অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার

আমাদের আজকের আলোচনা বিষয় –  অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল এর একটি অংশ।

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার

 

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার

 

একটি স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচনকমিশনই অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে পারে। সেই লক্ষ্যে ৯০-এর তিনজোটের ঘোষণায় নির্বাচনকমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য সেই ভিত্তিতে নির্বাচ কমিশনের পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছিল।

নির্বাচনী আইন ও বিধির ক্ষেত্রে কিছু সংশোধন ও সংযোজন করা হলেও প্রধান নির্বাচন-কমিশনার ও নির্বাচন-কমিশনার নিয়োগ, নির্বাচন -কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা হয় নাই । ফলে নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন -কমিশন নির্বাহী বিভাগের কাছে অসহায় থাকে। এই অবস্থায় নির্বাচন -কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে গঠন করতে- 

১. প্রধান নির্বাচন-কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন-কমিশনারদের নিয়োগ রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রদান করতে হবে। কতজন নির্বাচন-কমিশনার হবেন তাও নির্ধারিত করতে হবে। 

২. কমিশনার সাধারণ নিয়মে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই কাজ করবে, তবে একাধিক মতামতের ক্ষেত্রে সংখ্যাধিক্য ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত কার্যকর করবে।

৩. নির্বাচন-কমিশনের একটি স্বাধীন সচিবালয় থাকবে। নির্বাচন-কমিশনের সচিবালয় হবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন সংস্থা। নির্বাচন কমিশনই উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত তার সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তৃ করবে এবং তার কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ করবে। নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনকে তার চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সংখ্যক জনবল সরকার সরবরাহ করবে।

৪. নির্বাচন-কমিশন আর্থিকভাবে পরিপূর্ণ স্বাধীন হবে এবং এ জন্য বাজেটে সংযুক্ত তহবিলের দায়মুক্ত ব্যয়ের বিধান অনুযায়ী সরাসরি বরাদ্দ প্রদান করা হবে। ঐ অর্থ ছাড় করার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোন কর্তৃত্ব থাকবে না। 

৫. নির্বাচন পরিচালনার সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনের আগে ও পরে একটি নির্দিষ্ট সময়কালে নির্বাচন-কমিশনের অধীন থাকবে এবং এই সময়কালে তাদের কৃত কোন অপরাধ ও কর্তব্যে অবহেলার জন্য নির্বাচন-কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এবং সরকার তা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে।

৬. নির্বাচন-কমিশনের পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকবে। বাজেটে নির্বাচন-কমিশনের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ থাকবে। এবং এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

৭. নির্বাচন-কমিশন রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের নিয়োগ প্রদান করবেন। নিয়োগদানের পূর্বেই তাদের নিরপেক্ষতা যাচাই বাছাই করবেন। এরা নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং নির্বাহী বিভাগের যে কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব মুক্ত হবেন। নির্বাচন কমিশন পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বিভাগের লোকজনের নিয়োগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। নির্বাচনী বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকবে।

 

৮. নির্বাচন-কমিশন কর্তৃক প্রতি নির্বাচনী এলাকায় এক বা একাধিক প্রজেকশন মিটিং এর আয়োজন করা উচিত।

৯. নির্বাচন-কমিশন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা ও নির্বাচন বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবে।

১০. নির্বাচনী আইন ও বিধি লংঘনের জন্য নির্বাচন-কমিশন নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা ও বাতিল করতে পারবে এবং ঐ আইন ও বিধি লংঘনকারীদের আটক করার আদেশ ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করতে পারবে। এই জন্য সময়কালের জন্য নির্বাচন-কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

১১. (ক) ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য।প্রচার মাধ্যমে লাগাতার প্রচার ও ক্রস চেকিং-এর ব্যবস্থাসহ ভোটার তালিকা প্রতিনিয়ত নবায়ন করার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। কম্পিউটারাইজড ভোটার তালিকা ও ভোটারদের জন্য আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।

(খ) পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 

১২. নির্বাচন-কমিশন নির্বাচনের সময় নির্বাচনী এলাকার ভিত্তিতে সর্বদলীয় পর্যবেক্ষণ দল গঠন করবে। জাতীয় ক্ষেত্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের মূল্যায়ন নির্বাচনের এক বছর পূর্বে করে তালিকাভুক্তি করতে হবে এবং এই পর্যবেক্ষকদের তালিকা নির্বাচন তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সরবরাহ করতে হবে। এ সকল পর্যবেক্ষক কোনক্রমেই ভেটি কক্ষ বা বুধে যাবেন না। 

১৩. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দলের বিষয়ও ন্যূনতম পক্ষে ভোট গ্রহণের একমাস আগে প্রকাশ করতে হবে এবং তাদের কার্যপরিধিও নির্দিষ্ট থাকবে।

১৪. ভোট গ্রহণের জন্য প্রতি বুদ্ধে স্বচ্ছ (Transparent) ভোট বাক্সের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তার নাম্বারিং থাকতে হবে।

১৫. ভোটকেন্দ্রে সকলের উপস্থিতিতে নির্বাচনী ভোট গণনা ও ফলাফলের স্বাক্ষরিত কপি প্রার্থী বা তার মনোনীত প্রার্থী এবং নির্ধারিত পর্যবেক্ষকদের প্রদান করবে। রিটার্নিং অফিসার নির্বাচনের ফলাফলের কনসলিডেটেড বিবরণী নির্বাচন-কমিশনকে প্রেরণ করবেন এবং কেবলমাত্র নির্বাচন-কমিশনই নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করবেন।

 

অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার

 

১৬. নির্বাচনী ফলাফল বিরোধের ক্ষেত্রে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে কোন মামলা দায়ের করা হলে দুই মাসের মধ্যে তার নিষ্পত্তি করা এবং সে সংক্রান্ত কোন আপীল সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের বেঞ্চ কর্তৃক তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ বিষয়েও নির্বাচন-কমিশন নিজে পক্ষভুক্ত হয়ে মামলায় নিষ্পত্তির ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

১৭. প্রবাসী বাংলাদেশের নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

Leave a Comment