আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থনীতিতে শিল্প। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অর্থনীতিতে শিল্প

আমাদের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবন যাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন করা হবে তিন বছর সময় পেয়েছিলেন। তবুও সেই অল্প সময়েই তার সরকার দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও ভৌত অবকাঠামো রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
সেই দায়িত্ব পালনের জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মাত্র সাড়ে পুনর্গঠিত করে কলকারখানা চালু করেছিলেন। বস্তুত তাঁর আমলে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ১৩ ভাগ। বঙ্গবন্ধুর সেই বিস্ময়কর সাফল্যের পাশাপাশি আমরা দেখি পরবর্তী দুইদশক যাবৎ লক্ষ্যহীন ও দুর্বল শিল্পনীতি, যার ফলে দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৫ ভাগের নীচেই অবস্থান করছে।
বিএনপি সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে অর্থনীতি আজ স্থবির, হাজার হাজার কল-কারখানা বন্ধ এবং শিল্প ক্ষেত্রে সুষম বিকাশের দ্বার রুদ্ধ। প্রবৃদ্ধি দুই ি শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকার ফলে অর্থনীতি ভারসাম্য হারাচ্ছে এবং জাতি গুটিকয়েক বিদেশী বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
উন্নয়নের তথাকথিত জোয়ার সম্বন্ধে বিরামহীন প্রচারণা চালিয়েও বিএনপি সরকার দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে পারে নি। এর আসল কারণ বিএনপির কুশাসনের ফলে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজী, দলীয় স্বার্থান্বেষীদের চাপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা ও বিলম্ব প্রভৃতি কারণে দেশের শিল্পায়ন। প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। উপরন্তু দলীয় সমর্থন পুষ্ট খেলাপী ঋণ গ্রহীতারা জনগণের বিপুল পরিমাণ সম্পন্ন আত্মসাৎ করার ফলে অর্থনীতির সার্বিক গতি ও নীতিমালা সম্বন্ধে জনগণের মধ্যে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে যে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ ত্বরান্বিত করার জন্য জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা জাতীয় শিল্পোন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সেই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা হবে যাতে শিল্প উদ্যোক্তারা উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ সম্বন্ধে আস্থাবান হয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন।
বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন কৌশলের একদিকে থাকবে রপ্তানীশিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ, অন্যদিকে থাকবে কৃষিভিত্তিক ও শ্রমনিবিড় ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের ব্যাপক প্রসার। রপ্তানীমুখী শিল্পকে জরুরী খাত হিসাবে ঘোষণা করে।
উৎপাদন ও রপ্তানীর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সাথে সাথে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোেদ্যাক্তাদের পর্যাপ্ত ঋণ, প্রযুক্তিগত সমর্থন ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রদান নিশ্চিত করে তাদের সর্বতোভাবে উৎসাহিত করা হবে।
বর্তমানে যে সব শিল্প ইউনিট রুগ্ণ বা আধা রুগ্ণ হয়ে অর্থনীতির উপর একটা বোঝা হয়ে আছে তাদের অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা হবে এবং যে-সব ইউনিটের ব্যবসায়িক সাফল্যের সম্ভাবনা আছে তাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এ-কথা আজ দিবালোকের মত পরিষ্কার যে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বিনিয়োগের ও শিল্পোন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। এই ক্ষেত্রে বিএনপির ব্যর্থতা জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে একটা বিরাট নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেবে এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী ও মাস্তানদের দৌরাত্ম কঠোর হস্তে দমন করবে। প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা ও দুর্নীতি দমন করার জন্য বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ভৌত অবকাঠামোর সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে, অর্থস্থাতের সংস্কার দৃঢ়তার সঙ্গে সম্পূর্ণ করা হবে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত করার জন্য রপ্তানীকারকদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আওয়ামী লীগ শিল্প খাতকে অর্থনীতির সার্বিক অগ্রগতির জন্য একটা গতিশীল চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে।
শিল্প
(ক) বাংলাদেশের যে প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ বর্তমান তার সৎ ও বৈজ্ঞানিক ব্যবহার দ্বারা দেশকে উন্নত সমাজে। রূপান্তরিত করা অসম্ভব কাজ নয়। এরই প্রেক্ষিতে বলা যায় যে বাংলাদেশে যে পরিমাণ খনিজ সম্পদ, যথা- কয়লা, চুনাপাথর, প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোলিয়াম, কঠিন শিলা, আকরিক পদার্থ, পিট ইত্যাদি আছে তাতে এই সম্পদাদির উপর নির্ভর করে বিরাট বিরাট শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
(খ) দেশে অবশ্যই মৌলিক শিল্পগুলির উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিল্পনীতি গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ লোহা, কয়লা, সিমেন্ট এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ও কেমিক্যাল সম্পর্কিত শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য শিল্প গড়ে তুলতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে স্টীল মিল, কারিগরী টুলস ফ্যাক্টরী, ডিজেল প্ল্যান্ট ইত্যাদিকে আধুনিকীকরণ করে দেশের চাহিদা মেটাতে হবে।
এরই পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আওয়া শিল্পগুলির মনোন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্যে সর্বদা সচেষ্ট থাকবে। যেমন- পাট শিল্প, রেশম শিল্প, চিনি শিল্প ইত্যাদি এবং এই সঙ্গে ফলমূল, মাছ, মাংস ইত্যাদির সংরক্ষণ শিল্প ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা করব
(গ) প্রধান প্রধান বৃহদায়তন শিল্পগুলির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে এবং পরিপূরক হিসাবে মাঝারি, ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পে বিকাশ ঘটাতে হবে।
(ঘ) আওয়ামী লীগ বন ও বনজ সম্পদকে বিনষ্ট হতে দেবে না এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমেই কেবল বনজ সম্পদ ব্যবহার করবে, যাতে ঐ সম্পদের ন্যূনতম ক্ষতি না হয়।
(ঙ) দেশে বর্তমানে প্রাপ্তিযোগ্য ফলমূল এবং শাকসবজির ফলন বাড়িয়ে এবং নতুন নতুন প্রজাতির ফলমূল আমদানী করে কৃষিজ শিল্পকে নতুন মাত্রায় উত্তরণ করা আওয়ামী লীগের লক্ষ্য।
(চ) আওয়ামী লীগ পরিবেশ সুস্থ রাখা সম্বন্ধে সদা সচেতন। কোন শিল্প যেন পরিবেশ দূষিত না করে আইনগতভাবে এবং প্রশাসনের মাধ্যমে তার সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

(ছ) দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির উৎপাদনে দেশীয় শিল্পের প্রধান ভূমিকা যাতে থাকে আওয়ামী লীগ সেদিকে লক্ষ রাখবে।
(জ) প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানে যে অভূতপূর্ব বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়েছে এবং হচ্ছে আওয়ামী লীগ সে সম্বন্ধে সচেতন।বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতিকে দেশের উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করবে।
