আজকের আলোচনার বিযয় সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, পাকিস্তানে ক্ষমতার হাতবদল ও সামরিক আইন পুনঃআরোপের পর কোনো কোনো অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকের মতে পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি এমন এক চরম অবস্থায় পৌঁছায় যখন সামাজিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারতো।
অবশ্য শাসকগোষ্ঠীবিরোধী উত্তাল জোয়ার শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিপ্লবে গড়ায়নি। কেননা, সামাজিক বাস্তব পরিস্থিতি সেভাবে পরিণত হয়ে ওঠেনি। ঐ সময়ে পাকিস্তানী জনসমাজে অত্যন্ত সুস্পষ্ট শ্রেণী-সংঘাতের অস্তিত্ব ছিল না।` আর শ্রেণী বিরূপতা সে কারণেই তীব্র, শাণিত হতে পারেনি।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 2 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2015/01/বাংলাদেশ-কৃষক-শ্রমিক-আওয়ামী-লীগের-কেন্দ্রীয়-কমিটি.png)
সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১
বিপ্লবী নেতৃত্বও সে সময়ে ছিল অনুপস্থিত । ফলে তা বিপ্লবী প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাকে কার্যত তাৎপর্যহীন করে তোলে। এ দিকে, ব্যাপক বিস্তৃত এক সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের অধিকারী আওয়ামী লীগের সাথে আবার ছাত্রদের মাধ্যমে যুবসম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় দলটি জনসাধারণকে সক্রিয় করে তুলতে সক্ষম ছিল।
কিন্তু “সামাজিক বিপ্লবের” মাধ্যমে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে দলটির কোনো অঙ্গীকার ছিল না। শেখ মুজিব পরিষ্কার বলেন, আওয়ামী লীগের প্রথম ও সর্বাগ্রের লক্ষ্য হলো, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসন অর্জন করা । পরে অন্যান্য পরিবর্তন আসবে। আর সেগুলি এর আগে যেমন ঘটবে না, যুগপৎ স্বায়ত্তশাসনের সাথেও তা আসবে না। তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেন, দ্বিতীয়-দফার পরিবর্তনগুলিকে ক্রমান্বয়ে ও খাপ খাইয়ে নিয়ে প্রবর্তন করা হবে।
প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ নেতারা আদর্শিকভাবে কখনো সহিংসতার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্বে আস্থা স্থাপন করেননি। ঐ স্তরে এমনকি কৌশল হিসেবে এ ধরনের নীতি গৃহীত হলেও তাতে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় অবস্থান বজায় থাকতো না।
আওয়ামী লীগের নীতি ছিল যে জনপ্রিয়তা সে ইতোমধ্যে অর্জন করেছে তা ধরে রাখা ও আরো বিস্তৃত করা। আওয়ামী লীগ বরাবরই উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সমর্থক। সেই হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় রাজনৈতিক দলের মর্যাদা ফিরে পেতে হলে তার সামনে একটি পথ খোলা ছিল আর তা হলো নির্বাচনে প্রথম সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল হওয়া। সে জন্য তার যে কোনো কিছুর চেয়ে সবচেয়ে দরকার ছিল আগামীতে এক উল্লেখযোগ্য। জয়ের গৌরব অর্জন করা।
দলের স্বকীয় স্বার্থ ছাড়াও অন্য বিবেচনাটি ছিল এই যে, কোনো সহিংস আন্দোলন হলে তা এমন প্রবল দমন ও নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা ডেকে নিয়ে আসতে পারে যার ফলে সকল বিরোধিতার অস্তিত্ব চূর্ণ হয়ে যেতে পারে। আর তাতে স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে ভবিষ্যৎ এমনকি, শাসনব্যবস্থার গণতন্ত্রায়নের সম্ভাবনাটুকুর ভবিষ্যৎ লুপ্ত হবে। এ কারণে আওয়ামী লীগ সামাজিক বিপ্লবের সূচনা না করে নির্বাচন অনুষ্ঠান ও তাতে অংশগ্রহণের রাজনীতির ওপরই বেশি নির্ভর করেছে।
ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আইন পরিষদ ও ১৯৬২ সালে শাসনতন্ত্রের বিলুপ্তি এবং অনতিবিলম্বে সামরিক আইন বলবৎ করার ঘোষণা দেন। তিনি সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারেরভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেন। অবশ্য অল্পদিন পরেই তিনি বলেন, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের রূপরেখা ও কাঠামো এবং রাজনৈতিক কাঠামো কী হবে সে বিষয়ে রাজনীতিকরা সর্বসম্মতভাবে একমত হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন।
নতুন শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশ্য ছিল খুবই পরিষ্কার। পাকিস্তানের অতীত ইতিহাস, ১৯৬৮-৬৯ সালের জনবিক্ষোভের প্রকৃতি এবং গোলটেবিল সম্মেলনের ঘটনাবলি পরিষ্কার দেখিয়ে দেয় যে, পাকিস্তানী সমাজে এক সহজাত বৈপরীত্য রয়েছে আর তা এতই ব্যাপক যে, সে দেশটিতে কোনো বিষয়ে ঐকমত্য সর্বদাই এক দুর্লভ বস্তু ।
বাস্তবিকপক্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সময় পাকিস্তানীদের যে প্রধান ইস্যুগুলি রীতিমতো বিমূঢ় সংশয়ে রেখেছিল সে ইস্যুগুলি অমীমাংসিতই রয়ে যায়। যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামের ভূমিকা কী হবে ও ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা কী প্রকৃতির হবে—এগুলিও অমীমাংসিত থেকে যায়। আইয়ুব খান যখন ক্ষমতা ছেড়ে যান এবং ইয়াহিয়া খান যখন ক্ষমতায় আসেন তখন তাঁরা দু’জন এই সামগ্রিক বিভ্রান্তি সম্পর্কে জানতেন না—এমন হতে পারে না ।
কাজেই ক্ষমতার গঠন কাঠামোয় কোনো পরিবর্তনের বেলায় সর্বসম্মতি বা ঐকমত্যকে পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কেবল এই নিরেট বাস্তবতাকে বেআক্র করেছেন যে, ক্ষমতাসীনচক্রের নীতি-নৈতিকতায় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি; তাঁর এ পূর্বশর্ত দেখিয়ে দিয়েছে এটাও যে, তাঁরা কিছু অঙ্গরাগমূলক তথা ভাসাভাসা রদবদল করে। প্রচলিত ধারার নিরবচ্ছিন্নতাকেই বজায় রাখতে চান। অবশ্য তাঁরা মর্মে ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন যে, নিদেনপক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতাদানকারী বিধির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
আর কোনো জনপ্রিয় প্রতিনিধিকে সেই অবস্থানে দেওয়া না গেলে শাসকগোষ্ঠীর যা কিছু সমর্থনের ভিত এখনো আছে তা-ও হারাতে হবে। অবশ্য শাঁসালো কিছু পরিবর্তন ঘটাতে গেলে তাতে আবার বহাল ক্ষমতার কাঠামোই বিপন্ন হবে। সে জন্য ইয়াহিয়া খান এমন এক পদ্ধতিতে আনুষ্ঠানিকতার ছোঁয়াচ দিতে চেয়েছিলেন যার আওতায় জনপ্রিয়তার অধিকারী প্রতিনিধি শাসকগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন আর একইসঙ্গে নিজেদের কলহে ঐ প্রতিনিধিরা ক্রমেই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবেন। জাতীয় স্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অনুপস্থিতির খোদ বিষয়টিই রাজনীতিকদের কলহে ব্যস্ত রাখবে আর সেই অবকাশে জোরদার হয়ে উঠবে আমলা-মিলিটারি আঁতাঁত।
বাস্তবিকপক্ষেও ইয়াহিয়া খান শাসকচক্রের তরফে পাকিস্তানী রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগ নিতে কিংবা সেটিকে কাজে লাগাতে চেষ্টা করছিলেন । কোনো সত্যিকারের জাতীয় দলের অভাবে জাতীয় দলপদ্ধতির কার্যপ্রক্রিয়া সর্বদাই সঙ্কট তৈরি করবে আর তা আমন্ত্রণ করে আনবে আমলা-সামরিক হস্তক্ষেপ। তবে সে যা-ই হোক, ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের ২৮ জুলাই জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তার অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
কিন্তু ১৯৬৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আবার ইঙ্গিত দেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর নিজের কিছু “ভাবনাচিন্তা’ আছে । আর সে কথা যথাসময়ে জানানো হবে ।“ নিশ্চয়ই ইয়াহিয়ার এ উক্তি পূর্বসুরীর (আইয়ুব খানের) এই প্রত্যয়ী বক্তব্যের অশুভ স্মারক যে, ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র ও তাঁর নিজ রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রতিফলন ।
১৯৬৮-৬৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু প্রবীণ রাজনীতিক ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শুধু ক্ষমতায় জনগণের ব্যাপকতর অংশীদারি নেই বলেই, কিন্তু সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বড় ভূস্বামী ও ব্যবসায়ীরা যে ক্ষমতার আধার সেই ক্ষমতার ভারসাম্যের কোনো মৌলিক পুনর্গঠনের জন্য তাঁরা কোনো আন্দোলন করেননি। ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটি বা ড্যাকে প্রতিনিধিত্বকারী পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিকরা ক্ষমতা থেকে আইয়ুব খানের প্রস্থানে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনীতির মেজাজ বা উত্তাপ পরে কমে যাওয়ায় শাসকচক্র আশ্বস্ত হয় যে, একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশীদারির আনুষ্ঠানিকতায় পশ্চিম পাকিস্তানের এ সব রক্ষণশীল রাজনীতিক তুষ্ট হবেন। আর এক ইউনিট বাতিল করে ওয়ালী খান বা জিএম সৈয়দের মতো একটু বেশি নটখটে ব্যক্তিদেরকে ঠাণ্ডা করা যাবে।
অবশ্য, পশ্চিম পাকিস্তানের নতুন সামাজিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপিলস পার্টির মাধ্যমে। জুলফিকার আলী ভুট্টো ও তাঁর দল পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে সপক্ষে যে সমর্থনের ভিত গড়ে তুলেছিলেন শাসকগোষ্ঠী তা মোটেও মূল্যায়ন করতে না পারারই প্রবণতা দেখান। বস্তুত ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন অবধি এ ধরনের ঊনমূল্যায়ন চলতেই থাকে । পিপিপি ড্যাক কিংবা গোলটেবিল আলোচনা কোনোটিতেই যোগ দেয়নি ।
আর এভাবে দলটি শাসক মহলের প্রতি তাদের বিরোধিতার মহড়া প্রদর্শন করে। কিন্তু তাই বলে এতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের আওতায় নায়িত আমলা-সামরিক শাসকচক্রের মধ্যে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ নাকচ হয়ে যায়নি।
তাই সামরিক বাহিনীর কায়েমি স্বার্থ ও ভুট্টোর স্বার্থের একটা মিল অনুমান করে দৃষ্টত শাসক জান্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপিপির অভ্যুদয়কে দেখেও না দেখার ভান করে। এ ছাড়াও, পিপিপির আবির্ভাব ঘটেছিল প্রগতিবাদের দর্শনধারী হিসেবে, তাতে ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব।
তাই এ বিষয়টি দেশের পশ্চিমাঞ্চলে পুনর্গঠিত নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে এক অন্তর্বিষ্ট রক্ষাকবচের নিশ্চয়তা দেয়। ভুট্টো ও পিপিপি যে প্রবল শক্তি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে তা যদি আগেই না ঘটতো তাহলে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানে কিছু কিছু সমর্থনের বুনিয়াদ গড়ে তুলতে পারতো। বিশেষ করে, সিন্ধুর জিএম সৈয়দ ও সীমান্ত প্রদেশের ওয়ালী ন্যাপ আওয়ামী লীগের সাথে যোগ দিলে অবস্থা অন্য রকম হতেও পারতো।
সিন্ধুতে সিন্ধি মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও ছাত্র ইত্যাদির মুখপাত্র হিসেবে ভুট্টোর আবির্ভাব সুনিশ্চিতভাবেই আওয়ামী লীগের উদ্যোগকে পূর্বাহ্ণে নস্যাৎ করে এবং জিএম সৈয়দের “জিয়ে সিদ্ধ’ আন্দোলনকে পুরোপুরি অকেজো করে দেয় । তাই ভুট্টো ও পিপিপি আবির্ভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি জাতীয় দলের অভ্যুদয়ের ক্ষীণ সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যায় আর এই প্রক্রিয়ার সংহতিবিধায়ক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সুফল লাভের আরেক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় পাকিস্তান।
পূর্ব পাকিস্তান ক্ষমতার সম্পর্ক পরম্পরায় পরিপূর্ণ পরিবর্তন দাবি করেছিল। তবে যেহেতু এ দাবি অভিব্যক্ত হয়েছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সেহেতু পাকিস্তানের সংহতির হেফাজতের অজুহাত দেখিয়ে এবং গণতন্ত্রের সারবস্তুর চেয়ে আঙ্গিকের বেশি ভক্ত রক্ষণশীলদের পক্ষে যাদেরকে হাতের কাছে পাওয়া যায় ও যারা কেবল ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনে তুষ্ট থাকবে তাদের পিঠ চাপড়ে সবসময়েই এ দাবিকে গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল । উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ যে ব্যাপক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন চায় তার ব্যবস্থা ছিল না।
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের এ অবস্থান গোলটেবিল আলোচনায় অত্যন্ত স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় । শেখ মুজিবুর রহমান ইতঃপূর্বে এক বিবৃতিতে এক বিদেশী সংবাদদাতাকে বলেছিলেন, “আমি সমস্যার একটা এসপার ওসপার চাই আর তা চিরকালের মতো। অন্য নেতারা যদি একমত হতে পারেন খুব ভালো কথা।
কিন্তু তা যদি না হয় আমার লোকেরা সেটা করায়ত্ত করবে ।”৬ এ থেকে তিনি আভাস দেন, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দাবি জনগণেরই ইচ্ছার অভিব্যক্তি ও প্রতীক এবং তিনি কেবল এক সত্যতার চর্চাই করছিলেন যা পাকিস্তানের চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ নির্ধারক হয়ে উঠবে। এ ছাড়া, দেশের রাজনীতিতে, বিশেষ করে, দেশের পূর্বাঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভবিষ্যৎও এই বাস্তব সত্যতায় দলটি কতখানি সাড়া দিতে পারবে তার ওপরও নির্ভর করছিল। আওয়ামী লীগ স্বীয় বৈশিষ্ট্যময় উদার গণতান্ত্রিক ভঙ্গিতে জনগণের দাবির চূড়ান্ত পরিপূরণের সূচনা হিসেবে আশু প্রত্যক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ক্রমাগত গুরুত্ব আরোপ করে যেতেই থাকে। ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইন বিধির আওতায় প্রকাশ্য সকল রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা ও প্রস্তুতি চলতে থাকে।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল যখন আলোচনা, জল্পনায় ব্যস্ত তখন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নিজ মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে। এ জন্য শেখ মুজিব অন্য নেতাদের সঙ্গে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জেলাগুলি সফর করেন। তিনি জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন (সামরিক আইনে তখনো জনসভা অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল)। তাঁর সে সব ভাষণের মূল বক্তব্য ছিল: ছয়-দফায় নিহিত দলীয় দাবিগুলি পূরণ, সর্বজনীন বয়স্ক ভোটাধিকারেরভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের বিধান সন্নিবিষ্ট এক শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য জনসমষ্টিভিত্তিক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন জাতীয় পরিষদ গঠনই একান্ত আশু ও প্রাথমিক প্রয়োজন ।
পরিষ্কার উল্লেখ করা হয় যে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ১৯৫৬ কিংবা ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন দাবি করলেও তাতে কোনো ফলোদয় হবে না। যারা ইসলামের স্বার্থরক্ষার কথিত দাবিদার তাদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সজাগ থাকার জন্য হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয় । বলা হয়, এ সব শক্তি সেই একইভাবে তাদের কোনো কোনো কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করছে। তারা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়েও তাই করেছিল । গণতন্ত্রের জন্য পরিচালিত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাতের অপপ্রয়াসে লিপ্ত চরম বামপন্থীদের বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
পশ্চিম পাকিস্তানেও জনমত গড়ে তোলার কিছু চেষ্টা চলে । করাচি সফরকালে শেখ মুজিবুর রহমান উল্লেখ করেন যে, তাঁর দল সমাজবাদে বিশ্বাস করলেও বিদেশ থেকে ধ্যানধারণা ধার বা আমদানি করে না। বরং তিনি সুনিশ্চিত করে বলেন, আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তা হলো, তা দেশজ হতে হবে, তা উৎসারিত হবে মাটি থেকে তথা একান্ত ঘনিষ্ঠ পরিবেশজাত কোনো কিছু হিসেবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের ধারণার সমাজবাদে একদলীয় শাসন বা কোনো নাস্তিক রাষ্ট্রের অবকাশ নেই । ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তাঁর পরবর্তী সফরকালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানীদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জনসাধারণের উন্নতিই আওয়ামী লীগ কার্যক্রমের লক্ষ্য।
পরে এমন এক সাধারণ ধারণা গড়ে ওঠে যে, মুজিব যদি আরো আগে পশ্চিম পাকিস্তানের অবশিষ্টাঞ্চল সফর করতেন এবং আওয়ামী লীগের অবস্থান ও ভূমিকা ব্যাখ্যা করতেন তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানে যথেষ্ট সমর্থন নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। অবশ্য আওয়ামী লীগের কর্মসূচির ব্যাপারে বলতেই হয় এতে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান সমর্থন ছিল এক ইউনিট বিলোপকেন্দ্রিক । আর স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে কিছু সমর্থন থাকলেও তা কোনো কোনো পকেট এলাকায় মাত্র।
আওয়ামী লীগের সমাজবাদী অর্থনীতির চূড়ান্ত অপরিহার্যতা সম্পর্কিত অবস্থানের প্রচার কিছুটা বিলম্বিত না হলে সে কারণেও কিছু সমর্থন পাওয়া যেতো । কিন্তু পিপিপির অভ্যুদয়ে আওয়ামী লীগের সেই সম্ভাবনা মাটি হয়ে যায় । তাই পশ্চিম পাকিস্তানে প্রান্তিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দৃষ্টে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে সুনিশ্চিত সাফল্যের প্রতি আওয়ামী লীগের মনোযোগ বেশি করে পড়াটাই স্বাভাবিক।
জনসভা অনুষ্ঠানের ওপর লাগাতার নিষেধাজ্ঞা থাকায় আওয়ামী লীগের মতাদর্শ প্রচারের জন্য দলীয় কর্মীদের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক কাজ করার আবশ্যকতা দেখা দেয়। এ জন্য ১৯৬৯ সালের আগস্ট ও অক্টোবরের মধ্যবর্তী সময়টি শেখ মুজিবুর রহমান। কর্মিসভায় ভাষণ দিতে থাকেন। ঐ সব কর্মিসভায় তিনি কেবল আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ব্যাখ্যাই দেননি বরং বিভিন্ন মহল থেকে আওয়ামী লীগের নানা সমালোচনার জবাব দেন।
এমনিভাবেই তিনি স্থানীয় স্তরেই এ ধরনের সমালোচনার মোকাবেলায় স্থানীয় ইউনিটগুলিকে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর এই কর্মসূচি নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার কারণে জাতীয় শ্রমিক লীগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে পারেননি। আওয়ামী লীগের শ্রমিক ফ্রন্ট জাতীয় শ্রমিক লীগের উদ্বোধন নির্ধারিত ছিল ঢাকায় ১৯৬৯ সালের ১১ অক্টোবর । অবশ্য অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত এক বার্তায় তিনি বলেন, বাইশ বছর ধরে বাইশ পরিবার জাতীয় সংহতি ও ধর্মের নামে জাতীয় সম্পদের ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
তিনি এক সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করার আহ্বান জানান । তিনি বলেন, “এ ধরনের সমাজতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো হবে আমাদের রীতি-প্রথা, ঐতিহ্য ও ইচ্ছানুগ যা জাতীয়তাবাদী উপলব্ধির বুনিয়াদে এক নতুন শোষণমুক্ত জনসমাজ পত্তন করবে।” তিনি দাবি করেন যে, দেশের কলকারখানার মালিকানা বেশিরভাগ জনগণকে দিতে হবে। খরা, বন্যা ও অতিবর্ষণের দুর্ভোগ ও দুর্দশা কাটিয়ে ওঠার জন্য তিনি নিম্নোক্ত প্রস্তাব দেন:
১. পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিক চাষীদের খাজনা ও কর মওকুফ;
২. উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন চাষীদের মধ্যে বণ্টন;
৩. বন্যা নিয়ন্ত্রণ;
৪. সমবায় চাষাবাদের প্রবর্তন;
৫. দীর্ঘমেয়াদী ঋণ মঞ্জুরের জন্য গ্রামে গ্রামে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা;
৬. পাটের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ ও পাটশিল্পের জাতীয়করণ।
এভাবে ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে রাজনৈতিক কার্যকলাপের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনেক আগেই আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু করে দেয়। আর নির্বাচনী এলাকাগুলির বৃহত্তম অংশের স্বার্থের দিকে খেয়াল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যত্নও নেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির গৃহীত প্রস্তাবে এই দৃষ্টিভঙ্গির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয় ।
ঐ সব প্রস্তাবে রেশনিং ব্যবস্থাকে এমনভাবে সুষ্ঠু করে তোলার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যাতে গ্রামের মানুষ ও শিল্প শ্রমিকরা উপকৃত হতে পারে। এ ছাড়া সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ন্যায্যমূল্যের দোকান খোলার, বেকারদের জন্য আর্থিক সাহায্য ও কাজের ব্যবস্থা, লকআপ তুলে নিয়ে ও ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল করে শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে শ্রম। অসন্তোষ দূর করা, পাট ও আখ চাষীদের ফসলের অনুকূল ন্যূনতম দর নির্ধারণ, সকল চা-বাগানকর্মীর জন্য যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি প্রবর্তন এবং (স্বামী ও স্ত্রীকে এক ইউনিট হিসাব করার পদ্ধতির পরিবর্তে) মাথাপিছু এক ইউনিট গণনার ব্যবস্থা প্রচলনের জন্যও সরকারের প্রতি আবেদন জানানো হয় ।
আওয়ামী লীগ যখন জনসাধারণের বৈষয়িক অভিযোগের প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাদির আভাস দিচ্ছিল তখন জামায়াত-ই-ইসলামী ও পিডিপির মতো অন্য রাজনৈতিক দলগুলি অস্পষ্টভাবে ইসলাম ও পাকিস্তানের সংহতি বিপন্ন হওয়ার ধুয়ো তুলে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছিলেন। জামায়াত-ই-ইসলামীর আমীর মাওলানা মওদুদী অভিযোগ করেন, পূর্ব পাকিস্তানের বিক্ষোভ আন্দোলনের নেপথ্যে পড়শী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে কলকাঠি নাড়া হচ্ছে। জামায়াত-এর আরো একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব মিয়া তোফায়েল মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, শেখ মুজিব একজন কমিউনিস্ট।
পরে অবশ্য পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের মজলিশ-ই-শুরা এক প্রস্তাবে আইন পাসের মাধ্যমে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান এবং দাবি করেন, “এ ব্যাপারে গৃহীত বাস্তব পদক্ষেপগুলি বছরকালের মধ্যে অবশ্যই গোটা জাতির দৃষ্টিগোচর হতে হবে।” কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় এই যে, জামায়াতের প্রস্তাবে আওয়ামী লীগের ছয়-দফা ও পিডিএম-এর আট-দফার একটা সমন্বিত উপস্থাপনা ছিল।
পূর্ব পাকিস্তান পিডিপির আহ্বায়ক, আবদুস সালাম খান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আওয়ামী লীগের ছয়-দফার প্রায় সবই পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে এগুলি বাস্তবায়নের প্রয়াসে সশস্ত্র সংঘাত বাধবে।
তিনি সে জন্য বলেন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, এক ইউনিট বাতিল এবং জনসংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মতো ইস্যুগুলির নিষ্পত্তি সাধারণ নির্বাচনের আগে হতে হবে। পরে অবশ্য তিনি নিজেকে দৃষ্টত অনেকখানি যৌক্তিক করে তুলতে চেষ্টা করেন এই প্রস্তাব তুলে যে, স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটি এক বিশারদ কমিটিকে দিয়ে ছয়, আট ও এগারো দফাসমূহের মূল্যায়ন করানোর মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই এগুলির নিষ্পত্তি করা যায়।
পিডিএম ও ড্যাক প্রসূত পিডিপি ১৯৬৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তার নিজ গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো গ্রহণ করে। ১৩ তবে এ সব ইস্যু নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এ রকম সব বিলম্বিত পাল্টা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রচারাভিযানে আদৌ সুবিধা করা যায়নি (আর পরবর্তীকালে লক্ষ্য করা যায়, নিষ্ফলও বটে)। তাই পিডিপি বা জামায়াতের মত দলগুলি এ ধরনের জটিল সমস্যাবলির জন্য অতিসরলীকৃত সমাধানের পরামর্শ দিচ্ছিল।
১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে আতাউর রহমান আহূত ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ লীগ (এনপিএল) ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরে দলীয় গঠনতন্ত্র ও ম্যানিফেস্টো প্রণয়ন করে। ১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সম্মেলনে দলের আহ্বায়ক অংশত সঠিক অভিমত দিয়ে ।
বলেন, ছয়-দফা কর্মসূচি কোনো বিরাট কিছু আবিষ্কার নয় আর সেই সাথে তিনি তাঁর রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা দেখিয়ে ফেলেন এ কথা যোগ করতে গিয়ে যে, সমতা নীতি বিলুপ্ত হওয়ায় ছয়-দফা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে, কেননা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ও কেন্দ্রীয় সরকারে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তাঁর কথায় যা গড়িয়ে ও এড়িয়েও যায় তা হলো: ইতঃপূর্বে ছয়-দফার বিষয়গুলি দরকষাকষির রাজনীতি ও রফার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যখন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থার উন্নতির প্রয়াসকে কতিপয় কায়েমি স্বার্থবাদী মহল নস্যাৎ করে দিচ্ছিল; আর বস্তুতপক্ষেও এ ধরনের শক্তি তখন আগেকার যে কোনো সময়ের চেয়েও অনেক বেশি ভালোভাবে শেকড় গেড়ে বসেছিল; ছয়-দফা ফর্মুলা এ ধরনের ঘটনাবলির পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টি চাচ্ছিল ।
আওয়ামী লীগ যখন তার বুনিয়াদের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে চলেছিল এবং নির্বাচনের লক্ষ্যে তার দলীয় কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছিল তখন রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলি আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমালোচনাকে মূলধন করে টিকে থাকার চেষ্টা করছিল। বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করছিল ন্যাপের দুটি উপদল। মওলানা ভাসানী কী করবেন সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। তিনি দুয়ে হয়েই রইলেন। ১৯৬৯ সালের জুনে তিনি ঘোষণা করেন যে, তাঁর দল নির্বাচনে অংশ নেবে না।
কিন্তু অক্টোবরে তিনি প্রস্তাব দেন, প্রেসিডেন্টের একটা গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা এবং দেশের আগামী খসড়া শাসনতন্ত্রের একটি কাঠামো বা রূপরেখা তৈরি করে সেটির ওপর গণভোটের ব্যবস্থা করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির অভিমত গ্রহণ করা উচিত। অবশ্য, সে বছর ডিসেম্বরেই আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইস্যুতে তাঁর দল বিভক্ত হয়ে যায়। ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে ভাসানী গদি দখল নয়, বরং পরিষদে জনসাধারণের অভাব-অভিযোগ উত্থাপন করার জন্যই নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুকূলে মত ব্যক্ত করেন।
তাঁর কয়েকজন সমর্থক তখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধিতা করছিলেন। তবে বছর গড়ানোর মুখে তিনি সহিংস সমাজ বিপ্লব ছেড়ে অহিংস ইসলামী বিপ্লবের পক্ষপাতী হয়ে ওঠেন। এতে তাঁর দলের ভেতরের বিভেদ আরো বেড়ে যায়। মওলানা ভাসানীর এ দ্বিধা ও সিদ্ধান্তসংশয় পূর্ব পাকিস্তানের বিপ্লবী বামশক্তিকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেয়। মধ্যবামের প্রতিনিধি ওয়ালী ন্যাপ যা পূর্ব পাকিস্তানে মোজাফফর ন্যাপ নামে বেশি পরিচিত কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছিল। এক্ষণে এই দলটি স্বতন্ত্রভাবে নিজ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আওয়ামী লীগের সাথে এক আনুষ্ঠানিক জোট বাঁধার চেষ্টা করতে থাকে।
ইয়াহিয়া খানের শাসনামলের প্রথম কয়েক মাসে ছাত্ররা নিচু লয়ে চললেও তারা ১৯৬৯ সালের আগস্টে প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া)-এর মতো দুটি ছাত্র সংগঠন বিভিন্ন বিরোধীদলগুলির মধ্যে ঐক্যের কথা বলতে থাকে যদিও ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ ধরনের বক্তব্য বন্ধ করে দিয়ে নিজের সংগঠনকে প্রদেশের আরো ভেতরে ছড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারে মনোনিবেশ করে।
ছাত্রলীগ ১৯৭০ সালের মার্চে ঢাকায় বার্ষিক সম্মেলনে খুব পরিষ্কার জানিয়ে দেয় যে, ছয়-দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়িত না হলে এগারো দফার অন্যান্য দাবির বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে । ছাত্রলীগের আগামী কর্মপদক্ষেপ কী হবে তা ছকে দেন শেখ মুজিব যখন তিনি এ বার্ষিক সম্মেলনে বলেন যে, ‘জনগণকে এবার শহীদ নয়; গাজী হওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে।
১৯৬৬-৬৭ সালের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সময় ও তার পরের বছরগুলিতে যেমন তেমনি পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তিগুলি এখন থেকে প্রধানত তিনটি ভিন্ন দিকনির্দেশনায় কাজ করে যেতে থাকে। অবশ্য দেখা যায় যে আওয়ামী লীগই জনসাধারণের বাস্তব আশা-আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল ।
কাছাকাছি ছিল ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্রসমাজের বৃহত্তর অংশেরও । ১৯৬৯ সালের ২৮ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যখন চূড়ান্তভাবে জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখার ঘোষণা করেন এ রকমই পরিস্থিতি ছিল তখনকার। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনীতিকদের মাঝে ঐকমত্য নেই আর সেই সঙ্গে তিনি তাঁর এই উক্তির পুনরুক্তি করে বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানীদের অভাব-অভিযোগ ন্যায়সঙ্গত আর এ সবের সমাধান নিহিত রয়েছে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠায় যার আওতায় প্রদেশগুলি আইনগত ও আর্থিক উভয় ক্ষমতাই লাভ করবে।
তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে এক ইউনিট বাতিল এবং জনপ্রতি এক ভোট নীতির ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন । প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পরিসর কী হবে সে সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট পরিষ্কার কোনো কিছু বলেননি। স্বায়ত্তশাসনের এ বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করার প্রকৃত কাজটি ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র প্রণেতা সংস্থার জন্য রেখে দেওয়া হয় । তার দেওয়া নির্দেশিকায় বলা হয়, ফেডারেশনের অংশীদার কোনো ইউনিটের স্বায়ত্তশাসন জাতীয় অখণ্ডতা ও দেশের সংহতি ক্ষুণ্ণ করবে না।
তিনি বলেন, কেন্দ্রে জাতীয় সরকারের কার্যপরিচালনায় বিরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করার শর্তে পাকিস্তানের দুই অঞ্চল তদবধি তাদের অর্থনৈতিক সম্পদ ও উন্নয়নের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হবে। প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন যে, যেহেতু সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে প্রত্যক্ষ বয়স্ক ভোট, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও সেগুলির ন্যায্যতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও শাসনতন্ত্রের ইসলামী বৈশিষ্ট্য নিয়ে কোনো মতানৈক্য নেই সেহেতু আগামীতে যে শাসনতন্ত্র প্রণীত হতে যাচ্ছে (সে জন্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও) তার জন্য এগুলিকে নিষ্পত্তিকৃত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সূচি ছিল এ রকম: রাজনৈতিক কার্যকলাপের পুনরুজ্জীবন ১ জানুয়ারি, ১৯৭০; নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অস্থায়ী আইন কাঠামো আদেশ প্রণয়ন ১৯৭০ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে; ভোটার তালিকা প্রণয়ন জুন, ১৯৭০ নাগাদ; জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান ৫ অক্টোবর, ১৯৭০; এর পরে প্রাদেশিক পরিষদগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জাতীয় পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠানের ১২০ দিনের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন। প্রেসিডেন্ট “সকল সঙ্কীর্ণ স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত ও স্থানীয় পর্যায়ের বিষয় বড় করে দেখা পরিহারের”১৭ জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান । প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণাকে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনৈতিক মহল কিছু সমালোচনা করলেও মৃদু থেকে উষ্ণ মাত্রায় স্বাগতও জানায় ।
আশু যে সব সাড়া বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় সেগুলির মধ্যে প্রথম বিশদ সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া ছিল সাবেক আওয়ামী লীগার, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সম্প্রতি গঠিত ন্যাশনাল প্রগ্রেসিভ লীগের আহ্বায়ক আতাউর রহমান খানের। তিনি উল্লেখ করেন যে, “প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে ইতিবাচক কিছুই নেই যদিও স্বায়ত্তশাসনের দাবি এক ইউনিট ভাঙার মতো ক্ষমতাধর ছিল।
” তিনি আরো বলেন, জাতীয় সংহতি ক্ষুণ্ন হয় না—এমন পরিসর অবধি সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবটি অস্পষ্ট ও অসংজ্ঞায়িত এ কারণে যে, পূর্ব পাকিস্তানের দাবি ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। কেননা ঐ দাবিতে বলা রয়েছে, কেন্দ্রের হাতে থাকবে কেবল তিনটি বিষয় । তিনি এ কথাও বলেছিলেন বলে জানা যায় যে, “প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় একটি নিয়ন্ত্রিত পরিষদকেই পাওয়া যায় যদিও আমাদের দাবি ছিল একটি সার্বভৌম শাসনতান্ত্রিক পরিষদ।”
আশু সুখ্যাতিমূলক অভিব্যক্তি পাওয়া যায় কাউন্সিল মুসলিম লীগ পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি খাজা খয়েরউদ্দিনের কাছ থেকে । তিনি এই “বলিষ্ঠ” ও “সাহসী” ঘোষণাকে স্বাগত জানান। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক একিউএম শফিকুল ইসলাম আরো এক ধাপ আগ বাড়িয়ে বলেন যে, “প্রেসিডেন্ট জনসাধারণের ঠিক মনের কথাটিই বলেছেন” আর “তিনি তাঁর পক্ষে সর্বোত্তম যা করতে পারার তা করেছেন।”
পাকিস্তান পিপলস পার্টির পূর্ব পাকিস্তান শাখার চেয়ারম্যান মওলানা নুরুজ্জামান “সর্বান্তকরণে এই শাসনতান্ত্রিক ফর্মুলার প্রতি সমর্থন জানান” এবং এর মূল্যায়ন করেন, “একমাত্র সমাধান” বলে অভিহিত করে। ২০ এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, শফিকুল ইসলাম ও মওলানা নুরুজ্জামান উভয়ে প্রেসিডেন্টের ঘোষণাকে সুস্বাগত জানালেও শফিকুল ইসলামের মতে, “বল” এখন “রাজনীতিকদের” কোর্টে পক্ষান্তরে মওলানা নুরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী “বল” রয়েছে “জনগণের” কোর্টে।
পূর্ব পাকিস্তান জামায়াত-ই-ইসলামীর আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম এই মর্মে সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, প্রেসিডেন্ট কতকগুলি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তাঁর উপলব্ধির কথা প্রকাশ করে বলেন, স্বায়ত্তশাসনের পরিসর কতদূর পর্যন্ত হবে সেই অমীমাংসিত প্রশ্নটি এই মুহূর্তে সমাধানের বাইরে কেননা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
মওলানা ভাসানীর আশু প্রতিক্রিয়ায় তাঁর মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ পায়। তিনি এক ইউনিট বিলোপের মতো কোনো কোনো বিষয়কে স্বাগত জানান। আবার স্বায়ত্তশাসনের মতো অন্য কিছু বিষয়-সংক্রান্ত ঘোষণাকে অস্পষ্ট বলে মতপ্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে কেন্দ্র ও প্রদেশের সম্পর্কের পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকা উচিত ছিল। তিনি প্রেসিডেন্টের কথিত ইসলামী বৈশিষ্ট্যের শাসনতন্ত্র কী সে ব্যাখ্যা চান। কেননা তাঁর মতে, “ইসলামী শাসনতন্ত্রের প্রকৃতি নিয়ে প্রচুর বিভ্রান্তি রয়েছে।
” সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট দৃষ্টে মনে হয়, মওলানা প্রেসিডেন্টের সাথে তাঁর সর্বশেষ আলোচনার পর ধারণা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ইসলামী সমাজতন্ত্রে সম্মত হয়েছেন আর তিনি মর্মাহত হন ভেবে যে কথাটি তাঁর ঘোষণায় তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি ঘোষণার বিভিন্ন ভুলচুকের প্রতি অঙুলি নির্দেশ করার সাথে সাথে কতকগুলি প্রস্তাবও দেন। তার মতে, “সাধারণ নির্বাচন বা এ ধরনের অন্য বিষয়ের জন্য কোনো আইনগত কাঠামো” প্রণয়ন করতে হলে তা করা দরকার “রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক ও কৃষক প্রতিনিধিদের সম্মেলনে।” এভাবে যে কাঠামো পাওয়া যাবে সেটিকে এরপর গণভোটে দিতে হবে। আর এটি করতে
হবে বিশেষ করে এই কারণে যে, কিছু রাজনৈতিক নেতা যেমন জনমতের প্রতিনিধি নন। তেমনি প্রেসিডেন্টের সাথে তাঁরা কী আলোচনা করেছেন তা প্রকাশ করাও হয়নি। তাছাড়া, প্রেসিডেন্ট নিজেও জনসমক্ষে এ নিয়ে কথা বলেননি ।”
অস্থায়ী আইনগত কাঠামো সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর মূল অসন্তোষের বক্তব্য ছিল এই যে, “আগের দুটি শাসনতন্ত্রের মতো এটিকেও জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।” বিষয়টি আরো তীক্ষ্ণ, শাণিত করে প্রকাশ করেন তাঁর দলীয় সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তোয়াহা । তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত জাতীয় পরিষদের মাধ্যমে একটি শাসনতন্ত্র প্রাপ্তির ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের ঘোষণা আমাদের সময়ের চাহিদা পূরণ করতে পারেনি।” তিনি এ কথা বলেছিলেন বলে জানা যায় যে:
তিনি বুঝতে পারেন না, শাসনতন্ত্র প্রণয়নের মতো এমন প্রয়াস দেশের শ্রমজীবী শ্রেণী ও কৃষককুলকে হিসেবে না নিয়ে কেমন করে সম্ভব হতে পারে… কার্যকর একটি শাসনতন্ত্র লাভের যে কোনো প্রয়াসে শ্রমজীবী শ্রেণী, কৃষককুল, ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল, দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয় বুর্জোয়ার দেশপ্রেমিক অংশের অবশ্যই অংশীদারি থাকতে হবে…. দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রে অবশ্যই গণমানুষের শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে।
এখানে বিষয়টি কৌতূহলপূর্ণভাবেই লক্ষণীয় যে, ভাসানী ও তোয়াহা উভয়েই রাজনৈতিক দলগুলির যে কোনো জনপ্রতিনিধিত্বশীলতা থাকতে পারে তা স্বীকার করেননি। কেননা, রাজনৈতিক দলগুলি ছাড়াও তাঁরা শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কর্মজীবীদের প্রতিনিধিত্ব চাচ্ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাদের নিজ সংগঠন ন্যাপ-ভাসানীসহ রাজনৈতিক দলগুলি আসলে প্রতিনিধিত্ব করছিল কাদের? যদি তারা কারও স্বার্থের প্রতিনিধি না হয়ে থাকে তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তারা অংশগ্রহণের অধিকারী হবে?—এ ক্ষেত্রে ভাসানীর ও তোয়াহার মতো নেতার স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে বলেই মনে হয় । আর যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে তাঁরা তাঁদের ধ্যানধারণা বোঝাতে বা জ্ঞাপন
করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে ঘটনা এ দুয়ের যা-ই হোক দুটিই দল গঠনের পথে গুরুতর প্রতিবন্ধক, আর পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থীরা খুব সম্ভবত নেতৃত্বের নানা গলদ-ত্রুটির জন্য প্রচুর ভুগেছে। তার ফলে বাম আন্দোলনের বিকাশ হয়েছে প্রতিবন্ধী প্রাণীর মতো ।
মনে হয়েছে । তিনি গোড়ার দিকে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ও পরে করলেও অত্যন্ত কনভেনশন মুসলিম লীগের সিনিয়র সহসভাপতি খান এ সবুরকে অনেকটাই দ্বিধান্বিত চাওয়ায় আন্তরিকতা প্রমাণের জন্য প্রেসিডেন্টকে প্রশংসা করেন। তবে তিনি বলেন যে, ভোটদানের পদ্ধতি, কেন্দ্র ও প্রদেশগুলির মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন, নির্বাচনী প্রচার অভিযানের জন্য মৌলিক বিধিবিধান—এসবের আরো বিশদ ও সরল ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে আর ততোদিন পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে তার চূড়ান্ত মন্তব্য দেবেন না। তবু তার এই সতর্ক বিবৃতি থেকেও টের পাওয়া যায়, তিনি মনে করতেন না যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি এত মসৃণ, সাবলীল হবে কেননা, চার মাস এ জন্য খুবই অল্প সময় ।
পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ (মোজাফফর)-এর প্রতিক্রিয়া ছিল একান্তই নিরুত্তাপ। দলীয় ওয়ার্কিং কমিটিতে প্রেসিডেন্ট কিছু জনদাবি গ্রহণ করেছেন—এ কথার উল্লেখ করে এ দল দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করে । এক, যে অথেনটিকেশন/অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে তা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা কিনা, আর দুই, প্রেসিডেন্ট ও প্রস্তাবিত জাতীয় পরিষদের মধ্যে সম্পর্ক কী হবে। মোজাফফর ন্যাপের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া অন্যদের তুলনায় ভিন্ন ধরনের ছিল এই বিবেচনায় যে, তারা স্বায়ত্তশাসনের পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি যদিও এ প্রশ্নে তারা নিজ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে কেবল পররাষ্ট্র বিষয় (রাজনৈতিক), প্রতিরক্ষা ও মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে থাকবে।
আওয়ামী লীগ কোনো ত্বরিৎ প্রক্রিয়া ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকে । ২৬ অবশ্য দলের ভেতরে আলোচনার পর একটা দীর্ঘ অথচ নিরুত্তাপ বিবৃতি দেয়। তাতে পরিষ্কার বলা হয় যে, ইয়াহিয়া খান যে প্রকৃতির আইন কাঠামোই আরোপ করুন না কেন তাতে আওয়ামী লীগে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। দলটি তার নিজ কর্মসূচি অনুসরণ করবে। অন্য বেশিরভাগ প্রতিক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ।
দলটি কোনো ইস্যুর ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চায়নি। তবে উল্লেখ করে যে, কোনো কোনো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রেখে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ধরে নেয় যে, এ সব ইস্যু (আরো অন্যান্য ইস্যু যে সব বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন) নির্বাচনে জনগণের ম্যাণ্ডেটে প্রতিফলিত তাদেরই অভিপ্রায় অনুযায়ী মীমাংসিত হবে।
সে যা-ই হোক, প্রেসিডেন্ট গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরণের মনোভাব ব্যক্ত করায় আওয়ামী লীগ সেই মনোভাবের প্রশংসা করে এবং এই আশা ব্যক্ত করে যে, কোনো “স্পর্শকাতর বিষয়ে” ও “বিতর্কিত বিষয়ে” “অতি উৎসাহী ব্যবস্থা” গ্রহণে প্রশাসনকে সংযত রাখার অনুকূল পরিবেশ প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত করবেন। প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় আওয়ামী লীগের কোনো কোনো বিষয়ে বিজয়ী হওয়ার আভাস প্রতিফলিত । ঐ বিবৃতিতে বলা হয়:
আমরা সুনিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি, জনগণ ছয়-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে দ্ব্যর্থহীনভাবে তাদের স্বায়ত্তশাসন দাবির সপক্ষে রায় দেবে। কেননা, স্বায়ত্তশাসনের বুনিয়াদেই কেবল পাকিস্তানে সংহতি ও অখণ্ডতা গড়ে উঠতে পারে। কারণ, আজকে ক্ষমতার ভারসাম্যের যে অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রতিরক্ষা খাতে চাকরি-বাকরিসহ সকল সরকারি পদে নিয়োগের বেলায় যে বৈষম্য কেন্দ্র ও ফেডারেশনের ইউনিটগুলি, বিশেষ করে, পূর্ববঙ্গের বেলায় রয়েছে স্বায়ত্তশাসনই কেবল তার চির অবসান ঘটাবে।
সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগকে দৃষ্টত শান্ত মনে হয়। এ কথা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে, যে আশঙ্কামূলক অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন আতাউর রহমান যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তা ভিত্তিহীন কিংবা বিপরীতক্রমে আওয়ামী লীগ নিহিত তাৎপর্য দেখেও দেখেনি, অন্ধ ছিল।
বাস্তবিকপক্ষেও আওয়ামী লীগের এ বিষয়ে ঢের বেশি জ্ঞাত ও সজাগ থাকা উচিত ছিল। তবে এ পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার বিষয়টি কেবল তার নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে দিত আর নিশ্চয়ই তা হতো মন্দ কৌশল। তাই আওয়ামী লীগ, প্রেসিডেন্ট কী বলেছেন ও সেই সাথে কী-ই বা তাঁর বলা উচিত ছিল অথচ বলেননি সে বিষয়ে একটা নিরুদ্বিগ্ন ঔদাসীন্যের মনোভাব দেখানোর সিদ্ধান্ত নেয় বলেই মনে হয় ।
আর এ মনোভাব যেন প্রেসিডেন্ট কী বললেন তাতে কিছু যায় আসে না—এমনি করে গায়ে না মাখা ভাব গোটা নির্বাচনী অভিযানের আগাগোড়াই চলতে থাকে । আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে এই নির্বিকার ভাব এমন এক প্রত্যয় জোরদার করে তোলে বলে মনে হয় যেন তারা উদ্দিষ্ট পথেই চলেছে। নানা উপলক্ষে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ছাত্রলীগের এক আলোচনা সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, তাঁর দলের সকল দাবি খুব ভালো করে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখার পর দৃঢ় প্রত্যয়ে স্থির করা হয়েছে । কাজেই এ সব দাবি নিয়ে দরকষাকষির কোনো অবকাশ নেই।
ছাত্রসমাজ প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় । পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (এনএসএফ)-এর সভাপতি ও সম্পাদকদের সই করা এক প্রচার পুস্তিকায় কতকগুলি বিষয়ে ব্যাখ্যা, প্রস্তাবিত নির্মিতিগত কাঠামো সম্পর্কে দ্রুততর ঘোষণা, সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং রাজবন্দীদের মুক্তি দাবি করা হয়। তাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ছিল ঐ নির্মিতিগত কাঠামোর চৌহদ্দিতে সরল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে শাসনতন্ত্র গৃহীত হওয়া, আনুষ্ঠানিকতা মাত্র হিসেবে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক শাসনতন্ত্র অনুমোদন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনসহ সকল সিদ্ধান্ত প্রণয়নে জাতীয় পরিষদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হওয়া। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় এই যে, ছাত্ররাও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে প্রেসিডেন্টের কোনো ফরমান চায়নি।
তারাও দৃষ্টত এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিল যে, এ রকম কোনো ফরমান দেওয়া হলেও তা নিষ্ফল হতো। তারা বরং অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল তাদের ভাষায় “ডান প্রতিক্রিয়াশীল ও বাম রোমাঞ্চবিলাসীদের নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র” সম্পর্কে । আর তাই তারা জনগণকে তাদের আত্মতুষ্টি ছেড়ে এ সব শক্তি সম্পর্কে সজাগ হওয়ার জন্য হুঁশিয়ার করে দেয়। ছাত্ররা অবশ্য এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে যে, তারা যে মুক্তির কথা ভাবে তা কেবল নির্বাচন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করা যাবে না।
সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ এবং একচেটিয়া পুঁজি উৎখাত না করা, বাঙালিসহ (পাকিস্তানের) সকল নরগোষ্ঠীর স্বশাসন পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া এবং সাধারণ মানুষের সকল সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলতে থাকবে ।
তাদের মতে, নির্বাচন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়ে থাকে তা কেবল অভীষ্টের উপায় মাত্র, খোদ অভীষ্ট নয় । তবে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করে এই অভিযানের দলিলে স্বাক্ষরদাতারা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সংগ্রামের কৌশলের প্রতি সমর্থন জানান। এখানে লক্ষণীয় যে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ঐ স্বাক্ষরদাতাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলত তা থেকে আভাস পাওয়া যায় যে, আওয়ামী লীগকে সমর্থনের সিদ্ধান্তে ছাত্রসমাজের মাঝে আর ঐকমত্য ছিল না।
সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে খুব ভালো করেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আওয়ামী লীগ অন্য দলগুলির সাথে কোনো রকম আঁতাত না করেই কিংবা জোট না বেধেই নিজ ছয়-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে স্থিরসংকল্প। আর নির্বাচন- সংক্রান্ত বিধিবিধানের ব্যাপারে কোনো রকম আলোচনা বা দরকষাকষি নিয়েও দলটি মাথা ঘামায়নি। বস্তুত এ ছিল আওয়ামী লীগের নিজ কর্মসূচির ওপর জনগণের আনুষ্ঠানিক রায় লাভের প্রথম সুযোগ।
এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ায় দলটি অন্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে তাই এ রাজনৈতিক গৌরবে অংশীদার করতে চায়নি। শেখ মুজিব ছাত্রলীগকে বলেন, “যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে জনগণের কোনো সত্যিকারের কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না ।” তিনি জোর দিয়েই বলেন, “আমরা দল বা নেতাদের ঐক্য চাই না, আমরা জনগণের ঐক্য চাই।” তিনি আরো বলেন, যদি অন্যান্য দলের সদস্যরা আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাস করে তাহলে তাদের নিজ নিজ সাইনবোর্ড বদলে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া উচিত।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 3 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ.jpg)
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট রাজনীতির উল্লেখ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি আবার সেই একই অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে প্রস্তুত নন। তাঁর উল্লিখিত সমমনা দল বলতে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ (মোজাফফর)-ই ছিল স্পষ্টতই সেই দল। এ দলটি নির্বাচনের জন্য বারংবার যুক্তফ্রন্ট গঠনের তাগাদা দিয়ে আসছিল। আর বলাবাহুল্য, পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ (মোজাফফর)-ই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক দল যা প্রায় সকল মৌলিক সমস্যার সমাধানের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের মতবাদের সবচেয়ে কাছাকাছি। স্পষ্টত পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপ (মোজাফফর) তখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটা নির্বাচনী গাঁটছড়া বাঁধার আশায় হাল ছাড়েনি কেননা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) তখনো পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সঙ্গে এক কাতারে শামিল ছিল।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 1 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-১](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/সাধারণ-নির্বাচন-পর্ব-১.png)