই মঞ্জুর করা সম্ভব আর অবশিষ্টগুলি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে আইন পরিষদ। এমনি করে, ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী, পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিক এবং সেই সাথে পূর্ব পাকিস্তানের রক্ষণশীল রাজনীতিকদের স্বার্থ এই স্তরে এসে একত্রে মিলেমিশে যায় ।

কামাল হোসেনের সাথে একমত হতেই হবে সংশয়াতীতভাবেই যে, পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় এসে দাড়িয়েছে যেখানটায় এসে আর কোনো কিছুই টেবিলের আলোচনায় নিষ্পত্তি করা যায় না। কেননা, ঐ টেবিলের চার ধারে যারা বসে আছেন তাঁরা হলেন, নিন্দিত অপ্রতিনিধিত্বশীল নেতা যাঁদের প্রবণতা টেবিলের তলে কিংবা পর্দার আড়ালে লেনদেন করা ।৪৩ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষও এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল বলেই মনে হয় ।

তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বহু ক্ষেত্রে সহিংসতার আশ্রয় নিয়ে আইয়ুব খানের রায়ের প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করে। অ্যাপস্যাক গোলটেবিল বৈঠকের রায়ের প্রতিবাদে এবং পূর্ব পাকিস্তানী নেতাদের ঐ বৈঠকে ভূমিকার প্রতিবাদে এবং এগারো-দফা বাস্তবায়নে নতুন করে শপথ নেওয়ার জন্য ১৯৬৯ সালের ১৭ মার্চ প্রদেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়।

শেখ মুজিব ঢাকায় ফিরে এক সংবাদ সম্মেলনে গোলটেবিল আলোচনায় এনডিএফ-এর হামিদুল হক চৌধুরী, পিডিএম-এর মাহমুদ আলী, নিজাম-এ-ইসলাম-এর ফরিদ আহমদের ভূমিকার প্রকাশ্য সমালোচনা করেন এবং নুরুল আমিন, জাস্টিস মুর্শেদ ও ওয়ালী ন্যাপের মোজাফফর আহমদের বলিষ্ঠতার প্রশংসা করেন। তিনি এর আগেই ড্যাকের সাথে তাঁর দলের সম্পর্কচ্ছেদের কথা ঘোষণা করেন। তিনি গোলটেবিল আলোচনায় মওলানা ভাসানীর অনুপস্থিতি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্যও করেন যে, তাঁরা দু’জন যদি একত্রে গোলটেবিল আলোচনা থেকে ফিরতে পারতেন ৪ তাহলে বোধহয় খুবই ভালো হতো।

স্পষ্টতই এর অর্থ তার প্রতিক্রিয়া হতো আরো অনেক বেশি আর আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায় হতো আরো বেশি শক্তিশালী। এ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের এবং একই সঙ্গে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভাসানীর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ও মর্যাদার খোলা স্বীকৃতি। তবে শেখ মুজিব ভাসানীর গুরুত্বের কথা স্বীকার করলেও, ভাসানীর এই পরিচয় নিয়ে অন্যেরা প্রশ্ন তোলে। ছাত্রলীগ ও অ্যাপস্যাক নেতা তোফায়েল আহমদ এর আগে এ বিষয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভাসানী যদি এগারো-দফার এতই সপক্ষে থাকেন তিনি কেন তাহলে এ সব দফা উত্থাপনের জন্য গোলটেবিল সম্মেলনে গেলেন না? 

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সীমিত উদ্দেশ্যে ড্যাকে যোগ দিয়ে থাকলে অন্য দল বা উপদলগুলিও তা-ই করেছিলেন। তাদের সীমিত উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার পর যখন তারা দ্বিতীয়-দফার কলকাঠি নাড়ার রাজনীতির প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে তখনই ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।

বস্তুত এই কলকাঠি নাড়ার চালের রাজনীতি পাকিস্তানের একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য । নসরুল্লাহ খান গোলটেবিল সম্মেলনের সমাপনী দিবস ১৯৬৯ সালের ১৩ মার্চ। ড্যাকের বিলুপ্তি ঘোষণা করেন ও প্রেসিডেন্টের সম্মানে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন। ঐ দিন সন্ধ্যায় এয়ারমার্শাল আসগর খান জাস্টিস পার্টি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। নসরুল্লাহ খান পরে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি গঠন করেন সাবেক পিডিএমভুক্ত প্রায় সকলকে নিয়ে ।

আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান, পূর্ব পাকিস্তান চটকল ফেডারেশনের সভাপতি মওলানা সাইদুর রহমানের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জের আদমজিনগরে আয়োজিত প্রায় তিন লাখ লোকের এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় তাঁর দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা কী হবে তার রূপরেখার আভাস দেন।

তিনি বলেন, এখন থেকে সংগ্রাম হবে দ্বিমুখী: একদিকে, গণআন্দোলন, অন্যদিকে জনসাধারণের ভোটাধিকার। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এ কৌশলে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন আদায়, পশ্চিমে এক ইউনিট বাতিল এবং সেখানকার স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশগুলির মধ্যে উপফেডারেশন গড়া সম্ভব হবে । তিনি বলেন, “আমি এক কথার মানুষ: আমি আমার দেশবাসীদেরকে এই মর্মে আশ্বাস দিতে চাই যে, ছাত্র/শ্রমিক/কৃষকের সঙ্গত দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আমি তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাবো।”

প্রতিপক্ষ শক্তিসমূহের অস্তিত্বে আওয়ামী লীগ যে সজাগ ছিল সে বিষয়টি স্পষ্ট করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ। তিনি উল্লেখ করেন যে, গণআন্দোলন নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি তৎপর হয়ে উঠেছে।

তবে তিনি এই আশাবাদও ব্যক্ত করেন যে, জনগণ আর তাদের ফাঁদে পড়বে না । পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আবদুর রউফ ও তোফায়েল আহমদ সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের অবস্থানের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে কোনো আশু রাজনৈতিক মুনাফার জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে সহিংস আন্দোলনে পর্যবসিত করার সম্ভবাবনার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আর সম্ভবত এটি অ্যাপস্যাকে ভাঙনের সূচনার প্রতিও অঙুলি নির্দেশ করে।

মওলানা সাইদুর রহমান আশা প্রকাশ করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমিকদের পক্ষেই থাকবেন । সুপরিচিত শ্রমিক নেতা এবং চটকল শ্রমিক ফেডারেশনের সম্পাদক আব্দুল মান্নান শ্রমিকদের বহুমুখী সমস্যার সমাধানে শেখ মুজিবের সহযোগিতা কামনা করেন । সভায় অন্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন, সুতাকল শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক আব্দুল মোতালিব, নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুর রহমান এবং এমপিএ ও নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক নুরুল হক।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতা সিরাজুল আলম খান প্রস্তাব পাঠ করেন ও সভার শ্রোতারা হাত উঠিয়ে বেশ কতকগুলি প্রস্তাব পাস করেন। যা হোক, সভার জন্য নির্বাচিত স্থান, বাছাই করা বক্তা এবং সেখানে প্রখ্যাত ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের উপস্থিতি কলকারখানায় বিভিন্ন ইউনিয়নগুলির মাঝে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা বৃদ্ধির পরিচায়ক কেননা, এ সব ইউনিয়ন ঐতিহ্যগত ধারা অনুযায়ী বামপন্থী দলগুলির সঙ্গেই অনেক বেশি সম্পর্কিত ছিল ।

শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নে ঘোষিত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আওয়ামী লীগ ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ জাতীয় পরিষদের সচিবের কাছে শাসনতান্ত্রিক সংশোধনী-সংক্রান্ত এক বিল দাখিল করে ।৪৮ এতে একশতটি সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয় । এ সব সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ছয়-দফা ও এগারো-দফা অনুসারে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ ফেডারেল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং এক ইউনিট বাতিল করে পশ্চিম পাকিস্তানে এক উপফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা দেখতে চেয়েছিল।

এই সর্বশেষ উদ্যোগটি সফল হলে তাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমস্যাগুলি সমাধান হতে পারতো। জাতীয় পরিষদে এ সংশোধনী প্রস্তাবগুলির ওপর খোলা ও অবাধ আলোচনা অনুষ্ঠিত হলে তাতে ছয়-দফা ফর্মুলার কথিত দুর্বল কেন্দ্র সম্পর্কিত কল্পিত হুমকি কমতে পারতো ও ফলত গোটা ব্যবস্থাকে পশ্চিম পাকিস্তানী জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা যেতো।

কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা বরাবরের মতোই তখনো বিষয়টি এভাবে ভাবতে পারেননি। বরং অনুমান করা যায়, সিন্ধি, পাঠান, বালুচ ও বাঙালি সদস্যদের সমর্থনে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়ে যেতে পারে—এ আশঙ্কা ও অন্যদিকে এক বিরাজমান বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ এক বেতার ভাষণে আইয়ুব খান দেশবাসীকে জানান যে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন করা হলে তা শেষ পর্যন্ত দেশকে ধ্বংস করবে। আর তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তা নীরবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন না। যেহেতু জাতি চায়, সেনাবাহিনীপ্রধান তাঁর শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা পালন করুন সে জন্য তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিচ্ছেন।৪৯ এর আগে ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ আইয়ুব খান এক পত্রে সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে তাঁর এই প্রস্তাবিত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করেন ।

আওয়ামী লীগ নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়মতন্ত্রবহির্ভূত—উভয় বিকল্প পথ খোলা রাখলেও মওলানা ভাসানী অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের উপায় প্রত্যাখ্যান করেন। তখন মনে হয়েছিল মওলানা ভাসানীর আদর্শিক প্রবণতায় একটা বোধগম্য পরিবর্তন ঘটেছে। কেননা, তিনি গরিব, শোষিত মানুষের মুক্তির পথ হিসেবে “ইসলামী সমাজতন্ত্রের” কথা বলতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাতে তার ঘোলাটে ভূমিকা আরো বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। 

সে যা-ই হোক, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভাসানীই কেবল অজ্ঞাত ও অনিশ্চিত ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠলেন না, অ্যাপস্যাকের ভবিষ্যৎ ভূমিকাও অনিশ্চিত হয়ে উঠলো । অ্যাপস্যাক পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন সেই “অবিসংবাদিত নেতা”র কাছ থেকে আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে তাদের দাবিগুলির প্রতি স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হয়েছিল যাঁকে অংশত তারাই এই স্থানের অধিকারী বলে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

এগারো-দফা তখনো পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ছিল আধিপত্যশীল মূলভাব যদিও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রাথমিক উদ্যোগের ব্যাপারটি চলে যায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের হাতে কিংবা আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে শেখ মুজিবের হাতে। কিন্তু এ রকম এক ধরনের মহিমারোপের পর সেই অ্যাপস্যাকের পক্ষে তাঁকে কার্যকরভাবে অস্বীকার করাও সম্ভব ছিল না। ফলে তখনকার বিরাজমান পরিস্থিতিতে অ্যাপস্যাক যে তুলনামূলকভাবে কম সংহত ইউনিট হয়ে উঠবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

কেননা, হাজার হলেও উভয় ছাত্র ইউনিয়নের তাদের নিজ নিজ গুপ্ত বা প্রকাশ্য মূল দলের প্রতি আনুগত্য যেমন ছিল তেমনি তাদের পরিষ্কার আদর্শিক অঙ্গীকারও ছিল। যেমন দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর প্রতিনিধি ছিলেন মাহবুবুল্লাহ; এ সংগঠনের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাথে কিংবা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর সঙ্গেও মৈত্রীতে আসা সম্ভব ছিল না।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তাদের একত্র সমাবেশ সম্ভব হয়েছিল কৌশলগত কারণে ও সীমিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য। অনুরূপভাবে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-র প্রতিনিধি সাইফুদ্দিন আহমদ মানিক তাঁর মূল সংগঠন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির দীর্ঘদিনের নীতি-কৌশল অনুসারে হয়তোবা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ঘনিষ্ঠ থাকতে পেরেছিলেন, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর সঙ্গে আশু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন নিশ্চয়ই তার বেশিদিন থাকা তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এ ছাড়াও, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রদেশে নিজের পায়ের তলায় মাটি মজবুত করে নিতে পারার পর স্পষ্টতই অ্যাপস্যাকের ছত্রচ্ছায়ার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের জন্য ছিল না।

 

আইয়ুববিরোধী আন্দোলন পর্ব-২

 

তাই সময় এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ন্যাপ মোজাফফরের ব্যাপারে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মনোভাব শীতল হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর সঙ্গেও ছাত্রলীগের সম্পর্কের উষ্ণতা অনুরূপভাবেই কমে যায়। অবশ্য, পরবর্তীকালের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলি নিয়ে কোনো কিছু আরো দানা বেধে ওঠার আগেই একান্ত পাকিস্তানী বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয় যা আইয়ুব খানের ক্ষমতা ত্যাগের পটভূমিকায় অপ্রত্যাশিতও ছিল না।

আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়লেও পাকিস্তানী ক্ষমতার কাঠামোটি বদলায়নি। তবে যে পরিস্থিতিতে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তাতে বোঝা যায়, পাকিস্তান তখন একটা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে “প্রেসিডেন্টের, প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ও প্রেসিডেন্টের জন্য সরকার”৫২ গোটা জনসমষ্টির রাজনীতি সম্পর্কিত সাধারণ মানুষের কাছে আর মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না ।

রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি খাপ খাওয়ানোর প্রবণতাসম্পন্ন ও চালিকাশক্তিসম্পন্ন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগই, বিশেষ করে, পূর্ব পাকিস্তানে এই পরিস্থিতি গড়ে তোলায় সবচেয়ে বেশি কৃতিত্বের দাবিদার হতে পেরেছিল।

Leave a Comment