আমাদের আজকের আলোচনা বিষয়-সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট-ভূমিকা। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট-ভূমিকা
![সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট - ভূমিকা [ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ] 2 সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট-ভূমিকা](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2015/01/মুক্তিযুদ্ধোত্তর-বঙ্গবন্ধুর-সরকার-ও-জাতীয়-পুনর্গঠন-3.jpg)
জনাব সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সংগ্রামী কাউন্সিলর ভাই ও বোনেরা। আপনারা আমার সালাম ও আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন। চলতি বছরের ৩রা, ৪ঠা ও ৫ই মার্চ জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে আমরা একত্রিত হয়েছিলাম। ঠিক করে নিয়েছিলাম আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা।
কিন্তু বর্তমানে দেশ ও জাতি এক চরম সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে নিমজ্জিত যে, ত্রিশ লক্ষ শহীদের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ও একটি সর্বাত্মক জাতীয় সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের কাছে বিকিয়ে দেয়ার এক ভয়ঙ্কর হীন চক্রান্ত চলছে।
ঠিক তেমনি সময়ে আমরা আবার অন্তর্বর্তীকালীন এই বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে মিলিত হচ্ছি। দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই কাউন্সিল অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সবিশেষ অর্থবহ। এবারের এই কাউন্সিল অধিবেশনে আপনাদের এমন কয়েকটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে, যা দেশ এবং জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যে এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত করবে।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
আপনারা জানেন যে, দেশ ও জাতির এক নিদারুণ সংকটকালে আমরা এই বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে একত্রিত হচ্ছি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গোটা জাতি আজ সার্বিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। দেশের কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষ তথা আপামর জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত।
এহেন একটি জাতীয় বিপর্যয়ের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে দেশের স্বাধীনতা আনয়নকারী ও দুঃখী মানুষের বাঁচার সংগ্রামে আজীবন নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে অবশ্যই বাস্তবভিত্তিক সঠিক ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই এই রিপোর্টে আমি আমাদের এই প্রাণপ্রিয় সংগঠনের অতীতের বিরাট, ঐতিহাসিক ও সংগ্রামী ঐতিহ্যের বিস্তৃত ইতিহাস আর বিবৃত করলাম না। তবে অতীত দিনের রাজনৈতিক ও অন্যান্য আন্দোলন সংগ্রাম সমূহের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।
আপনারা জানেন, বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে একটি নিরেট সাম্প্রদায়িক চেতনার বশবর্তী হয়েই দ্বি- জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে একদা পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিলো। সেই স্বাধীনতায় একটি রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকলেও পরবর্তীকালে প্রতীয়মাণ হয় যে, তা দেশে কৃষক শ্রমিক, মেহনতি মানুষ তথা আপামর জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিকাশের কোন দিক-নির্দেশ দানে ব্যর্থ।
সেই পটভূমিতে এবং ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত সাধারণ মানুষকে রক্ষার জন্য ১৯৪৯ সালে এদেশের নবীন প্রতিশ্রুতিশীল ও প্রবীণ প্রগতিশীলদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের জন্ম। সেই জন্মলগ্ন থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত ভাষা আন্দোলনই প্রথম বাঙালী জাতি এবং বাঙালীর পরেই পাকিস্তানী নেতৃত্ব ও শাসক শ্রেণীর নগ্নস্বরূপ প্রকাশের সংগে সংগে তার হিংস্র ছোবল থেকে দেশের দ্বীন-দুঃখী সচেতন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ধমনীতে নতুন করে সাড়া জাগালো।
বস্তুতঃ তা থেকেই বাঙালী জাতীয়তার নবতম বিকাশ ঘটে এবং তা একটি সঠিক ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথে মোড় নিতে থাকে ধাপে ধাপে। এই সময় আওয়ামী লীগেও নেতৃত্বের বলিষ্ঠতা বিকাশ লাভ করতে থাকে এবং তা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে আজকের এই স্বাধীনতার পথে এগুতে থাকে।
অবশ্য এই পথে চলতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে যেমন বেশ কিছু ঐতিহাসিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে, তেমনিভাবে বহু নির্যাতন ও নিষ্পেষণের শিকারেও পরিণত হতে হয়েছে। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করে।
সারা দেশবাসীর কাছে এই সময় আওয়ামী লীগ বাঙালী জাতিসত্তার রাজনৈতিক গতিধারার নিয়ন্ত্রক হিসাবেই সুপরিচিত হয়ে ওঠে। আর ঠিক সেই সময়েই পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রকারী নেতৃত্ব শাসকশ্রেণী তাদের স্বৈররূপের নগ্ন প্রকাশ ঘটিয়ে বিভিন্ন প্রকারের নিবর্তন, নির্যাতন ও নিষ্পেষণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে থাকে।
আসলে জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী লীগ তাদের মনে দারুণ শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল। তাই পরবর্তীকালে তারা তাদের রাজনৈতিক প্রভুত্ব ও অর্থনৈতিক শোষণের স্বার্থ রক্ষার উদগ্র বাসনায় সামরিক ও বেসামরিক ব্যুরোক্রেসির চিরাচরিত নিবর্তনমূলক পথে অগ্রসর হতে থাকে।
যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দিয়ে ৯২-ক ধারা জারী শাসনতন্ত্র বাতিল, সামরিক আইন জারী, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং তার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা ও কর্মী এবং বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনাসম্পন্ন কর্মীদের গ্রেফতার সেই স্বৈররূপেরই নগ্ন প্রকাশ।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
আপনাদের নিশ্চয় স্মরণ আছে যে, বাঙালী জাতি ও জাতীয়তাবাদের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বার বার বলেছিলেন যে, একটি অব্যাহত ও ধারাবাহিক আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে আমরা গোটা জাতিকে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে পরিচালিত করেছিলাম।
বস্তুতঃ সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক জাতীয়বাদী সংগ্রামের সেটাই রাজনৈতিক চরিত্র। নইলে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম উগ্রপথে পরিচালিত হয়ে ফ্যাসিবাদী আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম যোগ্যতা এবং বিরল রাজনৈতিক নেতৃত্বে আমাদের এই ঐতিহাসিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রগতিশীল আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে।
অথচ সেদিন যেমন একদিকে ছিলো পাকিস্তানী সাম্প্রদায়িকতা ও উপনিবেশবাদী প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, আমলাতন্ত্র, সামরিকজান্তা, সামন্ত শ্রেণী ও পুঁজিপতি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ও নির্যাতন, তেমনিভাবে এদেশের ও একদল উগ্র সাম্প্রদায়িক ও উগ্র বামপন্থী নেতৃত্ব সেই জাতীয়তাবাদী চেতনার অভিযাত্রায় বার বার বাধা দান করতে চেয়েছিলো তাদের নাশকতামূলক তৎপরতার মাধ্যমে কখনো বা বিচ্ছিন্নভাবে আবার কখনো বা ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে আঁতাত করে। কিন্তু সে সব সকল পর্বত প্রমাণ বাধা-বিঘ্নকে অতিক্রম করে আমাদের জাতীয় সত্তা দেশের সাধারণ মানুষের সুদৃঢ় ঐক্য ও লক্ষ্যের পথে এগিয়ে গিয়েছিলো স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের উত্তরণ ঘটিয়ে স্বাধীনতার পথে।
বস্তুতঃ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, তেপ্পান্নর শাসনতন্ত্র কমিশনের আন্দোলন, চুয়ান্নর সাধারণ নির্বাচন, পঞ্চান্ন ছাপ্পান্নর ৯২-ক ধারা ও তার বিরোধী আন্দোলন, আটান্নর সামরিক শাসন, বাষট্টির শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, তেষট্টির জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন, চৌষট্টির সমাবর্তন বিরোধী আন্দোলন ও কুচক্রী মহলের ভ্রকুটি অগ্রাহ্য করে।
সংগঠনের পুনরুজ্জীবন, ছেষট্টির ঐতিহাসিক ৬-দফা সংগ্রাম আষট্টির আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী সংগ্রাম ঊনসত্তরের ঐতিহাসিক ১১-দফার সংগ্রাম ও জাতীয় গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয় সেই স্বাধীকার ও স্বাধীনতার চেতনাকে ক্রমাগতভাবে সুদৃঢ় করেছে চূড়ান্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ।
পরিচালনার পথে এবং এই সব আন্দোলন সংগ্রামে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু নিজে কখনো স্বয়ং উপস্থিত থেকে কখনো বা সঠিক কর্মসূচী ঘোষণার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সংগঠনের পক্ষ থেকেই। আর জাতির জনকের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সব অব্যাহত ও ধারাবাহিক আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমেই বাঙালী জাতীয়তাবাদ আমাদের এই বাংলাদেশের বুকে পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে।
তারই ফলশ্রুতিতে সত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনের রায় বিজয়াকে নস্যাৎ করার জন্য যখন পাকিস্তানী চক্রান্তের রাজনীতি মরিয়া হয়ে ওঠে, তার বিরুদ্ধে বিশ্ব-ইতিহাসে তুলনাহীন সাফল্য লাভকারী অসহযোগ আন্দোলন এবং একাত্তরের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ মাস স্থায়ী সার্বিক সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে অর্জিত জাতীয় রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মুক্তি বিশ্বের মানচিত্রে এই দেশকে একটি দেশ এবং এই জাতিকে একটি জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভের গৌরব দান করে।
এই দেশ ও জাতি সেই গৌরব অর্জন করেছে আমাদের মহান শিক্ষক ও নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক নেতৃত্বে তাঁরই সংগঠন আওয়ামী লীগের পরিচালনায় এই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, চাকুরীজীবী তথা আপামর জনগণের অপূর্ব ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সার্বিক অংশ গ্রহণের মাধ্যমে।
বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ঐতিহাসিক নেতৃত্ব এবং অনবদ্য রাজনৈতিক কৌশল ও সিদ্ধান্ত আজ বিশ্বব্যাপী প্রমাণিত যে, বাঙালী জাতির জীবনে তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি দেশের সকল মানুষের নজীরবিহীন সমর্থন লাভ করে তাদের ঐক্যবদ্ধ চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার। পরেও গোটা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ তাঁর নামেই, তাঁর নির্দেশ মতেই এবং তাঁর লক্ষ্য পথেই পরিচালিত হয়ে সাফল্য অর্জন করেছিলো। মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে এমন নজীর বিরল ।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
আজকের দিনে নিদারুণ মর্মস্তুদ হলেও সত্য যে আট কোটি বাঙালীর মুক্তিদাতা সেই মহান নেতা, আমাদের সেই মহান শিক্ষক বাঙালী জাতি ও জাতীয়তাবাদের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের এদেশীয় পদলেহীদের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়ে অতি নির্মম ও মর্মান্তিকভাবে তাঁর মহাপ্রয়াণ ঘটেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সেই জাতীয় শোকাবহ কালোরাতে হিংস্র হায়নার দল তাঁকে, তাঁর পত্নী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র ও ছাত্রনেতা শেখ কামালুদ্দীন, তার স্ত্রী ও দেশের সেরা মহিলা ক্রীড়াবিদ বেগম সুলতানা কামাল, মধ্যম পুত্র শেখ জামালুদ্দিন, তার স্ত্রী বেগম রোজী জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র ও ৯ বৎসরের শিশু শেখ রাসেল, কনিষ্ট ভ্রাতা শেখ আবু নাসের, প্রগতিশীল কৃষক নেতা ও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য জনাব আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর এক পুত্র ও এক কন্যা, এক ভ্রাতুষ্পুত্র ও এক নাতি এবং এদেশের বিপ্লবী যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর পত্নী বেগম আরজু মনিকে মানব ইতিহাসে বিরল, এমন পৈশাচিকভাবে হত্যা করেছে।
শুধু তাই নয়, এই সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আর সেই ঘৃণ্য খুনীর দল সেই একই হত্যালীলার সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরের আরেক শোকাবহ কালোরাতে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের অভ্যন্তরে হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধুর চারজন যোগ্য উত্তরসূরী আমাদের চারজন প্রাণপ্রিয় নেতাকে।
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে গঠিত বিপ্লবী সরকারের অস্থায়ী প্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদ, বিপ্লবী সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব এম. মনসুর আলী এবং বিপ্লবী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আমাদের সংগঠনের এককালীন সভাপতি জনাব এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান সেদিন নিহত হন।
এই হায়নার দল কেবল এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সারাদেশে সেদিন থেকে তারা আওয়ামী লীগ, হাজার হাজার নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করেছে, সামরিক আদালতে একতরফাভাবে বিচার করে দণ্ড ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের শত শত নেতা ও কর্মীকে হত্যা করেছে এবং দিয়েছে- আজো দিচ্ছে ।
আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা,
কেন এই হত্যাকাণ্ড? কেন আমরা বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের নেতৃবৃন্দকে হারালাম? কেন এমন পৈশাচিকভাবে তাঁদের হত্যা করা হোল? কেন আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতাদের হত্যা করা হোল কারারুদ্ধ করা হোল এবং এখনো হচ্ছে? কেন আমাদের উপর আওয়ামী লীগের উপর এই নির্যাতন? আজ আমাদের সঠিকভাবে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
আসলে সাম্রাজ্যবাদীচক্র তাদের এদেশীয় দোসর এবং সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও চিহ্নিত শরুরা কোনদিনই বাঙালীর জাতিসত্তা, জাতীয়তাবাদী চেতনা জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে মেনে নিতে পারেনি। এখনও পারছে না। এদের কেউ কেউ ধর্মের বুলি আওড়িয়ে আবার কেউবা অতি বিপ্লবী কথাবার্তা বলে বাইরে থেকে আঘাত হানতে চেষ্টা করে, আবার কেউবা সংগঠনের ভেতরে থেকে বন্ধুর ছদ্মবেশে সংগঠন সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার দিকে চালিয়ে নেবার চেষ্টা করে।
তাই আমরা দেখতে পাই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটানোর ও চূড়ান্ত স মুক্তি সংগ্রাম চালানো পর্যন্ত যতগুলো প্রগতিশীল কর্মপন্থা নিয়ে ছিলেন, সব সময়ই কিছু লোক মাথা দিতে চেয়েছে সাবোটাজ করতে চেয়েছে এবং নিজেরা মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করেছে।
এরাই রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনকে ইসলাম বিরোধী বলে ফতোয়া দিয়েছে। ৬-দফার সংগ্রামে সি.আই.এ’র গন্ধ আবিষ্কার করেছে, সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধকে বিদেশের উস্কানীর ফল বলে অবহিত করেছে। বাঙালীর জাতিসত্তাকে দ্বি-জাতিতত্ত্বের নিগড়ে আবদ্ধ করার সচেষ্ট হয়েছে।
এরাই ধর্মকে রাজনীতির সাথে জড়িত করে নিজস্ব স্বার্থ হাসিলের জন্য দুটো মহৎ জিনিষকেই কলুষিত করেছে-স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হয়েছে, আলবদর, রাজাকার, আলশামস ও শান্তি কমিটির দালাল, এরাই মদদ দিয়েছে হানাদার বাহিনীকে এদেশে ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যার দু’লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত নাশের এবং গ্রাম বাংলা জ্বালানো পোড়ানোর এবং এরাই নিজ হাতে হত্যা করেছে এদেশের অসংখ্য মানুষকে। এদের যত আক্রোশ আর জিঘাংসা সহ কিছুই বঙ্গবন্ধু তাঁর আদর্শের অনুসারী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
তাই আমরা দেখতে পাই, ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানী জন্মাদের জিন্দানখানা হতে এসে সদ্য মুক্তি দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করে, তখন থেকেই এরা আবার সঙ্গোপনে তৎপর হতে থাকে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, কল-কারখানা সব ধ্বংস বা লুণ্ঠিত, ব্যাংকের কোষাগার লুণ্ঠিত ও শূন্য, বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ স্বর্ণ সব লুণ্ঠিত, খাদ্যের গুদামগুলো সব শূন্য, রাস্তাঘাট, পুল-ব্রীজ, রেল লাইন বিধ্বস্ত, নদীপথ ও বন্দর সমূহ ডুবন্ত জাহাজ ও মাইনে পূর্ণ, সড়ক, নৌ, রেলপথসহ সব যানবাহন প্রায় বন্ধ। একটি বিমানও নেই-এক যুদ্ধবিধ্বস্ত ভাগাড়ের মত অবস্থা সারাদেশের।
তেমনি অন্যদিকে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সকল কিছুর সদর দফতর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় বিদেশের সাথে যোগাযোগ করাও প্রায় দুরূহ ব্যাপার, তদুপরি দেশত্যাগী এক কোটি মানুষের পুনর্বাসন সমস্যা। অর্থাৎ গোটা দেশ ও জাতিকে নতুন করে পুনর্গঠন-পুনর্নির্মাণ ছাড়া আর কোন পথ নেই। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দক্ষ ও সঠিক লোকের অভাব। বঙ্গবন্ধু এ অবস্থায় দেশের হাল ধরে এক বছর সময়ের মধ্যে রেল, সড়ক ও নদী পথের যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন।
বিদেশ থেকে খাবার এনে এক নির্ধারিত দুর্ভিক্ষ এড়ালেন, বাস্তুত্যাগীদের পুনর্বাসন করলেন, শিল্প-কারখানা সমূহ চালু করতে সক্ষম হলেন, বৈদেশিক সাহায্যে ও মাধ্যমে ব্যাঙ্ক চালু ও স্বর্ণ রিজার্ভের ব্যবস্থা করলেন, একটি জাতীয় সরকার কায়েমের জন্য প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করালেন, ১২৫টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করলেন এবং সর্বোপরি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারিটি জাতীয় মূলনীতির ভিত্তিতে জাতিকে দিলেন তার আকাঙ্ক্ষিত আত্মশাসনের দলিল জাতীয় সংবিধান। এবং সেই সংবিধান অনুযায়ী একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সার্বভৌম জাতীয় সংসদও গঠন করলেন। তা ছাড়াও ব্যাঙ্ক, বীমা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ করে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার পথ বন্ধ করলেন।
২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাগ পাকিস্তানী আমলের সকল বকেয়া খাজনা, কৃষি ও অন্যান্য ঋণ মওকুফ, হাট-বাজার-ঘাট ইজারা দেওয়ার ব্যবহা রহিত, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ করে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্ব ভোগীদের হাত থেকে পাট চাষীকে রক্ষা করলেন। দেশের সমস্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে সরকারী কোঠাগার থেকে বেতনদান স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কারিগরি, চিকিৎসাসহ সকল বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করলেন, স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়, সারা বিশ্বের সকল দেশের বিশেষ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মুক্তিকামী নিপীড়িত মানুষের নেতা হিসেবে স্বীকৃত হলেন।
দেশ জাতি যেমন একদিকে অগ্রগতি লাভ করতে থাকে এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একটি মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে, তখনই শুরু হয় এই শত্রুদের গোপন তৎপরতা তারা ব্যাপক হারে গুপ্ত হত্যা, ব্যাঙ্ক লুট, থানা লুট, পাটের গুদামে আগুন, সার কারখানা বিধ্বস্ত, পাটের কলে আগুন, ডাকাতি, রাহাজানি, হাইজ্যাকিং শুরু করে জন-জীবনে মাসের সন্ধান করে। শুরু করে বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার-পরিজন, তাঁর আদর্শের কর্মী তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসা কটনা।
অন্যদিকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ফসল উৎপাদনে বিঘ্ন, ১৯৭২ সালের বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি, ১৯৭৩ সালের ধরা ও তেলের মূল্য বৃদ্ধি, ১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৯ মাস স্থায়ী বন্যা ও প্রতিশ্রুতি মোতাবেক খাদ্য সরবরাহ না করার সাম্রাজ্যবাদী কারসাজীতে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয় দেশ এক দুর্ভিক্ষের শিকারে পরিণত হয়।
এই সব কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যখন সার্বিক জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও সুষম সরবরাহ ও বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, গ্রাম সমবায় ও গ্রাম্য আদালতে ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসন ভেঙ্গে দিয়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা জেলার প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থানীয় নেতৃত্বের উপর দায়িত্ব অর্পণ করে জনগণকে প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করার ও শ্রমভিত্তিক অংশীদারিত্বের নিশ্চিতকরণ এবং জনসম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত জনসংখ্যার কর্মসূচীভিত্তিক নতুন জাতীয় রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে জাতিকে সুসংহত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
তখনই তারা আঘাত হানলো তাদের আন্তর্জাতিক প্রভুদের নির্দেশ মোতাবেক। বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ কোন একদলীয় ব্যবস্থা ছিলো না, আসলে এটা ছিলো এদেশের ৮ কোটি মানুষের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও চর্চার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিকাশের আর প্রশাসন ক্ষেত্রে জনগণের অংশ গ্রহণের এক কমন প্লাটফরম। এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি ও দুঃখী মানুষের উপর পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, আমলাতন্ত্র ও নীল রক্তের দাবীদার সমাজপতিদের শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ এদেশের উপর তার প্রভুত্ব হারাবে, সেজন্যই সেই বিদেশী চিহ্নিত শত্রু তার এদেশীয় দোসরদের মাধ্যমে এই আঘাত হেনেছে।
![সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট - ভূমিকা [ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ] 3 সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট-ভূমিকা](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2023/03/অসাংবিধানিক-ধারা-প্রতিক্রিয়ার-যুগ-6.jpg)
সেজন্যই এহেন জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডসমূহ, সেজন্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের উপর এই নির্যাতন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় তাঁর দুই কন্যা বেগম হাসিনা শেখ ও বেগম রেহানা শেখ বিদেশে ছিলেন। কিন্তু গত তিন বছরে এই সরকার তাঁদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে দিচ্ছেন না বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব বাসভবনও এখন সরকারী হেফাজতে। আমরা অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের দেশে এসে বঙ্গবন্ধুর বাড়ী তাদের হাতে ফেরতদানের দাবী জানাই।
কিন্তু আমি আজ এক আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আপনাদের সামনে ঘোষণা করতে চাই যে, বর্তমানকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিহার করে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচীসমূহ বাস্তবায়ন অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সেজন্যই আমরা ১১-দফার একটি সংগ্রামী কর্মসূচী পেশ করেছি। আমরা বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত শোষিতের গণতন্ত্রের মাধ্যমে শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সোনার বাংলা কায়েমের পথ ধরেই এগিয়ে যাবো।
![সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট - ভূমিকা [ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল ] 1 সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট-ভূমিকা](https://bn.historygoln.com/wp-content/uploads/2024/09/সাধারণ-সম্পাদকের-রিপোর্ট-ভূমিকা.jpg)