আজকের আলোচনার বিযয় সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩, যা আমাদের ” ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগ ” এর ইতিহাসের অর্ন্তভুক্ত, এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আর নতুন করে নির্বাচন স্থগিত করা চাইবে না। যে অঙ্গীকার রয়েছে পূর্ব পাকিস্তানকে হয় সংসদীয় পদ্ধতিতে নয় সংসদবহির্ভূত পদ্ধতিতে স্বনিয়ন্ত্রিত করার—সে অঙ্গীকার বাস্তবায়িত করতে আওয়ামী লীগকে লড়তে হবে একটা সুবিধাজনক অবস্থান থেকে।
এ দলের শক্তি যেহেতু বন্দুকের নলে নিহিত নয় সেহেতু এ দলটিকে ঐ সব মানুষের মন জয় করতেই হবে সুনিশ্চিতভাবে, এ মানুষগুলিই হবে তার জন্য সমর্থনের বুনিয়াদ । আর এটিই ছিল এ ধরনের প্রয়াস চালানোর সবচেয়ে অনুকূল সময় । দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত মোকাবেলায় নামার আগে আওয়ামী লীগের নিজের জন্য যেমন নির্ধারণ করা দরকার তেমনি বিরোধীদের কাছে প্রমাণ করাও দরকার, সমর্থনের পরিসর ঠিক কতখানি। আর তার শক্তি কতখানি একটি আশু নির্বাচনই শুধু তা দেখাতে পারে ।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 2 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ02.jpeg)
সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩
আর এই নির্বাচন যে, দলের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা বাস্তবিকপক্ষে তার অনেক আগেই শেখ মুজিব চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশনে প্রদত্ত ভাষণে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে নেতা বলার কোনো নৈতিক অধিকার আমার নেই”। বাহ্যত ইয়াহিয়া খানের অভিমতও ছিল তাই। তিনি ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি কাউকে জনগণের প্রতিনিধি বলে মনে করেন না।
কতিপয় রাজনীতিক নির্বাচন স্থগিত করার দাবিতে দলীয় ভূমিকার জন্য আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে। ভাসানী ও অন্যরা ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রতিবাদ দিবস পালন করেন । প্রতিবাদ দিবসে নির্বাচন তিন মাস বিলম্বিত করার দাবি করা হয় ।
পশ্চিম পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক তাঁদেরকে “ঘূর্ণিঝড়ের এতিম” বলে আখ্যায়িত করে ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, “ঘূর্ণিঝড়-মহাপ্লাবনের যে ধ্বংসাবশেষের আবডালে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছেন সে ঝড়-দুর্যোগ নয় বরং যে রাজনৈতিক ঝড় গত এক বা দু’বছর ধরে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তার কারণেই মনে হয় ভদ্রলোকেরা হুঁশিয়ারি বিহনে নিজেদেরকে পুরো অপ্রস্তুত দেখতে পান”।
অথচ পূর্ব পাকিস্তানের মোটামুটি বেশিরভাগ মানুষ তো মনে হয় আওয়ামী লীগের “এখনই কিংবা কখনো নয়” এই অভিমতের অংশীদার। পূর্ব পাকিস্তান তো বরাবরই তার অভাব-অভিযোগের কথা প্রকাশ করে এসেছে কেন্দ্রবিরোধী বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে।
তবে এবার আর কোনো বিক্ষোভের কথা খবরে জানানো হয়নি। নির্বাচন এসে পড়ায় ওরা মনে হয় তাদের যা প্রকাশের তা প্রথমে ভোটাধিকারের মাধ্যমে ব্যক্ত করার ও প্রয়োজনে পরে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় বেছে নিয়েছে। এই সংযমী মনোভাব ছিল অংশত স্বতঃস্ফূর্ত, অংশত আওয়ামী লীগ কর্মীদের আর সেই সাথে ছাত্রলীগ কর্মীদের সজাগ প্রয়াসের ফল। কেননা, নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাঝে এর নিজ দায় ও স্বার্থ নিহিত ছিল।
পাকিস্তানী রাজনীতির আচমকা নানা ডিগবাজির পূর্ব অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক আওয়ামী লীগ নেতারা আশঙ্কা করেন যে, কোনো ব্যাপক সহিংসতা দেখা দিলে (যে কোনো সময় যে কোনো কেন্দ্রবিরোধী বিক্ষোভের স্বাভাবিক পরিণতি) তা ১৯৬৮-৬৯ সালের বিক্ষোভ-নিপীড়ন ও সহিংসতার দুষ্টচক্রকে পুনরাবৃত্ত করবে আর তাতে নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়ে যাবে। এতে কেবল স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের আরো অগ্রগতিই বরবাদ হয়ে যাবে না, এ পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে তা-ও বরবাদ হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, ১৯৬৯ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা অভিযান আন্দোলন চালিয়ে আওয়ামী লীগ জনক্ষোভকে এক ফুটন্ত অবস্থায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এখন তাতে কোনো রকম ঢিলে দিলে, কিংবা যতি-বিরতি ঘটালে দলীয় সংগঠনের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে, বিশেষ করে, ছাত্রলীগ কর্মীসহ ছাত্রদের মাঝে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, অসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে। ১৯৬৯ সালের প্রথম তিন মাসে যে তীব্রতায় ছাত্রবিক্ষোভ গড়ে উঠেছিল তার ধার অনেকটাই কমে আসে।
এটি কতকটা হয় সামরিক আইন পুনঃআরোপের কারণে। তবে এর বড় কারণ হলো, ছাত্রসংগ্রাম কমিটির সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠনের স্বআরোপিত সংযমের কারণে । সংগঠনটি ছাত্রলীগ বৈ কেউ নয় । ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতৃত্ব সাময়িকভাবে আক্রমণাত্মক ও আদর্শে প্রগতিবাদী হলেও বাস্তববাদীও ছিল বটে। তারা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সমস্যা সমাধানে রাজনীতিকদেরকে সময় দিতে তৈরি ছিল তবে সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়।
তখন কোনো কোনো সময় এমনও দেখা যায় যে, ছাত্রলীগ কার্যত শেখ মুজিবের পরামর্শ অগ্রাহ্য করেছে। ছাত্র সংগ্রাম কমিটি যে গণআন্দোলন শুরু করে তা স্থগিত করা হলেওপ্রত্যাহার করা হয়নি। অবশ্য এতে গঠনের দিক থেকে কমিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ অ্যাপস্যাক ছেড়ে যায় ও তাতে ঐ ছাত্রগ্রুপের মধ্যে বিভক্তিও। দেয়। তবে আওয়ামী লীগের প্রতি ছাত্রলীগের প্রশ্নাতীত আনুগত্যের বিষয়টিও অনির্দিষ্টকালের জন্য অটুট থাকবে এমনও ধরা যায় না। এ সংগঠনটিও একই ধরনের সমস্যায় পড়ে।
শেষ পর্যন্ত যদি নিয়মতান্ত্রিকতার বাইরে গিয়েই সঙ্কটের সমাধান করতে হয় তাহলে সে বিষয়টি যত শীঘ্র স্পষ্ট হয় ততোই মঙ্গল । কেননা, ছাত্র আন্দোলন তখন এমন একটা গতি অর্জন করেছিল যাতে খুব বেশি দিন ফাঁক পড়ে গেলে ঐ আন্দোলন আবার শুরু করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
এ জন্য নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে আওয়ামী লীগের অনুকূল সিদ্ধান্ত প্রকাশ তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতারই পরিচয় দিয়েছে। এই ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগের নেওয়া অবস্থানের প্রতি জনসমর্থন থেকে আভাস পাওয়া যায় যে, আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচির বাস্তবায়নই সর্বাগ্রগণ্য হয়ে জনচিত্ত জুড়ে আছে । এটি বেশ বোঝা যায় যে, বিস্তারিত ব্যাখ্যায় “স্বায়ত্তশাসন” বিভিন্ন শ্রেণীর লোকের কাছে বিভিন্ন অর্থবাহক হতেও পারে।
তবু সাধারণ মানুষের কাছে এর একটা অভিন্ন তাৎপর্য ছিল আর তাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুপ্রাণিত হয়। তাদের বিশ্বাস, আর্থ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী না থাকলে স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমেই তাদের জীবনযাত্রার মান সন্তোষজনক হবে। অপেক্ষাকৃত বয়সী প্রজন্মের লোকেরা যখন পাকিস্তানের জন্ম হয় তখন এটিই চেয়েছিল কিন্তু তা পায়নি। আর তরুণতর প্রজন্মের কাছে এগুলি ছিল মৌলিক মানবাধিকার যা থেকে তারা বঞ্চিত রয়েছে । একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকার এ সবের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে:
এ সব নির্বাচনে যে সব মৌলিক বিষয় বা কারণ ক্রিয়াশীল থাকবে তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খুব বেশি ভিন্ন হবে এমন সম্ভাবনা কম। সমগ্র প্রদেশের একমাত্র ইস্যু হলো: পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বশাসন ও এ ক্ষেত্রে মুজিব ত্রাতা মসীহের ভূমিকায় অবতীর্ণ।
তাঁর বার্তা স্থানীয় নেতা তথা পিতাদের প্রভাব অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হবে কিনা কিংবা তাঁর সেই প্রভাবের সুবাদে তাঁর দলীয় প্রার্থীদের দোষত্রুটি ছাপিয়ে তাঁর জন্য সামগ্রিক জয় আসবে কিনা সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে তিনি যে অন্য সব দল ও তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পিছু ফেলে নির্বাচনে আধিপত্য লাভ করবেন সে বিষয়টি নিশ্চিত।
এরপর সংগ্রামের দ্বিতীয় পর্যায়। প্রথম পর্যায়ের ফল দেখে শাসকদের কী প্রতিক্রিয়া হয় তার ওপর দ্বিতীয় পর্যায়ের এই সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করবে। যদি এ ফলাফলকে চ্যালেঞ্জও করা হয়, তাহলে প্রায় নিঃসংশয়ে বলা চলে আন্দোলনের রাজনীতির জন্য পূর্ব পাকিস্তানের মেজাজ এখন পুরো তৈরি ।
স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে জনআগ্রহ এ-ও প্রমাণ করেছে যে, স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটিকে মুলতবি রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতে ছিল একনায়কের সর্বময় ক্ষমতা। তিনি সহজেই নির্বাচনের আগে স্বায়ত্তশাসনের পরিসর কী হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। বস্তুতপক্ষে, আইন কাঠামো আদেশের (এলএফও) আওতায় শাসনতন্ত্র বিলের অনুমোদনের বেলায় নিজ ভিটো ক্ষমতার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রেখে এ বিষয়ে তিনি তাঁর স্বাধীন বিচার-বিবেচনার বিকল্পটি খোলা রেখেছিলেন।
তবে তিনি এও জানতেন যে, স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তাঁর রায় সংশ্লিষ্ট জনসমষ্টির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। স্পষ্টতই নির্বাচনের আগে কোনো অচলাবস্থা বাঞ্ছনীয় ছিল না, কেননা তেমন ঘটনা ঘটলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর নিজ অবস্থানকে একটা বৈধতা দেওয়ার প্রয়াসেও ছেদ পড়বে। তাই স্বায়ত্তশাসনের ইস্যুটি সম্পর্কে আগেভাগেই সিদ্ধান্ত দিয়ে আওয়ামী লীগের আবেদন কমানোর চেষ্টায় না গিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যে মতানৈক্যের অপেক্ষায় থাকেন।
তাঁর আশা ছিল, এতে আওয়ামী লীগের ভোটের বাক্সে ব্যালটের পরিমাণ কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু শাসকগোষ্ঠী আশা করেনি যে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল হবে (নির্বাচনে প্রার্থী প্রদানের ধারাবিন্যাসটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হলে অবশ্য এ ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট অবকাশ ছিল)।
মনে করা হয়েছিল যে, স্থানীয় বিরোধ ও মতানৈক্য জাতীয় পরিষদ অবধি টেনে নিয়ে আসা যাবে ও তাতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে একটা অচলাবস্থা দেখা দেবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট “আইনসম্মতভাবে” (এলএফও অনুসারে এ কাজটি নিখুঁত আইনসম্মত) তাঁর নিজ সমাধান জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গোটা দোষ পূর্ব পাকিস্তানী রাজনীতিকদের, বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারবেন এই সব কথা বলে যে, তাদের মধ্যে সহযোগিতার অভাব রয়েছে, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নেও তাদের মাথাব্যথা নেই।
এভাবে গণতন্ত্রের একটা সাইনবোর্ডের আড়ালে শাসকচক্রের স্বার্থ পুরোপুরি প্রকাশ্যে না এনেও রাজনীতিকদের বিশেষ করে আওয়ামী লীগারদের দায়ী করে বর্তমান ব্যবস্থা কায়েমি রাখার সুযোগ মিলবে |
স্বায়ত্তশাসন ইস্যুর নিষ্পত্তির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলির মনোভাব স্পষ্ট বোধগম্য । আওয়ামী লীগ ও মোজাফফর ন্যাপ ছাড়া সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট সুনির্দিষ্টভাবে স্বায়ত্তশাসন ইস্যুর নিষ্পত্তি দিন—এটিই চেয়েছিল। কারণ তারা মনে করেছিল, এটি করলে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী আবেদন বহুলাংশেই জলো হয়ে যাবে । আওয়ামী লীগ এ নিয়ে খুব ব্যগ্র ছিল না। কেননা, দলটি সুনির্দিষ্টভাবে স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নেই নির্বাচন লড়ছিল ।
অবশ্য সম্ভবত এ কথা ধরে নেওয়া ভুল হবে যে, সহজে নির্বাচন জয়ের জন্যই শুধু দলটি স্বায়ত্তশাসন ইস্যু জীইয়ে রাখতে চেয়েছিল। স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের উদ্গাতা ও পতাকাবাহী আওয়ামী লীগ নিশ্চিত ছিল যে, ছয়-দফা ফর্মুলার রূপরেখা অনুযায়ী স্বায়ত্তশাসনের কথা পাকিস্তানের পশ্চিম পাকিস্তানীপ্রধান শাসকগোষ্ঠী কল্পনাও করতে পারে না। আর সে কারণে এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের কোনো ব্যবস্থাপত্র কোনো সমাধানও নিয়ে আসবে না । উল্লেখ করার বিষয় এই যে, ষাটের নয় বরং পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকেই স্বায়ত্তশাসনের ধারণার ভ্রূণ গঠিত হয়েছিল । জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এ ব্যাপারে একমাত্র আশা-ভরসা ছিল।
বস্তুত আওয়ামী লীগ সেই লক্ষ্যে ব্যাপক ও নিবিড় প্রচার ও গণসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে ১৯৬৯ সাল থেকেই কাজ করে আসছিল। তবে সংখ্যাগত গরিষ্ঠতাকে যে উদ্দেশ্যে কাজে লাগানো হবে সে উদ্দেশ্যে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে উৎকর্ষগত দিক থেকেও পর্যাপ্ত হতে হবে।
এ কারণে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে, বিশেষ করে, জাতীয় পরিষদের প্রার্থী মনোনয়নের বেলায় প্রচুর আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন হয় । ফলত দেখা যায়, আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্তরা গড়ে প্রায় সবাই লক্ষ্যাভিমুখী, সুসংবদ্ধ, শিক্ষিত ও রাজনীতি-সচেতন যাদের জন্ম গ্রামে, তুলনামূলকভাবে বয়সে তরুণ। আর তাঁদের প্রায় সকলেই স্বাধীন পেশার লোক।
জাতীয় পরিষদের সাধারণ আসনগুলির জন্য ১৬২ জন মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে পেশার বিচারে সবচেয়ে বড় অংশটি (৪৭.৫৩%) গঠিত ছিল আইনজীবীদের নিয়ে; এর পরে যথাক্রমে ব্যবসায়ী (১৯.১৩%), কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (৬.১৭%) ও জোতদার (৭%)-দের অবস্থান। শিক্ষার দিক থেকে মনোনীত প্রার্থীদের ৮১.৪৩% ছিল কমপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট (এঁদের মধ্যে বেশ কিছু লোক স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী)।
বয়সের দিক থেকে মনোনীত প্রার্থীদের ৪৭.৫৩ শতাংশের বয়স ৪০-৫০ বছর। অবশিষ্টাংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৩২ শতাংশের মনোনীত প্রার্থীদের বয়স ছিল ৪০-এর নিচে এবং মাত্র ২০ শতাংশ পঞ্চাশোর্ধ্ব।৬৩ মনোনীত প্রার্থীদের পেশা ও শিক্ষাগত পটভূমি উপনিবেশোত্তর উদীয়মান উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলির অনুরূপ। এ ছাড়া আইন প্রণয়নমূলক পরিষদীয় কার্যাবলিতে এই প্রার্থীদের ভূমিকার তাৎপর্যের বিবেচনায় উচ্চ শিক্ষা ও আইনগত প্রশিক্ষণের প্রাধান্য থাকাই স্বাভাবিক । তাছাড়া, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনসমষ্টিতে বিভিন্ন বয়ঃবর্গের বণ্টন বিন্যাসের তুলনায় মনোনীত প্রার্থীদের মাঝে অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সীদের আধিপত্যের বিষয়টিও বোধগম্য।
এ ছাড়া দলের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের বিষয়টি মনোনীত প্রার্থীদের দলের সাথে একটানা দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন ও পরিষ্কার রেকর্ডের ভিত্তিতেই নিশ্চিত করা সম্ভব। আর এ জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত হলো দল যখন গোড়ার দিকে গড়ার পর্যায়ে ছিল তখন যারা দলে যোগ দিয়েছেন সেই বর্ষীয়ানদের এবং অপেক্ষাকৃত বয়সে তরুণ যাদের রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ শুরু হয়েছে এই দলের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংসর্গে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা।
উল্লিখিত ১৬২ জন জাতীয় পরিষদের মনোনীত প্রার্থীর প্রায় ১০০ জন সম্পর্কে সংগৃহীত পটভূমি তথ্যে তারই প্রমাণ পাওয়া যায় । এই ১০০ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পটভূমি সমীক্ষায় দেখা যায় যে, এদের ৮৪ জনের জন্ম গ্রামে, ৬ জনের শহরে এবং যে সব জেলা থেকে তাঁরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সেই সব জেলাতেই এ সব গ্রাম ও শহর অবস্থিত। একজনের জন্ম নগরে (কলকাতায়)।
অবশ্য এই মনোনীত প্রার্থীদের ৬১ জনের যেহেতু স্নাতকোত্তর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল তাদের পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরের বছরগুলি পড়াশোনায় কেটেছে নগর এলাকায়, ঢাকায়, কয়েকজনের রাজশাহী ও চট্টগ্রামে। সমীক্ষাধীন এই ১০০ জনের মধ্যে ৩৫ জন তাঁদের ছাত্রজীবনে কিংবা আওয়ামী লীগে যোগদানের আগে কোনো না কোনো ছাত্র বা যুব সংগঠনের সদস্য ছিলেন ।
বয়সভিত্তিতে উল্লিখিত ৩৫ জনের মধ্যে ১৮ জনের বয়স ছিল ৪০ বছরের নিচে। এদের ১২ জন ১৯৬০ সালের পর (বাস্তবিকপক্ষে ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের পর) এবং তিনজন ১৯৫০-এর দশকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ।
দু’জন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি। ১৭ জন মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৩ জনের বয়স ছিল চল্লিশোর্ধ্ব (৫৫ বছরের কম)। এঁরা ১৯৫০-এর দশকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং তিনজন ষাটের দশকে । একজনের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায়নি।
পেশার দিকে থেকে ১৭ জন মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আইনজীবী ও তাঁদের কর্মস্থল ছিল ঢাকা জেলার মধ্যে কিংবা ঢাকায়। দু’জন ছিলেন কৃষিজীবী-ব্যবসায়ী। দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় ও দু’জন কলেজ শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত কিংবা সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত পাঁচজন তখনো কোনো পেশার সাথে যুক্ত হননি। আর আটজন মনোনীত প্রার্থীর পেশা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়নি ৷
উল্লিখিত ৩৫ জন মনোনীত প্রার্থীর ২৪ জন ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ সদস্য (অর্থাৎ ছাত্রজীবনে তাঁরা কেবল ছাত্রলীগেই ছিলেন)। ৬৮ দু’জন ছিলেন মুসলিম ছাত্রলীগে (ছাত্রলীগের পূর্বসূরি)। আর এঁদের মধ্যে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন, যুবলীগ ও নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন থেকেও একজন করে মোট তিনজন। একজন মুসলিম ছাত্রলীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন। দু’জন মুসলিম ছাত্রলীগ ও যুবলীগের, একজন মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন ও যুবলীগের, একজন ছাত্র ইউনিয়ন ও যুবলীগের সদস্য ছিলেন। আর একজন আওয়ামী লীগে আসেন মুসলিম ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে ।
ছাত্রলীগের এই ২৪ জন ছাত্রলীগ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তা ছিলেন। এদের ১৬ জন কমপক্ষে একটি নিম্নস্তর থেকে আরেকটি স্তরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিস্তারিত তথ্যে দেখা যায়, এদের ১৫ জন প্রাদেশিক উচ্চস্তরের কর্মকর্তা।
তাঁদের এই অবস্থান সর্বশীর্ষস্থানীয় কেননা ছাত্রলীগের জাতীয় (পাকিস্তান) পর্যায়ের কোনো সংগঠন তখন ছিল না। এই ১৫ জনের দুইজন জেলা পর্যায়ে কলেজ থেকে আসেন, তিনজন মহকুমা ও জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, আর সাতজন আসেন সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে । দু’জন মহকুমা থেকে জেলা হয়ে সরাসরি আসেন। এদের চারজন মহকুমা থেকে জেলা পর্যায়ে উন্নীত হন। একজন জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নীত হন। আর দু’জন, একজন ও একজন যথাক্রমে কেবল জেলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ স্তরে ছাত্রলীগ সংগঠনে কাজ করেন ।
আওয়ামী লীগের সাবেক ২৪ জন ছাত্রলীগারের ১৩ জন দলীয় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন ৬৯ তাদের পেশা বা কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই ১৩ জনের চারজন জাতীয় পর্যায়ে পদাধিকারী ছিলেন। এঁদের একজন মহকুমা থেকে জেলা, জেলা থেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে এবং তিনজন জেলা থেকে প্রাদেশিক পর্যায়ে উঠে আসেন। দু’জন থানা স্তর থেকে মহকুমা স্তরে এবং একজন মহকুমা স্তর থেকে জেলা স্তরে উন্নীত হন। এ ছাড়া একজন, চারজন ও একজন যারা যথাক্রমে নগর, জেলা ও প্রাদেশিক স্তরের পদে আসীন ছিলেন ।
এগারোজন মনোনীত প্রার্থী যাঁদের প্রায় কেউই কেবল সাবেক ছাত্রলীগারই ছিলেন না তাঁরা আওয়ামী লীগে বিভিন্ন পদে দায়িত্বও পালন করেন। এঁদের একজন করে নগর, জেলা ও প্রাদেশিক স্তরে ছিলেন। জেলা স্তরের একজন উঠে এসেছিলেন মহকুমা স্তর থেকে। এঁদের তিনজন ছিলেন জাতীয় স্তরে, তাঁরা এ অবস্থানে উন্নীত হন জেলা থেকে প্রাদেশিক স্তর হয়ে । এঁদের প্রায় সকলেই তাঁদের নিজ নিজ ছাত্র/যুব সংগঠনে পদাধিকারী ছিলেন ।
আওয়ামী লীগের সরাসরি সদস্য হিসেবে গৃহীত ৬৫ জন মনোনীত প্রার্থীর বেলায় দেখা যায়, এদের অনেকে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার আগে বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগের ছাত্র শাখায় ছিলেন ও তাঁরা পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
তিনজন মনোনীত প্রার্থী ইতঃপূর্বে যথাক্রমে কেএসপি, ন্যাপ (ওয়ালী) ও ন্যাপ (ভাসানী)-তে ছিলেন। বয়সওয়ারি দেখা যায়, মনোনীত প্রার্থীদের ৫১ জনের বয়স ছিল চল্লিশোর্ধ্ব। এঁদের ২০ জন ১৯৫০ সালের আগে, ৮ জন ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে, ১০ জন শেষের দিকে, ছয়জন ১৯৬০-এর দশকে ও একজন ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ছয়জন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। চল্লিশ অনূর্ধ্ব ১৪ জনের দু’জন ১৯৫০-এর দশকে, ৩ জন ১৯৬০-এর দশকে ও দু’জন ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগে আসেন । সাতজন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাঁরা যে দলের নিষ্ক্রিয় সদস্য ছিলেন না তা দলীয় সংগঠনের ভেতরে তাঁদের সচলতার রেকর্ড থেকে বেশ পরিষ্কার। ১৯৭০ সালে এঁদের সাতজন ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা। এ সাতজনের চারজন আগে ছিলেন জেলা ও প্রাদেশিক স্তরে, দু’জন প্রাদেশিক স্তরে ও একজন জেলা স্তরে। তিনজন ছিলেন প্রাদেশিক স্তরে যাঁদের দু’জন আগে ছিলেন জেলা ও একজন মহকুমা স্তরে। জেলা স্তরে ছিলেন নয়জন।
তাঁদের আটজন আসেন মহকুমা স্তর থেকে আর একজন থানা স্তর থেকে মহকুমা স্তরে উন্নীত হয়ে । একজন তখনো মহকুমা স্তরে। তিনি এর আগে থানা স্তরে ছিলেন। এই বিশজন ছাড়া ছয়জন ছিলেন প্রাদেশিক, ছয়জন জেলা, চারজন মহকুমা ও পাঁচজন থানা পর্যায়ের কর্মকর্তা। এখানে আলোচিত মনোনীত শত প্রার্থীর ২৪ জনের (১৯৭০ বা আরো আগে) দলীয় পদ ঠিক কী ছিল তা নির্ণয় করা যায়নি।
তবে এই কয়েকজনের মধ্যে রয়েছে ১২ জনের মতো মনোনীত প্রার্থী যাদের আওয়ামী লীগের সাথে দৃষ্টত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল না। আর সে কারণে সঙ্গতভাবেই সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকাগুলির অন্যান্য অভিলাষীরা। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ সব “নবাগতদের” তথ্যাদি পর্যবেক্ষণে তাদের মনোনয়নের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়। একজন প্রথমে এক স্বতন্ত্র গ্রুপের নেতা ও পরে ১৯৬৫ সাল। থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন।
ছিলেন দু’জন বিশিষ্ট তরুণ ব্যারিস্টার যাঁরা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামীপক্ষের কৌঁসুলি দলের বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন এবং এ দু’জনই গোলটেবিল সম্মেলনে বাংলাদেশ দলেরও অংশ ছিলেন। একজন ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী যিনি ঢাকা হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্ট উভয়েরই বিশিষ্ট সদস্যও বটে ।
একজন তরুণ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর চীফ রিপোর্টার যিনি এই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগে ১৯৬৯ পর্যন্ত ইত্তেফাকে ঐ পদে ছিলেন । ট্রেড ইউনিয়নের দু’জন বিশিষ্ট নেতাও ছিলেন মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে । এঁদের একজন ছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের সম্পাদক। কয়েকজন কলেজ অধ্যক্ষও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভ করেন। তাঁদের এলাকায় গঠনমূলক কাজের জন্য তাঁরা সুনাম অর্জন করেন। আরো দু’জন সাংবাদিক মনোনয়ন লাভ করেন। এঁরা হলেন: চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত এক প্রগতিশীল পত্রিকা দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এবং ভাসানী ন্যাপের সাবেক সদস্য ও একই দলের সাপ্তাহিক পত্রিকা জনতার সাবেক সম্পাদক ।
কোনো কোনো মহল থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন খেয়ালখুশিমাফিক ও অযৌক্তিক বলে যে অভিযোগ করা হয় তা দৃষ্টত এই বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে যে, আওয়ামী লীগের কিছু মনোনীত প্রার্থী দৃষ্টত উল্লিখিত কোনো শ্রেণীতেই পড়ে না। হামিদুল হক চৌধুরীর পত্রিকা দৈনিক পূর্বদেশ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই মর্মে রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, খন্দকার মোশতাক আহমদের কয়েকজন বাছাই করা ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
অবশ্য ১৯৭৬ সালে খোদ খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭০ সালের দলীয় মনোনয়ন সম্পর্কিত কথাবার্তায় এর উল্লেখ করেননি । তিনি বরং বলেন যে, মনোনয়ন দানের নীতিমালা যেমন দলীয় আনুগত্য, বলিষ্ঠতা, সততা, সেবা রেকর্ড, প্রার্থীর গুণাবলি সাধারণত মেনে চলা হয়েছিল তবে কতিপয় ক্ষেত্রে, যেমন, ড. কামাল হোসেনের মতো ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করা হয় ।
তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নের অবেদন অনুমোদনের বেলায় সর্বাত্মক বস্তুনিষ্ঠতা অনুসৃত হয়ে থাক বা না থাক যাঁরা মনোনীত হন তাদের বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নে দেখা যায় যে, মনোনীতদের সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিলেন দলের নির্ধারিত মানের নিরিখে বৈধ মনোনয়ন উপযুক্ত। আর তাঁরা তীব্র বাধার মুখেও ছয়-দফার ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের এক সর্বাত্মক প্রয়াস তথা মিশন বাস্তবায়িত করার জন্য ছিলেন এক সুগঠিত ও সুসংবদ্ধ গ্রুপ। অন্ততপক্ষে তীব্র প্রচারাভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে জাগ্রত প্রত্যাশাটি ছিল ঠিক তাই।
প্রাদেশিক পরিষদের জন্য আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের ওপর এক নজর বুলিয়ে নিলে কমবেশি একই ধারা লক্ষ্য করা যাবে। অবশ্য অনিবার্য কারণেই এই সমাবেশটিকে অনেকটা জৌলুসহীন মনে হয়। কিন্তু তারপরেও এই সমাবেশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, মনসুর আলী, ডা. আসহাবুল হক, শামসুল হক, ময়েজুদ্দিন, ফণীভূষণ মজুমদার, মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কম্যান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী, নজরুল হক প্রমুখের মতো সুপরিচিত প্রাদেশিক ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ; ছিলেন সরদার আমজাদ হোসেন, আব্দুর রউফ চৌধুরী, মোহাম্মদ শফিউল্লাহ,
রাশেদ মোশাররফ, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আব্দুর রাজ্জাকের মতো ছাত্রলীগ নেতা এবং ছিলেন আইয়ুবী নিপীড়নের শিকার ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট ফজলুল হক যাঁকে “আগরতলা ষড়যন্ত্র” মামলা চলাকালে ঢাকা সেনানিবাসে সার্জেন্ট জহুরুল হকের পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ করা হয়।
এ কথা সকল মহলে স্বীকৃত যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী অভিযান ছিল মাত্র এক ব্যক্তির প্রদর্শনী বিশেষ । ১৯৪৫-৪৬ সালে ভারতের মুসলমানদেরকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ এমনকি যদি ল্যাম্পপোস্টকেও মনোনয়ন দিয়ে থাকে তাকে ভোট দেওয়ার জন্য বলা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানীদেরকে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকায় ভোট দিতে বলা হয় । আগের বেলায় এ নির্দেশ আসে কায়েদ-ই-আযমের কাছ থেকে। পরের বেলায় এ নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু।
৭১ শেখ মুজিবের নিজের একটা আবেদন তো ছিলই, সবচেয়ে ফলদায়ক নির্বাচনী প্রচার মাধ্যম ছিল একটি পোস্টার যার শিরোনাম ছিল: “সোনার বাংলা শ্মশান হইল কেন?”৭২ অবশ্য কতিপয় মহল আওয়ামী লীগের কার্যকারিতাকে তেমন আমল দেয়নি। দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, রাজশাহীর একজন “ধনী” ও “প্রভাবশালী” কনভেনশন মুসলিম লীগ প্রার্থীর বিশ্বাস ছিল যদি তিন মুসলিম লীগ ও জামায়াত-ই-ইসলামীর মতো ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি তাঁকে সমর্থন দেয় তাহলে আওয়ামী লীগ, পিডিপি, ন্যাপ (ওয়ালী) ও ন্যাপ (ভাসানী)-র মধ্যে বিরোধীদলীয় ভোট ভাগাভাগির ফাঁকে তিনি সুনিশ্চিতভাবেই নির্বাচনে জয়ী হবেন।
ঐ একই জেলায় নির্বাচনী প্রচারাভিযান চলাকালে এমনকি অনেকের এ ধারণাও জন্মে যে, শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় ভাটার টান পড়েছে কেননা তিনি সব গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে একত্রিত করার মতো দূরদর্শিতা দেখাতে পারেননি। আরো মনে করা হয় যে, জয় বাংলা শ্লোগান খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। ওয়ালী ন্যাপের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী এ কথা বলেন বলে উল্লেখ করা হয় যে, জয় বাংলা শ্লোগানের মাধ্যমে লাখো নির্যাতিত মানুষের অধিকার বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে না।
রাজশাহীকে ওয়ালী ন্যাপের তুলনামূলকভাবে শক্ত ঘাঁটি মনে করা হতো। ওয়ালী ন্যাপ এই জেলা থেকে জেলার মোট নয়টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ছয়টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ জেলায় ওয়ালী ন্যাপের জেলাওয়ারি প্রতিদ্বন্দ্বিতার শতকরা হার (৬৬) গোটা প্রদেশে সর্বোচ্চ ছিল। কিন্তু কার্যত দেখা যায় রাজশাহী জেলায় জেলার মোট নির্বাচন প্রার্থীর (৫০) ১৮ শতাংশ তথা নয়জন ছিলেন আওয়ামী লীগের। কিন্তু তারা জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে এই জেলায় প্রদত্ত মোট বৈধ ভোটের শতকরা ৭৪.৫৯টি ভোট পেয়েছে। আর ৩৭ জন প্রার্থীর (৭৪ শতাংশ) জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
অবশ্য সকল জল্পনা-কল্পনা, বিশেষ করে কিছু প্রাক্নির্বাচন জরিপভিত্তিক ধারণাগুলি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, রংপুর ও নোয়াখালীতে নির্বাচনের আগে টিম জনমত জরিপ করে। এ জরিপ থেকে যে ধারণা দেওয়া হয় পরবর্তীকালে নির্বাচনী ফলাফলে তার সত্যতা প্রমাণিত হয়।
এই টিমের ধারণা অনুযায়ী—যদিও প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে রংপুর জেলাতেই ছিল সর্বাধিক সংখ্যক নির্বাচক ও এ জেলাতেই ছিল জমি মালিকানায় সর্বাধিক বিষম বণ্টন আর তদবধি তাদের বেশি আগ্রহ ছিল স্থানীয় ইস্যুতে যাতে আধিপত্য ছিল জোতদারের মতো স্থানীয় প্রভাবশালীদের—এহেন জেলাও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঢলমুক্ত থাকতে পারেনি আর শেখ মুজিবের চারপাশে আকর্ষিত হয় নজিরবিহীন, উন্মাতাল বিপুল জনতা। ৫ রংপুরে ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনী ফল ছিল আওয়ামী লীগ কর্তৃক জেলার মোট বৈধ ভোটের ৭০.৩৭ শতাংশ লাভ।
নোয়াখালী জেলায় প্রাকনির্বাচন জরিপ দলের ধারণা ছিল, নোয়াখালী জেলা “জামাতীদের আখড়া” বলে জনশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টত সমর্থনের জোয়ার-উচ্ছ্বাস আওয়ামী লীগের অনুকূলেই চলেছে। তাদের মনে হয়েছিল নোয়াখালী জামাতীদের চারণক্ষেত্র—এ ধারণাটি ঠিক নয় আর “চলতি সত্যতার আলোকে এর কোনো ভিত্তি নেই।” তারা সঠিকভাবেই উল্লেখ করেছে: “নোয়াখালীবাসীদের সচলতার ঐতিহ্য রয়েছে।
ফলে সেটি তাদেরকে চারধারের বিশ্ব সম্পর্কে অধিকতর সচেতন ও রাজনীতি সচেতন করেছে।” এও উল্লেখ করা হয় যে, হাতে গোনা যে ক’জন মৌলিক গণতন্ত্রী ১৯৬০-এ প্রেসিডেন্ট পদে অনুমোদনদানে আইয়ুবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠই নোয়াখালীর বিডি। আর নোয়াখালীর এই মৌলিক গণতন্ত্রীরাই ১৯৬৫ সালে প্রায় একাট্টা হয়েই মিস জিন্নাহকে ভোট দেয় । আর আইয়ুবশাহী আমলে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বিরোধীদলীয় এমএনএ ও এমপিএ’ও আসেন এই জেলা থেকেই ।৭৭ নোয়াখালী জেলায় আওয়ামী লীগ মোট ৮০.২৯ শতাংশ ভোট পায়। আওয়ামী লীগের ২৬ জন প্রতিপক্ষের ২০ জনই তাদের জামানত হারায় । জামায়াত-ই-ইসলামী জেলার আটটি আসনের পাঁচটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং ভোট পায় ৮.৫৩ শতাংশ।
উল্লিখিত দুটি জরিপের ফলাফল ধরে নেওয়া যেতে পারে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জেলাভিত্তিক কেস সমীক্ষা। এই দুই জেলায় আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনের বিষয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষকের চোখে ধরা পড়ে আর নির্বাচনের ফলে বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সমীক্ষকদের মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। এ কারণে মনে হয় আওয়ামী লীগে আত্মবিশ্বাসের ভালো রকমের ভিত্তি ছিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০ আসনে জয়ী হয় ।
বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নাও পেতে পারে। কিন্তু ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আসন জয়ে আওয়ামী লীগের অসাধারণ সাফল্য প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হারে আরো মজবুত হয়ে ওঠে। জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের ১৬২ জন প্রার্থী ছিল প্রদেশে ঐ সব আসনের মোট প্রার্থী সংখ্যার ২০.৭৪ শতাংশ। আর প্রদেশে জাতীয় পরিষদের আসনগুলিতে মোট যে বৈধ ভোট পড়ে তার ৭৫.১১ শতাংশ পায় এই দলের প্রার্থীরা। ৮০ কোনো রকমের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি । অর্থাৎ প্রতিপক্ষের সাথে ভোটের ব্যবধান ছিল অনেক।
আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য বিরোধী শিবিরের দলগুলিতে তীব্র মতানৈক্য ছিল। ফলত জাতীয় পরিষদের ৮২ শতাংশ আসনের প্রতিটিতে তিনের বেশি প্রার্থী এবং ৫৫ শতাংশ। আসনে চারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। অবশ্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত সত্যও এই যে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও তাতে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সাফল্য খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতো না ।
আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিয়ে (বাতিলকৃত দুই শতাংশ ভোটের পছন্দ-অপছন্দ অজ্ঞাত থাকায়) ভোটারদের তিন-চতুর্থাংশ ঘোর ধর্মবাদী ও ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদীদেরকে এবং সেই সাথে বামপন্থীদেরও প্রত্যাখ্যান করেছে। অবশ্য প্রদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে আওয়ামী লীগের নয় এমন ভোটগুলি বিলিবণ্টন বা ভাগবাটোয়ারা কেমন তার একটা চিত্র কৌতূহলোদ্দীপক।
বণ্টনের ধারাবিন্যাসে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের স্বকীয় আবেদন সম্ভবত সকল আঞ্চলিক ও লোকালয়গত প্রতিবন্ধকতা ছাড়িয়ে উত্তরিত হয় শুধু ব্যতিক্রম কিছু ক্ষেত্র ছাড়া। আর প্রদেশে আওয়ামী লীগ সমর্থক নয় এমন কোনো তাৎপর্যময় এলাকাবিশেষও চিহ্নিত করা যায়নি ।
প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্তির পরিসর ও ব্যাপ্তি আওয়ামী লীগ সমর্থক নয় এমন শক্তিগুলির দুর্বলতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে আরো প্রকট ও নগ্ন করে তুলেছে। আনুমানিক ৬৬ শতাংশ প্রার্থী তাঁদের জামানত খুইয়েছেন। জামানত সবচেয়ে বেশি বাজেয়াপ্ত হয়েছে পিএমএল (কাইয়ুম)-এর, তারপরেই কাছাকাছি রয়েছে পিএমএল (কনভেনশন) ও প্রগ্রেসিভ ন্যাশনাল লীগ (পিএনএল)। যে সব দল জামানত হারিয়েছেন তাদের মধ্যে সবেচেয় কম ক্ষতিগ্রস্ত দল হলো জামায়াত- ই-ইসলামী ।
বিষয়টি অধিকতর তাৎপর্যের দাবিদার কেননা, দলীয় জামানত হারানোর হার পশ্চিম পাকিস্তানে—এ দলটির একান্ত ভুবন পাঞ্জাবে অনেক বেশি। পাঞ্জাবে জামায়ত- ই-ইসলামী ৭৯.৪৫ শতাংশ আসনে জামানত হারায়। সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে জামানত হারানোর এই শতকরা হার যথাক্রমে ছিল ৫২.৬৩, ১০০ ও ৮০ শতাংশ |
তবে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াত-ই-ইসলামীর প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ হারের বণ্টন থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, কোনো কোনো পকেট এলাকায় জামায়াত- ই-ইসলামীর কিছু কট্টর সমর্থক সমাবেশ ছিল। সেখানে তারা অন্যান্য ডানপন্থী কিংবা রক্ষণশীল দলের অনিশ্চিত সমর্থক ঘাঁটি বা বুনিয়াদের তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রবল চাপের মোকাবেলায় সমর্থ হলেও প্রদেশে তাদের সামগ্রিক নির্বাচনী মদদের শক্তি খুবই সীমিত। তারা মোট ভোটের যে শতাংশ (৬.০৭%) পেতে সক্ষম হয়েছে বলে দেখা গেছে তাতেই তা প্রমাণিত হয়েছে।
জামানত হারানোর আলোকে পূর্ব পাকিস্তানে অন্যান্য আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের তুলনায় জামায়াত-ই-ইসলামীর ভালো অবস্থার বিবেচনায় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় এই দলের প্রার্থী বণ্টনের ধারাবিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমের জেলাগুলিতে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলির তুলনায় জামায়াতের তুলনামূলক বেশি সমর্থকের সমাবেশ রয়েছে।
যে সব জেলা থেকে জামায়াত ৭০ শতাংশেরও বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম ছিল সে জেলাগুলি হলো: দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা ও কুষ্টিয়া। যে জেলাগুলিতে জামায়াতের ২০ জন প্রার্থী ২০ শতাংশেরও বেশি ভোট পায় সেই জেলাগুলি হলো: রংপুর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, যশোর ও খুলনা।
পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনী ফল পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী ফলেও পরিষ্কার প্রতিফলিত হয়। আর সেই সুবাদে আওয়ামী লীগের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সমর্থনের বিষয়টিও পুনঃপ্রমাণিত হয়। যদিও আওয়ামী লীগ বহির্ভূত দলগুলি প্রাদেশিক পরিষদের জন্য অপেক্ষাকৃত অধিক হারে প্রার্থী মনোনয়ন করে তথাপি তাদের নির্বাচনী ফলাফল ছিল হতাশাব্যঞ্জক ।
জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আওয়ামী লীগ স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রে সরকার গঠনের অধিকার অর্জন করে। অবশ্য, জাতীয় পরিষদে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন ছিল একান্তই আঞ্চলিক কেননা, এ দল পশ্চিম পাকিস্তানে এমনকি একটি আসনও পায়নি যদিও আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে নামেমাত্র হলেও আটটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। এটি আবারও আওয়ামী লীগের একান্তই আঞ্চলিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করেছে।
এ ছাড়াও, পূর্বাঞ্চলের কোনো বিশিষ্ট আওয়ামী লীগারই, এমনকি, প্রতীকী অভিব্যক্তি হিসেবেও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এতে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের আদৌ আস্থাযোগ্যতা নেই— কেবল এ কথাই প্রমাণিত হয়নি বরং এ ধরনের প্রয়াস নিষ্ফল হবে বলে আওয়ামী লীগের যে পূর্বাহ্ণেই জানা ছিল সে কথাও প্রকাশ পেয়েছে।
এদিকে, পূর্ব পাকিস্তানে পিপিপির পরিপূর্ণ অনুপস্থিতি এ সবের সাথে যোগ হওয়ায় এ বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে যে, পাকিস্তানী জনসমাজে সংহতি বিধায়ক রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব ছিল না। ফলে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তার স্বকীয় স্ববিরোধিতারই শিকার হয়েছে।
ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ সর্বাত্মক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে—এটি শাসকগোষ্ঠী কল্পনা করতে পারেননি। আর তার ফলে একটা অচলাবস্থা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে তার ছয়-দফা কর্মসূচির জন্য গণভোট বা রায় হিসেবে কাজে লাগায় ।
এ দল বারংবার ঘোষণা করেছে যে, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পক্ষে জনগণের অনুকূল রায় পাওয়ার পরেও যদি নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় তা বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হয়, তাহলে জনগণ নিয়মবহির্ভূত পন্থায় এই সংঘাতের বা বিরোধের নিরসন করবে। নির্বাচনের পর পেছনে ফেরার পথও ছিল না। বাস্তবিকপক্ষেও, “আওয়ামী লীগ জনগণের পক্ষ থেকে যে বিপুল ম্যান্ডেট পায় সেই সমর্থনই দলের ছয়-দফা কর্মসূচিকে পূর্ব বাংলার ন্যূনতম দাবি করে তোলে যা নিয়ে কোনো আপোসরফার বা দরকষাকষির অবকাশ নেই ।”
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 3 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2007/01/আওয়ামী-লীগ01.jpg)
আওয়ামী লীগের এই অবস্থান ছিল মি. জিন্নাহ্র সেই বিখ্যাত ঘোষণার অনুরূপ যে ঘোষণায় তিনি বলেছিলেন, (অবিভক্ত) ভারতের মুসলমানরা যদি নিজেদেরকে ‘জাতি’ ভাবে ও ‘সংখ্যালঘু’ মনে না করে তাহলে তাদের উচিত হবে তাদের নিজেদের জন্য এক স্বদেশভূমি হাসিলে যে কোনো আত্মত্যাগের জন্য তৈরি থাকা।
পরবর্তীকালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ পাকিস্তান ইস্যুকে ভিত্তি করে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে লড়ে। ১ এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ জেতার ফলে শুধু সকল বিরোধিতাই স্তব্ধ হয়নি বরং মুসলিম লীগ “প্রত্যক্ষ সংগ্রামের” প্রস্তাব গ্রহণ করে (অবিভক্ত ভারতের) মুসলমান জনসাধারণের মেজাজের শরিক হয় । একইভাবে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিজস্ব শৈলীতে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগকেও পূর্ব পাকিস্তানীদের রায় মেনে চলতে হয়। এ থেকে তার কোনো বিচ্যুতিতে প্রদেশের জনগণ তাদের আস্থা প্রত্যাহার করতে পারতো। উল্লেখযোগ্য যে, ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানকে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ বলেই উল্লেখ করতো ।
![সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩ [ ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ এর আওয়ামী লীগের ইতিহাস ] 1 সাধারণ নির্বাচন পর্ব-৩](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/04/সাধারণ-নির্বাচন-পর্ব-৩.png)