দলীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –দলীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

দলীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন

 

দলীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন

 

সাধারণ নির্বাচনের পর পর ১৯শে মার্চ ১৯৭৩ সালে সাংগঠনিক কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্য মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গুপ্তহত্যা প্রভৃতির উপর বিষদ আলোচনা করা হয় এবং প্রস্তাবাবলী গ্রহণ করা হয়। এ বৈঠকেই দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে,

(ক) ৩১শে মার্চ পর্যন্ত প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ অভিযান।

(খ) ১০ই মে পর্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচন।

(গ) ৩১শে মে থানা পর্যায়ের নির্বাচন

(ঘ) ৩১শে জুন জেলা পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভায় যোগদান করতে হবে।

কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল বহু জেলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দলীয় নির্বাচন সমাপ্ত করতে অসমর্থ হলো। দিন পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ এলো বিভিন্ন জেলা থেকে। পরবর্তীকালে সারা দেশে রাজনৈতিক ক্রিয়া কর্মের উৎস নিম্ন পর্যায়ের সকল ইউনিটে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য পর পর দু’বার কাউন্সিল সভার দিন পরিবর্তন করা হয়।

মাননীয় কাউন্সিলার ও ডেলিগেট বন্ধুগণ জাতীয় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যার আলোকে এই দিন পরিবর্তন সহানুভূতিশীল দৃষ্টি নিয়ে বিচার করবেন এ আশাই আমি করবো। এ ছাড়াও আমরা যখন দলীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন জেলায় সফররত ঠিক এমনি সময়ে বাংলাদেশের ছ’টি আসনে উপ-নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলো। স্বাভাবিক ভাবেই উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের তৎপরতা কেন্দ্রীভূত হলো নির্বাচনী এলাকাগুলোতে।

উপ-নির্বাচনের এলাকাগুলো হলো বঙ্গবন্ধুর তিনটি শূন্য আসন যথাক্রমে ঢাকা, ফরিদপুর এবং বরিশালে, অনুরূপভাবে সিলেটের দুইটি শূন্য আসন এবং রাজশাহীতে জনাব এ, এইচ, এম, কামারুজ্জামানের শূন্য আসন। এই উপ-নির্বাচনে সাংগঠনিক শক্তি নিয়োগ করতে হয় সঙ্গত কারণেই। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে এ এলাকাগুলোতে নির্বাচনী তৎপরতা চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমি নিজে সিলেটের কুলাউড়া আসনে প্রচারণা চালাই।

 

আমার সঙ্গে উক্ত এলাকায় ছিলেন সংগঠনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব মুস্তফা সারওয়ার, ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের সদস্য জনাব ফজলুল হক ভূঁইয়া প্রমুখ সহকর্মীবৃন্দ। প্রায় কুড়ি দিন ধরে সেখানে নির্বাচনী কাজ করি। অপর পক্ষে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক জনাব আবদুর রাজ্জাক নড়িয়া নির্বাচনের প্রথম থেকে শেষ অবধি কাজ করেন। নড়িয়া নির্বাচনী এলাকায় প্রথম সহ-সভাপতি জনাব কোরবান আলীও নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দিয়ে শক্তিশালীভাবে আমরা প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করি।

উপ-নির্বাচন চলাকালীন সময়ে আমাদের বিভিন্ন জেলায় সাংগঠনিক কাজ চলছিলো পুরোদমে। আমাদের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সভার দিন পরিবর্তিত হলেও আমাদের নিম্ন পর্যায়ের ইউনিটগুলির কাজ পুরোদমে অগ্রসর হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তব্য হিসেবে সকল সময়ই এসব সাংগঠনিক কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করেছি। মার্চ ১৯৭৩ হতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ছিল দলীয় নির্বাচনের সময় ।

থানা থেকে জেলা পর্যন্ত এ সময় দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বস্তুতঃ মার্চ মাসে যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রথম তারিখ ঘোষিত হয় এরপর হতে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য সাড়া পড়ে। চরম বাধাবিপত্তি, গুপ্তহত্যা, দ্রব্য- মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার তাণ্ডবলীলা প্রভৃতি সমস্যাগুলি মাথায় নিয়ে আমাদের নিঃ পর্যায়ের নির্বাচন করতে হয়েছে।

জাতীয় সমস্যার জটিলতায় আমাদের কর্মীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় নিঃসন্দেহে। তবুও বার বার কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির পক্ষ থেকে পরিপত্রের মাধ্যমে কমিটি গঠনের জন্য অনুরোধ জানাই। তাই সমস্যার মধ্যেও আমাদের জেলা ও থানা নেতৃবৃন্দের এবং সহকর্মীদের আপ্রাণ চেষ্টায় ও সহযোগিতায় আমরা সকল জিলার নির্বাচন সম্পন্ন করে আজ আপনাদের সাথে এই কাউন্সিল সভায় মিলিত হয়েছি।

এ নির্বাচন অনুষ্ঠান কালে আমরা সারা বাংলাদেশে ব্যাপক সাংগঠনিক সফরে বেরিয়ে যাই। জুলাই এবং আগস্ট দুইমাস সকল সময়ে এমনকি প্রতিদিন বাংলাদেশের যে কোন জেলায় আমাদের সফরসূচী থাকে। এ নির্বাচন কালকে সার্থক করার হয়। বিশেষ করে এ সময় বিভাগীয় দায়িত্ব হিসাবে সাংগঠনিক সম্পাদক দীর্ঘ সফরে থাকেন। আমি নিজেও জেলা কাউন্সিল সভাগুলিতে যোগ দিই। বাংলাদেশের সব জেলাতেই নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে এলো।

কিন্তু কয়েকটি জেলা সম্মেলনে দুটি করে কার্যকরী সংস্থা গঠিত হয়। কাউন্সিল সভায় এ জেলাগুলি ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। তাই কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির ১৩-৯-৭৩ তারিখের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এ ট্রাইব্যুনাল সংগঠনের প্রথম সহ-সভাপতি জনাব কোরবান আলীর নেতৃত্বে জনাব আবদুর রাজ্জাক, জনাব খোন্দকার ওবায়দুর রহমান, জনাব সালাহউদ্দিন ইউসুফ, জনাব নূরুল হক এবং আমি নিজে সদস্য ছিলাম।

 

দলীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচন

 

আমরা গত ১৬- ২১শে সেপ্টেম্বর (১৯৭৩) পর্যন্ত বিবদমান পক্ষগুলির বক্তব্য শোনার পর উভয় পক্ষের গ্রহণযোগ্য একটি সম্মত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সমস্যা সমাধান করেছি। এভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল সভার পূর্বাহ্নে বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান করা হয়। এতে আমরা অনেক সময় সহকারী বন্ধুদের প্রতি হয়তো সম-পরিমাণ সুবিচার প্রদান করতে পারিনি, হয়তো বা কাউকে আহতও করেছি। যতটুকু করেছি সংগঠনের মঙ্গলের জন্য। সহকর্মী বন্ধুরা এ সত্য অবশ্যই উপলব্ধি করেছেন। বর্তমানে আমরা ঊনষাটটি থানার নির্বাচন সম্পন্ন করেছি।

Leave a Comment