আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –অর্থনৈতিক-আদর্শসমূহ। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
অর্থনৈতিক-আদর্শসমূহ

আমাদের অর্থনৈতিক আদর্শ এক শোষণমুক্ত ও উন্নত সমাজ-ব্যবস্থা কায়েম করা। সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন অর্জনের জন্য সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করার জন্য আমরা দেশের নিকট প্রতিশ্রতিবদ্ধ।
দেশে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকল্পে সেই সমাজ-ব্যবস্থা কায়েম করা আমাদের লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা আচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া আমাদেরকে গঠনমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করিতে হইবে। আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা এবং জনসম্পদ ও অর্থসম্পদের প্রতি লক্ষ রাখিয়া সমাজ-ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করিতে হইবে।
আমাদের দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাইতেছে, কিন্তু তদনুপাতে সম্পদের নিতান্তই অভাব। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা আমাদের অবশ্যকরণীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আমরা বিশ্বাস করি যে, দেশের জনসাধারণকে ত্যাগের মনোভাব নিয়া গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগের জন্য উদ্বুদ্ধ করিতে পারিলে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হইবে।
দেশের সঠিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য আমরা সকলকে আহ্বান জানাই। সেই সঙ্গে আমরা এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, জনগণের ত্যাগ ব্যর্থ হইবে না এবং তাঁহারা সকলেই উন্নত অর্থনৈতিক জীবন যাপন করিতে সক্ষম হইবেন। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ইহা সম্ভব হইবে।
জাতীয়করণ ও সরকারী নিয়ন্ত্রণ
সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হইবে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসমূহকে ভারী বৃহৎ শিল্প যথা-
লৌহ, ইস্পাত, ধাতু, খনিজ, বিদ্যুৎ প্রভৃতি শিল্প ও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং পাট, বস্ত্রশিল্প, চিনিশিল্প ও পরিবহনের একটি বৃহৎ অংশ ইতিমধ্যেই জাতীয়করণ করা হইয়াছে। আমরা প্রতিশ্রতি দিতেছি যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন হইলে ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানও জাতীয়করণ করা হইবে।
সরকারী নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন শিল্পকে অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও অন্যান্য ক্ষতিকর কার্যকলাপ হইতে মুক্ত করিয়া দক্ষতার সহিত পরিচালনার ব্যবস্থা পিরিতে হইবে। সেই উদ্দেশ্যে সকল শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বভার দক্ষ ও উপযুক্ত শিক্ষাপ্রাপ্ত কর্মচারীদের হতে অর্পণ করিতে হইবে। সেই সমস্ত কর্মচারীকে শিক্ষাদানের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা আমাদের আস্ত লক্ষ্য।
আয়কর ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন
সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েমের জন্য আমাদের আয়কর ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন সাধন করা প্রয়োজন। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে পর্বত প্রমাণ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সম্পত্তি হইতে বিনা পরিশ্রমে কত আয় হ্রাস করা, বিলাস দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করা।
সাধারণ মানুষের উপর আরোপিত বিপুল পরোক্ষ কর ভার লাঘব করার জন্য আমাদের আয়কর ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন সাধন করিতে হইবে। আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে সকল বকেয়া খাজনাসহ কৃষকের পঁচিশ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা ইতিমধ্যেই মওকুফ করা হইয়াছে।

দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ ও মূল্যের স্থিতিশীলতা
জনসাধারণকে ন্যায্যমূল্যে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা এবং মূল্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। সেই উদ্দেশ্যে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিপুল পরিমাণে মওজুদ এবং ন্যায্যমূল্যে সেই সমস্ত দ্রব্য জনসাধারণের নিকট সরবরাহের ব্যবস্থা করিতে হইবে।
সেই জন্য ব্যাপকভাবে মওজুদ ও সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রতিটি ইউনিয়নে সমবায় ভিত্তিতে ন্যায্য মূল্যের দোকান স্থাপন করিয়া জনসাধারণের নিকট বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করিতে হইবে। এই পরিকল্পনার অধীনে চাউল, গম, লবণ, কেরোসিন, ভোজ্য-তৈল, সাবান ও মোটা সুতীবস্ত্র জনসাধারণের মধ্যে সরবরাহ করিতে হইবে।
