দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত আওয়ামী লীগ

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত আওয়ামী লীগ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত আওয়ামী লীগ

 

দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত আওয়ামী লীগ

 

আজ এই মহান সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসের কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন বোধ করছি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সুদীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে ধাপে ধাপে একটি জাতিকে কিভাবে স্বাধীনতার দিকে টেনে এনেছিল তা ইতিহাসের এক অমর অধ্যায়। এ প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে হাজার হাজার কর্মী তাদের জীবনের স্বপ্নময় দিনগুলি বিসর্জন দিয়েছে- কারাপ্রাচীরের অন্তরালে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে— কত সোনার সংসার বিরাণ হয়েছে, তার হিসেব নেই।

কিন্তু আওয়ামী লীগের সংগ্রামী কাফেলার বিরামহীন যাত্রায় ছেদ পড়ে নাই। ১৯৪৯ সালে এদেশের মানুষের বাঁচার অধিকার, কথা বলার অধিকার, এবং প্রাসাদচক্রের কুটিল আবর্ত হতে রাজনীতিকে গণমুখী করার প্রত্যয় নিয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। জন্মলগ্ন হতেই তদানীন্তন বিদেশী শাসক পাকিস্তানীরা এর কর্মীদের উপর নির্যাতন শুরু করে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য প্রথম ঝুঁকি আসে আওয়ামী লীগের উপর। হাজার হাজার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

তখন এমন কোন রাজনৈতিক দল ছিল না যে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে এদেশের এ সংগ্রামী ছাত্রসমাজের পেছনে কাতারবন্দী হবে। আওয়ামী লীগ এবং একক আওয়ামী লীগই সেই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নির্যাতিত বাংগালীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৪ সালে নির্বাচন বিজয়ের পরও পাকিস্তানীদের অত্যাচার ছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের উপর। ১৯৫৪ সালে ৯২(ক) ধারা জারি করে শেরে-বাংলার মত শ্রদ্ধেয় নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ৫০ জন এমএলএ-কে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে নিয়ে যাওয়া হয়। তৎকালে বঙ্গবন্ধুও মন্ত্রী ছিলেন।

সেই অবস্থাতেই তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৮ সালে এদেশের উপর সামরিক শাসন জারী করা হয়। আওয়ামী লীগকে বেআইনী ঘোষণা করে আওয়ামী লীগের সকল কার্যালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তাঁরা দলীয় কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলে। আসবাবপত্র সকল দখল করে নেয়। শত শত কর্মীকে বন্দী করে মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দেয়। ১৯৬২ সালে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুসহ হাজার হাজার নেতা ও কর্মীকে পুনরায় কারাগারে আটক করে।

১৯৬৩ সালে ৫ই ডিসেম্বর কারা নির্যাতনের অবর্ণনীয় দুঃখে জর্জরিত প্রিয়নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতের হোটেলে নিঃসংগভাবে প্রাণত্যাগ করেন। ১৯৬৪ সালে দল পুনরুজ্জীবিত করে আবার সংগ্রাম শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচী গ্রহণ করে। ১৯৬৬ সালে স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের পক্ষ হতে জাতির কাছে ৬-দফা পেশ করেন। ৬-দফা দেবার পর শাসককূল সেদিন প্রমাদ গুণেছিল।

বঙ্গবন্ধু যেমন জানতেন স্বাধীনতার প্রথম ডাক ৬-দফা তেমনি সেদিন পাকিস্তানীরাও বুঝতে পেরেছিল। তাই সেদিন অত্যাচারের ষ্টীমরোলার চালিয়েছিল আওয়ামী লীগের কর্মী ও নেতাদের উপর। ৬-দফার সমর্থনে বাংলার জনগণ ১৯৬৬ সালে ৭ই জুন বাংলার বন্দ ঘোষণা করেছিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা গুলি চালিয়ে মনু মিঞা সহ প্রায় শতাধিক লোক হত্যা করে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জনাব তাজুদ্দীন আহমেদ, জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদ, জনাব এম, মনসুর আলী, জনাব শেখ আবদুল আজিজ, চট্টগ্রামের মরহুম এম, এ, আজিজ, জনাব মোল্লা জালালউদ্দিন, জনাব শামসুল হক, জনাব আবদুল মোমেন, জনাব দেওয়ান ফরিদ গাজী, জনাব বজলুর রহমান, মরহুম আমজাদ হোসেন, জনাব শাহ মোহাজ্জেম হোসেন, জনাব মোহাম্মদউল্লাহ, রাজশাহীর জনাব মজিবর রহমান, জনাব শেখ ফজলুল হক মনি, জনাব কে, এম, ওবায়দুর রহমান, জনাব আবদুর রাজ্জাক, জনাব শামসুদ্দোহা, চট্টগ্রামের জনাব আবদুল মান্নান, শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুল মান্নান এবং ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মানিক ভাইসহ শত শত আওয়ামী লীগের কর্মীকে বন্দী করা হয়।

এরপর সর্বদলীয় ছাত্র- সংগ্রাম পরিষদের ডাকে এবং আওয়ামী লীগের সমর্থনে ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলা প্রত্যাহার এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তি দাবীতে তথা ছ-দফা সম্বলিত এগার-দফা আদায়ের জন্য নজীরবিহীন উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শাসককূল নতি স্বীকার করে। আগরতলা মামলার পর গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীদের ফর্মুলা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ গ্রহণ করেন।

‘৭০-এর নির্বাচনে বাংগালী জাতির বিজয় ঘোষিত হলেও ষড়যন্ত্র শেষ হলো না। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে বাংগালীদের উপর চরম আঘাত হানার জন্য নানা টালবাহানা করছিল। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিলেন। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে তিনি ডাক দিলেন,

“ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল!যার যা আছে তাই নিয়ে তৈরী হয়ে যাও! এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

২৫শে মার্চ পশ্চিমা সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লো এদেশের নিরীহ মানুষের উপর। ঐদিন রাত ১২টায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এবং চট্টগ্রাম বেতার থেকে তা প্রচারিত হয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে। সে রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ফাঁসি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

 

দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত আওয়ামী লীগ

 

এরপর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ও ঘোষণা অনুযায়ী ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জনাব তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদ, জনাব এম, মনসুর আলী, জনাব এইচ, এম, কামারুজ্জামানকে মন্ত্রিসভার সদস্য করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। তাঁরাই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

এই সময়ে আমাদের মুক্তি সংগ্রামে এবং স্বাধীনতাত্তোরকালে ভারত সরকার বিশেষভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আমাদেরকে যে সাহায্য ও সহায়তা দিয়েছেন তা আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। ১৬ই ডিসেম্বর পরাজিত পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করলো, ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলেন।এ সুদীর্ঘ সংগ্রাম এককভাবে আওয়ামী লীগকেই পরিচালনা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসাবে বাংলার জনগণের সমর্থন নিয়ে এত দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহ্যমণ্ডিত দল আর এদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করে নাই ।

Leave a Comment